পাপিয়া জেরীনের কয়েকটি কবিতা

পাপিয়া জেরীন
অলঙ্করণ শতাব্দী জাহিদ

অলঙ্করণ শতাব্দী জাহিদ

  • Font increase
  • Font Decrease

এই জ্বর ঘোর-লাগা রাতে

এই জ্বর ঘোর-লাগা রাতে
তোমার শরীরে গজাই
কয়েকশো একর কাগজিলেবু বন,
দুধে ভেজা রুটির মতন
শুষে নিতে থাকি অধরান্ত জিভ
আঙুল ডুবায়ে রাখি অতলান্ত গহ্বরে;
অপাঙ্গ-জল, জলের আঘাত
রোমে রোমে মন্থিত শ্বেত পারিজাত!
ফের অতিক্রান্ত কালোয়
আবেস্তার পাতায় পাতায় খুঁজি—
শিফা-ই-গুল;
এই জ্বর ঘোর-লাগা রাতে
কেন আহরিমান খুলে রাখে বুক!
আমি সত্য-শিব ভুলে খুলে দিই গোপন দেরাজ,
চুষে নিতে থাকি তোমার অধরান্ত জিভ;
এই ঘোর-লাগা রাতে কুয়াশার হোমকুণ্ড ভাঙে
নামে ধুন্ধুকার পীড়ন,
জন্মান্ধ চোখ নিয়ে দেখি—
আঁধারে ঝরে আছে পারস্য গোলাপ!

হিজরত

রক্তের দাগ ধুয়ে মুছে গেলে
সেখানে গাছেদের শুভ্রতর যৌনাঙ্গ
স্তবকে স্তবকে শুয়ে থাকে
স্মৃতিতে শরীরের বিচ্ছিন্ন মাথাগুলি
হাতের ওপর ধারালো ধাতব হাত
স্থির থেকে স্থির, ফসিলের মতো।
তবু, জীবনের নিস্তার নাই জেনে—
আঁধারের পিছু নেয় চাঁদ;
ক্ষুধার জলাবদ্ধ মুখ
শরীরের ভাঁজে ফুল
তোর আঙুলের জোনাকি
আমার গহ্বরে আশ্রিত হতে থাকে
অবিরাম—দলে দলে।

তোমার চোখে

তোমার চোখে চেয়ে দেখেছি—
সেখানে গোল্ডেন রেশিও মেনে
জেগে থাকে বন্য অর্কিড-রমণী,
কিশোরীর ব্যালাডোনায় ফোটানো চোখ;
এই সব দেখে
পৃথিবীর কোন এক বিন্দুতে তোমাকে রেখে
আমি হেঁটে চলে গেছি অভিমানে,
যেখানে শিমুল ফুলের অর্ঘ্য ছড়ায়ে  
দাঁড়ায়ে থাকে শিমুলেরই ডাল;
সেখানে দীর্ঘতম দিনে দাঁড় করায়ে রাখি কল্পনায়
জানি না, পথেপ্রান্তরে মাঠে জলাজমিতে কেমন
দেখাবে তোমারে
কাস্তে হাতে, অথবা ঠোঁট গড়ায়ে পান্তার রসে!
আমি জানি না, তুমি কখনো শিশুরে বুকে রেখেছো
কি রাখো নাই!
তবু মনে মনে জ্বরে লাল হওয়া শিশু তোমার কোলে রাখি;
দেখি, তার নরম আঁচে পুড়ে যায় কিনা বুক!
তোমার চোখের ভেতর চেয়ে দেখেছি আরো একবার—
অতলান্তিক সমুদ্রে নাবিকের মতো
ধরে রেখেছো রমণীর হাল;
অথচ, এই আমাকে দেখো—
এক অবিনশ্বর আঁতুড়ঘরে শুয়ে
আমি দেখছি তোমার চোখ, যে চোখে
ফুটে থাকে শুক্ল অর্কিড আর দ্বিদল অপরাজিতা!

আত্মজ

কাঁঠালি-চাঁপার মতো হাত
এসে ঝুলে থাকে বুকের কাছে
একজোড়া ছোট্ট জোনাকি জুতো
বারান্দার ইউরেকাময় জল
কত কিছু ছলকায় স্বপ্নের ভিতর!
স্বপ্নশেষে, গলার ভেতর এসে
ফুলে থাকে এক নলা ভাত
দরদ-সৌরভ মিলায়ে গেলে
ধীরে মনে হয়—
সে থাকে অংশত আমার হয়ে
তবু, আমার মতো পাই না তারে।

এইসব রাতে

প্রবল চাপে এক সমতলে আসে গিরি, গিরিখাত
যুগল চাঁদের ভাঁজে জড়ায়ে থাকে শ্মশ্রুল মেঘ,
তৃণভূমির সিঞ্চিত জলে ডুবায়ে আম্বর-জিভ
পুরুষ হরিণ ধুয়ে ফেলে তার লবণের ক্লেদ;
দূরে...দূরে ডাহুকের বনে
ফুটে ঝরে যায় ফুল দেহগন্ধময়,
গন্ধবহ বয়ে আনে মৃদু সৌরভ তার!
এইসব বিপন্ন রাতে আমি বীতকাম
যেন এই দেহ দাহ হবে না কোনোদিন,  
রজতরেখার তীরে কীটেরা কেটে নেবে
শরীর তন্তুময়, ক্ষয়ে যাবে—
পদ্মবক্র নাভিদেশ, বিরান মন্দির!

আপনার মতামত লিখুন :