Barta24

বৃহস্পতিবার, ২২ আগস্ট ২০১৯, ৭ ভাদ্র ১৪২৬

English

কিশোরগঞ্জে ৯০ বছরস্পর্শী সাবেক জমিদারের গানের অ্যালবাম

কিশোরগঞ্জে ৯০ বছরস্পর্শী সাবেক জমিদারের গানের অ্যালবাম
শিল্পী পিতা সৈয়দ মশকুরের সঙ্গে পুত্র সৈয়দ শাকিল
ড. মাহফুজ পারভেজ
কন্ট্রিবিউটিং এডিটর
বার্তা২৪.কম


  • Font increase
  • Font Decrease

পৌষ আসার আগেই যৌবনবতী শীত জাপটে ধরেছে পৃথিবীকে। হেমন্তের বিষণ্ন জোছনা কুয়াশায় ভিজে ভিজে আরো ম্লান। স্তব্ধ রাতের আকাশ হয়ে গেছে একখণ্ড শীতার্ত চাদর। এমন প্রকৃতিতে চাঁদের চোখেও ঘুমের ছায়া।

স্মরণীয় শিল্পী তালাত মাহমুদ এমনই মায়াময় চিত্রকল্পের কথা বলেছেন প্রণব রায়ের লেখা ও কমল দাশগুপ্তের সুরে গাওয়া একটি গানে। প্রেম ও স্মৃতিকাতরতায় বোনা গানটি হিমেল পরশে নস্টালজিয়া জাগিয়ে গাইলেন ৯০ বছরস্পর্শী এক চির তরুণ, যার মৃত্যুর এক মাস পর গানটি অ্যালবাম থেকে ইউটিউবে প্রকাশ পেয়েছে। তার নাম সৈয়দ আব্দুল আহাদ মশকুর (১০ জানুয়ারি ১৯৩০-২৮ অক্টোবর ২০১৮), কিশোরগঞ্জের হয়বতনগর জমিদার বাড়ির উত্তরপুরুষ তিনি।

বাংলাদেশে তো বটেই, বিশ্বের জানা-শোনা ইতিহাসে ৯০ বছরের দ্বার প্রান্তের কোনো শিল্পীর পক্ষে গান গাওয়া এবং সেই গানের অ্যালবাম প্রকাশ করার নজির সম্ভবত আর নেই। গভীর প্রেমাবেগে গানগুলো গেয়েছেন সৈয়দ আব্দুল আহাদ মশকুর। অতি বৃদ্ধ বয়সে কণ্ঠের ভারসাম্য ও আবেগ রক্ষা করে সঙ্গীত উপস্থাপনা তার পরিশীলিত শৈল্পিক কৃতিত্বের স্বাক্ষরবাহী। প্রতিটি শব্দের যথাযথ উচ্চারণ ও সুর-তাল-লয়ের বিচ্যুতি এড়িয়ে গান গাইবার সময় শিল্পী নিজেও জানতেন না যে, মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই তিনি মৃত্যুর হাতে রাখি পড়াবেন। অথচ গানটির কোনো এক চরণে তিনি গেয়েছেন, ‘হিয়া যে চাহে, এ মধু রাতে, পড়াতে তোমায়, মিলন রাখি।’

প্রিয়ার হাতে রাখি পড়াবার অতৃপ্ত বাসনা জাগিয়ে তিনি নিজেই চলে গেছেন মৃত্যুর অচ্ছেদ্য রাখিবন্ধনে। রেখে গেছেন সঙ্গীতের ঐতিহাসিক স্মারকচিহ্ন আর সাংস্কৃতিক পরম্পরার যোগসূত্র। ঐতিহ্যভাবেই যা তিনি অর্জন করেন পুরুষানুক্রমে এবং বারো ভূইয়া-প্রধান, বীর মসনদে আলা দেওয়ান ঈসা খাঁ আর হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর সঙ্গী বৃহত্তর সিলেট বিজয়ী সৈয়দ নাসিরউদ্দিন সিপাহসালাহের ঐতিহ্যসূত্রে। ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় এসবই তিনি পেয়েছেন দেওয়ান ও সৈয়দ বংশের আত্মীয়তা ও রক্তধারার নাভিমূল কিশোরগঞ্জের হয়বতনগর জমিদার বাড়ির জন্মস্থান থেকে।

শিল্পী সৈয়দ আব্দুল আহাদ মশকুর-এর সঙ্গে আমার কখনো সাক্ষাত-পরিচয় ঘটে নি। কিন্তু তার জেষ্ঠ্যপুত্র সৈয়দ শাকিল আহাদ ৪৬ বছর আগে কিশোরগঞ্জ শহরে আমার শৈশবের সহপাঠী ছিল। জানতাম, তার পিতা সরকারী চাকরির সুবাদে ঢাকায় কর্মরত রয়েছেন।

স্কুলের মেলামেশার বাইরে শহরের উপান্তে নরসুন্দা নদী পেরিয়ে হয়বতনগর গেলে জমিদার বাড়ির হাভেলিতে দেখা হয়েছে বড় বোনের বান্ধবী জুঁই আপা, সিনিয়র বন্ধু বাশার ভাই, বন্ধু এনাম, আজিম এবং শাকিলের সঙ্গে। সেই সত্তর দশকে ক্ষয়িষ্ণু হয়বতনগনের জৌলুস ও জেল্লার খানিকটা অবশিষ্ট ছিল। আভিজাত্য ও রক্ষণশীলতার মিশেলে সেখানে পুঞ্জিভূত ঐতিহ্যগত আদব-লেহাজ, আচার-আচরণ, তাহজিব-তমুদ্দুন, রীতি-রেওয়াজ মুগ্ধ করেছে আমাদের। সুশ্রী, পর্দানশীল, খানদানি মহিলাদের স্নেহ আর রাজসিক পোষাকের সুঠাম পুরুষদের উপস্থিতিতে ছমছম করতো যে জমিদার বাড়ি, একদা সেখানে নূপুরের নিক্কণ, এস্রাজ আর পাখোয়াজের আওয়াজের সন্ধ্যা নামতো। ভোর হতো শেহনাই ও নহবতের সুরে।

 https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2018/Dec/07/1544181386779.jpg

দূরাগত অতীতের পাটাতনে স্মৃতির মমি হয়ে সেইসব ঔপনিবেশিক-সামন্তগন্ধী দিনগুলো হারিয়ে গেছে আমাদের শৈশবের স্মৃতি-বিস্মৃতির নদীতে। দিগন্ত বিস্তারী মহাবৃক্ষের শাখা-প্রশাখার মতো হয়বতনগরের বিভিন্ন খান্দানের বাসিন্দারাও ছড়িয়ে গেছেন দেশে-বিদেশে। এখন বিশাল জমিদার বাড়ি বহু শরিকের মধ্যে বিভক্ত ও ছিন্ন-বিছিন্ন আকারে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে ইতিহাসের কঙ্কাল হয়ে। নান্দনিক সাংস্কৃতির সুষমা কিশোরগঞ্জের সমাজ ও মানুষের মধ্যে বিলিয়ে দিয়ে প্রাগৈতিহাসিক কম্পনে ইতিহাসের বিবর্ণ পাতায় শুধুমাত্র লেপ্টে আছে হয়বতনগর নামটি।

কর্মসূত্রে চট্টগ্রাম থাকায় কিশোরগঞ্জ যাওয়া হয় কম। গেলেও হয়বতনগরে যাওয়ার সুযোগ কিংবা পরিবেশ পাওয়া যায় না। ফলে বিগত চার দশকে সৈয়দ শাকিলের সঙ্গে আর দেখা বা যোগাযোগ হয় নি। আমাদের কিশোরগঞ্জের বাসায় আব্বার সঙ্গে দেখা করে সে আমার খোঁজ-খবর-ঠিকানা জেনে কদিন আগে ফোনে যোগাযোগ করে। ফোনে সে জানালো তার পিতার মৃত্যু সংবাদ এবং শেষ বয়সে পিতার গানের অ্যালবাম বের হওয়ার খবর। আনন্দ ও বেদনার ধ্বনির মিশেলে কথাগুলো উচ্চারিত হয়েছিল তার কণ্ঠে।

শাকিলের পিতাকে আমরা জানতাম অন্য রকম একজন মানুষ হিসাবে। জাগতিক লাভ ও লোভের বাইরের একজন শুদ্ধতম ব্যক্তিত্ব হিসাবে তার ছিল উজ্জ্বল ইমেজ। সারা জীবন সঙ্গীত, চলচ্চিত্র, অভিনয় নিয়ে মেতে ছিলেন তিনি। ক্ষয়িষ্ণু জমিদার বংশের উত্তরাধিকারী হিসাবে অর্থ-বিত্ত-সম্পদ সংগ্রহের মাধ্যমে অতীতের শক্তি ও দাপট পুনরুদ্ধারের পথে চলেন নি তিনি। সাধক প্রকৃতির এই মানুষটি মোটেও হিসাবী-সংসারী ছিলেন না। স্বর্ণালী পূর্বপুরুষদের নন্দন ঐতিহ্য ধরে রাখার মানসে তিনি চলেছেন সঙ্গীত, শিল্প ও সাহিত্যের জগতে।  কর্মসুত্রে জড়িত ছিলেন বাংলাদেশ ফিল্ম ইনসটিটিউট অ্যান্ড আর্কাইভ-এর সঙ্গে। সে সুবাদে চলচ্চিত্র বিষয়ক চর্চা ও গবেষণায় ছিল তার পেশাগত দক্ষতা। সময়ে-অবসরে মেতে থাকতেন গান নিয়ে। আর ছিল লেখালেখির প্রবল ঝোঁক। তার রচিত গ্রন্থ ‘ফেলে আসা দিনগুলো’ এবং ‘স্মৃতির পাতা থেকে’ পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে।

মূলত ভক্ত, অনুরাগী, আত্মীয়-পরিজন ও সন্তানদের চাপে একেবারেই শেষ বয়সে সৈয়দ আব্দুল আহাদ মশকুর তার সঙ্গীত প্রতিভার স্মারকচিহ্ন রাখতে সম্মত হন। মৃত্যু অল্পদিন আগে ‘তুমি জানো প্রিয়া’ নামে একটি মিউজিক্যাল অ্যালবাম প্রকাশ করা হয় তার গানগুলোকে নিয়ে। আটটি একক গানে তিনি দরদী কণ্ঠে মন-প্রাণ উজাড় করে গেয়েছেন। অ্যালবামটি তত্ত্বাবধান করেন তার জেষ্ঠ্যপুত্র সৈয়দ শাকিল আহাদ। সঙ্গীত পরিচালনা ও কম্পোজিশন করেন ইবনে রাজন। আরও জড়িত ছিলেন পুলক বড়ুয়া, মুজাহিদুল হক লেনিন এবং শিল্পীর কনিষ্ঠপুত্র ২০১৬ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত সঙ্গীত শিল্পী সৈয়দ ওয়াকিল আহাদ।

অ্যালবামের সবগুলো গানই হৃদয়গ্রাহী। বিশেষত ‘ঘুমের ছায়া চাঁদের চোখে এ মধু রাত নাহি বাকি’ গানটিতে তিনি সুরের মুর্চ্ছনার সঙ্গে কণ্ঠমাধুয্যের অনন্য মিলন ঘটিয়েছেন। বাংলাদেশের সর্বজেষ্ঠ্য কণ্ঠশিল্পী হিসাবে তার আত্মপ্রকাশ সঙ্গীতের ইতিহাসে যেমন দাগ কেটেছে, তেমনি একজন ভরাট গলার প্রবীণ পুরুষের প্রেমময় আর্তি শ্রোতাদের হৃদয়ে দোলা জাগিয়েছে। এই শীতে গানটি প্রকাশ পাওয়ার সময় তিনিও ঘুমের দেশে চলে গেছেন। তথাপি ঘুমের ছায়া চোখে নিয়ে এক ফালি চাঁদের মতো তিনি সুরের আকাশে জেগে আছেন।

কিশোরগঞ্জের প্রাচীন হয়বতনগর পরগণার আকাশে কোনো কোনো জোছনা-প্লাবিত রাতে হয়ত আর ভেসে আসবে না শান-শওকতে ভরা জমিদার বাড়ির আবছায়া। কালের গর্ভে অনেক কিছুর মতোই হারিয়ে গিয়েছে সেই প্রাঙ্গণ, প্রাচীন ইমরাত, সাংস্কৃতিক দ্যোতনা। মানুষগুলোও চলে গেছেন জীবনের চেয়ে বহুদূরের ঠিকানায় কিংবা দেশ-দেশান্তরের অভিবাসনে। কিন্তু সেই জোছনায় হয়বতনগরের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের নক্ষত্রতুল্য জ্যোতিতে ঠিকই জ্বলজ্বল করবেন বর্ষীয়ান শিল্পী সৈয়দ আব্দুল আহাদ মশকুর। কণ্ঠের লালিত্যে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ভূগোলে তিনি থাকবেন একটি মরমী গানের পাখির আদলে।

আপনার মতামত লিখুন :

বাংলা অনুবাদ সাহিত্যে তারুণ্যের জাগরণ

বাংলা অনুবাদ সাহিত্যে তারুণ্যের জাগরণ
প্রসিদ্ধ প্রকাশনীর বড় ভরসা অনুবাদ সাহিত্যগুলো

বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন শাখার মধ্যে অনুবাদ সাহিত্য অনেক আগেই তৈরি করে নিয়েছে শক্তিশালী এক অবস্থান। গত এক দশকজুড়ে এই মাধ্যমটা হয়েছে আরো শক্তিশালী। বিভিন্ন প্রসিদ্ধ প্রকাশনীর বড় ভরসা অনুবাদ সাহিত্যগুলো। তেমনি অপেক্ষাকৃত ছোট ও কম খ্যাতিমান প্রকাশনীগুলোও অনুবাদ বই বের করতে বিনিয়োগ করছে এই আশায় যে, তাদের টাকাটা অন্তত কিছু লাভসহ উঠে আসবে। আর এই অনুবাদ সাহিত্যের জগতে, উল্লেখ্য এই সময়টাতে, ভালো অনুবাদক হিসেবে পাঠকদের মনে জায়গা করে নিয়েছেন বেশ কিছু তরুণ অনুবাদক। প্রকাশক ও পাঠক—উভয়েই ভরসা করতে পারছেন দক্ষ এসব তরুণ অনুবাদকদের ওপর।

এই তরুণ অনুবাদকদের বয়স ২০ থেকে ৩৫-এর মধ্যে। তাদের অনেকেই এখনো ছাত্র। কিন্তু, এরই মধ্যে তাদের অনেকের অনুবাদ করা বই অর্জন করেছে দারুণ পাঠকপ্রিয়তা। একই সাথে অনুবাদক হিসেবে জনপ্রিয় হচ্ছেন তারাও। বিশ্বের বিখ্যাত ও বড় বড় লেখকদের বই তারা অনুবাদ করে হাজির করছেন বিশ্বসাহিত্যে আগ্রহী দেশের পাঠককূলের কাছে। তাদের কারণেই অনেক বিখ্যাত ও মাস্টারপিস সাহিত্যকর্ম আস্বাদন করতে পারছেন দেশের বিপুল সংখ্যক পাঠক। কেননা, ভাষার সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে ইংরেজি বা অন্যান্য ভাষায় সেসব বই পড়া সম্ভব হয় না দেশের বেশিরভাগ পাঠকের। তাই, তাদের ভরসা অনুবাদ। আর একাজে আসলেই অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করছেন দেশের তরুণ অনুবাদকেরা। বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রকাশনীর অনুবাদকদের বেশিরভাগই আসলে এই বয়সী তরুণরাই।

বাংলাদেশে তরুণ অনুবাদকদের এই কর্মস্পৃহাকে স্বাগত জানান অন্বেষা প্রকাশনীর প্রকাশক ও সত্ত্বাধিকারী মোহাম্মদ শাহাদত হোসেন। তিনি বলেন, “তরুণ অনুবাদকদের অনেকেই ভালো করছে। আমাদের অন্বেষা প্রকাশনীতে মো. ফুয়াদ আল ফিদাহ, সান্তা রিকি, আদনান আহমেদ রিজনের মতো তরুণ অনুবাদকেরা যথেষ্ট ভালো মানের অনুবাদ বই উপহার দিচ্ছেন, এবং সাড়াও পাচ্ছেন পাঠকদের কাছ থেকে। আর দেশে তরুণ অনুবাদক যারা আছেন, তারা যদি অনুবাদকে আরো অর্থবহ করে তোলার সক্ষমতা অর্জন করেন, তাহলে তা অনুবাদ ও প্রকাশনা শিল্প—দুটোর জন্যই ভালো। বেশ কিছু তরুণ অনুবাদক এখন দুর্দান্ত কাজ করছেন। নিকট ভবিষ্যতে দেশের অনুবাদসাহিত্যকে আরো ভালো জায়গায় তারা নিয়ে যাবেন বলে আমি বিশ্বাস করি।”

এসময়ের একজন জনপ্রিয় তরুণ অনুবাদক মো. ফুয়াদ আল ফিদাহ। ২০১৫ থেকে এপর্যন্ত তার অনুবাদ গ্রন্থ বের হয়েছে ৪০টির মতো। এপ্রসঙ্গে তিনি বলেন, “একসময় দেশে ভালো মানের অনুবাদ বই বের হতো বেশ কম। এইক্ষেত্রে তরুণরা যে এগিয়ে এসেছে এবং দারুণ কাজ দেখাচ্ছে, তা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। আর্থিক ব্যাপারের থেকে এক্ষেত্রে তাদের কাজ করার প্যাশনটাই অনেক বড়। এই পরিবর্তনটা আসলেই দরকার ছিল।”

বাংলা অনুবাদ সাহিত্য আসলে শুরু হয়েছিল কবির চৌধুরী, কাজী আনোয়ার হোসেন, শেখ আব্দুল হাকিম, রকিব হাসান প্রমুখের হাত ধরে। বিদেশি সাহিত্যকে সহজ ভাষায় দেশের মানুষের কাছে উপস্থাপন করতে বড় ভূমিকা ছিল সেবা প্রকাশনীর। তবে, তাদের বইগুলো ছিল নিউজপ্রিন্ট কাগজের। এরপর ৯০ দশকের শেষার্ধ্ব ও ২০০০-এর প্রথম দশকে বোর্ড বাঁধাই ও হোয়াইট প্রিন্ট কাগজে অনুবাদ বইয়ের প্রচলন ঘটে। এক্ষেত্রে অগ্রগণ্য ভূমিকা রেখেছে সন্দেশ, অন্যধারা, রোদেলা, বাতিঘর, অন্বেষা, ঐতিহ্য ইত্যাদি প্রকাশনী।

বাতিঘর প্রকাশনীর যাত্রা শুরু ২০০৩ সালে মোহাম্মদ নাজিমউদ্দিনের হাত ধরে। তার অনূদিত ও বাতিঘর থেকেই প্রকাশিত ‘দ্য ডা ভিঞ্চি কোড’ বইটি বাংলা অনুবাদ সাহিত্যের ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক। জনপ্রিয়তা ও বিক্রয় সংখ্যা—দুই দিক থেকেই। ২০০৫-এ এই বইটি অনুবাদ করার সময় নাজিমউদ্দিনও নিজেই ছিলেন একজন তরুণ অনুবাদকই। এর ঠিক আগের সময়টাতে অনুবাদক হিসেবে দারুণ জনপ্রিয়তা পান অনীশ দাশ অপু। বলাই বাহুল্য, তিনিও অনুবাদ করতে ও জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করেন তরুণ বয়স থেকেই।

তাদেরই পথ ধরে গত কয়েক বছরে অনুবাদ সাহিত্যে খুব ভালো কাজ দেখিয়েছেন অনেক তরুণ অনুবাদক। এদের মধ্যে পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছেন সায়েম সোলায়মান, মো. ফুয়াদ আল ফিদাহ, শাহেদ জামান, সালমান হক, কিশোর পাশা ইমন, আদনান আহমেদ রিজন, সাইম শামস, অসীম পিয়াস, কৌশিক জামান, সান্তা রিকি মাকসুদুজ্জামান খান, ডিউক জন প্রমুখ। অত্যন্ত জনপ্রিয়তা পেয়েছে সায়েম সোলায়মানের ‘কুইন অব দ্য ডন’, ‘কালো কফি’, ‘দ্য ওয়ান্ডারার্স নেকলেস’ (সেবা প্রকাশনী) ইত্যাদি থ্রিলার ঘরানার বই, সালমান হকের বাতিঘর প্রকাশনী থেকে বের হওয়া ‘থ্রিএএম’ সিরিজের বই ও ‘দ্য বয় ইন দ্য স্ট্রাইপড পাজামা’ বইটি, শাহেদ জামানের ‘দ্য পিলগ্রিম’ (বাতিঘর প্রকাশনী), ‘দ্য ফর্টি রুলস অব লাভ’ (রোদেলা প্রকাশনী) ও ‘দ্য ফরবিডেন উইশ (নালন্দা প্রকাশনী), মো. ফুয়াদ আল ফিদাহর ‘সিরিয়াল কিলার’, ‘গেম ওভার’ (সেবা প্রকাশনী) ও ‘সাইকো ২’ (আদি প্রকাশনী), কিশোর পাশা ইমনের ‘দ্য গার্ল অন দ্য ট্রেন’ (বাতিঘর প্রকাশনী), ‘দ্য পাওয়ার অব হ্যাবিট’ (নালন্দা প্রকাশনী), আদনান আহমেদ রিজনের ‘দ্য প্রেসিডেন্ট ইজ মিসিং’ ও ‘দ্য গার্ল ইন রুম ওয়ান জিরো ফাইভ’ (আদি প্রকাশনী), মাকসুদুজ্জামান খানের ‘দ্য আলকেমিস্ট’ (রোদেলা প্রকাশনী) ও ‘অ্যাঞ্জেল অ্যান্ড ডেমনস’ (অন্বেষা প্রকাশনী), ডিউক জনের ‘সুলতান সুলেমান’ ও ‘বিউলফ’ (সেবা প্রকাশনী), কৌশিক জামানের ‘নরওয়েজিয়ান উড’ (বাতিঘর প্রকাশনী), সান্তা রিকির ‘দ্য সার্জন’ (বাতিঘর প্রকাশনী)।

উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো, কিছুদিন আগেও যেখানে বাংলা অনুবাদে আক্ষরিক অনুবাদের আধিক্য ছিল, সেখানে বর্তমানের তরুণ অনুবাদকেরা বইয়ের ভাবানুবাদটাই বেশি করেন। একারণে তাদের অনুবাদ হচ্ছে বেশি পরিমাণে সহজ, সাবলীল ও প্রাঞ্জল। আর, পাঠকদের বেশিরভাগই যেহেতু তরুণ, এক্ষেত্রে অনুবাদক-পাঠকের চিন্তাধারাও মিলে যাচ্ছে একই সমান্তরালে।

এই তরুণ অনুবাদকদের অন্য যে বৈশিষ্ট্য সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, তা হচ্ছে এদের অনেকেই বই অনুবাদের কাজ শেষ করেন অত্যন্ত দ্রুত। এদের কারো কারো উদাহরণ রয়েছে ২ বছরে ১২টা অথবা দেড় বছরে ৯টি অনুবাদ বই বের করার। কিন্তু মানের দিক থেকে খারাপ হচ্ছে না বা হয়নি তাদের বইগুলো, এমনটাই মনে করছেন পাঠক ও সাহিত্যপ্রেমীরা। অত্যন্ত দ্রুত এবং মান ঠিক রেখে অনুবাদ করার ক্ষেত্রে পাঠক, প্রকাশক ও সাহিত্যপ্রেমীদের মধ্যে আলাদাভাবে চিহ্নিত হয়ে আছেন ফুয়াদ আল ফিদা, শাহেদ জামান, সালমান হক, আদনান আহমেদ রিজনেরা। অনেকেই তাদের মতো দ্রুতগতির অনুবাদকদের ভালোবেসে ‘মেশিন ম্যান’ বলে আখ্যা দেন। কিন্তু অনেকের কাছে এই ব্যাপারটাই আবার রহস্য। নেতিবাচক-ইতিবাচক দুরকম মতামতই রয়েছে এ ব্যাপারে। সাহিত্যাঙ্গন নিয়ে কাজ করছেন এবং এক্ষেত্রে ভালো অবস্থানে আছেন, এরকম অনেকেই বিষয়টাকে ইতিবাচক চোখে দেখেন না। তাদের মতামত হচ্ছে, “বর্তমানে অনেক তরুণ অনুবাদকই দেখা যায় একমাসে একটা বই অনুবাদ করছেন। এতে অনুবাদে ভুলত্রুটি থেকে যাচ্ছে অনেক।” এক্ষেত্রে তারা জি এইচ হাবীবের মতো স্বনামধন্য অনুবাদকের উদাহরণ দিয়ে বলেন, তিনি তো সোফির জগত বইটি অনুবাদ করেছিলেন ৩-৪ বছর সময় নিয়ে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/21/1566394777242.jpg
 প্রকাশক, লেখক ও অনুবাদক মোহাম্মদ নাজিমুদ্দিনের হাত দিয়ে গত কয়েক বছরে উঠে এসেছে বেশকিছু ভালোমানের তরুণ অনুবাদক ◢


এই ব্যাপারটাকে কিভাবে দেখছেন প্রকাশনা শিল্পের কর্ণধাররা? যোগাযোগ করা হলে বাতিঘর প্রকাশনীর প্রকাশক, বিশিষ্ট লেখক ও অনুবাদক মোহাম্মদ নাজিমউদ্দিন বলেন, “আমি মনে করি না দ্রুত অনুবাদের কাজ শেষ করলেই তার মান খারাপ হয়। আমি নিজেও খুব দ্রুত কিছু বইয়ের অনুবাদের কাজ করেছি। বর্তমানে আমরা অনুবাদের কাজে প্রযুক্তির সহায়তা অনেক পরিমাণে পাচ্ছি। আগে হাতে লিখে তারপরে হয়তো কম্পোজ করা হতো। তবে, বর্তমানে পার্সোনাল গেজেটেই আমরা করি সেই অনুবাদের কাজটা। আগে হয়তো ডিকশনারিতে খুঁজে খুঁজে ইংরেজি শব্দের অর্থ বের করতাম আমরা। কিন্তু এখন ই-ডিকশনারি থেকে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে অর্থটা বের করতে পারি আমরা। এডিট করতেও সময় লাগছে আগের তুলনায় অনেক কম। কাজেই দ্রুত কাজ করেও অনুবাদের মান ভালো রাখা যায় বলেই মনে করি।”

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/21/1566394941196.jpg
◤ গত কয়েক বছরে জনপ্রিয়তা পেয়েছে তরুণ অনুবাদক সালমান হকের ‘থ্রিএএম সিরিজ’-এর অনুবাদসহ অন্যান্য অনুবাদ বই ◢


একই মতামত জনপ্রিয় তরুণ অনুবাদক সালমান হকের। তিনি বলেন, “অনেক আগে থেকেই, রকিব হাসান, শেখ আবদুল হাকিমেরাও কিন্তু অনেক দ্রুত কাজ করেন। আমি মনে করি এটা কোনো সমস্যা নয়। আর যারা দ্রুত অনুবাদ করছে, তাদের কারো কারো অনুবাদের মান খারাপ হতেই পারে। তবে, আমি মনে করি এই ধারায় ভালোর পরিমাণই বেশি। কারণ, জোয়ারের সময় অন্যান্য আজেবাজে জিনিসের সাথে কিন্তু পলিমাটিও এসে জমা হয়। আর সম্পাদনার কাজটা যদি ভালো করে বেশ কয়েকবার করা যায়, তাহলে অনুবাদ বইটি অবশ্যই ভালো হবে।”

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/21/1566394866820.jpg
◤ গত কয়েক বছরে পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে তরুণ অনুবাদক আদনান আহমেদ রিজনের বেশ কিছু অনুবাদ বই ◢


তবে, তরুণদের অনূদিত সব বই যে মানসম্মত হচ্ছে, তেমনটাও নয়। এই ফাঁকে নিশ্চিতভাবে কিছু সাব-স্ট্যান্ডার্ড অনুবাদ বই বের হচ্ছে বলে মনে করেন অনুবাদ সাহিত্য-সংশ্লিষ্টরা। জনপ্রিয় তরুণ অনুবাদক আদনান আহমেদ রিজন বলেন, “তরুণরা যে অনুবাদ সাহিত্যে এত বেশি পরিমাণে এগিয়ে আসছে, এতে নিম্নমানের কাজের চেয়ে ভালো মানের কাজই বেশি পরিমাণে বের হচ্ছে। অনুবাদে আসতে হলে সাহিত্যকে ভালোবাসতে হবে। আর যাদের অনুবাদ ভালো হচ্ছে না, সেক্ষেত্রে বলতে হবে অনুবাদ ভালো করে করার যোগ্যতাটাই হয়তো তাদের নেই। সেজন্য অনুবাদে আসতে হলে নিজেদেরকে ভালো করে যোগ্য করে তারপরে আসতে হবে।”

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/21/1566395064592.jpg

◤ একজন অনুবাদকের নিজেকে ঠিকভাবে অ্যাসেসমেন্টের ক্ষমতা থাকতে হবে বলে মনে করেন তরুণ অনুবাদক মো. ফুয়াদ আল ফিদাহ ◢


তা কিভাবে তরুণ অনুবাদকেরা নিজেদের প্রস্তুত করতে পারে? হতে পারে একজন ভালো অনুবাদক? এই প্রসঙ্গে মো. ফুয়াদ আল ফিদাহ বলেন, “বই অনুবাদে আসার আগে আমি নিয়মিত লিখতাম রহস্যপত্রিকায়। লেখা ছাপা হওয়ার পর দেখতাম সম্পাদনামণ্ডলী ওখানে কী কী চেঞ্জ এনেছে। এভাবে একজন অনুবাদকের নিজেকে অ্যাসেসমেন্টের যোগ্যতা থাকতে হবে। আর ভালো অনুবাদ যারা করছে, তাদের কাউকে মানদণ্ড ধরে সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও ফলাফলটা ভালোই হবে।”

ইতোমধ্যেই তরুণ অনুবাদকেরা অত্যন্ত ভালো ও স্মার্ট কাজ দেখিয়ে অর্জন করেছেন পাঠক ও প্রকাশকের আস্থা। আর তরুণেরা যদি নিজেদেরকে আরো প্রস্তুত করে অনুবাদ জগতে আসেন এবং নিজেদের কাজের মানোন্নয়নে সচেষ্ট থাকেন, তাহলে অনুবাদ সাহিত্যে তরুণ অনুবাদকদের অবদান নিঃসন্দেহে পৌঁছে যাবে নতুন উচ্চতায়।

জহির রায়হান : দেশপ্রেমিক ও সমাজ-সচেতন এক শিল্পী-প্রতিকৃতি

জহির রায়হান : দেশপ্রেমিক ও সমাজ-সচেতন এক শিল্পী-প্রতিকৃতি
অসাধারণ চলচ্চিত্র ও শৈল্পিক সাহিত্যকর্মের স্রষ্টা হিসেবে আজও স্মরণীয় জহির রায়হান

মাত্র ৩৬ বছর বয়সের জীবনেই জহির রায়হান নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে গিয়েছেন বাংলাদেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী একজন কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্র-পরিচালক হিসেবে। প্রচণ্ড বক্তব্যধর্মী ও জীবনমুখী তাঁর চলচ্চিত্রগুলো নান্দনিকতা ও কৌশলগত মানের দিক থেকে এখনো স্মরণীয় হয়ে টিকে আছে। অনুপ্রাণিত করছে বর্তমান ও ভবিষ্যতের চলচ্চিত্রকারদের। তেমনি মাত্র আটটি উপন্যাস লিখেই তিনি বাংলা সাহিত্যের একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লেখক হওয়ার মর্যাদা লাভ করেছেন। ‘হাজার বছর ধরে’ দেশের সাহিত্য ও চলচ্চিত্রাঙ্গনে তাঁর পথ চলার কথা থাকলেও, ১৯৭২ সালে নিরুদ্দেশের ‘বরফ গলা নদীতে’ হারিয়ে যাওয়ার পর ফিরে আসেননি আর। আজ এই বহুপ্রজ বিরল প্রতিভার ৮৪তম জন্মদিন।

জহির রায়হানের প্রকৃত নাম মোহাম্মদ জহিরুল্লাহ। জন্ম ১৯৩৫ সালের ১৯ আগস্ট ফেনীর মজুপুর গ্রামে। জহির রায়হান তাঁর সাহিত্যিক নাম। এ নামেই তিনি সুপরিচিত। তাঁর শৈশব কেটেছে কলকাতায়। দেশ বিভাগের পর ঢাকায় আসেন। ১৯৫৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সাথে বাংলায় এমএ করেন জহির। ছাত্রাবস্থায়ই তাঁর সাহিত্যিক ও সাংবাদিক জীবন শুরু হয়। ১৯৫০ সালে তিনি যুগের আলো পত্রিকায় সাংবাদিক হিসেবে কাজ করা শুরু করেন। পরবর্তীকালে তিনি খাপছাড়া, যান্ত্রিক, সিনেমা ইত্যাদি পত্রিকাতেও কাজ করেন। ১৯৫৬ সালে তিনি সম্পাদক হিসেবে প্রবাহ পত্রিকায় যোগ দেন। এই সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতাই হয়তো তাঁর ভেতরে আরো শক্তভাবে গেঁড়ে দেয় লেখক হওয়ার বুনিয়াদ।

১৯৫৫ সালে তার প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘সূর্যগ্রহণ’ প্রকাশিত হয়। কিন্তু, তিনি যে ছিলেন একজন বহুমাত্রিক মানুষ। চলচ্চিত্রের প্রতি ছিল তাঁর মনের ভেতরে গভীর ভালোবাসা। তাই, চলে আসলেন চলচ্চিত্রাঙ্গনে। চলচ্চিত্র জগতে তার পদার্পণ ঘটে ১৯৫৭ সালে, ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ ছবিতে সহকারী হিসেবে কাজ করার মাধ্যমে। সহকারী হিসেবে আরো কাজ করেন সালাউদ্দীনের ছবি—‘যে নদী মরুপথে’-তেও। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক এহতেশাম তাকে ‘এ দেশ তোমার আমার’-এ কাজ করার আমন্ত্রণ জানান; এ ছবির নামসংগীত রচনা জহির রায়হানের হাতেই।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/19/1566207266898.jpg

◤ ‘বেহুলা’ সিনেমার সেটে নির্দেশনা দিচ্ছেন জহির ◢


সহকারী পরিচালক হিসেবে সফলভাবে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁকে পরিচালক হিসেবে কাজ করার প্রয়োজনীয় আত্মবিশ্বাস দিয়েছিল। ১৯৬১ সালে তিনি রুপালি জগতে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন ‘কখনো আসেনি’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। ১৯৬৪ সালে তিনি পাকিস্তানের প্রথম রঙিন চলচ্চিত্র ‘সঙ্গম’ নির্মাণ করেন। এটি অবশ্য ছিল উর্দু ভাষার চলচ্চিত্র। পরের বছর মুক্তি পায় তার প্রথম সিনেমাস্কোপ চলচ্চিত্র ‘বাহানা’। এরপর ১৯৬৬ সালে ‘বেহুলা’, ১৯৬৭-তে ‘আনোয়ারা’, ১৯৭০-এ ‘জীবন থেকে নেওয়া’, ‘টাকা আনা পাই’, ‘লেট দেয়ার বি লাইট’-এর মতো চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। 

চলচ্চিত্র নির্মাণের পাশাপাশি, সাহিত্যিক হিসেবেও তাঁর কলম সচল ছিল মুক্তিযুদ্ধের আগ পর্যন্ত। অনেক কালজয়ী উপন্যাস তিনি উপহার দিয়েছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে : ‘বরফ গলা নদী’, ‘আর কত দিন’, ‘শেষ বিকেলের মেয়ে’, ‘হাজার বছর ধরে’, ‘আরেক ফাল্গুন’, ‘কয়েকটি মৃত্যু’, ‘তৃষ্ণা’, ‘সূর্যগ্রহণ’ ইত্যাদি। সংগ্রামমুখর নাগরিক জীবন, আবহমান বাংলার জনজীবন, মধ্যবিত্তের আশা-আকাঙ্ক্ষা-বেদনা প্রভৃতি তাঁর রচনায় শিল্পরূপ পেয়েছে। সাহিত্যকৃতীর স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে আদমজী সাহিত্য পুরস্কার, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (মরণোত্তর) দেওয়া হয়।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/19/1566207304659.jpg
◤ প্রথম স্ত্রী সুমিতা দেবীর সাথে জহির রায়হান ◢


ব্যক্তিজীবনে দুবার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন জহির রায়হান। তার প্রথম স্ত্রী ছিলেন চিত্রনায়িকা সুমিতা দেবী। ১৯৬১ সালে বিয়ে করেন তারা। প্রথম পরিবারে অনল রায়হান এবং বিপুল রায়হান নামে দুই পুত্র সন্তানের জন্ম হয়।

সুমিতা দেবীর সাথে বিচ্ছেদের পর ১৯৬৮ সালে আরেক জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা সুচন্দার সাথে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন তিনি। দ্বিতীয় পরিবারে রয়েছেন তার দুই সন্তান অপু ও তপু। তার বড় ভাই প্রয়াত লেখক শহীদুল্লা কায়সার। তিনি লেখক ও রাজনীতিক পান্না কায়সারের স্বামী এবং জনপ্রিয় অভিনেত্রী শমী কায়সারের বাবা।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/19/1566207352881.jpg

◤ জহির রায়হানের আলোচিত, নন্দিত ও প্রভাবশালী চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেয়া’র পোস্টার ◢


শুধুমাত্র কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্রকার হিসেবে জহির রায়হানকে দেখলে সবটুকু যেন বলা হয় না তাঁর ব্যাপারে। একজন সমাজ ও রাজনীতি সচেতন শিল্পী ছিলেন তিনি। নিজেও স্বশরীরে অংশ নিয়েছেন দেশ মাতৃকার বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে। ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন জহির রায়হান। উপস্থিত ছিলেন একুশে ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক আমতলা সমাবেশে। এসময় তাকে পুলিশ ধরে নিয়ে জেলে পুরে দেয়। এই জেলে বসেই তিনি ভাষা আন্দোলন নিয়ে তাঁর কালজয়ী উপন্যাস ‘আরেক ফাল্গুন’ রচনা করেন। ভাষা আন্দোলন তার ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল, যার ছাপ দেখতে পাওয়া যায় তার বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেওয়া’–তে। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেন তিনি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি কলকাতায় চলে যান এবং সেখানে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে প্রচারাভিযান ও তথ্যচিত্র নির্মাণ শুরু করেন। কলকাতায় তার নির্মিত চলচ্চিত্র জীবন থেকে নেওয়ার বেশ কয়েকটি প্রদর্শনী হয় এবং চলচ্চিত্রটি দেখে ভূয়সী প্রশংসা করেন সত্যজিত রায়, মৃণাল সেন, তপন সিনহা এবং ঋত্বিক ঘটক প্রমুখ খ্যাতিমান চলচ্চিত্রকাররা। সে সময়ে তিনি চরম আর্থিক দৈন্যের মধ্যে থাকা সত্ত্বেও তার চলচ্চিত্র প্রদর্শনী হতে প্রাপ্ত সমুদয় অর্থ তিনি মুক্তিযোদ্ধা তহবিলে দান করে দেন।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/19/1566207399680.jpg
◤ প্রামাণ্যচিত্র ‘স্টপ জেনোসাইড’, যা মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে জনমত তৈরিতে রাখে দারুণ ভূমিকা ◢


মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানিদের গণহত্যা ও বুদ্ধিজীবী নিধনের এক অসাধারণ প্রামাণ্য দলিল ‘স্টপ জেনোসাইড’ তৈরি করেন জহির রায়হান। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ভারতে আশ্রয়গ্রহণকারী বাঙালিদের দুঃখ-দুর্দশা, হানাদার পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ, ভারতে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের দিনকাল প্রভৃতি এই তথ্যচিত্রে তুলে ধরা হয়েছিল। এর প্রথম প্রদর্শনী হয় এক অজ্ঞাত স্থানে, যেখানে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ, মুজিবনগর সরকারের মন্ত্রীপরিষদের সদস্যবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য বিশ্বব্যাপী জনমত তৈরি করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রেখেছিল ‘স্টপ জেনোসাইড’। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে এখন পর্যন্ত নির্মিত ছবিগুলোর মধ্যে শিল্পগত ও গুণগত সাফল্যের দিক থেকে শীর্ষে স্থান দেওয়া হয়ে থাকে এই চলচ্চিত্রটিকে।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর জহির রায়হান ঢাকায় ফেরেন। ফিরে জানতে পারেন, মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে পাক হানাদার বাহিনীর দোসর রাজাকার আল বদর বাহিনী তার বড় ভাই প্রখ্যাত লেখক শহীদুল্লাহ কায়সারকে অপহরণ করেছে। নিখোঁজ ভাইকে হন্যে হয়ে খুঁজতে শুরু করেন জহির। ১৯৭২ সালের ২৮ জানুয়ারি সকালে এক রহস্যময় ব্যক্তি তাকে ফোন করে জানান, তার ভাইকে মিরপুর ১২ নাম্বারে একটি হাউজিং সেক্টরে আটকে রাখা হয়েছে। একথা শুনেই তিনি ভাইয়ের খোঁজে মিরপুর যান এবং আর ফিরে আসেননি।

জহির রায়হানের নিখোঁজ হওয়া নিয়ে অনেক ধরনের থিওরি রয়েছে। এমন বলা হয় যে, তিনি একটি সার্চ পার্টি নিয়ে মিরপুরের উদ্দেশে যাত্রা করেন। সেখানে পাক হানাদার বাহিনীর কিছু সদস্য ছদ্মবেশে ছিল। তারা তাকে লুকিয়ে আটক করে হত্যা ও গুম করে ফেলে। তার ছোট ভাই হাবীবের ভাষ্যমতে, তিনি জহির রায়হানকে মিরপুর পুলিশ স্টেশনে নামিয়ে দিয়ে এসেছিলেন। এরপর আর তার দেখা পাননি। এমন খবরও শোনা যায়, মিরপুর পুলিশ স্টেশন থেকে জহির রায়হানকে জানানো হয়েছিল, মিরপুর ১২ নাম্বারে কিছু পাকিস্তানি সৈন্য ও রাজাকার ছদ্মবেশে লুকিয়ে আছে। সেখানে না গিয়ে আগে তাকে কল ট্রেস করার পরামর্শ দেওয়া হয়। এরপর তিনি নাকি ক্ষুব্ধ হয়ে পুলিশ স্টেশন থেকে বেরিয়ে যান। আর তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/19/1566207448145.jpg

◤ ১৯৭২-এর পর ‘আরেক ফাল্গুন’ হয়তো ‘কখনো আসেনি’ তবে দেশ ও সমাজ-সচেতন শিল্পীদের এগিয়ে যাওয়ার বড় প্রেরণা তিনিই ◢


এ ব্যাপারে বিভিন্ন সময় আরো অনেক গুজব ছড়িয়েছে। এগুলোর কোনটি সত্য, কোনটি মিথ্যা, তা যাচাই করা মুশকিল। তাঁর মৃতদেহও কখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাই নিশ্চিত হওয়া যায়নি কিভাবে মারা গিয়েছেন তিনি। ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি তার মৃত্যুদিন হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

স্বাধীনতার ঠিক পরপর, সেই ৭২ সালেই জহির রায়হান চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেলেও তাঁর অসাধারণ, শৈল্পিক ও নান্দনিক সাহিত্যকর্ম ও চলচ্চিত্রের জন্য জাতি ঠিকই তাকে স্বরণে রেখেছে। চলচ্চিত্রে অবদানের জন্য কয়েক বছর পর, ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে প্রদান করে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার একুশে পদক (মরণোত্তর)। ১৯৯২ সালে প্রদান করে সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা স্বাধীনতা পুরস্কার। আজও তাঁর সাহিত্যকর্ম ও চলচ্চিত্রগুলো টিকে আছে অমূল্য সম্পদ হয়ে। ১৯৭২-এর পর ‘আরেক ফাল্গুন’ হয়তো ‘কখনো আসেনি’ জহির রায়হানের জীবনে; তবে দেশ ও সমাজ সচেতন শিল্পীদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার বড় প্রেরণা তিনিই। এই ক্ষণজন্মা প্রতিভার জন্মদিনে তাঁর প্রতি সশ্রদ্ধ সালাম!

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র