Barta24

বুধবার, ২৬ জুন ২০১৯, ১১ আষাঢ় ১৪২৬

English Version

বিন্নাবেড়া গ্রামের পথে

বিন্নাবেড়া গ্রামের পথে
অলঙ্করণ শতাব্দী জাহিদ
মঈনুস সুলতান


  • Font increase
  • Font Decrease

থিকথিকে আবর্জনায় জুতাখানা ঘিনঘিনে ময়লায় ভরে উঠল। কিন্তু এসব দিকে নজর দেওয়ার সময় কই। দেওয়ান তরজার বেড়া মড়মড় করে ভেঙে হীরা মিয়ার ভুষিমালের দোকানের পেছনে বেগুনের খেতে এসে পড়ে। পাতার আর্দ্রতা গুটানো পায়জামার পায়ায় দাগ কেটে দেয়। এলাকায় বড় দেওয়ান বলে পরিচিত আসিফ হাসান বসে ছিলেন কামাল ফার্মেসির পেছনের কামরায়। খানিকটা রাশভারী লোক, হাটেবাজারে তিনি তেমন একটা আসেন না। তবে আজ আসতে হয়েছে, কারণ তাঁর ফিলিপস্ ট্রানজিসটারের ব্যাটারি ফুরিয়েছে। খান সেনারা গ্রামেগঞ্জে ছড়িয়ে পড়ছে। রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে নানা জায়গায়। বাজারে মাল সামানের চালান আসছে না। তাই পয়সা দিয়েও কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না রেডিওর ব্যাটারি।

তো বড় দেওয়ান বাজারে এসে কামাল ফার্মেসির পেছনে বসে ভলিওম কমিয়ে কমপাউন্ডারের সাথে ফিসফিস করে কথা বলতে বলতে স্বাধীনবাংলা বেতারের সংবাদ শুনছিলেন। কপাটের বাইরে পায়ের শব্দ হতেই কমপাউন্ডার দ্রুত নভ ঘুরিয়ে নিয়ে আসেন রেডিও পাকিস্তানের অনুষ্ঠানে। ওখানে গীত হচ্ছে আহমেদ রুশদীর উর্দু গান ‘একেলে না জানা/হামে ছোড় কর তুমহারে বিনা।’ এলাকার তরুণ কমরুদ্দীন কামরায় ঢুকে ফিসফিস করে দেওয়ানকে খবরটি দেয়। একটু আগে চারজন খান সেনা তার চাচা শান্তি কমিটির প্রধান বদরুদ্দীন হাজিকে নিয়ে দেওয়ানবাড়িতে যায়। তারা হয়তো গ্রামে রেইড সেরে এবার বাজারের দিকে আসবে। তাই সময় থাকতে দেওয়ানের সরে পড়া উচিত।

নুরমনার বেগুন খেতের বেড়া ডিঙ্গিয়ে বড় দেওয়ান এবার বাজারের মসজিদের পেছনে ওজু করার পুকুরের কাছে এসে পড়েন। কমরুদ্দীন সম্পর্কে তার ছাত্র। বছর কয়েক আগে তিনি জেলা সদরের কলেজ থেকে বি এ পাশ করে ফিরে আসেন নিজস্ব সাকিন ঝিগরকান্দি গ্রামে। অবশ্য বি-এ’র রেজাল্ট আউট হওয়ার পর ঢাকা শহরেও দু’বার গিয়েছিলেন ভার্সিটিতে মাস্টার্স করা যায় কিনা তার সুলক সন্ধান করতে। কিন্তু ভার্সিটির ক্যাম্পাসে সারাক্ষণ মিছিল স্লোগান, কখনো কখনো টিয়ার গ্যাস লাঠিচার্জ ইত্যাদি নজর করে মনে হয়েছিল এসব জঞ্জাল থেকে দূরে থাকাই বেহতর। দেওয়ানবাড়িতে পুরানো পত্রিকা পড়ে সময় তার কাটছিল না। এলাকার হাই স্কুলে তখন শিক্ষকদের খুব আক্রা যাচ্ছে। মাসের শেষে মাইনার সঙ্কুলান হচ্ছে না বলে অনেক শিক্ষকই সরে গেছেন অন্যত্র। তখন দেওয়ান সিদ্ধান্ত নেন বিনা মাইনায় স্কুলে ক্লাস নেওয়ার। বছর খানেক তার খারাপ কাটেনি। শীতের সিজনে স্যুটটাই পরে স্কুলে যেতেন। বর্ষাকাল আসতেই গামবুট পরে জলকাদা ডিঙ্গিয়ে স্কুলে আসা-যাওয়া বেজায় বিরক্তির ব্যাপার হয়ে দাঁড়াল। তারপর ছাত্র সামলানোর বিষয়টিও তার কাছে উটকো ঝামেলা মনে হতো। কমরুদ্দীন ছাত্র হিসাবে মেধাবী না হলেও তার আউট বই পড়ার ধাত আছে। বিষয়টি দেওয়ান খুব পছন্দ করতেন। তো স্কুল মাস্টারি ছেড়ে দেয়ার পরও তার সাথে ছাত্র হিসাবে কমরুদ্দীনের একটা সম্পর্ক থেকে গেছে। মাঝে মাঝে তার কাছে আসে সে দেওয়ানবাড়ির লাইব্রেরি থেকে তারাশঙ্করের ‘হাঁসুলি বাঁকের উপকথা’ বা সমরেশ বসুর ‘গঙ্গা’ ইত্যাদি বইপত্র ধার নিতে।

মসজিদের পেশাবখানার পাশে এসে বড় দেওয়ান রুমালে নাক চেপে ধরেন। ঠিক তখনই কমরুদ্দীন ফিসফিস করে বলে—গতকাল শান্তি কমিটির গোপন বৈঠকে তার চাচা বদরুদ্দীন হাজি তাকে চা ও খিল্লিপান সরবরাহের দায়িত্ব দেন। তখন সে শুনতে পায় যে—খান সেনাদের কাছে দেওয়ানের আচরণ সম্পর্কে নালিশ করার বিষয়টি। দেওয়ান ছাত্রদের বাংলাদেশের মানচিত্র আঁকা সোনালি-সবুজ পতাকা দর্জি দিয়ে তৈরির জন্য পঞ্চাশ টাকা চাঁদা দিয়েছিলেন। এ ছাড়া .. মাস খানেক আগে যখন এলাকার লোকজন, বিশেষ করে হিন্দুরা শরণার্থী হিসাবে ভারতে চলে যাচ্ছিল তখন তিনি প্রমোদ বাবুকে পাওয়ার টিলারখানা ব্যবহার করতে দেন। বাবু টিলারের ট্রেইলারে করে খেশকুটুম বিশেষ করে তার বিরাশি বছরের বৃদ্ধা মাকে ত্রিপুরাতে পাঠান। আরো কিছু হিন্দু পরিবারও ট্রেইলারে করে সীমান্ত পাড়ি দেয়। আর গতকাল সন্ধ্যাবেলা সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটির এক সদস্য স্কুলের বয়োবৃদ্ধ হেডমাস্টার আব্দুল খালেক সাহেবকে খান সেনারা গুলি করে হত্যা করছে। তার লাশ পড়ে আছে কালের থলির পাঁকুড় গাছের তলায়, কেউ দাফন করার সাহস পাচ্ছে না। বিষয় দুশ্চিন্তারই বটে। দেওয়ানবাড়িতে ফিরে যাওয়া হবে এখন আজরাইলের সাথে মোলাকাতের শামিল। সামনে উপায় একটাই। প্রায় মাইল পাঁচেক হেঁটে গিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করে ত্রিপুরায় চলে যাওয়া। সড়ক ধরে যাওয়াটা সঠিক হবে না। রিক্সা ফিক্সার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। কমরুদ্দীন তাকে আলপথে হাঁটার পরামর্শ দিয়ে বিদায় নিতে চাইলে দেওয়ান ভীষণ অসহায় বোধ করেন। তার সাথে কমরুদ্দীনের বর্ডার অব্দি যাওয়া খুবই মুশকিল। কারণ তার চাচা বদরুদ্দীন হাজি তাকে টাকা দিয়ে বাজারে পাঠিয়েছেন। ডালডা, গরমমশলা ও তেজপাতা কিনে তার তাড়াতাড়ি এখনই হাজিবাড়িতে ফেরা উচিত। কারণ মেয়েরা অপেক্ষা করছে, ডালডা ও তেজপাতা পাওয়া গেলেই তারা খান সেনাদের জন্য দোপেঁয়াজা রাঁধবে। কমরুদ্দীন তাকে অভয় দিয়ে বলে—স্যার, সোজা যাবেন বিন্নাবেড়া গ্রামে। নাসিরুদ্দীন বিড়ির চোরাচালানী বোংগা করবারি দানাউল্লাহকে বিষয় খুলে বলবেন। সে সন্ধ্যার পর আপনাকে নিরাপদে সীমান্তের ওপারে পৌঁছে দেবে।

কমরুদ্দীন ফিরে যাওয়ার পর দেওয়ান খেয়াল করেন যে—তার সফেদ পায়জামার পায়া চোরকাটায় ভরে উঠছে। আলপথে তিনি কি কখনো এর আগে হেঁটেছেন? একবার কি এক খেয়ালে একখানা পাওয়ার টিলার কিনেছিলেন। বাপ দাদার আমলের জমিদারী না থাকলেও তার বিষয় সম্পত্তির খাসে ধানি জমি-মিরাশ এখনো প্রচুর। ভেবেছিলেন আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ করবেন। চাষবাসের ওপর দু’চারখানা বইপত্রও কিনেছিলেন। একদিন গামবুট পরে ফেল্টহ্যাট মাথায় আলে দাঁড়িয়ে দেখেছিলেন পাওয়ার টিলারের লাঙ্গল বাওয়া। কিন্তু জমিজিরত চাষবাসের জঞ্জাট তার পোষালো না। ড্রাইভার তেল চুরি করে। কিছুদিন পরপর কিনতে হয় পার্টস্, সারাই করাতে হয় টিলার। তো একলটে ঘুরঘুরি বন্দের সাড়ে তিন হাল খাস-জমি তিনি প্রমোদ বাবুর কাছে বর্গা দিয়েছেন। বাবু তার পাওয়ার টিলার মেনটেইন করেন, তিনি মাসওয়ারি খানিকটা ভাড়া পান।

পরিস্থিতি গুরুতর হলেও দেওয়ানের মনে ভয়ের কোনো অনুভূতি হয় না। বদরুদ্দীন হাজির সাথে তার বাবা মরহুম দেওয়ান আবুল হাসানের মামলা মোকদ্দমা নিয়ে কাজিয়া সংঘাত ছিল। এসব তো তিরিশ বছর আগের পৌদপুরানী কেসসা। হাজির সাথে তার তো কোনো দুশমনী নেই। হাজি তার পেছনে লাগলেন কেন? এসব ভাবতে গিয়ে দেওয়ানের শরীর খারাপ লাগে। মনে হয় জ্বর এসে যাচ্ছে। পাকস্থলিতেও নিঃসরিত হচ্ছে এসিড। ঠিক বুঝতে পারেন না বিন্নাবেড়া গ্রামের নিশানা কি এদিকে? তার মন কেবলই ফিরে যেতে চায় দেওয়ানবাড়িতে। ইচ্ছা হয় কুসুম গরম জলে গোসল সেরে একটু বারান্দার ইজি চেয়ারে বসবেন। বাড়িতে কাজবাজও পড়ে আছে অনেক। তার স্ত্রী গোলমালের কারণে বাপের বাড়িতে চলে যাওয়ার পর থেকে পোষা ময়না ও টিয়ে পাখিকে আদার তিনি নিজ হাতে দেন। আর নতুন প্রজাতির গোলাপের যে চারা লাগিয়েছেন তাতে বিকালে পানিই বা কে দেবে? শমসেন নগরে গোলাগুলির পর স্ত্রী রওশন বানুকে যমজ বাচ্চা দুটিসহ বাপের বাড়ি তিনিই পাঠিয়েছেন। ওরা মফস্বল শহরের বাসায় নিরাপদে আছে। তবে স্ত্রী বাপের বাড়িতে চলে যাওয়ার পর দেওয়ানবাড়িতে কামকাজের লোকজন তিনি নিজেই কমিয়ে দিয়েছেন। কেবলমাত্র এক বৃদ্ধা বাপের আমলের বান্দীবেটি তার জন্য রান্নবান্না করে দিয়ে নিজের গ্রামে ফিরে যায়। মাঝে মাঝে তার নাতনিও আসে দালানঘরের যে দু’তিনটি কামরা তিনি ব্যবহার করেন তা ঝাড়পোছ করতে। পাখি দুটিকে আদার দেওয়ার বিষয়টি কি তাদের মাথায় আসবে? আর ঝারি দিয়ে গোলাপ গাছে একটু পানি দেওয়া।

বিকাল পড়ে যাওয়ার সময় নানা হাঙ্গামার ভেতর দিয়ে দেওয়ান বিন্নাবেড়া গ্রামে পৌঁছান। পায়ে ফোস্কা পড়ে যাওয়ায় খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছেন। বোংগা কারবারী দানাউল্লার বাড়িতে গিয়ে তিনি বড় খাজুল হন। তার স্ত্রী দরজার বেড়ার আড়াল থেকে কেঁদে-কেটে হাহাকার করে জানায় যে, তার স্বামী সপ্তাহ দিন আগে ইন্ডিয়া যায় বোংগায় বিড়ির চালান আনতে। এদিকে বর্ডারে চলছে গোলমাল, রাতবিরাতে গোলাগুলি হলে সে আর ফিরে আসতে পারেনি।

হাঁটতে গিয়ে হঠাৎ করে দেওয়ানের মাথায় কী যেন ঘুরে ওঠে। বেশ মশগতে শরীরের ভারসাম্য বাজায় রাখেন তিনি। শীতের সন্ধ্যায় দু’তিন পেগ ব্র্যান্ডি খেলে এরকমের অনুভূতি হয়। চন করে বিষয়টি মনে পড়ে। দেওয়ানবাড়ির ধান রাখার বাড়ার-ঘরের আধো অন্ধকারে শুয়ে আছেন প্রমোদ বাবু। কামরাটি বাইরে থেকে তালা দেওয়া। প্রমোদ রঞ্জন দাসের বিষয় আশয় প্রচুর। বাজারে আড়ত ছাড়াও আছে রেশনের দোকান ও স্ট্যাম্প ভেন্ডারের কারবার। অত্র এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রায় সকলে শরণার্থী হিসাবে ত্রিপুরা গেলে প্রমোদ বাবু তাঁর পরিবার পরিজন সকলকে ওপারে পাঠান। তবে তিনি থেকে যান নিজ বাড়িতে। পাঁচদিন আগে খান সেনারা হিন্দুপাড়ায় নাপাম ছিটিয়ে বেড়-আগুন দিলে তার ঘরবাড়ি তাবৎ কিছু পুড়ে যায়। প্রমোদ বাবু বাঁশঝাড়ের ভেতর লুকিয়ে থেকে প্রাণে বাঁচেন। তারপর সন্ধ্যাবেলা দেওয়ানবাড়িতে এসে আশ্রয় নেন। বাড়ার-ঘরের ধানগোলার ঠিক উপরে ছাদের কাছে আছে একটি গুপ্ত কামরা। চাকর নকরদের যাতে সন্দেহ না হয় এর জন্য দেওয়ান কামরায় দরোজায় বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে দিয়েছেন। বুড়ি বান্দীবেটি কাজে আসার আগে তিনি তাঁকে নিজ হাতে নাস্তা দিচ্ছেন। আর বুড়ি চলে যাওয়ার পর, তাকে থালায় করে খাবারও তিনি পৌঁছে দিচ্ছেন।

প্রমোদ বাবুকে বাড়ার-ঘরে তালাবদ্ধ রেখে দেওয়ান পালিয়ে ইন্ডিয়ায় যেতে পারেন না। এর একটা বিহিত করতে হয়। তিনি ঝিকরকান্দি গ্রামে ফেরার পথে এবার ঘুরে দাঁড়ান। প্রমোদ বাবু সাথে তার সম্পর্ক বাপের আমল থেকে। বিবাহের সময় কিংবা মামলা মোকদ্দমা ইত্যাদি সংসারের নানাবিধ দুর্বিপাকে যখন তার টাকা পয়সার তঙ্গি পড়েছে তখনই তিনি প্রমোদ বাবুর কাছ থেকে সামান্য সুদে টাকা ধার নিয়েছেন। তার প্রতি দেওয়ানের আছে এক ধরনের কৃতজ্ঞতা। আর প্রমোদ বাবুর বুদ্ধিসুদ্ধির ওপরও তিনি নির্ভর করেন বিপুলভাবে। ঝিকরকান্দির দিকে হাঁটতে হাঁটতে ভাবেন—পথঘাট না জেনে একা বর্ডার অতিক্রম করতে যাওয়াটা হবে বেআকলামির শামিল। আর সাথে টাকা পয়সাও তেমন কিছু নেই। ত্রিপুরাতে পৌঁছে দিনগুজরানই বা করবেন কিভাবে? খান সেনারা এতক্ষণে টহল ছেড়ে নিশ্চয়ই ফিরে গেছে থানা সদরে। দ্রুত হাঁটতে থাকলে ঠিক সন্ধ্যার পরপরই তিনি ফিরতে পারবেন দেওয়ানবাড়িতে। তালা খুলে দিয়ে প্রমোদ বাবুর সাথে জলদি একটু শলা পরামর্শও করা যাবে। সিন্দুক থেকে টাকাপয়সা ও সোনার জেওরাত কয়েকখানাও তুলে নিতে পারেন। তারপর না হয় রাত থাকতে থাকতে প্রমোদ বাবুকে সাথে নিয়ে আবার মেলা দেবেন ত্রিপুরার দিকে।

হঠাৎ করে দেওয়ানের খেয়াল হয় যে—তিনি এবার সড়ক ধরেই হাঁটছেন। আলপথে ফিরে যেতে ইচ্ছা হয় না। কারণ আলপথ ধরে বিন্নবেড়া গ্রামে আসার পথে ফোঁস করে ওঠা সাপের মুখে পড়ে যেতে যেতে অল্পের জন্য বেঁচে গেছেন। মনে একটি কুচিন্তা খেলে যেতেই তিনি নিজেকে প্রবোধ দেন—খান সেনারা কেবল মাত্র হিন্দু সম্প্রদায়ের ঘরবাড়িতে আগুন দিচ্ছে। দেওয়ানবাড়ির বারমহলে আছে মিনারওয়ালা মসজিদ ও মকতব। তাকে বাড়িতে না পেয়ে হয়তো খান সেনারা রেগে যাবে, কিন্তু আগুন দিতে যাবে না। সড়কের বাঁকে এসে দেওয়ান ইতস্তত করেন—রাজপথ ধরে হেঁটে যাওয়াটা কি সঠিক হবে? পথে জনমানুষ কিছু নেই কেন? তবে কি তিনি সাপখোপের রিস্ক নিয়ে আবার ফিরে যাবেন আলপথে। ঠিক তখনই হরন দিয়ে ধুলাবালি উড়িয়ে বাঁকের ওপার থেকে বেরিয়ে আসে গাড়িটি। লালরঙের পিকাপ। গাড়িখানা ঝিমাইচাল চা-বাগানের। দেওয়ান শুনেছেন যে বাগানের বিহারী মালিক লাল পিকাপটি পাক-আর্মিকে ব্যবহার করতে দিয়েছেন টহলের কাজে। তিনি ভাবেন—গাড়ির আরোহীরা হয়তো তাকে চিনতে পারবে না। কিন্তু নসীব খারাপ। পিকাপটি এসে দাঁড়ায় তার পাশে।

গরু-ভইস বাঁধার একখানা দড়ি তার হাতে প্যাঁচাতে গেলে দেওয়ানের মেজাজ বিগড়ে যায়। তিনি চীনা কারবাইন ঝুলানো খান সেনাকে পরিষ্কার উর্দু জবানে বলেন—গায়ে হাত দেবে না। হাম আপস্ তোমহারা সাথ ক্যাম্প-ছে যাওগি। বাত করোঙ্গি খোদ কমান্ডার কা সাথ। কিন্তু ছ-ফুটি খান সেনা তাকে পিছমোড়া করে বাঁধতে গেলে তিনি বেঁকে ওঠেন। তখন জোরাজোরিতে চোখ থেকে চশমা খুলে ছিটকে পড়ে ধুলায়। খান সেনা তার কোমরে বন্দুকের কোন্দা দিয়ে ঘাঁ দিলে তিনি হুমড়ি খেয়ে পড়েন পিকাপের চেসিসে। তখন মিলিটারির বুটের তলায় পড়ে মড়মড় করে ভেঙ্গে যায় তার বাইফোকাল চশমা।

পিকাপ ট্রাকে দড়ি বাঁধা হয়ে বসে আছে আরো কয়েকজন মানুষ। এদের মাঝে বাবরি চুলের মরম আলীকে তিনি চিনতে পারেন। মাথা ফেটে রক্ত বেরিয়ে ভিজিয়ে দিচ্ছে তার গালের বা’ দিক। বাউলা গানের লোক মরম আলীকে তিনি খুব ভালো করে চেনেন। ইলেকশনের সময় মাইকে তার গলার স্বর প্রায়ই শোনা যেত। দোতারা বাজিয়ে সে গাইছে জয় বাংলার গান।  মরম আলী দেওয়ানের দিকে নীরবে তাকিয়ে থাকে। তার মুখে কোনো কথা জোগায় না। হঠাৎ করে সে চোখমুখ ভেঙেচুরে শিশুর মতো কেঁদে ওঠে হু হু করে। কিছু যেন বলে। দেওয়ান খেয়াল করে তা শুনতে গেলে পিকাপে দাঁড়িয়ে থাকা এক খান সেনা ‘হাল্লা মত করো হারামজাদে’ বলে বন্দুকের কোন্দা দিয়ে মরম আলীর মাথায় বাড়ি মারে। বড় দেওয়ানের আদ্দির ফিনফিনে কোর্তা ঘামে জবজবে হয়ে উঠছে। মরম আলীর কথা কি তিনি ঠিক মতো শুনতে পেরেছেন? তবে কি আগুনে পুড়ে দেওয়ানবাড়ি সত্যিই খাক হয়ে গেছে। খান সেনারা শুধু কি তার দালানঘরে আগুন দিয়েছে। নাকি আগুনের লেলিহান শিখা পুড়িয়ে ভস্ম করেছে ধানের বাড়ার-ঘরও?

যদি মরম আলীর বাচন সত্যি হয়ে থাকে, তাহলে শত বৎসর আগে মুর্শিদাবাদের নবাবের দরবার থেকে পাওয়া দেওয়ানী সনদ খানাও পুড়ে গেছে। এই প্রথম বিশাল কিছু হারানোর বেদনা তার কলিজায় শেলের মতো এসে বিঁধে। দারুণ আফসোস হয়—তার যমজ বাচ্চা দুটি কোনো দিন দেখবে না দেওয়ানবাড়ির দড়ো বুনিয়াদের দলিলি প্রমাণ। আলমারির উপরের তাকে সনদের পাশেই রাখা আছে তার পরদাদা দেওয়ান নুরুল হাসানের হাতে লেখা ইয়াসিন শরীফ। আল্লার কালাম আগুনে পোড়ে না। তবে কী পবিত্র সুরার তাসিরে দগ্ধ হওয়া থেকে রেহাই পাবে নবাবী জামানার সনদ? ধানের বাড়ার-ঘরটি দালান থেকে বেশ দূরে মহলের পুকুরের ওপারে। আগুন হয়তো অত দূর অব্দি পৌঁছবে না। কিন্তু গুপ্ত কামরার দুয়ারে যে তালা লাগানো। আর যদি হার্মাদ সেনারা বাড়ার-ঘরেও আগুন দিয়ে থাকে,তাহলে..? কী করবেন ঠিক বুঝতে পারেন না, প্রমোদ বাবু তার বড়ো কাছের মানুষ। এক ধরনের অসহায় রাগে দেওয়ান উঠে দাঁড়াতে গেলে মাথায় চীনা কারবাইনের বাড়ি দিয়ে তাকে বসিয়ে দেওয়া হয়।

তখনই লাল পিকাপটি থামে। ফ্রন্টসিট থেকে নেমে আসেন বদরুদ্দীন হাজী। পিকাপের চেসিসের কাছে এসে হাজি মেহদীমাখা দাড়ি খিলাল করতে করতে গলা খাঁকারি দিয়ে বলেন—দেওয়ানজীর বেটা দেওয়ান, মনে মনে কয়েক মর্তবা তওবা আসতাগফার পড়েন। রক্তের ধারায় বুজে যাওয়া চোখের পাপড়ি খানিক কসরতে খুলে বড় দেওয়ান কী যেন বলতে চান। কিন্তু ঝাঁকি দিয়ে ঝিমাইচাল চা বাগানের লাল পিকাপটি ধুলা উড়িয়ে খান সেনাদের ছাউনির দিকে ছোটে।

আপনার মতামত লিখুন :

৯০ বছরেও সরব দার্শনিক হেবারমাস

৯০ বছরেও সরব দার্শনিক হেবারমাস
দার্শনিক জার্গেন হেবারমাস, ছবি: দ্য রিডার্স বুরে্য'র সৌজন্যে

তিনি বলেছিলেন, ‘রাজনৈতিক আশ্রয় ব্যক্তি মানুষের মৌলিক মানবাধিকার’। গণতন্ত্র, আইনের শাসন, নাগরিক অধিকার, মিডিয়া ও জনপরিসর নিয়ে কথা বলেছেন বার বার। ৯০ বছর পেরিয়েও সরব রয়েছেন জার্মান দার্শনিক জার্গেন হেবারমাস, যাকে গণ্য করা হয় সমকালীন বিশ্বের জীবিত দার্শনিকদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী একজন হিসাবে।

ফিলসফি, পলিটিক্স, সোসিওলজি, মিডিয়া ও কমিউনিকশেনের কনটেম্পোরারি থিওরি রূপে তার বক্তব্য পড়ানো হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর ক্লাসে। কিন্তু ১৯২৯ সালের ১৮ জুন জন্ম গ্রহণকারী এই দার্শনিক পাঠ্যপুস্তকের অক্ষরে সীমাবদ্ধ থাকতে নারাজ। যে কোনও আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক বিষয়ে এই অশীতিপর পণ্ডিত বিতর্ক করতে ওস্তাদ। নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের প্রশ্নে সোশ্যাল ডিবেট করতে তিনি কখনো পিছপা হন না।

জীবনীকার ক্রিস্টান নিপ ও সেবাইন ওয়েইজ দার্শনিক হেবারমাসের ৯০ বছরের কর্মময় জীবন ঘেঁটে দেখেছেন, নাৎসি নিপীড়ন থেকে উদ্বাস্তু সমস্যা পর্যন্ত বিশাল ক্ষেত্রে তিনি কাজ করেছেন। লেখালেখি ও গবেষণার পাশাপাশি পালন করেছেন অ্যাক্টিভিস্টের ভূমিকা। নব্য জাতীয়তাবাদের উগ্রতা উত্থানকে ঠেকাতে মাঠে নেমেছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নকে মানবিকতা ও মানবাধিকারের পক্ষে থাকতে বার বার সতর্ক করেছেন।

‘এ কারণেই নিৎসে, হেগেল, মার্কস, ওপেনহেইমার প্রমুখ বিশ্ববিশ্রুত জার্মান দার্শনিকের তালিকার সর্বশেষ রত্ন রূপে চিহ্নিত করা হয় তাকে’, বলেছেন জীবনীকারদ্বয়। তিনি পরিচিত জার্মান ফিলসফির যথাযোগ্য উত্তরাধিকার রূপেও।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jun/21/1561122057228.jpg

৯০ বছর পেরিয়ে ১৭০০ পৃষ্ঠা ও তিন খণ্ডে লিখিত ‘হিস্ট্রি অব ফিলসফি’ বা ‘দর্শনের ইতিহাস’ নামক পাণ্ডুলিপিটি প্রকাশে ব্যস্ত আছেন হেবারমাস। শুধু দর্শনের ইতিহাস বা ইতিবৃত্ত নয়, দর্শন মানব সভ্যতার পক্ষে ও বিপক্ষে কেমন ভূমিকা রেখেছে, সে মূল্যায়ন করেছেন তিনি তার বিশালায়ন গবেষণায়, যাতে দর্শনের ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিকগুলোও স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।

ইউরোপের চিন্তাজগতে জার্মান ফিলসফিকে বলা হয় সর্বশ্রেষ্ঠ আর ফরাসিরা এগিয়ে নন্দনতত্ত্বের দিক থেকে। জার্মান ফিলসফির শক্তিশালী স্তম্ভ হলো ‘ফ্র্যাঙ্কফুট স্কুল অব থট’, যার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা তিনি। শিক্ষকতা ও গবেষণা ছাড়াও তিনি জীবনের অধিকাংশ সময় কাটিয়ে এখনো বসবাস করছেন জার্মানির এই শহরেই। শহরের বৌদ্ধিক প্রতীক বা আইকন তিনি, যিনি বিশ্বকে নাড়া দিয়েছেন এ শহর থেকে, শহরবাসী এমনটিই বিশ্বাস করে।

গণআন্দোলন ও ছাত্র আন্দোলনের গণতান্ত্রিক অভিমুখকে বার বার জারিত করেছেন তিনি তার চিন্তা, তত্ত্ব ও দর্শন নিয়ে। মিডিয়া ডিসকোর্সে তিনি ‘জনপরিসর তত্ত্ব’ দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ-পাণ্ডিত্যপূর্ণ অবদান রেখেছেন।

হেবারমাস ঐতিহাসিক পর্যালোচনা করে দেখিয়েছেন যে, সতেরো ও আঠারো শতকের ইউরোপের সেলুন, কফিশপ মুক্ত আলোচনার ক্ষেত্র ছিল। সেসব জনপরিসরে রাষ্ট্র ও সমাজের নানা আলোচনা অবাধে হয়েছে, সংবাদপত্রে পক্ষে-বিপক্ষে লেখা হয়েছে, যা বুর্জোয়া মতাদর্শ বিকাশে সহায়ক ছিল। কিন্তু করপোরেট যুগে সংবাদপত্র বিজ্ঞাপন ও পণ্যবাণিজ্যের খপ্পরে পড়ে গেছে। জনপরিসরের গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডার বদলে এখন বিজ্ঞাপনদাতা ও মালিক পক্ষের স্বার্থচর্চা করা হচ্ছে।

হেবারমাসের চিন্তায় মিডিয়া কাঠামো ও মালিকানায় যে অবক্ষয়চিত্র দেখা যাচ্ছে, তাতে পাবলিক ইন্টারেস্ট ও পাবলিক স্ফিয়ার নষ্ট হয়ে গণতন্ত্র ও নাগরিক অধিকারের জায়গাটিও সঙ্কুচিত হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নাগরিক ও সামষ্টিকভাবে জনগণ। আরও যে বিপদ এর ফলে আসতে পারছে, তা হলো, মালিকানার হাত ধরে মৌলবাদ, উগ্রতা, শোষণ ও অর্থের দাপট, যাতে ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক-জাতিগত সংখ্যালঘু, নারী, শিশু, অবহেলিত প্রান্তিকজনের স্বার্থ ও অধিকারের আলোচনা কমছে এবং এদের এজেন্ডা উপযুক্ত গুরুত্ব পেতে ব্যর্থ হচ্ছে।

জার্মান দার্শনিক হেবারমাস, যিনি সমকালের বরিষ্ঠ চিন্তক হিসাবে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি, তিনি ব্যক্তিগত কর্মপ্রবণতা ও সচলতার যে অনন্য উদাহরণ ৯০ বছর স্পর্শ করেও সকলের সামনে উপস্থাপন করেছেন, তা তার তত্ত্বসমূহের মতোই অনুপ্রেরণাদায়ী, দৃষ্টান্তমূলক ও প্রণোদনায় ভরপুর।

শুক্রবার রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ’র মৃত্যুবার্ষিকী

শুক্রবার রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ’র মৃত্যুবার্ষিকী
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ/ ছবি: সংগৃহীত

আগামীকাল ২১ জুন শুক্রবার তারুণ্য ও সংগ্রামের দীপ্ত প্রতীক কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ’র ২৮তম মৃত্যুবার্ষিকী। বাংলা কবিতায় অবিসস্মরণীয় এই কবির শিল্পমগ্ন উচ্চারণ তাকে দিয়েছে সত্তরের অন্যতম কবি স্বীকৃতি। ১৯৯১ সালের ২১ জুন মাত্র ৩৫ বছর বয়সে মারা যান রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ।

কবির মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে শুক্রবার রুদ্র স্মৃতি সংসদ কবির গ্রামের বাড়ি বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার মিঠাখালী ইউনিয়নের মিঠাখালীতে শোভাযাত্রা সহকারে কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ, মিলাদ মাহফিল, দোয়া ও স্মরণ সভার আয়োজন করবে। স্মরণসভা শেষে রুদ্রের কবিতা আবৃত্তি ও রুদ্রের গান পরিবেশিত হবে।

অকালপ্রয়াত এই কবি নিজেকে মিলিয়ে নিয়েছিলেন আপামর নির্যাতিত মানুষের আত্মার সঙ্গে। সাম্যবাদ, মুক্তিযুদ্ধ, ঐতিহ্য চেতনা ও অসাম্প্রদায়িকবোধে উজ্জ্বল তাঁর কবিতা। ‘জাতির পতাকা আজ খামচে ধরেছে সেই পুরোনো শকুন’ এই নির্মম সত্য অবলোকনের পাশাপাশি উচ্চারণ করেছেন অবিনাশী স্বপ্ন ‘দিন আসবেই দিন সমতার’।

যাবতীয় অসাম্য, শোষণ ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে অনমনীয় অবস্থান তাকে পরিণত করেছে ‘তারুণ্যের দীপ্ত প্রতীকে’। একই সঙ্গে তাঁর কাব্যের আরেক প্রান্তর জুড়ে রয়েছে স্বপ্ন, প্রেম ও সুন্দরের মগ্নতা।

মাত্র ৩৫ বছরের (১৯৫৬-১৯৯১) স্বল্পায়ু জীবনে তিনি সাতটি কাব্যগ্রন্থ ছাড়াও গল্প, কাব্য নাট্য ও ‘ভালো আছি ভালো থেকো’ সহ অর্ধ শতাধিক গান রচনা করেছেন। এমনকি একাধিক গানে সুরারোপও করেছেন। পরবর্তীকালে এ গানটির জন্য তিনি বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি প্রদত্ত ১৯৯৭ সালের শ্রেষ্ঠ গীতিকারের (মরণোত্তর) সম্মাননা লাভ করেন।

‘উপদ্রুত উপকূল’ ও ‘ফিরে চাই স্বর্ণগ্রাম’ কাব্যগ্রন্থ দুটির জন্য ‘সংস্কৃতি সংসদ’ থেকে পরপর দু’বছর ‘মুনীর চৌধুরী সাহিত্য পুরস্কার’ লাভ করেন। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট ও জাতীয় কবিতা পরিষদ গঠনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র