মধুপ-কাহিনী

রহিমা আখতার কল্পনা
অলঙ্করণ শতাব্দী জাহিদ

অলঙ্করণ শতাব্দী জাহিদ

  • Font increase
  • Font Decrease

বিষয়টা হঠাৎ করেই, বহু বছরের ব্যবধানে আমাকে চমকে দেয়। কিংবা তার চেয়েও বেশি। বলা যায়, আমাকে আমূল নড়িয়ে দেয়। আমার বন্ধু শামীম, শামীম খন্দকার—মাঝখানে ন’বছরের অদর্শন সত্ত্বেও, তার চেহারা সুরতে নয়টি বছরের পরিষ্কার পরিবর্তনের ছাপ বহন করা সত্ত্বেও, কথাটি এমন সহজে বলে, যেন এটি গতকাল বা পরশুর ঘটনা। যেন রোজ আমাদের দেখা হয়। যেন ঘটনাটি ঘটবার পর পুরো ঊনিশটি বছর কেটে যায়নি। প্রসঙ্গটা কিভাবে যেন উঠেছিল মনে নেই। এক পর্যায়ে শামীম বলে
- দোস্ত, সেদিন তোমার পরনের শাড়িটা ছিল সবুজ, খুব তাজা সবুজ।
আমি চমকে যাই—শাড়ির রঙটাও তোমার মনে আছে?
- হ্যাঁ। সবুজ। পাড়টা লাল। এ দু’টো রঙের মিশেল কি ভুলে যাওয়া সম্ভব! বিশেষ করে একজন বাঙালির পক্ষে?

সামান্য ক’টি বাক্য, কয়েকটি মাত্র শব্দ, অথচ কী যে হয়ে যায় আমার ভেতরে। আশ্চর্য, এতগুলো বছরের এত হাজার হাজার দিনের লক্ষ লক্ষ ঘণ্টার দীর্ঘ সময়ে কথাটা একবারও আমি ভাবিনি। কেন ভাবিনি?

আমাদের জাতীয় পতাকার, আমার মাতৃভূমির, আমাদের স্বাধীনতার প্রতীক লাল-সবুজ কম্বিনেশনের শাড়ি আমার খুব কম বয়স থেকেই পছন্দের। প্রায়ই পরি। এখনো। লাল শাড়ি সবুজ পাড়। সবুজ শাড়ি লাল পাড়। পাড়হীন সবুজ থান অথবা পাড়হীন গাঢ় লালও, সময়ে সময়ে। কিন্তু বহুদিন আগেকার সেই ঘটনাটির সঙ্গে কাকতালীয়ভাবে মিলে যাওয়া এই প্রতীকী বর্ণ-সমন্বয়টি আমার মনে কখনো উদিত হলো না কেন, সেটাই বিস্ময়ের। শামীম আজ এতদিন পরে কী কথা মনে পড়িয়ে দিচ্ছে! আমি কি বাংলাদেশ!

হ্যাঁ, আমি একটা দেশ। বাংলাদেশ। আজ থেকে ঊনিশ বছর আগে, যখন আমার বয়স ছিল চব্বিশ, আর আমি শেষ জুলাইয়ের এক মধ্যদুপুরে স্বাধীন বাংলাদেশেই প্রথমবারের মতো ধর্ষিত হই—তখন আমার পরণে ছিল লাল পাড়ের তাজা কিন্তু গাঢ় সবুজ রঙের শাড়ি। টাঙ্গাইলের তাঁত। আহা, ঐতিহ্য। সেদিনের কোনো কিছুই ভুলে যাবার কথা নয়। আমি ভুলিওনি। কিন্তু শাড়ির রঙ টঙের ব্যাপারটা কেমন যেন আবছা হয়ে এসেছিল স্মৃতিতে। অথবা তেমনভাবে স্মৃতিতে আঁচড়ই কাটেনি বিষয়টা।
- তুই আমার বাড়ি থেকেই গিয়েছিলি।
শামীমের কথায় আমি নিজের মধ্যে ফিরে আসি—হ্যাঁ। তুমি তখন নীলক্ষেত কোয়ার্টারে সাবলেট থেকে ল্যাব এইডে কাজ করো।
- হুঁ। অফিস সেক্রেটারি ছিলাম। কোম্পানি সেক্রেটারিও, সাকুল্যে ওই একটা অফিসই তখন ওদের কোম্পানি ছিল তো।

আমি একবার শামীমের দিকে তাকাই। সেদিনের স্বল্পায়তন প্রতিষ্ঠানটির অফিস সেক্রেটারি শামীম খন্দকারকে আজকের শামীমের ভেতরে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। অবশ্য বদলে গেছে প্রতিষ্ঠানটিও, অনেক বড় হয়েছে। তবু সেখানকার ‘চাকুরে’ হিসেবে আজ শামীমের অবস্থান অকল্পনীয়। আজ সে ওরকম ব্যবসার কমপক্ষে বিরাট শেয়ারের মালিক হতে পারে। আমি তার কথার জের ধরি—
- আমি তোমার বাসায় তৈরি হয়ে কোথাও যাব বলে তুমি আধাবেলা ছুটি নিয়েছিলে।
- কারণ আমি জানতাম দিনটা তোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

ল্যাব এইড তখন সদ্য প্রতিষ্ঠিত ছোট একটা ডায়াগনোস্টিক সেন্টার। আজকের বিশাল হাসপাতাল-ভবন তখন কল্পনারও বাইরে। তিনতলা ভবনের ওই পরীক্ষাগারে কাজের ব্যস্ততা বলতে গেলে ছিলই না। আমার সব মনে পড়ে। বলি—ওই টেবিলে বসে থেকে তুমি খুব বোর হতে তখন।
- হ্যাঁ। ওটার মালিকের নামও শামীম। ডা. শামীম। নামের সূত্রে খানিকটা সৌহার্দ্য থাকায় শামীম ভাইয়ের অনুমতি পেয়েছিলাম সহজে। কোম্পানি-সচিবের মাছিমারা দায়িত্বের টেবিল ছেড়ে উঠে এসেছিলাম দুপুর বারোটার পরপরই।
- হুঁ।
- হুঁ মানে কী। তোর জন্যই করেছিলাম সব। অকৃতজ্ঞ।

ওর উষ্মার মুখে আমি আর কোনো শব্দই করি না। আমাদের আড্ডার তৃতীয় সদস্য, শামীমের বান্ধবী নাজনীন আমাদের আলাপচারিতা সবিস্ময়ে শুনছিল, নীরবে। খানিক পরে শামীম আবার সক্ষোভে বলে—আমি জানতাম দিনটা তোর বিশেষ দিন।
- হুঁ।
- আবার হুঁ। আমি কিন্তু জানতাম দোস্ত, সেদিন ঘটবে।

এবার শামীমের উচ্চারণে ক্ষোভ নেই, বরং নির্বিকার সে। কিছুটা কি কৌতুকপ্রবণও? কেন যেন আমার সুক্ষ্ম একটা অপমানবোধ হয়—কী অশ্লীল ইঙ্গিত দিয়ে কথা বলো শামীম। ‘ঘটবে’। কী ঘটবে ?
- এটা অশ্লীল ইঙ্গিত? যাহ্ শালা। যার জন্য করি চুরি...। কামখান বানাইতে পারলা তোমরা, আমি আন্দাজ করতে পারলে দোষ।
- আবার বাজে কথা?
- কথা যেরকমই হোক, আমি একশো ভাগ সিওর ছিলাম, জানতাম যে ওই দিন অঘটনটা ঘটবেই।
- মাই গড, তুমি এতো নিশ্চিত জানতে ? আমি তো কিছুই জানতাম না। তুমি কী করে...
- ওসব বুঝা যায়, কাঞ্চনমালা।

শামীমের মুখে আমাকে ‘কাঞ্চনমালা’ ডাকতে শুনে আমার কোনো স্মৃতিমেদুরতা তৈরি হয় না, কারো প্রতি ক্ষোভ কিংবা ঘৃণাও না। হাসি পায়। একদা এক যুবক আমার ‘মালা’ নামটিকে অলংকৃত করিয়া কাঞ্চনমালা বলিয়া আহ্বান করিত বটে। সুমিত। সুমিত ফায়জুল্লাহ। কী ছিল তার ঢলোঢলো আবেগ! বাথটাব ভর্তি সুগন্ধি সাবান-ফেনার মতো। কিন্তু শামীম তো মনে হচ্ছে আজ এই বিদঘুটে প্রসঙ্গ—কচলানো থেকে রেহাই দেবে না আমাকে। দেড় হাত দূরত্বে মুখোমুখি বসে সে যেন কোন এক দূরাগত গলায় স্বগতোক্তি করে—
- রওনা দেবার আগে আমার রুমে এসে তুই যত্ন করে গাঢ় লাল টিপটা কপালে দিলি। সঙ্গে ম্যাচ করে লিপস্টিক... টিপটপ ড্রেসআপ...
- তুমি শামীম, মুখস্ত করে রেখেছো ওই সব!
- কেন, অস্বাভাবিক? বলতে চাস তোরও মুখস্ত নেই! মনে পড়ে না এখনো?

আমি জবাব দেই না। চুপ থাকি। একসময় চোখ বুজে মুখটা আকাশমুখো তুলে ধরি। যেন এক্ষুণি আকাশ থেকে বৃষ্টি নামবে, মুখটা ধুইয়ে দেবে। বৃষ্টি নামে না। নাজনীন অধৈর্য হয়ে এসময় বলে—অনেক হয়েছে ভাই। তোমরা এবার দু’জনেই ঊনিশ বছর পেছন থেকে আজকের দিনটাতে ফিরে আসো তো।

হঠাৎ শামীম হাসতে থাকে। আমিও। নাজনীনও। যে যার নিজস্বতায়, আনন্দে, স্বস্তি বা অস্বস্তিতে, অর্থহীনতায় কিছুক্ষণ হাস্য-আক্রান্ত থাকি। এরপর একসময় থিতিয়ে আসে যার যার নিজস্ব অনুভূতি। খানিক আগের ঝলমলে বিকেলটা কেমন যেন বিমর্ষতায় মরে আসতে থাকে। জাতীয় জাদুঘরের ভেতরের পুকুরটা কমলারঙের মিহি সরভাসা পানি বুকে নিয়ে স্থির হয়ে আছে। পশ্চিমে হেলে পড়া সূর্যরশ্মি তির্যকরেখায় পুকুরের পানিতে পড়ে কেমন একটা সব্জে-কমলা রঙ ধরেছে। আমরা তিনজন পুকুরপাড়ের সবুজ মাঠে বসে থেকে নিজেদেরকে চিনতে পারি না। অথচ বহুদিনকার যোগাযোগহীনতাকে দূর করে দেবার জন্যই আমরা খুব উদার প্রকৃতির স্পষ্টতায় খোলা আকাশের নিচে বসেছিলাম; শামীম বারবারই কাছের কোনো চাইনিজ রেস্টুরেন্টে বসবার জন্য পীড়াপীড়ি করা সত্ত্বেও। শুধু তারুণ্যের স্মৃতিমেদুরতার কারণেই এই প্রান্তরবিহার। না হলে বয়স এবং তথাকথিত পদমর্যাদার দৌরাত্ম্যে আমাদের জীবন থেকে সাধারণ দিনযাপনের আনন্দ অন্তর্হিত হয়েছে বহু আগে। আমি চারপাশে চোখ ফেলি। দূরে দূরে ছড়ানো নানান গাছপালা। এ মুহূর্তে এই বৃক্ষমালাদের মতো আমরাও আমাদেরকে অনড় বলে বোধ করি। তিনজনই চুপ করে যাই। যেন আমরা সত্যিই গাছ হয়ে গেছি। ভাষাহীন। গাছগুলো মাটির গভীরে চলে যাওয়া শেকড়ের বন্ধনে আঁটো, তবে এই গাছ তিনটির কাণ্ডগুলো হাঁটু ভেঙে জুবুথুবু হয়ে জমে পড়েছে বুঝি। আমরা মাঠের দুর্বাঘাসের ওপর বসেছিলাম।

একটু দূরে, মাঠের অন্যপাশে কয়েকটি শিশু-কিশোর কল্পিত পীচের দু’প্রান্তে পরপর চার পাঁচটা করে ইট বসিয়ে স্ট্যাম্প বানিয়ে ক্রিকেট খেলছিল। বিপদজনক স্ট্যাম্প, কিন্তু বাচ্চাদের মুখে ভীতি বা দুশ্চিন্তার চিহ্ন নেই। এসময় আমাদের নীরবতার অখণ্ডতায় একটা ঢিল পড়ে। আচমকাই। ওদের একটি বল ব্যাটের আঘাতে উড়ে এসে আমার ঠিক ডান হাঁটুতে লেগেছে। ক্ষুদে খেলোয়ারদের হল্লা উঠলে আমরা আবার ধুলোওড়া বিকেলটাতে ফিরে আসি। আমি বলটা হাতে নিয়ে ওদেরকে হাত ইশারায় ডাকি। খুব দ্বিধার সঙ্গে একজন এগুচ্ছে। হাতে ব্যাট। স্ট্যাম্পের কাছে ব্যাট হাতে আরেকটি ছেলে। তার পাশে বড় জোর ন’দশ বছরের একটি মেয়ে। কী মায়াবী মুখটা তার! খুশির হাসিতে চোখ দুটো বুজে আসার যোগাড়। হাসতে হাসতে ঝুঁকে পড়েছে সামনের দিকে। তার কথা শুনতে পাচ্ছি—আমাকে তো খেলতে নাও না। এই জন্য। এইজন্য বিচার হইছে।

আগুয়ান ছেলেটি সম্ভবত ‘বিচার’- এর ভয়েই মুখ শুকনো করে একটু দূরত্ব রেখে দাঁড়াল। শামীম গম্ভীর গলায় বলে—কী ঘটনা? ছেলেটি উসখুশ করছে। শামীম আবার বলে—ঘটনাটা কী, বল নিতে এসেছো?
নাজনীন হেসে ফেলে—বেচারা ভয় পেয়েছে। শামীম আবার রহস্য করে আমাকে দেখিয়ে বলে—ভয়ের দেখেছো কী, শোনো ছেলে, এই ম্যাডাম যে খুব রাগী, তা জানো?
ছেলেটি না বোধক মাথা নাড়ে।
- এই রাগী ম্যাডাম যদি সত্যিকার রেগে যায়, তাহলে তোমাদের খেলাটা একদম খেয়ে হজম করে ফেলবে, বুঝলা?
- কী খেয়ে ফেলবে? এতক্ষণে বিস্মিত মুখে কথা ফুটল ছেলেটির।
- তোমাদের খেলাটা।
- খেলা-টা? খেয়ে হজম?
- হ্যাঁ ব্যাট-বল-স্ট্যাম্প সব। বেশি রাগ করলে উনি হাতের কাছে যা-ই পান, তাই খেয়ে ফেলেন।
তারপর আমার দিকে চেয়ে উদাস গলায় বলে—নিজের রাগটা খেতে পারেন না তো! এজন্য।
এবার সম্ভবত কৌতুকটা ধরতে পারল ক্রিকেটার। সে মুচকি হেসে আমার দিকে হাত বাড়াল বলটার জন্য। বলল—আমরা সরি আন্টি। আপনি কিন্তু খুব বেশি রাগ করেন না।

আমরা এবার নিজেরাই হাসতে লাগলাম। ছেলেটা বল হাতে নিয়ে হাসতে হাসতে ফিরে গেল। অনেকক্ষণ ধরে খেলা বন্ধ রেখে ওদের হাসাহাসিই চলছে, দেখলাম। বিকেলটা ফের তার নিজস্বতা নিয়ে ফিরে এসেছে শাহবাগ অঞ্চলে। আমাদের মধ্যেও কি ফিরে আসে প্রত্যেকের নিজ নিজ দিনরাত, ভিন্ন ভিন্ন জীবনযাপনের অশ্রুত পাঁচালী! কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা, সম্পূর্ণ ভিন্ন তিনটি বাস্তবতার প্রতিনিধি, কিছু কমন বিষয় নিয়ে মামুলি আলোপচারিতায় অংশী হয়ে উঠি। একটু পরেই জাদুঘরের ডেপুটি কিপার ড. নীরু শামসুন্নাহারকে আসতে দেখা যায়। মুখে উজ্জ্বল আভা। তার সম্প্রতি পাওয়া দু’বছর মেয়াদী জাপানের স্কলারশিপসহ ভিসা প্রাপ্তির খবর এবং আগে থেকে জানা তার সদ্যসূচিত সপ্রেম দ্বৈত-জীবনের তথ্য আমাদের দারুণ আনন্দিত করে অথবা নিজেদের কিছু কিছু না-পাওয়ার ক্লেশকে অধিকতর গভীর করে। আমরা তাকে উইশ করি, সঙ্গে থাকা মিষ্টি সকলে মিলে খাই। নিমকিভাজা খাই, বোতলের পানিতে তৃষ্ণা দূর করি। নানান বিষয়ে কথা চলতে থাকে। মিনিট চল্লিশেক পরে নীরু আপা ‘মোশারফ ভাই আমার জন্য অপেক্ষা করতেছে, না হইলে আরো অনেকক্ষণ থাকতাম’ বলে উঠে গেলে আবার তিনজন একা হয়ে পড়ি।

শামীমের বহুদেশ ঘোরার অভিজ্ঞতা আছে। আজ সে নিউইয়র্ক তো পরশু ব্রাসেলস। এক সপ্তাহ পরেই  হয়তো সে ফ্রান্সে, পরের মাসেই থাকতে পারে হংকং। কয়েক মাস ধরে সে বাংলাদেশে আছে। সম্প্রতি সে বিরিশিরিতে বিঘা দশেক জমি কিনেছে। আরো দশ পনের বিঘা কেনার ধান্দায় আছে। আপাতত কিনে ফেলা জমিতে একটা ট্যুরিস্ট-রিসোর্ট আর বৃদ্ধাবাস করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রাথমিক কাজকর্ম সেরে ফেলেছে। মহাব্যস্ত লোক।

নাজনীনের ব্যাপারটাও জানা গেল। সম্প্রতি নিঃসঙ্গ হয়েছে সে। বিয়ে হয়েছিল পারিবারিকভাবে। ছেলে রূপে গুণে বিদ্যায় ছিল অতুলনীয়। মনকাড়া সুন্দরী নাজনীনও মেধায় নান্দনিকতায় চূড়াস্পর্শী। সোনায় সোহাগা। কিন্তু স্বামীধনের গুণপনার অলিগলিতে বিচরণ করতে নিয়ে সে যখন আবিষ্কার করে যে, প্রতিরাতে স্বামী তাকে কিশোরীসুলভ কিছু ব্রীড়াভাঙার ক্রীড়াশৈলীতে আবিষ্ট রাখবার চেষ্টা করে ঘুম পাড়াতে চায়, অভিযাত্রার প্রান্তদেশে পৌঁছাতে উদ্যোগী হয় না, তখন সে সংশয়ে পড়ে। লোকটি কি শারীরিকভাবে অক্ষম! মগজে কেউটের মতো ফণা তোলা এ প্রশ্নের জবাব কিন্তু সে অচিরেই পেয়ে যায়। দেহ আর মনের বিবাদভঞ্জন হয়—নাহ, অমূলক সন্দেহ। বরং পারঙ্গম স্বামী নিজের দাদীর কাছে শোনা স্বামী-স্ত্রীর মিলন বিষয়ক অব্যর্থ প্রবাদটি তাকে শোনায়—‘মাসে এক, বছরে বারো, এর থাইককা যে যতো কমাইতে পারো।’ নাজনীন বিশ্বাস করেছিল। তীব্র আকাঙ্ক্ষায় জর্জরিত বহু রাতেই সে স্বামীর ঔদাসীন্যে তেমন দোষ দেখেনি। আর দীর্ঘ বিরতিতে যেদিন প্রত্যাশিত সন্তরণ ঘটেছে, সেদিন তার মতো সুখী আর কেউ নয়। ভালোই কাটছিল। মন্দের ভালো। দু’বছর আগে স্বামী যখন উচ্চতর বিদ্যালাভের জন্য ইংল্যান্ড পাড়ি দেয়, তখনই সে প্রথম জানতে পারে যে লোকটি সম্পর্কে তার জানাশোনায় ফাঁক থেকে গেছে। ইংল্যান্ডে সে একা যায়নি। সঙ্গে স্বামীর কৈশোরোত্তীর্ণকাল থেকে সখ্যের সম্পর্কধারিনী একজন দু’সন্তান-শোভিত বিধবা যুবতী মাতাও গিয়েছেন। সন্তানসহ তার ভিসা অবশ্য আলাদাভাবে হয়েছে। তার বাচ্চারা ওখানে পড়াশোনা করতেই যাচ্ছে।

নাজনীনের সঙ্গে তার স্বামীর বিয়েটা ছিল পরিবারের চাপে। এ বিয়ের ফলে তাদের পূর্বসম্পর্কের কোনো বিরতি ঘটেনি। সবকিছু জানাজানি হলে ঘুমন্ত স্বামীর পাশে জেগে কাটানো উপোসী রাতগুলো তার চোখে টেঁটাবিদ্ধ করে বুঝিয়ে দেয় সত্য কী। তারপরও সে চেষ্টা করেছিল। বৃথা। দু’বছর প্রকৃত প্রোষিতভর্তৃকার জীবন কাটানোর পর সম্প্রতি তালাকের নোটিশ এসেছে। যে ফ্ল্যাটটিতে সে এখন বসবাসরত, সেটি দেনমোহরের হিসাবে ফেলে নাজনীনের নামে লিখে দিয়ে স্বেচ্ছায় মুক্তি নিচ্ছে তার প্রবাসী স্বামী। দেনমোহর এবং তিনমাস দশদিনের ইদ্দতকালের খোরপোশের খরচের অন্তত আট ন’ গুণ বেশি হবে ফ্ল্যাটটির দাম। কিন্তু নাজনীন এই প্রাপ্তির হিসাব বুঝিয়ে অনির্বাণ জ্বলতে থাকা মনকে শান্ত করতে পারে না। অপমান। তীব্র অপমান অবিরত দংশনে তাঁকে মৃত্যুমুখী করে ফেলছিল।

এ অবস্থায় শামীম তাকে সঙ্গ দিচ্ছে। অথবা শামীমকে সে। বন্ধু হিসেবে পরস্পর পরস্পরের নির্ভরতা হয়ে উঠছে। ফেরার পথে কলাবাগানে আমার বাড়িতে আমাকে নামিয়ে দিয়ে যায় ওরা। আমার বাচ্চাদের জন্য অনেক খাবার আর গিফট কিনে দিয়েছে শামীম। কিন্তু সময়ের তাড়া বলে ওরা আমার বাড়িতে নামে না, রওনা দেয় উত্তরার দিকে, নাজনীনের বাড়ির উদ্দেশ্যে। শামীম কিছুদিন ধরে নাজনীনের ফ্ল্যাটে থাকছে। আমি দেখি, আমার বন্ধু শামীম তার বন্ধু নাজনীনকে নিয়ে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে জনাকীর্ণ রাজপথে। কিন্তু শামীম কি জানে, কী মারাত্মক একটি জখমের চাপাথাকা মুখ সে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে খুলে দিয়ে গেছে আজ!

সে দিনটা অন্য দিনগুলো থেকে ভিন্ন ছিল।
গরম কালটা আমার অপছন্দের। কিন্তু শেষ জুলাইয়ের সেই অসহ্য গরমেও নিজেকে আমার ফুরফুরে লাগছিল। আমার বন্ধু... দীর্ঘদিনের বন্ধু, যাকে আমি খুব মামুলি মেয়েদের মতো লুকিয়ে লুকিয়ে ভালোবাসি—আজ আমাকে নিভৃতে ডেকেছে। আমরা বহুবছর বন্ধুত্ব রক্ষার দূরত্বে থেকেছি, তার বিভিন্ন নারী বা তরুণী বিষয়ক গল্প, তা প্রেম বা নিছক কামের তাড়নাতেই হোক—আমি শুনেছি। জানি। আমার রক্ষণশীল প্রেমপ্রবণতাও জানে সে। আমাদের সম্পর্কটা নিয়ে একটা ধুম্রজাল রয়েছে বন্ধুদের মধ্যে। কেউ বলে, আমি সুমিতের পেছনে অর্থহীন মোহে সময় নষ্ট করছি। কেউ বলে সুমিত আমাকে খেলাচ্ছে, লক্ষ্যে পৌঁছামাত্র কেটে পড়বে। বন্ধুরা, বিশেষত মেয়ে বন্ধুরা আমার ব্যাপারে খুবই শংকিত। তারা মনে করে, আমি সুমিত ফায়জুল্লাহর মতো একটা চিহ্নিত প্লেবয়ের পাল্লায় পড়ে জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলটা করতে যাচ্ছি। আমি জানি প্রকৃত সত্য। ভুল শুদ্ধ যা-ই হোক কাজটা আমি করেই বসেছি। সুমিতকে ভালোবেসেছি। বাইরে অবশ্য আমি এর তীব্র বিরোধিতা করি। সুমিতও। সে কী বুঝে আমাদের প্রেমসম্পর্ক হওয়ার সম্ভাবনাকে স্রেফ অবাস্তব বলে উড়িয়ে দেয় জানি না। তবে আমিও ঠিক তারই মতো করে সবকিছু অস্বীকার করি। কারণ সকলের মনোযোগ সরিয়ে দিয়ে আমি ওকে সত্যিকারেরই পেতে চাই। এরপর জানতে পেরে চমকে উঠুক সবাই। তবে মেলামেশার ব্যাপারে আমি খুবই সাবধানী। আগামী মাসে আমার চব্বিশ পূর্ণ হবে। এখনো আমি কোনো পুরুষের শারীরিক সাহচর্যে যাইনি। দীর্ঘ ছ’বছরের বন্ধুত্বে সুমিত পর্যন্ত কাছ ঘেঁষতে পারেনি। কত গান, কত সাংগঠনিক কাজ, ডাকসু সাংস্কৃতিক দলের অনুষ্ঠান আমরা একসঙ্গে অনেকের সাথে করেছি। আবার ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়েছি শুধু দু’জনে, আমি যে চাচাজির বাড়িতে থাকি, সেখানে। কোনো নির্জনতার প্ররোচনাতেই সে বন্য হয়ে ওঠেনি। অথচ কত কথাই ওর লাম্পট্য সম্পর্কে আমি শুনেছি।

সুমিতের আমার সাথে একান্তে দেখা করে আমাদের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনার প্রস্তাবে আমি সানন্দে রাজি হয়েছিলাম। তবে কথাটা যাতে কোনোভাবেই প্রচার না হয় সেদিকে আমরা দু’জনেই সর্তক।

বিশ্ববিদ্যালয়ে সুমিত অন্য সাবজেক্টের ছাত্র আমাদের ইয়ারেই। তার একাডেমিক রেজাল্ট খুব সাধারণ হলেও সে কোনো বিচারেই সামান্য নয়। সুমিতের বাবা দেশের শীর্ষস্থানীয় বুদ্ধিজীবী শিক্ষাবিদ। সে নিজে সঙ্গীত-শিল্পী। সম্প্রতি সিনেমার প্লে ব্যাকও শুরু করেছে। আমার অনার্সের রেজাল্ট আশানুরূপ, একই পর্যায়ের রেজাল্ট এমএতেও হবে আশা রাখি। এরপর তো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতায় যোগ দেবার সিদ্ধান্ত পাকা হয়েই আছে। স্বপ্নের জীবন পেয়ে যাব বাস্তবে। কঠিন সংগ্রামের দীর্ঘ জীবন থেকে বিদায়। আমি এখন নিজের উপার্জনে পড়ি। পার্টটাইম কাজ করি দু’টো জাতীয় দৈনিকে। অনেকে ছাত্র পড়াতে বলে। আমার পোষায় না। শিক্ষকতা একেবারে বিশ্ববিদ্যালয়েই শুরু করব। সুমিত আমার এই ডিটারমিনেশনটা খুব সম্মান করে। সীমাহীন প্রতিকূলতায়ও হাল ছেড়ে না দেবার দৃঢ়তাকে সম্মান করে। আরেকটা ব্যাপারে আমার আশ্চর্য লাগে—ও তার সমস্ত গোপন কথা, লোভ, ঈর্ষা, ভবিষ্যত-ভাবনা এমনকি অপরাধবোধের কথাও আমাকে জানায়। আমি মাঝে মাঝে সংশয়ে পড়ে যাই। ও কি আমাকে সত্যিই ভালোবাসে ? নাকি এ কেবল কথামালা ? আবার বিভ্রান্ত লাগে—ভালো না বাসলে কেউ কাউকে এত চায়? এত কিছুতে জড়িয়ে নেয়! মাঝে মাঝে আমার সম্পর্কে সুমিত বন্ধুদের কাছে উচ্চকণ্ঠে প্রশংসা করে, যার মর্মার্থ হচ্ছে—আমি একটা খুব অন্যরকম চরিত্র। মামুলি মেয়েদের মাপকাঠিতে আমাকে বিচার করা যাবে না। এগুলো কি স্তুতি? সে চিঠিতেও আমাকে লেখে—কাঞ্চনমালা, আমার প্রতি আপনার কোনো তুচ্ছ অধিকারবোধ নেই বলেই আপনার অধিকার আমার ওপর সবচাইতে বেশি। সম্পর্কের ভেতরকার দাবি মানুষের সম্পর্ককে জীর্ণ করে। আপনাকে এত বেশি ভালো লাগার এটা অনেক বড় কারণ যে আপনি অনাবশ্যক দাবির কথা তুলে আমাদের অসাধারণ সম্পকটা, জীর্ণ করেন না।

হ্যাঁ—আমি হয়তো সুমিতের কথাগুলোর মতোই একটা চরিত্র। আমি এখন পর্যন্ত কিছু চাই না ওর কাছে। সে-ও না। কিন্তু চাওয়া কি নেই, এমনকি দাবি? আমি আপনমনেই হেসে ফেলি। সে-ও তো মুখে কিছু উচ্চারণ করে না। কিন্তু গত মাসখানেক আগে এই প্রথমবারের মতো, ফাঁকা বাড়িতে বড় চাচাজির বেডরুমে আমরা যখন আচার খুঁজছি, পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে আচমকা একটা চুমু খেয়ে ফেলেছিল সুমিত। দীর্ঘ সময়ের চুমু। আমি আচারের বয়াম রাখবার সেল্ফটাতে খুঁজে দেখে সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছি মাত্র, কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে একহাতে কোমর জড়িয়ে ধরে মুখটা অন্যহাতে ঘুরিয়ে গ্রাস করতে শুরু করেছে ঠোঁট দুটো। দম আটকে ছটফট  করতে শুরু করার আগে পর্যন্ত ছাড়েনি। আমি ক্ষুণ্ণ হয়েছিলাম। প্রতিক্রিয়ায় এক সপ্তাহ আর দেখা করিনি। সেও সাহস করে আমার বাসস্থানে আসেনি। একটা চিঠি পেয়েছিলাম সে সময় তার। অনেক কথার সঙ্গে লিখেছিল যে, আমরা দু’জন পরস্পরকে ভালোবাসি আর বিষয়টাও উপভোগ না করার মতো কিছু ছিল না, তবে ক্ষুব্ধ হওয়ার কারণ কী। এ-ও লিখেছিল—এরকম একটা ঘটনার জন্য কান্নাকাটি করাটা কোনো সোলেমানীয় ব্যাপার না। ‘সোলেমানীয়’ কী? কথাটা আমি বুঝতে পারিনি। এবার জিজ্ঞাসা করতে হবে। আরেকটা ভয় হচ্ছে—এবারও কি একবার সেদিনের মতো দুঃসাহস করে ফেলতে পারে সে? ভাবতেই আমার গায়ে শিহরণ বোধ করি। বজ্জাত। এবার ওকে কাছে আসার সুযোগই দেওয়া যাবে না। অবশ্য সে নির্জনতাও আজ পাবে না। আমরা যে বাসায় দেখা করব, সেটা আবৃত্তিকার দম্পতি ফরহাদ-নাবিলার। ফরহাদ ভাই আর নাবিলা আপা দু’জনেই চাকরিজীবী। তাদের বাসায় আমি আসবো জানালে নাবিলা আপু বলেন—
- সুমিতও আসবে শুনলাম?
- হ্যাঁ। কিন্তু আমি তো এখনো তোমাকে সেটা বলিনি। জানলে কিভাবে।
- ফরহাদ বলেছে। আসো দু’জনেই। কিন্তু মালা, যত দ্রুত সম্ভব সম্পর্কটার পরিণতি ঠিক করে ফেলো। সুমিত খুব অস্থির ধরনের ছেলে।
- কী করব?
- কী করব মানে? আমরা কি করেছি, আমি আর ফরহাদ? জগতের আর সব জুটিরা কী করে? বিয়ে করবে। সরাসরি বিয়ের সিদ্ধান্ত নিতে বলবে এবার।

নাবিলা আপার কথার যুক্তি আমাকে প্রভাবিত করে। সুমিতের সঙ্গে সম্পর্কটা নিয়ে একমুখী সিদ্ধান্তে স্থির হয়ে আমি তার মুখোমুখি হবার অপেক্ষায় থাকি।

বাজে ধরনের গরম পড়েছিল সেদিন। বকশিবাজার এলাকায় নাবিলা আপার শ্বশুরবাড়ি। বাড়িটায় তিনতলার ছাদে আরেকটা ফ্লোর করে গোটা অর্ধেক অংশ জুড়ে একটা এ্যাপার্টমেন্ট বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাকি অর্ধেকটা ছাদ যেন স্নিগ্ধ উঠান। চারপাশে টবের বাগান। ফুলের, ফলেরও। কিন্তু এ মুহূর্তে চারতলার কংক্রিটের উঠান রোদে জ্বলছে। দু’জোড়া ক্লান্ত পা দু’টি পরিশ্রান্ত মানুষকে সেই আঙিনাতে এনে পৌঁছায়। সুমিত আর আমি অথবা আমি আর সুমিত। তবু রক্ষা, চলে তো এলাম। স্বস্তি। স্বস্তির কথা ভাবতে না ভাবতেই আমার মাথায় একটা চক্কর দিয়ে উঠল। অ্যাপার্টমেন্টের দরজায় বিশাল এক তালা।

আমার মনে হলো ক্লান্তি যেন শতগুণ বেড়ে গেছে। ইচ্ছে করছে কয়েক পা পিছিয়ে ছায়াচ্ছন্ন সিঁড়িঘরেই বসে পড়ি। হঠাৎ চোখে পড়ে, তালার আঙ্টায় একটা কাগজ গুঁজে রাখা। দ্রুত ভাঁজ খুলি। নাবিলা আপার লেখা—মালা, দুঃখিত। ভোরবেলা খুব জরুরি খবর পেয়ে নরসিংদী যেতে হচ্ছে। মা অসুস্থ। রাতের আগে ফিরতে পারব না, ওখানে আজ থেকে যেতেও হতে পারে। তোদের বোঝাপড়াটা আরেকদিন হোক। অবশ্যই, আমার বাড়িতেই হোক। দুঃখিত সোনা।

আমি হতাশ হয়ে সুমিতের দিকে তাকিয়ে একটু অবাক হই। তার মুখে চিন্তার ছায়া নেই। এবং অচিরেই পকেট থেকে চাবি বের করে সে গেট খোলে। আমি প্রায় চিৎকার করে উঠতে গিয়ে সতর্ক হই। গলা খাটো করে বলি
- অ্যাই, কিভাবে?
- ফরহাদ ভাই। চিরকুটে লেখা খবরটা সকালে আমাকে জানালে আমি রিকোয়েস্ট করেছিলাম...।
- কী রিকোয়েস্ট?
- বলেছিলাম, আমাদের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ব্যাপারে আজকেই কথা বলা খুব জরুরি।
- নাবিলা আপা?
- জেনে থাকতে পারে, না-ও জানতে পারে। এটা তাদের ব্যাপার। আমরা তো আর লুকিয়ে চুরি করতে আসিনি।
- তবু
- তবু কী। খোদ গৃহকর্তাই তো চাবিসহ প্রবেশাধিকার দিয়েছে। নাকি?
- ধূর। কেমন যেন হয়ে গেল না?
- হ্যাঁ। খুবই ‘কেমন’ হয়ে গেল। এসো ভেতরে।

জ্বলতে থাকা দুপুরের ঝাঁজ থেকে স্নিগ্ধ পরিচ্ছন্ন আরামদায়ক ফ্ল্যাটটিতে ঢুকে আমি মুগ্ধ হই। সুমিতও। ঘুরে ঘুরে দ্যাখে ঘরগুলো। বেডরুমটায় ঢুকতে গিয়ে সুমিত একবার পেছনফিরে তাকায়—‘এসো।’ ও সব সময় আমাকে ‘আপনি’ বলে। আমিও। আজকে সেই প্রথম থেকেই ‘তুমি’ বলছে। বিনা কারণেই কেমন একটা ভয় হয় আমার। দ্বিধার সঙ্গে বলি,
- একজনের অনুপস্থিতিতে তার বেডরুমে ঢুকে পড়া উচিত হয়?
- আরে কী মুশকিল। এ বাড়িটা পুরোটাই আজ আমাদের জন্য বরাদ্দ আছে তো।
- তবু
- আবার তবু। বিছানার পাশে ড্রেসিং টেবিলের সেটিংটা দারুণ না?

সত্যিই দারুণ। এ সংসারে অনেক কিছুই দারুণ। কিন্তু আমরা এসব ‘দারুণ গৃহসজ্জা’ কতক্ষণ দেখব? কথা বলা জরুরি। নিজেদের ভবিষ্যত-পরিকল্পনার কথা। হঠাৎ করেই সুমিত আমার কাঁধে হাত রাখে। আমি চমকে উঠি। সে আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করে না। একজন সম্পূর্ণ আলাদা সুমিত আমাকে সর্বাঙ্গে জড়িয়ে ধরে তীব্র চুমু খেতে থাকে। আমার সাধের পাটভাঙ্গা টাঙ্গাইলের শাড়ি, সাথে রঙমেলানো যাবতীয় আবরণ তার কাছে বাহুল্য বলে সে সব সে অপসারণে ব্যস্ত হয়। আমি একটি মরিয়া প্রাণীর মতোই প্রতিরোধ করতে থাকি। আজন্ম যত্ন-লালিত সংস্কার আমাকে আমার সবচাইতে আকাঙ্ক্ষিত মানুষের বিরুদ্ধে প্রায় যুদ্ধে অবতীর্ণ করে। এক সময় সমস্ত শরীরে অনিচ্ছার মুদ্রা নিয়ে বিছানায় আমাকে কুঁকড়ে থাকতে দেখে ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠে সুমিত—এ সবের কী মানে মালা, এটা কী রকম আচরণ?
- এই কথা তো আমি জিজ্ঞেস করব আপনাকে।
-  না, করবে না। এটাই স্বাভাবিক।
- না।
- তাহলে চলো, ফিরি।

সুমিতের ফিরে যাবার প্রস্তাব শুনে আমার অন্তর আর্তনাদ করে ওঠে—ফিরি মানে? আমরা কি এসবের জন্য এসেছিলাম? আমরা কথা বলব না?
- অবশ্যই বলব। অনেক কথা বলার আছে আজ। একটু সহজ হও।

আমি সহজ হবার চেষ্টা করি। সুমিতও অনেকটা শান্ত, আমার অন্তত তাই মনে হয়। অভয় দেবার ভঙ্গিতে সে আমাকে জড়িয়ে ধরে বসে থাকে। বেশ কিছুক্ষণ। এবং আর কিছুক্ষণ পরেই সে সমস্ত নিয়ন্ত্রণের বাইরে অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে। তার প্রাণের ‘কাঞ্চনমালা’ এবার তার আগ্রাসী পৌরুষের কাছে সম্পূর্ণ পরাস্ত হয়। এরপর অনেকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে সুমিত। কোনো কথা বলে না। আমার ভেতরে অকারণে একটা ভয়-শিরশিরে অনুভূতি হয়। আর এত অসহায় লাগে ! নিজেই বুঝতে পারি না কখন নিঃশব্দে কাঁদতে শুরু করেছি।
- এতে কান্নাকাটির কী হলো...।
আমি আহত বোধ করছি, তবুও বলি—‘সরি।’
- সেদিন একটা চুমু খাওয়ার পরও তুমি কেঁদেছিলে। এসব কী ন্যাকামো। নাকি বুঝাতে চাও এর আগে কেউ তোমাকে চুমুও খায়নি!

সুমিত ব্যঙ্গ করে বললেও কথাটা সত্যি। কিন্তু এ মুহূর্তে তথ্যটা অর্থহীন লাগে, ওকে তা জানিয়ে কী হবে। বরং তার চোখমুখে নির্মমতার অভিব্যক্তি দেখে আমি বিস্মিত হয়ে পড়ি। সুমিতকে আমি চিনতে পারি না। ওর কণ্ঠস্বর, আমার এত প্রিয় কণ্ঠশিল্পীর নিয়মিত রেওয়াজের স্বর এত কর্কশ! আমার কান্নার বেগ দ্বিগুণ হয়ে উঠছে। কিন্তু আমি নিজেকে সামলে নিই। মনে হয় যেন অন্য কেউ আমার গলায় মরিয়া হয়ে বলছে—এসব কী বলেন আপনি।
- হ্যাঁ, ঠিকই তো বলছি। তুমি এত খুকী নাকি। সামান্য একটা চুমুতেও তুমি ক্ষয়ে গিয়েছিলে?

আকাশপাতাল খুঁজেও এ প্রশ্নের জবাব আমি পাই না। কিন্তু ঠেলে ওঠা কান্নার দমকটা এবার আর সামলাতে পারি না আমি। উপুড় হয়ে দু’হাতের ওপর মুখটা রেখে কাঁদতে থাকি। শুধু বেডকভারটাই আমার শরীর ঢেকে রেখেছে। খানিকটা সময় ভীষণ অস্বস্তির মধ্যে কাটে। আবার সুমিতের গলা শোনা যায়, এবারে অনেকটাই কোমল—‘শোনো।’
আমার অভিমান হয়। হায় আল্লাহ, এরপরও আমার অভিমান হয়! কিন্তু সত্যিই হয়েছে তো। আমি সাড়া দিই না। আমার তলপেটে খুব ব্যথা, দুই উরুর মাঝখানের গহীনে তীব্র জ্বালা। বরফঠান্ডা পানিতে যদি এক্ষুণি গোসল করা যেত! কিন্তু আমি উঠব না। ও বেরিয়ে যাক এ বাড়ি থেকে। তারপর উঠে, অনেকক্ষণ ধরে গোসল করে ধুয়ে ফেলে দেব সমস্ত ক্লেদ। সুমিত অপরাধী। সুমিত অপরাধী। আমাকে ফাঁদে ফেলে কলঙ্কিত করেছে সে।
- শোনো, মালা। জরুরি কথা আছে।
আমি মুখ তুলে ওর দিকে তাকিয়ে দেখি সে বেশ শান্ত। আমার মনে হয় যেন কিছুটা আপোষের বা অনুতাপের ভাব ফিরে এসেছে তার মধ্যে। আমি চোখভরা পানি নিয়ে ওর দিকে তাকাই। এখন যেভাবেই হোক, আমি তাকে মনস্থির করাব। আমি তাকে সরাসরি জানাব যে আমার পক্ষে আর ফিরে যাওয়া সম্ভব না। আমরা আজ হোক কাল হোক দ্রুত বিয়ে করব। এরকম একটি ঘটনার পর আমার শরীর-মন আর কারো হতে পারে না। ভিতরে ভিতরে ক্ষীণ একটা আশা দৃঢ় হতে থাকে। সুমিত নিজের ভুল বুঝতে পারছে। এমন রক্ষণশীল একটা সমাজে আমার মতো একটা অসহায় নিরুপায় অভিভাবকহীন মেয়েকে পরিকল্পনা করে ঠকাবার মতো হীন সুমিত নিশ্চয় না। আমার স্ট্রাগলকে, আমার মেধাকে সে তো খুবই সম্মান করে। সে তো জানে, একটি সৎ জীবনের আশায় আমি এই প্রতিকূল সমাজের সমস্ত অশুভ নেতিবাচক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করছি। ঘটনার আকস্মিকতায় সে হয়তো খানিকটা এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল। সামলে নিচ্ছে এখন। কত দীর্ঘদিন আমরা এক অপরকে জানি।  

ওকে চিনতে এমন ভুল কিছুতেই হতে পারে না। আমি উৎসুক হয়ে জানতে চাই,
- কী জরুরী কথা?
- মানে... বলছিলাম, তোমার কি শরীর খারাপ?
আমার গলা বুজে আসে। ওর গলা জড়িয়ে ধরে বুকে মুখ লুকিয়ে বলতে ইচ্ছে করে—হ্যাঁ গো সোনা, আমার শরীর খারাপ, খুব খারাপ। মনও খারাপ। তুমি আমাকে আগের মতো আদর করে কথা বলো, আমি ঠিক হয়ে যাব।
বলা হয় না। আমি রুদ্ধস্বর চুপ করে থাকি।
- কিছু বলছো না কেন। তোমার পিরিয়ড চলছে এখন?
এবার আমি প্রশ্নটার প্রকৃত অর্থ বুঝতে পারি। আমার ক্ষোভ হয়—‘পিরিয়ড? না, আমার এখন পিরিয়ড চলছে না।’
- তুমি সিওর?
- হ্যাঁ, সিওর। কেন?  
- এদিকে তাকাও। এটা কী!

আমার সবুজ শাড়ির অর্ধেকটা বিছানায়, অর্ধেকটা বিছানার পাশে রাখা ড্রেসিং টেবিলের সীটার-এ। বিছানায় থাকা অংশটুকুতে বেশ অনেকটা রক্ত। তাজা লাল রক্ত সবুজ কাপড়ে পড়ে সামান্য কালচে দেখাচ্ছে। আমার ভেতরে শিরশির করে ওঠে। অস্বাভাবিক লজ্জায় আমার সর্বাঙ্গ ঝিমঝিম করছে। কুমারীর প্রথম সঙ্গম সম্পর্কে আমার পড়াশোনা ছিল। আমার নিজের জীবনে সেই অপূর্ব ঘটনাটি ঘটেছে। শাড়িটা বিছানায় থাকায় তাতে লেগেছে রক্তের ছোপ।
- বলো, কী এটা।
- আপনি বুঝতে পারছেন না?
কথাটা বলতে গিয়ে আবেগে আমার গলা কেঁপে ওঠে।
- নতুন করে বুঝবার আর কী আছে। বলো তো শেষবার তোমার পিরিয়ড হয়েছে কবে?
আমি একটু হিসাব করে জবাব দেই—প্রায় সতের আঠারো দিন আগে।
- মিথ্যা বলো না মালা। আমার কাছে সতী সাজবার কোনো দরকার নেই। এসব কৌশল বিয়ের রাতে স্বামীর সঙ্গে কোরো।
- কীহ্?

আমার এই আহত জিজ্ঞাসা যেন সুমিতকে আরো হিংস্র করে তোলে। হিসহিসিয়ে বলে,
- আজকে তোমার পিরিয়ডের কত দিন? আর এ অবস্থায় আমার সঙ্গে দেখা করতে এলে কেন?

আমি হতভম্ব হয়ে সুমিতের দিকে তাকিয়ে থাকি। তার চোখে তীব্র ঘৃণা। আমার সমস্ত স্বপ্নপ্রাসাদ ভেঙে খান খান হয়ে যায়। সুমিতের প্রতিটা কথা ধারাল চাবুক হয়ে আমার সর্বাঙ্গে আঘাত করতে থাকে। আমার মনকে ক্ষত বিক্ষত করতে থাকে। আমি সহ্য করতে পারি না। আমার চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করে—তুমি এখান থেকে যাও সুমিত। তুমি আমার জীবন থেকে একেবারে দূর হয়ে যাও। তুমি একটা মেরুদণ্ডহীন কীট। দায়িত্ব নেবার ভয়ে তুমি আমাকে এমন নোংরাভাবে আক্রমণ করছো।

বলতে চাই, কিন্তু আমার জিভ সরে না। আমার কণ্ঠ স্বরহীন। আমি অকল্পনীয় বিস্ময়ে হতবাক। সুমিত বাথরুমে গেলে আমি উঠে দ্রুত আমার বাসি, ক্লেদাক্ত বেশবাস আবার শরীরে উঠাই। অরণ্যে পশুদের আক্রমণে বিধ্বস্ত বনমানুষের মতো বাকল জড়াই গায়ে। সবুজ বাকল। শাড়ির প্যাঁচটা এমনভাবে জড়াই যেন রক্তের দাগগুলো সহজে দেখা না যায়। হায়, আরব সভ্যতার ইতিহাসে প্রসিদ্ধ কুমারী নারীর পবিত্র রক্ত। পাপস্পর্শহীনতার প্রতীক। কান পাতি, বাথরুমে কলকল করে পানি পড়ার শব্দ। আমার জীবনের প্রথম পুরুষ আমাকে বলাৎকার শেষে গোসল করছে। আমি তার জীবনের কততম নারী? এই প্রশ্ন জিজ্ঞাসার আর কোনো প্রয়োজন নেই। আমি বাড়ির চাবিটা ড্রেসিং টেবিলে রেখে অভুক্ত স্নানহীন ধর্ষিতা এক স্বপ্নভুক নারী বেরিয়ে এসেছিলাম সেদিনের পড়ন্ত দুপুরে। পুড়ন্ত দুপুরে। সেই দুপুরের আগুন সমগ্র জীবন ধরে অপমান সাথী করে জ্বলছেই। সেদিনের পর সুমিত নিজেকে পুরোপুরি গুটিয়ে নিয়েছিল। আমিও।

আমার জন্মভূমিতে একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল। আমি তখন শিশু। কিন্তু সেদিনের লক্ষ নারীর সম্ভ্রম হারানোর ইতিহাসে পরবর্তীকালে যোগ দেওয়া আমিও যে একজন সৈনিক, আমার গোপন রক্তও যে বাংলাদেশের সবুজ জমিনে মিশে লাল সূর্যটা তৈরি করেছে, কথাটা আমি আজকের আগে একবারও ভাবিনি। আমার বন্ধু শামীম, আমার গভীর গোপন গ্লানির সাক্ষী শামীম আজ কথাটা আমাকে মনে পড়িয়ে দিয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন :