শিমুল মাহমুদের একগুচ্ছ কবিতা



শিমুল মাহমুদ
অলঙ্করণ শতাব্দী জাহিদ

অলঙ্করণ শতাব্দী জাহিদ

  • Font increase
  • Font Decrease

লবণ

প্রেমে পড়া মাত্র আমরা ক্রমশ লবণ-রহস্যের দিকে এগিয়ে যেতে শুরু করেছি। লবণ হলো সেই রহস্য যা আমাদের একই সাথে সমুদ্রের বিশালতা ও চোখের জলের কথা মনে করিয়ে দেয়। তোমার জিভ আমার জিভের সাথে স্পর্শ করা মাত্র আমি লবণের স্বাদ পেলাম; পক্ষান্তরে পেলাম সমুদ্র ও কান্না।

রুটি

মাঠ থেকে তোলা হলো ফসল। মাড়াই কলের ভেতর দুমড়ে মুচড়ে ওদের নগ্ন করা হলো; চালুনি দিয়ে ছেঁকে নেয়ার পর কোমল ও মায়াবী না হওয়া অবধি ময়দার মতো পিষে ফেলা হলো; তারপর আগুনে সেঁকে তৈরি করলাম রুটি। ভুলে গেছো মেয়ে, এভাবেই দীর্ঘ চাষাবাদ মৌসুমে খুঁজে পেয়েছিলাম আমরা আমাদের যৌথজীবন। সেই থেকে তুমি আর আমি পরস্পরের খাদ্য হয়ে বেঁচে আছি।

নক্ষত্র

শুনেছি আমাকে শাসন করছে আকাশের এক একটি নক্ষত্র। বেঁচে থাকার জন্য ঘুমোতে হচ্ছে আমাকে; নক্ষত্রের নির্দেশে জেগে উঠছি আবার। অন্য কারোর ঘুমের ভেতর স্বপ্ন দেখছি; অন্য কেউ হয়ে অন্য কারো জীবনকে যাপন করছি।

মৃত্যু মানে, নক্ষত্রের নির্দেশে ছোট্ট একটি সফর; যেখানে মুহূর্তের ভেতর বুঝতে পারবে তুমি, কী ফেলে এসেছো পেছনে। (মৃত্যুর পর নক্ষত্র আর মানুষের পার্থক্য ঘুচে যায়)

বাস্কেটবল

লাল পোশাক গায়ে ছেলেটি সূর্যকে বাস্কেটবল বানিয়ে ছুড়ে দিচ্ছে লক্ষ্যের দিকে; প্রতিবারই ব্যর্থ হচ্ছে; সূর্য কিছুতেই প্রবেশ করছে না খুঁটির মাথায় বাঁধা ঝুড়ির গোলকে। অথচ আমরা প্রতিদিনই ঢুকে যাচ্ছি কোনো না কোনো বাক্সেটের ভেতর; তারপর আমাদেরকে বেঁচে দেয়া হচ্ছে মার্কেটে।

ঘড়ি

বুড়ো সূর্যকে পেছনে রেখে ফ্যাঁকাসে আলোর ভেতর দিয়ে হাঁটছি। দালান কোঠা মার্কেট অফিস আদালত আগে আগে হাঁটছে। পাশাপাশি হাঁটছে সবুজ লতার মতো সবুজ পা ফেলে আমার প্রেমিকা, নারগিস বেগম। শালিকের হৃদপিণ্ডের মতো কেঁপে ওঠা নারগিস বেগম; হাজার পাখির হাজার রঙের পালকের মতো পালকমুখর নারগিস বেগম চাঁদের মুকুট মাথায় আমার সাথে হাঁটছে বুড়ো সূর্যের নিচ দিয়ে ঘড়ির কাটার মতো মৃত্যুর কাজল এঁকে চোখে। তোমার চোখ ফাকি দিয়ে ‘ঘড়ি’র দিকে তাকালেই মৃত্যুর কথা মনে হয় আমার।

জানালা

যতদূর চোখ যায় ততদূর ফেলে এসেছি সবুজ পাতা। সবুজ পাতার অর্থ, ‘তুমি’। ‘তুমি’ অর্থ সন্ধ্যাবেলার জানালায় দাঁড়িয়ে থাকা একজোড়া চোখ; যে চোখের মায়ায় দাদাজান হেঁটে আসতেন মকতবের পুণ্য ফেলে; ফিরে আসতেন রাতের নামাজ ফাঁকি দিয়ে বাড়ির উঠোনে। আজকের জানালায় যখন তোমাকে তাকিয়ে থাকতে দেখলাম তখন মনে পড়ল দাদিআম্মার কথা। এভাবেই কোনো এক বালক ক্রমশ যুবক হলে আমাদের এই জানালাখোলা মায়াকথা মনে করে খুঁজতে থাকবে আরো এক নতুন জানালা; আর আশ্চর্য, সেই জানালাতেও তখন দাঁড়িয়ে থাকবে দাদিআম্মার মায়ামায়া চোখ। জানালা অর্থ, আমার মায়ের মতো দাদিআম্মার মায়াকাতর একজোড়া চোখ।

ডিম

মেয়েটি সঞ্চয়ের কথা ভাবছে; আমি ভাবছি মেয়েটি কতটা প্রফেশনাল। পাশাপশি হাঁটছি; দেখতে পাচ্ছি, বিচিকাটা একটা লাল তাগড়া খাসিমোরগ। মোরগটি একঝাঁক যুবতী মুরগির ভেতর বিচরণ করছে। মুরগিগুলো ডিম দিচ্ছে প্রতিদিন। ডিম অর্থ প্রোটিন। প্রোটিন অর্থ, পিছিয়ে পড়া মেয়েটিকে ডিম-ইন্ডাস্ট্রির মতো ক্রমশ সেক্স-ইন্ডাস্ট্রিতে অভ্যস্ত করে তোলা।

একটা হেলেঞ্চাসাপ এইমাত্র ডিম পাড়া শেষ করে হতবাক চোখে তাকিয়ে দেখছে আমাদের।

ডাকবাক্স

স্কুল থেকে ফেরার পথে গার্লস-স্কুলের গেটে লাল-ডাকবাক্সের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যেতাম; ভাবতাম মেয়েরা এত এত চিঠি লেখে কোথায়! প্রথম তোমাকে যেদিন দেখলাম, সেই থেকে নিজেই লাল-ডাকবাক্স হয়ে লটকে থেকেছি তোমাদের স্কুল-গেটে। প্রতিদিনই মনে হতো, গোপনে ফেলে রেখে যাবে তুমি হাতে লেখা খামবন্দী চিঠি। আজ এত বছর পর, পুরনো বইয়ের ভাঁজে মাকে লেখা বাবার চিঠি খুঁজে পেয়ে মনে হলো, লটকে রয়েছি আজও আমি লাইটপোস্টের সাথে, ধুলোমাখা লাল-ডাকবাক্স। আমাকে কখনো চিঠি লেখেনি কেউ। বাবা লিখতেন, মাকে।

কেঁচো

এনজিও কর্মীদের পরামর্শে আবেদালি কেঁচো চাষ করতে শুরু করেছে। কাঁচা-মাটির ভেতর কিলবিল করছে তামাটে রঙের শতসহস্র কেঁচো। ‘কেঁচোকে প্রকৃতির লাঙ্গল বলা হয়’; শুনেছিলাম রমজান স্যারের ক্লাশে। প্রতিদিন খুব কাছ থেকে আবেদালি দেখছে, কেঁচোরা কিভাবে মাটি খেয়ে বেঁচে থাকে; কিভাবে মাটির ভেতরে নিজেকে লুকিয়ে রাখতে রাখতে সকলের চোখের আড়ালে শ্বাস টেনে নেয়। এইভাবে ক্রমশ মাটির ভেতর কেঁচোগুলো বংশবিস্তার করতে থাকলে আবেদালির মনে হতে থাকে, মাটির ভেতর শুয়ে আছে সে, যেন বা নিজেই এক প্রাকৃতিক লাঙ্গল। আবেদালি মাটি চষছে, আবেদালি মাটি খাচ্ছে, আবেদালি উগলে দিচ্ছে মাটি; আবেদালি মাটির সুড়ঙ্গ খুঁড়ে ক্রমশ পৌঁছে যাচ্ছে কেঁচোর মতো মাটিদের গোপন গুহায়; যেখান থেকে আবেদালির মতো একটি কেঁচোও কোনোদিন ফিরতে পারেনি কোনো খোলা আকাশের কাছে।

শরীর

প্রথম যেদিন তোমাকে ঝলমলে আলোর ভেতর দেখেছিলাম তখন তুমি ছিলে একটি আপেল বাগান; তোমার মন ছিল বাঁশির কুহক; যার ঐশী সুর তোমার হৃদয়কে অতিক্রম করে গিয়েছিল; তুমি উন্মোচন করতে পারছিলে না তোমার গভীরতা; যা ছিল এক খণ্ড ভেসে থাকা মেঘের মতো নীরব ও প্রশান্ত; তোমার স্বপ্নগুলো ক্রমশ সবুজ পাতা; যেন বা দেবদারুশাখায় দোল খেতে থাকা সমুদ্রগামী পালতোলা জাহাজ। এই সত্যগুলো একদিন পৌঁছে যাবে, তোমার রক্তে মিশে থাকা কন্যা ও পুত্রদের কাছে; যখন শেকড়সুদ্ধ গোটা পৃথিবী তোমার বুড়িয়ে যাওয়া শরীর থেকে চোখ ফিরিয়ে নেবে; আর আমি, তখনও অপেক্ষায় থাকব তোমার।