Alexa

সবাই টমবয় বলে ডাকতো

সবাই টমবয় বলে ডাকতো

ছবি: বার্তা২৪

মেয়েরাও ফুড ডেলিভারি দেয়?- এই প্রশ্নটি আমাকে প্রায়ই শুনতে হয়। বেশিরভাগ ইউজারদের বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়।  আমার নিজেরেও প্রশ্ন জাগে, অবাক হওয়ার কি আছে? বিদেশে সবাই পাল্লা দিয়ে কাজ করে বেড়াচ্ছে। প্রশ্নের উত্তর আমি হাসিমুখে সবসময় জবাব দিয়ে বলি, জী দেয়।

ছোটবেলায় আমাকে সবাই টমবয়, টমবয় বলে ডাকতো।  কারণ তাদের মতে আমার সব কাজকর্ম ছেলেসুলভ।  আমার চুল ছোট, বাজার করতে আমিই যাই।  কোন ইলেক্ট্রনিক জিনিসপত্র নষ্ট হলে আমারই ঠিক করতে হতো। সবাই বলতো, একটু মেয়েলি হতে পারো না? বিয়ে করতে হবে, সংসার করতে হবে।  এমন পুরুষ, পুরুষ ভাব দেখালে ছেলে কোথায় পাবো? আমি এড়িয়ে যেতাম।  আমার মায়ের খুব শখ ছিল একটি ছেলে নেওয়ার। তবে তার কোন পুত্রসন্তান হয়নি।  হয়তো মা এইজন্যেই আমাদের দুই বোনকে ছেলেদের মতো বড় করার চেষ্টা করেছেন।  আমার বোন ততটা হয়নি যতটা আমি হয়েছি। আমি ছোটবেলা থেকেই প্যান্টশার্টে অভ্যস্ত। আর এই মনোভাবের জন্যে কম কথা কানে যায়নি।  প্রতিনিয়ত শুনতে হয়েছে, এবং হচ্ছে।

পাঠাও’তে ফুড ডেলিভারি করি শখের বসে।  সাইকেল আছে, তাই কেন নয়? আজকাল সবাই কিছু না কিছু করে আয় করছে।  আমার কাছে আয়ের চেয়ে সবচে বড় কথা আমি স্বাধীনভাবে এমন এক কাজ করছি যেখানে বাধাধরা নিয়ম নেই।  আমি নিজেই আমার নিজের বস!

আমি প্রায় ১৭ জনেকে খাবার পৌঁছে দিয়েছি এবং আমার প্রত্যেকটা অভিজ্ঞতা ছিল বেশ ভালো। আমার মাঝেমধ্যে অস্বস্তিবোধ কাজ করতো। কারণ, এখন আমাদের পরিবেশ মেয়েবান্ধব হয়ে উঠেনি।  আমাকে সবসময় চোখ কান খোলা রেখে চলতে হচ্ছে এবং আগামীতেও এই কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

আজকে এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা হলো। রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার নিয়ে যাকে পৌঁছে দিব তার ঠিকানা নিয়ে একটু ঝামেলা হচ্ছিল। ব্যক্তিগতভাবে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার আগ পর্যন্ত কোনভাবে ইউজারদের ফোন করে লোকেশন জিজ্ঞেস করি না।  নিজেই খুঁজে বের করে পৌঁছে দিয়ে আসি।  তবে আজকে ব্যতিক্রম ঘটলো।  আমি ফোন করে লোকেশন ভালোভাবে জেনে নিলাম।  ওপাশে একজন মহিলা আমাকে খুব সুন্দরভাবে বুঝিয়ে দিলেন কিভাবে কোন রাস্তা দিয়ে আসতে হবে।  আমি যখন বাসা খুঁজে কলিংবেল টিপ দিলাম, তখন সেই মহিলা বের হয়ে আসলেন।  আমাকে দেখতেই বিস্ময়ে তার চোখ চকচক করতে লাগলো।  তিনি বললেন, আমি ভেবেছিলাম . . . .

আমি কিঞ্চিৎ হেসে বললাম, আপনি ভেবেছিলেন ডেলিভারি তো ছেলেরাই দেয় তাই না?

মহিলাটি লজ্জা পেলো।  তিনি মাথা নাড়িয়ে বললেন, কখনও দেখিনি মেয়েরা দিচ্ছে তাই ভেবেছিলাম এই আর কি।

আমি বললাম, আপনার সঙ্গে ফোনেও তো কথা হল।

মহিলাটি বললেন, হ্যাঁ হয়েছে হয়েছে।  তবুও  . . .

আমি আর কথা বাড়ালাম না। প্যাকেটটি বাড়িয়ে দিলাম তার দিকে। তিনি প্যাকেটে ফাঁক দিয়ে উঁকি মেরে আমাকে টাকা দিয়ে দিলেন।  আমি সঠিকভাবে টাকা গুণে, তাকে বিদায় জানালাম।

পিছন ঘুরে পা দিতে না দিতেই মহিলাটি হঠাৎ বলে উঠলেন, আপু কথা ছিল।

আমি বললাম, বলুন!

মহিলাটি শান্ত গলায় বললেন, আপনি কিছু মনে করেননি তো?

আমি বললাম, না না।  আমি কিছুই মনে করিনি।  কেন বলুন তো?

মহিলাটি বললেন, এই যে আপনাকে দেখতেই আমি একটু চমকে উঠলাম।

আমি হেসে বললাম, আমি স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছি।  চমকে উঠা আমার কাছে নতুন কিছু নয়।

মহিলাটি বললেন, আসলে আমাদের সমাজে কিছু কিছু পেশা আছে সেখানে মেয়েরা কাজ করতে চাইলেও করতে পারে না।  কিন্তু কেউ যদি করে তাহলে আমরা তা সঠিকভাবে নিতে পারি না।

আমি বললাম, এইজন্যেই তো কিছু কিছু মেয়ে কাজ করে এই প্রথাগুলো ভাঙছে।  আমি এই প্রশ্নের সম্মুখীন হইনি তা বলবো না, কিন্তু আমি কোন নেগেটিভ রেসপন্স পাইনি।

মহিলাটি অবাক  করে বললেন, আপনি খুব সাহসী!

আমি হাত বাড়িয়ে তার সঙ্গে হ্যান্ডশেক করলাম।  তারপর বিদায় নিয়ে চলতে লাগলাম আমার সাইকেলের কাছে।

আজ না হয়তো কাল হয়তো না পরশু একদিন না একদিন প্রথাগুলো চুরমার করে ভেঙে যাবে। 

আমি সেইদিনটির জন্য অপেক্ষা করছি।

উল্লেখ্য পাঠাও-এর আরো অসাধারণ কিছু রাইডার, ইউজার, ক্যাপ্টেন এবং ডেলিভারি এজেন্টদের সত্য ঘটনা অবলম্বনে ২১ শে বইমেলায় আসছে "অগ্রযাত্রার অগ্রদূত-২"!

বইটির মোড়ক উন্মোচন হবে আগামী সোমবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি বইমেলার বিশ্ব সাহিত্য ভবনে।

আপনার মতামত লিখুন :