Barta24

সোমবার, ১৯ আগস্ট ২০১৯, ৪ ভাদ্র ১৪২৬

English

আল মাহমুদ, প্রেমবাদ ও ইমাম খোমেনি

আল মাহমুদ, প্রেমবাদ ও ইমাম খোমেনি
অলঙ্করণ কাব্য কারিম
সৈয়দ তারিক


  • Font increase
  • Font Decrease

এ লেখার একটি মজাদার আপতিক কারণ রয়েছে।
আমার অনুজাপ্রতিম কবিবন্ধু নভেরা হোসেন সেলফোনে বললেন, ‘তারিক ভাই, বইমেলায় গিয়ে আপনার বই কিনলাম। পরে দেখি যে, ওপরে আপনার বইয়ের কভার, ভেতরে আল মাহমুদের কবিতা।’ আমি খুব কৌতুক বোধ করলাম। কবি আল মাহমুদের সঙ্গে এক প্রকার আধিদৈবিক আত্মীয়তার বিরল আস্বাদ পেলাম যেন। তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্মৃতিগুলো অবিরল পাপড়ি মেলতে থাকল।

আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে কবি আল মাহমুদের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল। আমি তখন নিতান্ত যুবক। ‘সোনালি কাবিন’ সনেটগুচ্ছ নিয়ে একটা আলোচনা লিখেছিলাম ‘একবিংশ’ পত্রিকায়। তিনি লেখাটির প্রশংসা করেছিলেন। তিনি তখন শিল্পকলা একাডেমিতে চাকরি করেন। মাঝে মধ্যেই চলে যেতাম তার দপ্তরে। চা খাওয়াতেন। বেনসন অ্যান্ড হেজেসের প্যাকেট খুলে দিতেন। আর, অনর্গল কথা বলতেন সাহিত্য নিয়ে, তার কবিবন্ধুদের নিয়ে, তার জীবনের নানা ঘটনা নিয়ে এবং ধর্ম নিয়ে। তার রচনার মতো তার কণ্ঠেও উত্তাপ আছে। শামসুর রাহমান এবং আল মাহমুদ—এ দুটি নাম প্রায়ই একসঙ্গে উচ্চারিত হয়। সব তুলনাই সরলীকরণ ও বিভ্রান্তির দিকে নিয়ে যেতে পারে। তবু বলা যায়, শামসুর রাহমানের কবিতার মতো ব্যক্তি শামসুর রাহমানও তুলনামূলকভাবে অধিকতর নাগরিক ও বিদগ্ধ এবং আল মাহমুদের কবিতার মতো ব্যক্তি আল মাহমুদও অধিকতর লোকায়ত ও ভাবপ্রবণ। এ দুই কবি—যারা এককালে বন্ধু ছিলেন, একসময় পরস্পর বিপরীত অবস্থানে চলে যান। আল মাহমুদ সে-বিষয় নিয়েও নানারকম কথা বলতেন। অনেকটা সময় পার হলে তারপর উঠতে চাইলেও উঠতে দিতেন না। সিগারেটের প্যাকেট এগিয়ে দিতেন—‘বসো, সিগারেট খাও।’ কোনো-কোনো দিন অফিসের সময় শেষ হয়ে যেত। উনি উঠতেন। বলতেন, ‘আজ গাড়িতে যাব না। চলো হাঁটি।’ তার সঙ্গে বেরিয়ে পড়তাম। রমনা পার্কের পাশ দিয়ে হেঁটে মগবাজারের দিকে চলে যেতাম। তিনি তখন ওই এলাকার মীরবাগে থাকতেন। গল্প করতে করতে দুপুরের রোদ ভেঙে আমরা চলতে থাকতাম।

একদিন তার বাসায় গেলাম বিকেলে। গল্প হলো। চা-নাশতা খাওয়া হলো। তারপর তিনি বললেন, ‘আমি একটু বাজারে যাব। তুমি বসতেও পারো, আমার সঙ্গে আসতেও পারো।’ আমি বললাম, ‘নিশ্চয়ই সঙ্গে যাব। কবির বাজার করা দেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে চাই না।’ তিনি বাজার করলেন। শাকসবজি, বড়-বড় চিংড়ি মাছ এবং গরুর গোস্ত কিনলেন। বাজার শেষ হলে বললেন, ‘চলো, আরো গল্প করা যাক।’ আবার গেলাম তার বাসায়। একসময় উঠতে চাইলে বললেন, ‘না, এখন যেতে পারবে না। রান্না হচ্ছে, খেয়ে তারপর যাবে।’ সেদিন তার সঙ্গে ভূরিভোজ করতে হয়েছিল।

অনেকদিন হলো সাহিত্যিক পরিমণ্ডলের সঙ্গে আমার যোগাযোগ ক্ষীণ। শ্রদ্ধেয় কবি আল মাহমুদের সঙ্গেও দেড় দশকের বেশি কাল ধরে কোনো যোগাযোগ নেই। তার লেখাও পড়া হয় না বহুদিন। এমনই সময়ে নভেরা নস্টালজিয়ার উপলক্ষ দিল আমাকে। 

২.
সে বছর (২০০৯) বইমেলায় আমার একটি কবিতার বই বের হয়েছে। মাওলা ব্রাদার্স প্রকাশ করেছে সেটা। বইটির নাম ‘মগ্ন তখন মোরাকাবায়’। সৈয়দ মুজতবা আলীর দৃষ্টান্তে আমি মাঝে মধ্যে বইটি কিনি একে-ওকে-তাকে উপহার দেওয়ার জন্য। ও রকম কিনতে গিয়ে আমার হাতেও পড়ল একটা কপি, যার প্রচ্ছদে ‘মগ্ন তখন মোরাকাবায়’ আর ভেতরে আল মাহমুদের ‘প্রেমের কবিতা সমগ্র’। বাঁধাইখানার নিতান্ত বিভ্রাট। তবু এরই ফলে অনেকদিন পর আল মাহমুদের কবিতা (আবার) পড়ার সুযোগ পাওয়া গেল।

কবিরা প্রায় সবাই প্রেমের কবিতা লেখেন। যদি কেউ বলেন যে, সব কবিতাই প্রেমের কবিতা, তা-ও অবশ্যই মান্য। প্রেমই জন্মস্থান, সৃষ্টির আঁতুরঘর। ঘৃণা বা দ্রোহ তো প্রেমেরই বিপরীত প্রকাশ, সৌন্দর্য তো প্রেমেরই অলঙ্কার। তারপরও কিছু কিছু কবিতা বিশেষভাবেই প্রেমের কবিতার তিলক কপালে আঁকে। প্রেমের কবিতার বিশেষ সঙ্কলন হয়।

প্রেম কী?

প্রেম হচ্ছে দুটি সত্তার মধ্যে আত্যন্তিক আকর্ষণ—যে আকর্ষণ বিশ্বজাগতিক প্রধান সত্য। যে চারটি বল বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে কাজ করে (অভিকর্ষ, তড়িৎ-চৌম্বক বল, স্ট্রং ফোর্স ও উইক ফোর্স) তার সবই আকর্ষণমূলক। সবরকম ইতিবাচক মানবিক সম্পর্কের মধ্যেই ভালোবাসা আছে, তবু প্রেম বলতে প্রচলিতার্থে নর-নারীর পারস্পরিক আকর্ষণ বোঝায়। এর পেছনে দৈহিক প্রণোদনা নিশ্চয়ই একটি প্রধান নিয়ামক, তবু ভালোবাসা কেবল ভোগাকাঙ্ক্ষার মধ্যেই সীমিত নয়। দুটি সত্তার ঐক্য উপলব্ধির অভিপ্রায় নিহিত থাকে এর মধ্যে। দুটি মানুষ পরস্পরের পরিপূরক হয়ে জীবনযাপন করতে চায়। প্লেটোর প্রেমতত্ত্ব বলছে, মানুষরা আগে ছিল পরস্পর সংযুক্ত, দেবরাজ জিউস তার তরবারিতে দ্বিখণ্ডিত করলেন তাদের। আর তাই নিজের বাকি আধখানাকে ফিরে পাওয়ার জন্য মানুষ অন্যকে ভালোবাসে। এর মধ্যে রূপক সত্য এই যে, মানুষ নিজের সত্তার অপূর্ণতাকে অনুভব করে এবং সেটিকে পূর্ণ করতে চায় অন্য একটি সত্তার সঙ্গে সম্মিলিত হয়ে। নর-নারীর প্রেমেই এর সাধারণ প্রকাশ। কিন্তু এখানে জাগতিক অর্থে চাওয়া-পাওয়ার ব্যাপার থাকে। পরস্পরের দেহভোগের আকাঙ্ক্ষা থাকে। পরস্পরের কাছ থেকে নানা রকম সুবিধা পাওয়ার ব্যাপার থাকে। কিন্তু এই প্রেমের জন্যই মানুষ কী না করতে পারে! পরিত্যাগ করতে পারে জাগতিক সম্পদ ও সাফল্য, যেমন অষ্টম এডওয়ার্ড করেছিলেন সাম্রাজ্যত্যাগ। এই প্রেমেরই জন্য যুবকরা হয়ে ওঠে উন্মার্গী—লায়লীর প্রেমিক কায়েস যার দৃষ্টান্ত। এই প্রেমে পড়েই যুবকেরা কবি হয়ে ওঠে আর পৃথিবীর মানুষরা তাদের হৃদয়ের কথাগুলো শুনতে পায় অমর পঙক্তিমালায়।

কিন্তু এই সাধারণ ও সঙ্কীর্ণ সম্পর্কের বাইরে রয়েছে উচ্চতর ও গভীরতর প্রেমের আদর্শ, যেখানে সীমিত ব্যক্তিসত্তা পূর্ণসত্তার সঙ্গে প্রণয়ে ব্যাকুল। জালালউদ্দিন রুমির পবিত্র ‘মসনবি’র শুরুতেই এই ব্যাকুল কান্নার কথা আছে, বাঁশির মর্মবেদনায়। আপন সত্তার অপূর্ণতা যে অনুভব করে সে খোঁজে পূর্ণতাকে। এই পূর্ণসত্তাকে মানুষ দেশ-কাল-সংস্কৃতি ভেদে নানারকম নাম দেয়। মানুষ প্রথমত ইন্দ্রিয়নির্ভর। ইন্দ্রিয় তাকে বাহ্যবস্তুর দিকেই নিবিষ্ট রাখে এবং পূর্ণসত্তাকে সেই বাহ্যিক জগতের দূরতম অধিবাসী ধরে নেয়। কিন্তু গভীর অনুধ্যান তাকে শেখায় যে পূর্ণসত্তা ব্যক্তির চেতনার গভীরেই নিহিত। অপূর্ণ সত্তার নাম দেওয়া হয় ‘জীবাত্মা’, ‘নফ্স’, ‘কাঁচা আমি’, ‘ছোট আমি’ এবং পূর্ণ সত্তার অভিধা হলো ‘পরমাত্মা’, ‘রুহ’, ‘পাকা আমি’, ‘বড় আমি’ ইত্যাদি। এই অপূর্ণ সত্তার একমাত্র বাসনা আপন সত্তার সীমা অতিক্রম করে সত্তার পূর্ণতা লাভ করা। এই পূর্ণতা লাভ করার যে প্রক্রিয়া, দেশ-কাল-সমাজ-সংস্কৃতি-দর্শন প্রভৃতির আপেক্ষিকতায় তার বিভিন্ন নাম হয়; কিন্তু মূলগতভাবে সবাই অভিন্ন দর্শনের অনুসারী। ইসলাম ধর্মের কাঠামোয় এ পদ্ধতির নাম সুফিবাদ বা ফকিরি বা তাসাউফ বা মারেফতপন্থা ইত্যাদি। এ পথচারিতার জন্য মুরশিদ বা গুরুর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরম সত্তার বাস্তব প্রতিভূ হিসেবে মুরশিদ বা গুরুর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তুলতে হয়। অহম থেকে মুক্তির জন্য এটা খুবই দরকারি। মুরশিদের সঙ্গে এই সম্পর্ক প্রেমের নতুন তাৎপর্য দেয়।

আধ্যাত্মিক সাধকরা সাধনার অংশ হিসেবে এবং/অথবা ভাবধারা প্রকাশের লক্ষ্যে গানে ও কবিতায় যেসব বাণী রচনা করেছেন, তার মধ্যে প্রেম একটি প্রধান অনুষঙ্গ। ‘চর্যাপদ’-এ এক অন্ত্যজ রমণীর উল্লেখ রয়েছে ‘ডোমনি’, ‘চণ্ডালিনী’ ইত্যাদি নামে—যদিও তা আন্তরসত্তার রূপক বর্ণনা। বৈষ্ণব পদাবলিতে রাধা ও কৃষ্ণের মিলন ও বিরহ এবং এর নানা অনুষঙ্গ বাঙালির হৃদয়ের কীর্তন। এই রাধাকৃষ্ণ জীবাত্মা বা নফ্স বা জৈবপ্রবৃত্তি এবং পরমাত্মা বা রুহ বা বিশুদ্ধ সত্তার প্রতীক। রোমান্স কাব্যগুলোতে প্রেমকাহিনীর রূপকে জীবাত্মার দিব্যাভিসারের কাহিনী আমরা পাঠ করি। পরম সত্তার প্রতি প্রণয়াকাঙ্ক্ষা মানুষকে সার্বিকভাবে মানবপ্রেমিক করে তোলে। কারণ সাধক জানেন ‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।’ এই প্রেমের বাণী আমরা শুনতে পাই কবিরের দোঁহায়, শাহ আবদুল লতিফ ভিটাইর কাব্যে, মীর তকি মীরের গজলে, মীরা বাঈয়ের ভজনে, আমির খসরুর কাওয়ালিতে। এই প্রেমের বাণী আমরা পাঠ করি জালালউদ্দিন রুমি, হাফিজ, জামি, সাদি, খৈয়ামের কাব্যে, ইকবালের দর্শনস্নিগ্ধ কবিতাবলিতে। এই প্রেমের বাণী আমরা হৃদয় মেলে শুনি রবীন্দ্রনাথ-নজরুল ইসলাম-ডি এল রায়-অতুল প্রসাদ-রজনীকান্ত সেনের অমর সঙ্গীতমালায়। এই প্রেমের বাণী আমরা শুনতে পাই ফকির লালন সাঁই ও হাছন রাজার মহৎ কালামগুলোতে। এই প্রেমে জাগতিক তুচ্ছতা থেকে আধ্যাত্মিক অপার সৌন্দর্যের হাতছানি; এই প্রেমে ব্যক্তির অহমকেন্দ্রিক ও ভোগলিপ্সু সঙ্কীর্ণ দুনিয়াদারির জীবন থেকে উদার, সর্বজনীন ও মহামানবিক দিব্য জীবনের আহ্বান—যে প্রেমের চর্যা দুনিয়াকেই স্বর্গে পরিণত করে। কবির আধ্যাত্মিক দর্শন থাকলে দেখা যায়, সাধারণ প্রেমের কবিতাতেই আধ্যাত্মিক সত্যের প্রকাশ ঘটেছে। ‘গীতবিতান’-এর ‘প্রেম’ এবং ‘পূজা’ পর্যায়ের অনেক কবিতাই স্থানান্তরযোগ্য।

আল মাহমুদ—বেদনার বিষয়—সেই ধারার কবি নন। অথচ তারই ছিল সম্ভাবনা এই ধারার সার্থক কবি হওয়ার। সেই ১৯৭৪ সালে যখন ‘গণকণ্ঠ’ নিষিদ্ধ হলো এবং এই পত্রিকার তৎকালীন সম্পাদক আল মাহমুদ—যিনি ‘সোনালী কাবিন’-এর রচয়িতা—কারাবন্দি হলেন, তিনি একদিন ‘ইসলামি কবি’ হয়ে উঠলেন। তার সঙ্গে সান্নিধ্যের কালে তাকে বলতে শুনেছি, কেউ কেউ তার নামে অপপ্রচার করে যে, তিনি পেট্রোডলার পেয়ে ভোল পাল্টেছেন; কিন্তু সত্য হচ্ছে যে, তিনি জেলে থাকা অবস্থায় পবিত্র ‘কোরআন’ পাঠ করে এর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হন। ঘটনা হচ্ছে এই যে, সে সময় থেকে আজ অবধি যেসব ধর্মভিত্তিক গোষ্ঠী ও সংগঠনের সঙ্গে তার কুটুম্বতা তাদের ইসলামের সামাজিক, রাজনৈতিক ও বাহ্যিক আচরণিক দিক নিয়েই প্রধান কায়কারবার এবং এদের কোনো কোনো অংশ উদার মানবিকতা, সহনশীলতা ও সর্বজনীনতার বিপক্ষ শক্তিও বটে। নিশ্চয়ই পছন্দের এখতিয়ার তার ছিল এবং তা আসলে তার তকদির। তবু যদি তিনি ইসলামের অন্তরে নিহিত মৌল সত্য, সৌন্দর্য ও পদ্ধতির অনুসারী হতেন, যদি তিনি সুফিবাদকে একান্তভাবে গ্রহণ করতেন, তবে হয়তো বাংলা ভাষার একজন মহৎ মর্মবাদী কবিকে আমরা পেতাম এবং তার বাণী আমাদের আধ্যাত্মিক অগ্রযাত্রায় সহযোগী কালাম হয়ে উঠত। কারণ সুফিবাদ শেখায় মানবপ্রেমই ধর্মের মৌল আচরণ, সুফিবাদ শেখায় ধৈর্য ও সহিষ্ণুতাই ধর্মের প্রধান শিক্ষা। বিশেষত, এই মৌলবাদী (ভাস্কর্যও এ দেশে ভেঙে ফেলা হয় ‘মূর্তি’ অপবাদ দিয়ে!), উগ্রবাদী (একে-ওকে-তাকে ‘মুরতাদ’ বা ‘কাফের’ ফতোয়া দিয়ে কী নৈরাজ্যিক পরিবেশ সৃষ্টি করে তারা!) ও জঙ্গিবাদী (কী ভয়ঙ্কর রক্তলোলুপ বীভৎসতা শান্তি ও আত্মসমর্পণের ধর্ম ইসলামের নামে!) অপতৎপরতার যুগে প্রেমবাদের চর্চা খুবই অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। তার ‘প্রেমের কবিতা সমগ্র’র মধ্যে নির্জনে অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকে ‘কৃষ্ণকীর্তন’ ও ‘নেকাব’-এর মতো কোনো-কোনো কবিতা এবং চমক দেয় সম্ভাবনার।

৩.
এ বইয়ে আল মাহমুদ অনূদিত কয়েকটি বিদেশি কবিতার অনুবাদও সঙ্কলিত হয়েছে। তার মধ্যে একটি হলো আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির ‘গজল’ শীর্ষক কবিতা। কবিতাটি সুন্দর। সুফি ভাবধারায় লিখিত। এটি পড়লে মনেই হবে না যে, তিনি ইরানের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী সেই রাষ্ট্রবিধাতা। এটা পড়লে মনেই হবে না যে, এর রচয়িতা তিনি, যিনি সালমান রুশদি নামের লেখক একটি উপন্যাস লেখায় তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ সৃষ্টি করেছিলেন লেখককে কেউ হত্যা করতে পারলে তাকে বিশাল অঙ্কের পারিতোষিক দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে। কোনো লেখা যদি গ্রহণযোগ্য না হয় তবে নিশ্চয়ই তার সমালোচনা করে অন্য লেখা তৈরি হতে পারে। কিন্তু কোনো লেখককে হত্যার জন্য পুরস্কার ঘোষণা কী করে একজন ‘নিরাসক্ত পীরের মোটা আলখাল্লা পরা’ লোক করতে পারে, তা বিস্ময়কর। কারণ সুফিবাদ প্রেমের, ধৈর্যের ও ক্ষমার পথ।

মুসলমানদের কোনো কোনো গোষ্ঠীর মধ্যে সহনশীলতা খুবই কম। এরা কেউ কেউ বড় পীর মহিউদ্দিন আবদুল কাদের জিলানি, হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাজ্জালি, মাওলানা জালালউদ্দিন রুমি, মহিউদ্দিন ইবনুল আরাবি এবং আহমদ রেফায়িকে ‘খামসায়ে কাফেরে আকবর’ বা ‘পাঁচজন শ্রেষ্ঠ কাফের’ বলে ফতোয়া দিয়েছিল। এরাই কেউ কেউ আল্লামা ইকবালকে কাফের ফতোয়া দিয়েছিল। এরাই কেউ কেউ কাজী নজরুল ইসলামকে কাফের ফতোয়া দিয়েছিল (ইতিহাসের কী বিদ্রুপ, আজ তারাই কেউ কেউ নজরুলকে ‘নায়েবে রসুল’ বলে থাকে)। এসব ফতোয়ার কারণে ধর্মে জমেছে ক্লেদ, সভ্যতায় লেগেছে আঘাত।

প্রসঙ্গত উল্লেখ করি, ১৯৮৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে যখন রুশদি রচিত ‘দ্য স্যাটানিক ভার্সেস’-এর বিরুদ্ধে ইমাম খোমেনির ফতোয়ার পরিপ্রেক্ষিতে সারা পৃথিবীতে ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম শুরু হয় ও দেশে দেশে নিষিদ্ধ হয় বইটি, তখন আমরা, বাংলাদেশের ২০ জন তরুণ লেখক-কবি একটি যৌথ বিবৃতি দিয়েছিলাম। যার মূল বক্তব্য ছিল এই যে, কোনো সৃজনশীল লেখককে নিষিদ্ধ করা উচিত নয় এবং তাকে হত্যা করার নির্দেশ ও উৎসাহ সভ্যতাবিরোধী। এর ফলে আমরা এ-দেশি মৌলবাদীদের রোষের মুখে পড়েছিলাম।

আজ বলতে পারি, কোনো লেখকেরও উচিত নয়, যে-ব্যক্তিকে পৃথিবীর নানা স্তরের মানুষ শ্রদ্ধা করে, ভালোবাসে, তাকে সাহিত্যকর্মে এমনভাবে উপস্থাপন করা, যা মানুষের মনে গুরুতর আঘাত করে। এটাও মানবিক সম্প্রীতির পরিপন্থী।

তারপরও জিজ্ঞাসা জাগে, এই হত্যার নির্দেশ দেওয়া তার পক্ষে কেমন করে সম্ভব যিনি লিখতে পারেন :
‘মসজিদ আর মাদ্রাসার প্রতি আমি বেজার
আমি দেহ থেকে খুলে ফেলেছি খোদাভীতি
ও লোকদেখানো ধার্মিকতার পোশাক।
এবং পরে নিয়েছি নিরাসক্ত পীরের মোটা আলখাল্লা, শালীন।
বকবাজ শহুরে মোল্লাদের উপদেশে আমি তিতিবিরক্ত।
আর সাহায্যটুকু তো মদাসক্ত মাতালের নিঃশ্বাস থেকেই আমি পেয়েছি।’

সংযোজন :

ওপরের লেখাটি তৈরি হয়েছিল ২০০৯ সালে। তারও কয়েক বছর পরে, ২০১৩ সালে, আল মাহমুদ-এর সাথে শেষবার দেখা হয়েছে ‘নতুনধারা’ সাহিত্য পত্রিকা আয়োজিত কবিতা পাঠের আসরে। বয়সের ভারে তিনি ক্লান্ত। তার সাথে করমর্দন করে বললাম, ‘মাহমুদ ভাই, আমি সৈয়দ তারিক।’ তিনি যেন কোনো সুদূর কালের অন্তর হতে ধীর স্বরে বললেন, ‘অনেক আগে সৈয়দ তারিককে আমি চিনতাম।’

এর কয়েক বছর পর তিনি পার্থিবতা ঘোচালেন। একদিকে কবিতায় ও গল্পে তার অসাধারণ অবদান অন্যদিকে তার রাজনৈতিক অবস্থান ও প্রবণতা তাকে একটি বিচিত্র গ্রহণ-বর্জনে রেখেছিল, রেখেছে এখনো। তবে, সন্দেহ নাই, তার কাব্যকীর্তিই নাক্ষত্রিক দ্যুতি ছড়িয়ে বহাল থাকবে।

আমার ইচ্ছা করে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তার সমাধির পাশে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে আসি।

আপনার মতামত লিখুন :

জহির রায়হান : দেশপ্রেমিক ও সমাজ-সচেতন এক শিল্পী-প্রতিকৃতি

জহির রায়হান : দেশপ্রেমিক ও সমাজ-সচেতন এক শিল্পী-প্রতিকৃতি
অসাধারণ চলচ্চিত্র ও শৈল্পিক সাহিত্যকর্মের স্রষ্টা হিসেবে আজও স্মরণীয় জহির রায়হান

মাত্র ৩৬ বছর বয়সের জীবনেই জহির রায়হান নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে গিয়েছেন বাংলাদেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী একজন কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্র-পরিচালক হিসেবে। প্রচণ্ড বক্তব্যধর্মী ও জীবনমুখী তাঁর চলচ্চিত্রগুলো নান্দনিকতা ও কৌশলগত মানের দিক থেকে এখনো স্মরণীয় হয়ে টিকে আছে। অনুপ্রাণিত করছে বর্তমান ও ভবিষ্যতের চলচ্চিত্রকারদের। তেমনি মাত্র আটটি উপন্যাস লিখেই তিনি বাংলা সাহিত্যের একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লেখক হওয়ার মর্যাদা লাভ করেছেন। ‘হাজার বছর ধরে’ দেশের সাহিত্য ও চলচ্চিত্রাঙ্গনে তাঁর পথ চলার কথা থাকলেও, ১৯৭২ সালে নিরুদ্দেশের ‘বরফ গলা নদীতে’ হারিয়ে যাওয়ার পর ফিরে আসেননি আর। আজ এই বহুপ্রজ বিরল প্রতিভার ৮৪তম জন্মদিন।

জহির রায়হানের প্রকৃত নাম মোহাম্মদ জহিরুল্লাহ। জন্ম ১৯৩৫ সালের ১৯ আগস্ট ফেনীর মজুপুর গ্রামে। জহির রায়হান তাঁর সাহিত্যিক নাম। এ নামেই তিনি সুপরিচিত। তাঁর শৈশব কেটেছে কলকাতায়। দেশ বিভাগের পর ঢাকায় আসেন। ১৯৫৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সাথে বাংলায় এমএ করেন জহির। ছাত্রাবস্থায়ই তাঁর সাহিত্যিক ও সাংবাদিক জীবন শুরু হয়। ১৯৫০ সালে তিনি যুগের আলো পত্রিকায় সাংবাদিক হিসেবে কাজ করা শুরু করেন। পরবর্তীকালে তিনি খাপছাড়া, যান্ত্রিক, সিনেমা ইত্যাদি পত্রিকাতেও কাজ করেন। ১৯৫৬ সালে তিনি সম্পাদক হিসেবে প্রবাহ পত্রিকায় যোগ দেন। এই সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতাই হয়তো তাঁর ভেতরে আরো শক্তভাবে গেঁড়ে দেয় লেখক হওয়ার বুনিয়াদ।

১৯৫৫ সালে তার প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘সূর্যগ্রহণ’ প্রকাশিত হয়। কিন্তু, তিনি যে ছিলেন একজন বহুমাত্রিক মানুষ। চলচ্চিত্রের প্রতি ছিল তাঁর মনের ভেতরে গভীর ভালোবাসা। তাই, চলে আসলেন চলচ্চিত্রাঙ্গনে। চলচ্চিত্র জগতে তার পদার্পণ ঘটে ১৯৫৭ সালে, ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ ছবিতে সহকারী হিসেবে কাজ করার মাধ্যমে। সহকারী হিসেবে আরো কাজ করেন সালাউদ্দীনের ছবি—‘যে নদী মরুপথে’-তেও। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক এহতেশাম তাকে ‘এ দেশ তোমার আমার’-এ কাজ করার আমন্ত্রণ জানান; এ ছবির নামসংগীত রচনা জহির রায়হানের হাতেই।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/19/1566207266898.jpg

◤ ‘বেহুলা’ সিনেমার সেটে নির্দেশনা দিচ্ছেন জহির ◢


সহকারী পরিচালক হিসেবে সফলভাবে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁকে পরিচালক হিসেবে কাজ করার প্রয়োজনীয় আত্মবিশ্বাস দিয়েছিল। ১৯৬১ সালে তিনি রুপালি জগতে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন ‘কখনো আসেনি’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। ১৯৬৪ সালে তিনি পাকিস্তানের প্রথম রঙিন চলচ্চিত্র ‘সঙ্গম’ নির্মাণ করেন। এটি অবশ্য ছিল উর্দু ভাষার চলচ্চিত্র। পরের বছর মুক্তি পায় তার প্রথম সিনেমাস্কোপ চলচ্চিত্র ‘বাহানা’। এরপর ১৯৬৬ সালে ‘বেহুলা’, ১৯৬৭-তে ‘আনোয়ারা’, ১৯৭০-এ ‘জীবন থেকে নেওয়া’, ‘টাকা আনা পাই’, ‘লেট দেয়ার বি লাইট’-এর মতো চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। 

চলচ্চিত্র নির্মাণের পাশাপাশি, সাহিত্যিক হিসেবেও তাঁর কলম সচল ছিল মুক্তিযুদ্ধের আগ পর্যন্ত। অনেক কালজয়ী উপন্যাস তিনি উপহার দিয়েছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে : ‘বরফ গলা নদী’, ‘আর কত দিন’, ‘শেষ বিকেলের মেয়ে’, ‘হাজার বছর ধরে’, ‘আরেক ফাল্গুন’, ‘কয়েকটি মৃত্যু’, ‘তৃষ্ণা’, ‘সূর্যগ্রহণ’ ইত্যাদি। সংগ্রামমুখর নাগরিক জীবন, আবহমান বাংলার জনজীবন, মধ্যবিত্তের আশা-আকাঙ্ক্ষা-বেদনা প্রভৃতি তাঁর রচনায় শিল্পরূপ পেয়েছে। সাহিত্যকৃতীর স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে আদমজী সাহিত্য পুরস্কার, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (মরণোত্তর) দেওয়া হয়।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/19/1566207304659.jpg
◤ প্রথম স্ত্রী সুমিতা দেবীর সাথে জহির রায়হান ◢


ব্যক্তিজীবনে দুবার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন জহির রায়হান। তার প্রথম স্ত্রী ছিলেন চিত্রনায়িকা সুমিতা দেবী। ১৯৬১ সালে বিয়ে করেন তারা। প্রথম পরিবারে অনল রায়হান এবং বিপুল রায়হান নামে দুই পুত্র সন্তানের জন্ম হয়।

সুমিতা দেবীর সাথে বিচ্ছেদের পর ১৯৬৮ সালে আরেক জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা সুচন্দার সাথে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন তিনি। দ্বিতীয় পরিবারে রয়েছেন তার দুই সন্তান অপু ও তপু। তার বড় ভাই প্রয়াত লেখক শহীদুল্লা কায়সার। তিনি লেখক ও রাজনীতিক পান্না কায়সারের স্বামী এবং জনপ্রিয় অভিনেত্রী শমী কায়সারের বাবা।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/19/1566207352881.jpg

◤ জহির রায়হানের আলোচিত, নন্দিত ও প্রভাবশালী চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেয়া’র পোস্টার ◢


শুধুমাত্র কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্রকার হিসেবে জহির রায়হানকে দেখলে সবটুকু যেন বলা হয় না তাঁর ব্যাপারে। একজন সমাজ ও রাজনীতি সচেতন শিল্পী ছিলেন তিনি। নিজেও স্বশরীরে অংশ নিয়েছেন দেশ মাতৃকার বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে। ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন জহির রায়হান। উপস্থিত ছিলেন একুশে ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক আমতলা সমাবেশে। এসময় তাকে পুলিশ ধরে নিয়ে জেলে পুরে দেয়। এই জেলে বসেই তিনি ভাষা আন্দোলন নিয়ে তাঁর কালজয়ী উপন্যাস ‘আরেক ফাল্গুন’ রচনা করেন। ভাষা আন্দোলন তার ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল, যার ছাপ দেখতে পাওয়া যায় তার বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেওয়া’–তে। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেন তিনি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি কলকাতায় চলে যান এবং সেখানে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে প্রচারাভিযান ও তথ্যচিত্র নির্মাণ শুরু করেন। কলকাতায় তার নির্মিত চলচ্চিত্র জীবন থেকে নেওয়ার বেশ কয়েকটি প্রদর্শনী হয় এবং চলচ্চিত্রটি দেখে ভূয়সী প্রশংসা করেন সত্যজিত রায়, মৃণাল সেন, তপন সিনহা এবং ঋত্বিক ঘটক প্রমুখ খ্যাতিমান চলচ্চিত্রকাররা। সে সময়ে তিনি চরম আর্থিক দৈন্যের মধ্যে থাকা সত্ত্বেও তার চলচ্চিত্র প্রদর্শনী হতে প্রাপ্ত সমুদয় অর্থ তিনি মুক্তিযোদ্ধা তহবিলে দান করে দেন।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/19/1566207399680.jpg
◤ প্রামাণ্যচিত্র ‘স্টপ জেনোসাইড’, যা মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে জনমত তৈরিতে রাখে দারুণ ভূমিকা ◢


মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানিদের গণহত্যা ও বুদ্ধিজীবী নিধনের এক অসাধারণ প্রামাণ্য দলিল ‘স্টপ জেনোসাইড’ তৈরি করেন জহির রায়হান। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ভারতে আশ্রয়গ্রহণকারী বাঙালিদের দুঃখ-দুর্দশা, হানাদার পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ, ভারতে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের দিনকাল প্রভৃতি এই তথ্যচিত্রে তুলে ধরা হয়েছিল। এর প্রথম প্রদর্শনী হয় এক অজ্ঞাত স্থানে, যেখানে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ, মুজিবনগর সরকারের মন্ত্রীপরিষদের সদস্যবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য বিশ্বব্যাপী জনমত তৈরি করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রেখেছিল ‘স্টপ জেনোসাইড’। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে এখন পর্যন্ত নির্মিত ছবিগুলোর মধ্যে শিল্পগত ও গুণগত সাফল্যের দিক থেকে শীর্ষে স্থান দেওয়া হয়ে থাকে এই চলচ্চিত্রটিকে।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর জহির রায়হান ঢাকায় ফেরেন। ফিরে জানতে পারেন, মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে পাক হানাদার বাহিনীর দোসর রাজাকার আল বদর বাহিনী তার বড় ভাই প্রখ্যাত লেখক শহীদুল্লাহ কায়সারকে অপহরণ করেছে। নিখোঁজ ভাইকে হন্যে হয়ে খুঁজতে শুরু করেন জহির। ১৯৭২ সালের ২৮ জানুয়ারি সকালে এক রহস্যময় ব্যক্তি তাকে ফোন করে জানান, তার ভাইকে মিরপুর ১২ নাম্বারে একটি হাউজিং সেক্টরে আটকে রাখা হয়েছে। একথা শুনেই তিনি ভাইয়ের খোঁজে মিরপুর যান এবং আর ফিরে আসেননি।

জহির রায়হানের নিখোঁজ হওয়া নিয়ে অনেক ধরনের থিওরি রয়েছে। এমন বলা হয় যে, তিনি একটি সার্চ পার্টি নিয়ে মিরপুরের উদ্দেশে যাত্রা করেন। সেখানে পাক হানাদার বাহিনীর কিছু সদস্য ছদ্মবেশে ছিল। তারা তাকে লুকিয়ে আটক করে হত্যা ও গুম করে ফেলে। তার ছোট ভাই হাবীবের ভাষ্যমতে, তিনি জহির রায়হানকে মিরপুর পুলিশ স্টেশনে নামিয়ে দিয়ে এসেছিলেন। এরপর আর তার দেখা পাননি। এমন খবরও শোনা যায়, মিরপুর পুলিশ স্টেশন থেকে জহির রায়হানকে জানানো হয়েছিল, মিরপুর ১২ নাম্বারে কিছু পাকিস্তানি সৈন্য ও রাজাকার ছদ্মবেশে লুকিয়ে আছে। সেখানে না গিয়ে আগে তাকে কল ট্রেস করার পরামর্শ দেওয়া হয়। এরপর তিনি নাকি ক্ষুব্ধ হয়ে পুলিশ স্টেশন থেকে বেরিয়ে যান। আর তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/19/1566207448145.jpg

◤ ১৯৭২-এর পর ‘আরেক ফাল্গুন’ হয়তো ‘কখনো আসেনি’ তবে দেশ ও সমাজ-সচেতন শিল্পীদের এগিয়ে যাওয়ার বড় প্রেরণা তিনিই ◢


এ ব্যাপারে বিভিন্ন সময় আরো অনেক গুজব ছড়িয়েছে। এগুলোর কোনটি সত্য, কোনটি মিথ্যা, তা যাচাই করা মুশকিল। তাঁর মৃতদেহও কখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাই নিশ্চিত হওয়া যায়নি কিভাবে মারা গিয়েছেন তিনি। ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি তার মৃত্যুদিন হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

স্বাধীনতার ঠিক পরপর, সেই ৭২ সালেই জহির রায়হান চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেলেও তাঁর অসাধারণ, শৈল্পিক ও নান্দনিক সাহিত্যকর্ম ও চলচ্চিত্রের জন্য জাতি ঠিকই তাকে স্বরণে রেখেছে। চলচ্চিত্রে অবদানের জন্য কয়েক বছর পর, ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে প্রদান করে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার একুশে পদক (মরণোত্তর)। ১৯৯২ সালে প্রদান করে সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা স্বাধীনতা পুরস্কার। আজও তাঁর সাহিত্যকর্ম ও চলচ্চিত্রগুলো টিকে আছে অমূল্য সম্পদ হয়ে। ১৯৭২-এর পর ‘আরেক ফাল্গুন’ হয়তো ‘কখনো আসেনি’ জহির রায়হানের জীবনে; তবে দেশ ও সমাজ সচেতন শিল্পীদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার বড় প্রেরণা তিনিই। এই ক্ষণজন্মা প্রতিভার জন্মদিনে তাঁর প্রতি সশ্রদ্ধ সালাম!

রেমব্রান্ট ও ভারমিয়ার : সপ্তদশ শতকের দুই ডাচ শিল্পী

রেমব্রান্ট ও ভারমিয়ার : সপ্তদশ শতকের দুই ডাচ শিল্পী
ইউহানেস ভারমিয়ার┇রেমব্রান্ট

রেমব্রান্ট
১৬০৬-১৬৬৯

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566114164805.jpg
◤ রেমব্রান্ট ◢


ছবি আঁকা শিখতে হলে কাকে গুরু মানবেন? রেমব্রান্ট বলেছেন, কেবল একমাত্র গুরু—প্রকৃতি। তিনি আরো বলেছেন পেইন্টিং হচ্ছে প্রকৃতির দৌহিত্র, এর সাথে ঈশ্বরের সম্পর্ক। কিংবা একটি পেইন্টিংকে তখনই সমাপ্ত বলা হয়েছে যখন এর ওপর ঈশ্বরের ছায়া পড়ে।

চিত্র-সমালোচকদের জন্য রেমব্রান্ট বলেছেন, পেইন্টিং নাকে শুকবার জন্য নয়। নতুন শিল্পীদের জন্য তাঁর কথা : যা জানো তার চর্চা করতে থাকো, এটাই তোমার কাছে স্পষ্ট করে দেবে তুমি কী জানো না। যে সব বড় শিল্পীর সাথে এক নিঃশ্বাসে রেমব্রান্টের নাম উচ্চারিত হয় তারা ইতালির। রেমব্রেন্ট ডাচ; হল্যান্ডের মানুষ।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566114291988.jpg

◤ মিনার্ভা ◢


 ১৬০৬ : জন্ম ১৫ জুলাই, লেইডেনে। বাবামার দশ সন্তানের অষ্টম। পুরো নাম রেমব্রান্ট হার্মেনসুন ভ্যান রিইন।
১৬১৩ : ল্যাটিন স্কুলে ভর্তি।
১৬২০ : ১৪তম জন্মদিনের ২ মাস আগে লেইডেন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, তখনও ল্যাটিন স্কুলের পাঠ অব্যাহত।
১৬২৪ : ইতিহাস, অলঙ্কার-শাস্ত্র অধ্যয়ন।
১৬২৫ : লেইডেনে নিজস্ব স্টুডিও স্থাপন, দ্য স্টোনিং অব স্টেপেন অঙ্কন
১৬২৯ : প্রথম আত্মপ্রতিকৃতি অঙ্কন।
১৬৩৪ : সাস্কিয়া উইলেনবার্গকে বিয়ে।
১৬৪২ : সাস্কিয়ার মৃত্যু, শিশুপুত্র টাইটাসের জন্য গির্জে ডির্কসকে আয়া নিয়োগ; নাইট ওয়াচ অঙ্কন।
১৬৪৭-১৬৫০ : ডির্কসের সাথে শারীরিক সম্পর্ক, বিরোধ, সাস্কিয়ার অলঙ্কার বন্ধক দেওয়ার কারণে রেমব্রান্টের চেষ্টায় তাকে সংশোধনাগারে প্রেরণ।
১৬৫৪ : নতুন হাউসমেইড হেন্ডরিক স্টোফেলস-এর সাথে সম্পর্ক, কন্যা সন্তান কর্নেলিয়ার জন্ম, বাথশেইবা অ্যাট হার বাথ অঙ্কন।
১৬৫৬ : দেওলিয়া ঘোষণা, ক্রোক পরোয়ানা জারি।
১৬৫৮ : বাড়ি বেচে ভাড়া বাড়িতে গমন।
১৬৬৯ : মৃত্যু ২ নভেম্বর। ওয়েস্টরকার্ক সিমেট্রিতে ভাড়া করা অজানা কবরে সমাহিত। 」

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566114473772.jpg

◤ আব্রহাম’স স্যাক্রিফাইস ◢


চিত্রশিল্পের ইতিহাসের দিকে যাদের নজর তারা খুব ভালোভাবেই জানেন সপ্তদশ শতকের ‘ডাচ গোল্ডেন এজ’-এর স্রষ্টাদের নাম বলতে শুরু করলেই রেমব্রান্টের নাম এসে যায় এবং প্রায় সকলে সেই সোনালি যুগে আঁকা নাইট ওয়াচ চিত্রটির উদাহরণ দেন। অথচ এ ছবিটির জন্য তিনি লাঞ্ছিত হয়েছেন। ছবির বিষয় রাতের প্রহরা, অর্থের বিনিময়ে যাদের জন্য এটি আঁকতে তিনি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন তারা কেউই রেমব্রান্টের কাজটি পছন্দ করেননি।

এই ছবিতে আলো পড়েছে ঠিক মাঝখানে, দুজন অফিসারের উপর আর বর্ষাধারী রক্ষীরা সব আঁধারে অস্পষ্ট। ফরমায়েশটা তাদেরই, অথচ তাদের ভালো করে দেখা যাবে না আর তারা চাঁদা তুলে শিল্পীর টাকা দেবে এটা তো হতে পারে না। খুব বদনাম হলো শিল্পীর। ছবি আঁকার ফরমায়েশ পাওয়া মারাত্মক হ্রাস পেল। স্বচ্ছল পরিবার থেকে আসা একটু বেহিসেবি গোছের এই শিল্পী দেওলিয়া হয়ে গেলেন, বাড়ি বিক্রি করলেন, পারিবারিক অশান্তিও তাঁকে ছাড়ল না। সেই নাইট ওয়াচ-এর দাম এখন কত মিলিয়ন ডলার হতে তা গবেষণার বিষয়।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566114622015.jpg
◤ দ্য নাইট ওয়াচ ◢


রেমব্রান্টের স্মরণীয় উক্তি : ওরা আমাকে নিয়ে যেভাবে ছবি আঁকাতে চায় আমি সেভাবে আঁকতে পারি না, এটা ওরাও জানে।

শিল্পীদের বিশ্বাস নেই
রেমব্রান্ট জেনোয়া থেকে দুটি ছবির ফরমায়েশ পেয়েছিলেন, একটি বাণিজ্যিক জাহাজের ক্যাপ্টেন ভিভিয়ানো দরদাম এবং সরবরাহের তারিখ ঠিক করেন। তিনি এসে দেখেন কাজ শেষ হয়নি, অধিকন্তু শিল্পী বেশি দাম হাঁকছেন। ক্যাপ্টেন পোর্ট অব আমস্টার্ডাম থেকে ক্রেতাকে লিখলেন : কাজের গতি অত্যন্ত মন্থর, শিল্পীরা সাধারণত তাই করে থাকে, তাছাড়া এই লোকটির বিশ্বাস নেই। এখন দুটি ছবির জন্য ৩০০০ গিল্ডার চাইছেন, অথচ আমার সাথে দর ঠিক হয়েছিল ১২০০ ডলার। তার উপর ভরসা রাখা যায় না।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566114664684.jpg

◤ বাথশেইবা অ্যাট হার বাথ ◢


রেমব্রান্টের ছবির ওপর চোরের নজর, গবেষকেরও
১৬৩০-এ আঁকা রেমব্রান্টের বাবার পোর্টেট—‘পোর্ট্রেট অব দ্য ফাদার’ ২০০৬ সালে জাদুঘর থেকে চুরি হয়; সাত বছর পর সার্বিয়ার একটি গির্জায় ৪ মিলিয়ন ডলার মূল্যের ছবিটি উদ্ধার করা হয়। এর আগে একবার চুরি হয়েছিল, ১৯৯৬ সালে, উদ্ধার হয় স্পেনে।

রেমব্রান্টের মাস্টারপিস ‘ওল্ডম্যান ইন মিলিটারি কস্টিউম’ ছবিটির ওপর ইনফ্রারেড আলো, নিউট্রন ও এক্স-রে প্রয়োগ করে গবেষণা ২০১৩ সালে নিশ্চিত হয়েছে অন্য একটি ছবি রঙ দিয়ে ঢেকে রেমব্রান্ট এটি এঁকেছেন। নিচের ছবিটিও উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566114702139.jpg

◤ দ্য অ্যানাটমি লেসন অব ডক্টর নিকোলাস টাল্প ◢


বার্ধক্য ও যৌবন
রেমব্রান্ট ৬৩ বছর বেঁচে ছিলেন। বার্ধক্যের সঙ্কট তিনি মোকাবেলা করেছেন, তবুও বলেছেন : বার্ধক্য সৃজনশীলতার অন্তরায় কিন্তু বার্ধক্য আমার যৌবন-স্পৃহাকে দমিয়ে রাখতে পারে না।

কয়েকটি সেরা ছবি : সেল্ফ পোর্ট্রেট সিরিজ, দ্য নাইট ওয়াচ, দ্য রিটার্ন অব দ্য প্রডিগাল সান, দ্য অ্যানাটমি লেসন অব ডক্টর নিকোলাস টাল্প, দ্য জুইশ ব্রাইড, দ্য স্টর্ম অব দ্য সি অব গ্যালিলি, মিনার্ভা, আব্রহাম’স স্যাক্রিফাইস, বেলথাজার্স ফিস্ট, ডায়ানা, ফিলোসোফার ইন মেডিটেশন, বাথশেইবা অ্যাট হার বাথ, দ্য ব্লাইডিং অব স্যামসন, দ্য কন্সপিরেসি অব ক্লডিয়াস সিভিল, লুক্রেশিয়া।

 ✨

ইউহানেস ভারমিয়ার
১৬৩২-১৬৭৫

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566114784531.jpg
◤ ইউহানেস ভারমিয়ার ◢


‘যে প্রভাতে পৃথিবী সৃষ্টি হয়, তখন ঈশ্বরের সামনে নিশ্চয়ই ভারমিয়ারের শিল্পকর্মগুলো ছিল’—ফ্রেডেরিক সোমার এভাবেই শ্রদ্ধা জানিয়েছেন ডাচ চিত্রশিল্পের স্বর্ণযুগের শিল্পী ইউহানেস ভারমিয়ারকে। অথচ এই শিল্পীর কাজের খবর তাঁর জীবদ্দশায় নিজ শহর ডেলফট-এর বাইরে কোথাও পৌঁছেনি। তিনি ইয়ান বা ইউহান ভারমিয়ার নামেও পরিচিত। তাঁর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কিংবা কোনো শিল্পগুরুর কাছে শিক্ষালাভ করার সুযোগ হয়নি, তিনি নিজেও কোনো স্কুল খোলেননি বা নিজ হাতে অনুগত আঁকিয়ে শিষ্যও তৈরি করেননি। অন্যদিকে তাঁর ছবিগুলো কেবল একজন ক্রেতাই নিজ সংগ্রহে রাখায় শিল্প-সমঝদারদের অন্য কেউ তাঁর সম্পর্কে জানতেও পারেননি।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566114892303.jpg

◤ গার্ল উইথ অ্যা ইয়ার রিং ◢


১৬৩২ : অক্টোবরে জন্ম, ৩১ অক্টোবর ব্যাপটাইজড।
১৬৫২ : বাবার মৃত্যু।
১৬৫৩ : ক্যাথরিনা বোলনেসকে বিয়ে এপ্রিলে; বিয়ের আগে ক্যাথলিক চার্চে দীক্ষা গ্রহণ; চিত্রশিল্পী সংসদে যোগদান।
১৬৫৭ : পিটার ভ্যান রুভেন নামক একজন প্যাট্রন লাভ।
১৬৬১ : পেইন্টার্স গিল্ডের সভাপতি নির্বাচিত ; ১৬৬৩ ১৬৭০, ১৬৭১-এ পুনর্নির্বাচিত।
১৬৭২ : কিছু ইতালীয় চিত্রকলার যথার্থতা সনাক্ত করতে হেগ গমন।
১৬৭৫ : আর্থিক দুরবস্থা কাটাতে ১০০০ গিল্ডার ধার গ্রহণ, সে বছরই মৃত্যু। ১৫ ডিসেম্বর ওল্ড চার্চে সমাহিত। 」

গার্ল উইথ এ পার্ল ইয়াররিং
গার্ল উইথ এ পার্ল ইয়াররিং-কানে মুক্তোর দুল পরিহিত এ ছবিটি ভারমিয়ারের সবচেয়ে বিখ্যাত কাজ। সপ্তদশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এই ছবিকে বলা হয় ‘দ্য মোনালিসা অব দ্য নর্থ’ কিংবা ‘ডাচ মোনালিসা’। কারো ফরমায়েশে তিনি এ ছবিটি এঁকেছেন বা নিজস্ব কোনো নারীকে চিত্রায়িত করেছেন তা নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি।

১৮৮১ সালে হেগে অনুষ্ঠিত একটি নিলামে মাত্র দুই গিল্ডার ৩০ সেন্টে ছবিটি বিক্রি হয়ে যায়। ক্রেতার কোনো উত্তরাধিকার না থাকায় শেষ পর্যন্ত আজকের এ বিশ্বখ্যাত ছবিটি ১৯০২ সালে মরিতসুইস জাদুঘরে দান করে দেওয়া হয়।

ট্র্যাসি ক্যাভেনিয়র এ ছবিটিকে নিয়ে একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস রচনা করেন গার্ল উইথ এ পার্ল ইয়াররিং (১৯৯৯) নামে। ২০০৩ সালে চলচ্চিত্রায়িত হলে তা গোল্ডেন গ্লোব অ্যাওয়ার্ড লাভ করে।

গার্ল উইথ এ রেড হ্যাট-লাল টুপি পরা এই মেয়েটিও এখন শিল্পরসিকদের কাছে পরিচিত মুখ। ভারমিয়ারের ছোট আকৃতির তেলচিত্রগুলোর একটি হয়ে ওঠে এই লাল টুপির মেয়ে। উনবিংশ শতকেই অল্প কটি ছবির শিল্পী হলেও ভারমিয়ারের প্রভাব নবীন শিল্পীদের ওপর পড়তে শুরু করে।

সালভাদর দালি ভারমিয়ারের দ্য লেসমেকার নিজের মতো করে এঁকেছেন। দালির ১৯৩৪ সালের একটি অমর কাজ-‘ভারমিয়ারের প্রেতাত্মা, যা টেবিল হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।’

অঙ্কনই জীবনের ব্রত
অর্থনৈতিক মন্দা, মহামারি প্লেগ এবং ছবি আঁকার পেছনে ব্যয়—পনের সন্তানের জনক ভারমিয়ারের জীবনকে বিপন্ন করে তোলে। তারপরও তিনি সেকালের সবচেয়ে দামি রঙ কিনে ছবি আঁকতেন। দারিদ্র্য জর্জরিত অবস্থায় মাত্র তেতাল্লিশ বছর বয়সে মৃত্যু, তবুও তিনি বিস্মৃত হয়ে গেলেন। তাঁর শাশুড়ির বাড়িতে দুটি কক্ষে ছবিগুলো পড়ে থাকে। গুস্তাভ ফ্লেডরিখ ভাগান ও থিওফাইল থোর-বার্জার তাঁকে পুনরাবিষ্কার করেন এবং ৬৬টি ছবি সনাক্ত করেন। তবে এর মধ্যে ৩৪টি ছবি নিয়ে সার্বজনীন সম্মতি রয়েছে যে এগুলো তাঁরই।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566114986807.jpg

◤ দ্য মিল্কমেইড ◢


২০০ বছর পর
তখনকার চিত্রশিল্পের ইতিহাসে তিনি প্রায় সম্পূর্ণভাবে অনুল্লিখিত ও উপেক্ষিত রয়ে যান। মৃত্যুর ২০০ বছর পর ভারমিয়ারের পুনর্জাগরণ ঘটে এবং শিল্পবোদ্ধারা স্বীকার করেন তিনি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শিল্পীদের একজন। গুস্তাফ ফ্রেডরিখ ভাগান এবং থিউফাইল থোরে-বার্জার পুনরাবিষ্কৃত ভারমিয়ারের ওপর প্রবন্ধ রচনা করেন। তখন থেকেই ভারমিয়ার পুনর্মূল্যায়িত হতে শুরু করেন এবং কার্যত তাঁর পুনর্জাগরণ ঘটে। তিনি হয়ে ওঠেন ডাচ স্বর্ণযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিত্রশিল্পী।

তাঁর প্রায় সব ছবিই ক্যানভাসে তৈল রঙ। অত্যন্ত দামি ল্যাপিস লাজুলাই, প্রাকৃতিক আলট্রামেরিন এবং অ্যম্বর রঙ ব্যবহার করতেন। সপ্তদশ শতকের কোনো শিল্পী রঙের পেছনে এত ব্যয় করতেন না, তাঁর দারিদ্র্যের সাথে এটা মেলানো যায় না। রঙের ঔজ্জ্বল্য তাঁর ছবি চিনিয়ে দেয়।

লক্ষীমন্ত নারী ক্যাথরিনা বোলনেসকে বিয়ে করেন। তাদের চৌদ্দটি সন্তানের মধ্যে দশজন বেঁচে থাকে। আর্থিক সংকটের কারণে ক্যাথরিনা স্বামী ও সন্তানদের নিয়ে তার মায়ের বাড়ি ওঠেন। সে বাড়িরই দোতলার সামনের একটি কক্ষ হয়ে ওঠে ভারমিয়ারের স্টুডিও। সেই বাড়ির একেবারে গা ঘেঁষা একটি চার্চও ছিল, তাঁর ল্যান্ডস্কেপে চার্চের উপস্থিতি দেখা যায়। ভারমিয়ারের কেবল তিনটি ছবিতে অঙ্কনের সময়কাল লেখা হয়েছে : দ্য প্রোকিউরেস (১৬৫৮), দ্য অ্যাস্ট্রোনোমার (১৬৮৮) এবং দ্য জিওগ্রাফার (১৬৬৯)।

দারিদ্র্যের ভার
দারিদ্র্য ঘোচাতে তিনি রাতভর সরাইখানাও চালিয়েছেন, কিন্তু দারিদ্র্য ঘোচেনি। সন্তানদের ভার ও দারিদ্র্যের চাপ তাকে নিঃশেষ করে দিয়েছে। স্ত্রী ক্যাথরিনা বলেছেন, অর্থকষ্টের চাপ সহ্য করতে না পেরে মাত্র দেড় দিনের প্রচণ্ড উন্মত্ত আচরণের পর তাঁর স্বামী মৃত্যুবরণ করেছেন। সে সময় ক্যাথরিনা ও তাঁর মায়ের দখলে এসে যায় তার ১৯টি ছবি। এর মধ্যে দুটো ছবি বিক্রি করে ঋণ শোধ করা হয়।

‘ভারমিয়ারের মতো আর কেউ নেই’—জোনাথান রিচম্যানের এই গানটি সংগীত প্রেমিকদের কাছে একজন চিত্রশিল্পীকে পৌঁছে দিয়েছে। ট্রান্সট্রোমারের কবিতাও ভারমিয়ারকে নতুন করে চিনিয়েছে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566115170809.jpg

◤ গার্ল উইথ অ্যা রেড হ্যাট ◢


কয়েকটি সেরা ছবি : ডিউ ফ্রম ডেলফ্ট, দ্য ক্যাপটিভ, গার্ল উইথ অ্যা ইয়ার রিং, গার্ল ইন অ্যান্টিক কস্টিউম, গার্ল উইথ অ্যা রেড হ্যাট, দ্য গিটার প্লেয়ার, ওমেন রিডিং, অ্যা লেটার, ডায়ানা অ্যান্ড হার নিম্ফস, ইয়াং ওমেন উইথ অ্যা পিচার, দ্য লাভ লেটার, দ্য মিল্কমেইড।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র