ঘুরেফিরে আমি কিছুটা ভারসাম্যহীন

আন্নি
অলঙ্করণ কাব্য কারিম

অলঙ্করণ কাব্য কারিম

  • Font increase
  • Font Decrease

মৃত্যু—আরেক বেঁচে থাকা

শহরের মৃত্যুগুলো শুধু শ্বাসনালীর কেবলই থেমে যাওয়া
হাহাকার, শবযাত্রা, দাফন কেবলই প্রক্রিয়া।
যেন ব্রাশ, গোসল সেরে আয়রন করা জামা চাপিয়ে অফিস যাচ্ছি
কাকেদেরও কোনো আগ্রহ নেই মৃতের দিকে।
তাই যখন শুনি অমুক ভাই, তমুক চাচার মৃত্যু খবর
দুঃখ যেন মাত্র সিগন্যাল ছেড়ে দেওয়ায়
ভিক্ষুকটিকে টাকা না দিতে পারার ব্যর্থতার মতো।
মরদেহ দেখতে যাওয়ার বরং প্রস্তুতি আছে
বড় জামা, ওড়না, লিপিস্টিক না দিয়ে বরং হালকা কোনো লিপবাম।
ওয়েল ফার্নিশড রুমটাতে লাশটা বড়ই বেমানান
গ্যারেজে রাখলেও পারত, অবশ্য তাতে গরমে কান্নাকাটি
আবার হালকা রঙের জামা ভিজে বিশ্রি এক অবস্থা।
সোফার এক কোনায় মৃতের বিড়ালটিকে অবশ্য দেখা যায়
শোকটা সেখানে স্পষ্ট কিনা তা বোঝা যাচ্ছে না।
তবে গ্রামে যখন মাইকে মৃত্যুর খবর আসত
দমবন্ধ হয়ে কানগুলো খাড়া করে রাখতাম
ওখানে মৃত্যু তাদের হয় যাদের সপ্তাহে অন্তত একবার দেখা যায়
এ বাড়ির মৃতের সাদা কাপড়ের ছায়া সব বাড়িতেই কতক বিষাদ এনে দেয়।
নিজের মৃত্যু নিয়ে ভেবে কতক শোক চোখেমুখে থাকে
বাড়ি বাড়ি থেকে খাবার মৃতের ঘরে
যে বাড়িতে গতকালও সারা মাসের বাজারে ডিম, গোশত, মাছ ছিল না
মৃত্যু যেন প্রোটিনের সমারোহ ঘটিয়েছে।
বাড়ি বাড়ির কুকেরেরাও আছে একত্রে
বড় গাছের নিচে পরিবার পরিজন মিলিত হয়ে
বাচ্চাদের হুটোপুটি দেখছে, মৃত্যুর শোকের চেয়ে খিদা সেখানে স্পষ্ট।
হেঁটে কবরের কাছে গেছি, ভীষণ বুকচাপা ভয়
যেন মুহূর্তেই বড় আঁধার, আর নিজের অস্তিত্ব
সকলকে ছাপিয়ে কাদামাটির সাথে মিশে যাওয়া
কেমন ঘেন্না ধরে যায় নিজের শরীরে।
তবু দিনে বহুবার মৃত্যু চেয়ে বেড়াই শহরে, গ্রামে
মৃত্যু যেন সহনীয় সময়ে আরেক বেঁচে থাকা।

মম প্রার্থনা

অসহনীয় এক গ্রীষ্মে বড় আকুতি
হে শ্রাবণ, ধুয়ে ফেলো সকল পোড়ামুখ
ধুয়ে ফেলো হিংস্র চাহনি, অজস্র ঘৃণা
এ সারফেসে রবের বিলিবণ্টন সাঙ্গ করে
শ্রাবণ তুমি বয়ে চলো সকল হৃদয়ের গভীরে
পথের এই ধুলো তবুও থাক, না জমুক
শুধু হৃদয়ের কোটরে কোটরে
শ্রাবণ তুমি সর্বকালের বড় ঘূর্ণিঝড়
আঘাতে আঘাতে ভেদের প্রাচীর চিরে
শান্ত রক্তের প্রবাহ এনে দাও
ঢেউয়ে ঢেউয়ে ভালোবাসা বয়ে
সকল কূলে ঢলে পড়ো
শ্রাবণ, তোমার হাহাকারে জ্বলছে
বিষাদ, ক্রোধ বিম্বের প্রতি স্তরে
চারা থেকে বটতলা, ভয়ানক অস্থির মেলা
আছড়ে পড়ো শ্রাবণ তুমি
আবু তালিবের পায়ের অগ্নি জুতায়
সবুজ বনের গহীন কোঠায়
সীতার চোখের নোনা জল তুমি ধুয়ে ফেলো
ভীষণ এ তাপদাহে ভালোবাসা বাষ্প হয়ে
মেঘ জমেছে আজ সকল কোনে
ঝড় হয়ে ভেঙে ফেলো যীশুর শরীরের পেরেকগুলো
ভয়ানক শো শো শব্দ দিকে দিকে ছড়িয়ে দিয়ে
বুদ্ধের সর্ব মৌনতা ভাঙাও তুমি
তোমার প্রার্থনায় একূলে দাঁড়িয়েছি আমি
আজ তাই শ্রাবণ রূপে, নেমে আসো অন্তর্যামী।

নিঃশব্দ প্রেক্ষাপট

সরু এই গলিতে হেঁটে যাবার কালে
কিছু যদি হুট করে জানতে চাও
আমার ভাষারা শব্দহীন হয়ে যাবে
অথবা শব্দরা আওয়াজহীন হয়ে যাবে।
এত যে অস্থির বাক্যালাপ
কিছুই ফিরবে না এ সময়ে
তবে স্থির এ শরীর অস্থির হয়ে যায়।
নোনা কিছু গন্ধেরা চারপাশ থেকে
নিঃশ্বাসের সাথে বুকের ভেতর
কতগুলো কচুরিপানা বৃহৎ পরিবার নিয়ে
রক্তের নালিতে নালিতে ভ্রমণে রত।
বারবার এ প্রশ্ন, নতুন কচুরি ফুল
নিঃশ্বাসে শ্যাওলা পানির বোটকা গন্ধ আর
ঝরা পাতার সাথে এ শরীর ডোবায় আটকে যাবে।
আমি কার সাথে আগাব
প্রশ্ন নাকি নন ভার্বাল যোগাযোগের বলয় ধরে?
যেখানে সংযোগ কেবল শরীরের সাথে শরীরের
তবে প্রশ্নটাই পৃথিবীর বুকে রয়ে যাবে
তোমার পরিচয় তোমার প্রশ্নই যে।
আমার দীর্ঘ উত্তরেরা মহাশূন্যে বিলীন হয়ে
এ সন্ধ্যায় কিছু শীতল বাতাসের জন্ম দেবে
অতটুকু স্বস্তি দেবার সামর্থ্য আমার আছে।
তাই তোমার প্রশ্নেরা কূটিল বা সরল
তবুও তোমার সহিত তোমার প্রশ্ন
বহুকাল আমি বিচার বহির্ভূত করে,
কেবল একটু নোনা স্পর্শের তরে
দাফন করেছি এই সরু গলির মোড়ে।

আমার সফল ভালোবাসার ফুলেরা

কবিতারা হারিয়ে যায় যখন, তখন
আমার দৃষ্টিশক্তিরা প্রখর হয়ে যায়।
গভীর আঁধারেও আমি তখন স্মৃতিদের
চলাফেরা দেখি, প্রখর সূর্যতে দেখি
কাটানো কিছু অন্ধকার রাত।
কবিতারা বরং কিছু স্মৃতি শুষে নেয়
যেন শরীর থেকে বিষাক্ত কিছু ভাইরাস
যা মাটিতে নেমে হয়েছে সুন্দর ছত্রাক।
এই ছত্রাক আমার খাতার পাতায় পাতায়
সময়কে উলটো দিকে ঘোরায়
ঘুরেফিরে আমি কিছুটা ভারসাম্যহীন।
তবুও উত্তাল নদীর নৌকায় চড়ে বসি
সময় পাড়ি দিয়ে সময়ের খোঁজে
এই ভীষণ বদ্বীপ জুড়ে আছড়ে পড়ি।
অক্ষত থাকে শুধু কবিতা আর খাতার পাতা
যে পাতা ঘুরে সকল না পাওয়া
চিৎকার করে বেড়ায়।
মানুষের সাথে যে প্রেম তা তো কেবল সময়
রিপ্লেসমেন্টের এক প্রক্রিয়ায় সম্পর্কেরা
রিলে রেসের মতো পত্র আর পাত্র বদলায়।
প্রেম হয় কবিতার সাথে, গানের সাথে
অনবদ্য, অবিচ্ছেদ্য আর অপ্রতিরোধ্য।
প্রেম আছে আমার খাতার পাতায়
শব্দ, ছন্দ আর বাক্যের সাথে মিলিত হয়ে
আমার ভ্রুণে বেড়ে ওঠে কবিতারা
আমার সফল ভালোবাসার ফুলেরা।

আপননামা

বুক আর পিঠের ব্যথায় কাত হইয়া
জিরাফের ডিগ্রিতে বাঁকাইয়া
সমতলে মিশিয়া যাইবার কালে
ভাবনার মশাল ফুলকি মাইরা
ছোপ ছোপ মুখের দাগগুলো
ই-আয়নায় দেখবার তরে খেয়ালে
মোবাইলে কী কী জানি দেখবার
সহিত আরো কী যে দেইখা
সমতল কাঁপিয়া কাপড় থেকে শরীর খসিয়া
দরদের হিয়াবিন দেহখানি পরখে
খালি ছোপ অফ ফুলকিজে
চোখের পানিশূন্যতা অজ্ঞাত চিকিৎসার অসুখে
অল্প ভারী মদ্য কম হজম হওয়ায়
দেহরে দানকৃত পানি থেইকা
চাতকরূপ চোখের কোয়ায় জইমা
দুইটার বেশি ঢেউ হইল না
আলো উল্টাইয়া বুদ্ধি আর স্মৃতি জ্বইলা
কাজ হইল খুব অল্প কইরা
সমতল থেইকা উইঠা হেব্বি দাঁড়াইয়া
আত্মাহুতি আপনার আপনরে
অতঃপর শঠাং কিছু ব্যাপার দ্বারা মুইড়া যাইয়া
খুবই অপরিচিত অবয়ব
আত্মাহীন এক মনুষ্য বহি।

আপনার মতামত লিখুন :