নজরুল জীবনে ফরিদপুর

ড. মাহফুজ পারভেজ, কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম
বাংলাদেশ আর নজরুল যেন অবিচ্ছেদ্য সত্তা, ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশ আর নজরুল যেন অবিচ্ছেদ্য সত্তা, ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

শৈশবে বর্ধমান জেলা থেকে দারিদ্র্যের কারণে নজরুল চলে এসেছিলেন অবিভক্ত বঙ্গদেশের আরেক প্রান্তের ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশালে। জীবনের নানা পর্যায়ে তিনি চারণের মতো ভ্রমণ করেছেন বাংলাদেশের বহু অজানা জায়গা ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে। বাংলাদেশ আর নজরুল যেন অবিচ্ছেদ্য সত্ত্বা।

আত্মভোলা, খামখেয়ালী, ভাবপ্রবণ নজরুল পৌঁছে গিয়েছিলেন বাংলাদেশের প্রধান প্রধান শহর-বন্দর বাদেও নিভৃত পল্লীতে। নজরুল এঁকে দিয়েছিলেন পদচিহ্ন সন্দীপ, সীতাকুণ্ড, হাটহাজারী, রাউজানে। নজরুল বাংলাদেশের স্মৃতিতে রচনা করেছেন বহু গান ও কবিতা। 'পাহাড়ে হেলান দিয়ে আকাশ ঘুমায় ঐ' গানটি সীতাকুণ্ডের পাহাড়ে রচিত নজরুলের অবিস্মরণীয় সৃষ্টি।

ঢাকা ও কুমিল্লা নজরুলের স্মৃতি-ধন্য। তেমনি আরেকটি প্রসিদ্ধ নজরুল-স্মৃতিস্থান পদ্মা বিধৌত ঐতিহ্যবাহী ফরিদপুর।

সাংবাদিক ও গবেষক মফিজ ইমাম মিলনের তথ্যানুযায়ী, 'নজরুল প্রথম যেবার ফরিদপুর এসে কবিতা পড়লেন, সেই মঞ্চে বসা ছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, মহাত্মা গান্ধী, নেতাজি সুভাস চন্দ্র বসু, মওলানা আবুল কালাম আজাদ, সরোজিনী নাইডু প্রমুখ সর্বভারতীয় নেতৃবৃন্দ। নজরুলের স্বাদেশিক কবিতায় মুগ্ধ হয়েছিলেন জাতীয় নেতারা। সমবেত জনতা উদ্বেলিত হয়েছিল তার কবিতার আবেগ ও উচ্চারণে।'

ফরিদপুরে নজরুল
ফরিদপুরে নজরুল, ছবি: সংগৃহীত

 

ইমাম মিলন আরও উল্লেখ করেন, ১৯২৫ সালে ফরিদপুরে নজরুলের আরেকটি ঐতিহাসিক ও স্মৃতিময় ঘটনা। সে বছর ফরিদপুরে বাংলার মুসলমানদের অবিস্মরণীয় একটি উদ্যোগ রূপায়িত হয়েছিল। অল বেঙ্গল মুসলিম কংগ্রেস কনফারেন্স, অল বেঙ্গল স্টুডেন্ট কংগ্রেস কনফারেন্স এবং অল বেঙ্গল কংগ্রেস কনফারেন্স, এই তিনটি অনুষ্ঠান এক সাথে অনুষ্ঠিত হয়েছিল ফরিদপুরের টেপাখোলায়। কবি নজরুল তাঁর অবিস্মরণীয় গান ও কবিতায় মাতিয়ে রেখেছিলেন হাজার হাজার জনতাকে। চারদিকে তখন নজরুলে প্রশংসা ও জয়ধ্বনি।

উল্লেখ্য, সেদিনের আয়োজনে কবি জসীম উদ্দীন স্বেচ্ছাসেবকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। নজরুল একজন বামপন্থি নেতাসহ চারজনের একটি দল নিয়ে কবি জসীম উদ্দীনের বাড়িতেও আতিথ্য গ্রহণ করেছিলেন। তখন ফরিদপুর রেলস্টেশন নির্মিত হয়নি। অম্বিকাপুর নেমে পায়ে হেঁটে পল্লীকবির বাড়ি যেতে হয়েছিল নজরুলের নেতৃত্বে আগত দলটিকে। সেখানে অবস্থানকালে নজরুল অভ্যাস মতো চা এবং পানের বায়না ধরলে গ্রামবাসীকে বেশ বিপাকেই পড়তে হয়। পান-সুপারি সহজলভ্য হলেও তৎকালের পশ্চাৎপদ গ্রামবাংলায় চা নামের পানীয়টি তখনও বলতে গেলে মানুষের কাছে অচেনাই ছিল। বেশ কষ্ট করে সে সময় নজরুলের চা তেষ্টা মেটাতে হয়েছিল।

ফরিদপুরে কবি নজরুলের নানা স্মৃতিময় ঘটনা গবেষক মফিজ ইমাম মিলন দীর্ঘদিনের চেষ্টায় খুঁজে খুঁজে বের করেছেন। ‘ফরিদপুরে নজরুল’ নামের একটি গ্রন্থে তিনি সেসব কথা ও কাহিনী সবিস্তারে বর্ণনাও করেছেন। বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় নজরুলের ভ্রমণ ও নানা স্মৃতি উন্মোচিত হলে বর্ণিল নজরুল জীবনের অনেক অজানা অধ্যায় জানা সম্ভব হবে। একটি পূর্ণাঙ্গ ও সম্পূর্ণ নজরুল জীবনী রচনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নজরুল-স্মৃতি বিশেষভাবে সহায়ক হবে।

আপনার মতামত লিখুন :