যখন জীবনের ছায়া দীর্ঘতর হয়

কুমার চক্রবর্তী
অলঙ্করণ কাব্য কারিম

অলঙ্করণ কাব্য কারিম

  • Font increase
  • Font Decrease

মদ-পিপাসার গান

আজ পান করব বলে বসে আছি
পাত্রহীন, স্তবকিত এই নদীর ধারে।
নদীকে বলি—হে প্রবাহ, মৃত্তিকাউৎসার, তুমি রজনীকে
ডাকো, বলো চাঁদকে ঢেলে দিতে মাতালসম্মতসুরা,
যেন রোগমুক্ত হয় আমার জীবন
যেন তৃষ্ণান্বিত মন খুঁজে পায় জীবনপুষ্পের।

যেদিকে মাঝিহীন নৌকা চলে, চলে যায়,
তার ফেলে যাওয়া পথ ধরে আমিও যেতে চাই
সময়প্রাচীন সেই চরে, যেখানে
আলোঅন্ধকার হাত ধরাধরি করে রেখে যায়
নোঙরের কাতরতা।

পিপাসা হলো পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ
যখন জীবনের ছায়া দীর্ঘতর হয়।

অমর পিপাসা নিয়ে আমরা বেঁচে থাকতে চাই,
পান করতে চাই মরজগতের রহস্যজল,
যেন পৌঁছতে পারি সেই জীবনতীরে যেখানে
ঝিনুকের মন সিন্ধুবাতাসের সাথে
নিরন্তর একাত্ম হয়, আর একা হয়ে ওড়ে!

হাসে, স্মিত হাসি!

যা আমার ভাষা, আজ
ওই দ্যাখো উপহার দেয়—আলী আকবর, বেলায়েত আর রবিশঙ্কর:
শোনো পিলু, কিরওয়ানি বা বিলাশখানি টোড়ি,
কী বলে, কী বলতে চায় সুর?
—বলে, এসো নদীটির ধারে
যেখানে নদীর জল কথা বলে ইঙ্গিতমোহন
বিষণ্ণ ও সন্ধ্যার তিমিরে অবনিপ্রতীক এক অশরীরীতান
দাঁড়াও একবার, রে পথিক, তারপর মরে যাও, ভূত হও,
গ্রস্ত হও পার্থিবের ছলে,
বলো কথা, শিখে নাও পাতালের ভাষা
কী অদ্ভুত রূপককুয়াশা বারে বারে আজ,
হিমঋতু প্রিয় ছিল মনের দক্ষিণে, তবু ভুলবে না জীবনের দান
মৃত্যুতে যা পুনরায় পেয়ে যাবে জগতের অনন্তপ্রস্থান
মনের সমস্ত দৃশ্যান্তর, অভিনীত ভুবনমোহন
কোমলভাবের অভিমানে, চিরস্থায়ী, এবং মহান
আমাকে করালগ্রাসে নিয়ে যায়,
স্থবিরতা, হাসে, স্থির হাসি!

দুঃখ

দুঃখের ভাষাকে তুমি রপ্ত করো আজ।
দেখো এক চলাচল কী নশ্বর গতিতে আবার
যায় চলে, যেতে চায় মিত্রহীন পথে, কালের বিস্তারে
তার অপসৃত পথে স্থবির মুহূর্তডানা জেগে থাকে
অচকিত, হাহাকারসাথে,
অবিশ্বস্ততায়।

নদীর মুহূর্ত যেন অনশ্বর, বারে বারে অবাস্তব উদারায়
কোমল রেখাবের টানে, অপার্থিব সুর জাগে নিখিলধারায়,
জলচর পাখিরাও সচকিত মুহূর্তবিভাবে
একবার জন্ম ছেড়ে মৃত্যুকেই ভালোবেসে পুনরায়
ফিরে আসে জন্মের ডেরায়।

জলবোধ যেন কাঁপে—দুঃখের মতন
কাঁপে প্রাণপাতা, হাওয়াবিহ্বল এই পল!

পৃথিবীর যাবতীয় চিহ্নকাল, যাবতীয় স্থিরতার ধ্বনি,
বোধনে গায় যে গান, একটি আত্মার মতো, অদৃশ্যসম্ভোগে,
মৃত্যুকেই ভালোবেসে মানুষ অমর হতে চায়
হতে চায় ভূত, যেন তার কায়াহীন দেহের বিস্তার
ব্যাপ্ত হতে পারে, পৃথিবীর প্রতিমুখে, ছায়ায় ছায়ায়।

দুঃখ যেন মহাভারতম্
যেন ট্রয়, অদিসিয়া
দুঃখ এক অমোঘ জীবনানন্দ
আত্মঘাতী হাইনরিশ ক্লাইস্ট
কবিদের মহাপ্রাণ মর্মধ্বনি
দুঃখ যেন জীবনের জলভরামেঘ
অশ্রুনদীর এক আত্মদর অবনিপ্রতিম

আজ মৃত্যুকে আপন করে পেতে, দুঃখ তাই
জীবনের সমগ্র সাজায়!

আপনার মতামত লিখুন :