পরিসংখ্যানের দিন

অমিতাভ পাল
অলঙ্করণ কাব্য কারিম

অলঙ্করণ কাব্য কারিম

  • Font increase
  • Font Decrease

ব্রেকআপের পরদিন।
হতাশ মেয়েটা সবকিছু হারিয়েও নতুন হৃদয়, নতুন সম্পর্ক এবং নতুন পুরুষের আশা ছাড়ল না। আর এই আশা আবার তাকে তৈরি করল নতুন দিনের জন্য।

একটা অফিসে মেয়েটা কাজ করে। অফিসে যেতে তাকে একটা বাস ধরতে হয়। পথটা যদিও মিনিট পনেরোর, কিন্তু ঢাকা শহরের জ্যাম সেটাকে বানিয়ে দেয় ঘণ্টা দেড়েক। আর সেই ঘণ্টা দেড়েকের অকথ্য যাত্রা জীবনের মূলধন থেকে কেটে নেয় অনেকখানি সুদ।

আজও বাস ধরতে বাসস্ট্যান্ডে এলো সে। অনেকক্ষণ লাফাল ঝাঁপাল—কিন্তু একটাও বাসে উঠতে পারল না। শেষে হঠাৎ দেবদূতের মতো একটা লোক নিজের সুযোগ ছেড়ে দিয়ে ওঠার পথ করে দিল তাকে এবং নিজে রড ধরে ঝুলতে লাগল বিপদজনকভাবে।

ব্যাপারটা মোটেও শান্তি দিল না মেয়েটাকে। অজস্র যাত্রীর ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে ঝুলন্ত লোকটাকে বারবার দেখতে লাগল মেয়েটা। তার কেবলই মনে হচ্ছিল লোকটা বোধহয় পড়ে যাবে। পাশাপাশি এই ভয়টাও কাজ করছিল তার মনে যে, বারবার চারপাশের স্তব্ধ ভিড়টাকে বিরক্ত করে ঝুলন্ত লোকটাকে দেখার ব্যাপারটা সহজভাবে নেবে না জমাটবাঁধা কেউই। কিন্তু সে অবাক হয়ে দেখল—ভিড়টা মোটেই তার নড়াচড়ায় বিরক্ত হচ্ছে না, বরং ঝুলন্ত লোকটার প্রতি উৎকণ্ঠায় তারাও ব্যাকুল।

মোটাদাগের একটা স্টপেজে এসে বাসটা প্রায় খালি হয়ে গেল। মেয়েটার চারপাশ থেকে সরে গেল ভিড়। তাকে সাহায্য করা ঝুলন্ত লোকটাও সেই উধাও হওয়া ভিড়ের মধ্যে কখন যে মিশে গেছে, সেটা বোঝাও যায়নি। তবে অন্যদিকে যেটা হয়েছে, সেটাও চমৎকার। বাসের সিটগুলির সংখ্যাগরিষ্ঠই এখন নিঃসঙ্গতায় আক্রান্ত—তারা চাইছে সঙ্গের উত্তাপ।

এরকম সুযোগ ছাড়াটা যে বুদ্ধিমানের কাজ না, গরু গাধাও সেটা বোঝে। আর মেয়েটা যেহেতু মানুষ—সময় অপচয় না করে সে দখল করে নিল একটা উইন্ডো সিট এবং সারাটা পাছা ছড়িয়ে জাঁকিয়ে বসল তাতে। এখন শান্তির সঙ্গে সংসার।

কিন্তু শান্তির সংসার বুঝি মেয়েটার কপালে নেই। একটা লোক বাস ছাড়ার ঠিক আগমুহূর্তে উঠে এসে বসে পড়ল মেয়েটার পাশের খালি জায়গাটাতে। বসার সময় যেন মেয়েটার কোলে বসতে চায়—এইভাবে পাছাটা এগিয়ে দিয়েছিল লোকটা। কিন্তু শেষপর্যন্ত আশ্চর্য তৎপরতায় নিজেকে মেয়েটার শরীর থেকে ইঞ্চি দুয়েক দূরে স্থাপন করতে পারল সে। তার এই ভদ্রজনোচিত আচরণ মেয়েটাকে কিন্তু একটুও খুশি করতে পারেনি, কারণ পথের এখনো অনেকটাই বাকি এবং সেই বাকি পথে শরীর ঘেঁষে কাছে আসতে অনেক সুযোগ পাবে লোকটা।

প্রাচীন কাল থেকে চালু একটা প্রবাদ এবার নিজের চেহারা দেখাল। বাকি পথের যে শঙ্কা ঘিরে ধরেছিল মেয়েটার মন—তাকে বুড়া আঙুল দেখিয়ে পাশে বসা লোকটা মেয়েটার কাছ ঘেঁষে তো এলোই না, বরং সারা রাস্তা এমনভাবে বসে থাকল যেন মেয়েটা খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় যাকে পবিত্রতার মন্দিরে নিয়ে যাওয়ার জন্য সে সারাটা জীবন অপেক্ষা করে আছে। এটা স্বপ্ন বোধহয়—মেয়েটার মনে হলো। এরকম তো সচরাচর ঘটে না বরং প্রায় প্রতিদিনই এসব যাত্রার শেষে তার শরীরে লেগে থাকে রাস্তার কাদার মতো অজস্র অনাবশ্যক পুরুষস্পর্শ। তবে এটাও হতে পারে এই লোকটা সকলের মতো না বা মেয়েদের ঘৃণা করে। যাই হোক, যুক্তির জালে ধরা পড়ে নরম হওয়া চলবে না। নরম জিনিসে সহজেই ফাটল তৈরি হয় এবং অজস্র আবর্জনা নিয়ে বন্যার জল ঢুকে পড়ে যখন তখন। সেটা হতে দেয়া যাবে না কোনোভাবেই।

কিন্তু শক্ত হওয়ারও দরকার পড়ল না সারাটা রাস্তায়। লোকটা স্ক্রু দিয়ে আটকানো একটা যন্ত্রের মতো বসে থাকল সারাক্ষণ। এরমধ্যে কনডাকটর এলো ভাড়া নিতে এবং মেয়েটার কাছ থেকে পাঁচশো টাকার নোট পাওয়ার পরও কোন খোঁচা মারা কথা না বলে বা কোনো অজুহাত বা ভ্রুকুটি না দেখিয়ে ভাড়ার টাকাটা রেখে বাকি টাকা ফিরিয়ে দিয়ে মিষ্টি একটা হাসি হাসল। হাসিটা মেয়েটার মনে কেমন যেন সন্দেহ জাগাল। মনে হলো নিশ্চয়ই জাল কোনো টাকা দিয়েছে কনডাকটরটা। তাই মিষ্টি হাসি দিয়ে দৃষ্টি ঘুরিয়ে দিতে চাইছে। কিন্তু কোথায় কী? কনডাকটরের সবগুলি টাকা এত ঝকঝকে এবং নতুন যে মেয়েটা মনে মনে লজ্জা পেল নিজের ভাবনার জন্য। তারপর নিজেকে সান্ত্বনা দিল এই বলে—তার কাছে ভাংতি টাকা না থাকায় সে ভয় পাচ্ছিল। তাই এরকম খারাপ ভাবনা এসেছে তার মনে।

তারপর আরেকটা স্টপেজে এসে পাশে বসা লোকটা নেমে গেল। সাথেসাথে মেয়েটাও উইন্ডো সিটের মায়া ছেড়ে দিয়ে লোকটার ছেড়ে যাওয়া পাশের আইল সিটটাতে বসল। বলা তো যায় না—আরেকটা লোক এসে বসতেও পারে পাশে এবং শরীর ঘষাঘষি তার ভালো লাগতেও পারে। কিন্তু মেয়েটাকে সমস্ত দুঃশ্চিন্তা থেকে মুক্ত করে দিয়ে উইন্ডো সিটটাতে গিয়ে বসল আরেকটা মেয়ে। এখন অন্তত বাকি পথটা নিশ্চিন্তে যাওয়া যাবে কারণ মেয়েরা সাধারণত আরেকজন মেয়ের সাথে শরীর ঘষাঘষি করে না যদি না সে লেসবিয়ান হয়।

কিন্তু মেয়েটার নিশ্চিন্ততাকে বেশিক্ষণ জীবিত থাকতে দিল না সিটের পাশে এসে দাঁড়ানো একটা লোক। এসব লোক শরীর ঘষাঘষির চেয়েও আরো গভীরে চলে যাওয়ার সুযোগ খোঁজে এবং প্রথম সুযোগেই নিজের জননযন্ত্রটাকে ঘষে দেয় আইল সিটে বসা কোনো মেয়ের ঘাড়ে বা বাহুমূলে। মেয়েরা কত স্বপ্ন দেখে পুরুষদের নিয়ে অথচ পুরুষরা—ভাবতেও যেন কীরকম অশ্লীল লাগে সবকিছু। তাই ভাবনা বন্ধ করে দিয়ে মেয়েটা তৈরি হলো শক্ত একটা জননযন্ত্রের ঘষা খেয়ে রেগে উঠতে এবং যন্ত্রের মালিক লোকটাকে বাজে কিছু কথা শুনিয়ে দিতে।

কিন্তু কিছুই হলো না। মেয়েটা বসে থাকল তার জায়গায়—লোকটাও স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল নিজের স্থানাঙ্কে এবং শুধু থাকলই না, অন্যদেরকেও ঘেঁষতে দিল না মেয়েটার কাছে। ফলে কোনো শক্ত জননযন্ত্রের ঘষা খাওয়ার অভিজ্ঞতা ছাড়াই শেষ হলো মেয়েটার অফিস যাত্রার অভিযান।

বাস থেকে নামার সময় দাঁড়ানো যাত্রীদের সম্পূর্ণ সহযোগিতা পেল মেয়েটা। সবাই নিজের নিজের জায়গা থেকে সরে গিয়ে পথ করে দিল তাকে এবং মেয়েটা বাস থেকে নামল কোনো রাষ্ট্রপ্রধানের বিমান থেকে নামার মতো।

অফিসেও সে পেল অসম্ভব ভদ্রলোকি ব্যবহার। এবার তার মনে এই প্রাপ্তি সম্বন্ধে সন্দেহ জাগল। দুই একবার ভদ্রলোকদের সঙ্গে চলার পথে কারো দেখা হতেই পারে। কিন্তু তাই বলে সারাক্ষণ ভদ্রলোকেরা চারপাশে থাকে কী করে? এরা কি সবাই তার সদ্য ব্রেকআপের খবর জানে? তাই হয়তো সমবেদনায় তারা আগলে রাখছে তাকে। কিন্তু সেটাও তো সম্ভব না। তাহলে? সবাই নিশ্চয়ই তামাশা করছে তার সাথে। মেয়েটা আর সহ্য করতে পারল না ভদ্রলোকদের এহেন প্রতুল সম্ভ্রান্ত আচরণ। এই অসম্ভব ঘটনা তার মন ভরিয়ে দিল দুঃখের আসবাবপত্রে। আর সেই দুঃখে উথলে ওঠা অপমানিত মেয়েটা ফিরতি পথে মহাখালিতে নেমে ঝাঁপ দিল ট্রেনের তলায়।

সে জানত না, পরিসংখ্যানের বদান্যতায় এমন একদিন আসতেও পারে—যেদিন ভদ্রলোকরাই রাজত্ব করবে পৃথিবীতে।

আপনার মতামত লিখুন :