সেমেটিক ডেথ

ক্যামেলিয়া আলম
অলঙ্করণ কাব্য কারিম

অলঙ্করণ কাব্য কারিম

  • Font increase
  • Font Decrease

পান্থপথের স্কয়ার হাসপাতালের রাস্তায় আগুনের হলকা দেওয়া মধ্যদুপুরে স্টেনগানের শব্দে ব্রেক কষা গাড়ির নিচে কৃষ্ণচূড়ার ফোয়ারা ছুটল, মারা গেল মণিষা। কনকর্ড টাওয়ারের গার্ড রহিম মিয়ার চোখ ছিল রাস্তায় অপলক কিন্তু দেখছিল মাটির চুলায় লালচে মুখের বউটিকে। বেশ কতগুলো খালি রিকসা অলসমুখে দাঁড়ানো এনা ভবনের কাছে। যার বিপরীত দিকেই সালামের চায়ের ভ্যানে থরেথরে সাজানো পুদিনা পাতা, ছোট লেবু আর মাল্টা। বিপরীত মুখ থাকায় ঠিক একসিডেন্টের সময়টি চোখে না পড়ার আফসোস নিয়ে আস্তে আস্তে জমে থাকা ভিড়ের দিকে উৎসুক দৃষ্টি মেলে ধরে সালাম মিয়া। তার চোখে পড়ে শুধু পাতালে কোলের মেয়েটির টপটপ করে পড়া রক্তের মাথা। ছোট চুলের মাথাটিকে এক ঝলক তাকিয়েই সালাম চিনতে পারে। যে কিনা প্রায়ই আসে তার কাছে মাল্টা চা খেতে। নামধাম কিছুই বলতে পারে না। চা চায় হাসিমুখে, এরপরেই গভীর মন দিয়ে চা খায় রাস্তা দেখতে দেখতে। কোনোদিন চা শেষ হতে না হতেই মোবাইলের শব্দে ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে ফোনটি বের করে ব্যস্ত হাতে চায়ের বিল মিটিয়ে চলে যায় রাস্তার ওপারে। হাজার ব্যস্ততায় মেয়েটির গমন পথ কখনোই দেখা হয় না সালামের। সে পুবে যায় না পশ্চিমে, এমনকি ঠিক কোনদিক থেকে এসে দোকানের সামনে দাঁড়ায় তাও কোনোদিন খেয়াল করেনি। তবু নাম না জানা ভীষণ চেনা আপার খুলির টপটপ রক্ত সালামকে অস্থির করে। পাশের মুড়ি বুটের রুপালি ভ্যানের শেফালিরে ডেকে বলে, দেইহা আহি, দোকানখান নজর রাইখেন। উত্তরের আশা না করেই সালাম দৌড়ে ভিড়ের সাথে আগায়।

মেয়েটিকে কোলে নেওয়া রায়হান, যে কিনা হোটেল ক্যাপিটালে এসে আজই উঠেছিল ময়মনসিংহ থেকে। পান্থপথের আরিফ এন্ড কোং-এ চাকরির ইন্টারভিউ দিতে। পেছনে পাংশু ফ্যাকাসে চেহারার ড্রাইভার মতিন মিয়া, যার গাড়ির চাকায় কৃষ্ণচূড়ার চাকা চাকা রঙ। গাড়ির ভেতরে ভয়ার্ত আর জলে ভেজা চোখের শরীফার ভারী শরীর। ৫৫ বছর বয়সী শরীফা জীবনে রক্ত দেখতে শেখে নাই। মুরগী কাটার দৃশ্য যে কিনা দেখে না, কোরবানি ঈদের দিন কানে তুলা দিয়ে ভারী পর্দা দিয়ে জানালা ঢাকে, তার গাড়ির নিচেই কিনা জলজ্যান্ত এক ফুটফুটে মেয়ে। যার মোমরঙা গায়ের রঙ। ছোট চুলের মেয়েটির চুইয়ে পড়া রক্ত কাঁপুনি ধরিয়ে দিয়েছে শরীফার শরীরে। বিড়বিড় করে অন্তরের সমস্তটা দিয়ে আল্লাহর কাছে ভিক্ষা চায় মেয়েটির জীবন। তবু চলে যায় মণিষা রায়হান। আজ যেন যাবার কথাই ছিল তার। নাহয় কেন তার আজকের কপালটিই থাকবে চন্দ্রবিহীন। টিপ পরতে ভীষণ ভালোবাসত।

টিপ ছাড়া রাস্তায় নামার কথা খুব একটা স্মরণে আসে না শিহাবের। শিহাবের কাছে অচেনা এক নাম্বার থেকে ফোন আসে ঠিক ৪ টা ৫৫ মিনিটে। কলাবাগান থানা থেকে। পরে বহুবার শিহাব ভেবেছে একটা কথা, পুলিশ ঠিক কী কারণে তার নাম্বারে ফোন দিয়েই জিজ্ঞাসা করল, মণিষা তার স্ত্রী কিনা? শিহাবের নাম্বার কি মণিষা বর হিসেবে সেইভ করেছিল? মণিষার ব্যস্ত জীবনে শিহাব তো ছিল অপাঙ্ক্তেয়। বেদনা, ঘৃণার মিশ্র এক ভারী বলের চাপ অনুভব করে বুকের মধ্যখানে। মণিষা মারা যেতে পারে কোনোদিন তা ভাবেনি শিহাব। মানুষ মারা যাচ্ছে, যাবে, এই সত্যটি জানে। কিন্তু তাই বলে মণিষা মারা যাবে! যেতে পারে। তা ভাবনারও অতীত ছিল শিহাবের। অফিস থেকে সে চারবারের বার যখন ফোন রিসিভ করল একরাশ বিরক্তি নিয়ে। তখন তার কাছে জানতে চাওয়া হলো, মণিষা তার স্ত্রী কিনা? এরপরেই ভনিতা না করে তাকে বলা হলো, তার স্ত্রী মারা গেছে, প্রাথমিক তদন্তে আত্মহত্যা বলে সনাক্ত করা হয়েছে। স্কয়ার হাসপাতালের জরুরি বিভাগে আছে। শিহাবের জানা ছিল না, দূর থেকে কাউকে ফোন ধরেই মারা যাবার কথা বলা যায়। আর তা মণিষার। যার মারা যাওয়া অসম্ভব শিহাবের কাছে। তাদের প্রায় ২০ বছরের সংসার। এক ছেলে আর এক মেয়ে। মণিষা মারা যাবে আর তা হবে আত্মহত্যা। এরপরের ঘটনা শুধুই ঝড়ের কবলে পড়া চড়ুই পাখির মতন। বাসায় আর মণিষার ফ্যামিলিকে দ্রুত ফোন দিয়ে হাসপাতালে আসা। হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নিয়ে বহু টাকায় মিটমাট হওয়া আত্মহত্যা একসিডেন্ট হিসেবে সাধারণ ডায়েরি করে বেরিয়ে প্রায় ভোর তিনটা নাগাদ এম্বুলেন্সে করে মণিষার দেহ নিয়ে বাসায় যখন, তখন শিহাবের শরীর অসাড় হয়। যদিও মিটমাট সহজ হলো মণিষার বাবার জন্য। যার নিজের জামাতার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। মেয়ে আত্মহত্যা করতে পারে বলে একবারও বিশ্বাস করাতে পারল না জামিল রায়হানকে। শুধুই বলে, আপনাদের ভুল হচ্ছে। তখন কাঁদো কাঁদো ড্রাইভার মতিন মিয়া শিহাবের পা জড়িয়ে ধরে। বলে, আমারে এত বড় কেসে ফাঁসাইয়েন না। রাস্তা ছিল খালি। আমি গাড়ি ৫০-এ চালাইতেছিলাম। আইল্যান্ডে ওই নারী খাড়ায় আছিল। খালি পাইয়াও রাস্তা পার হয় নাই। ঠিক আমার গাড়ি আসার পরে পরেই ঝাপ দিল গাড়ির সামনে। আমি সাথে সাথেই ব্রেক কষছি। প্রায় ১৩ বার একই কথা বলে যায় মতিন মিয়া। লজ্জায় ভয়ে কুঁকড়ে যেতে থাকে শিহাব। মণিষার আত্মহত্যা মানেই সামাজিক খলনায়কের নাম শিহাব। শিহাব তো মারতে চায়নি। তবু তার কেন অভিমান হয়? দলা পাকানো অজগরের কষ্ট সারা শরীর বেয়ে ফোঁসফোঁস করতেই থাকে শিহাবের। সেই রাত পার হলে পরদিন সকাল ৮টায় নিয়ে যাওয়া হয় মণিষাকে। দুইদিন আগে ঝগড়া হয়েছিল। গত ২০ বছর একই রকম ঝগড়া চলে তাদের। শিহাব তো বরাবরই এগ্রেসিভ। কিন্তু রাগ কমে গেলে ভালো ব্যবহার কি পায়নি মণিষা? ২০ বছরের কত জমানো কষ্টের কথা কাটাকাটির পাশে আনন্দের সময়ও কি যায়নি! স্মৃতিগুলো চাবুক মারতে থাকে শিহাবের সারা শরীর জুড়ে।

মণিষা খুব বহির্মুখী মেয়ে। বিয়ের সময়ে ওর চপলতা মুগ্ধ করলেও ওর ঘরের বাইরের কাজগুলো নিয়ে ধীরে ধীরে অশান্তি বাড়তে থাকে শিহাবের। একেবারেই স্থিরতা নেই মেয়েটির। ইস্কুলে মাস্টারি করার পাশে পাশে তার লেখালেখি করতে হবে, সিনেমা বানাতে হবে, বন্ধুদের সাথে নিয়মিত আড্ডা দিতে হবে, কবিতার ক্লাস করতে হবে, নাটক করতে হবে, এরপরেও ছুটি পেলেই ক্লান্তিকর ঘ্যানঘ্যানানি, বাচ্চাদের নিয়ে অমুক জায়গায় চলো, তমুক জায়গায় চলো, চলো সিনেমা দেখি, নাটক দেখি। বিয়ের পরপর কিছুদিন প্রশ্রয় দেয়ায় মাথায় উঠে বসল। শিহাবের মনে হলো, মণিষার বোধ বলে কিছুই নেই। শুধুই ছুটছে। স্থিরতার সৌন্দর্য বোঝার ক্ষমতা তার নেই। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে গাধার খাটনি খেটে সপ্তাহে দুইদিন সারাদিন ঘুমাবে, পত্রিকা পড়বে, টিভির টক-শোগুলো মন দিয়ে দেখবে বা ভালো কোনো মুভি। আর নাহয় গা এলিয়ে শুয়ে টানা গান শোনা। পুরনো গানগুলো এখনো টানে শিহাবকে। ভালো লাগায় সময়কে। এইরকম আয়েশি এক দিন ছেড়ে সারাসময়ই ছুটছে তো ছুটছেই। স্বভাবজাত গালি আসে মুখে, আর তখনই ভাবে, মৃত মণিষাকে গালি আর দেয়া যায় না। দেবার বিধান নেই। ইচ্ছেও নেই। উড়নচন্ডীটার মাথায়ও দোষ ছিল। বিয়ের পরের রাতেই বুঝেছিল। শারীরিক ধকলের পর একটু ঘুমাতে না ঘুমাতে গভীর রাতে তুলে দিয়ে বলে, চলো, বৃষ্টি দেখি। পাগলের পাগল! কী যে আনন্দ পেত আজব কাজগুলোয়? গল্প করার বিষয়ও ছিল ওর অদ্ভুত। গল্প, কবিতা কোনো বিষয় হলো কথা বলার? কিছুতেই মাথায় আসত না। নিজের সুখ দুঃখের কথা বলা শুরু করলেই বিরক্ত হতো! জীবন ছেড়ে ভাবের জগত নিয়ে থাকা কি মানুষের কাজ? বিরক্তিতে কুঁকড়ে ওঠা শিহাবের মনে হয়, এত দোষ নিয়েও মণিষার সাথে ঘর করছে শিহাব। তা মণিষা বোঝে কখনো? ঠিক এই সময়টাতেই শিহাবের চিন্তা থমকায়। উঁকি দেয় আরেক কথা, মণিষাকে কখনো আপন মনে হয়নি, তবু মণিষার কাছে কী যেন এক ছিল, ওকে ছেড়ে থাকার কথাও ভাবেনি শিহাব কোনোদিন।

শিহাবের কোনো সমস্যা দেখতে পায় না জামিল সাহেবও, মণিষার বাবা। মেয়ের জামাই মদ খায় না, গাঁজা খায় না, মেয়ে মানুষ নিয়েও দোষ নাই, তবে কিছুটা শিশুতোষ মাথা গরম আছে। কথায় কথায় রাগ করে বসে। তাই শিহাব বাড়িতে এলে বাড়তি খাতির যত্ন করতে হয়। শিশুতোষ আলসেমি আছে। সারাদিনই বিছানায় গড়াগড়ি খায়। মেয়ের আত্মহত্যার কোনো কারণই খুঁজে না পেয়ে অদ্ভুত বেদনায় আচ্ছন্ন হয়ে বসে থাকে। শুধু মনে হয় জগতের চারপাশ এক কালসিটে কালচে আলোয় প্রখরভাবে পুড়িয়ে দিচ্ছে। লেজার অপারেশনের চকচকে চোখ ইদানীং সবকিছুই ঝাপসা দেখছে আবার। বাবা দেখো, দেখো, কত্তগুলা কাক, কথার শব্দে সামনে তুলতুলে হাতের গোলগাল মুখের বাচ্চাটির দিকে তাকিয়ে অকারণেই চোখ ভিজে উঠে রাস্তার এক দোকানে বসা জামিল সাহেবের। শুধুই মনে হয়, আর সুখী হওয়া গেল না, আর স্বপ্ন দেখার স্বপ্ন কোথাও নাই। অকারণেই এমন এক হাসিখুশি মেয়ে চলে যেতে পারে? ওর কষ্ট কী ছিল? হ্যাঁ, শ্বশুরবাড়ির সাথে বিয়ের পরপর বেশ ঝামেলা হয়েছিল। পরে মেয়েটা কী সুন্দর করে মানিয়ে ফেলল নিজেকে! শিহাবের বিরুদ্ধে কিছুই তো বলত না কখনো। তবে শিহাব দুইদিন পরপরই বিচার দিত নানা কারণে ফোন করে করে। কিন্তু মেয়েকে সেসব বলতে গেলে, বোঝাতে গেলেই হাসত, বলত, বাবা, সে তো একটু পাগলই আর হাইপার। তুমি কিছু ভেবো না। ঠিক হয়ে যাবে। যদি বলতাম, জামাই চায় না, এমনভাবে তুমি চলো কেন? শুধু বলত, বাবা, আমি তো বাঁচতে চাইছি কেবল। মরণ থেকে পালাবার জন্য করি। যদি জানতে চাইতাম, সমস্যা কী তোমার? বলত, কোনো সমস্যাই নাই। গ্রিণ হাউজ এফেক্টে পৃথিবীর তাপ বাড়ছে, তাই সবার মেজাজ চড়া হচ্ছে। তুমি কুল থাকো তো বাবা, একটা আইসগোল্লা খাও আর মাথা ঠান্ডা করো। মরণ থেকে বাঁচার চেষ্টার মেয়েটা মরতে কেন চাইবে? কোনোভাবেই জট ছাড়ানো যাচ্ছে না।

দুই.

জট তাইফের মাথায়ও জাল বুনছে। মণিষার সাথে পরিচয় বেঙ্গলে। ওর বন্ধুদের আড্ডায়। ফোক গানের এক অনুষ্ঠানে। তাইফের বন্ধু সুজিতের বন্ধু মণিষা। গল্পে গল্পে দার্শনিক বিষয়বস্তুর আড্ডা প্রোগ্রামের চেয়ে মুখ্য হয়ে গেল। রাত হলে বাড়ি যাবার তাড়ায় বাকি কথাগুলো হয়েছিল মেসেঞ্জারে। গল্পগুলো যেদিন শেষ হলো, তার পরের দিনটিতে তাইফ আবিষ্কার করে, দেখতে ছোট মনে হওয়া, ৪ বছরের বড় মেয়েটির সাথে কথা বলার এক আকুতি তৈরি হচ্ছে মনের মাঝে। মেসেঞ্জারে নক করে চুপচাপ রইল। কিছুক্ষণ পরেই মণিষার লেখা ভেসে আসে মেসেঞ্জারে। টানা দুই ঘণ্টা কী করে কেটে গেল সেদিন! হাসির এক ইমো পাঠাল। মণিষা অবাক। লিখল, হাসির ইমো কেন? তাইফ এক নিমিষেই বলে উঠল, আমি তুমি করে বলব, কারণ আমরা হয়তো একে অপরের প্রেমে পড়েছি। মণিষার উত্তর, প্রশ্নই ওঠে না। জুনিয়রের সাথে প্রেম করি না। বলে ফোন রেখে দেয়া মণিষা পরের দিনই প্রেমে পড়ে। একটা সময় প্রেম করতে না চাওয়া মণিষা তাইফ কেন্দ্রিক হয়ে উঠল। প্রতিদিনই একবার দেখা না হলে অস্থিরতায় ভুগতে থাকে। দিনে রাতে বারেবারে যোগাযোগ করতে থাকলে তাইফ হঠাৎ হাপিয়ে ওঠে। স্বাধীনতায় বিশ্বাসী তাইফ পরাধীন জীবন থেকে বাঁচতেই বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সেখানে মণিষা তার জীবনের সম্পূর্ণ ভার ছেড়ে দিচ্ছে। হ্যাঁ, মণিষাকে সে ভালোবাসে। ভালো বোঝে। কিন্তু তার মতন একলা স্বাধীনচেতা মানুষের জীবন শুধুই মণিষাকেন্দ্রিক কী করে হয়? এই সাধারণ বাস্তবতা বোঝে না মেয়েটা। কত কত রাতে একান্ত চাওয়ার মুহূর্তগুলোয় মণিষা থাকেনি পাশে! একাকিত্বে অন্য কেউ, তার জীবন, সমস্যা, হালকা কিছু অনুভূতি ছড়ানো কথপোকথন কি এড়ানো যায়? মেয়েটা কোনোদিনই বুঝতে চায় না। এ নিয়ে কত বহুবার ঝগড়া, দূরে সরে থাকা, আবার ফিরে আসা অহরহ ঘটেছে। মেয়েটা রাগ করে কথা বন্ধ রাখলে কেমন এক বিষণ্ণতার বিকেল দুপুর কাটে তাইফের। কোনো এক বিপন্নতা খেলা করে বুকের ভেতর। জীবনের ঝলমলে দুপুরকে হঠাৎ কটকটে লাগে। যানজট আর রাস্তার পাশের ময়লা আবর্জনাগুলো হুল ফোটায় নাকে। বিকেল গড়িয়ে রাতের শীতলতায় যখন নিস্তেজ লাগে দেহ, ঠিক তখনই আসে মণিষার ফোন। রাগ করে থাকতে পারে না মণিষা। শুধুমাত্র এই গুণটির জন্যই টিকে যায় ওদের পরিণতিহীণ প্রেম, এলোমেলো এক ছন্নছাড়ার জীবনে।

আজ মণিষা নাই। তাইফ ভালোভাবে ভাবতে থাকে। নতুন কোনো সংঘাতের কথা। হ্যা, নিশা নামক নতুন এক মেয়ের সাথে তাইফের টুকটাক কথা নিয়ে কিছুদিন ধরেই চলছিল মন কষাকষি। কিন্তু এ তো তাদের নিত্য দিনের সাথী। সবসময়ই কিছু না কিছু নিয়ে কথা কাটাকাটি হতে থাকেই। মণিষা এই বয়সেও কেন এত ইললজিক তা নিয়ে বিরক্তির সীমা নেই তাইফের। কেন মণিষা বুঝবে না যে, তাইফ তাকে সত্যিই ভালোবাসে। কিন্তু টিন এইজের মতো, আমি কেবলই তোমার টাইপ প্রেমে যে আর পড়া যায় না, মনের একগামিতা যে বাস্তবিক অর্থ মিথ, তা তাকে হাজার চেষ্টাতেও বোঝানো যায় না। তবু মণিষা চলে যেতে পারে একবারও ভাবা হয়নি। সেদিন ওদের কথা হয়েছিল দীর্ঘ সময়। এক বোবা কান্না আর হতাশার চাহনি যদিও দেখেছিল, তবু সে আত্মহত্যা করতে পারে বলে একবারও ভাবেনি। বিদায় দিয়ে অফিসে কাজ করছিল। ঘণ্টা দুয়েক পরেই এক ফোন পায় আরজুর কাছ থেকে। চমকে উঠে স্কয়ার হাসপাতালে ছুটতে ছুটতে যায়। শিহাবের মুখোমুখি হতে না চাইলেও চোখাচোখি হয়। শিহাবের চমকানো আর এর পরপরই গম্ভীর মুখটার বিপরীতে গিয়ে অসহায় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে তাইফ। বর্তমানে মণিষার জীবনের সবচেয়ে কাছের মানুষ তাইফের সামাজিক অধিকার নাই আর মণিষার নিথর হওয়া দেহটিকে একটুখানি ছুঁয়ে দেখবার। মণিষার লাশটি না দেখতে পেলেও কল্পনায় মণিষার বুজে আসা চোখ আর বন্ধ হওয়া ঠোঁট দুখানি গভীরভাবে দেখতে পায়। শিহাব ২০ বছরে মণিষাকে যতটা পায়নি তার চেয়েও ঢের বেশি কাছে পেয়েছিল তাইফ। তেমন মণিষাও তাইফের পাথুরে বুকে কী করে যেন ঘাস জন্মে ফেলল। অদ্ভুত এক সারল্য আর নরম মনের মেয়ে ছিল মণিষা। চারপাশের জগত জুড়ে সবাইকে খুশি করতে চেষ্টা করে করেও ক্লান্ত হতো না। মণিষার সাথে তাইফের সম্পর্ক আচঁ করতে পারত শিহাব। এ নিয়ে মণিষার সাথে তিক্ততার কথাও কানে গেছে তাইফের। সংকোচ নিয়ে কথা না বলে বোবা হয়েই দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে থাকল সামাজিক ও বিমূর্ত সম্পর্ক ঘেরা দুইটি মানুষ। হাসপাতাল থেকে মণিষার বডি বের করে রাত দুইটায়। এক ঝলক দেখে নেয় তার ঘুমন্ত শান্ত মুখখানা। মৃত মণিষার স্তব্ধ দেহের দায় থাকে সামাজিক মানুষগুলোর, মানসিক সত্তার তাতে থাকে না কোনো অধিকার। তাই তাইফ বাসায় ফেরে। জড় পদার্থের মতন শরীরকে টেনে শাওয়ারে দাঁড়ায়। গোসল করতে করতেই পেট খাবার চায়। টেবিলে ঢাকা দেওয়া বুয়ার সাজানো রান্না মুখে তুলে ফ্রিজের কাছে গিয়ে বের করে ভদকার এক বোতল। মদের চুমুকে তাইফ চিন্তাগুলো সাজাতে থাকে এবার। বিচ্ছেদ এক চরম বাস্তবতা। কিন্তু হঠাৎই মনের মাঝে অক্টোপাসের মুখ থেকে বেরিয়ে আসা কালো এক রাশ কালি যেন ছিটিয়ে দেয় কেউ। বুকের মাঝে প্রবল এক হাতুড়ির বাড়ি। কেন আত্মহত্যা করতে হলো মেয়েটার? কেন? সামান্য এক ফ্লার্ট, ভিত্তিহীন কথা চালাচালি, এতে লয়াল থাকা না থাকার সম্পর্ক কী? আর এত তুচ্ছ বিষয়ে আত্মহত্যা? হ্যা, ইদানীং ঝগড়া তুমুল লাগছিল। ওর অতি খবরদারি তাইফকে মানসিক আঘাত দিত। ব্যক্তিত্ব কিসে যায়, কিছুতেই মানতে চাইত না মেয়েটা। গ্লাসের চুমুক বাড়িয়ে দিতে দিতে একসময় নিস্তেজ হয়ে সেই ঠান্ডা মাটিতেই তাইফের শরীরখানা মিশে থাকে। মণিষা তাইফের মুখোমুখি হয় পরদিন মধ্যরাতে। প্রবল ঘুমকাতুরে তাইফের গলা শুকিয়ে আসে কেবল, আকণ্ঠ মদ গেলে পরপর দুইদিন। মদের ঘোর কেটে যাওয়ায় বেদনার চাপ চাপ দলাগুলো গলা দিয়ে বুকে এসে জমতে শুরু করে আবার। বুক ভারী হতে থাকে। গা ঝাড়া দিয়ে উঠে ফেসবুক ওপেন করে বিদেশি বান্ধবীদের খোঁজ করে। ওদের পাঠানো হাস্যরস বা গান বা পর্ন সাইটগুলো কোনোটাই তাইফকে শান্ত করতে পারে না। হেগেলের ‘থট অব রিজন’ নিয়ে ডুবে যায় বইয়ের পাতায়।

তাইফের কাছ থেকে বেরিয়ে মণিষার থমকানো মন শান্ত হয়েছিল সেদিন। প্রতিবারই তা হয়। এই অদ্ভুত ভালো লাগার, আবেশে জড়ানোর চেতনার রহস্য, যুক্তি খোঁজা মণিষা কিছুতেই বের করতে পারে না। শিহাবের সাথে প্রায় দুই যুগ পাড়ি দেওয়া মণিষা কখনোই শিহাবকে ভালোবাসতে পারেনি। অথচ কত অবলীলায় ছন্নছাড়া এই আধাপাগল অল্প বয়সী ছেলেটাকে জীবনের মতো ভালোবেসে ফেলেছিল। তাইফ ছিল ভীষণ পরিষ্কার চিন্তার অধিকারী। জ্ঞানকে এত সাবলীলতা দিয়ে মণিষার কাছে তুলে ধরত আর এতই ইন্সপায়ারিং ছিল যে, যে কোনো কাজে তাইফ মণিষার অন্যতম বেঁচে থাকবার অবলম্বন হয়ে উঠল। তবে তাইফকে ভালোবাসলেও সংসার ভাঙার যুক্তি খুঁজে পেত না মণিষা। শিহাবের সাথে গড়ে তোলা সংসার ভাঙতে পারেনি তাই। সংসার তো শুধুই দুইটা চারটা মানুষের জগৎ না। চলটে ওঠা গ্রিল, জানালার পাশে বসে বাতাসের নিমজ্জন, রান্নাঘরের তাকে ধুলোমোছা সযতনের মসলার কৌটা, ড্রইংরুমের কোণার শতরঞ্চি আর ইটরঙা টাইলসের মেঝেতে দাড়িয়ে শাওয়ার নেওয়া। এসব চেনা অভ্যস্ত সুখ তাকে সংসার ভাঙার মতন কোনো অবস্থান নিতে দেয়নি। তবু মাঝে মাঝে প্রতারণা শব্দটা মগজে ঘুরে বেড়াত। পরে আবার আরেক ভাবনা উঁকি দিত। শিহাবের সাথে এই যে এক সামাজিক সম্পর্ক ধরে চলার অভ্যস্ততাকে সে সহনশীল করে তুলতে পেরেছিল তাইফ জীবনে আসাতেই। নানা অভাব, অভিযোগ, তিক্ততা, হতাশার জমে ওঠা বেলুনটা ফেটে না গিয়ে আকাশে উড়তে পারত শুধুই তাইফের জন্য। মগজের কোষে কোষে শিশিরগুলো জমাতে সাহায্য করত তাইফ। ফলে তাইফকে ঘিরে এক আচ্ছন্নতা গড়ে উঠল মণিষার। কিন্তু তাইফের মগজে প্রবাহিত হবার গুণ যত ছিল, ততটাই ছিল ওর ফিলোসফিক্যাল একাকিত্ব। ফলে মণিষার একাকিত্ব কিছুতেই কাটত না। সেইসাথে মণিষা নিজের মাঝে টের পেতে শুরু করেছিল, সে দুনিয়ার সব কিছুতেই ভয় পায়। হারাবার ভয়! তাইফকে হারাবার, সংসার হারাবার, সন্তান হারাবার, আনন্দ হারাবার, প্রতিদিনের বেঁচে থাকার স্বপ্ন হারাবার, জানালা দিয়ে হুড়মুড় করে জাপটে ধরা বাতাস হারাবার! একদিন তাইফকে এই কথা বলাতে তাইফ প্রথমে বহুক্ষণ হেসে মণিষাকে খুব কাছে নিয়ে বলেছিল, তুমি এমন কোনো সৃষ্টি দেখাতে পারো, যার সমাপ্তি নেই? মণিষা জানে, নেই। তবু মণিষা বলে, আমার কেন এত ভয়? সব ভয় পাওয়া মেয়েটি এত সাহসী কেন হবে?

বিগত বেশ কিছুদিন ধরেই মণিষার ঘোর চলছিল। জ্ঞান, বাস্তবতা তাকে ক্রমাগত বোঝাচ্ছিল শূন্যতাই জীবনের একমাত্র সত্য। আর বাকি শুধুই সেই সত্যের পথে ধাবমান গতিময়তা। শিহাবের দুর্ব্যবহার, তাইফের ফিলোসফি আর সেই সাথে সভ্যতার ছুটে চলায় খেই হারাতে থাকে মণিষা। পত্রিকা খুলেই হত্যার বীভৎস রূপে টের পায়, কী যেন একটা ঘটে যাচ্ছে দুনিয়ায়। চারপাশে নতুন নতুন বীভৎস খবরের জন্ম অস্থিরতায় ভোগাতে থাকে মণিষাকে। প্রকৃতির সব শেষ হয়ে যাচ্ছে। মানুষের বেঁচে থাকার, লালসার চকচকে সভ্যতা প্রকৃতিকে চিড়ে দিচ্ছে। হতাশ প্রকৃতি অবাক বিস্ময়ে দেখে চলৎশক্তিহীন বোবাদের ঘিরে কত কামনার আগুন জ্বলতে পারে। এসব দেখে আর কুঁকড়ে যেতে থাকে মণিষা। চরম এই বাস্তবতাকে প্রবল ইচ্ছা দিয়েও মেনে নিতে পারছিল না মন। আর যত ভয় বাসা বাঁধতে থাকে, তত আরো ছুটে চলা বাড়তে থাকে মণিষার। বয়স, সময়, পারা আর না পারাকে তুচ্ছ করে যুক্তি আর যুক্তিহীনতার পথ ধরে মণিষা পাড়ি দিতে থাকে এক বিবর্ণ সময়। যেই বিবর্ণতাকে চোখ বন্ধ করলেই মণিষা হিসহিসিয়ে সামনে আসতে দেখে। ঘুম কমতে থাকে আরো। পরিবার, প্রেম, সমাজের সভ্যদের অসভ্য রূপ এমন হরেক গলিপথ ঘুরতে ঘুরতে হতাশ মণিষা ঘূর্ণিপাকে ঘুরতে থাকে। সেদিনও তাইফের সাথে নিজের মানতে না পারা বাস্তব সত্য নিয়ে প্রবল লড়াইয়ে ক্লান্ত মণিষা পান্থপথের স্কয়ার হাসপাতালের রাস্তাটা পার হচ্ছিল। তাইফ ফিরে গেছে ওর অফিসে। মধ্যদুপুরের গনগনে রোদ, শিহাবের বিছুটি মাখা কথা, বাচ্চাদের বয়ঃসন্ধিকালের মেজাজ আর সেই সাথে তাইফের সোজা সাপটা কথা মণিষার মগজের কোষ বেয়ে বেয়ে প্রতিটি কূপে প্রবেশ করছিল তখনও। কার্বনের কালো ধোয়ার মতন তা মাথা বেয়ে বেয়ে দেহে প্রবেশ করছিল, ঠিক তখনই ভয়ঙ্কর এক ঝাকুনি আর মণিষা নামাধিকারী এক মানবের চূড়ান্ত সত্যের পথ অবগাহন।

আইল্যান্ডের সরু মাথা নিয়ে নুইয়ে থাকা মানুষের পায়ের চাপে পিষ্ট হওয়া তারকাটাগুলো শুধু নির্বাক সাক্ষ্য হয়ে থাকে ছোট এক মামুলি ঘটনার। রাস্তা পেরুবার আইল্যান্ডে দাঁড়ানো মণিষার মাথায় যখন দপদপিয়ে বেড়াচ্ছিল তার মানতে না চাওয়া বাস্তবতাগুলো, ঠিক তখনই অন্যমনস্ক এক পা চলে যায় পায়ের নিচে পড়ে থাকা লোহার তারগুলোয়। হোঁচট খেয়ে পড়ে এক স্বাভাবিক মৃত্যু—আত্মহত্যার মহিমা নিয়ে টিকে থাকে সামান্য কিছু মানুষের জীবনে।

আপনার মতামত লিখুন :