নিজ বলয়ে প্রদক্ষিণরত নক্ষত্র

রোজেন হাসান
অলঙ্করণ কাব্য কারিম

অলঙ্করণ কাব্য কারিম

  • Font increase
  • Font Decrease

ভালো কবিতা অনেকেই লেখেন, যে কবিতাগুলো পড়ে পাঠকেরা আপ্লুত হন। এই কবিতাগুলো অনেকটাই অতীতের গুরুত্বপূর্ণ কবিদের কবিতার সাথে মিলে যায়। পাঠকেরাও পূর্বকবিদের কবিতা পড়ার কারণে এই ভালো কবিতাগুলোর ভাষা-ভঙ্গিমাকে চিনতে পারেন। তাই যখনই ওইসব গুরুত্বপূর্ণ কবিদের কবিতার মতো কবিতা কোনো কবি লেখেন, সেগুলো পাঠকদের পূর্বঅভিজ্ঞতার সাথে মিলে যায় এবং তারা বাহ্ বাহ্ বলে ওঠেন এবং সেগুলো ভালো কবিতা হিসেবে চিহ্নিত হয়। কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় যখন কোনো কবি কথিত ভালো কবিতা লেখেন না, এর বিপরীতে নিজস্ব কাব্যভাষায় নিজের কবিতা লেখেন। এই কবির নিজস্ব কাব্যভাষা আসে তার নিজস্ব কাব্যজগত থেকে। যে জগত তিনি পৃথিবীর চির ইতিহাসের মাঝে বিরাজমান চিন্তা, প্রাণ এবং বস্তুর সাথে নিজের অভিজ্ঞতাকে মিলিয়ে তৈরি করেন। ফলে তার কবিতা নতুন হয়ে ওঠে। আর তার কবিতার এই নতুনত্বের কারণেই অতীতের কবিতায় অভ্যস্ত এবং সাম্প্রতিক কালের ভালো কবিতার দৌরাত্ম্যের কবলে পড়ে পাঠকেরা এই কবিতাগুলোকে ভালোভাবে গ্রহণ করতে পারেন না।

পাঠকদের মতো সমালোচকেরাও সমস্যায় পড়ে যান কেননা তারা এইরকম কবিতা আগে পড়েননি। আর যা আগে পড়েননি সেরকম কবিতার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করা তাদের পক্ষে দুরূহ হয়ে পড়ে। কিন্তু আশার কথা হলো একসময় এইরকম কবিরা গৃহীত হন পাঠক এবং সমালোচক মহলে। সময়ের সাথে সাথে এই কবিদের—যারা সংখ্যায় খুব নগন্য—কাব্যজগতটি ধীরে ধীরে ভাস্বর হয়ে ওঠাই এর মূল কারণ। যখনই তাদের জগতটি উন্মেচিত হতে শুরু করে, তাদের আসে গৃহীত হবার পালা, তখন পাঠক এবং সমালোচকরা উন্মাদপ্রায় হয়ে যান। এই কবির অনুসারীতে কবিতা লেখকদের ছোট পরিধিটি দ্রুত ভরে যেতে থাকে। এই কবি নতুন কবিদের আদর্শ হিসেবে বিবেচিত হন। অবশ্য তার অনুসারীরাও ভালো ভালো কবিতা লিখতে শুরু করেন। এই ধারা চলতে পারে এমনকি যুগ থেকে যুগ পর্যন্ত। বিনয় মজুমদারও সেই নতুন কবিতা সৃষ্টিকারী কবি, যাঁর রয়েছে একটি স্বতন্ত্র কবিতাবিশ্ব, রয়েছে একটি নিজস্ব কাব্যভাষা। ভালো কবিতালেখকদের ভিড়ে তিনি তাই এক নিজ বলয়ে প্রদক্ষিণরত নক্ষত্র। যার আলো বহু আলোকবর্ষ দূর থেকে আসে। তাই তাঁকে বুঝতে পাঠকদের এবং সমালোচকদের একটু সময় লেগেছে, সময়টা একটু বেশিই।

কী রয়েছে তাঁর কবিতাবিশ্বে? তাঁর কবিতা বিশ্বের স্তম্ভগুলো হলো গণিত, বিজ্ঞান, প্রকৃতিবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান এবং দর্শন। এই সবকিছুকেই তিনি মিলিয়েছেন নিজের অভিজ্ঞতার সাথে, আর অভিজ্ঞতার হীরক স্পর্শে এইসব উপাদান বিনয় মজুমদারের নিজস্বতায় চিহ্নিত হয়ে ওঠার সাথে সাথে বাংলা কবিতাতেও খুলে দিয়েছে নতুন নতুন সব জানালা। তার কাব্যভাষাটিও তাই নতুন। তিনি কবিতায় আবেগকে পরিমিতভাবে ব্যবহার করেন। কবিতাসহ শিল্পের যে কোনো শাখায় অতি আবেগ এবং আবেগহীনতা এই দুটি জিনিসই ক্ষতিকর, বিনয় মজুমদারের কবিতায় আবেগ সবসময় এই দুইয়ের মাঝামাঝি অবস্থান করে; তিনি তাঁর কবিতার জন্য এমন একটি ভাষা নির্মাণ করেছিলেন যেটিতে অনায়াসে গভীর চিন্তাকে উপমা, চিত্রকল্পে ব্যক্ত করা যায়। তাঁর কবিতার ভাষায় গণিতের বস্তুনিষ্ঠতা, নিরপেক্ষতা এবং সিদ্ধান্তগ্রহণ পদ্ধতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে, পর্যবেক্ষণ এবং যুক্তিরও একইরকম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে সেখানে। তবে একসময় তিনি ক্রমশই সহজ-সরলতার দিকে ঝুঁকে পড়েছিলেন। এই কবিতাগুলোতে চারপাশের মানুষ, উদ্ভিদ এবং বস্তু পারস্পরিক পারম্পর্য তৈরি করে ভিন্ন অর্থবোধকতা তৈরি করে। বিনয় মজুমদারের কবিতা থেকে কিছু পঙ্ক্তি পড়া যাক—

আমার আশ্চর্য ফুল, যেন চকোলেট, নিমিষেই
গলাধঃকরণ তাকে না-ক’রে ক্রমশ রস নিয়ে
তৃপ্ত হই, দীর্ঘ তৃষ্ণা ভুলে থাকি আবিষ্কারে, প্রেমে।
অনেক ভেবেছি আমি, অনেক ছোবল নিয়ে প্রাণে
জেনেছি বিদীর্ণ হওয়া কাকে বলে, কাকে বলে নীল—
আকাশের হৃদয়ের; কাকে বলে নির্বিকার পাখি।
[ফিরে এসো, চাকা]

পৃথিবীর আকর্ষণে ফুলগুলি নুয়ে পড়ে, ঝ’রে পড়ে যায়।
কিন্তু দ্যাখো, পাখিগুলি স্বেচ্ছাধীন নেমে পুনরায় উড়ে যেতে পারে।
চেষ্টাকৃত পদ্ধতিতে অসময়ে জন্ম দিতে গেলে
শিশু মরে যেতে পারে, এ সত্যটি চিকিৎসক জানে।
[গায়ত্রীকে]

অমিল পয়ার ছন্দে রচিত বসন্তকাল শেষ হয়ে এলো।
পথের উপরে আজ দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ দেখলাম চারিপাশে মাঠ
কালো কালো ধানগাছ ঢাকা আছে, এই সুমুদ্রিত ধানগাছগুলি
আমার এ জীবনের বসন্তের অভিজ্ঞতা।
[বসন্তকাল]

তিনি অনেকটা সুফি কবি মনসুর আল-হাল্লাজ এবং মাহমুদ শাবিস্তারির মতো মেকি আবরণ ছেড়ে কবিতার অন্তঃসারটিকেই মুখ্য ভূমিকা দিতে চান। মিউজগণ এবং দুয়েন্দের বিপরীতে তাঁর ছিল গণিত, বিজ্ঞান ও দর্শন। বাস্তবেও তিনি গণিতচর্চায় মুখর থাকতেন। গণিতে তাঁর কিছু আবিষ্কারও আছে।

দুই.

বিনয় মজুমদার তাঁর কবিতায় উৎসর্গকৃত জীবন, গায়ত্রী চক্রবর্তীর প্রতি প্রেম এবং তাঁর বারবার পাগল হয়ে যাওয়া নিয়ে মিথে পরিণত হয়েছেন আজ। তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়ার সময় এক সুন্দরী নারীর প্রেমে পড়েন, সেই নারীটি হলেন গায়ত্রী চক্রবর্তী। ইংরেজি সাহিত্যের এই ছাত্রীর সাথে তাঁর কথা হয়েছিল মাত্র তিন-চারবার। পরে বিনয় মজুমদার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে অন্যত্র চলে যান। কিন্তু গায়ত্রীর প্রতি প্রেম এবং সেই প্রেমের অভিঘাত স্থায়ী হয়েছিল তাঁর সমগ্র জীবনব্যাপী। কৃতিত্বের সাথে তিনি ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেছিলেন এবং সেইকালের মোটা অংকের চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন শুধুমাত্র কবিতায় আরো গভীরভাবে মনোনিবেশ করার জন্য। তাঁর ‘ফিরে এসো, চাকা’র সেই ৭৮টি শিল্পের উত্তুঙ্গ শিখরস্পর্শী কবিতা লেখা সম্ভব হয়েছিল মনে হয় কবিতায় এই বিশুদ্ধ আত্মনিবেদনের ফলেই। এই বইটির নাম গায়ত্রী চক্রবর্তীর নাম থেকেই নেওয়া, তিনি পরে বলেছিলেন গায়ত্রী চক্রবর্তীকে তিনি রূপান্তরিত করেছিলেন ‘গায়ত্রী চাকা’তে। বইটি উৎসর্গও করেছিলেন তাঁকেই।

এই বইয়ের কবিতাগুলোতে আমরা যে বিনয় মজুমদারকে পাই তিনি একাধারে দার্শনিক, বিরহী প্রেমিক, জীবনের গহীন অতল সমস্যাগুলোর পর্যবেক্ষক, বৈশ্বিক বোধের অধিকারী, বিজ্ঞানে নিবেদিত এবং এমন এক কবিসত্তায় উত্তীর্ণ কবি যিনি বিশ্বের মাঝে মানবাত্মার দুরূহ জীবনের বহুবিস্তারী সুন্দরের অনেকগুলো জানালা খুলে দেন। বইটি থেকে কিছু কবিতার পঙ্ক্তি পড়া যাক—

১.
একটি উজ্জ্বল মাছ একবার উড়ে
দৃশ্যত সুনীল কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে স্বচ্ছ জলে
পুনরায় ডুবে গেল—এই স্মিত দৃশ্য দেখে নিয়ে
বেদনার গাঢ় রসে আপক্ক রক্তিম হ’লো ফল।

২.
ভালোবাসা দিতে পারি, তোমরা কি গ্রহণে সক্ষম?
লীলাময়ী করপুটে তোমাদের সবই ঝ’রে যায়—
হাসি, জ্যোৎস্না, ব্যথা, স্মৃতি, অবশিষ্ট কিছুই থাকে না।

৩.
স্রোতপৃষ্ঠে চূর্ণ-চূর্ণ লোহিত সূর্যাস্ত ভেসে আছে;
নিশ্চল, যদিও নিম্নে সংলগ্ন অস্থির স্রোত বয়।
এখন আহত মাছ কোথায় যে চ’লে গেছে দূরে,
তুমিও হতাশ হ’য়ে রয়েছো পিছন ফিরে, পাখি।
এখনো রয়েছে ওই বর্ণময়, সুস্থ পুষ্পোদ্যান;
তবুও বিশিষ্ট শোকে পার্শ্ববর্তী উদাত্ত সেগুন
নিহত, অপসারিত, আর নেই শ্যামল নিস্বন।
কেন ব্যথা পাও পৃথিবীর বিয়োগেবিয়োগে?

৪.
শুনেছি সবার মাঝে একটি কুসুম ঘ্রাণময়ী;
ব্যথিত আগ্রহে দেখি; এত ফুল, কোনটি বুঝি না।
যে-কোনো অপাপবিদ্ধ তারকারো জ্যোৎস্না আছে ভেবে
কারো কাছে যেতে চাও, হে চকোর, স্বপ্নচারী, বৃথা।

৫.
অভিজ্ঞতা থেকে ক্রমে আকাশের বর্ণহীনতার
সংবাদের মতো আমি জেনেছি তোমাকে; বাতাসের
নীলাভতাহেতু দিনে আকাশকে নীল মনে হয়।

৬.
আমিই তো চিকিৎসক, ভ্রন্তিপূর্ণ চিকিৎসায় তার
মৃত্যু হ’লে কী প্রকার ব্যাহত আড়ষ্ট হ’য়ে আছি।
আবর্তনকালে সেই শবের সহিত দেখা হয়;
তখন হৃদয়ে এক চিরন্তন রৌদ্র জ্ব’লে ওঠে।

৭.
শ্বাশ্বত মাছের মতো বিস্মরণশীলা যেন তুমি।

এই কবিতাগুলো শিল্পের সেই উর্ধ্বমেঘে ডানা মেলেছে, যেখানে একজন কবির যাবার প্রত্যাশা থাকে। পাঠকদের জন্যেও এ এক নতুন অভিজ্ঞতা। এ-বইয়ে শিল্প সক্ষমতার পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছেন বিনয় মজুমদার।

‘ফিরে এসো, চাকা’ প্রকাশিত হবার পর থেকে অনেকদিন পর্যন্ত এর কবিতাগুলো জীবনানন্দ দ্বারা প্রভাবিত হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। অবশ্য বিনয় মজুমদারও একবার বলেছিলেন তিনি সারাজীবন জীবনানন্দ দাশের মতো কবিতা লিখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সময় প্রবাহিত হওয়ার সাথে সাথে আজ এটি প্রতিষ্ঠিত যে ‘ফিরে এসো, চাকা’ তাঁর মৌলিক সৃষ্টি। এটি অনন্য, যদি প্রভাবিত হওয়ার বিষয় থাকেও, সেটি তিনি করেছিলেন জীবনানন্দ দাশ থেকে সরে যাওয়ার জন্য, মানে জীবনানন্দকে তিনি একটি উপাদান হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন এখানে। জীবনানন্দ দাশের কাব্যজগত এবং বিনয় মজুমদারের কাব্যজগত সম্পূর্ণ পৃথক।

‘ফিরে এসো, চাকা’ প্রকাশিত হবার দীর্ঘকাল পর তিনি একটি আশ্চর্য কবিতার বিষয়বস্তু খুঁজে পান। সেই বিষয়বস্তু খুঁজে পেয়ে তিনি ১৯৭৪ সালে একমাসে ছয়টি দীর্ঘ কবিতা লিখলেন। তিনি নিজে বলেছিলেন, “১৯৭৪ এক মাসের মধ্যে এ যেন একটা বিশাল যুগ পার হয়ে যাওয়া।” এই কবিতাগুলোই লিপিবদ্ধ হলো ‘অঘ্রানের অনুভূতিমালা’ নামক কবিতার বইয়ে। বাংলা সাহিত্যে স্বার্থক দীর্ঘকবিতা হিসেবে এই কবিতাগুলো এক অনন্য উদাহরণ। কবিতাগুলোতে তিনি একজন দ্রষ্টার মতো বস্তুর, দৃশ্যের, সময়ের, অন্তর্নিহিত সত্তাকে উন্মোচিত করেছেন। এখানে দেখা যায় তিনি একটি বিষয় নির্বাচন করেছেন, এবং এরপর সেই বিষয়টিকে ভিন্ন ভিন্ন কোণ থেকে বিশ্লেষণ করেছেন, সিদ্ধান্ত টেনেছেন, এরপর এরকমভাবে আরেকটি বিষয়ে গেছেন। এগুলো স্বার্থক দীর্ঘকবিতা কারণ কবিতাগুলোকে দশ-বারো লাইনের লিরিক কবিতার মতো টেনে-টেনে বড় করেননি তিনি। এখানে কবিতায় উপস্থাপিত বিষয়বস্তুই প্রধান, একজন কথক তো আছেনই কিন্তু লিরিক কবিতার কবির মতো তিনিই মুখ্য নন, কবির নিজস্ব আবেগই মুখ্য নয় এখানে। কবিতায় আসা প্রতিটি বিষয় এবং ঘটনাই মূল ভূমিকা নিয়ে চিত্রকল্পে, উপমায়, বর্ণনায় হাজির হয়েছে। তাই পাঠকদের ক্লান্তিবোধ জাগে না, বারবার পড়ার পরেও। কবিতাগুলো মহাপয়ারে লেখা। তিনি অবশ্য তাঁর প্রায় সব কবিতাই পয়ার এবং মহাপয়ারে লিখেছেন। বইটি থেকে কয়েকটি পঙ্ক্তি পড়া যাক—

১.
যদি কাছাকাছি থাকি তবে আর অকারণে উদয়ের ভাবনায় কখনো পড়ি না।
থাকে না এমন ভিড়ে খুঁজে-খুঁজে সপ্তর্ষিকে বার ক’রে আনবার বিরাট ঝামেলা।
নিজেই উদিত হলে এ রকম অসুবিধা—অপরের উদয়ের ভরসা লাগে না।
সপ্তর্ষিকে পেতে হলে এইভাবে তার কাছে নিজেই উদিত হতে চিরকাল হয়।

২.
অনেক গভীর রাতে আমি রোজ বাজপাখি হয়ে যাই—বাজপাখি হই,
পাহাড়ের বাজপাখি... এবং আকাশে উঠে এসকল... উড়ে দেখি।

এর বিপরীতভাবে, পাখি যদি মরে যায় তবু সেই মৃতদেহ পাখি,
গাছ যদি মরে যায় তবে যা থাকে তা—তাও গাছ, মৃত বলে অন্য কিছু নয়।
সেইভাবে আমাদের মন ম’রে গেলে যা থাকে তা—তাও মন
মৃত্যুর নিয়মে।
[বিশাল দুপুরবেলা]

কবিতাগুলো মহাজাগতিকতাকে স্পর্শ করে বৈশ্বিকতার দিকে যাত্রা করেছে। এই কবিতাগুলোয় জীবনের বহুমাত্রিক বিস্তারকেও যেন স্পর্শযোগ্য করে তুলেছেন বিনয় মজুমদার।

তাঁর কাব্যকৃতির সর্বোচ্চ নিদর্শন ‘ফিরে এসো, চাকা’ এবং ‘অঘ্রানের অনুভূতিমালা’ নামক কবিতার বই দুটি। অবশ্য তাঁর ‘বাল্মীকির কবিতা’ নামক কবিতার বইটি প্রকাশিত হবার পর থেকেই বিতর্কিত হয়ে আসছে। এতে তিনি মানব-মানবীর যৌনতার যে আড়ালবিহীন প্রকাশ ঘটিয়েছেন, সেটিই এর বিতর্কিত হবার কারণ। কবিতা হিসেবেও সেগুলি বিশেষ উৎরে যায়নি। তাঁর ঠাকুরনগর বাসপর্বে লিখিত কবিতাগুলি ক্রমেই জটিলতামুক্ত হয়ে এসেছে, যেন এক অন্য সহজতার দিকে যাত্রা করেছিলেন তিনি।

বারবার পাগল হয়ে যাওয়া বিনয় মজুমদারের জীবনে নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে উঠেছিল। ২০০২ সালে আবার সেই রোগ ফিরে এলে তিনি বাঙ্গুর সাইকিয়াস্ট্রি ইনস্টিটিউটে দুইমাস চিকিৎসাধীন ছিলেন। কবিতা লেখার তিন বছরের বিরতির পর কিছুটা সুস্থ হলে সেই হাসপাতালেই নতুন করে লিখতে শুরু করেন কবিতা। কবিতাগুলো অনবদ্য। এর সাথে লেখেন একটি ছোটগল্পও। এ বিষয়ে মনে পড়ে ভিনসেন্ট ভ্যান গখের কথা, তিনিও মানসিক হাসপাতালে থাকার সময় বিস্ময়কর সব ছবি এঁকেছিলেন। ২০০৩ সালে বিনয় মজুমদারের এই পর্বে লেখা কবিতা নিয়ে বের হয় ‘হাসপাতালে লেখা কবিতাগুচ্ছ’ শিরোনামে বই। এই বই পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পায় ২০০৫ সালে। বইয়ের ‘আমরা দুজনে মিলে’ কবিতাটা পুরোটাই পড়া যাক, কবিতাটিতে তিনি গায়ত্রী চক্রবর্তীকে উদ্দেশ্য করে বলছেন—

আমরা দুজনে মিলে জিতে গেছি বহুদিন হলো।
তোমার গায়ের রঙ এখনো আগের মতো, তবে
তুমি আর হিন্দু নেই, খ্রিস্টান হয়েছো।
তুমি আর আমি কিন্তু দুজনেই বুড়ো হয়ে গেছি
আমার মাথার চুল যেরকম ছোট করে ছেঁটেছি এখন
তোমার মাথার চুলও সেইরূপ ছোট করে ছাঁটা,
ছবিতে দেখেছি আমি দৈনিক পত্রিকাতেই; যখন দুজনে
যুবতী ও যুবক ছিলাম
তখন কি জানতাম বুড়ো হয়ে যাব?
আশা করি বর্তমানে তোমার সন্তান নাতি ইত্যাদি হয়েছে।
আমার ঠিকানা আছে তোমার বাড়িতে,
তোমার ঠিকানা আছে আমার বাড়িতে,
চিঠি লিখব না।
আমরা একত্রে আছি বইয়ের পাতায়।

অভিমান এবং অভিজ্ঞতার মিশেলে কবিতাটি অনন্য হয়ে উঠেছে। গায়ত্রী চক্রবর্তীর নামের সাথে তখন স্পিভাক যুক্ত হয়েছে এবং তিনি বিশ্ববিখ্যাত একজন তাত্ত্বিক ও যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক।

কবিতার পাশাপাশি বিনয় মজুমদার কিছু গল্প, ছড়া, গান এবং প্রবন্ধ লিখেছিলেন। ডায়রিও লিখতেন তিনি। যৌবনে তিনি রুশ ভাষা শিখেছিলেন, অনেক রুশ কবির কবিতা অনুবাদের সাথে সাথে আলেক্সান্দ্র পুশকিনের কবিতাও অনুবাদ করেছিলেন তিনি। সেগুলিও অনন্য। তাঁর মৌলিক গল্পগুলি আকারে খুবই ছোট, অনেকগুলিই এক থেকে দেড় পৃষ্ঠার মধ্যে শেষ হয়েছে। এর মাঝে একটি গল্পের শিরোনাম ‘বিশ্ববীক্ষা’, কল্পিত এক আমি’র সাথে কল্পমামার কথোপকথন দিয়ে এর শুরু এবং শেষ। এর একটি অংশ পড়া যেতে পারে—

আমি: ঐ যে চা বানাচ্ছে সুবোধ। সুবোধ পৃথিবীর অংশ মানে বিশ্বের অংশ।
কল্পমামা: তা ঠিক। সুবোধ পৃথিবীর অংশ বিশ্বের অংশ।
আমি: তা হলে কল্পমামা, আপনিও পৃথিবীর অংশ মানে বিশ্বের অংশ।
কল্পমামা: তা ঠিক। আমি পৃথিবীর অংশ মানে বিশ্বের অংশ।

গল্পগুলোতে সাধারণ কথোপকথনের মাঝে চমকপ্রদ সব সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন তিনি। চারপাশের সব চেনা-জানা মানুষেরাই তাঁর গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র।

বিনয় মজুমদারের কবিতার আবেদন ফুরোবার নয়। তিনি কালে-কালে নতুন-নতুনভাবে মূল্যয়িত হতে থাকবেন। পাঠকেরা প্রতিবারই নতুন সৌন্দর্যের মুখোমুখি হবেন তাঁর কবিতায়, গানে, গল্পে, অনুবাদে।

আপনার মতামত লিখুন :