কন্টাক্ট সাউথ এশিয়া

মারিয়া রিমা

  • Font increase
  • Font Decrease

‘কন্টাক্ট সাউথ এশিয়া প্রোগ্রাম’-এর মাঝামাঝি সময়ে একদিন একটা ফার্ম হাউসে বেড়াতে নিয়ে গেল। সেদিন আমরা একসাথে হয়েছিলাম ১২টি দেশের লোক। ওটা ছিল ইসাবেলার ফার্ম হাউস। সে ইউকে’র। তিব্বতিয়ান ও হিমালয়ের পিপলদের ওয়ার্ল্ড লার্নিং প্রোজেক্টের একাডেমিক ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করছে। আমি নেপালি লোকাল মদ ‘চো’ খাইছিলাম। সন্ধ্যায় শুরু হলো লাইভ গান আর আমরা সবাই নাচতেছিলাম যার যার মতন।

একসময় আফগানের সাঈদ এসে বলল, আমি তোমার সাথে নাচতে পারি? বললাম, শিওর!

তার আগে আমরা একসাথে ক্লাস করেছি কিন্তু পরিচিত হইনি, কথা হয়নি। শেষের ক্লাসে সাঈদ আমার গ্রুপে ছিল তখন জিজ্ঞেস করছিল, বাংলাদেশ কি ইসলামিক রাষ্ট্র?

বললাম, না, তবে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম কিন্তু আমরা লিবারেল কান্ট্রি।

সে বলল, আমাদের দেশেও ওয়েস্ট প্রভিন্সের লোকজন লিবারাল, ইস্টের দিকে তারা কট্টরপন্থী। বলল, সে লিবারাল মানুষদের ভালোবাসে, বাংলাদেশ পছন্দ করে।  ইউএসএ-তে সে যখন পড়ত তখন বাংলাদেশের কেউ একজন তার বন্ধু ছিল।

আফগানের একজনের নাম ছিল হযরত। প্রথম এই নাম নিয়ে বেকায়দায় পড়ে গেলাম আমরা মুসলিম দুয়েকজন। নাঈম আমাদেরকে ব্যাপারটা খোলাসা করে দিলো যে,  হযরত মানে হচ্ছে স্যার। এবং ইসলামে নবীদের নামের প্রথমে হযরত শব্দটা যুক্ত করা হয় সম্মান দেখানোর নিমিত্তে। কিন্তু আফগানের হযরতকে আমি সম্মান দেখাতে পারিনি। আমাদের ভিজিটে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল একটা পুরনো টেম্পেলে। নেপালে টেম্পল ঘিরে তাদের মার্কেট প্লেইস। সবাই শপিংয়ে ব্যস্ত। আমি একা একা ঘোরাঘুরি করতেছিলাম। হযরত এসে আমাকে সঙ্গ দিতে চাইলে আমি খুশি হই। আমার মা বাবার জন্য উলের তৈরি মোজা কিনতে গেলাম তখন আমার হাতে রুপির শর্টেইজ।  হযরত নিজের পকেট থেকে বের করে দিলো রুপি এবং বলল, ‘তুমি আর কী কী নিতে চাও বলো, আমার অনেক টাকা। আমি বিদেশি এনজিওতে চাকরি করি।’ কিছুক্ষণ পর বলল, আমার রুম নাম্বার ৫১২, লাঞ্চব্রেকে তুমি আমার রুমে আসো। আমাকে এমন মিন করার জন্য আমি মনে মনে ক্ষেপতেছিলাম কিন্তু তাকে কোনো রেসপন্স না করে নিয়ে গেলাম ডলার এক্সচেঞ্জের দোকানে। ডলার এক্সচেঞ্জ করে তার রুপি তাকে ফিরিয়ে দিলাম। সে শুধু বলতেছিল তাদের কালচারে নেই এভাবে টাকা ফিরিয়ে দেওয়া।

এ ট্রেনিং ছিল ইউএসএ’র একটি গ্র্যাজুয়েট ইন্সটিটিউটের প্রোজেক্ট। প্রোগ্রামটি অনুষ্ঠিত হয় নেপালে। এই কথাটা আমি আমাদের দেশের ব্যাংকারকে বুঝাইতে পারলাম না। তারা আমাকে মাত্র ১০০ ডলার ইউএসএ পাঠাইতে দেয় না।  বলে, বাংলাদেশ ব্যাংকের অনেক কড়াকড়ি আছে। ডাচবাংলা ব্যাংকের এলিফ্যান্ট রোড ব্রাঞ্চে ফরেন এক্সেঞ্জ নেই তারা আমাকে ফরওয়ার্ডিং লেটার দিয়ে ধানমন্ডি ব্রাঞ্চে পাঠাল। ধানমন্ডি ব্রাঞ্চে দায়িত্বরত মিনা বেগমের আচরণে আমি খুবই মন খারাপ করে রাগ করে ব্যাংক থেকে বের হয়ে গেলাম।

আমাদের ট্রেনিংয়ে পাকিস্তানি ছিলেন কজন। আমি তাদের সাথে কথা বলিনি একদিনও। কেমন যেন মানসিক দৈনতায় ভুগছিলাম। ক্লোজিং সেলিব্রেশান পার্টিতে আমরা সবাই ডান্স করছি। সেখানে পাকিস্তানি মীর জাফর আমাকে পার্টনার বানাল কয়েকবার।

পার্টি শেষে পাকিস্তানি নাঈম বলছিল, আপনার সাথে এতটা দিন গেল, একদিনও কথা হয়নি। আজকের পর আর দেখা হবে কিনা জানি না। আপনার সুন্দর জীবন কামনা করি।

কিন্তু পরের দিন ফ্লাইট না পাওয়ার কারণে আমরা শুধু পাকিস্তানি, (একজন কাশ্মীরি যিনি নিজেকে ভারতীয় নাগরিক বলে মেনে নিচ্ছিলেন না এবং মনে করতেন পাকিস্তান তাদের দেশ) আর আমাকে থেকে যেতে হলো। আমরা থামেলে গেলাম শপিংয়ের উদ্দেশ্যে। একটা ক্যাবে গাদাগাদি করে চারজন পাকিস্তানিসহ আমি।

‘মে’ ছিল মিয়ানমারের বুদ্ধিস্ট মেয়েটার নাম। তার নাম উচ্চারণে বাংলা ‘মেয়ে’র মতো শোনায়। তাকে এই কথা বলাতে সে বলল, তার বংশে সে একমাত্র মেয়ে তাই হয়তো তার মা আদর করে এ নাম রেখেছে। মিয়ানমার থেকে তিনজন মেয়ে আমাদের সাথে ট্রেনিংয়ে ছিল। বাকি দুজনের একজন মুসলিম, একজন ক্রিশ্চান।

ক্লাসের দ্বিতীয় দিন মে সবাইকে তাদের দেশের আঁচার, চকলেট গিফট করল। এবং পরের সময়গুলোতে সে বেশ কজনের বন্ধু হয়ে গেল তার রুমে মদের আসর জমিয়ে। তিব্বতিয়ান মেয়েরা আর মিয়ানমারের মে মদে বুঁদ হতে পছন্দ করত। আফগান ছেলেরাও। আফগান ছেলেরা বারবার এলার্ট করছিল যে, তারা মেয়েদের সাথে নাচছে এ ছবি ফেসবুকে যেন না দেওয়া হয়। বলল, তাদের দেশে বিয়ে করা অনেক কঠিন। সহজে মেয়ের পরিবার যে কোনো ছেলের কাছে বিয়ে দেয় না। সাঈদ বলছিল, বিয়ে করার জন্য সে ৩৪ বার মেয়ের বাবার কাছে প্রপোজাল পাঠায়। তারপর তার বিয়ে হয়।

জাম্মুই ছিল মিয়ানমারের, ক্রিশ্চান। ক্লোজিং পার্টি শেষে আমরা দুজন যখন সিঁড়ি দিয়ে নামছিলাম সে বলল, তুমি তো ভালো নাচতে পারো! তার প্রশংসায় আমার খুশি লাগতেছিল। কারণ এর আগে আমি এভাবে ডান্স করিইনি।

ড. হামিদা, হেড অফ ইংলিশ ডিপার্টমেন্ট, কাশ্মীর ইউনিভার্সিটি। আমাদের দুজনের ফ্লাইট কয়েক ঘণ্টা আগ পিছ হওয়ার ফলে আমরা গাড়িতে একসাথে এয়ারপোর্ট থেকে ইন করেছিলাম। সেই থেকে উনার সাথে আমার ভাব হয়ে গেছিল। উনি কোনোভাবেই নিজেকে ইন্ডিয়ান বলতে রাজি না। ক্লাসে প্রসঙ্গ এলেই তিনি ইন্ডিয়ার গোষ্ঠী উদ্ধার করতেন। আর পাকিস্তানিদেরকে তার মনে হতো বেহেস্তের বাসিন্দা। তাদের সাথে সুন্দর মজার কথা বলতেন।

জার্মানির উয়ান আমাদের ক্লাস নিয়েছেন শেষের সপ্তাহ। আমাদের বলা হয়েছিল, জার্মানি টাইম ৯টা মানে ৮.৪৫। এবং ক্লাসে সে প্রতিটা পার্টিসিপেন্টকে মনোযোগী করতেও বাধ্য করেছিলেন।

মেয়েরা বলাবলি করছিল, উয়ানকে তাদের পছন্দ নয়। কিন্তু আমার তাকে অনেক ভালো লেগেছিল। আমার বাবাও এমন টাইম মেইন্টেইন করে চলে। ৯টা মানে ৮.৪৫-এ পৌঁছে যাওয়া। উয়ানের বলা আর তার কাজ করা যেন তীরের মতন। প্রতিটি কাজে তাকে আমার অনেস্ট এবং বুদ্ধিদীপ্ত মনে হচ্ছিল। ক্লাসের একটা রোল প্লে করতে উয়ান আমাকে আর বেলুচি মেয়ে রায়লাকে চুজ করে।

রায়লাকে দেখে প্রথম প্রথম তার দিকে শুধু তাকিয়ে থাকতাম। তার আকর্ষণীয় পুরু ঠোঁট যেমনটি নায়িকা নার্গিস ফাখরির। মনে মনে এ সিদ্ধান্তে আসলাম যে, বেলুচি মেয়েদের ঠোঁট বোধহয় এমন সেক্সিই হয়। তবে শরীর বাঙালি মেয়েদের মতো ভারী। সাধারণত পাকিস্তানি মেয়েরা স্লিম হয় তাই জানতাম।/uploads/files/PUsUX0Q9W9HUf8CmrTroJsIFUmznRDFw3DV8QTvG.jpegরায়লার সাথে মিয়ানমারের সাই ছেলেটার ভাব ছিল। দুজনের শরীরের গঠনগত মিলও ছিল। চ্যাপ্টা এবং মাঝারি সাইজ। সাই যেদিন চলে যাচ্ছিল সে আমাকে হাগ করছিল আমি একটু ফেয়ারভাবে করতে গেছিলাম সেখানে সে আরো জোরে চেপে ধরল। বন্ধুত্বের প্রেমের শেষ প্রকাশটা বুঝিয়ে গেল।

বিদায়ের সময় আমরা সবাই সবাইকে হাগ করছি। কিন্তু সেটা আফগান, নেপাল, পাকিস্তানের ছেলেদের সাথে হয়নি। আমাদের নর্মস্ কোথায় যেন বাধা দিয়েছিল!

রুমে আমি ও দুজন তিব্বতিয়ান ছিলাম। একজন ইউএস’র সিটিজেন ছিল। তিব্বতিয়ানরা নিপীড়িত, এসাইলাম হিসেবে ইউরোপ, আমেরিকাতে তাদের সিটিজেনশিপ সহজ। তাছাড়া সারা নেপালজুড়ে তিব্বতিদের বসতি। রিফিউজি হিসেবে থাকছে। কিছু ইন্ডিয়াতেও আছে। দালাই লামার অনুসারীরা কখনো কাউকে আঘাত করে না। উল্টো অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে নিজেকে শেষ করে ফেলে। ক্লাসের সেশনে তারা বারবার এ কথাগুলোই বলে যাচ্ছিল। যেন, এখানে কেউ তাদের জাতিকে উদ্ধার করতে এসেছে! কেউ বুঝি মুক্তি দিতে এসেছে!

আমার রুমমেট ডোঙ্গা বলছিল, তাদের মা বাবা কিভাবে বরফের ওপর দিয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটতে ছুটতে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল। প্রতিনিয়ত কত লোক সেখানে সুইসাইড করে নিজেকে মুক্তি দিচ্ছে। আজ চায়না পরাশক্তি। ওয়ার্ল্ড তাদের সাথে খাতির রেখে চলে। তিব্বতিয়ানদের পাশে দাঁড়ায় না কেউ। নিজেদের ভাষাকেই রক্ষা করতে পারছে না তারা, পুরোই জিম্মি হয়ে আছে।

একজন আফগানি বিরক্ত হয়ে বলছিল, তোমরা যদি প্রতিবাদ না করো, দালাই লামা যদি বলে প্রতিবাদ করা যাবে না, কাউকে আঘাত করা যাবে না, শান্তির মাধ্যমে কিভাবে স্বাধীনতা চাও!

প্রয়োজন ছাড়া সেশনগুলোতে কম কম কথা বলছিলাম। এমনিতেই আমি কম কথা বলি। উয়ান সবাইকে নিজের সম্পর্কে এবং নিজের দেশ সম্পর্কে যখন বলতে বলছিল আমি বললাম, আমার মাতৃভাষা বাংলা, পৃথিবীতে এই একমাত্র দেশ যারা নিজের ভাষার জন্য লড়াই করেছিল। আই ফিল প্রাউড টু বি বাঙালি। এছাড়া আমি আসলে ব্যস্ত ছিলাম অন্যদের ধারণাগুলো বুঝে নেওয়াতে। সেশনে যে যার দেশের কনফ্লিক্ট নিয়ে আলোচনা করে যাচ্ছিল।

আমাদের ফ্যাকাল্টি উয়ান ইউএন মিশনে মিডিয়েটর হিসেবে কাজ করেছিলেন। তিনি আমাদের টাস্ক দিলেন নিজের দেখা বা শোনা বা মিডিয়েটর হিসেবে কাজ করেছে এমন কিছু আমাদের শেয়ার করতে হবে। ফিলিপিনো দুজন মেয়ে ছিল। তারা গভমেন্টের সাথে খনির শ্রমিকদের কনফ্লিক্ট এবং তার নেগোসিয়েশন নিয়ে আলোচনা করেছিল।  

ওদের দুজনের বয়স বোঝা মুশকিল ছিল। আমার যদ্দূর মনে হলো কুইনি গভমেন্টের কোনো ডিপার্টমেন্টের অফিসার। তাদের উচ্চতা ৫ ফিটের চেয়ে কম, স্লিম। ঠান্ডা মাথায়  বুঝেশুনে সফটলি কথা বলে। আমার আর ড. হামিদার অবজারভেশন, এরা সবার চেয়ে ম্যাচিউরড্ ফিমেইল ছিল। তবে, শী মেয়েটা আমাকে অকারণে ছোট করার চেষ্টা করত। এশিয়ান মেয়েদের কমন প্রবলেম হতে পারে। পরে দেশে ফিরে তার কোনো রিয়েলাইজেশান হয়েছে হয়তো। আমার সাথে কন্টাক্ট করে কয়েকবার  খবরাখবর নিয়েছিল। ফিলিপিনস কৃষির অর্থনীতি দিয়ে এত এগিয়ে গেছে। বাংলাদেশে কৃষিবিদরা অনেকেই দেখা যায় ফিলিপিনসে পিএইচডি করতে যায়। দেশের ধান গবেষণার অনেককেই ফিলিপিনসে পাওয়া যাবে যে কোনো সময়।

প্রথম তিনদিন বাংলাদেশি হিসেবে আমি একা ছিলাম। পরে অরূপ এসে জয়েন করে। প্রেজেন্টেশানে আমাদের হিলট্রেক্স কনফ্লিক্ট নিয়ে সাজাতে হলো যেহেতু উপস্থাপনের মতো আমাদের আর কোনো কনফ্লিক্ট ছিল না এবং তা আসলেই নেই। আমি বিজনেস ব্যাগগ্রাউন্ডের লোক। অরূপের ওপর ভরসা করে ছেড়ে দিলাম। তার ডেভেলপম্যান্ট স্টাডিজ। তবে কথা হলো, হিলট্রেক্স নিয়ে আমাদের পিস একরড্ হয়ে যায় ১৯৯৭-এ। ক্লাসের অনেকে বিশেষ করে পাকিস্তানিরা খুব করে জানতে চায় বাংলাদেশে কি আর কোনো কনফ্লিক্ট নেই! নাঈম প্রশ্ন করছিল, সমাজে কোনো ক্রাইম হলে তার সমাধান কিভাবে করো? আমরা বলছিলাম, আমাদের রাষ্ট্রীয় আইনে তার সমাধান হয়। আফগানিরা জার্গা সিস্টেমে তাদের বিচার কাজ করে এবং পাকিস্তানেও এটা চালু  আছে। আমাদের গণতন্ত্রের ব্যাপারটাতে তারা একটু অবাক হলো। জার্গা আমাদের দেশে গ্রামে চালু থাকা পাঞ্চায়েত সভার মতো একটা ব্যাপার হলেও এটা খুব ভয়ানক ব্যাপার। দুই এলাকার দুই প্রধানরা প্রচুর খুনাখুনির কাজ করে সমাধানে না পৌঁছাতে পারলে। পাঞ্চায়েত সিস্টেমের ব্যাপারে আমি জেনেছিলাম কারণ আমার দাদা পাঞ্চায়েত সভাপতি ছিলেন। সে সময় গ্রামের লোকেরা অতো চৌকস ছিল না। নিরীহভাবে জীবন চালাত। সালিশের একটা ধমকেই কাবু হয়ে যেত।

আফগানিরা বলছিল, তাদের দেশে তালিবানদের উৎপাত এবং সবসময় যুদ্ধ বিগ্রহ লেগে থাকার পেছনে কলকাঠি নাড়ছে পাকিস্তানিরা এবং যেজন্যে ভৌগোলিক জায়গা থেকে আফগান অর্থনীতিতে অনেক সম্ভাবনাময় অবস্থানে থেকেও নিজেদের উন্নতি করতে পারছে না। পাকিস্তানিদের তারা খুব অপছন্দ করছিল।

আমাদের আরেকজন ফ্যাকাল্টি ছিলেন আজরা। প্রথম কদিন আমি শুধু তার দিকে তাকিয়ে থাকতাম। তার পোশাক এতটাই সেক্স এপিল দেখাচ্ছিল। আজরা টার্কি ইউনিভার্সিটির টিচার।

আজরার পোশাক ছিল একটা ফ্রক, হাঁটুর উপরে। বেশ বড় গলার কাট। অবশ্য পায়ে স্কিনি কালো সক্স। ওটা পা বলে ঠাউর হবে কিন্তু কালো আবরণে ঢাকা।

আমার শুধু মনে হচ্ছিল এই টার্কিশ এসে বাংলার মানুষকে মুসলমান বানিয়ে গেছে। কিন্তু তারা নিজেরা যথেষ্ট ওপেন চলছে। আজরা বলছিল, তাদের দেশ হান্ড্রেড পার্সেন্ট মুসলিম হলেও সেখানে মুসলিমদের মধ্যেও ভায়োলেশান আছে। যেমন, পশু জবাই নিয়ে মুসলিম-এন্ট্রি চিন্তার দল আছে যারা জীবহত্যাকে পাপ মনে করে।

পোশাক পরিধানে আমার ফিলিপিনো মেয়েদের আধুনিক মনে হয়েছে। তাদের  ট্রেডিশনাল পোশাকটিও অনেক সুন্দর। বিউটি বোনের নিচে থেকে হাঁটুর উপর তাদের পোশাক যেখানে স্লিভ নেই। শুধু শরীরটা মোড়ানো। পোশাকের দিক থেকে ইন্ডিয়া, নেপাল আর ফিলিপিনিরা পশ্চিমা পোশাকে অনুরক্ত আর নেপাল টুরিস্ট কান্ট্রি বলেই হয়তো পশ্চিমাদের ধাঁচ তাদের সাথে মিশে গেছে। সেখানে অল্প আধটু সবাই ইংলিশ বলতে জানে। রাস্তায় নেপালি নারীরা শাড়ি পরে স্কুটি চালাচ্ছে এমন দেখা যায়। অকেশানে নেপালি মেয়েরা শাড়ি পরে দেখলাম ইন্ডিয়ান নায়িকাদের স্টাইলে, খোলা পিঠ এবং পেট দেখিয়ে। প্রথমদিন যখন নেপালে ঢুকছিলাম রাস্তায় প্রচুর মেয়ে তারা সবাই মাঝারি সাইজের প্যান্ট আর জ্যাকেট পরা, হয়তো গলায় স্কার্ফ ঝুলিয়েছে কেউ কেউ। সবাইকে একরকম লাগছিল। শীতের সময় আমাদের গুলশানের কর্পোরেট মেয়েদের দেখতেই আমার বেশি স্মার্ট লাগে। থ্রি-পিসের সাথে সোয়েটার।

নেপালে আমি শুধু একটা ছুপ্পা কিনতে চেয়েছিলাম। ওটা তিব্বতিদের পোশাক। পরলে  প্রিন্সেস প্রিন্সেস মনে হতো।

নেপালি মেয়েরা যতটা সুন্দরী ছেলেরা ততটাই আনকালচারড্। সেখানে যাবার আগে আমাকে তাই বলছিল আমার এক কাজিন। রাজিব নামের এক নেপালি ছিল, দেখতে আমাদের দেশের ছেলেদের মতোই। আমাকে বলছিল সে ইউনিভার্সিটির টিচার। কিন্তু তার সাথে কথা বলে আমার ডাউট হলো। পরে জানতে পারলাম আসলে নেপালের সব কলেজগুলো ইউনিভার্সিটির আন্ডারে। আর সেখানে নৈশ ক্লাসের ব্যবস্থা আছে। সেখানে সে টিচার। তার নাম উচ্চারণে আমাদের সতর্ক করে দিলো যেন ‘জ’ এর  ওপর বেশি মাত্রা আরোপ করে না ডাকি তাইলে সেটা আরব কান্ট্রির মুসলমানের নাম হয়ে যাবে। আমাদের সবার ধারণা নেপাল একটি বুদ্ধিস্ট কান্ট্রি। কিন্তু রাজিব আমাকে জানাল, নেপাল হিন্দুপ্রধান দেশ তবে ওদের দেশে খাঁটি হিন্দু খুঁজে পাওয়া মুশকিল। নেপালিরা হিন্দুইজম এবং বুদ্ধইজম দুটো মিলে একটা ধর্ম পালন করে থাকে।/uploads/files/9yMS0ydJPiPkQYDeGtAlTcZel31sYgSa8YcA3Ylz.jpegপ্রথমদিন লাঞ্চব্রেকে আমি রাজিবকে নিয়ে খাবার খেতে বের হই। ওই সময়টাতে তেমন খাবার পাওয়া যায় না রাজিব তাই বলল। কারণ, সকাল এগারোটার মধ্যে তারা ভারী খাবার খেয়ে থাকে। দুপুরবেলা হাল্কা খাবার খায়। আবার সন্ধ্যে ৮-৯টার মধ্যেই তাদের ডিনার শেষ করে থাকে। আমরা শহরের শেষ প্রান্তে ছিলাম বলে তেমন রেস্টুরেন্ট খুঁজে পাচ্ছিলাম না। শেষমেশ লাঞ্চ হিসেবে বাঁশের নতুন শাখা দিয়ে তৈরি স্যুপ আর ডিমের ভাপে দেওয়া একটা পিঠা খেলাম যেটা নেপালি ট্রেডিশনাল খাবার ছিল। নেপালের মম আমি এত খেয়েছি যে আর কখনো মম খেতে ইচ্ছে জাগবে না। দেখলাম ওখানে রাস্তায় দাঁড়িয়ে লাইন ধরে লোকজন মম খায় ভেড়ার মাংস দিয়ে বানানোটা। পরবর্তী সময়গুলোতে আমি খেতাম রুটি আর রাজমা যেটা কিডনি বিনের কারি অথবা আলু মটর যেটাকে আমরা ইন্ডিয়ান খাবার ছোলাবাটুরা নামে জানি। কিডনি বিনের চাষ হচ্ছে এখন আমাদের গ্রামেও। আমাদের গ্রাম হিন্দুপ্রধান বলেই এটা জনপ্রিয় হচ্ছে বলে আমার মায়ের ধারণা। তবে ব্যাংকক শহরের মতো জোড়া সেদ্ধ ডিম, কলার ডজন বা হাফ ডজন ছাড়া বিক্রি করে না তারা। আমাদের দেশের মতো হালির চল নেই সেখানে।

২০১৫’র অক্টোবরে নেপালে নতুন সরকার আসে। ফিমেইল প্রেসিডেন্ট দায়িত্ব নেন। আমাদের প্রোগ্রামের শিডিউল ছিল ডিসেম্বর মাসে যখন তাপমাত্রা ৩-৪ ডিগ্রিতে। নেপালিরা বলছিল, তাদের দেশে ঠান্ডা পড়লেও কুয়াশা পড়ে না। তারা কুয়াশাকে ঘৃণা করে আর এবং আমাদের দেশে কুয়াশা পড়ে। ঠান্ডার কারণে নেপালে  কুকুরের বংশবিস্তার প্রচুর। কুকুরকে অনেক সেবাও করে তারা। নেপালি ভাষার সাথে আমাদের ভাষার মিল পাওয়া যায়, যেমন হিন্দি ভাষার কিছু মিল। ওদের পত্রিকায় কিছু শব্দ দেখে কী লিখেছে শব্দগুলো বুঝতে পারতাম। তারা ধন্যবাদ শব্দটি উচ্চারণ করে খুব।

সে সময়ে নেপালে ডিজেস্টার  চলছিল। নেপালের কিছু এথনিক গ্রুপ নতুন সরকারের কন্সটিটিউশানের ব্যাপারে প্রটেস্ট করছিল আর সেই এথনিকদের ব্যাপারে কনসার্ন হওয়ার জন্য নেপালের সরকারকে বলে ইন্ডিয়া। বর্ডার দিয়ে ফুয়েল আসা প্রায় বন্ধ করে রেখেছিল ইন্ডিয়া। ইন্ডিয়া থেকে আসা  ফুয়েল দিয়ে চলতে হয় নেপালকে। নেপালে যানবাহনের ‘কস্ট’ বেড়ে গেল। বিদ্যুৎ থাকত না ঠিকমতো। রাস্তাঘাট অন্ধকার হয়ে থাকত। এরকম ট্রেনিং শেষে আমি একা সন্ধ্যায় রেস্টহাউসে ফিরছিলাম। অন্ধকারে অস্থির হয়ে পড়ি কিন্তু পরে এটুকু নিশ্চিত ছিলাম নেপালে এভাবে কোনো মেয়ে ফরেনার একা চললে লোকে হেল্প করবে কখনো ইনসিকিউরড হবে না। মোড়ে কিছু ইয়াং ছেলেপেলে টিজ করেনি যে তাও না। আমার লম্বা চুল ছিল আর চুল ছেড়ে চলাতে আমি অভ্যস্ত। ওরা হিন্দিতে বাল বাল বলে কিছু বলতেছিল আর হাসাহাসিও করছিল।

একটি দেশের অর্থনীতি পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল ভাবতে অবাক লাগত! আর তাদের সহযোগিতা করছে বিদেশি এনজিওরা। আমি দেখলাম, তারা পশ্চিমাদের বেশ ভক্তি করছে, লবিংয়ের চেষ্টা করছে। এছাড়া তাদের উপায়ও নেই। আমাদের দেশ এখন বলতে গেলে বেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ। আজকাল কোনো এনজিও’র দরকার পড়ে না। পাকিস্তানে প্রচুর এনজিও কাজ করে। আফগানেও।

আমরা বারবার এই কথাই বলে যাচ্ছিলাম, আমাদের কোনো কনফ্লিক্ট নেই। আমরা আমাদের দেশে শান্তিতে বসবাস করছি। এক তিব্বতিয়ান জেলাস হয়ে বলছিল, তোমাদের দেশে তো ব্লগারদের মেরে ফেলে এথিজম নিয়ে কথা বললে। আফগানরা বলছিল, ইস! তোমাদের দেশে গিয়ে যদি থাকতে পারতাম। পাকিস্তানিরাও শ্লেষ গেয়ে যাচ্ছিল এ নিয়ে।

আপনার মতামত লিখুন :