Barta24

মঙ্গলবার, ১৬ জুলাই ২০১৯, ৩১ আষাঢ় ১৪২৬

English Version

আধুনিক বাংলা কবিতার নাগরিক কণ্ঠস্বর

আধুনিক বাংলা কবিতার নাগরিক কণ্ঠস্বর
কবি শহীদ কাদরী।
ড. মাহফুজ পারভেজ
কন্ট্রিবিউটিং এডিটর
বার্তা২৪.কম


  • Font increase
  • Font Decrease

'বন্য শূকর খুঁজে পাবে প্রিয় কাদা/মাছরাঙা পাবে অন্বেষণের মাছ/কালো রাতগুলো বৃষ্টিতে হবে শাদা/ঘন জঙ্গলে ময়ূর দেখাবে নাচ/প্রেমিক মিলবে প্রেমিকার সাথে ঠিক-ই/কিন্তু শান্তি পাবে না, পাবে না, পাবে না…'

(সঙ্গতি/শহীদ কাদরী)

তার প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ মাত্র চারটি। মোট কবিতার সংখ্যা মাত্র ১২৬টি। কাব্যগ্রন্থ তিনটি প্রকাশিত হয়েছে মোটামুটি ৫/৭ বছরের বিরতিতে। শেষটি তিরিশ বছর পর। প্রবাস থেকে লেখা। তবু তিনি আধুনিক বাংলা কবিতার অপরিহার্য অংশ, নাগরিক কণ্ঠস্বর।

পঞ্চাশ দশকে বহুপ্রজ কাব্য প্রতিভার মিছিলের অনন্য পুরুষ শহীদ কাদরী (১৪ আগস্ট ১৯৪২ - ২৮ আগস্ট ২০১৬), কবিতায় নাগরিক বোধ ও বিষয়ের স্বাতন্ত্রিক উপস্থাপনায় উজ্জ্বলতম ব্যক্তিত্ব। আজ (মঙ্গলবার) তার দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিিকী।

শহীদ কাদরী তৎকালীন অবিভক্ত ব্রিটিশ বাংলার রাজধানী শহর কলকাতার মুসলিম অধ্যুষিত পার্ক সার্কাস এলাকায় জন্ম নেন এবং কলকাতা শহরেই তার শৈশব কাটান। পরবর্তীতে ১৯৫২ সালের দিকে দশ বছর বয়সে তিনি পরিবারের সঙ্গে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) রাজধানী ঢাকায় চলে আসেন।

যৌবন ও পরিণত বয়সের প্রায় তিন দশক তিনি ঢাকা শহরে অবস্থান করেন এবং ১৯৭৮ সালে আবার দেশান্তরী হয়ে প্রবাসজীবন শুরু করেন। তিনি বার্লিন, লন্ডন, বোস্টন হয়ে অবশেষে মৃত্যুর পূর্ব-পর্যন্ত নিউইয়র্কে বসবাস করেন। এবং ২০১৬ সালের ২৮ আগস্ট নর্থ শোর বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ২০ মিনিটে ৭৪ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।


দীর্ঘজীবনে তাঁর কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা অত্যল্প হলেও সেগুলে পাঠকপ্রিয় ও আলোচিত। উত্তরাধিকার (১৯৬৭), তোমাকে অভিবাদন, প্রিয়তমা (১৯৭৪), কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই (১৯৭৮) এবং আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও (২০০৯) ছাড়াও তার দুটি সংকলন হলো: শহীদ কাদরীর কবিতা এবং তোমার জন্যে।


আমুণ্ডু শহরবাসী নাগরিক তিনি। শহরে শহরে কেটেছে তার জীবন। জীবনে ও কবিতায় তার কোনও গ্রাম, গ্রামীণ আবহ বা অনুষঙ্গ ছিল না। এ কারণে শহীদ কাদরী আধুনিক কবিদের মধ্যে নাগরিক-জীবন-সম্পর্কিত শব্দ চয়নের মাধ্যমে বাংলা কবিতায় নাগরিকতা ও আধুনিকতাবোধের সূচনা করতে পেরেছিলেন।

সম্ভবত তিনিই প্রথম আধুনিক নাগরিক জীবনের প্রাত্যহিক অভিব্যক্তির অভিজ্ঞতাকে কবিতায় রূপ দিয়েছেন। দেশপ্রেম, অসাম্প্রদায়িকতা, বিশ্ববোধ এবং প্রকৃতি ও নগর জীবনের অভিব্যক্তি তার কবিতার ভাষা, ভঙ্গি ও বক্তব্যেকে বৈশিষ্ট্যায়িত করেছে। শহর এবং তার সভ্যতার বিকারকে তিনি ব্যবহার করেছেন তার কাব্যে। তার কবিতায় অনুভূতির গভীরতা, চিন্তার সুক্ষ্ণতা ও রূপগত পরিচর্যার পরিচয় সুস্পষ্ট। নাগরিক যন্ত্রণার অভিব্যক্তিকে তিনি প্রেমে ও প্রকৃতিতে প্রযুক্ত করেছেন। নাগরিক অভিজ্ঞানে বৃষ্টিকে বলেছেন সন্ত্রাস আর চেকের বদলে গোলাপকে পাঠিয়েছেন ব্যাঙ্কে।

শহীদ কাদরীর প্রকাশিত মাত্র চারটি গ্রন্থে সন্নিবেশিত কবিতার সংখ্যা ১২২টি। পরবর্তীতে তিনি আরও চারটি কবিতা লিখেন, যার তিনটি ছাপা হয় 'কালি ও কলম' সাহিত্য পত্রিকায় আর একটি অন্য কাগজে। সব মিলিয়ে তার কবিতা সংখ্যা মাত্র ১২৬টি। অতি অল্প লিখেই তিনি বিখ্যাত, আলোচিত ও পাঠকপ্রিয় হয়েছেন।


১৯৭৩ সালে বাংলা কবিতায় অবদানের জন্য তিনি বাংলা একাডেমী পুরস্কার পেয়েছেন। ২০১১ সালে ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার একুশে পদকও পেয়েছেন।


আলাদা কাব্যবৈশিষ্ট্যের জন্য এবং নাগরিক-কাব্যভাষ্য নির্মাণের সফলতার নিরিখে শহীদ কাদরী আধুনিক বাংলা কবিতার ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য হয়ে থাকবেন। অনন্য মর্যাদায় তিনি স্থায়ীভাবে রয়ে যাবেন বাংলা কবিতার পাঠকচিত্তে।

 

আপনার মতামত লিখুন :

মৌসুমি বায়ু আসে

মৌসুমি বায়ু আসে
অলঙ্করণ কাব্য কারিম

নাদিরার আজ অন্য রূপ।
অন্যদিন নাদিরা আমার কাছে আসত ক্যাজুয়ালি। লিপস্টিক যদিও থাকে তার ঠোঁটে। লাল টকটকে রাশান লিপস্টিক মেখে আসে সে। ওর ফর্সা ত্বকের সঙ্গে লাল রঙটা খুব যায়। কিন্তু এটুকুই। একটা সালোয়ার বা একটা টপ পরে আলুথালু চুলে নাদিরা আমার কাছে আসত। আজ রোজার মধ্যেই লিপস্টিকের সাজ না দিলেও সে পরিপাটি। অন্তত চুল বাঁধা। নাদিরার চুল স্ট্রেট অ্যান্ড সিল্কি। মিহি চুলগুলা কিছুটা ব্রাউনিশ। এগুলো সে বেশিরভাগ সময় ছেড়ে আসত। বা খোঁপা যদি একটা বাঁধতও তো আশপাশে চুল উড়ত। কিন্তু আজ সে টাইট করে চুল বেঁধে এসেছে। ক্লিপ দিয়েছে, মাথাটা একটু উঁচা উঁচা লাগছে। আরো একটা ব্যাপার আছে। নাদিরা আজ আমাকে খাওয়াবে। বলতে গেলে এই প্রথম সে আমাকে খাওয়াবে মানে ইফতার করাবে। এই ট্রিটটা সে কেন দেবে জানি না। কারণও বলে নাই। ওকে কিছু জিজ্ঞাস করলে অনেক কথায় উত্তর দেয়। বলে, ‘তোরে কী আমি খাওয়াইতে পারি না একটা দিন? তুই আমারে কী ভাবিস’—এসব।

কিন্তু যে বিষয়টা নাদিরার রূপ সবচেয়ে কড়াভাবে বদলে দিয়েছে, তা হলো সে আজ শিশিরের নাম একবারও উচ্চারণ করে নাই। অন্যদিন নাদিরার আলাপের মূল বিষয় শিশির। তাকে নাদিরা গুরু ডাকে। শিশির নাদিরার জীবনের দার্শনিক। তাকে সে অন্য চোখে দ্যাখে। শিশিরকে সে নিজের জীবনদর্শনের একটা উঁচা জায়গায় রেখে দিয়েছে। গুরুর হাজার প্রসংশা, ন্যূনতম সমালোচনা আর অল্প-স্বল্প বিরক্তি মিলিয়ে সারাক্ষণ গুরুই নাদিরার আলোচ্য বিষয়। আমার দিক থেকে নাদিরার সঙ্গ পাওয়ার জন্য গুরুর আলাপ শুনতে হয়। ওকে যদিও একটু খাওয়াতে হয়। কিন্তু আমার নারীসঙ্গ ভালো লাগে বলে ওর জন্য এই খরচটুকু সামান্যই। তবে বোনাসও আছে সঙ্গে। সেটা শিশিরের বা অন্যদের খবর পাওয়া। শিশিরের কাছে না গিয়ে, বাংলার চলমান সাহিত্যের কারো কাছে না গিয়েও, ওদের বিষয়ে আমার আগ্রহ নাই বাইরে বাইরে এটা দেখিয়ে চলা অব্যাহত রেখেও সহজে ওদের বিষয়ে জানার উপায় নাদিরা। এবং আমাদের এসব সাক্ষাত বা আলাপ গোপন রাখাটা ছিল নিজেদের মধ্যে একমাত্র শর্ত।

শিশির গল্প লেখে। সে বিয়ে করে নাই। আমি করেছি এবং গল্প লেখি না। কিন্তু নাদিরার আমি বন্ধু। আর নাদিরা শিশিরের বোজম। ওদের বন্ধুত্বের শুরুটা বইমেলা থেকে। আরেক বন্ধুর হাত ধরে। আমার সঙ্গে নাদিরার বন্ধুত্ব বিশ্ববিদ্যালয়ে। এরপর সেই বন্ধুত্ব ক্ষুণ্ন হয়। আমরা একে অন্যের থেকে দূরে সরে যাই। এরপর আমাদের দেখা ঘটবার কারণ ছিল আমার শ্বশুরবাড়ি। আর সেটা ময়মনসিংহ। ঠিক ময়মনসিংহও না নেত্রকোনা সীমানায়। সেখানে নাদিরাদেরও বাড়ি। নাদিরার সঙ্গে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা, একান্তে আড্ডা দেওয়া কিম্বা খাওয়ানোর মতো সম্পর্ক ছিল না। ইনফ্যাক্ট আমি তাকে দেখেছি কিন্তু আলাপ হয় নাইয়ের মতো একটা সম্পর্ক ছিল। এই সম্পর্কটা একই বিশ্ববিদ্যালয়ে যতটা থাকে ততটা আরকি। আছেও আবার নাইও সম্পর্ক। বিয়ের পর বউয়ের কাছ থেকে ওদের এলাকাগত নৈকট্য জানার পর নাদিরা আবার ফিরে এলো আমার জীবনে। ফেসবুকে আমি তাকে অনেকদিন পর, বিশ্ববিদ্যালয় পার হয়ে যাওয়ারও সেই কত পরে, জিজ্ঞেস করলাম, কেমন আছিস?

নাদিরা অন্য রকম মেয়ে। খোলামেলা, উড়ু উড়ু। একটা ছেলের সঙ্গে ওর চৌদ্দ বছরের সম্পর্ক ছিল। বিয়ের পর নাদিরাকে চাকরি করতে দেবে না বলে সেই বিয়ে আর হলো না। নাদিরা সেই থেকে একা থাকে। ওই ছেলে বিদেশ। চৌদ্দ বছরের সম্পর্ককে নাদিরা নিজের স্বাধীনতার জন্য বিসর্জন দিয়ে এলো। ওর জীবনে অনেক কাহিনী। প্রেমছাড়া হওয়ার পর বেশিরভাগ কাহিনীর সঙ্গে শিশিরের যোগাযোগ। অথচ আজ আর সে শিশিরের কথা বলতেছিল না একদমই। খালি নিজের এসব কথা আবার করে বলতেছিল। চৌদ্দ বছরের সম্পর্কের কথা। কত ঘুরেছে তারা। এই ঢাকা শহরের হেন রাস্তা নাই তারা রিকশায় ঘুরে নাই। পুরান ঢাকা টু বনানী—হেন রেস্টুরেন্ট নাই তারা খায় নাই। চৌদ্দ বছরের তুলনায় ঢাকা খুব ছোট একটা শহর। তবু তাদের প্রেম তো দমে নাই, ঘুরাঘুরি থামে নাই, শোয়াতে কম পড়ে নাই। অথচ চাকরির জন্য সব বিসর্জনে গেল। এই যে কত কথা, কত ঘটনা, অনুরাগ সব কিছুই কি ফ্যালনা? আমার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায়া জানতে চাইল নাদিরা।

: বুঝলি মানুষ সবচেয়ে হারামি প্রাণী আর এর মধ্যে পুরুষরা বেশি হারামি। তুই আবার রাগ করিস না। তোর সাথে যে কেন আমার আগে দেখা হলো না। আমার আসলে তোদের সঙ্গে বেশি মেলে বুঝলি। ওই যে একটু বুদ্ধিজীবী টাইপ। নানা বিষয় নিয়ে কথা বলবে। তোদের মধ্যে এই ফ্রি ফ্রি ভাবটা আমার বেশ লাগে। কিন্তু আমি কিনা সম্পর্ক করলাম একটা গেরস্থ ছেলের সঙ্গে আর সেটা বুঝতে আমার চৌদ্দ বছর লাগবে?

আজ যেন নাদিরা কেঁদে দিবে। জ্যৈষ্ঠের শেষ দিকে ভাসতে ভাসতে আকাশে জমতে থাকা নতুন মেঘের মতো দলা দলা না-পাওয়ার বেদনা ওর চোখেমুখে। কাজল দেওয়া চোখে ভাব জমেছে। আমরা বসছি শুক্রাবাদের ‘হটহাট’-এ। এই জায়গাটা নাদিরার সবচেয়ে পছন্দ। ঢাকা ছোট হলেও এর মধ্যে এত চিপাচাপা যে অগম্যতা থেকেই যায়। চৌদ্দ বছরের দীর্ঘ প্রেমের পরও হটহাট-এ তাদের পায়ের চিহ্ন পড়ে নাই। এটা আমি নাদিরাকে প্রথম চেনাই। সে তো দেখেই অবাক। এমন নিরিবিলি, ছিমছাম একটা রেস্টুরেন্ট সে আগে দেখে নাই। এরপর থেকে এটা আমার আর নাদিরার কমন জায়গা। এখানে বসে সে শিশিরের কথা বলত আমাকে এতদিন।

: শিশির বুঝলি খুব শার্প একটা ছেলে। অন্য রকম একটা জায়গা আছে ওর মধ্যে। এই যে আমি যাই ওর বাসায়, কেউ থাকে না সেখানে তারপরও আমাকে একবারও ছুঁয়ে দেখে নাই। ওর চাহনির মধ্যেই এসব নাই আমার প্রতি। ওর গল্পের মধ্যে দেখিস না কেমন একটা বিয়োন্ড দ্য বাউন্ডারি ব্যাপার আছে। গল্পটা তো আসলে ইমাজিনেশনই বল। মানে এই যে তুই আর আমি গল্প করতেছি, কিন্তু এটা কি গল্প? গল্পে কল্পনাটা থাকতে হয়। শিশিরের আছে। ওর চোখ দুইটাই যেন কল্পনার রাজ্য বুঝলি।

এভাবে শিশিরের গুণকীর্তন আমার শুনে যাইতে হয়। সেটা নাদিরার কারণেই। ওর শরীরটা আমি দেখি, ওর হাসি, গহীন চোখ এসব দেখার জন্যই আমি নাদিরার ডাকে সাড়া দেই। ওরে ডাকি। কফি খাই। রাস্তার দিকে তাকাই। শুক্রাবাদের জঞ্জাল পার হয়ে কেমনে মানুষ যায়? নাদিরা থাকে ওর মায়ের সঙ্গে। বাবার লগে সেপারেশন হয়ে গেছে। নাদিরার বাবার অন্য মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল। সেটা তিনি গোপন করতেন। বাসায় সবসময় খিটখিট করতেন। সবাইকে সাপ্রেশনে রাখতেন। প্রতিদিন দিনের একটা সময়ে তিনি বাসার বাইরে থাকতেন। একদিন নাদিরা তার এক বন্ধুকে বলল ফলো করতে। দেখা গেল তিনি একজন বোরখা পরা মহিলাকে নিয়ে ঘুরছেন রিকশায়। নাদিরা তার বাবাকে কখনো পান-সিগারেট খেতে দেখেনি। রিকশায় বসে তিনি পান চিবাচ্ছেন আর সিগারেট খাচ্ছেন। বোরখা পরা মহিলার চেহারা দেখা যাচ্ছে না। চোখ দেখা যাচ্ছে শুধু। ফলো করতে করতে নাদিরার বন্ধু আদাবর পর্যন্ত গেল। সেখানে একটা ফ্যাকাশে চার তলা বিল্ডিংয়ে ঢুকলেন।

এসব আমাকে যতবার বলে, তত রাগে নাদিরার গা জ্বলে।
ফলো করতে করতে সেদিন ওই বাসার নিচে একটা চায়ের দোকানে বসে থাকে তার বন্ধু ঘণ্টার পর ঘণ্টা। দুপুরের পরে বেরিয়ে আসেন তার বাবা। নাদিরার বন্ধু নিজ বুদ্ধিতে নিজেকে আড়াল করার জন্য বোরখা পরে ছিল। সঙ্গে সঙ্গে নেকাব বেঁধে নেয়। দুধর্ষ সেসব অভিযানের দিনে শিশির ছিল নাদিরার পরামর্শদাতা, সহসদাতা। এসব ঘটনায় নাদিরার পরাজয় নাই, বরং জয় আছে—শিশির এভাবে তাকে মানসিক সান্ত্বনা দিত।

পঞ্চম দিনে নাদিরার বন্ধু নিজ সাহস ও বুদ্ধিতে হাতেনাতে ধরে ফেলে তার বাবাকে। ফলো করে উঠে যায় চারতলায়। কলিংবেল বাজিয়ে ঘরে ঢুকে পড়ে। তারপর বোরখার নেকাব খুলে দেখিয়ে দেয় নাদিরার বাবাকে নিজের মেয়ের বন্ধুর মুখ। নিজেও দেখে নেয় সেই মহিলাকে। তাদেরই বয়সী একটা মেয়ে। গ্রাম্য। একটা গার্মেন্টস কারখানায় কাজ করত। নাদিরার বাবা তাকে একটা প্রকাশনা হাউসে চাকরি নিয়ে দিয়েছিলেন। মেয়েটা দেখতে শ্যামলা। কিন্তু শরীরটা ছিল পোক্ত। ঠাস করে নাদিরার সেই বন্ধুর গালে একটা চড় লাগিয়ে দেয় তার বাবা। ছেলেটা হকচকিয়ে যায়। কিন্তু নাদিরার বাবা হৈ চৈ শুরু করে দেন। নিজের মেয়ের ফন্দিতে এসব হচ্ছে জেনে তিনি চোখের সামনে অস্বীকার করে বসেন তার কোনো মেয়ে নাই। এবং এই ছেলে অনুপ্রবেশকারী। এই মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক নিরাপদ রাখার জন্য লোকাল কিছু গুণ্ডাকে পুষতেন তিনি। তাদের ডেকে আনলেন। বললেন ছেলেটাকে পিটিয়ে ঘর থেকে বের করে দিতে। অপমানে, লজ্জায়, অসহায়ত্বে কুঁকড়ে গিয়ে রিক্ত, নিঃস্ব, সর্বশান্ত নাদিরা সেদিন এসব ঘটনার পর আবার বাড়ি ফিরে গেলেও সেটা ছিল তার কাছে ভাঙা হাটের মতো।

সেই থেকে শিশিরের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা। এতে ভীষণ আপ্লুত নাদিরা। এসব বিবরণ নাদিরা আমাকে দিয়েছে। শিশির তো পারত সেদিন তার দুর্বলতার সুযোগ নিতে। নাদিরা কি ফেলনা কিছু? সে দেখে না যে ছেলেরা তার দিকে কেমন করে তাকায়? কিন্তু শিশির, ও যেন সন্ত!

শিশিরের সঙ্গে যোগাযোগ ওর প্রথম প্রেমিকের সূত্রেই। শিশির যদিও বাম ছিল না কখনো। কিন্তু নাদিরার প্রথম ও জ্ঞাত একমাত্র প্রেমিক ছিল বাম। আজিজ সুপার মার্কেট, কাঁটাবন, শাহবাগ, তোপখানা রোড—এসব জায়গা ঢাকার বাম ও সাহিত্যিকদের জন্য কমন জায়গা।

আমি অবশ্য মফস্বল থেকে আসা। শিশিররা বরাবরই ঢাকার ছেলে। ওদের একটা চাপ আছে, ওরা পরিচিত, অনেক কিছু চেনে-জানে। আমার যেমন চিনতে-চিনতেই অনেক সময় চলে গেছে। এমনকি শিশিরকে চিনতেও। ঢাকায় সাহিত্য করতে এসে ঢাকার লোকদের না চিনে সাহিত্য করা যায় না। কিন্তু আমাকে না চিনে সাহিত্য করা যায়। ওদের ইন্টারোগেশনের চৌকাঠ পাড়ায়ে তারপর সাহিত্যিক স্বীকৃতি মেলা।

যাই হোক এসব জায়গার কোথাও শিশিরের সঙ্গে পরিচয় নাদিরার। তারপর হয়তো ফেসবুক, ওর সাহিত্যিক মনোযোগ—এগুলা করতে করতে প্রেমিকের সঙ্গে সম্পর্ক ছুটে গেলেও শিশিরের সঙ্গে রয়ে গেছে। সেই শিশির তার দুশ্চরিত্র বাবার স্বরূপ উন্মোচন কাহিনীর রচনাকার।

এরপর থেকে বাবার বিষয়ে তার ধারণা পাল্টে গেল। মেয়ের বিষয়েও বাবার আচরণ পাল্টে গেল। সে এক বিতিকিচ্ছিরি ব্যাপার। আর পুরোটা সময়ে নাদিরাকে শিশির সাপোর্ট দিয়েছে। আর্থিক, মানসিক—সব। আর সেই নাদিরা আজ একবারও শিশিরের নাম মুখে নিচ্ছে না এতক্ষণ হয়ে গেল। যেন ওই নামে কেউ নাই দুনিয়ায়। আমি একটু অবাক। কিছুটা ভাবছিও ব্যাপারটা কী হতে পারে। নাদিরা এরপর ওইসব সিনেম্যাটিক ঘটনার পর আবার বাসায় স্বাভাবিকভাবে থাকতে শুরু করেছে। এখন সে ব্যাংকে চাকরি আর নিজের মাকে নিয়ে থাকছে। শিশির বা আমি ছাড়া তার অন্যত্র যাওয়া আছে কিনা আমার জানা নাই। জানলেও কিছু করার কী আছে আমার, কিছুটা মনেমনে জ্বলা ছাড়া। আমার সঙ্গে যোগাযোগ সে কেন রাখে জানি না। হয়তো শিশিরের কথা কাউকে না কাউকে তো বলতে হবে এই বিবেচনায়। কিম্বা দ্বিতীয় পুরুষ হিসেবে আমাকে সে গোনায় ধরে। এমনও হতে পারে ওর তো বকবক করা স্বভাব, তা কার সঙ্গে করবে? কিন্তু এই কারণ নিয়ে আমি বিচলিত না।

বরং আজ কেন শিশির আলোচনাতেই নাই তা নিয়ে আমি বেশি চিন্তিত। অনেকক্ষণ আবার নাদিরার পুরান আলাপ, জীবনের গভীর বেদনার কথা শোনার পর জানতে চাইলাম শিশিরের কী খবর।

নাদিরা কিছুটা বিরক্ত মনে হইল। বলল—
: আছে ওর মতো। ওই যে অস্ট্রেলিয়ান গাভীটা আছে না রেহনুমা। ও ফিরছে। ওরে নিয়া আছে। আমার খোঁজ আর লাগে না তার। রেহনুমারে নিয়া নাকি একটা উপন্যাস লিখবে সে। আচ্ছা তুই বল, আমার জীবন কি কম ড্র্যামাটিক। এই যে এত ঘটনা ঘটল, সব তো সে জানে। কিন্তু ওই পুতুপুতু রেহনুমার মধ্যে কী আছে। ও ইউরোপ গেছে বইলাই কি সব! বুঝলি ছেলেরা খুব হারামি হয়। ওদের বুঝে উঠা যায় না। তুই অবশ্য আলাদা। তোর মতো ছেলের সঙ্গে যে আমার আগে কেন দেখা হয় নাই। তোর সঙ্গে মিশতে মিশতে তোরে ভালো লাগে। শিশির অবশ্য শুরুতেই ভালো লাগে। কিন্তু জানিস কি ভরসা করা যায় না ছেলেদের ওপর। আমার মতো মেয়েদের জন্য ছেলে পাওয়া খুব কষ্ট। তোর সঙ্গেই যা একটু-আধটু গল্পগুজব করি বল। নইলে তো আমার সারাটা দিন বেকার যায়। তোর বউ কেমনরে, ফ্রি খুব? অন্য মেয়েদের সঙ্গে মিশলে কিছু বলে না? আমার সঙ্গে যে মিশিস তা তো জানে না। জানে না যখন তখন তুই এত দূরে দূরে রাখিস কেন আমাকে বল তো?

বলতে বলতে কেমন মিইয়ে আসে নাদিরা। আমি রেস্টুরেন্টের গ্লাসের বাইরে তাকাই। আমার বউ বিষয়ে কখনো কিছু জানতে চায় নাই সে। আজ জানতে চাইল কেন ভাবছি।

কয়দিন আগে মোরা নামে একটা ঝড় খুব আতঙ্ক জাগাইছিল। কিন্তু যত গর্জাইল তত বর্ষাইল না। এতে অবশ্য ভালোই হলো। মৌসুমী বায়ুও ধরা দিল। এখন একটা একটানা বাতাস পাওয়া যায়। সন্ধ্যা নামতে শুরু করছে। কেমন একটা সোনালি আলো শুক্রাবাদের আকাশে দম ধরে আছে। রাতে হয়তো বৃষ্টি নামবে। নাদিরা একদম নাকি বৃষ্টিতে ভিজতে পারে না, ওর জ্বর চলে আসে।

আধুনিক গদ্যের রূপকার আন্তন চেখভ

আধুনিক গদ্যের রূপকার আন্তন চেখভ
আন্তন চেখভ

কিংবদন্তি রুশ কথাসাহিত্যিক ও নাট্যকার আন্তন চেখভকে বাংলা সাহিত্যে প্রথমবারের মতো পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন সম্ভবত সৈয়দ মুজতবা আলী। ‘পঞ্চতন্ত্র’ গ্রন্থে তিনি চেখভকে নিয়ে স্বতন্ত্র প্রবন্ধ রচনা করেন। এবং রবীন্দ্রনাথ ও অন্যান্যদের সাথে তূলনামূলক একটি রচনাও সেখানে স্থান পায়। চেখভ হলেন বিশ্বের সেসকল অল্প কিছু প্রভাব বিস্তারকারী সাহিত্যিকদের একজন, যাদের নামেই পরবর্তী বিশ্বসাহিত্যে একটি স্বতন্ত্র শৈলি তৈরি হয়।

চেখভের শুরুর জীবন ছিল দুঃখ কষ্টে জর্জরিত। শৈশব থেকেই জীবনের কঠিন বাস্তবতার সাথে নিজেকে মানিয়ে একরকম সংগ্রাম করে বেড়ে উঠেছেন তিনি। তাকে বলা যায় গদ্যের চার্লি চ্যাপলিন৷ চেখভ তার অনেক গল্পই লিখেছেন কমেডির আদলে; কিন্তু চেখভের পাঠকেরা জানেন, এরই আড়ালে লুকিয়ে আছে গভীর দুঃখবোধ ও বেদনার আবহ।

১৮৬০ সালের ২৯ জানুয়ারি দক্ষিণ রাশিয়ার আজভ সাগর সংলগ্ন তাগানরোগ শহরে জন্মগ্রহণ করেন চেখভ। বাবা ছিলেন প্রাক্তন ভূমিদাস কৃষক। তিনি তাগানরোগে একটি দোকান চালাতেন। পাশাপাশি গির্জার ধর্মসংগীতে নেতৃত্বদানকারী গায়কদের পরিচালক ছিলেন। তাঁর স্বভাব ছিল ভীষণ রূঢ় ও কঠোর। মা জেভলোনিয়া জাকোভলেভনা ছিলেন ঠিক উল্টো। অত্যন্ত স্নেহবৎসল আর চমৎকার গল্পকথক; অবিকল রুশ উপন্যাসের মায়েদের মতো। তবে চেখভের বাবা ছিলেন মেধাবী ও তৎপর একজন ব্যক্তি। অভাবের সংসার চালিয়ে নিতে তাকে অনেক পরিশ্রম করতে হতো। চেখভ বলেছিলেন, আমরা আমাদের মেধা বাবার কাছ থেকে পেয়েছি আর হৃদয় মা’র কাছ থেকে।

চেখভের শৈশব-কৈশোর কেটেছে সীমাহীন দারিদ্র্যে। গৃহশিক্ষকতা, পাখি ধরে বিক্রি আর খবরের কাগজে ছোট ছোট স্কেচ এঁকে তিনি নিজের লেখাপড়ার খরচ যোগাতেন। সেই সাথে প্রচুর পড়তেন। মাধ্যমিকেই পড়ে ফেলেছিলেন তুর্গেনিভ, গনসারভ ও শোপেনহাওয়ার। ১৮৭৯ সালে ভর্তি হন মস্কো বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল কলেজে। পাশাপাশি চলছিল গল্প লেখা। তবে প্রথম দিকের গল্পগুলো লিখেছিলেন জীবনযাপন ও লেখাপড়ার খরচ যোগাতে। পরবর্তীকালে তা-ই হয়ে উঠল অন্তরের তাগিদ। ডাক্তারি পাশ করলেও সেই পেশা ছেড়ে পুরোপুরি সাহিত্য চর্চায় মনোনিবেশ করেন চেখভ। তাঁর রচিত গল্পগুলোর মধ্যে : ‘স্তেপ’, ‘চাষী’, ‘ওয়ার্ড নম্বর ছয়’, ‘বিষণ্ণ কাহিনি’ উল্লেখযোগ্য।

নাটক লিখেছেন অনেক। তবে নাট্যকার হিসেবে আন্তর্জাতিক পরিচিতি এসেছে ‘থ্রি সিস্টার্স’, ‘দ্য সিগাল’ এবং ‘দ্য চেরি অরচার্ড’ নাটকের মাধ্যমে। চেখভের কাহিনি অবলম্বনে মঞ্চস্থ হয়েছে বহু নাটক। এদিক থেকে শেকসপিয়র ও ইবসেনের পাশাপাশি চেখভের নাম উল্লেখ্য।

সাহিত্যচর্চায় চেখভের স্বকীয় রীতি আধুনিক ছোটগল্পের বিকাশে বিশেষ ভূমিকা রাখে। চেখভের রচনা শৈলির ওপর দাঁড়িয়ে যায় ‘চেকভিয়ান ম্যানার’। পরবর্তীকালে জেমস জয়েস ও অন্যান্য আধুনিক কথাসাহিত্যিকদের মধ্যে প্রকটভাবে চেখভের প্রভাব লক্ষ করা যায়।

১৯০৪ সালের ১৫ জুলাই আজকের এই দিনে চেখভ প্রয়াত হন।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র