তুরস্ক ইউরোপীয় ইউনিয়নে প্রবেশে বাধা কোথায়?



কাওসার আহমেদ
তুরস্ক ইউরোপীয় ইউনিয়ন।

তুরস্ক ইউরোপীয় ইউনিয়ন।

  • Font increase
  • Font Decrease

 

তুরস্ক,ইজমির থেকে: তুরস্কের ভৌগলিক অবস্থান ইউরোপ ও এশিয়া মহাদেশে। ইউরোপীয়ান নেইবারহুড এনলারজমেন্ট পলিসি বা নীতির   ভিত্তিতে দেশটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হতে কোন বাধা বা অন্তরায় নেই। তাছাড়া তুরস্ক কাউন্সিল অফ ইউরোপ, ইউরোপীয়ান কোর্ট অব হিউম্যান রাইট্‌স, ন্যাটো ও জি২০ এর সদস্য পদ লাভ করেছে। 

কয়েক দশক ধরে তুরস্ক ইউরোপীয় ইউনিয়নে ঢোকার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।নানা কারণে থেমে আছে তাদের ইইউ সদস্য পদ অর্জন। সেই ১৯৮৭ সালে ইউরোপীয়ান ইকোনমিক কমিউনিটি যা আজকের ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন তার সদস্য হওয়ার জন্য আবেদন করে ছিল তারা।কিন্তু ইউরোপীয়ান কমিশন আবেদনটি খারিজ করেছিল এইমর্মে যে খুব শীঘ্রই আলোচনার ধাঁর খুলছেনা।কিন্তু ইউরোপীয়ান কমিশন আবেদনটি খারিজ করেছিল তার কারণ -খুব শীঘ্রই আলোচনার ধাঁর খুলছেনা।কারণ হিসাবে উল্লেখ করে তুরস্কের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নাজুক পরিস্থিতি,গ্রীসের সঙ্গে খারাপ সম্পর্ক এবং সাইপ্রাসের সাথে দন্ধের যু‌ক্তি দেখা‌নো।এরপর আরও বহু পদক্ষেপ নিয়েও সফলতার মুখ দেখতে পায়নি তুরস্ক। 

অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে ২০০৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর ইউরোপীয় ইউনিয়ন তুরস্কের সাথে আলোচনা করতে সম্মত হয় ও ২০০৫ সালের ২০ অক্টোবর আলোচনা শুরু করে। কয়েক দফা আলোচনার পর অ‌নেকটা ইতিবাচক দিকেই আগাচ্ছিল। ২০১৩ সালে ইউরোপে অভিবাসন প্রত্যাশীদের স্রোত নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে তুরস্কের তখনকার প্রধানমন্ত্রী আহমেদ দাভুতোগলুর সঙ্গে আঙ্কারায় বৈঠক করেন এঞ্জেলা ম্যার্কেল৷ ম্যার্কেল তুরস্কের ইইউ সদস্য হওয়ার দাবিকে সমর্থন করার আশ্বাস দেন৷ এছাড়া ম্যার্কেলের সঙ্গে বৈঠকে দাভুতোগলু যে দু’টি বিষয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন, সেগুলো ইইউ বৈঠকেও আলোচিত হয়েছে৷ তুরস্কে অবস্থানরত সিরীয়দের জন্য তুর্কি সরকারকে ৩ বিলিয়ন ইউরোর অর্থ সহায়তা দেয়া এবং ইইউ অঞ্চলে তুর্কিদের ভিসা প্রাপ্তি সহজ করার সিদ্ধান্ত ইউরোপের ২৮টি দেশের জোট মোটামুটি চূড়ান্ত করেছিল(সুত্রঃস্যমন্তক ঘোষ,ডিডাব্লিউ,১০.০২.২০১৮)৷ 

ইউরোপীয়ান অনেক রাজনৈতিক নেতা বহু দিন ধ‌রে সমালোচনা করে আসছিলেন যে, আধুলিক তুরস্কের স্থপ‌তি কামাল আতাতুর্কের স্যাকুলার নীতি থেকে দেশটি সরে যাচ্ছে। ক্ষমতাসীন জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি ইসলাম পন্থী নীতির দিকে ঝঁকুছে।তুরস্কের শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে শুরু ক‌রে সব ক্ষেত্রে ইসলামীকরণ করছে।  

এরপর ২০১৬ সালে এক দল বিপথগামী সেনা অফিসারের ব্যর্থ ক্যু চেষ্টার পর তুরস্কে দেড় লাখ মানুষকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে ও ৪০ হাজার জন‌কে জেলে ঢোকা‌নো হয়েছে – তাদের মধ্যে বহু বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, ছাত্র, সাংবাদিক, লেখক ও আন্দোলনকারী ছি‌লেন। তখন গোটা ইউরোপ জুড়ে তুরস্কের মানবাধিকারের জন্য নিন্দার ঝড় উঠে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রেজেপ তায়্যিপ এরদোয়ান সকল সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করে বলেন এরাসবাই ব্যর্থ ক্যু সাথে জড়িত। 

তুরস্কের সংবিধানে প্রেসিডেন্টসিয়াল পদ্ধতি প্রবর্তনে গণভোট আয়োজনের প্রাক্কালে আবার তীব্রও সমালোচনার মুখোমুখি হন এরদোয়ান। তাঁকে অনেকেই ডিক্টেটর বা নতুন সুলতান বলেও সমালোচনা করেন।তবে সিএনএনকে তিনি জানিয়েছেন, গণভোট তাঁকে ‘ডিক্টেটর’ বানাচ্ছে না৷ বরং নতুন ব্যবস্থার জন্য নয়, তুরস্কের মঙ্গলের জন্যই৷ইইউর মধ্যেই ফ্রান্সে প্রেসিডেন্টসিয়াল পদ্ধতি রয়েছে। 

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2018/Aug/30/1535628387498.jpg   

২০১৬ সা‌লের ২৪ নভেম্বর ইউরোপীয় ইউনিয়ন পার্লামেন্ট তুরস্কে মানবাধিকার ও আইনের শাসনের উপর উদ্বেগ প্রকাশ করে ইইউতে প্রবেশের আলোচনা স্থগিতের জন্য সিংহভাগ সাংসদরা ভোট প্রধান করে।

প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান ইইউ নীতি নির্ধারকদের কঠোর সমালোচনা করে বলেন” ইইউ আমাদের চায় না, কারণ আমারা মুসলিম সংখ্যা গরিষ্ঠ দেশ। আমরা এটি জানতাম কিন্তু আমরা আমাদের আন্তরিকতা প্রদর্শন করার চেষ্টা করেছিলাম”(সুত্রঃ রাশা টুডে, ২৩ জুন,২০১৬-১৩:৪৭)।৫৪ বছর ধরে আমাদের অপেক্ষায় রেখেছেন, "আপনারা যদি সৎ হন, তাহলে আপনাদের বক্তব্য পরিষ্কার করুন।আমরা এটা বন্ধ করে দেব, আমাদের আর ইইউর দরকার নেই” (সুত্রঃ হুররিয়াতডেইলি নিউজ,১৩ অক্টোবর ২০১৭-১১:৩৪:০০)।

ইউরোপীয় আইন বিশেষজ্ঞ ড. হাজী জান, প্রফেসর ও সাবেক বিভাগীয় প্রধান ডিপার্টমেন্ট অফ ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ‘ল’, ডকুজ এইলুল ইউনিভার্সিটি, ইজমির,তুরস্ক। তিনি বলেন “ তুরস্ক মুসলিম রাষ্ট্র এটা তো আছেই তবে, এটা কোন মুখ্য বিষয় নয়, আসল কারণ তুরস্কের জনসংখ্যা ইউরোপের তুলনায় অনেক বেশি ও এখানে বেকারত্বের হারও অনেক এই মুহূর্তে তুরস্ক যদি ইইউর সদস্য হয় তাহলে এদের কর্মসংস্থানের জন্য ইইউ একটা সংকটের মুখোমুখি হবে।তাই এ বিষয় গুলোতে আগে নিজেদের সক্ষমতা অর্জন করতে হবে“।

একরোখা ও কর্তত্বপরায়ণ আচরণের জন্য এরদোয়ান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমালোচিত চরিত্র হলেও নিজের দেশের জনগণের মধ্যে তাঁর সমর্থন বেড়েই চলেছে৷ গণভোটে জয়, শেষ জাতীয় নির্বাচনে তাঁর ও তাঁর  দলের ল্যান্ড স্লাইড ভিক্টরি।এমনকি তাঁর বিরুদ্ধে সেনা অভ্যুত্থান ব্যর্থ হয়েছিল কার্যত জনগণ প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান পাশে থাকায়৷ 

সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনে জয়ের পর এরদোয়ান আবারও সম্পর্ক উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করছেন।ইতালির প্রধান মন্ত্রীর সাথে বৈঠক পর ইইউতে প্রবেশের কথা পুনরায় ব্যক্ত করেন।বিশ্লেষকরা মনে করছেন জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেলের আমন্ত্রণে জার্মানিতে গেলে এবিষয়ে কথা উটতে পারে।তবে আলোচনা যাইহউক না কেন তুরস্ক খুব শীঘ্রই ইইউ সদস্য হতে পারছেনা বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।