এরশাদ এবং রাজনীতি



ফরিদুল আলম
সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ/ ছবি: সংগৃহীত

সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ/ ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

একদা ব্যাপক আলোচিত, ততোধিক সমালোচিত এরশাদের এই চলে যাওয়া হঠাৎ না হলেও আমাদের রাজনীতিতে তাকে নিয়ে আলোচনা চলবে, চলতেই থাকবে। রাজনীতিতে নিত্য নতুন ঘটনার জন্ম দেওয়া এরশাদের এই চলে যাওয়ায় তাই এক ধরনের শূন্যতা অনুভূত হবে গভীরভাবে। সেই সাথে তার বিদায়ে তার সৃষ্ট দল জাতীয় পার্টি যে অনেকটা মুখ থুবরে পড়বে সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। আর সেজন্যই বোধকরি আগামী দিনের রাজনীতি এরশাদকে মিস করবে দারুণভাবে। আমাদের দেশের রাজনীতিতে চলনে, বলনে, পোশাকে এবং রুচিতে এরশাদ ছিল এক এবং অদ্বিতীয়। জীবনের শেষ দিনগুলোতেও তার এই রুচিশীলতার প্রকাশ দেখেছি আমরা।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এরশাদের আগমন অনেকটা ঝড়ের বেগে ঘটলেও তার আগমনপরবর্তী রাজনীতি ঘটনাবহুল। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ থেকে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর তার পতনের আগ পর্যন্ত সময়ে তিনি ছিলেন দুর্দণ্ড প্রতাপশালী এক শাসক। একাধারে সামরিক শাসক, স্বৈরশাসক, প্রেমিক, কবি ইত্যাদি নানা রূপে তাকে আমরা দেখেছি। মনে পড়ে তার নামের আগে ‘বিশ্ব বেহায়া’ খেতাবটিও একসময় ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতো। তাতে করে তার কিচ্ছু যেত আসতনা। তিনি তার মত করেই দেশ চালিয়েছেন যতক্ষণ পেরেছেন ততোক্ষণ পর্যন্ত।

এরশাদের পতনের পর বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তীতে তিনিই প্রথম শাসক যিনি জেল খেটেছেন টানা ৬ বছর এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র সাবেক শাসক যিনি দূর্নীতির দায়ে সর্বোচ্চ আদালত কর্তৃক সাজাপ্রাপ্ত হয়েছেন। মৃত্যুর সময়েও কাধে প্রায় দুই ডজন মামলা নিয়ে তার এই প্রস্থান তার রাজনীতির ইতিবাচক দিকগুলো না হলেও নেতিবাচক দিকগুলোকে মানুষের মনে স্মরণীয় করে রাখবে অনেকদিন পর্যন্ত।

আরও পড়ুন: যেভাবে রাষ্ট্রপতি হন এরশাদ

এরশাদের কর্ম নিয়ে অনেক কথা এবং লেখা হয়েছে এবং দেশের রাজনীতি সচেতন কমবেশি সকলেই তার সম্পর্কে মোটামোটি ধারণা রাখেন বলেই তার মৃত্যুতে এই মুহুর্তে তার রাজনীতির নেতিবাচক দিকগুলো নিয়ে আমি আর কোন আলোচনায় যেতে চাইছিনা। তাছাড়া আমাদের রাজনীতির বর্তমান সময় বিশ্লেষণ করে আমি ব্যক্তিগত মত পোষণ করি যে একটি অস্থির রাজনৈতিক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করে আজকের এই সময়ে যে আমরা অবস্থান করছি তাতে কাকতালীয় হলেও এরশাদের কিন্তু অবদান কম নয়।

ব্যক্তিজীবনের মতো রাজনীতিতে ঘনঘন সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের জন্য যতটুকু আলোচিত তার অধিক সমালোচিত ছিলেন এরশাদ। তবে তার মৃত্যুর আগে জাতীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে তাকে সিদ্ধান্তহীন হতে দেখা যায়নি খুব একটা। প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে যতই নিন্দনীয় বা সমালোচিত হোন না কেন তার পতনের পর থেকে জীবদ্দশা পর্যন্ত তাকে হিসেবে নিয়েই রাজনীতি করতে হয়েছে ক্ষমতার দৌড়ে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোকে। সেই সাথে তাকে আস্থায় রেখেই রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকতে হয়েছে। এই বিষয়টি নিয়ে অনেকে বিতর্ক করতে পারেন, তবে আমার যুক্তির স্বপক্ষ্যেও ব্যাখ্যা রয়েছে।

দূর্নীতির দায়ে এরশাদ জেল খেটেছেন ৬ বছরের বেশি। ৯০ পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে ৭টি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর প্রতিটিতেই এরশাদকে আমলে নিয়ে ক্ষমতায় আসার ছক কাঁটা, আসন সমঝোতা, তার মামলাগুলোকে নিষ্পত্তি না করে ঝুলিয়ে রাখা, প্রকারান্তরে তাকে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ করেছে। একই সাথে বোদ্ধা নাগরিকদের কাছে ৯০ পরবর্তী শাসকদের দূর্নীতিবিরোধী স্লোগানগুলো প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে দারুণভাবে।

১৯৯৬ সালে যখন বর্তমান ক্ষমতাসীন দল সরকার গঠন করে, আমরা দেখেছি এর পেছনে জাতীয় পার্টির প্রাপ্ত ৩২টি আসন আওয়ামী লীগের জন্য ২১ বছর পর সরকার গঠনের পথ অনেকটা সুগম করে দেয়। সে সময় আওয়ামী লীগের পাওয়া ১৪৬টি আসনের সাথে যুক্ত না হয়ে জাতীয় পার্টির পাওয়া ৩২ টি এবং জামায়াতের ৩ টি আসন যদি বিএনপির প্রাপ্ত ১১৬টি আসনের সাথে যুক্ত হত তাহলে আবারও ক্ষমতায় আসতে পারত বিএনপি। কথিত আছে যে সে সময় তারেক রহমানের পক্ষ থেকে এর বিনিময়ে এরশাদের সকল মামলার নিষ্পত্তি ছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি মন্ত্রণালয় তাকে ছেড়ে দেয়ার প্রস্তাব দেয়া হলেও তিনি রাজী হননি এই ক্ষোভ থেকে যে বেগম জিয়ার শাসনামলের পুরোটাই তিনি জেলে কাটিয়েছেন। সুতরাং, আমরা কেবল সমালোচনার খাতিরে সমালোচনা না করে যদি যুক্তি দিয়ে সমালচনা করার চেষ্টা করি তবে দেখব কারো ক্ষমতায় যাওয়ার পেছনে কিন্তু তার সমর্থন কম নয়।

আরও পড়ুন: এরশাদ-এক রাজনৈতিক অধ্যায়

এরশাদ চলে গেলেন। আমি বলব মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এদেশের রাজনীতিতে তিনি তার অপরিহার্যতাকে প্রমাণ করে গেছেন। আজকে বিএনপিসহ তথাকথিত চারদলীয় জোটের শাসনামলের দূর্নীতির বিচার, যুদ্ধাপরাধের বিচার, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হমলা মামলাসহ বর্তমান সরকার স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ের যত অপকর্মের বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে এর কোনটাই সম্ভব হতনা যদিনা এরশাদের সমর্থন পাওয়া যেত। আর তাই প্রকাশ্যে না হলেও ক্ষমতাসীনদের কাছে অপ্রকাশ্যে তিনি কিন্তু কম সমিহ পাননি। ২০১৪ সাল থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি মন্ত্রীর মর্যাদা ভোগ করেছেন, শেষ সময়ে একটি সর্বদলীয় সংসদের বিরোধী দলের নেতা হিসেবে তার এই প্রস্থান আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

একজন ব্যক্তি বা তার ব্যক্তিগত কৃতকর্ম পছন্দ করা বা না করা ব্যক্তিগত বিষয়ের মধ্যে মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিৎ। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে যখন কেউ জাতীয় জীবনে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেন তখন নিছক ব্যক্তিগত পছন্দ বা অপছন্দ দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে তার জন্য নির্ধারিত যোগ্য সম্মানটি দিলে তা আগামী প্রজন্মের জন্য উদাহারণ হয়ে ওঠে। আমাদের মনে রাখতে হবে এরশাদের মৃত্যু হয়েছে সংসদের বিরোধী দলের নেতা থাকা অবস্থায়। ওয়েস্ট মিনিস্টার ধাচে বিরোধী নেতাকে বলা হয়ে থাকে ‘ছায়া প্রধানমন্ত্রী’। বাংলাদেশেও এর গুরুত্ব কম ছিল না কখনও। এরশাদ তার যথাযোগ্য সম্মান পাক এটাই কাম্য।

ফরিদুল আলম: সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়