মেঘের ভেলায় ভেসে সান্দাকফু-ফালুট: পর্ব ২



তৌফিক হাসান
ছবি: লেখক  তৌফিক হাসান

ছবি: লেখক তৌফিক হাসান

  • Font increase
  • Font Decrease

ভোরের আলোয় কাঞ্চনজঙ্ঘা  দেখার আশাবাদ দিয়ে নিয়ে বিছানায় গিয়েছিলাম। গাইড সুভাষকে বলে রেখেছিলাম ভোরে জাগিয়ে দিতে। সুভাষ জাগাবার আগেই আমারা জেগে উঠলাম ভোরের প্রথম আলোয় কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখবো বলে। সময় নষ্ট না করে বিছানা ছেড়ে চটজলদি ভারী শীতের কাপড় গায়ে জড়িয়ে বাহিরে বের হলাম।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/May/26/1558853429917.jpg

** তুমলিং এর পূব আকাশে সূর্যোদয়ের আগের মুহূর্ত

ভোর পৌনে ৫টা, আস্তে আস্তে পুব আকাশে আলো ফুটছে আর কনকনে শীতে বাহিরে দাঁড়িয়ে আমরা আশায় বুক বেঁধে আছি যে একটা উজ্জ্বলতম মেঘমুক্ত সূর্যোদয় দেখবো বলে। আগে থেকেই ওয়েদার ফোরকাস্ট দেখে গিয়েছিলাম, তাতে মেঘ এবং বৃষ্টির আভাস ছিলো আমাদের ট্রেকের সময়। উপরন্তু যাবার সময় সাইক্লোন ফনীর খবর সাথে করে নিয়ে গিয়েছিলাম। তারপরও ভাগ্য ভালো বলতে হতে মেঘমুক্ত আকাশেই আলো ছড়িয়ে পরতে শুরু করলো, আস্তে আস্তে হিমালয় হাসতে শুরু করলো। এমন সময় সেই ফ্রেঞ্চ-স্প্যানিশ জুটিও যোগদান করলো আমাদের সাথে। ভাগ্য বেশিক্ষণ সুপ্রসন্ন থাকলো না, দেখতে লাগলাম দুপাশ হতে দুটো মেঘের ফালি আসতে আসতে স্লিপিং বুদ্ধকে গ্রাস করছে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/May/26/1558855126441.jpg

হিমালয়ের কয়েকটি পিক মিলে একটি শায়িত মানুষের অবয়বের মতো দেখায় বলে এই অংশটুকুকে স্লিপিং বুদ্ধ বলা হয়ে থাকে। পুরোপুরি আলো ফোটার আগেই স্লিপিং বুদ্ধ ঢেকে গেল মেঘের চাদরে। হিমালয়ন রেঞ্জের ভাল ভিউ পাওয়া যায় অক্টোবর-নভেম্বরে, মার্চ-এপ্রিলেও পাওয়া তা কালেভদ্রে। হিমালয় আগেও দেখেছি, তাই এটা নিয়ে তেমন মনে কষ্ট রইলো না, তাছাড়া হিমালয়ান শৃঙ্গ খুব ভালোভাবে দেখা যাবেনা এটা ধরে নিয়েই আমরা রওনা দিয়েছিলাম।

সকাল সাড়ে ৫টা নাগাদ তুমলিং পর্ব শেষ করে ঝকঝকে পাকা সড়ক ধরে আমরা যাত্রা শুরু করলাম সান্দাকফুর পথে। পথে গইরিবাসে নাস্তা করবো বলে সিদ্ধান্ত নিলাম। তুমলিং ছাড়াতেই সামান্য চড়াই, খালি পেটে সকাল সকাল উপড়ে উঠতেই হাফ ধরে গেল! সামান্য যেতেই সিঙ্গালিলা উদ্যানের প্রবেশদ্বার, আমরা সিঙ্গালিলা উদ্যানের মধ্যে প্রবেশ না করে বা দিকের রাফ রোড ধরলাম। রাস্তাটা নেপালের মধ্য দিয়ে চলে গেছে, আসলে সান্দাকফু পর্যন্ত ট্রেকের অনেকটা অংশ নেপালের মধ্য দিয়ে যেতে হয়।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/May/26/1558853557574.jpg
*** ছোট্ট ছিমছাম নেপালী গ্রাম যোবাড়ী

কিছুদুর যাবার পর নেপালের একটা চেকপোস্ট পড়লো সেখানে এন্ট্রি করে এগিয়ে যেতেই নেপালের ছোট্ট গ্রাম যোবাড়ী পড়লো। সেখানে ফটাফট কয়েকটা ছবি তুলে আবার পা চালালাম। গ্রাম পেরোতেই রাস্তা নিচের দিকে যেতে থাকলো, বেশ খারাপ রাস্তা হলেও ল্যান্ডস্কেপ কিন্তু অসাধারণ। চোখ জুড়ানো ল্যান্ডস্কেপ দেখতে দেখতে আমরা চললাম গইরিবাসের উদ্দেশ্যে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/May/26/1558853639624.jpg
** গইরিবাসের পথে

 তুমলিং থেকে গইরিবাসের এর দুরত্ব ৭ কিমি। গইরিবাসের উচ্চতা ৮৬০০ ফিট এবং এখানেও রাস্তাটাই ভারত-নেপাল সীমান্ত। আমরা সেখানে পৌঁছে রাস্তার বা পাশের ম্যাগ্নোলিয়া লজে বসে নাস্তার অর্ডার করে দিলাম। এতটা পথ হাঁটার কারনে আর সূর্যতাপ এর কারনে গরম অনুভূত হল। তাই গায়ে জড়ানো কমানো শুরু করলাম। গায়ে দুটো জ্যাকেট ছিলো, খুলতেই দেখি ভিতরের টিশার্ট টি ভিজে একাকার। সেকেন্ড জ্যাকেটটাও খানিকটা ভিজে উঠেছে। জ্যাকেটটি রোদে শুকাতে দিয়ে নিজেও দাঁড়িয়ে গেলাম টি শার্ট শুকাতে। সিনথেটিক টিশার্ট হওয়াতে খুব অল্প সময়েই শুকিয়ে গেল। এধরনের ট্রেকে সিনথেটিকের পোশাক নেয়াই ভালো কারন সুতি পোশাক শুকাতে সময় বেশী নেয় এবং ঘামের গন্ধও বেশী হয়। গাইড আমাদের পাসপোর্ট গুলো রাস্তার অপর পার্শ্বের ভারতীয় এসএসবি ক্যাম্পে দেখিয়ে নিয়ে আসলো। সময় বাঁচানোর জন্য আমরা ভেজিটেবল মম আর সিন্ধ ডিম অর্ডার করেছিলাম, নেপালী দিদি ঝটপট অর্ডার সার্ভ করলো। খেতে খেতেই কোলকাতার একটা গ্রুপ এসে পৌঁছল, ওরা ল্যান্ড রোভার গাড়িতে করে এসেছে আর এসেই হল্লা শুরু করলো। আমরাও তাড়াতাড়ি শেষ কালিপোখরীর পথ ধরলাম। গইরিবাসের পরেই রাস্তাটা বেশ খাঁড়াভাবে উঠে গেছে, কিছুদূর উঠার পর দেখলাম ট্রাফিক জ্যাম! এই পাহাড়ে আবার জ্যাম কথা থেকে আসলো ভাবতে ভাবতে পরের বাক ঘুরতেই দেখি একটা ল্যান্ড রোভারের চাকার এক্সেল ভেঙ্গে গেছে এবং সেটার মেরামত চলছে। তাই দুইপারেই বেশ কয়েকটা গাড়ি আটকে গেছে। আসলে যেইরকম রাস্তা এতে এইসব বৃটিশ আমলের গাড়ীগুলো কেমনে চলে সেটাই একটা বিস্ময়। চড়াই শেষ হতেই একটা ভিউ পয়েন্ট আসলো সেখানে পাথরের উপরে দারিয়ে-বসে ত্যারাব্যাকা হয়ে নানা স্টাইলে ফটোসেশন করে আবার পা বারালাম। পথে পরিচিত হলাম এক অস্ট্রেলিয়ান দম্পতির সাথে, লাগেজগুলো ঘোড়ায় চাপিয়ে তারা চলেছে পদব্রজে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/May/26/1558853676177.jpg
** অস্ট্রেলিয়ান দম্পতির সাথে আমরা

আরেকটু উপরে উঠতেই মেঘের কোলে রোদ হারিয়ে যেতে থাকলো, মাঝে মাঝে এত ঘন মেঘের মধ্য দিয়ে আমরা হেটে যেতে থাকলাম যে সামান্য দূরেই দেখতে পাচ্ছিলাম না। এভাবে কখনও মেঘ কখনও রোদ, কখনও রুক্ষ পথ আবার কখনও রড্ডেন্ড্রন ফুলের শোভা দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম কালিপোখরী।  নেপালী ভাষায় পোখরী অর্থ লেক আর কালী অর্থ কালো, কালিপোখরী নামটা এসেছে ওখানকার কালচে পানির লেকের থেকে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/May/26/1558853709360.jpg
*** কালিপোখরী লেক

কালিপোখরীর উচ্চতা ১০৪০০ ফিট, এই সিজনে সেখানে প্রায় সময়ই জোর হাওয়া বয়। লেকটাকে ভাল করে দেখে কয়েকটা ছবি তুলে রওনা হয়ে গেলাম সান্দাকফুর উদ্দেশ্য, পরবর্তী বিরতি চৌরি বাজারে লাঞ্চ করার জন্য। চৌরি নামটা আসলে এসেছে চমড়ি বা ইয়াক থেকে, বাজার বলা হলেও ছোট্ট একটা গ্রাম মাত্র কয়েকটা ঘর। গাইড কে আগেই পাঠিয়ে দিলাম কারণ এই পথে আপনি যেখানেই খাবার অর্ডার করুন না কেন সবাই ফ্রেশ রান্না করে দিবে। আগে কেউ রান্না করে রাখে না। আমরা হেলতে দুলতে ছবি তুলতে তুলতে সেই খাবার রেস্তোরায় গিয়ে পৌঁছলাম। যেতেই সুভাষ জিজ্ঞাসা করলো আমরা ইয়াকের মাংস খাবো কিনা, উত্তেজনায় সবাই হ্যাঁ বলে উঠলাম। যে পথে আন্ডাকারিই সবচেয়ে দামী খাবার সেখানে ইয়াকের মাংস!!! আমি বললাম, কই মাংস আগে দেখাও, আমাকে নিয়ে গেল দেখাতে। মাংস দেখে তো আমার চক্ষু চড়কগাছ, রান্নাঘরের এক কর্নারে ছাদের বাঁশের সাথে কয়েকটি ইয়াকের হাড্ডী দাঁত কেলিয়ে হাসছে আর তার শেষ মাথায় খুবই সামান্য কালচে রঙের মাংস তার অবস্থান জানান দিচ্ছে। মাংস না বলে মাংসের শুঁটকি বলাই আসলে যুক্তিযুক্ত। ট্রাভেলার মনির ভাইকে ডাকলাম, তার চেহারা দেখে যা বোঝার বুঝে নিয়ে সুভাষকে বললাম আমাদের মাফ করো। ধোঁয়াওঠা গরম ভাত, সবজি আর আন্ডাকারি দিয়ে পেটপুজা করে রওনা হলাম কাঙ্ক্ষিত সান্দাকফুর পথে। কালিপোখরী  থেকে সান্দাকফুর দুরত্ব ৬ কিমি যার শেষ ৩ কিমি বেশ খাঁড়া। সান্দাকফু যতই কাছে যেতে লাগলাম ততই রোমাঞ্চিত হতে থাকলাম। মাঝে মাঝে ঘন মেঘ আমাদের ঢেকে দিচ্ছিল। পুরোটা পথেই সোঁ সোঁ শব্দ করে বেশ জোর হাওয়া বইছিলো। একটা আশ্চর্য বিষয় লক্ষ্য করলাম, মেঘগুলো পাইন গাছে আটকে যাচ্ছে আর পানি হয়ে গাছ বেয়ে নিচে নেমে আসছে। কোথাও কোথাও রাস্তা বেশ কর্দমাক্ত হয়েছে  পাইন গাছে আটকে বেয়ে গলে পরা এই সব পানির কারনে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/May/26/1558853760121.jpg
*** মেঘের আহ্বানে পাইনবনের পথে

আমাদের দেশের বান্দরবনেও অনেক মেঘ দেখেছি আমরা কিন্তু মেঘ যত ঘনই হোক না কেন এভাবে কোন গাছের পাতাও আটকে পানি হয়ে ঝরতে দেখিনি। আরেকটা পার্থক্য লক্ষ্য করলাম আমাদের দেশের মেঘের গতি খুব বেশ না হলেও হিমালয়ান রেঞ্জে মেঘ যেন চঞ্চলা হরিণ। সান্দাকফু দূরে থাকতেই গাইডকে ছেড়ে দিলাম জিটিএ ট্রেকার্স হাটে আমাদের রুম ঠিক করার জন্য। ট্রেকের সময় আমাদের ক্রস করে অনেকগুলো ল্যান্ড রোভার গাড়ি গিয়েছে সান্দাকফুর দিকে সেই হিসেবে টুরিস্টদের একটু চাপ থাকার কথা। যাইহোক সন্ধ্যার সামান্য আগে আমরা সান্দাকফু পৌঁছে গেলাম, সুভাষ আমাদের মনোনীত জিটিএ-তেই রুম পেয়েছে। একটাই রুম খালি ছিলো, বাকীগুলো বুক হয়ে আছে বেশ কয়েকদিন থেকেই। কোলকাতার কয়েকটি পরিবার ২/৩ দিন থেকে অবস্থান করছেন সান্দাকফু থেকে সূর্যোদয় দেখবে বলে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/May/26/1558853814384.jpg
 *** জিটিএ হাট, সান্দাকফুতে আমাদের থাকার স্থান

সান্দাকফুর উচ্চতা ১১৯২৯ ফুট এবং উপরের দিকে সানরাইজ নামের একটা প্রাইভেট হোটেল আছে যেটা থেকে বেশ ভাল ভিউ পাওয়া যায় বিধায় এখন টুরিস্টরা সেখানেই বেশি থাকে। যাইহোক, রুমে ঢুকে কাপড় ছাড়তে ছাড়তেই হাওয়ার বেগ এমন বেড়ে গেলো যে শব্দ শুনে মনেহল আমরা কক্সবাজার বীচে বসে আছি। সেই সাথে ঠান্ডাটাও বেড়ে গেল, তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে এলাম। কনকনে ঠান্ডা পানি লাগাতেই আমাদের কাঁপাকাঁপি শুরু হয়ে গেলো, গায়ে একটা গেঞ্জি আর একটা জ্যাকেট ছিলো  তার উপর আরও একটা জ্যাকেট চড়াতে হলো। তাও কাঁপাকাঁপি কমছিল না অগত্যা ১ কম্বল ২ লেপের নিচে সাথে কান টুপি, হাত এবং পা মোজা। সামান্য পরেই কেয়ারটেকার নক করলো খাবার রেডি, কোন উপায় নাই খেতেই হবে কারণ এসব পাহাড়ে সন্ধ্যা ৭টাই ডিনার টাইম। ছোটবেলায় বার্ষিক পরীক্ষার পর যখন নানাবাড়ি যেতাম তখন এরকম সন্ধ্যা হলেই ডিনার দিয়ে দিত আর সন্ধ্যা ৭-৮টা নাগাদ মোটামুটি পুরো গ্রাম নিস্তব্ধ হয়ে যেত। আমার নানা বাড়ির কথা মনে পড়ছিলো খুব করে। যাইহোক কাঁপতে কাঁপতে খেয়ে নিয়ে বিছানায় গেলাম, বাতাসের কারনে রুমের বড় বড় কাঁচের জানালাগুলো যেভাবে কাঁপছিল আর সোঁ সোঁ শব্দ হচ্ছিল তাতে তো মনে হচ্ছিল যেন ভেঙ্গে না যায়। অনেক কষ্টে হাত পা গরম হলো এবং এক সময় ঘুমিয়ে পরলাম। এলার্ম ছাড়াই ভোর সাড়ে ৪টার দিকে জেগে গেলাম, ঢাকায় অফিসে যাবার জন্য মোবাইলের এলার্ম ৩ বার চেঞ্জ করতে হয় আর এখানে কিছুই লাগলো না। বিছানা ছেড়ে কটেজ থেকে বেরতেই মন টা খারাপ হয়ে গেলো, ঘন মেঘ ছেয়ে আছে পুরো উপত্যাকা। যদিও জোর হাওয়া বইছে তবুও মন বলল কোনো চান্স নেই। মনির ভাইয়ের মন মানছিল না বললও চলেন ভিউ পয়েন্টে গিয়ে আরেকটু অপেক্ষা করি দেখি মেঘ সরে যেতেও পারে। আমি বল্লাল চলেন, গিয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে বললাম ফেরত যাই উনিও সায় দিল। ভোর সাড়ে ৬টাও ব্রেড-বাটার খেয়ে যাত্রা শুরু করলাম ফালুটের পথে, আজ আমরা হাটবো ২১ কিমি পথ। কোলকাতার সেই গ্রুপটিও বেরিয়ে পরলো আমাদের সাথে। ওরা গাড়ি ছেড়ে দিয়েছে আর বাকি পথটুকু পায়ে হেঁটেই যাবে। পথটা খুব ভালো করে চিনেনা বলে আমাদের সঙ্গী হতে চাইল, আমরা বললাম সমস্যা নেই ফলো করুন আমাদের। এই রুটে রাস্তার অনেকগুলো শাখা রাস্তা রয়েছে, ভুল করলে বেশ কয়েক ঘণ্টা বারতি হাঁটতে হবে। সন্ধ্যা নামার আগে ফালুট পৌঁছায় জরুরী। রাস্তায় অনেক যায়গায় রেড মার্ক দেয়া আছে ফালুট কে নির্দেশ করে, একটু দেখে চললে ভুল হবার সম্ভবনা নেই।

আমাদের ট্রেকের সবথেকে সুন্দর অংশ হলো এই ২১ কিমি পথ। ঘন পাইন বন, সবুজ ভ্যালী, নানান রঙয়ের বাহারি ফুল আর ভেসে বেড়ানো মেঘের দল আপনাকে শারীরিক কষ্ট অনুভব করতেই দিবেনা। আপনি ফুল ভালবাসলে মার্চ-এপ্রিল সিজনে এই ট্রেকে আসুন, কথা দিচ্ছি আপনার চোখ জুড়িয়ে যাবে আর হারিয়ে যাবেন দূর পাহাড় থেকে ভেসে আসা ইয়াকের গলার ঘণ্টার শব্দের ছন্দে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/May/26/1558855442349.jpg

 *** মনকাড়া এমন ফুল আপনার ভাল লাগবেই

এই পথে অনেকে গাড়িতেও যায় তবে আমি বলবো প্রান হাতে নিয়ে যেধরনের কষ্ট সয়ে যেতে হবে তাতে করে না যাওয়াই ভাল। রাস্তা মাঝে মাঝে অসম্ভব ভাঙ্গাচুরা, জীপের সিট ধরে বসে থাকতে থাকতে আর ঝাকি খেতে খেতে আপনার হাড্ডি মাংস এক হয়ে যাবে।

সান্দাকফু ছাড়াতেই পথ চলে যাবে পাইন বনের মধ্য দিয়ে, আর পথে পথে রডডেন্ড্রন, ম্যাগ্নোলিয়া আরও নাম না জানা ফুল আপনাকে স্বাগত জানাবে। এমন পাগল করা রাস্তা দিয়ে আমরা হেঁটে যেতে থাকলাম।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/May/26/1558854383378.jpg
*** ফ্রেঞ্চ-স্প্যানিশ জুটি পল-নেভিসের সাথে

পাইনবন শেষ হতেই সেই ফ্রেঞ্চ-স্প্যানিশ জুটি আমাদের ধরে ফেলল। হাল্কা কথাবার্তা ফটোশেসন শেষে ওরা এগিয়ে গেল। আমাদের অত তারা নেই, আমরা পুরো প্রকৃতি কে উপভোগ করার চেষ্টা করি আমারে ট্রেকে। খানিকটা এগোতেই আমাদের রুট লালে লাল হয়ে গেল, যেদিকে চোখ যায় শুধু রডডেন্ড্রন ফুল আর ফুল। বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়ালাম, নয়ন ভরে দেখে মাথায় গেঁথে নিলাম এই সৌন্দর্য কে। ফুলেল শুভেচ্ছার পর শুরু হলো সবুজ গালিচা, যতদুর চোখ যায় শুধু সবুজ আর সবুজ। চিত্রের পর এমন সবুজ আর চোখে পড়েনি। প্রতিটা পাহাড় চুড়াই সবুজ ঘাসে ঢাকা, দেখলেই নয়ন জুড়িয়ে যায়।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/May/26/1558855391425.jpg
*** এরকম অনেক পথ সবুজ গালিচায় ঢাকা

কয়েকটা চূড়া পেরোতেই একটা যায়গায় কিছু অস্থায়ী স্থাপনা দেখে গাইড কে জিজ্ঞাসা করলাম সেখানে কি, এমন জনমানবহীন যায়গায় কি হতে পারে? গাইড বল্লো ইয়াক ফেস্টিভ্যাল, প্রতি বছর নেপালী নববর্ষে অনুষ্ঠিত। আমাদের মতো নেপালেও ১৪ এপ্রিল বছরের প্রথম দিন। দূর দূরান্ত থেকে সবাই ইয়াক নিয়ে সেখানে হাজির হয় বছরের প্রথম দিনে। ভারত, নেপাল, ভুটান ছাড়াও বেশ কিছু ইউরোপিয়ান বা আমেরিকান টুরিস্টও নাকি আসে এই ফেস্টিভ্যাল দেখতে। আরও কিছুদুর যেতে এক পাহাড়ের চূড়ায় একটা বাড়ি তৈরি হতে দেখে গাইড কে জিজ্ঞাসা করলাম মানুষ এখানে থাকে কি কিরে, বাজার কোথায় করে, জীবন চলে কিভাবে? আমরা নেপালের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলাম, গাইড বললো এখান থেকে ৫-৬ ঘণ্টা হাঁটলে একটা বাজার আছে ওরা ওখানে থেকে রসদ কিনে আনে আর বেঁচে থাকার জন্য ওরা ইয়াক পালন করে। একেকটা ইয়াকের দাম নাকি আড়াই তিন লাখ রুপি আর ইয়াকের দুধের পনির আর ঘী এর দাম এবং চাহিদা নাকি অনেক চড়া। আরও খানিকটা পথ যেতেই একটা ভারতীয় এসএসবি চেক পোষ্ট চোখে পড়লো, সেখানে পৌঁছে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলাম আর বিস্কিট, খেজুর ও পানি খেলাম। এর মাঝেই সেখানে অস্ট্রেলিয়ান দম্পতি এসে উপস্থিত হলো, আড্ডা চলল আরও কিছুক্ষণ। তারপর আবার পা বাড়ালাম, অস্ট্রেলিয়ান দম্পতি আমাদের ছেড়ে ক্রমশ এগিয়ে গেলো। ওনাদের স্ট্যামিনা অনেক, এই বয়সে আমাদের দেশের কোনো মানুষের এরকম এক্সপিডিশন করতে পারে আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারিনা।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/May/26/1558854786812.jpg
*** সাবারগ্রাম থেকে যাত্রা শুরুর পর

দুচোখ দিয়ে অপার সৌন্দর্য  গিলতে গিলতে আমরা সাবারগ্রাম পৌঁছে গেলাম, সেখানের সরকারি ট্রেকার্স হাটে নুডুলস আর বয়েল্ড আন্ডা অর্ডার করলাম। খানিকক্ষণ অপেক্ষার পর আমাদের লাঞ্চ সার্ভ করা হলো, গোগ্রাসে গিলে ফেললাম সব। খাবার শেষে জিজ্ঞাসা করলাম চা পাওয়া যাবে কি, বলল যাবে একটু অপেক্ষা করুন। হাটের বাহিরে চেয়ারে বসে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে চা চলে এলো। সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে ১১৮০০ ফিট উচ্চতাইয় ইয়াকের দুধে তৈরি চা সে এক অনন্য অভিজ্ঞতা।

চা খেয়েই পা চালালাম, আকাশটাও বুজে আসতে শুরু করলো। কপালে মনেহয় খারাপি আছে তাই পায়ে জোর লাগালাম। আগের রাতে রেডিওতে নাকি বলেছে আজ ভারী বর্ষণ হবে, সাইক্লোন ফনীর কারনে নাকি পশ্চিমবঙ্গে হাই এলার্ট জারি করা হয়েছে, বেশ কয়েকটি রুটে নাকি ট্রেন চলাচল বাতিল করা হয়েছে। বেশি দূর এগোতে পারলাম না, বৃষ্টি শুরু হয়ে গেলো। হাঁটা বন্ধ হলোনা, পঞ্চো গায়ে চড়িয়ে হাঁটা অব্যাহত রাখলাম।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/May/26/1558855344457.jpg
*** ফালুটের সামান্য আগে, পিছনে দূর পাহাড়ের চূড়ায় ফালুট ট্রেকার্স হাট

সন্ধ্যার বেশ খানিকক্ষণ আগে ফালুট পৌঁছে গেলাম। ফালুটে একটা মাত্র ট্রেকার্স হাট তাই আগে থেকে বুকিং দিয়ে না গেলে এখানে যায়গা পাওয়া বেশ কঠিন। যথারীতি গাইডকে আগেই ছেড়ে দিয়েছিলাম রুম ঠিক করার জন্য তাই রক্ষে। রুমে ঢুকে লাগেজ রেখে ফ্রেশ হলাম। রাতে ডিনার টেবিলে অস্ট্রেলিয়ান, ফ্রেঞ্চ-স্প্যানিশ জুটির সাথে দীর্ঘক্ষণ আড্ডা হলো। অস্ট্রেলিয়ার সার্বিক অবস্থা, ফ্রান্সের ইয়েলো শার্টের তান্ডব, বাংলাদেশ এবং ভারতের রাজনৈতিক অবস্থা কিছুই বাদ থাকলো না। রাত যত বাড়তে থাকলো বৃষ্টি তত বাড়তে থাকলো। দেশে থাকতেই প্লান করে গিয়েছিলাম ফালুট ভিউ পয়েন্টে বাংলাদেশের পতাকা হাতে নিয়ে এবং ফ্ল্যাগ ব্র্যান্ডেড টিশার্ট গায়ে দিয়ে কাঞ্চনজঙ্গাকে ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে একটা ছবি তুলবো। সেই ইচ্ছে কে পাথর চাপা দিয়ে আন্ডা কারি দিয়ে ভাত খেয়ে ১ কম্বল ২ লেপের নিচে চলে গেলাম। শুয়ে শুয়ে হাটের টিনের চালে বৃষ্টির রিমঝিম শব্দ শুনতে থাকলাম, আর মনে মনে দোয়া করতে থাকলাম সকালে উঠে যেন ঝকঝকে আকাশ পাই। ফালুটের উচ্চতা ১১৮১১ ফিট আর এখান থেকেই হিমালয়ের সবচেয়ে ভাল ভিউ পাওয়া যায়। রাতে ঘুমুতে যাবার আগে ধারনাও করতে পারলাম না পরদিন আমাদের জন্য কি অপেক্ষা করছে বা পরের দিনের সিঙ্গালিলা ফরেস্ট ট্রেকই হতে যাচ্ছে আমাদের ট্রেকের সবচেয়ে অ্যাডভেঞ্চারাস অংশ।

আরও পড়ুন: মেঘের ভেলায় ভেসে সান্দাকফু-ফালুট

 

****আগামী পর্বে সমাপ্য

বাংলাদেশি পর্যটক আকর্ষণে ঢাকায় ট্যুরিজম মালয়েশিয়ার রোড শো



তৌফিক হাসান, কন্ট্রিবিউটিং এডিটর-ট্রাভেল এন্ড ট্যুর, বার্তা২৪.কম
বাংলাদেশি পর্যটক আকর্ষণে ঢাকায় ট্যুরিজম মালয়েশিয়ার রোড শো

বাংলাদেশি পর্যটক আকর্ষণে ঢাকায় ট্যুরিজম মালয়েশিয়ার রোড শো

  • Font increase
  • Font Decrease

করোনাভাইরাসের প্রভাবে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর  চলতি বছরের ১ এপ্রিল সীমান্ত খুলে দেয় মালয়েশিয়া। মূলত ওইদিন থেকে দেশটিতে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা উঠে যায়। এর ফলে ফের পর্যটক টানতে নানা উদ্যোগ নেয় মালয়েশিয়া। এর অংশ হিসেবে দেশটির পর্যটন উন্নয়ন সংস্থা ‘ট্যুরিজম মালয়েশিয়া’ ২ থেকে ৭  জুন বাংলাদেশের  গুরুত্বপূর্ণ শহর ঢাকা এবং চট্রগ্রামে প্রথমবারের মতো রোডশো’র আয়োজন করছে।

ঢাকায় রোববার (৫ জুন) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁ হোটেলে বাংলাদেশি ট্রাভেল এজেন্ট ও ট্যুর অপারেটরদের জন্য  রোডশো’র আয়োজন করে মালয়েশিয়া পর্যটন উন্নয়ন বোর্ড- ট্যুরিজম মালয়েশিয়া।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে মালয়েশিয়ার হাইকমিশনার হাজনা এমডি. হাশিম, ট্যুর অপারেটর্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশ (টোয়াব)-এর নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট শিবলুল আজম কোরেশী সহ স্বনামধন্য সকল ট্রাভেল এজেন্ট এবং ট্যুর অপারেটররের শীর্ষকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া অন্যদের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন ট্যুরিজম মালয়েশিয়ার সিনিয়র পরিচালক সৈয়দ ইয়াহিয়া সৈয়দ ওথমান এবং ‘দ্য বাংলাদেশ মনিটর’র সম্পাদক কাজী ওয়াহিদুর আলম।

এদিকে রোডে শো উপলক্ষে ট্যুরিজম মালয়েশিয়ার সিনিয়র পরিচালক (কৌশলগত পরিকল্পনা বিভাগ) সৈয়দ ইয়াহিয়া সৈয়দ ওথমান এর নেতৃত্বে একটি মালয়েশীয় প্রতিনিধি দল বর্তমানে বাংলাদেশে অবস্থান করছে। প্রতিনিধি দলে অন্তর্ভূক্ত রয়েছে মালয়েশিয়ার ৫টি ট্রাভেল এজেন্সি এবং দুটি স্বাস্থ্যশিল্প সংস্থার প্রতিনিধিরাও।

বাংলাদেশে মালয়েশিয়ার হাইকমিশনার হাজনা এমডি. হাশিম বক্তব্য রাখছেন

অনুষ্ঠানে রোড শো’র আয়োজন প্রসঙ্গে বক্তরা জানান, মালয়েশিয়া ভ্রমণে বাংলাদেশিদের মধ্যে আস্থার সঞ্চার করার সাথে সাথে এই রোডশো’র লক্ষ্য হলো ভ্রমণ ও পর্যটন শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্টদের জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম প্রদান করা যার মাধ্যমে তারা পর্যটনকে পূর্বাবস্থায় বা আরো ভালো অবস্থায় নিয়ে যেতে পারে।

সৈয়দ ইয়াহিয়া সৈয়দ ওথমান বলেন, বাংলাদেশে ফিরে আসার এটি একটি দারুণ সময় এবং রোডশো আয়োজনের জন্য যথার্থ। বাংলাদেশে নিয়মিত আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পুনরায় শুরু এবং আন্তর্জাতিক ভ্রমণের জন্য মালয়েশিয়ার সীমান্ত উন্মুক্তকরণ বলতে গেলে একই সময়ে সংঘঠিত হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশি পর্যটকদের মালয়েশিয়ায় স্বাগত জানানোর সূযোগ পেয়ে আমরা সত্যিই রোমাঞ্চিত। পর্যটকরা এখন মালয়েশিয়ার শ্রেষ্ঠ এবং সর্বশেষ রোমাঞ্চকর আকর্ষণগুলো সাশ্রয়ী খরচে উপভোগ করার সুযোগ পাচ্ছেন। দীর্ঘ দুবছর পর পর্যটকরা এখন অনেক কিছুই এক্সপ্লোর করতে পারবেন যার মধ্যে রয়েছে সম্প্রতি চালু হওয়া আউটডোর থিমপার্ক, গেন্টিং স্কাইওয়ার্ল্ড, কুয়ালালামপূরে নতুন সাজে সজ্জিত সানওয়ে রিসোর্ট এবং জাকজমকপূর্ণ নতুন আকর্ষণ বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উঁচু অট্টালিকা ‘মারদেকা ১১৮’। অনিন্দ্য সুন্দর সমূদ্রতট, চিত্তাকর্ষক পর্বতমালা ও বনোরাজিসহ বিভিন্ন আনন্দদায়ক ও রোমাঞ্চকর কর্মকান্ড আপনার ভ্রমণকে স্মরণীয় করে রাখবে।

উল্লেখ্য, বিদেশি পর্যটকদের সংখ্যার হিসেবে মালয়েশিয়ার তালিকায় বাংলাদেশের স্থান প্রথম দিকে। ২০১৯ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ১ লাখ ৮৯ হাজারের বেশি বাংলাদেশি মালয়েশিয়া ভ্রমণ করেছেন; যা মোট সংখ্যার ১৯.৩০ শতাংশেরও বেশি। চলতি বছরের ১ এপ্রিল থেকে পূর্ণ কোর্স কোভিড টিকাপ্রাপ্ত বিদেশিদের জন্য মালয়েশিয়া ভ্রমণে কোন কোয়ারেন্টাইনের প্রয়োজন নেই। আসার আগে ও যাওয়ার পর  পর্যটকদের কোভিড-১৯ পরীক্ষা লাগবে না। ১৭ বছর বা তার নিচের বয়সী শিশুদের জন্যও করোনা পরীক্ষার প্রয়োজন নেই। বর্তমানে মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্স, বাটিক এয়ার এবং এয়ার এশিয়া ঢাকা এবং মালয়েশিয়ার মধ্যে ভ্রমণের জন্য সপ্তাহে ৩ হাজার ৯১০ টির বেশি আসন অফার করছে।

;

ফের ট্যুরিস্ট ভিসা চালু করছে মালয়েশিয়া



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
ফের ট্যুরিস্ট ভিসা চালু করছে মালয়েশিয়া

ফের ট্যুরিস্ট ভিসা চালু করছে মালয়েশিয়া

  • Font increase
  • Font Decrease

দুই বছর পর পুরোদমে ট্যুরিস্ট ভিসা চালু করার ঘোষণা দিলেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী দাতুক সেরি ইসমাইল সাবরি ইয়াকোব। মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ১ এপ্রিল থেকে আন্তর্জাতিক ভ্রমণকারীদের জন্য সীমানা সম্পূর্ণরূপে খুলে দেওয়া হবে।

মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী বলেন, দর্শনার্থীদের পাশাপাশি মালয়েশিয়া থেকে ফেরত আসা কর্মী যারা দুই ডোজ বা বুস্টার ডোজ গ্রহণ করেছেন তারা খুব সহজেই মালয়েশিয়ায় ঢুকতে পারবেন। তাদের কোয়ারেনটিনে থাকার প্রয়োজন নেই। তবে তাদের অবশ্যই যাত্রার দুই দিন আগে একটি আরটি-পিসিআর পরীক্ষা এবং পৌঁছানোর পরে একটি দ্রুত পরীক্ষা (আরটিকে) করতে হবে।

করোনা মহামারির কারণে ২০২০ সালের মার্চ থেকে পর্যটনসহ সব ধরনের ভিসার কার্যক্রম বন্ধ করে দেশের সীমানা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দিয়েছিল দেশটির সরকার। মালয়েশিয়ার প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার প্রায় ৯৮ শতাংশকে দুই ডোজ টিকা দেওয়া হয়েছে এবং অর্ধেকেরও বেশি বুস্টার ডোজ পেয়েছেন।

;

করোনা টেস্ট ছাড়াই ভ্রমণ করা যাবে মালদ্বীপ



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
করোনা টেস্ট ছাড়াই ভ্রমণ করা যাবে মালদ্বীপ

করোনা টেস্ট ছাড়াই ভ্রমণ করা যাবে মালদ্বীপ

  • Font increase
  • Font Decrease

করোনার টিকার দুই ডোজ সম্পন্ন করলেই যাওয়া যাবে মালদ্বীপ। বিশ্বের যেকোনো দেশের পর্যটকরাই এ সুযোগ নিতে পারবে।

সম্প্রতি মালদ্বীপের পর্যটন মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে নতুন নির্দেশনা দিয়েছে, যা গত শনিবার থেকে কার্যকর হয়।

নতুন নির্দেশনায় বলা হয়, কোনো যাত্রী যদি করোনা প্রতিরোধ টিকার পূর্ণাঙ্গ ডোজ (বুস্টার ডোজ প্রয়োজন নেই) নিয়ে থাকে, সে ক্ষেত্রে ৫ মার্চ থেকে সেসব যাত্রীর মালদ্বীপ ভ্রমণের আগে আরটি-পিসিআর টেস্টের বাধ্যবাধকতা প্রত্যাহার করা হলো। সূত্র: লয়ালটিলবি ডটকম

;

সাদা পানির ঝর্ণা



তৌফিক হাসান
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

অন্ধকার থাকতেই ভোর ৫টা নাগাদ হোটেল ছেড়ে নৌকা ঘাট পৌঁছে গেলাম। ভোরের আলো সবে ফুটতে শুরু করেছে ইতিমধ্যেই কিছু জেলে নৌকা নিয়ে নেমে গেছে কাপ্তাই লেকের জলে জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে। আজকের যাত্রা সাদা পানির ঝর্ণা তথা ধুপপানির উদ্দেশ্যে। রাঙমাটির বিলাইছড়ি ঘাট থেকে সকাল সাড়ে ৫টা নাগাদ আমাদের বোট ছাড়ল উলুছড়ির উদ্দেশ্যে, সেখান থেকেই শুরু হবে ঝর্ণার উদ্দেশ্যে মূল ট্রেকিং। লোকালয়ের পাশ দিয়েই এগিয়ে চলছে আমাদের বোট। স্থানীয়রা কেউ কেউ লেক ঘেষা রাস্তায় প্রাতঃভ্রমণ করছেন, কেউ কেউ কৌতুহলী দৃষ্টি আমাদের বোটের দিকে তাকিয়ে আছেন। এবারের যাত্রায় আমরা মোট ৯ জন যাচ্ছি। সবারই পাহাড়ে হাঁটার অল্প বিস্তর অভিজ্ঞতা আছে। ঢাকা থেকে সেন্টমার্টিন নন-এসি বাসে করে কাপ্তাই এসেছিলাম। কাপ্তাই ঘাট থেকে দুই দিনের জন্য ৫৫০০ টাকায় নৌকা ভাড়া নিয়ে আমরা রাঙ্গামাটির বিলাছড়িতে পৌঁছেছি। রাত্রিবাস হয়েছে ঘাট লাগোয়া স্মৃতিময় বোডিং-এ। কোনরকমে থাকা যায় সেরকম রুমের ভাড়া পড়েছে ১০০০ টাকা।

কাপ্তাই লেকের বুক চিরে আমাদের নৌকা এগিয়ে চলছে। বিগত কয়েকদিন বৃষ্টিজনিত পাহাড়িঢলের কারণে সব পলিমাটি এসে জমা হয়েছে সুন্দরি কাপ্তাইয়ের বুকে, তাই পানি একেবারে ঘোলা। সুন্দর পানিপথের মাঝে মাঝে জংলার মতন আবার কখনো বা নাম না জানা জলজ ফুল দেখতে পাচ্ছি। সামান্য যাবার পর বিলাইছড়ি আর্মি সদর দফতরের নৌ-চেক পোস্ট পড়লো সেখানে যথাযথ পরিচয় লিপিবন্ধ করেই আবার সচল হলো আমাদের নৌকার ইঞ্জিন। নৌকা এবার নদী বা খালের মতো সরু পথ ধরে এগিয়ে যাচ্ছে। কি মনোরম এই পথ, সবুজে ঘেরা খাড়া পাহাড়কে পাশে রেখে চলছি। মাঝে মাঝে পাহাড়ের খাজে শুভ্র মেঘকে আটকে থাকতে দেখছি যেন সবুজ পাহাড় তার শুভ্রতায় ভরা প্রেয়সীকে বুকে জড়িয়ে রেখেছে। আমরা কেউ কোনো কথা বলছিনা, অবারিত সৌন্দর্যে অবগাহন করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছি।

কাদা মাটি মাড়িয়ে ঝর্ণার উদ্দেশ্যে মূল ট্রেকিং শুরু

এক পর্যায়ে আমরা আলীক্ষিয়াং নামক একটা স্থানে দাঁড়িয়ে নাস্তা সেরে নিলাম। এখানে খুব কম সংখ্যক পরিবারই বাস করে যার মধ্যে মাত্র ৩টি পরিবার আছে বাঙালি। লাল মিয়া নামে এক বাঙালির হোটেলে ঝটপট নাস্তা করেই যাত্রা শুরু হলো। মিনিট ৫/৭ পরেই আবার দাঁড়াতে হলো আরেকটা আর্মি চেক পোস্টে, যথারীতি পরিচয় লিপিবদ্ধ করার পালা। এবারে চেক পোস্ট থেকে আমাদের সতর্ক করা হলো ফিরতি পথে বিকেল ৫টার মধ্যেই এই চেকপোস্ট পার হতে হবে। চেকপোস্ট পেরিয়ে সুন্দর নদীপথ ধরে যেতে যেতে মোটামুটি আড়াই ঘণ্টায় উলুছড়ি পৌঁছে গেলাম। ঘাট থেকে ৫০০ টাকার বিনিময়ে এক ক্ষুদে গাইড বিচ্ছুকে সাথে নিয়ে শুরু হলো মূল ট্রেকিং। যাত্রা শুরুর পূর্বে মাঝির মাধ্যমে দুপুরের খাবার ব্যবস্থা করে গেলাম স্থানীয় এক ব্যক্তির বাড়িতে, কারণ এখানে কোন খাবারের দোকান নেই। ২০০ টাকায় আমাদের ভাত, মুরগি, আলু ভর্তা আর ডাল খাওয়ার ব্যবস্থা হলো।

যাইহোক ট্রেকিং এর শুরুতেই পথটা বেশ খারাপ। খানিকটা পথ বেশ পিচ্ছিল, গ্রিপ পেতে বেশ সমস্যা হচ্ছিল। আর বেশ খানিকটা পথ ভয়াবহ কর্দমাক্ত, মোটামুটি হাঁটুর সমান কাঁদা। এ ধরনের রাস্তার আলাদা একটা মজা আছে, আমরা পাহাড়ে আসি রোমাঞ্চের খোঁজে আর এরকম পথ, নালা, জংগল, চড়াই-উতরাই ও ঝর্না দেয় ভীষণ রকম আনন্দ। ধুপপানিতে বর্ষার শেষ দিকে যাওয়াই উত্তম বিধায় আমরা সেপ্টেম্বর মাসে যাচ্ছি এই পথে। অন্য সময় গেলে হয়তো অন্যরকম সৌন্দর্য দেখতে পাবো কিন্তু ঝর্ণায় বেশি পানি পেতে হলে এর থেকে দেরিতে যাওয়া ঠিক হবে না।

অবারিত সৌন্দর্যে অবগাহন করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছি

 

ট্রেকিং শুরুর খানিক পরেই একটা ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গ্রাম পড়ল, চারিদিকে পাহাড় মাঝখানে সমতল আর সেখানে ধান পেকে সোনালি রঙ ধারন করে আছে। কি সেই সৌন্দর্য, সবুজের মাঝে খানিকটা সোনালি আভা একেবারে চিরায়ত বাংলার রূপ। গ্রামবাসীরা তাদের উৎপাদিত ফল বিক্রি করছিল আমরা সেখান থেকে দেশি লাল পেয়ারা আর পেঁপে কিনে খেয়ে হাঁটা দিলাম।

এরপর প্রথমে একটা সিড়ি তারপর খাঁড়া তিনটে পাহাড় ডিঙিয়ে বেশ হাঁপিয়ে গিয়ে বিশ্রাম নেবো বলে চিন্তা করতেই দূরে তাকিয়ে দেখি দুটো শিশু কি যেন বিক্রি করছে! ওদের কাছে গিয়ে দেখি কলার ছড়ি ঝুলিয়ে রেখেছে, প্রতি পিস ৫ টাকা। অতঃপর বেশকিছু কলার সুব্যবস্থা করে সেখানে খানিকক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আবার যাত্রা শুরু হলো আমাদের। আরও কিছুদূর গিয়ে ধুপপানি গ্রামে পৌঁছে দেখি টেবিল পেতে রীতিমতো দোকান সাজিয়ে বসে আছে, জুস পানি চিপস শসা আর ফল-মূল কি নেই সেখানে! আবারও পেয়ারা কিনে নিয়ে যাত্রা শুরু হলো আমাদের।

সাদা পানির ঝর্ণা

হাচরে-পাচরে প্রায় আড়াই ঘণ্টা হেঁটে পৌঁছে গেলাম ধুপপানিতে। রাঙ্গামাটি জেলার বিলাইছড়ি উপজেলার ফারুয়া ইউনিয়নে এর অবস্থান। খুব বেশিদিন হয়নি মানুষজন এই ঝর্ণার অস্তিত্ব সম্পর্কে জানতে পেরেছে। কিছু বছর আগে এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসী এই স্থানে ধ্যান করার কারণে নয়নাভিরাম এই ঝর্ণাটি মানুষের নজরে আসে। তঞ্চঙ্গ্যা শব্দে ধুপ অর্থ সাদা আর পানিকে পানিই বলা হয় অর্থাৎ ধুপানির অর্থ সাদা পানির ঝর্ণা ।

মূলত এই ঝর্ণার পানি স্বচ্ছ এবং যখন অনেক উঁচু (প্রায় ১৫০ মিটার) থেকে ঝর্ণার জল আছড়ে পড়ে তখন তা শুধু সাদাই দেখা যায়। তাই একে ধুপপানি ঝর্ণা বলা হয়। বাংলাদেশের অন্যতম সুন্দর ঝরনাগুলির মধ্যে অন্যতম এই ঝরনায় নিচের দিকে একটি গুহার মতন আছে। যা এই ঝরনাকে করেছে অনন্য।

;