সব সাহিত্যই এক অর্থে গূঢ় রূপকথা



মৌ কর্মকার
অলঙ্করণ শতাব্দী জাহিদ

অলঙ্করণ শতাব্দী জাহিদ

  • Font increase
  • Font Decrease

জীবিকার তাগিদ, মানুষের জীবনযাত্রার প্রকৃতির পরিবর্তন অথবা যুগের প্রয়োজনে সংসারের সবাই বিশেষ করে মা-বাবা দুইজনই চাকরি কিংবা বিভিন্ন কাজে রত। করছেন নিজ নিজ কাজ। বাসায় বসে একাকী  শিশু বাচ্চাটি। বিষয়টি আপনার নজরে পড়েছে কি? যদি না পড়ে তাহলে কিছু রূপকথার গল্প পড়ে আসুন! দেখতে পাবেন নাগরিক জীবনের এ ব্যস্ত বাস্তবতার চিত্র যেন আমাদের রূপকথার জগতকেই নির্দেশ করছে। সেই রাজকন্যার গল্প, একাকিত্বকে সঙ্গী করে বেড়ে উঠছিল যে। সে যেন আমাদের ফ্লাটে বন্দি এই শিশু বাচ্চাটিই। আমরা যদি গ্রিক রূপকথার একটি গল্প লক্ষ্য করি তাহলে দেখা যায়—

‘এক দেশে ছিল এক ছোট্ট রাজকন্যা। কিন্তু রাজকন্যার মনে বড় দুঃখ ... তাঁর কোনো বন্ধু নেই! বিশাল রাজপ্রাসাদের চৌহদ্দীর ভিতরেই সারাটা দিন কাটে রাজকন্যার। কত দাস-দাসী... কত পাইক-পেয়াদা!... কিন্তু রাজকন্যার কোনো সাথী নেই, কোনো বন্ধু নেই... মনের সুখ-দুঃখের দুটো কথা বলে সময় কাটানোর কেউ নেই! তাইতো রাজকন্যার মনটা খুব ভার! রাজপ্রাসাদের ভিতরে ছিল খুব সুন্দর একটা বাগান। সেই বাগানে কত নাম না জানা গাছ... কত ফুল! কিন্তু ফুলের বাগানেও রাজকন্যার ভালো লাগত না.... তাঁর কোনো বন্ধু নেই যে! একদিন রাজকন্যা দেখতে পেল... সেই বাগানের এক কোণায় ফুটে রয়েছে একটা চমৎকার ছোট্ট ঘাসফুল। ছোট্ট ঘাসফুলটিকে রাজকন্যার মনে ধরল!...’

গল্পের শেষ পর্যায়ে হয়তো রাজকন্যার বন্ধু হয়ে গেল সেই ঘাসফুল। কি? এই গল্পের সাথে আমাদের বর্তমান সময়ের শিশুদের মিল পাওয়া যায়? এই ঘাসফুলটির জায়গায় বর্তমানে আমরা যদি কম্পিউটার বা মোবাইলের কথা বলি তাহলে কি খুব ভুল হবে? গল্পটিতে রাজকন্যার সবই আছে—বিশাল রাজপ্রাসাদ, দাসদাসী, নেই শুধু একজন বন্ধু।

আধুনিক জীবনের ব্যস্ত নগরীতে শিশুরা  সারাদিন বাসায় একা একা কম্পিউটারে সময় কাটায়। উপরের  রূপকথার গল্পের রাজকন্যার ঘাসফুল বন্ধুর মতোই বর্তমানে শিশুরা বন্ধু হিসেবে খুঁজে নিয়েছে কম্পিউটারকে। দিনের এক দীর্ঘ সময় মা-বাবার সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত হয় অনেক শিশু-কিশোর। রাজকন্যার জীবনও অনেকটা এরকমই ছিল। তবে রাজপুরীতে থাকার কারণে  প্রেক্ষাপটটি একটু ভিন্ন হতে পারে। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, বর্তমানে দুরন্তপনার  শৈশবের কোনো উচ্ছলতা নেই, একাকিত্বকে সঙ্গী করে বেড়ে উঠছে  শিশু-কিশোররা। যে কারণে একাকিত্ব, মানসিক কষ্ট—এসব শুধু বড়দেরকেই নয়, দেখা যাচ্ছে শিশুদের ক্ষেত্রেও। অতিরিক্ত পড়াশোনা, খেলাধুলার অভাব, বিভিন্ন পারিবারিক সমস্যা শিশুদের ওপরও প্রভাব ফেলে এবং তারা একাকিত্বে ভোগে। মানসিক চাপের মধ্যে বড় হতে থাকে। এতে প্রভাব পড়ে একাকী শিশুর শৈশবে।

এখন বলতেই পারেন, রূপকথার গল্পের সাথে বাস্তব জীবনকে কি জন্য তুলনা করছি। সেক্ষেত্রে বলতেই হয়, একটু লক্ষ্য করে দেখুন তুলনা করার আগেই রূপকথার রাজকন্যা আর ফ্লাটের বন্দি শিশুর জীবন কিভাবে মিলে যাচ্ছে। একটু লক্ষ্য করুন!

ড. বরুণকুমার চক্রবর্তীর ‘বঙ্গীয় লোকসংস্কৃতি কোষ’ গ্রন্থে বলা হয়েছে—‘রূপকথা মূলত ঐতিহ্যবাহী রচনা। কথাগুলোকে আপাতভাবে অবাস্তব, অর্থহীন, উদ্ভট মনে হলেও এগুলোতে এমন এক সার্বজনীন আবেদন আছে, যা সহজেই পাঠককে টানে।’ এখন প্রশ্ন করা যায়, কেন টানে? নিশ্চয়ই আমাদের জীবনের সাথে মিল আছে তাই টানে। তাইতো? রফিকউল্লাহ খান বলেছেন—‘লোকজীবনের রোম্যান্সলোকের বিচিত্র ভাণ্ডার অবলম্বন করেই অষ্টাদশ শতাব্দী থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে জন্ম নেয় রোম্যান্টিক ন্যাশনালিজম। ঐতিহ্য সন্ধানের সূত্রে লোককথার গভীর তলে একেকটা জাতি পেয়ে যায় তাদের আত্ম-আবিষ্কারের ভূমিতল। যেখানে রাজপুরীও যেন বাস্তবসত্যে প্রতিষ্ঠিত হয়। লোকমুখের কথা গ্রহণ করা হয়, লেখ্য পাঠকলায়। তাতে অনেক ‘ইমেজ’ অপ্রতুলভাবে ফুটে উঠে, রোমাঞ্চরস সঞ্চারিত হয়, দেশজ স্মৃতি-সত্তার পরিচয়  প্রদীপ্তি হয়। সাহিত্যে যুক্ত হয় স্বতন্ত্র আনন্দের অভিমুখ।’ ( কালি ও কলম, জুলাই ৩১, ২০১৮) আসলেই কিন্তু তাই, রূপকথা  তুচ্ছ করে না কিছুই, বরং রাষ্ট্রিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক বেষ্টনীকে প্রাচুর্যময় করে তোলে। ভ্লাদিমির প্রপ, মিখাইল বাখতিন, ক্লোদ লেভি স্ত্রাউসের তত্ত্ব,  পোস্ট-কলোনিয়াল ব্যাখ্যায়  অথবা তুলনামূলক পদ্ধতির মাধ্যেমেও আমরা রূপকথার রাজপুরী ও রাজকন্যার সাথে আধুনিক রাজপুরীরূপী ফ্লাট ও ফ্লাটে বন্দি শিশুর জীবন নিয়ে আলাদা একটি পাঠ আলোচনা করতে পারি। উপরের গল্পে ও আলোচনায় রাজকন্যার সাথে শিশুর জীবনের মিল পাওয়া গেছে বলে মনে হয়!  এবার রাজপুরী নিয়ে আলোচনা করা যাক।

জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর রূপকথা সম্পর্কে  বলেছিলেন ‘জাতির আশায় স্বপ্নের ভাষায় অভাবনীয় সত্য সাহিত্য হচ্ছে রূপকথা।’ (ঘোষ, ২০০৭) এই সত্যতার প্রমাণ আমরা পেয়ে যাই ঠাকুর মার ঝুলির ‘ঘুমন্তপুরী’ গল্পে—

‘আর অমনি রাজপুরীর চারিদিকে পাখি ডাকিয়া উঠিল, দুয়ারে দুয়ারী আসিয়া হাঁক ছাড়িল, উঠানে হাতি ঘোড়া ডাক ছাড়িল, সিপাই তরোয়াল ঝনঝন করিয়া উঠিল; রাজদরবারে রাজা জাগিলেন, মন্ত্রী জাগিলেন, পাত্র জাগিলেন হাজার বচ্ছরের ঘুম হইতে, যে যেখানে ছিলেন, জাগিয়া উঠিলেন লোক লস্কর, সিপাই পাহারা, সৈন্যসামন্ত তীর-তরোয়াল লইয়া খাড়া হইল। সকলে অবাক হইয়া গেলেন, রাজপুরীতে কে আসিল!’ (ঘুমন্তপুরী)

অথবা আমরা যদি রুশ উপকথার একটি গল্প লক্ষ্য করি—‘বহুকাল আগে, ছিল এক রাজপুরী। সেখানে ছিল রাজা, রানী, রাজপরিবার, রাজদরবার, প্রজাকুল—সবাইকে নিয়ে হাসিখুশি এক রাজ্য। বিরাট ঝলমলে রাজপ্রাসাদ, হাতিশালে হাতি, ঘোড়াশালে ঘোড়া, বিরাট সৈন্যবাহিনী, দেশজুড়ে ছড়ানো অজস্র সম্পদ। রাজার ছিল ঝকমকে এক রাজপুত্তুর...’ (রুশ উপকথার গল্প)

রূপকথার ঘটনাবলি অবিশ্বাস্য ও রোমাঞ্চকর হলেও ঘটনামূলে এবং পাত্র-পাত্রীর নামের সঙ্গে অনেক ঐতিহাসিক সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়া যায়। উপরের ঠাকুরমার ঝুলির ‘ঘুমন্তপুরী’ গল্প এবং রুশ উপকথাটি যেন তারই প্রমাণ। গল্প দুটি একটি আদর্শ রাজপুরীর চিত্র আপন মহিমায় অঙ্কন করে তুলেছে। রাজপুরীটি গঠিত হয়েছে রাজা, রানী, রাজপরিবার, প্রজাকুল, রাজপ্রাসাদ, হাতিশালা, ঘোড়াশালা, বিরাট সৈন্যবাহিনী ও রাজপুত্তুরের মাধ্যমে। এছাড়াও রূপকথার গল্পে রাজপুরী রাজ ভাণ্ডার, সুন্দর বাগান, দেবী আরাধনার ঝলমলে মন্দির, শুকপাখি/ স্বর্ণপাখি ইত্যাদি উপাদান সমন্বয়ে গঠিত হয়। এখানে রূপকথার রাজপুরীর যে বর্ণনা পাওয়া গেছে তাতে রাজপুরীর সুন্দর এক রেখাচিত্র অঙ্কন করা যায়।  যায় কি?


https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2018/Sep/09/1536494320626.jpg
রূপকথার রাজপুরী

বর্তমানে আমাদের ফ্লাট বাসাগুলোর চিত্রও কিন্তু ঠিক এরকমই। ছোট এক বাসা যেখানে আছে ছোট বাগান, পুকুরের জায়গায় আছে সুইমিংপুল বা বাথটাব, হাতিশালা বা ঘোড়াশালার জায়গায় খাঁচায় বন্দি পাখি বা একুরিয়ামে বন্দি মাছ, শুকপাখির জায়গায় কম্পিউটার বা মোবাইল।

জগতের সেরা রূপশিল্পী পিকাসো বলেছেন—‘তুমি যা কিছু কল্পনা করতে পারো তাই সত্যি।’ আবার প্রিয় কবি ইয়েটস গল্পকারদের সম্পর্কে বলেছেন—‘তাহলে চলো আমরা গল্প বানিয়েরা, প্রাণে যা চায় নির্ভয়ে শুনিয়ে যাই। সবকিছু আছে সবকিছুই সত্যি।’ (আনন্দবাজার পত্রপত্রিকা, সংখ্যা :  ৩০ মে, ২০১৫) তাহলে আরকি! আমাদের কল্পনা বা স্বপ্নই যদি বাস্তবতাকে তুলে ধরতে পারে তাহলে বাস্তবতা থেকে আমাদের কল্পনাই শ্রেয়। তাইতো? সব মিলিয়ে বলতে গেলে সব সাহিত্যই এক অর্থে গূঢ় রূপকথা। যা আমাদের সামনে আমাদেরই বাস্তবতাকে তুলে ধরে।

সহায়ক গ্রন্থ
১. ঠাকুর মার ঝুলি, দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার, ২০১১।
২. দক্ষিণারঞ্জন রচনাসমগ্র (দ্বিতীয় খণ্ড), দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার, মিত্র ও ঘোষ, ১৯৬১, কলকাতা।
৩. বঙ্গীয় লোকসংস্কৃতি কোষ, ড. বরুণকুমার চক্রবর্তী, কলকাতা, ২০০৪।
৪. আখ্যানতত্ত্ব ও চরিত্রায়ণ, রফিকউল্লাহ খান, চারুলিপি প্রকাশন, ২০১১।
৫. দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার ও তাঁর ঠাকুরমার ঝুলি, বিশ্বজিৎ ঘোষ, ২০০৭, ঢাকা।
৬. আনন্দবাজার পত্রিকা,  অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায়, ৩০ মে, ২০১৫।
৭. কালি ও কলম, সাহিত্য শিল্প ও সংস্কৃতি বিষয়ক মাসিক পত্রিকা, আবুল হাসনাত, জুলাই ৩১, ২০১৮।

হাসান হাফিজের একগুচ্ছ কবিতা



হাসান হাফিজ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ম্যানিলা ও নস্টালজিয়া

ও ম্যানিলা
তুমি আছো স্মৃতিপটে,
ওগো প্রিয় ম্যানিলাসুন্দরী
তৃষিতের ওষ্ঠ তুমি ভিজিয়েছো
স্যান মিগ্যুয়েল নামে বীয়ারে মাদকে
‘পিনোটুবুু’ অগ্নিগিরি
খুব কিন্তু দূরে নয়
দ্বীপ দেশ ফিলিপিন্স
ঔপনিবেশক স্মৃতি কী দুঃসহ
একটানা চারশো বছর
দীর্ঘ দীর্ঘকাল পরে
মুক্তিস্বাদ পেয়েছো যে তুমি
সেই কটু অম্লস্বাদ
স্মৃতি হয়ে বুকে বেঁধে
‘মুক্তি’ দ্যায় উপশম
সুতন্বী উচ্ছল হও মনোরমা
দ্বীপকন্যা সুছন্দা ম্যানিলা।

অসহ দংশন

না-বৃষ্টি না-রোদ
এমন ধূসর দিনে
কেন ছুঁতে চেয়েছে সে
তোমার পেলব হাত
শৈল্পিক আঙুল
চুম্বনের অধিকার
ওরা কিন্তু দ্যায় নি যুবাকে
সন্ধ্যার আঁধারবেলা
সেই স্মৃতি অনশ্বর
জ্বলজ্বলে নক্ষত্রস্পর্ধায়
অমলিন চিরক্ষণ জলরঙ ছবি হয়ে
জেগে থাকে ঠোকরায়
না-পাওয়ার অসীম তৃষ্ণায়...

একগুঁয়ে মাঝি

মন পোড়ে?
বৃষ্টি ওড়ে?
মনের তো ডানা নাই,
কীভাবে বৈদেশ যাবে
বন্ধুয়া-হদিস পাবে
প্রশ্ন এইটাই।

বৃষ্টি পড়ছে
আছড়ে পড়ছে
মৃত্তিকার আলিঙ্গনে
এবং সম্ভোগে
সার্থকতা জলের প্রেমের।
দেখেছ প্রেমের মড়া?
কোনোদিন ডুবেছে সে জলে?

মন পোড়ে?
আহা বাহা পুড়ুক জ্বলুক
পোড়াই নিয়তি
বাহক দুর্গতি
ছিল যে কপালে লেখা
কীভাবে খ-াবে?
মনের বৈরাগী মাঝি
ফিরে আসতে নয় রাজি
চড়েছে সে একগুঁয়ে
ভাঙাচোরা ডিঙি নৌকায়।

নিরালায় সন্ধ্যাকালে

যাও পাখি যাও
পরানবন্ধুরে গিয়া
স্মরণ করাও
দুঃখিনীরে একলা রাইখা
কী মজা সে পায়?
এবার নাগালে পেলে
রশি দিয়া বাইন্দা রাখব
সতত পঞ্চল বন্ধে
এইবার দেইখা নিব কীভাবে পলায়!
শরমের খেতা পুড়ি
ওরে পাইলে এই ঘুরি
উইড়া চলি পাতায় পাতায়
যাও পাখি বলো তারে
এবার সে আসতে পারে
দুই বন্ধু বসব গিয়া
পুরানা দীঘির পাড়ে
নিরালা সন্ধ্যায় কালে
প্রাচীন ঘাটলায়
ও বন্দু সারলী হাঁস
খুঁচিয়ে কী মজা পাস?
সবকিছু ছাইড়া ছুইড়া
নিজ গৃহে সোজা চইলা আয়!


গত্যন্তর নাই

বিশ্বাস ভেঙেছো তবু
তোমাকে বিশ্বাস করি
পুনরায় প্রতারিত হতে চাই
ক্ষতি আর কতটুকু হবে?
সর্বনাশ পোড়া ছাই
লানতের অন্ত নাই
তোমাদ্বারা সকলই সম্ভব
যদি অসম্ভব হয়
আমি তবে বেপথু নাচার
পথ খোলা নাই যে বাঁচার
আমার কী গতি হবে তবে?


আশাভঙ্গ

এতোটা পথ
পাড়ি দিলাম একা
ভেবেছিলাম
হয়তো পাবো দেখা।
জানতাম না অদর্শনই
এই কপালের লেখা।
ভেবেছিলাম সরল তুমি
এখন দেখি জটিল বক্ররেখা!


নৈকট্য তো ছিল না কপালে

ক.
খুঁজতে খুঁজতে একদিন
হয়তো পেয়ে যাবো
ভয় কিন্তু জাগরুক
পেলে পর নিশ্চিত হারাবো!

খ.
কাঁটা ও সংশয়
সমস্ত জীবনব্যাপী
ভিলেনের মতো জেগে রয়।

গ.
জারিজুরি সবই হলো ফাঁস।
জানতে না আমার হৃদয়মধ্যে
বাস করে অপরূপ আন্ধা সর্বনাশ?
আমি কিন্তু জানতাম
সে কারণে কাছে ঘেঁষতে
চাইতাম না মোটের উপর
নৈকট্য নিয়তি নয় জানা ছিল
কিন্তু করতে পারি নাই
তোমাকে ত্যাগের মতো ছিন্ন উপবাস।

 

;

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু



হাসিবুর রহমান
পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

  • Font increase
  • Font Decrease

 

কোন জাতির উত্থান-পতন, আবেগ, ভবিষ্যৎ নির্মাণে মিশে থাকে ইতিহাসের  সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম উপাদান । কেউ ইচ্ছে করলেই তাকে যেমন বদলে দিতে পারে না, ঠিক তেমনি আদর্শগত দিক থেকে কোন জাতিকে বিপথে চালিতে করতে পারে ভুল ইতিহাস। ভারত উপমহাদেশের ইতিহাসে অষ্টাদশ শতকের বাংলা নানা কারণেই তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে, বাংলার আর্থিক সমৃদ্ধির সুনাম সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল সেই সময়। শান্তি সমৃদ্ধির চূড়ান্ত এক পর্যায়ে ১৭৫৭ পলাশির অন্ধকার নেমে আসে এবং ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন ঘটনো হয়।

দ্বিসার্ধশত বছরের পলাশি যুদ্ধের বহুমাত্রিক আলোচনা হয়েছে ঠিকই কিন্তু নবাব সিরাজউদ্দৌলার রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা ও ব্যক্তিগত চরিত্র নিয়ে জনসমাজে বিভ্রান্তিকর, কাল্পনিক গল্পও ছড়ানো হয়েছে । দেশী-বিদেশী ঐতিহাসিকরা তাঁকে লম্পট, দুশ্চরিত্র, কটুভাষী, হৃদয়হীন রূঢ়  চতুষ্পদ পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট স্বভাবজাত বলে মিথ্যা ও কলঙ্কের অপবাদে মুড়ে দিয়েছেন। সমকালীন যুগের ফারসি ভাষার মুসলমান,  ইংরেজ লেখক কেউই তাঁর প্রতি সুবিচার করে কলম ধরেননি।

তবে, অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, নিখিল নাথ রায় আধুনিক কালে সুশীল চৌধুরীর মতো ব্যতিক্রমী ঐতিহাসিকরা  সিরাজউদ্দৌলার মত দেশপ্রেমিক নবাবকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে যেভাবে মূল্যায়ন করে বিপথগামী ইতিহাস চর্চার ধারাকে থমকে দিয়েছেন- এটাও ইতিহাসবেত্তাদের সততা, স্বচ্ছতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্বরূপ। 

বর্তমানে অধিকাংশ ঐতিহাসিক পলাশির যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে বিস্তর লেখালেখিতে আগ্রহী। কিন্তু তাঁরা দেখেন না, দেখতে চান না যে পলাশি হলো একটি  পরিণতি । ষড়যন্ত্র আর সামরিক আগ্রাসনের একটি সুদূরপ্রসারী ফলাফল। তাঁরা পলাশি পরবর্তী সময়ে ইংরেজ কর্তৃক ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার বৈধতা দিতে সিরাজের বিরুদ্ধে সীমাহীন মিথ্যা যুক্তির জাল বুনেছিল, আসলে এছাড়া ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে স্বীকৃতি দেওয়ার অন্য কোন বৈধ উপায় তাঁদের হাতে অবশিষ্ট ছিল না।

মাত্র চৌদ্দ মাসের শাসনকালে অবাধ্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঔদ্ধত্যকে  দমন করতে সিরাজের দৃঢ়তা, সাহসিকতা, কঠোরতা দেখিয়েছিলেন তা নিঃসন্দেহে প্রশংসাযোগ্য। বাংলার মাটিতে বিনা অনুমতিতে ইংরেজদের দুর্গ নির্মাণ, কিংবা কর্মচারীদের  অবাধ "ব্যক্তিগত বাণিজ্য" বন্ধ করা তাঁর কাছে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। একজন স্বাধীন নবাবের চোখে সার্বভৌমিকতার প্রশ্ন এখানে জড়িয়ে ছিল। কিন্তু সিরাজের দুর্ভাগ্য তাঁর দরবারের পদস্থ বিশ্বাসী অমাত্য গোষ্ঠী, অনেকেই ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের আশায় কোম্পানির ষড়যন্ত্রের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। জগৎ শেঠদের মতো দেশীয় বণিকরাও এই ষড়যন্ত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

ঘরে বাইরে শত্রু পরিবেশিত সিরাজ দৃঢ়তার সঙ্গে এই অশুভ শক্তির মোকাবেলায় সফল হননি বটে , কিন্তু তাঁর স্বদেশভূমি রক্ষার লড়াইকে হীন চোখে দেখা অনৈতিহাসিক। পলাশি নামক বিয়োগান্ত ঘটনার পর  তাঁকে  চরম অপমান আর অমর্যতার সম্মুখীন হতে হয়। যে নিষ্ঠুরতা তাঁর সঙ্গে পলাশির পর দেখানো হয়েছিল ইতিহাসে তা বিরল। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক সিরাজুল ইসলাম লিখেছেন, প্রকৃতপক্ষে সমকালীন শাসকশ্রেণীর মানদণ্ডে সিরাজউদ্দৌলার চারিত্রিক দৃঢ়তা, অত্যন্ত সাহসিকতা ও অসাধারণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধ বিস্ময়কর বটে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় সাম্প্রতিক কালেও ইংরেজদের ভারতবর্ষ দখলের বৈধতা দান করতে গিয়ে একশ্রেণীর ইতিহাসবিদ সিরাজকে নিয়ে নতুন নতুন কাহিনী, উপাখ্যান ম্যানুফ্যাকচার করে ইতিহাস হিসাবে প্রচার করে চলেছেন। তাঁরা বলেন-- সিরাজের মৃত্যু কোন শহীদের মৃত্যু নয় । কারণ তিনি মধ্যযুগীয় রাষ্ট্রব্যবস্থাকে রক্ষা করতে লড়াই করেছিলেন মাত্র, যেখানে জনসমাজের সঙ্গে তাঁর কোন সম্বন্ধ ছিল না। অথবা একথা বলা হয় যে বাংলার নবাব হিসেবে কেন্দ্রীয় মুঘল শাসকদের দ্বারা কোন লিখিত বৈধ অনুমোদন তাঁর ছিল না ইত্যাদি।

সিরাজের মৃত্যু কোন শহিদের মৃত্যু কিনা সে বিষয়ে বিতর্ক থাকা অকল্পনীয়। তাঁর দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলা ইতিহাস-বিরুদ্ধ। এছাড়া শাসনের বৈধতার দিক থেকে বাংলার নবাবরা নিয়মিত দিল্লি সম্রাটদের রাজস্ব প্রদান করতেন, সিরাজ ও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। দেশের অভিন্ন মুদ্রা ব্যবস্থা বাংলাতেও চালু ছিল। কাজেই  অভিযোগকারীরা কি ধরনের 'দেশপ্রেম' ও 'জাতীয়তাবোধ' সিরাজের কাছে প্রত্যাশা করছেন তার কোন ইতিহাস সম্মত ব্যাখ্যা হয় না। দেশকে রক্ষা করার দায়িত্ব তিনি অস্বীকার করেননি এখানেই তাঁর রাজনৈতিক গুরুত্ব ও ঐতিহাসিক অবদান।

সিরাজউদ্দৌলার নিরন্তর লড়াই এর সঙ্গে যুক্ত ছিল আপামর বাংলার মানুষের জীবন ভবিষ্যৎ। পলাশিতে যদি নবাবকে না হারতে হত তাহলে বাংলার ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হত নিশ্চয়। দীর্ঘ দু'শো বছরের ঔপনিবেশিক শাসন, শোষণের জর্জরিত দেশবাসীর মনে হীনমন্যতাপদের জন্ম নিত না। স্বাধীনতার শত্রুদের সেদিন যথার্থভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। দেশপ্রেমিক নবাবের মৃত্যুকে কেবল ক্ষমতার হাত বদল বলেই ভেবেছিল একশ্রেণীর মানুষ। ক্ষমতাসীন নবাবের লাশকে সেদিন জনগণের ঘৃণা ও অপমানের বস্তু করে তুলেছিল। নবাবের অনুগ্রহে যাদের একসময় জীবন জীবিকা নির্ভর করত তারাই দেশপ্রেমিক সিরাজকে নির্মমভাবে হত্যা করল, মৃতদেহটি পশুর মত ডাস্টবিনে ছুঁড়ে দিয়েছিল। সমকালীন যুগের এই ঘৃণ্য প্রতিশোধ যেকোনো জাতির কাছেই বড় লজ্জার।

 

অথচ যে নবাব চরম বিপদের মুহূর্তে দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি, কারোর প্রতি  শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি, তাঁর সেই মহানুভবতা ও উদারতাকে কেউ মূল্যায়ন করতে চায় না। ম্যালেশন যথার্থই মন্তব্য করে করেছেন  যে, পলাশির আগে-পরে একমাত্র সিরাজের বিশ্বাসঘাতকতা ও ষড়যন্ত্রের সঙ্গে কোন সম্পর্ক ছিল না।

একথা সত্যি যে, বাংলার নবাবদের মধ্যে সিরাজই বোধহয় দেশকে একটু বেশি ভালোবেসে ফেলেছিলেন। তিনি মুর্শিদকুলি খান, সুজাউদ্দিন, সরফরাজ বা আলিবর্দী খানের মতো গা ভাসিয়ে চলতে পারতেন তাহলে তাঁকে অন্তত অকালে প্রাণ দিতে হতো না। হতভাগ্য রাজ্যহারা নবাব জীবনের অন্তিম সময়ের প্রাণ ভিক্ষার জন্য প্রত্যেকের পদতলে লুটিয়ে পড়েছিলেন কিন্তু সেদিন তাঁর করুণ আর্তি শুনতে পাইনি কেউ। ফলে বাংলার ইতিহাসে চিরকাল কালো অধ্যায় হিসেবে ১৭৫৭ সালের ৩রা জুলাই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। তাঁকে জীবন ভিক্ষার পরিবর্তে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। নিষ্ঠুর, ঘৃণিত সেই হত্যাযজ্ঞ আজও মানুষের হৃদয়ে কম্পিত হয়। দেশ রক্ষার লড়াইয়ে পরাজিত হয়েও মানুষের মনে তিনি চিরদিন স্বাধীনতার স্পৃহায় অমর হয়েই থাকবেন, এটাই অকালপ্রয়াত নবাবের জন্য  শ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি।

(প্রাবন্ধিক আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক।)

 সহায়ক তথ্যসূত্র :

১) যদুনাথ সরকার ,  বেঙ্গল নবাবস, এশিয়াটিক সোসাইটি, কলকাতা ,১৯৫২

 ২) ডঃ সুশীল চৌধুরী, পলাশির অজানা কাহিনী, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।

৩) ড: মোহম্মদ মোহর আলি,  হিস্টরি অব দ্য মুসলিমস অফ বেঙ্গল, ২খন্ড ,রিয়াধ ১৯৮৮।

৪) অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, সিরাজদ্দৌলা, কল্লোল, কলকাতা।

৫) ড : সিরাজুল ইসলাম , বাংলাদেশের ইতিহাস , খন্ড ১ম ( ১৭৫৭-১৯৭১) সম্পাদনা , এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ ২০১৭ ।

৬) আ:কা: মো: যাকারিয়া, সিরাজউদ্দৌলা , প্রথমা , ঢাকা ।

;

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

  • Font increase
  • Font Decrease

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ও শিশুসাহিত্যিক ফখরুল হাসান। ২৩ জুন বিকেলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সংগীত ও নৃত্যকলা মিলনায়তনে তার হাতে সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ৬ লেখককে সম্মাননা, ‘শেখ হাসিনার জয় বিশ্বের বিস্ময়’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, আবৃত্তি, ছড়া পাঠ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

এ সময় সৈয়দ মাসুম, আর মজিব, এনাম আনন্দ, ফাহমিদা ইয়াসমিন, লুৎফর রহমান চৌধুরীকেও সম্মাননা দেওয়া হয়।

বঙ্গবন্ধু জন্মশতবর্ষ আন্তর্জাতিক পর্ষদ, বঙ্গবন্ধু লেখক পরিষদের আয়োজনে বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. শাহজাহান মৃধা বেনুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ও জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা।

প্রধান অতিথি ছিলেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন কবি অসীম সাহা, মারুফুল ইসলাম, তারিক সুজাত ও অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন।

কবিতা আবৃত্তি করেন জালাল উদ্দিন নলুয়া, ড. তপন বাগচী, শফিকুর রাহী, রিফাত নিগার শাপলা, আনতানুর হক, হানিফ খান, ইউসুফ রেজা, রোকশানা সাথী, জমশেদ ওয়াজেদ, মাসুদ আলম বাবুল, মাদবর রফিক, লুৎফর চৌধুরী, হাসনাইন সাজ্জাদী, গিয়াসউদ্দিন চাষা, হেনা খান, কৌমুদী নার্গিস, বোরহান মাসুদ, সৈয়দ একতেদার আলী, আলী নিয়ামত, মিহির কান্তি ভৌমিক, লুৎফা জালাল, তানিয়া মাহমুদ, শ্রাবণ রেজা, ইমরান পরশ, সৈয়দ তপু, মেরীনা সাঈদ, শাফিন প্রমুখ

;

সংশপ্তক শেখ হাসিনা



আবদুল হামিদ মাহবুব
আবদুল হামিদ মাহবুব

আবদুল হামিদ মাহবুব

  • Font increase
  • Font Decrease

 

সংশপ্তক শেখ হাসিনা

কাণ্ড অনেক করে

পদ্মা বুকে ‘পদ্মা সেতু’

ঠিক দিয়েছেন গড়ে।

 

কাণ্ড ওসব নয় সাধারণ,

ভুলতে কি আর পারি?

জয় বাংলা জোরসে হেঁকে

ঠিক তো দিলেন পাড়ি।

 

অপেক্ষাতে সবাই আছি

মনটা উচাটন

ওই দিনটা জানান দিয়ে

আসলো শুভক্ষণ!

 

বাংলাদেশের এমন জয়ে

বিশ্ব জানুক, কি সুখ?

সব বাঙালি বুকের পাতায়

সুখের গাথা লিখুক।

;