হারুকি মুরাকামির বক্তৃতা



অনুবাদ | এমদাদ রহমান
অলঙ্করণ শতাব্দী জাহিদ

অলঙ্করণ শতাব্দী জাহিদ

  • Font increase
  • Font Decrease

‘বাতাস যেখানে গান গায়’ নামে মুরাকামি তার প্রথম উপন্যাসটি লিখেছিলেন ’৭৯ সালে, তারপর টানা ৩ দশক মানুষের মনোজগতকে তিনি আশ্চর্য দক্ষতায় পর্যবেক্ষণ করেছেন। শুধু জাপান নয়, মুরাকামি বিশ্বজুড়ে পরিচিত নাম। বিশ্বের কয়েক কোটি পাঠক তার লেখা পড়েন। ইতোমধ্যে পঞ্চাশটিরও বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে তার বইগুলি। পাঠককে অদ্ভুত ও পরাবাস্তব পরিস্থিতির মুখোমুখি করতে চান এই পোস্ট মডার্ন লেখক। ২০০৫-এ বেরিয়েছে তার বহুল আলোচিত উপন্যাস ‘কাফকা অন দ্য শোর’। মুরাকামি টোকিওর ওয়াসেদা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে চলচ্চিত্রের প্রতি প্রবল আগ্রহ তৈরি হয়, যদিও তার পড়ার বিষয় ছিল নাটক। ২০১৭ সালে প্রকাশিত হয় সঙ্গীত নিয়ে সেজি ওযাওয়া’র সঙ্গে আলাপচারিতার বই ‘অ্যাবসোলিউটলি অন মিউজিক’।

জে. ডি স্যালিঙ্গারের ‘দ্য ক্যাচার ইন দ্য রাই’, এফ. স্কট ফিটজিরাল্ডের ‘দ্য গ্রেট গ্যাটসবি’ বই দুটি তিনি অনুবাদ করেছেন। ফিটজিরাল্ডের উপন্যাসটিকে তিনি তার লেখক জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বই বলেছেন। লেখালেখির শ্রমসাধ্য দীর্ঘ প্রক্রিয়াকে তিনি ভিডিও গেমস প্রোগ্রামিংয়ের সঙ্গে তুলনা করে বলেছিলেন, লিখতে বসে কখনো মনে হয় ভিডিও গেম ডিজাইন করছি। আমিই প্রোগ্রামার, আমিই প্লেয়ার। এক বিচ্ছিন্ন খেলোয়াড়। দৌড়বিদ হিসেবেও তাঁর পরিচিতি আছে। ২০০৮-এর জুনে দ্য নিউইয়র্কারে মুরাকামি’র ‘দৌড়বিদ উপন্যাসিক’ লেখাটি প্রকাশিত হয়, একই বছর প্রকাশিত হয় তাঁর জীবনস্মৃতি ‘হোয়াট আই টক অ্যাবাউট হোয়েন আই টক অ্যাবাউট রানিং’।

মুরাকামির জন্ম ১৯৪৯ সালে, জাপানের কিয়োটোয়। তিনি ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, অনুবাদক, সাংবাদিক। ‘ড্যান্স ড্যান্স ড্যান্স’, ‘আফটার দ্য কোয়েক’, ‘দ্য স্ট্রেঞ্জ লাইব্রেরি’, ‘ব্লাইন্ড উইলো স্লিপিং উইম্যান’, ‘এ ওয়াইল্ড শিপ চেজ’, ‘নরওয়েজিয়ান উড’, ‘দি উইন্ড-আপ বার্ড ক্রনিকল’, ‘কাফকা অন দ্য শোর’, ‘স্পুটনিক সুইটহার্ট’, ‘ওয়ানকিউএইটফোর’ ইত্যাদি তাঁর অন্যতম সৃষ্টি।

‘এ ওয়াইল্ড শিপ চেজ’ উপন্যাসটি লেখার শৈলি নিয়ে, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্কলি ইনস্টিটিউটে তিনি একটি বক্তৃতা দিয়েছিলেন, ১৯৯২-এ। ‘হারুকি মুরাকামি এন্ড দ্য মিউজিক অব ওয়ার্ডস’ বইয়ে জে. রুবিন এ নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন, সাক্ষাৎকারের অংশবিশেষ নিয়ে গদ্য লিখেছেন ঔপন্যাসিক লাওরি পেই, তার ব্লগ ‘অন দ্য ওয়ে টু রাইটিং’-এ।

***
‘এ ওয়াইল্ড শিপ চেজ’ যেভাবে  লিখেছি, লিখতে লিখতে অনুভব করছিলাম এর গল্পটি ‘মোনোগাতারি’, মুখে মুখে কথিত হয়েছে, আমি কিছু সৃষ্টি করিনি; আবার এই গল্পটি এমন কিছু যেন তাকে আপনি নিজের ভেতর থেকে বের করছেন। গল্পটি আপনার ভেতরেই আছে। আপনি তাকে গড়বেন, তাকে বের করে আনবেন। আমার কাছে শেষ পর্যন্ত যে ব্যাপারটি সত্য, তা হলো গল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা। আমার ক্ষেত্রে, গল্প হচ্ছে একটি চলন্ত গাড়ি, যে গাড়ি তার পাঠককে কোথাও না কোথাও নিয়ে যায়। যাত্রাপথেই আপনার যা কিছু বলার বলবেন, পাঠকের সংবেদনে যতটুকু কম্পন তোলার তুলবেন, অনুভূতিকে তীব্র করবেন, কিন্তু প্রথমেই যা করতে হবে, তা হচ্ছে পাঠককে গাড়িতে তুলতে হবে, তারপর গল্পটি এমনভাবে বলে যেতে হবে যাতে পাঠককে বিশ্বাস করানোর ক্ষমতাটি আপনার থাকে। এ শর্ত গল্পটিকে অবশ্যই পূরণ করতে হবে।

আমি যখন ‘এ ওয়াইল্ড শিপ চেজ’ লেখা শুরু করি তখন আমার কাছে আগে থেকে ভেবে রাখা কোনো আইডিয়া ছিল না। প্রথম অধ্যায়টি টানা লিখে গেছি। এমনকি তখনও আমার ধারণা ছিল না কিভাবে আর কোন জায়গা থেকে গল্পটি শুরু করব! নির্ভার নিরুদ্বেগে লিখতে থাকলাম। শুধু এই অনুভূতিটি হতে থাকল যে গল্পটি আমার ভেতর কোথাও আছে, আমি সেটা জানি; ধীরে ধীরে গল্পটি খাড়া হচ্ছে, নিজের ভেতরে আমি তার রূপটা দেখতে পাচ্ছি। তখন আমি ভূগর্ভস্থ ধাতু সন্ধানকারী যন্ত্রের সেই অলৌকিক দণ্ড যে কাদামাটির ভেতর অনুসন্ধান করছে। আমি অনুভবে জানতাম কোথায় সেই কাদামাটি, জানতাম বলেই খনন শুরু করতে পেরেছিলাম। 

‘এ ওয়াইল্ড শিপ চেজ’ উপন্যাসটির নির্মাণ কাঠামো [স্ট্রাকচার] চ্যান্ডলারের গোয়েন্দা কাহিনীগুলির দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত। চ্যান্ডলারের বইগুলির আমি এক উন্মুখ পাঠক, তার কয়েকটি বই বারবার পড়েছি। আমি আমার নতুন উপন্যাসে তার ‘প্লট স্ট্রাকচার’কে ব্যবহার করতে চেয়েছিলাম, ভেবেছিলাম উপন্যাসের মুখ্যচরিত্রটি হবেন শহরের বসবাসকারী এক নিঃসঙ্গ ব্যক্তি যিনি কিছু একটা খুঁজে বেড়াচ্ছেন। খুঁজে বেড়ানোর পুরোটা সময় তিনি বিভিন্ন ধরনের জটিল পরিস্থিতিতে পড়বেন। অবশেষে তিনি যখন তার আরাধ্য জিনিসটিকে খুঁজে পাবেন, ইতোমধ্যে তা হয় ধ্বংসপ্রাপ্ত না হয় বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এটা স্পষ্টতই চ্যান্ডলারের নিজস্ব পদ্ধতি, একেই আমি ‘এ ওয়াইল্ড শিপ চেজ’-এ ব্যবহার করতে চেয়েছিলাম।

‘এ ওয়াইল্ড শিপ চেজ’-কে, আমি যা-ই বলি না কেন, কখনো রহস্যোপন্যাস হিসেবে লিখতে চেষ্টা করিনি। এসব উপন্যাসে হয় কী—একটি রহস্য থাকবে, সমগ্র উপন্যাস জুড়ে চলবে সেই রহস্যের সুলুকসন্ধান, উন্মোচনের খুঁটিনাটি, কিন্তু আমি তো কোনোকিছুর সমাধানের চেষ্টা করছি না। আমি যা করতে চেয়েছিলাম তা হচ্ছে রহস্যময়তার জন্ম দেওয়া। রহস্য থাকবে অমীমাংসিত। উপন্যাসে ‘শিপ ম্যান’ চরিত্রটি সম্পর্কে আমি কিছুই বলতে চাইনি, সেই মেষটি সম্পর্কেও কিছু প্রকাশ করতে চাইনি যার পেছন দিকে আছে একটি তারা; কিংবা ‘র‌্যাট’ চরিত্রটির ভাগ্যে শেষ পর্যন্ত কী ঘটেছিল সে সম্পর্কেও আমি নিশ্চুপ। আমি রহস্যোপন্যাসের কাঠামোকে ব্যবহার করেছি কিন্তু তাতে ভরে দিয়েছি অপরিচিত মালমসলা। এর বেশি বলতে হলে বলব—এই উপন্যাসের গঠন কাঠামোটি এমন যেন এক কলের গাড়ির ইঞ্জিন।

প্রথম কয়েক অধ্যায়ে আমি আমার আরাধ্য পথটিকে খুঁজেছি, অন্ধের মতো, কিন্তু তখনও আমি অনিশ্চিত গল্প কোথায় যাচ্ছে, কিভাবে নির্মিত হচ্ছে ভেবে; বিপুল অন্ধকারে ডুবে থাকা পথটিকে শুধু অনুভব করছি কিন্তু দেখতে পাচ্ছি না। কখন আর কোথায় মেষদলের গল্পের সঙ্গে উপন্যাসের অন্য গল্পটি পরস্পরকে একত্রে জড়িয়ে নেবে, ছেদ করবে তারপর আবারও এগিয়ে যাবে? ভাবছি ভাবছি, হঠাৎ অজানা কিছু একটা ক্লিক করল, নিকষ কালো অন্ধকারের সামনে দীপ্তিময় কিছু দেখা যাচ্ছে যেন! তার মানে—আলো আছে! আর আলো এখানেই ছিল। কেউ যেন আমাকে বলে দিচ্ছে এদিকে নয়, ওদিকে যাও, হ্যাঁ, এবার বাঁক নাও...এবার আমাকে দেখে দেখে পা ফেলতে হবে, পদক্ষেপে যেন ভুল না হয়, যেন অসাবধানতায় হোঁচট না খাই, ভুলে যেন গর্তে না পড়ি।

লেখালেখির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে আত্মবিশ্বাস। গল্পটি বলার শক্তি, জলের বুকে তীব্র আলোড়ন আর পাজলের এলোমেলো টুকরোগুলিকে একসঙ্গে জুড়ে দেবার তীক্ষ্ণতা আপনার থাকতে হবে। এই আস্থা ছাড়া আপনি এক লাইনও এগোতে পারবেন না। লেখালেখি ব্যাপারটা মুষ্টিযুদ্ধের মতো। একবার যদি রিঙের মধ্যে ঢুকে পড়েন তাহলে আর ফিরতে পারবেন না, ম্যাচ শেষ না হওয়া পর্যন্ত আপনাকে লড়ে যেতে হবে।

উপন্যাসগুলো আমি এভাবেই লিখি আর সেই ঠিক এভাবে লিখিত উপন্যাসগুলোই পড়তে পছন্দ করি। আমার কাছে স্বতঃস্ফূর্ততাই সব।

[নোট : ‘মোনোগাতারি’ জাপানি সাহিত্যের একটি বিশেষ ফর্ম। যেসব উপাখ্যান মহাকাব্যের সাথে তুলনীয়, গল্প বলার ‘ওরাল ট্র্যাডিশন’, বিশেষত ঐতিহাসিক ঘটনাবলী পুনঃকথনকে ‘মোনোগাতারি’ বলে।]

হাসান হাফিজের একগুচ্ছ কবিতা



হাসান হাফিজ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ম্যানিলা ও নস্টালজিয়া

ও ম্যানিলা
তুমি আছো স্মৃতিপটে,
ওগো প্রিয় ম্যানিলাসুন্দরী
তৃষিতের ওষ্ঠ তুমি ভিজিয়েছো
স্যান মিগ্যুয়েল নামে বীয়ারে মাদকে
‘পিনোটুবুু’ অগ্নিগিরি
খুব কিন্তু দূরে নয়
দ্বীপ দেশ ফিলিপিন্স
ঔপনিবেশক স্মৃতি কী দুঃসহ
একটানা চারশো বছর
দীর্ঘ দীর্ঘকাল পরে
মুক্তিস্বাদ পেয়েছো যে তুমি
সেই কটু অম্লস্বাদ
স্মৃতি হয়ে বুকে বেঁধে
‘মুক্তি’ দ্যায় উপশম
সুতন্বী উচ্ছল হও মনোরমা
দ্বীপকন্যা সুছন্দা ম্যানিলা।

অসহ দংশন

না-বৃষ্টি না-রোদ
এমন ধূসর দিনে
কেন ছুঁতে চেয়েছে সে
তোমার পেলব হাত
শৈল্পিক আঙুল
চুম্বনের অধিকার
ওরা কিন্তু দ্যায় নি যুবাকে
সন্ধ্যার আঁধারবেলা
সেই স্মৃতি অনশ্বর
জ্বলজ্বলে নক্ষত্রস্পর্ধায়
অমলিন চিরক্ষণ জলরঙ ছবি হয়ে
জেগে থাকে ঠোকরায়
না-পাওয়ার অসীম তৃষ্ণায়...

একগুঁয়ে মাঝি

মন পোড়ে?
বৃষ্টি ওড়ে?
মনের তো ডানা নাই,
কীভাবে বৈদেশ যাবে
বন্ধুয়া-হদিস পাবে
প্রশ্ন এইটাই।

বৃষ্টি পড়ছে
আছড়ে পড়ছে
মৃত্তিকার আলিঙ্গনে
এবং সম্ভোগে
সার্থকতা জলের প্রেমের।
দেখেছ প্রেমের মড়া?
কোনোদিন ডুবেছে সে জলে?

মন পোড়ে?
আহা বাহা পুড়ুক জ্বলুক
পোড়াই নিয়তি
বাহক দুর্গতি
ছিল যে কপালে লেখা
কীভাবে খ-াবে?
মনের বৈরাগী মাঝি
ফিরে আসতে নয় রাজি
চড়েছে সে একগুঁয়ে
ভাঙাচোরা ডিঙি নৌকায়।

নিরালায় সন্ধ্যাকালে

যাও পাখি যাও
পরানবন্ধুরে গিয়া
স্মরণ করাও
দুঃখিনীরে একলা রাইখা
কী মজা সে পায়?
এবার নাগালে পেলে
রশি দিয়া বাইন্দা রাখব
সতত পঞ্চল বন্ধে
এইবার দেইখা নিব কীভাবে পলায়!
শরমের খেতা পুড়ি
ওরে পাইলে এই ঘুরি
উইড়া চলি পাতায় পাতায়
যাও পাখি বলো তারে
এবার সে আসতে পারে
দুই বন্ধু বসব গিয়া
পুরানা দীঘির পাড়ে
নিরালা সন্ধ্যায় কালে
প্রাচীন ঘাটলায়
ও বন্দু সারলী হাঁস
খুঁচিয়ে কী মজা পাস?
সবকিছু ছাইড়া ছুইড়া
নিজ গৃহে সোজা চইলা আয়!


গত্যন্তর নাই

বিশ্বাস ভেঙেছো তবু
তোমাকে বিশ্বাস করি
পুনরায় প্রতারিত হতে চাই
ক্ষতি আর কতটুকু হবে?
সর্বনাশ পোড়া ছাই
লানতের অন্ত নাই
তোমাদ্বারা সকলই সম্ভব
যদি অসম্ভব হয়
আমি তবে বেপথু নাচার
পথ খোলা নাই যে বাঁচার
আমার কী গতি হবে তবে?


আশাভঙ্গ

এতোটা পথ
পাড়ি দিলাম একা
ভেবেছিলাম
হয়তো পাবো দেখা।
জানতাম না অদর্শনই
এই কপালের লেখা।
ভেবেছিলাম সরল তুমি
এখন দেখি জটিল বক্ররেখা!


নৈকট্য তো ছিল না কপালে

ক.
খুঁজতে খুঁজতে একদিন
হয়তো পেয়ে যাবো
ভয় কিন্তু জাগরুক
পেলে পর নিশ্চিত হারাবো!

খ.
কাঁটা ও সংশয়
সমস্ত জীবনব্যাপী
ভিলেনের মতো জেগে রয়।

গ.
জারিজুরি সবই হলো ফাঁস।
জানতে না আমার হৃদয়মধ্যে
বাস করে অপরূপ আন্ধা সর্বনাশ?
আমি কিন্তু জানতাম
সে কারণে কাছে ঘেঁষতে
চাইতাম না মোটের উপর
নৈকট্য নিয়তি নয় জানা ছিল
কিন্তু করতে পারি নাই
তোমাকে ত্যাগের মতো ছিন্ন উপবাস।

 

;

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু



হাসিবুর রহমান
পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

  • Font increase
  • Font Decrease

 

কোন জাতির উত্থান-পতন, আবেগ, ভবিষ্যৎ নির্মাণে মিশে থাকে ইতিহাসের  সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম উপাদান । কেউ ইচ্ছে করলেই তাকে যেমন বদলে দিতে পারে না, ঠিক তেমনি আদর্শগত দিক থেকে কোন জাতিকে বিপথে চালিতে করতে পারে ভুল ইতিহাস। ভারত উপমহাদেশের ইতিহাসে অষ্টাদশ শতকের বাংলা নানা কারণেই তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে, বাংলার আর্থিক সমৃদ্ধির সুনাম সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল সেই সময়। শান্তি সমৃদ্ধির চূড়ান্ত এক পর্যায়ে ১৭৫৭ পলাশির অন্ধকার নেমে আসে এবং ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন ঘটনো হয়।

দ্বিসার্ধশত বছরের পলাশি যুদ্ধের বহুমাত্রিক আলোচনা হয়েছে ঠিকই কিন্তু নবাব সিরাজউদ্দৌলার রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা ও ব্যক্তিগত চরিত্র নিয়ে জনসমাজে বিভ্রান্তিকর, কাল্পনিক গল্পও ছড়ানো হয়েছে । দেশী-বিদেশী ঐতিহাসিকরা তাঁকে লম্পট, দুশ্চরিত্র, কটুভাষী, হৃদয়হীন রূঢ়  চতুষ্পদ পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট স্বভাবজাত বলে মিথ্যা ও কলঙ্কের অপবাদে মুড়ে দিয়েছেন। সমকালীন যুগের ফারসি ভাষার মুসলমান,  ইংরেজ লেখক কেউই তাঁর প্রতি সুবিচার করে কলম ধরেননি।

তবে, অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, নিখিল নাথ রায় আধুনিক কালে সুশীল চৌধুরীর মতো ব্যতিক্রমী ঐতিহাসিকরা  সিরাজউদ্দৌলার মত দেশপ্রেমিক নবাবকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে যেভাবে মূল্যায়ন করে বিপথগামী ইতিহাস চর্চার ধারাকে থমকে দিয়েছেন- এটাও ইতিহাসবেত্তাদের সততা, স্বচ্ছতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্বরূপ। 

বর্তমানে অধিকাংশ ঐতিহাসিক পলাশির যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে বিস্তর লেখালেখিতে আগ্রহী। কিন্তু তাঁরা দেখেন না, দেখতে চান না যে পলাশি হলো একটি  পরিণতি । ষড়যন্ত্র আর সামরিক আগ্রাসনের একটি সুদূরপ্রসারী ফলাফল। তাঁরা পলাশি পরবর্তী সময়ে ইংরেজ কর্তৃক ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার বৈধতা দিতে সিরাজের বিরুদ্ধে সীমাহীন মিথ্যা যুক্তির জাল বুনেছিল, আসলে এছাড়া ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে স্বীকৃতি দেওয়ার অন্য কোন বৈধ উপায় তাঁদের হাতে অবশিষ্ট ছিল না।

মাত্র চৌদ্দ মাসের শাসনকালে অবাধ্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঔদ্ধত্যকে  দমন করতে সিরাজের দৃঢ়তা, সাহসিকতা, কঠোরতা দেখিয়েছিলেন তা নিঃসন্দেহে প্রশংসাযোগ্য। বাংলার মাটিতে বিনা অনুমতিতে ইংরেজদের দুর্গ নির্মাণ, কিংবা কর্মচারীদের  অবাধ "ব্যক্তিগত বাণিজ্য" বন্ধ করা তাঁর কাছে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। একজন স্বাধীন নবাবের চোখে সার্বভৌমিকতার প্রশ্ন এখানে জড়িয়ে ছিল। কিন্তু সিরাজের দুর্ভাগ্য তাঁর দরবারের পদস্থ বিশ্বাসী অমাত্য গোষ্ঠী, অনেকেই ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের আশায় কোম্পানির ষড়যন্ত্রের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। জগৎ শেঠদের মতো দেশীয় বণিকরাও এই ষড়যন্ত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

ঘরে বাইরে শত্রু পরিবেশিত সিরাজ দৃঢ়তার সঙ্গে এই অশুভ শক্তির মোকাবেলায় সফল হননি বটে , কিন্তু তাঁর স্বদেশভূমি রক্ষার লড়াইকে হীন চোখে দেখা অনৈতিহাসিক। পলাশি নামক বিয়োগান্ত ঘটনার পর  তাঁকে  চরম অপমান আর অমর্যতার সম্মুখীন হতে হয়। যে নিষ্ঠুরতা তাঁর সঙ্গে পলাশির পর দেখানো হয়েছিল ইতিহাসে তা বিরল। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক সিরাজুল ইসলাম লিখেছেন, প্রকৃতপক্ষে সমকালীন শাসকশ্রেণীর মানদণ্ডে সিরাজউদ্দৌলার চারিত্রিক দৃঢ়তা, অত্যন্ত সাহসিকতা ও অসাধারণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধ বিস্ময়কর বটে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় সাম্প্রতিক কালেও ইংরেজদের ভারতবর্ষ দখলের বৈধতা দান করতে গিয়ে একশ্রেণীর ইতিহাসবিদ সিরাজকে নিয়ে নতুন নতুন কাহিনী, উপাখ্যান ম্যানুফ্যাকচার করে ইতিহাস হিসাবে প্রচার করে চলেছেন। তাঁরা বলেন-- সিরাজের মৃত্যু কোন শহীদের মৃত্যু নয় । কারণ তিনি মধ্যযুগীয় রাষ্ট্রব্যবস্থাকে রক্ষা করতে লড়াই করেছিলেন মাত্র, যেখানে জনসমাজের সঙ্গে তাঁর কোন সম্বন্ধ ছিল না। অথবা একথা বলা হয় যে বাংলার নবাব হিসেবে কেন্দ্রীয় মুঘল শাসকদের দ্বারা কোন লিখিত বৈধ অনুমোদন তাঁর ছিল না ইত্যাদি।

সিরাজের মৃত্যু কোন শহিদের মৃত্যু কিনা সে বিষয়ে বিতর্ক থাকা অকল্পনীয়। তাঁর দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলা ইতিহাস-বিরুদ্ধ। এছাড়া শাসনের বৈধতার দিক থেকে বাংলার নবাবরা নিয়মিত দিল্লি সম্রাটদের রাজস্ব প্রদান করতেন, সিরাজ ও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। দেশের অভিন্ন মুদ্রা ব্যবস্থা বাংলাতেও চালু ছিল। কাজেই  অভিযোগকারীরা কি ধরনের 'দেশপ্রেম' ও 'জাতীয়তাবোধ' সিরাজের কাছে প্রত্যাশা করছেন তার কোন ইতিহাস সম্মত ব্যাখ্যা হয় না। দেশকে রক্ষা করার দায়িত্ব তিনি অস্বীকার করেননি এখানেই তাঁর রাজনৈতিক গুরুত্ব ও ঐতিহাসিক অবদান।

সিরাজউদ্দৌলার নিরন্তর লড়াই এর সঙ্গে যুক্ত ছিল আপামর বাংলার মানুষের জীবন ভবিষ্যৎ। পলাশিতে যদি নবাবকে না হারতে হত তাহলে বাংলার ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হত নিশ্চয়। দীর্ঘ দু'শো বছরের ঔপনিবেশিক শাসন, শোষণের জর্জরিত দেশবাসীর মনে হীনমন্যতাপদের জন্ম নিত না। স্বাধীনতার শত্রুদের সেদিন যথার্থভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। দেশপ্রেমিক নবাবের মৃত্যুকে কেবল ক্ষমতার হাত বদল বলেই ভেবেছিল একশ্রেণীর মানুষ। ক্ষমতাসীন নবাবের লাশকে সেদিন জনগণের ঘৃণা ও অপমানের বস্তু করে তুলেছিল। নবাবের অনুগ্রহে যাদের একসময় জীবন জীবিকা নির্ভর করত তারাই দেশপ্রেমিক সিরাজকে নির্মমভাবে হত্যা করল, মৃতদেহটি পশুর মত ডাস্টবিনে ছুঁড়ে দিয়েছিল। সমকালীন যুগের এই ঘৃণ্য প্রতিশোধ যেকোনো জাতির কাছেই বড় লজ্জার।

 

অথচ যে নবাব চরম বিপদের মুহূর্তে দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি, কারোর প্রতি  শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি, তাঁর সেই মহানুভবতা ও উদারতাকে কেউ মূল্যায়ন করতে চায় না। ম্যালেশন যথার্থই মন্তব্য করে করেছেন  যে, পলাশির আগে-পরে একমাত্র সিরাজের বিশ্বাসঘাতকতা ও ষড়যন্ত্রের সঙ্গে কোন সম্পর্ক ছিল না।

একথা সত্যি যে, বাংলার নবাবদের মধ্যে সিরাজই বোধহয় দেশকে একটু বেশি ভালোবেসে ফেলেছিলেন। তিনি মুর্শিদকুলি খান, সুজাউদ্দিন, সরফরাজ বা আলিবর্দী খানের মতো গা ভাসিয়ে চলতে পারতেন তাহলে তাঁকে অন্তত অকালে প্রাণ দিতে হতো না। হতভাগ্য রাজ্যহারা নবাব জীবনের অন্তিম সময়ের প্রাণ ভিক্ষার জন্য প্রত্যেকের পদতলে লুটিয়ে পড়েছিলেন কিন্তু সেদিন তাঁর করুণ আর্তি শুনতে পাইনি কেউ। ফলে বাংলার ইতিহাসে চিরকাল কালো অধ্যায় হিসেবে ১৭৫৭ সালের ৩রা জুলাই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। তাঁকে জীবন ভিক্ষার পরিবর্তে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। নিষ্ঠুর, ঘৃণিত সেই হত্যাযজ্ঞ আজও মানুষের হৃদয়ে কম্পিত হয়। দেশ রক্ষার লড়াইয়ে পরাজিত হয়েও মানুষের মনে তিনি চিরদিন স্বাধীনতার স্পৃহায় অমর হয়েই থাকবেন, এটাই অকালপ্রয়াত নবাবের জন্য  শ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি।

(প্রাবন্ধিক আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক।)

 সহায়ক তথ্যসূত্র :

১) যদুনাথ সরকার ,  বেঙ্গল নবাবস, এশিয়াটিক সোসাইটি, কলকাতা ,১৯৫২

 ২) ডঃ সুশীল চৌধুরী, পলাশির অজানা কাহিনী, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।

৩) ড: মোহম্মদ মোহর আলি,  হিস্টরি অব দ্য মুসলিমস অফ বেঙ্গল, ২খন্ড ,রিয়াধ ১৯৮৮।

৪) অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, সিরাজদ্দৌলা, কল্লোল, কলকাতা।

৫) ড : সিরাজুল ইসলাম , বাংলাদেশের ইতিহাস , খন্ড ১ম ( ১৭৫৭-১৯৭১) সম্পাদনা , এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ ২০১৭ ।

৬) আ:কা: মো: যাকারিয়া, সিরাজউদ্দৌলা , প্রথমা , ঢাকা ।

;

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

  • Font increase
  • Font Decrease

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ও শিশুসাহিত্যিক ফখরুল হাসান। ২৩ জুন বিকেলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সংগীত ও নৃত্যকলা মিলনায়তনে তার হাতে সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ৬ লেখককে সম্মাননা, ‘শেখ হাসিনার জয় বিশ্বের বিস্ময়’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, আবৃত্তি, ছড়া পাঠ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

এ সময় সৈয়দ মাসুম, আর মজিব, এনাম আনন্দ, ফাহমিদা ইয়াসমিন, লুৎফর রহমান চৌধুরীকেও সম্মাননা দেওয়া হয়।

বঙ্গবন্ধু জন্মশতবর্ষ আন্তর্জাতিক পর্ষদ, বঙ্গবন্ধু লেখক পরিষদের আয়োজনে বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. শাহজাহান মৃধা বেনুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ও জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা।

প্রধান অতিথি ছিলেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন কবি অসীম সাহা, মারুফুল ইসলাম, তারিক সুজাত ও অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন।

কবিতা আবৃত্তি করেন জালাল উদ্দিন নলুয়া, ড. তপন বাগচী, শফিকুর রাহী, রিফাত নিগার শাপলা, আনতানুর হক, হানিফ খান, ইউসুফ রেজা, রোকশানা সাথী, জমশেদ ওয়াজেদ, মাসুদ আলম বাবুল, মাদবর রফিক, লুৎফর চৌধুরী, হাসনাইন সাজ্জাদী, গিয়াসউদ্দিন চাষা, হেনা খান, কৌমুদী নার্গিস, বোরহান মাসুদ, সৈয়দ একতেদার আলী, আলী নিয়ামত, মিহির কান্তি ভৌমিক, লুৎফা জালাল, তানিয়া মাহমুদ, শ্রাবণ রেজা, ইমরান পরশ, সৈয়দ তপু, মেরীনা সাঈদ, শাফিন প্রমুখ

;

সংশপ্তক শেখ হাসিনা



আবদুল হামিদ মাহবুব
আবদুল হামিদ মাহবুব

আবদুল হামিদ মাহবুব

  • Font increase
  • Font Decrease

 

সংশপ্তক শেখ হাসিনা

কাণ্ড অনেক করে

পদ্মা বুকে ‘পদ্মা সেতু’

ঠিক দিয়েছেন গড়ে।

 

কাণ্ড ওসব নয় সাধারণ,

ভুলতে কি আর পারি?

জয় বাংলা জোরসে হেঁকে

ঠিক তো দিলেন পাড়ি।

 

অপেক্ষাতে সবাই আছি

মনটা উচাটন

ওই দিনটা জানান দিয়ে

আসলো শুভক্ষণ!

 

বাংলাদেশের এমন জয়ে

বিশ্ব জানুক, কি সুখ?

সব বাঙালি বুকের পাতায়

সুখের গাথা লিখুক।

;