আফ্রিকার উত্তর-উপনিবেশিক কথাসাহিত্যের পঞ্চপ্রদীপ



ফজল হাসান
অলঙ্করণ শতাব্দী জাহিদ

অলঙ্করণ শতাব্দী জাহিদ

  • Font increase
  • Font Decrease

আফ্রিকার উত্তর-উপনিবেশিক সাহিত্য শুরু হয়েছে ১৯৫৭ সালের পরে, বিশেষ করে ষাটের দশকে । সেই সময় থেকে আফ্রিকার দেশগুলো সরকারিভাবে স্বাধীনতা লাভ করে । অনেক সমালোচকের মতে উত্তর-উপনিবেশবাদী সাহিত্যে সাত ধরনের বিপ্রতীপ বিষয়বস্তু স্থান পেয়েছে, যেমন আফ্রিকার অতীত এবং বর্তমানের সংঘাত, চিরায়ত নিয়মকানুন এবং আধুনিকতা, আদিবাসী নৃ-গোষ্ঠী এবং বিদেশি, ব্যক্তিগত এবং সমষ্টিগত, সমাজতন্ত্র এবং ধনতন্ত্র, উন্নয়ন এবং আত্মনির্ভরশীলতা, এবং আফ্রিকাবাসী ও মানবতা । এছাড়া উত্তর-উপনিবেশবাদী সাহিত্যে অন্যান্য সামাজিক বিষয়বস্তুও স্থান পেয়েছে, যেমন দুর্নীতি, নব্য স্বাধীন দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক বিমাতাসুলভ আচরণ এবং নারীদের ভূমিকা ও অধিকার।

এ কথা সত্যি যে, উপনিবেশিক শাসনতন্ত্রের শুরু থেকে আফ্রিকার সাহিত্যে বিদেশি ভাষা, বিশেষ করে ইউরোপের ফরাসি, ইংরেজি এবং পর্তুগিজ, অনুপ্রবেশ করে । এসব বিদেশি ভাষার বিভিন্ন কলা-কৌশল, আন্তর্জাতিক মহলে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার লক্ষ্যে অথবা আফ্রিকার সাহিত্যকে ভিনদেশে পৌঁছে দেওয়ার অভিপ্রায়ে অনেক লেখক সাহিত্য রচনা করেন ।

সমকালীন বিশ্ব সাহিত্যে আফ্রিকার লেখকদের উপস্থিতি বিশেষভাবে লক্ষণীয় এবং তাঁদের মধ্যে বেশ কয়েকজন লেখক নিজেদের উজ্জ্বল স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হয়েছেন । এই নিবন্ধে মাত্র পাঁচজন লেখকের ব্যক্তিজীবন, সাহিত্য ভাবনা এবং উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলো। এই পঞ্চপ্রদীপ লেখকরা হলেন কেনিয়ার এনগুগি ওয়া থিওং’ও, ঘানার আমা আতা আইদু, সোমালিয়ার নুরুদ্দিন ফারাহ্, মোজাম্বিকের মিয়া কুতো এবং কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের বংশোদ্ভূত  ফরাসি লেখক অ্যালেন মাবানকো ।

এনগুগি ওয়া থিওং’ও
কেনিয়ার সবচেয়ে আলোড়িত এবং আলোচিত লেখক এনগুগি ওয়া থিওং’ও। তিনি একাধারে ঔপন্যাসিক, ছোটগল্প লেখক, নাট্যকার এবং প্রাবন্ধিক। তাঁর জন্ম কিয়াম্বু জেলার লিমুরু শহরর নিকটবর্তী কামিরিথিতে, ৫ জানুয়ারি ১৯৩৮ সালে। শৈশবে খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত (ব্যাপটাইজ) করে তাঁর নাম রাখা হয়েছিল জেমস্ এনগুগি। তিনি ১৯৬৩ সালে উগান্ডার ম্যাকেরে ইউনিভার্সিটি থেকে ইংরেজিতে গ্রাজুয়েশন লাভ করেন। পরবর্তীতে তিনি ইংল্যান্ডের লিডস্ ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করেন এবং লিডসে অধ্যয়নকালে ১৯৬৪ সালে তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘উইপ নট চাইল্ড’ প্রকাশিত হয়, যা কোনো পূর্ব আফ্রিকার দেশগুলির লেখকদের মধ্যে ইংরেজিতে লেখা প্রথম উপন্যাস। আন্তর্জাতিক পাঠকমহলে সাড়া জাগানো এবং নন্দিত উপন্যাস ‘এ গ্রেইন অব হুইট’ প্রকাশিত হয় ১৯৬৭ সালে। এই উপন্যাসে ফ্যানোনিস্ট মার্কসজমের প্রতি তাঁর আগ্রহ পরিলক্ষিত হয়। ‘এ মিটিং ইন দ্য ডার্ক’ এবং ‘সিক্রেট লাইভস্ অ্যান্ড আদার স্টোরিজ’ তাঁর ছোটগল্প সংকলন। যদিও সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অর্জনের যোগ্য প্রার্থী হিসাবে তাঁর নাম অনেকবার আলোচনায় এসেছে, কিন্তু এখনো ভাগ্য সুপ্রসন্ন হয়নি।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2018/Dec/08/1544257610990.jpg

একসময় এনগুগি ওয়া থিওং’ও খ্রিস্টান ধর্ম, ইংরেজি ভাষা এবং জেমস এনগুগি নাম প্রত্যাহার করে তিনি ফিরে যান তাঁর আদি নামে এবং লেখালেখি করেন মাতৃভাষা গিকুয়ুতে। সেন্সরশিপ ছাড়া ১৯৭৭ সালে তাঁর প্রকাশিত নাটক ‘আই উইল মেরি হোয়েন আই ওয়ান্ট’-এর জন্য তিনি গ্রেফতার হন। ১৯৭৮ সালের ডিসেম্বরে কারাগার থেকে মুক্তি লাভের পর তিনি নাইরোবি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। কিন্তু রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃত্ততা থাকার জন্য তিনি নির্বাসনে যেতে বাধ্য হন। বর্তমানে এনগুগি ওয়া থিওং’ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, আর্ভিন-এ ইরেজি এবং তুলনামূলক সাহিত্যে অধ্যাপনা করেন।

আমা আতা আইদু
ঘানার স্বনামধন্য এবং বিশ্বখ্যাত নারী ঔপন্যাসিক, ছোটগল্প লেখক, কবি, নাট্যকার, শিশু-কিশোর সাহিত্যিক এবং শিক্ষাবিদ আমা আতা আইদু (পুরো নাম ক্রিস্টিনা আমা আতা আইদু)। তাঁর জন্ম ১৯৪২ সালের ২৩ মার্চ। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্টের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির ফেলোশিপ অর্জন করেন। সেখান থেকে ফিরে এসে তিনি স্বদেশে শিক্ষকতা করেন। পরবর্তীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট এবং কেনিয়ায় শিক্ষক ছিলেন। এছাড়া ১৯৮২-৮৩ সালে ঘানা সরকারের শিক্ষা মন্ত্রী ছিলেন।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2018/Dec/08/1544257736362.jpg

ঘানা বিশ্ববিদ্যালয়ে বি.এ. পড়াকালীন আমা আতা আইদু গভীর মনোযোগের সঙ্গে লেখালেখি আরম্ভ করেন এবং লেখালেখির শুরুতেই ‘দ্য ডিলেম্যা অব এ ঘোস্ট’ (১৯৬৫) নাটক রচনার জন্য পুরস্কৃত হন। নাটকটি মঞ্চায়িত এবং গ্রন্থ হিসাবে প্রকাশিত হয়। এই নাটকে তিনি দেখিয়েছেন যে ঘানার ঐতিহ্যগত সংস্কৃতির সঙ্গে অন্য সম্প্রদায়ের অপরিচিত একজনের অনুপ্রবেশের জন্য পারিবারিক জীবনে নেমে আসা সংঘাত, অশান্তি এবং টানাপোড়েন। ‘আনওয়া’ (১৯৭০) তাঁর রচিত অনন্য নাটক। তাঁর প্রথম উপন্যাস (‘আওয়ার সিস্টার কিলিজয়’ বা ‘রিফ্লেকশন্স ফ্রম এ ব্ল্যাক-আইড  স্ক্যুইন্ট’) প্রকাশিত হয় ১৯৬৬ সালে । তিনি একাধিক ছোটগল্প সংকলন প্রকাশ করেন। এগুলোর মধ্যে ‘নৌ সুইটনেস হিয়্যার অ্যান্ড আ দার স্টোরিজ’ (১৯৭০), ‘দ্য গার্ল হু ক্যান অ্যান্ড আ দার স্টোরিজ’ (১৯৮৭) এবং ‘ডিপলোম্যাটিক পাউন্ড অ্যান্ড আ দার স্টোরিজ’ (২০১২) উল্লেখযোগ্য। ‘নৌ সুইটনেস হিয়্যার অ্যান্ড আ দার স্টোরিজ’ সংকলনের বিভিন্ন গল্পে তিনি ঘানার উত্তর-ঔপনিবেশিক সময়কে তুলে ধরেন এবং চরিত্রকে হেঁয়ালী, কিন্তু সততার সঙ্গে উপস্থাপন করেন। তিনি প্রায় পনের বছরে (১৯৭০-১৯৮৫) একমাত্র কাব্যগ্রন্থ (সামওয়ান টকিং টু সামওয়ান) প্রকাশ করেন। পরবর্তীতে তাঁর একাধিক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। এগুলোর মধ্যে শিশু-কিশোর উপযোগী ছোটগল্প সংকলন ‘দ্য ঈগল অ্যান্ড দ্য চিকেনস্’ (১৯৮৬), কাব্য গ্রন্থ ‘বার্ডস্ অ্যান্ড আদার পোয়েস্’ (১৯৮৭), উপন্যাস ‘চেঞ্জেস্: এ লভ স্টোরি’ (১৯৯১) এবং কবিতার বই ‘অ্যান অ্যাংগ্রি লেটার ইন জানুয়ারি অ্যান্ড আদার পোয়েমস্’ (১৯৯২) উল্লেখযোগ্য। তিনি ইংরেজি ভাষায় সাহিত্য রচনা করেন। তাঁর লেখার বিষয়আশয় পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে আফ্রিকার বৈষম্যমূলক আচরণ এবং টানাপোড়েন। এছাড়া তাঁর বিভিন্ন লেখায় স্থান পেয়েছে আধুনিক আফ্রিকার সমাজে নারীদের করুণ অবস্থান। বর্তমানে তিনি ঘানায় বসবাস করেন। সেখানে তিনি ‘মাবাসেম’-এর (ঘানা এবং আফ্রিকার অন্যান্য দেশের নারীদের কাজকে উৎসাহ প্রদান এবং উন্নতিবর্ধন করার সংস্থা) নির্বাহী পরিচালক হিসাবে কর্মরত আছেন।

নুরুদ্দিন ফারাহ্
আফ্রিকা মহাদেশের সফল এবং অন্যতম প্রভাবশালী লেখক সোমালিয়ার নুরুদ্দিন ফারাহ্। তিনি একই সাথে ঔপন্যাসিক, গল্প লেখক, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক এবং অধ্যাপক। তাঁর জন্ম তৎকালীন ইতালি অধ্যুষিত সোমালিল্যান্ডের বাইডোয়া শহরে, ১৯৪৫ সালের ২৪ নভেম্বর। তাঁর শৈশব কেটেছে পার্শ্ববর্তী ইথিওপয়া শাসিত ওজাডেন শহরের কালাফোতে। তিনি ভারতের পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শন, সাহিত্য ও সমাজ বিজ্ঞানে গ্রাজুয়েট ডিগ্রি এবং পরবর্তীতে ইংল্যান্ডের এসেক্স ইউনিভার্সিটি থেকে নাট্যকলায় মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ইউনেস্কো ফেলোশিপ লাভ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন নুরুদ্দিন ফারাহ্ সোমালি এবং ইংরেজি ভাষায় সাহিত্য রচনা শুরু করেন। তাঁর লেখাকে ‘রাজনৈতিক রোমহর্ষক’ বা ‘পলেটিক্যাল থ্রিলারস্’ হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়। তাঁর লেখার মূল বিষয় সোমালি সমাজ এবং রাজনীতি, বিশেষ করে পারিবারিক সম্পর্ক, জীবনের জটিলতা এবং নারীবাদ। প্রথম উপন্যাস ‘ফ্রম এ ক্রুক্ড রিব’ প্রকাশিত হয় ১৯৭০ সালে, যা নারীবাদী পাঠকের কাছে ভূঁয়সী প্রশংসা লাভ করে। এই উপন্যাসে তিনি পারিবারিকভাবে এক  কিশোরীর জোর করে বেশি বয়সী লোকের সঙ্গে বিয়ে নির্ধারিত হওয়ার পর কিশোরীর  পালিয়ে যাওয়া এবং বুড়ো লোকটির নতুন করে জীবন সংগ্রামের কাহিনী  তুলে ধরেছেন। ‘এ ন্যাকেড নিডল্’ (১৯৭৬) তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস। এই উপন্যাসে তিনি মধ্য-সত্তুরের বিপ্লবী-পরবর্তী সোমালিয়ার রাজনৈতিক অস্থিরতার এবং জনসাধারণের দুর্গতির কথা চিত্রায়িত করেন।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2018/Dec/08/1544257762913.jpg

উপন্যাস প্রকাশের পর ইউরোপে ভ্রমণকালীন তিনি জানতে পারেন, দেশে ফিরে গেলে উপন্যাসের বিষয়বস্তুর জন্য সরকার তাঁকে গ্রেফতার করবে। তাই গ্রেফতার এড়াতে তিনি স্বেচ্ছায় প্রায় বাইশ বছর দেশান্তরিত ছিলেন। সেই সময় তিনি বিভিন্ন দেশে শিক্ষকতা করেন। তিনি তিনটি ত্রয়ী উপন্যাসের সিরিজ রচনা করেন। এগুলো হলো : ‘ভেরিয়েশনস্ অন দ্য থিমস্ অব অ্যান আফ্রিকান ডিক্টেটরশিপ’ [‘সুইট অ্যান্ড সাওয়্যার মিল্ক’ (১৯৭৯), ‘সারডিনস্’ (১৯৮১) এবং ‘ক্লোজ সেস্যামি’ (১৯৮৩)], ‘ব্লাড ইন দ্য সান’ [‘ম্যাপস্’ (১৯৬), ‘গিফটস্’ (১৯৯২) এবং ‘সিক্রেটস্’ (১৯৯৮)] এবং ‘পাস্ট ইমপার্ফেক্ট’ [‘লিঙ্কস্’ (২০০৩), ‘নটস্’ (২০০৭) এবং ক্রশবৌনস্’ (২০১১)]। এসব সিরিজ উপন্যাসের মধ্যে ‘সুইট অ্যান্ড সাওয়্যার মিল্ক’ তাকে সুখ্যাতি এনে দেয় এবং তিনি ‘ইংলিশ স্পিকিং অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করেন। ২০১৪ সালে তাঁর সর্বশেষ উপন্যাস ‘হাইডিং ইন প্লেইন সাইট’ প্রকাশিত হয়। তাঁর একাধিক নাটক মঞ্চে মঞ্চায়িত এবং রেডিওতে প্রচারিত হয়েছে। তাঁর সাহিত্য কর্ম বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তিনি ২০১৬ সালে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার অন্যতম প্রার্থী ছিলেন। বর্তমানে তিনি ভাগাভাগি করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের মিন্যায়াপলিস এবং দক্ষিণ আফ্রিকার ক্যাপটাউনে বসবাস করেন।

মিয়া কুতো
আফ্রিকা মহাদেশে পর্তুগিজ ভাষার অন্যতম লেখক মিয়া কুতো (পোশাকি নাম আন্তোনীয় এমিলিও লিতে কুতো)। তিনি একাধারে ঔপন্যাসিক, ছোটগল্প লেখক, কবি এবং সাংবাদিক। তাঁর জন্ম মোজাম্বিকের বেইরা শহরে, ১৯৫৫ সালের ৫ জুলাই। সেখানেই তিনি শৈশব কাটিয়েছেন। মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে স্থানীয় সংবাদপত্রে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়। তিনি মেডিসিন পড়ার জন্য ১৯৭৪ সালে মপুতো শহরে গমন করেন। কিন্তু সেখানে পড়াশোনার সময় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৭৫ সালে মোজাম্বিক স্বাধীনতা অর্জন করার পর তিনি মেডিসিন পড়ায় ইস্তফা দেন এবং সাংবাদিকতা শুরু করেন। একাধিক সংবাদপত্র এবং ম্যাগাজিনের সম্পাদক ছাড়াও তিনি রাষ্ট্র পরিচালিত মোজাম্বিক ইনফরমেশন এজেন্সির ডিরেক্টর ছিলেন। গত শতাব্দীর আশির দশকে জীব-বিজ্ঞানে পড়াশোনা করার সময় তাঁর কবিতা এবং ছোটগল্প প্রকাশিত হয়।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2018/Dec/08/1544257844288.jpg

তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ (রুট অব ডিউ) প্রকাশিত হয় ১৯৮৩ সালে এবং প্রথম ছোটগল্প সংকলন (ভয়েসেজ মেইড নাইট) প্রকাশিত হয় ১৯৮৬ সালে। এই সংকলন তাঁকে আন্তর্জাতিক সাহিত্য জগতে পরিচয় করিয়ে দেয়। ‘এভরি ম্যান ইজ এ রেইস্’ (১৯৯৪) তাঁর অন্য ছোটগল্প সংকলন। সংকলন দুটির বেশির ভাগ গল্পের পটভূমি মোজাম্বিকের দশ বছরের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং স্বাধীনতা পরবর্তী গৃহযুদ্ধের পাশবিক ঘটনা। তাঁর প্রথম উপন্যাস (স্লিপওয়াকিং ল্যান্ড) ২০০২ সালে প্রকাশিত হয়। এই উপন্যাসটি বিংশ শতাব্দীর আফ্রিকার প্রথম ছয়টি উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের মধ্যে একটি। এছাড়া এই প্রথম উপন্যাসই তাঁকে এনে দেয় ‘জিম্বাবুয়ে ইন্টারন্যাশনাল বুক ফেয়ার’ পুরস্কার। সাহিত্য কর্মের স্বীকৃতি হিসাবে তিনি একাধিক আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করেন, যেমন ‘লাতিন ইউনিয়ন’ সাহিত্য পুরস্কার (প্রথম আফ্রিকার লেখক) (২০০৭), ‘নিউস্টাড ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজ ফর লিটারেচার’ (২০১৪) এবং ‘ক্যামোস প্রাইজ’ (২০১৩)। বর্তমানে তিনি মপুতোতে পরিবেশ বিজ্ঞানী হিসাবে কর্মরত আছেন।

অ্যালেন মাবানকো
কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের বংশোদ্ভূত ‘আফ্রিকার স্যামুয়েল বেকেট’ নামে অভিহিত ফরাসি লেখক অ্যালেন মাবানকো একাধারে কথাসাহিত্যিক, কবি, সাংবাদিক এবং অধ্যাপক। তাঁর জন্ম ১৯৬৬ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি। শৈশব কাটে কঙ্গোর সামুদ্রিক শহর পয়েন্ট-নোয়্যারে। তিনি দর্শন-শাস্ত্রে ব্যাচেলর ডিগ্রি অর্জন করার পরে মায়ের ইচ্ছে অনুযায়ী প্রাইভেটে আইন  বিষয়ে পড়াশোনা করেন। তিনি বাইশ বছর বয়সে বৃত্তি নিয়ে ফ্রান্সে যান এবং ইউনিভার্সিটি অব প্যারিস থেকে আইন বিষয়ে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০০২ সালে তিন বছরের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যান অ্যারবর ক্যাম্পাসে ফ্রাঙ্কোফোন সাহিত্যের শিক্ষক ছিলেন এবং পরে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া অ্যাট লস অ্যাঞ্জেলেস-এর অধ্যাপক নিযুক্ত হন।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2018/Dec/08/1544257870375.jpg

অ্যালেন মাবানকোর প্রথম উপন্যাস ‘রেড-হোয়াইট অ্যান্ড ব্লু’ প্রকাশিত হয় ১৯৯৮ সালে। প্রথম উপন্যাস প্রকাশের পর তিনি লেখালেখিতে নিয়মিত হন। ‘গ্লাস ব্রোকেন’ (২০০৫), ‘মেম্যোয়্যার অব পর্কুপাইন’ (২০০৬), ‘ব্ল্যাক বাজার’ (২০০৯), ‘টুমরো আই  উইল হ্যাভ টুয়েনটি ইয়ার্স্’ (২০১০), ‘লাইটস্ অব পয়েন্টে-নোয়্যার’ (২০১৩) এবং ‘স্মল চিলি’ (২০১৫) তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাস। সাহিত্য কর্মের স্বীকৃতি হিসাবে একাধিক পুরস্কার লাভ করেন, যেমন ‘রেড-হোয়াইট অ্যান্ড ব্লু’ উপন্যাসের জন্য ‘গ্র্যান্ড লিটারেরি প্রাইজ ফর ব্ল্যাক আফ্রিকা’, ‘মেম্যোয়্যার অব পর্কুপাইন’ উপন্যাসের জন্য ‘প্রি রেনো’ (২০০৬)  এবং ‘স্মল চিলি’ উপন্যাসের জন্য ‘প্রি গনকোর্ট’ (২০১৫)। ‘স্মল চিলি’ উপন্যাসের জন্য ২০১৭ সালে ‘ম্যান বুকার ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজ’-এর তালিকায় ছিলেন। এছাড়া ‘ব্ল্যাক বাজার’ এবং ‘লাইটস্ অব পয়েন্টে-নোয়্যার’ উপন্যাস দুটি সমালোচকদের ভূঁয়সী প্রশংসা অর্জন করে এবং ফ্রান্সের কুড়িটি বেস্ট সেলার উপন্যাসের তালিকায় (যথাক্রমে ২০০৯ এবং ২০১৩ সালে) অন্তর্ভুক্ত হয়। তাঁর উপন্যাসের বিভিন্ন চরিত্ররা অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক। তিনি আফ্রিকার অভিবাসীদের বাস্তব অভিজ্ঞতাকে চরিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। উপন্যাস এবং ছোটগল্প সংকলন ছাড়াও তিনি একাধিক কাব্যগ্রন্থের রচয়িতা। যদিও তিনি সাহিত্য কর্মের জন্য সমাদৃত, কিন্তু সমালোচনাও কুড়িয়েছেন। তাঁর সাহিত্য রচনা বিশ্বের পনেরটি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। বর্তমানে তিনি ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া অ্যাট লস অ্যাঞ্জেলেস-এর ফ্রাঙ্কোফোন সাহিত্যের অধ্যাপক হিসাবে কর্মরত আছেন।

পরিশেষে বলা যায়, গত শতাব্দীর পঞ্চাশের এবং ষাটের দশক থেকে, অর্থাৎ স্বাধীনতা লাভের সময় থেকে আফ্রিকার সাহিত্যের ব্যাপক প্রসার ঘটে। কেননা তখন থেকেই আফ্রিকার সাহিত্যে বিদেশি ভাষা, বিশেষ করে ইউরোপের ফরাসি, ইংরেজি এবং পর্তুগিজ, অনুপ্রবেশ করে। এসব বিদেশি ভাষার বিভিন্ন কলা-কৌশল, আন্তর্জাতিক মহলে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার লক্ষ্যে অথবা আফ্রিকার সাহিত্যকে ভিনদেশে পৌঁছে দেওয়ার অভিপ্রায়ে উত্তর-উপনিবেশিক সময়ে অনেক লেখক সাহিত্য রচনা করেন। বলাবাহুল্য, এসব সাহিত্য শুধু স্বদেশেই নয়, বিদেশেও প্রকাশিত হতে থাকে এবং আন্তর্জাতিক পাঠক মহলে আন্তরিকতার সঙ্গে গৃহীত হচ্ছে।

হাসান হাফিজের একগুচ্ছ কবিতা



হাসান হাফিজ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ম্যানিলা ও নস্টালজিয়া

ও ম্যানিলা
তুমি আছো স্মৃতিপটে,
ওগো প্রিয় ম্যানিলাসুন্দরী
তৃষিতের ওষ্ঠ তুমি ভিজিয়েছো
স্যান মিগ্যুয়েল নামে বীয়ারে মাদকে
‘পিনোটুবুু’ অগ্নিগিরি
খুব কিন্তু দূরে নয়
দ্বীপ দেশ ফিলিপিন্স
ঔপনিবেশক স্মৃতি কী দুঃসহ
একটানা চারশো বছর
দীর্ঘ দীর্ঘকাল পরে
মুক্তিস্বাদ পেয়েছো যে তুমি
সেই কটু অম্লস্বাদ
স্মৃতি হয়ে বুকে বেঁধে
‘মুক্তি’ দ্যায় উপশম
সুতন্বী উচ্ছল হও মনোরমা
দ্বীপকন্যা সুছন্দা ম্যানিলা।

অসহ দংশন

না-বৃষ্টি না-রোদ
এমন ধূসর দিনে
কেন ছুঁতে চেয়েছে সে
তোমার পেলব হাত
শৈল্পিক আঙুল
চুম্বনের অধিকার
ওরা কিন্তু দ্যায় নি যুবাকে
সন্ধ্যার আঁধারবেলা
সেই স্মৃতি অনশ্বর
জ্বলজ্বলে নক্ষত্রস্পর্ধায়
অমলিন চিরক্ষণ জলরঙ ছবি হয়ে
জেগে থাকে ঠোকরায়
না-পাওয়ার অসীম তৃষ্ণায়...

একগুঁয়ে মাঝি

মন পোড়ে?
বৃষ্টি ওড়ে?
মনের তো ডানা নাই,
কীভাবে বৈদেশ যাবে
বন্ধুয়া-হদিস পাবে
প্রশ্ন এইটাই।

বৃষ্টি পড়ছে
আছড়ে পড়ছে
মৃত্তিকার আলিঙ্গনে
এবং সম্ভোগে
সার্থকতা জলের প্রেমের।
দেখেছ প্রেমের মড়া?
কোনোদিন ডুবেছে সে জলে?

মন পোড়ে?
আহা বাহা পুড়ুক জ্বলুক
পোড়াই নিয়তি
বাহক দুর্গতি
ছিল যে কপালে লেখা
কীভাবে খ-াবে?
মনের বৈরাগী মাঝি
ফিরে আসতে নয় রাজি
চড়েছে সে একগুঁয়ে
ভাঙাচোরা ডিঙি নৌকায়।

নিরালায় সন্ধ্যাকালে

যাও পাখি যাও
পরানবন্ধুরে গিয়া
স্মরণ করাও
দুঃখিনীরে একলা রাইখা
কী মজা সে পায়?
এবার নাগালে পেলে
রশি দিয়া বাইন্দা রাখব
সতত পঞ্চল বন্ধে
এইবার দেইখা নিব কীভাবে পলায়!
শরমের খেতা পুড়ি
ওরে পাইলে এই ঘুরি
উইড়া চলি পাতায় পাতায়
যাও পাখি বলো তারে
এবার সে আসতে পারে
দুই বন্ধু বসব গিয়া
পুরানা দীঘির পাড়ে
নিরালা সন্ধ্যায় কালে
প্রাচীন ঘাটলায়
ও বন্দু সারলী হাঁস
খুঁচিয়ে কী মজা পাস?
সবকিছু ছাইড়া ছুইড়া
নিজ গৃহে সোজা চইলা আয়!


গত্যন্তর নাই

বিশ্বাস ভেঙেছো তবু
তোমাকে বিশ্বাস করি
পুনরায় প্রতারিত হতে চাই
ক্ষতি আর কতটুকু হবে?
সর্বনাশ পোড়া ছাই
লানতের অন্ত নাই
তোমাদ্বারা সকলই সম্ভব
যদি অসম্ভব হয়
আমি তবে বেপথু নাচার
পথ খোলা নাই যে বাঁচার
আমার কী গতি হবে তবে?


আশাভঙ্গ

এতোটা পথ
পাড়ি দিলাম একা
ভেবেছিলাম
হয়তো পাবো দেখা।
জানতাম না অদর্শনই
এই কপালের লেখা।
ভেবেছিলাম সরল তুমি
এখন দেখি জটিল বক্ররেখা!


নৈকট্য তো ছিল না কপালে

ক.
খুঁজতে খুঁজতে একদিন
হয়তো পেয়ে যাবো
ভয় কিন্তু জাগরুক
পেলে পর নিশ্চিত হারাবো!

খ.
কাঁটা ও সংশয়
সমস্ত জীবনব্যাপী
ভিলেনের মতো জেগে রয়।

গ.
জারিজুরি সবই হলো ফাঁস।
জানতে না আমার হৃদয়মধ্যে
বাস করে অপরূপ আন্ধা সর্বনাশ?
আমি কিন্তু জানতাম
সে কারণে কাছে ঘেঁষতে
চাইতাম না মোটের উপর
নৈকট্য নিয়তি নয় জানা ছিল
কিন্তু করতে পারি নাই
তোমাকে ত্যাগের মতো ছিন্ন উপবাস।

 

;

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু



হাসিবুর রহমান
পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

  • Font increase
  • Font Decrease

 

কোন জাতির উত্থান-পতন, আবেগ, ভবিষ্যৎ নির্মাণে মিশে থাকে ইতিহাসের  সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম উপাদান । কেউ ইচ্ছে করলেই তাকে যেমন বদলে দিতে পারে না, ঠিক তেমনি আদর্শগত দিক থেকে কোন জাতিকে বিপথে চালিতে করতে পারে ভুল ইতিহাস। ভারত উপমহাদেশের ইতিহাসে অষ্টাদশ শতকের বাংলা নানা কারণেই তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে, বাংলার আর্থিক সমৃদ্ধির সুনাম সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল সেই সময়। শান্তি সমৃদ্ধির চূড়ান্ত এক পর্যায়ে ১৭৫৭ পলাশির অন্ধকার নেমে আসে এবং ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন ঘটনো হয়।

দ্বিসার্ধশত বছরের পলাশি যুদ্ধের বহুমাত্রিক আলোচনা হয়েছে ঠিকই কিন্তু নবাব সিরাজউদ্দৌলার রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা ও ব্যক্তিগত চরিত্র নিয়ে জনসমাজে বিভ্রান্তিকর, কাল্পনিক গল্পও ছড়ানো হয়েছে । দেশী-বিদেশী ঐতিহাসিকরা তাঁকে লম্পট, দুশ্চরিত্র, কটুভাষী, হৃদয়হীন রূঢ়  চতুষ্পদ পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট স্বভাবজাত বলে মিথ্যা ও কলঙ্কের অপবাদে মুড়ে দিয়েছেন। সমকালীন যুগের ফারসি ভাষার মুসলমান,  ইংরেজ লেখক কেউই তাঁর প্রতি সুবিচার করে কলম ধরেননি।

তবে, অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, নিখিল নাথ রায় আধুনিক কালে সুশীল চৌধুরীর মতো ব্যতিক্রমী ঐতিহাসিকরা  সিরাজউদ্দৌলার মত দেশপ্রেমিক নবাবকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে যেভাবে মূল্যায়ন করে বিপথগামী ইতিহাস চর্চার ধারাকে থমকে দিয়েছেন- এটাও ইতিহাসবেত্তাদের সততা, স্বচ্ছতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্বরূপ। 

বর্তমানে অধিকাংশ ঐতিহাসিক পলাশির যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে বিস্তর লেখালেখিতে আগ্রহী। কিন্তু তাঁরা দেখেন না, দেখতে চান না যে পলাশি হলো একটি  পরিণতি । ষড়যন্ত্র আর সামরিক আগ্রাসনের একটি সুদূরপ্রসারী ফলাফল। তাঁরা পলাশি পরবর্তী সময়ে ইংরেজ কর্তৃক ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার বৈধতা দিতে সিরাজের বিরুদ্ধে সীমাহীন মিথ্যা যুক্তির জাল বুনেছিল, আসলে এছাড়া ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে স্বীকৃতি দেওয়ার অন্য কোন বৈধ উপায় তাঁদের হাতে অবশিষ্ট ছিল না।

মাত্র চৌদ্দ মাসের শাসনকালে অবাধ্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঔদ্ধত্যকে  দমন করতে সিরাজের দৃঢ়তা, সাহসিকতা, কঠোরতা দেখিয়েছিলেন তা নিঃসন্দেহে প্রশংসাযোগ্য। বাংলার মাটিতে বিনা অনুমতিতে ইংরেজদের দুর্গ নির্মাণ, কিংবা কর্মচারীদের  অবাধ "ব্যক্তিগত বাণিজ্য" বন্ধ করা তাঁর কাছে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। একজন স্বাধীন নবাবের চোখে সার্বভৌমিকতার প্রশ্ন এখানে জড়িয়ে ছিল। কিন্তু সিরাজের দুর্ভাগ্য তাঁর দরবারের পদস্থ বিশ্বাসী অমাত্য গোষ্ঠী, অনেকেই ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের আশায় কোম্পানির ষড়যন্ত্রের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। জগৎ শেঠদের মতো দেশীয় বণিকরাও এই ষড়যন্ত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

ঘরে বাইরে শত্রু পরিবেশিত সিরাজ দৃঢ়তার সঙ্গে এই অশুভ শক্তির মোকাবেলায় সফল হননি বটে , কিন্তু তাঁর স্বদেশভূমি রক্ষার লড়াইকে হীন চোখে দেখা অনৈতিহাসিক। পলাশি নামক বিয়োগান্ত ঘটনার পর  তাঁকে  চরম অপমান আর অমর্যতার সম্মুখীন হতে হয়। যে নিষ্ঠুরতা তাঁর সঙ্গে পলাশির পর দেখানো হয়েছিল ইতিহাসে তা বিরল। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক সিরাজুল ইসলাম লিখেছেন, প্রকৃতপক্ষে সমকালীন শাসকশ্রেণীর মানদণ্ডে সিরাজউদ্দৌলার চারিত্রিক দৃঢ়তা, অত্যন্ত সাহসিকতা ও অসাধারণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধ বিস্ময়কর বটে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় সাম্প্রতিক কালেও ইংরেজদের ভারতবর্ষ দখলের বৈধতা দান করতে গিয়ে একশ্রেণীর ইতিহাসবিদ সিরাজকে নিয়ে নতুন নতুন কাহিনী, উপাখ্যান ম্যানুফ্যাকচার করে ইতিহাস হিসাবে প্রচার করে চলেছেন। তাঁরা বলেন-- সিরাজের মৃত্যু কোন শহীদের মৃত্যু নয় । কারণ তিনি মধ্যযুগীয় রাষ্ট্রব্যবস্থাকে রক্ষা করতে লড়াই করেছিলেন মাত্র, যেখানে জনসমাজের সঙ্গে তাঁর কোন সম্বন্ধ ছিল না। অথবা একথা বলা হয় যে বাংলার নবাব হিসেবে কেন্দ্রীয় মুঘল শাসকদের দ্বারা কোন লিখিত বৈধ অনুমোদন তাঁর ছিল না ইত্যাদি।

সিরাজের মৃত্যু কোন শহিদের মৃত্যু কিনা সে বিষয়ে বিতর্ক থাকা অকল্পনীয়। তাঁর দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলা ইতিহাস-বিরুদ্ধ। এছাড়া শাসনের বৈধতার দিক থেকে বাংলার নবাবরা নিয়মিত দিল্লি সম্রাটদের রাজস্ব প্রদান করতেন, সিরাজ ও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। দেশের অভিন্ন মুদ্রা ব্যবস্থা বাংলাতেও চালু ছিল। কাজেই  অভিযোগকারীরা কি ধরনের 'দেশপ্রেম' ও 'জাতীয়তাবোধ' সিরাজের কাছে প্রত্যাশা করছেন তার কোন ইতিহাস সম্মত ব্যাখ্যা হয় না। দেশকে রক্ষা করার দায়িত্ব তিনি অস্বীকার করেননি এখানেই তাঁর রাজনৈতিক গুরুত্ব ও ঐতিহাসিক অবদান।

সিরাজউদ্দৌলার নিরন্তর লড়াই এর সঙ্গে যুক্ত ছিল আপামর বাংলার মানুষের জীবন ভবিষ্যৎ। পলাশিতে যদি নবাবকে না হারতে হত তাহলে বাংলার ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হত নিশ্চয়। দীর্ঘ দু'শো বছরের ঔপনিবেশিক শাসন, শোষণের জর্জরিত দেশবাসীর মনে হীনমন্যতাপদের জন্ম নিত না। স্বাধীনতার শত্রুদের সেদিন যথার্থভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। দেশপ্রেমিক নবাবের মৃত্যুকে কেবল ক্ষমতার হাত বদল বলেই ভেবেছিল একশ্রেণীর মানুষ। ক্ষমতাসীন নবাবের লাশকে সেদিন জনগণের ঘৃণা ও অপমানের বস্তু করে তুলেছিল। নবাবের অনুগ্রহে যাদের একসময় জীবন জীবিকা নির্ভর করত তারাই দেশপ্রেমিক সিরাজকে নির্মমভাবে হত্যা করল, মৃতদেহটি পশুর মত ডাস্টবিনে ছুঁড়ে দিয়েছিল। সমকালীন যুগের এই ঘৃণ্য প্রতিশোধ যেকোনো জাতির কাছেই বড় লজ্জার।

 

অথচ যে নবাব চরম বিপদের মুহূর্তে দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি, কারোর প্রতি  শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি, তাঁর সেই মহানুভবতা ও উদারতাকে কেউ মূল্যায়ন করতে চায় না। ম্যালেশন যথার্থই মন্তব্য করে করেছেন  যে, পলাশির আগে-পরে একমাত্র সিরাজের বিশ্বাসঘাতকতা ও ষড়যন্ত্রের সঙ্গে কোন সম্পর্ক ছিল না।

একথা সত্যি যে, বাংলার নবাবদের মধ্যে সিরাজই বোধহয় দেশকে একটু বেশি ভালোবেসে ফেলেছিলেন। তিনি মুর্শিদকুলি খান, সুজাউদ্দিন, সরফরাজ বা আলিবর্দী খানের মতো গা ভাসিয়ে চলতে পারতেন তাহলে তাঁকে অন্তত অকালে প্রাণ দিতে হতো না। হতভাগ্য রাজ্যহারা নবাব জীবনের অন্তিম সময়ের প্রাণ ভিক্ষার জন্য প্রত্যেকের পদতলে লুটিয়ে পড়েছিলেন কিন্তু সেদিন তাঁর করুণ আর্তি শুনতে পাইনি কেউ। ফলে বাংলার ইতিহাসে চিরকাল কালো অধ্যায় হিসেবে ১৭৫৭ সালের ৩রা জুলাই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। তাঁকে জীবন ভিক্ষার পরিবর্তে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। নিষ্ঠুর, ঘৃণিত সেই হত্যাযজ্ঞ আজও মানুষের হৃদয়ে কম্পিত হয়। দেশ রক্ষার লড়াইয়ে পরাজিত হয়েও মানুষের মনে তিনি চিরদিন স্বাধীনতার স্পৃহায় অমর হয়েই থাকবেন, এটাই অকালপ্রয়াত নবাবের জন্য  শ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি।

(প্রাবন্ধিক আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক।)

 সহায়ক তথ্যসূত্র :

১) যদুনাথ সরকার ,  বেঙ্গল নবাবস, এশিয়াটিক সোসাইটি, কলকাতা ,১৯৫২

 ২) ডঃ সুশীল চৌধুরী, পলাশির অজানা কাহিনী, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।

৩) ড: মোহম্মদ মোহর আলি,  হিস্টরি অব দ্য মুসলিমস অফ বেঙ্গল, ২খন্ড ,রিয়াধ ১৯৮৮।

৪) অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, সিরাজদ্দৌলা, কল্লোল, কলকাতা।

৫) ড : সিরাজুল ইসলাম , বাংলাদেশের ইতিহাস , খন্ড ১ম ( ১৭৫৭-১৯৭১) সম্পাদনা , এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ ২০১৭ ।

৬) আ:কা: মো: যাকারিয়া, সিরাজউদ্দৌলা , প্রথমা , ঢাকা ।

;

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

  • Font increase
  • Font Decrease

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ও শিশুসাহিত্যিক ফখরুল হাসান। ২৩ জুন বিকেলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সংগীত ও নৃত্যকলা মিলনায়তনে তার হাতে সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ৬ লেখককে সম্মাননা, ‘শেখ হাসিনার জয় বিশ্বের বিস্ময়’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, আবৃত্তি, ছড়া পাঠ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

এ সময় সৈয়দ মাসুম, আর মজিব, এনাম আনন্দ, ফাহমিদা ইয়াসমিন, লুৎফর রহমান চৌধুরীকেও সম্মাননা দেওয়া হয়।

বঙ্গবন্ধু জন্মশতবর্ষ আন্তর্জাতিক পর্ষদ, বঙ্গবন্ধু লেখক পরিষদের আয়োজনে বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. শাহজাহান মৃধা বেনুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ও জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা।

প্রধান অতিথি ছিলেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন কবি অসীম সাহা, মারুফুল ইসলাম, তারিক সুজাত ও অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন।

কবিতা আবৃত্তি করেন জালাল উদ্দিন নলুয়া, ড. তপন বাগচী, শফিকুর রাহী, রিফাত নিগার শাপলা, আনতানুর হক, হানিফ খান, ইউসুফ রেজা, রোকশানা সাথী, জমশেদ ওয়াজেদ, মাসুদ আলম বাবুল, মাদবর রফিক, লুৎফর চৌধুরী, হাসনাইন সাজ্জাদী, গিয়াসউদ্দিন চাষা, হেনা খান, কৌমুদী নার্গিস, বোরহান মাসুদ, সৈয়দ একতেদার আলী, আলী নিয়ামত, মিহির কান্তি ভৌমিক, লুৎফা জালাল, তানিয়া মাহমুদ, শ্রাবণ রেজা, ইমরান পরশ, সৈয়দ তপু, মেরীনা সাঈদ, শাফিন প্রমুখ

;

সংশপ্তক শেখ হাসিনা



আবদুল হামিদ মাহবুব
আবদুল হামিদ মাহবুব

আবদুল হামিদ মাহবুব

  • Font increase
  • Font Decrease

 

সংশপ্তক শেখ হাসিনা

কাণ্ড অনেক করে

পদ্মা বুকে ‘পদ্মা সেতু’

ঠিক দিয়েছেন গড়ে।

 

কাণ্ড ওসব নয় সাধারণ,

ভুলতে কি আর পারি?

জয় বাংলা জোরসে হেঁকে

ঠিক তো দিলেন পাড়ি।

 

অপেক্ষাতে সবাই আছি

মনটা উচাটন

ওই দিনটা জানান দিয়ে

আসলো শুভক্ষণ!

 

বাংলাদেশের এমন জয়ে

বিশ্ব জানুক, কি সুখ?

সব বাঙালি বুকের পাতায়

সুখের গাথা লিখুক।

;