অদৃশ্য মানচিত্র



মূল: মাজা মেনজিস্ট, অনুবাদ: ফজল হাসান
প্রতীকী

প্রতীকী

  • Font increase
  • Font Decrease

অদৃশ্য মানচিত্র
মূল: মাজা মেনজিস্ট
অনুবাদ: ফজল হাসান

দিন
লিবিয়ার চোরাচালানিরা কারাগারের সংকীর্ণ যে কক্ষটি অফিস হিসাবে ব্যবহার করে, টাইজিস্ট সেখানে গুটিসুটি হয়ে বসে আছে। কক্ষটি কংক্রিটের তৈরি এবং সেখানে শুধু একটা টেবিল এবং দু’টি চেয়ার আছে। সাহারা মরুভূমির মাঝে একটা বিশাল কারাগারে সে আটকে আছে। কারাগারের চতুর্দিকে অস্ত্রবাহী লোকজন পাহারা দিচ্ছে। তাদের হাবভাব দেখে মনে হয় তারা যেন শিকারি।

‘ফোন করো’, টাইজিস্টের মুখের সামনে সেলফোন নাড়তে নাড়তে একজন বলল, ‘বলে দাও, তুমি এখন কুফরাতে আছো এবং তারা যখনই তারবার্তায় টাকা পাঠাবে, তখনই আমরা তোমাকে ত্রিপোলিতে নিয়ে যাব এবং সেখান থেকে ইতালির জাহাজে তুলে দেব।’ লোকটি চাচ্ছে টাইজিস্ট যেন তার বাবা-মাকে ফোন করে মুক্তিপণ দেওয়ার কথা বলে। তার বাবা-মা বছরে যা আয়-রোজগার করেন, মুক্তিপণের অংক তার দ্বিগুণ পরিমাণে।

মানচিত্রের উপর কুফরার দিকে টাইজিস্ট বোবা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে এবং মানচিত্রের অস্পষ্ট সীমারেখা ভালো করে দেখার জন্য মাথা ঝাকায়। কতক্ষণ ধরে সে এই জায়গায় আছে? সে মনে করতে পারে না কখন সকাল গড়িয়ে সন্ধ্যার তরল অন্ধকার নেমে আসে। মনে হয় দীর্ঘ ঘণ্টা যেন একাকীত্বের নিজস্ব কক্ষপথে রূপান্তরিত হয়েছে। শুধু মরুভূমির ঊষর বুকে তেজদীপ্ত সূর্যের ওঠা-নামা দেখে একটা সীমাহীন ঘূর্ণন যাত্রার ছবি ঠাহর করা যায়।

টাইজিস্ট বুঝতে পারছে না, সে কেমন করে বাবা-মার কাছে মুক্তিপণের টাকা চাইবে। কেননা সে আসার সময় তাদের বিদায় জানায়নি। তখন বেকার জীবনের অসহায়ত্বের কথা বলার ভয় ছিল, কঠোর পরিশ্রম করা ও কোথাও না যাওয়া, অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি কিছু করার এবং আরো অনেক কিছু চাওয়ার অনুতাপ প্রকাশ করা অত্যন্ত কঠিন ছিল। তার চেয়ে দিগন্তের দিকে তাকিয়ে বলাটা সহজ ছিল, ‘কোথাও পৌঁছে আমি তাদের টেলিফোন করবো, যেন তারা বুঝতে পারেন।’

‘এক্ষুনি করো’, ধমকের সুরে চোরাচালানি বললো।
টাইজিস্ট আদ্দিস আবাবায় তার বাবা-মাকে ফোন করে। রিং হতে থাকে। টাইজিস্টের চোখের সামনে ভেসে ওঠে বাবা বিকলাঙ্গ পা নিয়ে তার প্রিয় চেয়ারে বসে আছেন, খবরের কাগজ পড়ায় মশগুল এবং চোখেমুখে অসন্তোষের চিহ্ন ফুটিয়ে বিড়বিড় করছেন। রান্নাঘরে তার মা ঠোঁটে ঠোঁট চেপে গুনগুন করছেন এবং কফির দানা ভাজছেন। বসার ঘরে পর্দা খোলা যায়। টাইজিস্টের বিগত ঊনত্রিশ বছরের জীবনে প্রতিদিন ঘরের ভিতর উজ্জ্বল মেজেন্টা রঙ বিবর্ণ হয়ে নিস্তেজ গোলাপি রঙের ফুলতোলা সোফার কোণায় যে জায়গায় সূর্যের নরম রোদ এসে পড়তো, সেই একই জায়গায় এসে রোদ পড়েছে। হয়তো তার মা অপরিসর রান্নাঘর থেকে তাকিয়ে আছেন, মুখমণ্ডল থেকে গন্ধযুক্ত ধোঁয়া মুছছেন এবং বলছেন, যা তিনি রৌদ্রজ্জ্বল দিনে সচারচর বলে থাকেন: ‘কবে আমাদের নতুন সোফা হবে?’ এবং তার বাবা, যিনি সবসময় মিতব্যয়ী, মাথা নেড়ে বলবেন, ‘ফিকির, আদরের বউ, এগুলো এখনো ভালো আছে।’ হয়তো কুয়াশাচ্ছন্ন দূরে কোথাও কোনো এক সন্নাসীর সুরেলা কণ্ঠস্বর জনস্রোতের একটানা উঁচু শব্দকে আলতো করে ঠেলে এগিয়ে যাবে এবং সরু সুতার মতো প্রার্থনার সুর তাদের বাড়িতে প্রবেশ করবে। তার মা ‘ক্রশ’ চিহ্ন আঁকবেন এবং বাবা-মা দু’জনেই মাথা নুইয়ে শ্রদ্ধা ও ধন্যবাদ জানাবেন। অথবা তার অনুপস্থিতে হয়তো দৈনন্দিন কাজের ধারা বদলে গেছে এবং মা-বাবা তার সুস্থতার জন্য কান্নাকাটি করে প্রার্থনা করছেন, হয়তো টেলিফোনের তীক্ষ্ণ আওয়াজে একে অপরের বাহুবন্ধন থেকে আচমকা ঝাঁকি দিয়ে নড়েচড়ে উঠেছেন। টেলিফোনের রিসিভার তুলে নেওয়ার আগে তার বাবা তিনবার রিং-এর জন্য অপেক্ষা করেন।

টাইজিস্ট কারাগারের কক্ষে বন্দি আছে, যা আয়তনে চোরাচালানিদের অফিস কক্ষের সমান। এই কক্ষটিতে রয়েছে পঁয়তাল্লিশজন বিধ্বস্ত মহিলা, ছয়টি শিশু এবং একটা ভাঙা শৌচাগার। টাইজিস্ট টেলিফোনের কর্কশ আওয়াজ হজম করার চেষ্টা করে। বাবা-মায়ের কথা সে সামান্য মনে করতে পারে। তার শুধু মনে পড়ে বাবার অনিমেষ অসহায়তার কথা এবং মায়ের চাপা কান্নার সুর। সে জিজ্ঞাসা করেনি কোথা থেকে তারা টাকা সংগ্রহ করবে, কিন্তু মনে মনে এরকম কল্পনা করেছে: ‘তার বাবা একজন খুঁতখুঁতে পুরকৌশলী, সবচেয়ে ভালো স্যুট পড়েন, পায়ে থাকে চকচকে জুতা কিন্তু পেট্রোল বাঁচানোর জন্য হেঁটে যান, বাড়তি অথবা অন্য প্রজেক্টে কাজ করার সুযোগ দেওয়ার জন্য চীনা বসকে অনুনয়-বিনয় করে অনুরোধ করেন। ‘আমি ছুটি না নিয়ে প্রজেক্টে প্রতিদিন কাজ করবো,’ তিনি হয়তো বলবেন। তার মা প্রত্যেক প্রতিবেশীর ঘরের দরজায় টোকা দিবেন এবং লিবিয়ার দিকে আঙুল উঁচিয়ে বলবেন, ‘মন যা চায়, তা-ই দিতে পারেন। যা করতে বলবেন, আমি তা করে ঋণ পরিশোধ করবো।’ তার বাবা ব্যাঙ্কে যাবেন এবং জমানো সব টাকাকড়ি তুলে আনবেন । দু’জনেই ঘরে ফিরবেন এবং যৎসামান্য টাকার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকবেন। তারা টাকা সংগ্রহ করার জন্য প্রতিদিন সংগ্রাম করবেন এবং টাইজিস্ট জানে, তারা তা পারবেন না।

যা হোক, যাত্রা সহজ হতে পারতো। কয়েকটি বিন্দুকে সংযোগ করে তাকে এবং তার বান্ধবী হেলিনাকে লোকগুলো পথ দেখিয়ে ইথিওপিয়া থেকে সুদান এবং তারপর লিবিয়া নিয়ে যেতে পারতো। কিন্তু তারা দু’জন সুদানি পুলিশের হাতে বন্দি হয়। খার্তুমের এক বাড়ি থেকে বন্দুকের ভয় দেখিয়ে তাদের পাকড়াও করে। চোরাচালানিদের সঙ্গে পুলিশের টাকা-পয়সার লেনদেন হয়। তারপর তাদের জোরপূর্বক অন্যান্য বেপরোয়া পুরুষ, মহিলা এবং শিশুদের সঙ্গে সংকীর্ণ লৌহ নির্মিত কন্টেইনারের মধ্যে তোলা হয়। এসব লোকজন পানি এবং আলো-বাতাসের জন্য চিৎকার-চেঁচামেচি করেছিল। সাহারা মরুভূমির উপর দিয়ে ট্রাক এদিক-ওদিক দুলতে দুলতে যাচ্ছিল। একসময় ট্রাক থামে। ট্রাকের ভেতর যারা বেঁচেছিল তারা প্রথমে মৃতদেহগুলিকে নিচে নামায়। ‘এখানে বসে থাক’, হেলিনা বললো। একসময় একজন বলেছিল, ‘সুন্দর জীবনের পথ আমি জানি।’ অথচ সে এখন সুর পাল্টিয়ে বলে, ‘ভালো কিছুর চিন্তা করো এবং ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করো।’ সে হেলিনাকে দূরে সরাতে চায়, কিন্তু বুঝতে পারে যে, আগের দিন হেলিনাও একই কারণে ফোন করেছিল। সে-ও অপেক্ষা করছে। টাইজিস্ট রীতিমতো লজ্জিত।

একসময় টাইজিস্ট হেলিনার হাত চেপে ধরে। সাধারণত এই প্রকাশ ভঙ্গি তাকে মনে করিয়ে দেয় তাদের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সমাবর্তন দিনের কথা। সেই অনুষ্ঠানে তাদের থেকে এক সারি সামনে বসেছিল লাজুক হাসি মুখের একটি ছেলে। টাইজিস্ট নিজের টুপি এবং গাউনের জন্য অত্যন্ত গর্বিত ছিল। তার কাছে মনে হয়েছে গাউনের কারুকাজ যেন সবচেয়ে উজ্জ্বল দিনের স্বচ্ছ আকাশের মতো। সেদিন ছেলেগুলির পুরুষ হয়ে যাওয়ায় তার কোনো ভয় ছিল না। সেই সময় সে বলতে পারতো, ‘না’। তারা শুধু স্মিত হেসে হাত ধরে কালদি ক্যাফেতে কফি খাওয়ার জন্য যেতে বলেছিল, অথবা কোনো ক্লাবে গিয়ে নাচতে আহ্বান করেছিল, কিংবা মেসকেল স্কয়্যারে গিয়ে বিশাল পর্দায় ফুটবল খেলা দেখতে বলেছিল।

কিন্তু তখন তা ছিল না এবং এটা ইথিওপিয়াও নয়। সে এমন এক জায়গায় আছে যেখানে স্বাভাবিকতা হচ্ছে অপরিচিত কোনো পুরুষকে দেখে বলা যায়, ‘হ্যাঁ, সে আমার স্বামী’ এবং আশা করা যেতে পারে যে, অন্য মহিলাদের কাছে যেই ধরনের ঘটনা ঘটে, তা থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া যাবে। সে এমন এক জায়গায় আছে যেখানে নারীদের ধীরে ধীরে আলাদা করা হয়। একসময় তারা ময়লা ও নোংরা হয়ে যায় এবং নিজেদের অন্ধকারের মধ্যে অবশ্যম্ভাবী চামড়ার আড়ালে গুটিয়ে নেয়। সে এমন এক জায়গায় আছে, যে জায়গার নাম লিবিয়া। পাহারাদার বলেছে, লিবিয়া হলো লিবিয়াবাসীদের জন্য, তার মতো কৃষ্ণ সারমেয়দের জন্য নয়। কয়েকজন প্রহরী বলেছে যে, বন্দিরা ইহুদি। যদিও তারা তাদের ‘ক্রশ’ চিহ্ন দেখিয়েছে এবং অনেকে স্বীকারোক্তি করেছে: তোমাদের মতো আমরা মুসলমান। কিন্তু পাহারাদার জোর গলায় বলেছে যে, তোমরা সবাই ইহুদি গুপ্তচর এবং তোমরা কালো চামড়া ও ‘ক্রশ’ চিহ্নের ছদ্মবেশে এখানে এসেছ। মাঝে মাঝে টাইজিস্ট জানে না বিনয়ী ব্যক্তিদের কাছ থেকে, বিশেষ করে তার পিতা-মাতা যাদের একমাত্র অপরাধ তারা তাকে জন্ম দিয়েছে, অর্থকড়ি আদায় করার অজুহাত।

রাত
অপেক্ষা করার ফাঁকে টাইজিস্ট বাবা-মাকে চিঠি লেখে। তার কাছে যখন কাগজ ও কলম কেনার টাকাপয়সা থাকে, তখন সে সময়কে বাস্তব শব্দে লিপিবদ্ধ করে চিঠি লেখে। লেখার সময় সে আনুষ্ঠানিকতা এড়িয়ে যায় এবং প্রতিটি লেখা হৃদয় থেকে শুরু করে। এমামা, সেইন্ট গাব্রিয়েল গির্জার, যেখানে একসময় জিদ এবং একগুঁয়েমি একসঙ্গে মিশে থাকতো, পাশে বস্তির কথা কী তোমার মনে আছে? প্রত্যেক বড়দিনের সময় তুমি যে ধূপবাতি জ্বালাতে, তার সুঘ্রাণ কি তোমার মনে পড়ে? আবাবা, আমার ইচ্ছে হয়, পুনরায় তোমার সঙ্গে মিলে আবাবায় আমাদের বাড়ির চালে বৃষ্টির ফোঁটা গুণি। স্মৃতির পাতায় ভেসে ওঠে সকালবেলায় ছোটখাটো ঘটনার জন্য মন খারাপের ধূসর সময়, সারাদিনের গেরস্থালির নীরস কাজ, কাজের পথে যাওয়া শ্রমিকদের ধূলি-ধূসরিত রাস্তায় ভিড় – সেই ভিড়ের মাঝে একজন তার সুদর্শন ও গৌরবান্বিত বাবা। তার ইচ্ছে হয় সে এনটোটো পাহাড় থেকে নিচের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে এদিক-ওদিকে খনন করা জমিন দেখে এবং সদ্যনির্মিত বাড়িগুলোর একটিতে বাস করার স্বপ্ন বোনে মনের ভেতর। বিশাল কোকাকোলা বোতল আকৃতির কিয়স্কে সাজানো সেলফ থেকে ক্যান্ডি কিনতে চায়। এছাড়া সে বাসে যাত্রী ওঠানোর জন্য ছেলেদের লাগাতার ডাকাডাকির অনুপস্থিতি দারুণভাবে অনুভব করে। সে বন্দি জীবনের বিস্তারিত বিবরণ মনে রেখেছে, যেমন মানুষের মলের দুর্গন্ধ ছাড়া কারাগারের মধ্যে কোনো কিছুই স্থায়ী নয়। তার মনে আছে মানুষের মাংসের মতো পুরো ও ভরাট বিরাজমান একধরনের আতঙ্ক এবং প্রায় প্রতিদিন ট্রাক ভর্তি নতুন বন্দির আগমন ও পুরনো অনেক বন্দির গায়েব হওয়ার ঘটনা। তার কাছে মনে হয় মানুষের যাওয়া-আসার জন্য এই জায়গাটিতে ঘূর্ণায়মান কোনো দরজা আছে। সত্যিকার অর্থে সে মনে করে যে, তাদের প্রকোষ্ঠের দরজা প্রায়ই খোলা হয়। তখন উপুড় হয়ে থাকা মহিলাদের গায়ের উপর বাইরের একঝলক আলো এসে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। পরবর্তী সম্ভাব্য ঘটনার কথা সে পরোক্ষভাবে বলতে পারে। সে বলে, ঘুমানোর আগে মহিলারা প্রায়ই প্রার্থনা করে। সে আরো বলে, মহিলারা একে অন্যের দেখভাল করে এবং নির্দিষ্ট দিনে এক বা দু’জনের চারপাশে সবাই জড়ো হয়। তখন তারা একে অন্যের মা হিসাবে আবির্ভূত হয়। এমামার অনুপস্থিতিতে সে বলে, অনেক মহিলাই তার প্রতি সহানুভূতিশীল। চিঠির শেষে বাবা-মায়ের সঙ্গে শিগগিরই দেখা হওয়ার কথা এবং ঋণ পরিশোধ করার জন্য টাকা পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে সে লেখা সমাপ্ত করে।

দিন
যদিও টাইজিস্ট কারাগারে বন্দিনী এবং বাবা-মায়ের কাছ থেকে টাকাপয়সা আসার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে, তবুও এসব কথা বলার কারণ সে জানে না। কিন্তু সে বলে, ‘হেলিনা, আমি বাড়ি যাবো। আমি বাড়ি ফিরে যেতে চাই।’

টাইজিস্ট ভাবে, সে সাহারা মরুভূমির মধ্যে নিঃশ্বাস বন্ধ করা যাত্রার জন্য ঝুঁকি নিতে পারবে। সে জানে, সেই যাত্রা পথে রয়েছে চোরাচালানিদের তৎপরতা এবং এলোপাথারি হত্যাকাণ্ড। লৌহ নির্মিত তপ্ত কন্টেইনারের মধ্যে সে হয়তো নিজেকে মানিয়ে নিতে পারবে, এমনকি বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনে নিজের মুখের লালা গিলতে কোনো দ্বিধা করবে না। বাড়ি ফিরে দু’হাতে বাবাকে জড়িয়ে ধরা এবং মাকে আদর করার জন্য এসব কাজ সে অনায়াসে করতে পারবে। এছাড়া তার ইচ্ছে সে কমলা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে কচি সবুজ পাতা স্পর্শ করবে এবং সকালের শিশির ভেজা হলুদ রঙের ডেইজি ফুল তুলবে। তাই সে পুনরায় চোরাচালানিদের মানচিত্র দেখতে চায় এবং তার দেশে ফিরে যাওয়ার প্রতিটি রাস্তা, যা শরীরের শিরা-উপশিরার মতো ছড়িয়ে আছে, মুখস্ত করতে চায়।

‘টাইজিস্ট, সম্মুখে যাওয়া ছাড়া আর কোনো পথ নেই’, বলেই হেলিনা তার বুড়ি মায়ের মতো, যার নামে তার নাম রাখা হয়েছে, প্রচণ্ড ঝাকুনির সঙ্গে মাথা দোলায়। তারপর সে আরো বলে, ‘অতিক্রম করার পরপরই সব পথ অদৃশ্য হয়ে যায়। আমরা যেখানে ছিলাম, সেখানে পথের মাঝে যারা মারা গেছে, তাদের হাঁড় ছাড়া এমন কিছু নেই যা চিহ্নিত করে রাখা যায়। এটা একটা অদৃশ্য মানচিত্র। যা হোক, টাকাকড়ি না আসা পর্যন্ত আমাদের শক্ত থাকতে হবে। আমাদের বেঁচে থাকার জন্য আমরা প্রার্থনা করবো।’

টাইজিস্ট হেলিনাকে ভালো করেই চেনে। হেলিনা যখন বলে, ‘সম্মুখে যাওয়া ছাড়া আর কোনো পথ নেই,’ আসলে সে বলতে চায়, ‘আমরা আটকে আছি।’

রাত
টাইজিস্ট স্বপ্ন দেখে। সে টেলিফোনের শব্দ শুনতে পায় এবং তার বাবা ফোন করেছে। বাবা হ্যালো বলেননি, বরং তার পরিবর্তে তিনি টাইজিস্টকে স্মরণ করিয়ে দেন, ‘বাড়িতে তোর জন্য ঘর খালি আছে। তুই কি ওখানে গাদাগাদি করে আছিস না?’ অন্য সময় তার মা হৃদয়ের সবটুকু আবেগ ছড়িয়ে দিয়ে বলেন, ‘তুই তো ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করিস না। আরো দু’মুঠো ভাত চেয়ে নিস।’ অন্য একসময় ক্লাসের শান্ত ছেলেটি একবার তার উরুর দিকে এক পলক দৃষ্টি ফেলে বলেছিল, ‘তুমি আর নতুন নও’। কখনও সে সকাল হওয়ার একটু আগে ঘুম থেকে জেগে যায় এবং জবুথবু হয়ে শুয়ে থাকা অন্য মহিলাদের ভারী শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ শোনে। সে সূর্য কল্পনা করে। মেঘহীন আকাশের গায়ে সূর্য যেন তার নিজের আলোক রশ্মির তীব্রতায় জ্বলছে। সে স্বপ্ন দেখে হেলিনা হাঁড় দিয়ে তার জন্য একটা মই বানিয়েছে। সেই মই বেয়ে সে সূর্যের বাড়ি পৌঁছে গেছে এবং সূর্যকে উদ্দেশ্য করে বলেছে, ‘ইথিওপিয়ায় ঠিক সকাল ছ’টায় তুমি প্রতিবার উদয় হও। কিন্তু লিবিয়ায় মাঝরাতের অন্ধকার খানাখন্দের মধ্যে একটা নতুন দিনের সূচনা করো। আমার পালিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে তুমি কি বলো?’

দিনের পরে রাত, রাতের পরে দিন, দিনের পরে রাত, রাতের পরে দিন, দিনের পরে রাত, রাতের পরে...
তারপর একদিন ঘটনা ঘটে। আলোর ঝলক টইজিস্টকে খুঁজে পায়। সে জানে, এই সেই অপেক্ষার রাত, যে রাতে তার পালা। সে চোখের পাতা বন্ধ করে এবং হেলিনার হাত চেপে ধরে। কিন্তু হেলিনা তাকে ঠেলে দূরে সরিয়ে দেয়। ‘উঠে দাঁড়াও, টাইজিস্ট’, হেলিনা বললো, ‘উঠে পড়ো। যাও। তুমি কী বুঝতে পারছো না?’

এবার লিবিয়ার চোরাচালানি এসেছে, পাহারাদার কেউ আসেনি। ‘জলদি করো’, চোরাচালানি লোকটি তাড়া দিয়ে বললো।

হেলিনাকে তুলে টাইজিস্ট দরজা পর্যন্ত নিয়ে যায় এবং দু’জনে একই সঙ্গে সজোরে ঝাড়া দিয়ে চোরাচালানির হাত সরিয়ে দেয়। তখন মনে হয় যেন উভয়ের ধুকপুকানির হৃদয় একটাই। তারা যদি কথা বলার জন্য কোনো কণ্ঠস্বর খুঁজে পায়, তাহলে দু’জনেই চোরাচালানি লোকটিকে বলবে, ‘আমরা শপথ করেছি, কখনও কেউ কাউকে ছেড়ে যাবো না। আমার হাত হেলিনার হাতকে শক্ত করে ধরে রাখে। সে যেন ঘুমিয়ে যায়, সেজন্য আমি গুনগুন সুরে গান করি। ত্রিপোলিতে পৌঁছে ইউরোপে যাওয়ার জন্য কোনো বাহন না পাওয়া পর্যন্ত আমরা একজন অন্যজনকে সহযোগিতা করবো। শুধু তাই নয়। ইউরোপে পৌঁছে আমরা যতদিন পর্যন্ত আমাদের ঋণ পরিশোধ করতে না পারি, যতক্ষণ না পর্যন্ত আমরা প্রেমে পড়ি এবং বিয়েশাদি করে থিতু হই, এমনকি যতক্ষণ না পর্যন্ত আমরা মন খুলে গান গাইতে না পারি, ততদিন আমরা এক হয়ে থাকবো। হেলিনাকে আমি একা রেখে যেতে পারি না। হ্যাঁ, সত্যি, আমি তা পারি না।’ চোরাচালানি লোকটি ধাক্কা দিয়ে হেলিনাকে দূরে সরিয়ে দিয়ে টাইজিস্টকে টেনে সামনে আনে। তখন টাইজিস্ট নিজের ভেতর শূন্যতা ছাড়া আর কিছুই অনুভব করতে পারে না।

পরবর্তীতে লোহার কন্টেইনারের দু’টি দরজা ভীষণ শব্দ করে বন্ধ হয়ে যায় এবং সঙ্গে সঙ্গেই কন্টেইনারের ভেতর অন্ধকার ছড়িয়ে পড়ে। কন্টেইনার লোকজনে ঠাসা এবং তারা বিলাপ করছে। ট্রাকের ঘড়ঘড় আওয়াজ, পানির জন্য নারী-পুরুষ ও শিশুদের চিৎকার-চেঁচামেচি, ঈশ্বরের কৃপা পাওয়ার জন্য বিনয়ী কন্ঠস্বর – সবকিছু ছাপিয়ে টাইজিস্ট শুধু দুর্বল বাতাসে ভাসমান একজনের নামই শুনতে পায় এবং সেই নাম তার বান্ধবী এবং বোনের, যে কিনা অতিসত্ত্বর স্মৃতি হয়ে যাবে।

২৮ জুন ২০১৬
টাইজিস্ট প্রতিটি চিঠি একইভাবে আরম্ভ করে:
সমুদ্র হলো একধরনের নীল, যা তুমি জীবনে কখনই দেখনি, হেলিনা। আমি রোমে আছি। তুমি কোথায়? কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে যারা এসেছে, তারা সবাই বলেছে তুমি সেখানে নেই। বোন আমার, এমন একটা দেশে, যেখানে চারপাশের পরিস্থিতি ক্রমশ খারাপের দিকে যাচ্ছে, তোমাকে একা ফেলে আসার জন্য আমাকে ক্ষমা করো। এখানে আমার একাংশ বাস করে। অদৃশ্য মানচিত্রের যেখানে তুমি আছো, সেখানে আমার বাকিটুকু রয়ে গেছে এবং বাদবাকি হাঁড় সংগ্রহ করে পূর্ণাঙ্গ অবয়ব দেওয়ার কাজে সেখানে ব্যস্ত আছে। তোমার কণ্ঠস্বর আমি রাতের আঁধারে শুনতে পাই। তুমি বলেছো, আমি যেন চিৎকার-চেঁচামেচি না করি। কিন্তু নিস্তব্ধতার মাঝে আমার কাছে এসে লিবিয়া হাজির হয়। হয়তো কোলাহলই মানুষ হিসাবে আমাদের চিহ্নিত করে। হয়তো তার জন্যই আমরা কাঁদি। আমি তোমাকে খুঁজবো, খুঁজতে থাকবো। কখনই হাল ছেড়ে দেব না।

লেখক পরিচিতি:
ইথিওপিয়ার সমকালীন কথাসাহিত্যের উল্লেখযোগ্য লেখক ও লেখিকাদের মধ্যে মাজা মেনজিস্ট অন্যতম। তার জন্ম আদ্দিস আবাবায়, ১৯৭৪ সালে। মাত্র চার বছর বয়সে বিপ্লবের ভয়ে সপরিবারে নাইজেরিয়ায় অভিবাসী হন। তার শৈশব কাটে নাইজরিয়া, কেনিয়া এবং আমেরিকায়। তিনি ফুলব্রাইট বৃত্তি নিয়ে ইতালিতে পড়াশোনা করেন এবং পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি থেকে ক্রিয়েটিভ রাইটিং-এ মাস্টার্স অব ফাইন আর্টস ডিগ্রি অর্জন করেন। তার লেখা ফিকশন এবং নন-ফিকশন বিখ্যাত পত্র-পত্রিকা এবং ম্যাগাজিনে, যেমন ‘দ্য নিউ ইয়র্কার’, ‘গ্রান্টা’, ‘দ্য গার্ডিয়ান’, ‘দ্য নিউইয়র্ক টাইমস’ এবং ‘এনকারে রিভিউ’-এ নিয়মিত প্রকাশিত হয়।

এছাড়া মাজা মেনজিস্টের ছোটগল্প ‘দ্য গ্রান্টা অ্যান্থোলজি অব দ্য আফ্রিকান শর্ট স্টোরিজ’ সংকলনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং বিবিসি রেডিওতে প্রচারিত হয়েছে। তার লেখালেখির মূল বিষয় যুদ্ধ-সংঘাত, বিপ্লব, অভিবাসন এবং ফটোগ্রাফির সঙ্গে হিংস্রতার সম্পর্ক। প্রথম উপন্যাস “বিনিথ দ্য লায়ন’স গেইজ” ২০১০ সালে প্রকাশের পরপরই তার নাম ছড়িয়ে পড়ে। এই উপন্যাসে তিনি ইথিওপিয়ার বিপ্লবের সময় একটি পরিবারের বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রামী জীবনের করুণ কাহিনী তুলে ধরেন। উপন্যাসটি লন্ডনের ‘দ্য গার্ডিয়ান’ পত্রিকা সমকালীন আফ্রিকার দশটি শ্রেষ্ঠ গ্রন্থের মধ্যে অন্যতম হিসাবে নির্বাচিত করেছে। এছাড়া উপন্যাসটি ‘ফ্লাহার্টি-ডুন্নান ফার্স্ট নোবেল প্রাইজ’-এর চূড়ান্ত তালিকায় নির্বাচিত হয় এবং ‘ক্রিস্টিয়ান সায়েন্স মনিটর’ ও ‘বোস্টন গ্লোব’ ম্যাগাজিন ২০১০ সালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আফ্রিকার উপন্যাস হিসাবে আখ্যায়িত করে। ইতোমধ্যে উপন্যাসটি ইউরোপের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে।

মাজা মেনজিস্ট ‘ওয়ার্ডস উইথআউট বর্ডার্স’ এবং ‘ওয়ারস্কেপস’ অনলাইন ম্যাগাজিনের পরিচালনা পরিষদের একজন সদস্য হিসাবে নিয়জিত আছেন। বর্তমানে তিনি নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির শিক্ষক এবং সেখানেই বসবাস করেন।

গল্পসূত্র:
‘অদৃশ্য মানচিত্র’ গল্পটি মাজা মেনজিস্টের ইংরেজিতে ‘দ্য ইনভিজিবল ম্যাপ’ গল্পের অনুবাদ। গল্পটি ‘এনকারে রিভিউ’ ম্যাগাজিনের ২০১৬ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত হয় এবং সেখান থেকে নেওয়া হয়েছে।

হাসান হাফিজের একগুচ্ছ কবিতা



হাসান হাফিজ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ম্যানিলা ও নস্টালজিয়া

ও ম্যানিলা
তুমি আছো স্মৃতিপটে,
ওগো প্রিয় ম্যানিলাসুন্দরী
তৃষিতের ওষ্ঠ তুমি ভিজিয়েছো
স্যান মিগ্যুয়েল নামে বীয়ারে মাদকে
‘পিনোটুবুু’ অগ্নিগিরি
খুব কিন্তু দূরে নয়
দ্বীপ দেশ ফিলিপিন্স
ঔপনিবেশক স্মৃতি কী দুঃসহ
একটানা চারশো বছর
দীর্ঘ দীর্ঘকাল পরে
মুক্তিস্বাদ পেয়েছো যে তুমি
সেই কটু অম্লস্বাদ
স্মৃতি হয়ে বুকে বেঁধে
‘মুক্তি’ দ্যায় উপশম
সুতন্বী উচ্ছল হও মনোরমা
দ্বীপকন্যা সুছন্দা ম্যানিলা।

অসহ দংশন

না-বৃষ্টি না-রোদ
এমন ধূসর দিনে
কেন ছুঁতে চেয়েছে সে
তোমার পেলব হাত
শৈল্পিক আঙুল
চুম্বনের অধিকার
ওরা কিন্তু দ্যায় নি যুবাকে
সন্ধ্যার আঁধারবেলা
সেই স্মৃতি অনশ্বর
জ্বলজ্বলে নক্ষত্রস্পর্ধায়
অমলিন চিরক্ষণ জলরঙ ছবি হয়ে
জেগে থাকে ঠোকরায়
না-পাওয়ার অসীম তৃষ্ণায়...

একগুঁয়ে মাঝি

মন পোড়ে?
বৃষ্টি ওড়ে?
মনের তো ডানা নাই,
কীভাবে বৈদেশ যাবে
বন্ধুয়া-হদিস পাবে
প্রশ্ন এইটাই।

বৃষ্টি পড়ছে
আছড়ে পড়ছে
মৃত্তিকার আলিঙ্গনে
এবং সম্ভোগে
সার্থকতা জলের প্রেমের।
দেখেছ প্রেমের মড়া?
কোনোদিন ডুবেছে সে জলে?

মন পোড়ে?
আহা বাহা পুড়ুক জ্বলুক
পোড়াই নিয়তি
বাহক দুর্গতি
ছিল যে কপালে লেখা
কীভাবে খ-াবে?
মনের বৈরাগী মাঝি
ফিরে আসতে নয় রাজি
চড়েছে সে একগুঁয়ে
ভাঙাচোরা ডিঙি নৌকায়।

নিরালায় সন্ধ্যাকালে

যাও পাখি যাও
পরানবন্ধুরে গিয়া
স্মরণ করাও
দুঃখিনীরে একলা রাইখা
কী মজা সে পায়?
এবার নাগালে পেলে
রশি দিয়া বাইন্দা রাখব
সতত পঞ্চল বন্ধে
এইবার দেইখা নিব কীভাবে পলায়!
শরমের খেতা পুড়ি
ওরে পাইলে এই ঘুরি
উইড়া চলি পাতায় পাতায়
যাও পাখি বলো তারে
এবার সে আসতে পারে
দুই বন্ধু বসব গিয়া
পুরানা দীঘির পাড়ে
নিরালা সন্ধ্যায় কালে
প্রাচীন ঘাটলায়
ও বন্দু সারলী হাঁস
খুঁচিয়ে কী মজা পাস?
সবকিছু ছাইড়া ছুইড়া
নিজ গৃহে সোজা চইলা আয়!


গত্যন্তর নাই

বিশ্বাস ভেঙেছো তবু
তোমাকে বিশ্বাস করি
পুনরায় প্রতারিত হতে চাই
ক্ষতি আর কতটুকু হবে?
সর্বনাশ পোড়া ছাই
লানতের অন্ত নাই
তোমাদ্বারা সকলই সম্ভব
যদি অসম্ভব হয়
আমি তবে বেপথু নাচার
পথ খোলা নাই যে বাঁচার
আমার কী গতি হবে তবে?


আশাভঙ্গ

এতোটা পথ
পাড়ি দিলাম একা
ভেবেছিলাম
হয়তো পাবো দেখা।
জানতাম না অদর্শনই
এই কপালের লেখা।
ভেবেছিলাম সরল তুমি
এখন দেখি জটিল বক্ররেখা!


নৈকট্য তো ছিল না কপালে

ক.
খুঁজতে খুঁজতে একদিন
হয়তো পেয়ে যাবো
ভয় কিন্তু জাগরুক
পেলে পর নিশ্চিত হারাবো!

খ.
কাঁটা ও সংশয়
সমস্ত জীবনব্যাপী
ভিলেনের মতো জেগে রয়।

গ.
জারিজুরি সবই হলো ফাঁস।
জানতে না আমার হৃদয়মধ্যে
বাস করে অপরূপ আন্ধা সর্বনাশ?
আমি কিন্তু জানতাম
সে কারণে কাছে ঘেঁষতে
চাইতাম না মোটের উপর
নৈকট্য নিয়তি নয় জানা ছিল
কিন্তু করতে পারি নাই
তোমাকে ত্যাগের মতো ছিন্ন উপবাস।

 

;

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু



হাসিবুর রহমান
পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

  • Font increase
  • Font Decrease

 

কোন জাতির উত্থান-পতন, আবেগ, ভবিষ্যৎ নির্মাণে মিশে থাকে ইতিহাসের  সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম উপাদান । কেউ ইচ্ছে করলেই তাকে যেমন বদলে দিতে পারে না, ঠিক তেমনি আদর্শগত দিক থেকে কোন জাতিকে বিপথে চালিতে করতে পারে ভুল ইতিহাস। ভারত উপমহাদেশের ইতিহাসে অষ্টাদশ শতকের বাংলা নানা কারণেই তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে, বাংলার আর্থিক সমৃদ্ধির সুনাম সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল সেই সময়। শান্তি সমৃদ্ধির চূড়ান্ত এক পর্যায়ে ১৭৫৭ পলাশির অন্ধকার নেমে আসে এবং ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন ঘটনো হয়।

দ্বিসার্ধশত বছরের পলাশি যুদ্ধের বহুমাত্রিক আলোচনা হয়েছে ঠিকই কিন্তু নবাব সিরাজউদ্দৌলার রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা ও ব্যক্তিগত চরিত্র নিয়ে জনসমাজে বিভ্রান্তিকর, কাল্পনিক গল্পও ছড়ানো হয়েছে । দেশী-বিদেশী ঐতিহাসিকরা তাঁকে লম্পট, দুশ্চরিত্র, কটুভাষী, হৃদয়হীন রূঢ়  চতুষ্পদ পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট স্বভাবজাত বলে মিথ্যা ও কলঙ্কের অপবাদে মুড়ে দিয়েছেন। সমকালীন যুগের ফারসি ভাষার মুসলমান,  ইংরেজ লেখক কেউই তাঁর প্রতি সুবিচার করে কলম ধরেননি।

তবে, অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, নিখিল নাথ রায় আধুনিক কালে সুশীল চৌধুরীর মতো ব্যতিক্রমী ঐতিহাসিকরা  সিরাজউদ্দৌলার মত দেশপ্রেমিক নবাবকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে যেভাবে মূল্যায়ন করে বিপথগামী ইতিহাস চর্চার ধারাকে থমকে দিয়েছেন- এটাও ইতিহাসবেত্তাদের সততা, স্বচ্ছতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্বরূপ। 

বর্তমানে অধিকাংশ ঐতিহাসিক পলাশির যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে বিস্তর লেখালেখিতে আগ্রহী। কিন্তু তাঁরা দেখেন না, দেখতে চান না যে পলাশি হলো একটি  পরিণতি । ষড়যন্ত্র আর সামরিক আগ্রাসনের একটি সুদূরপ্রসারী ফলাফল। তাঁরা পলাশি পরবর্তী সময়ে ইংরেজ কর্তৃক ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার বৈধতা দিতে সিরাজের বিরুদ্ধে সীমাহীন মিথ্যা যুক্তির জাল বুনেছিল, আসলে এছাড়া ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে স্বীকৃতি দেওয়ার অন্য কোন বৈধ উপায় তাঁদের হাতে অবশিষ্ট ছিল না।

মাত্র চৌদ্দ মাসের শাসনকালে অবাধ্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঔদ্ধত্যকে  দমন করতে সিরাজের দৃঢ়তা, সাহসিকতা, কঠোরতা দেখিয়েছিলেন তা নিঃসন্দেহে প্রশংসাযোগ্য। বাংলার মাটিতে বিনা অনুমতিতে ইংরেজদের দুর্গ নির্মাণ, কিংবা কর্মচারীদের  অবাধ "ব্যক্তিগত বাণিজ্য" বন্ধ করা তাঁর কাছে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। একজন স্বাধীন নবাবের চোখে সার্বভৌমিকতার প্রশ্ন এখানে জড়িয়ে ছিল। কিন্তু সিরাজের দুর্ভাগ্য তাঁর দরবারের পদস্থ বিশ্বাসী অমাত্য গোষ্ঠী, অনেকেই ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের আশায় কোম্পানির ষড়যন্ত্রের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। জগৎ শেঠদের মতো দেশীয় বণিকরাও এই ষড়যন্ত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

ঘরে বাইরে শত্রু পরিবেশিত সিরাজ দৃঢ়তার সঙ্গে এই অশুভ শক্তির মোকাবেলায় সফল হননি বটে , কিন্তু তাঁর স্বদেশভূমি রক্ষার লড়াইকে হীন চোখে দেখা অনৈতিহাসিক। পলাশি নামক বিয়োগান্ত ঘটনার পর  তাঁকে  চরম অপমান আর অমর্যতার সম্মুখীন হতে হয়। যে নিষ্ঠুরতা তাঁর সঙ্গে পলাশির পর দেখানো হয়েছিল ইতিহাসে তা বিরল। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক সিরাজুল ইসলাম লিখেছেন, প্রকৃতপক্ষে সমকালীন শাসকশ্রেণীর মানদণ্ডে সিরাজউদ্দৌলার চারিত্রিক দৃঢ়তা, অত্যন্ত সাহসিকতা ও অসাধারণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধ বিস্ময়কর বটে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় সাম্প্রতিক কালেও ইংরেজদের ভারতবর্ষ দখলের বৈধতা দান করতে গিয়ে একশ্রেণীর ইতিহাসবিদ সিরাজকে নিয়ে নতুন নতুন কাহিনী, উপাখ্যান ম্যানুফ্যাকচার করে ইতিহাস হিসাবে প্রচার করে চলেছেন। তাঁরা বলেন-- সিরাজের মৃত্যু কোন শহীদের মৃত্যু নয় । কারণ তিনি মধ্যযুগীয় রাষ্ট্রব্যবস্থাকে রক্ষা করতে লড়াই করেছিলেন মাত্র, যেখানে জনসমাজের সঙ্গে তাঁর কোন সম্বন্ধ ছিল না। অথবা একথা বলা হয় যে বাংলার নবাব হিসেবে কেন্দ্রীয় মুঘল শাসকদের দ্বারা কোন লিখিত বৈধ অনুমোদন তাঁর ছিল না ইত্যাদি।

সিরাজের মৃত্যু কোন শহিদের মৃত্যু কিনা সে বিষয়ে বিতর্ক থাকা অকল্পনীয়। তাঁর দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলা ইতিহাস-বিরুদ্ধ। এছাড়া শাসনের বৈধতার দিক থেকে বাংলার নবাবরা নিয়মিত দিল্লি সম্রাটদের রাজস্ব প্রদান করতেন, সিরাজ ও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। দেশের অভিন্ন মুদ্রা ব্যবস্থা বাংলাতেও চালু ছিল। কাজেই  অভিযোগকারীরা কি ধরনের 'দেশপ্রেম' ও 'জাতীয়তাবোধ' সিরাজের কাছে প্রত্যাশা করছেন তার কোন ইতিহাস সম্মত ব্যাখ্যা হয় না। দেশকে রক্ষা করার দায়িত্ব তিনি অস্বীকার করেননি এখানেই তাঁর রাজনৈতিক গুরুত্ব ও ঐতিহাসিক অবদান।

সিরাজউদ্দৌলার নিরন্তর লড়াই এর সঙ্গে যুক্ত ছিল আপামর বাংলার মানুষের জীবন ভবিষ্যৎ। পলাশিতে যদি নবাবকে না হারতে হত তাহলে বাংলার ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হত নিশ্চয়। দীর্ঘ দু'শো বছরের ঔপনিবেশিক শাসন, শোষণের জর্জরিত দেশবাসীর মনে হীনমন্যতাপদের জন্ম নিত না। স্বাধীনতার শত্রুদের সেদিন যথার্থভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। দেশপ্রেমিক নবাবের মৃত্যুকে কেবল ক্ষমতার হাত বদল বলেই ভেবেছিল একশ্রেণীর মানুষ। ক্ষমতাসীন নবাবের লাশকে সেদিন জনগণের ঘৃণা ও অপমানের বস্তু করে তুলেছিল। নবাবের অনুগ্রহে যাদের একসময় জীবন জীবিকা নির্ভর করত তারাই দেশপ্রেমিক সিরাজকে নির্মমভাবে হত্যা করল, মৃতদেহটি পশুর মত ডাস্টবিনে ছুঁড়ে দিয়েছিল। সমকালীন যুগের এই ঘৃণ্য প্রতিশোধ যেকোনো জাতির কাছেই বড় লজ্জার।

 

অথচ যে নবাব চরম বিপদের মুহূর্তে দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি, কারোর প্রতি  শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি, তাঁর সেই মহানুভবতা ও উদারতাকে কেউ মূল্যায়ন করতে চায় না। ম্যালেশন যথার্থই মন্তব্য করে করেছেন  যে, পলাশির আগে-পরে একমাত্র সিরাজের বিশ্বাসঘাতকতা ও ষড়যন্ত্রের সঙ্গে কোন সম্পর্ক ছিল না।

একথা সত্যি যে, বাংলার নবাবদের মধ্যে সিরাজই বোধহয় দেশকে একটু বেশি ভালোবেসে ফেলেছিলেন। তিনি মুর্শিদকুলি খান, সুজাউদ্দিন, সরফরাজ বা আলিবর্দী খানের মতো গা ভাসিয়ে চলতে পারতেন তাহলে তাঁকে অন্তত অকালে প্রাণ দিতে হতো না। হতভাগ্য রাজ্যহারা নবাব জীবনের অন্তিম সময়ের প্রাণ ভিক্ষার জন্য প্রত্যেকের পদতলে লুটিয়ে পড়েছিলেন কিন্তু সেদিন তাঁর করুণ আর্তি শুনতে পাইনি কেউ। ফলে বাংলার ইতিহাসে চিরকাল কালো অধ্যায় হিসেবে ১৭৫৭ সালের ৩রা জুলাই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। তাঁকে জীবন ভিক্ষার পরিবর্তে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। নিষ্ঠুর, ঘৃণিত সেই হত্যাযজ্ঞ আজও মানুষের হৃদয়ে কম্পিত হয়। দেশ রক্ষার লড়াইয়ে পরাজিত হয়েও মানুষের মনে তিনি চিরদিন স্বাধীনতার স্পৃহায় অমর হয়েই থাকবেন, এটাই অকালপ্রয়াত নবাবের জন্য  শ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি।

(প্রাবন্ধিক আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক।)

 সহায়ক তথ্যসূত্র :

১) যদুনাথ সরকার ,  বেঙ্গল নবাবস, এশিয়াটিক সোসাইটি, কলকাতা ,১৯৫২

 ২) ডঃ সুশীল চৌধুরী, পলাশির অজানা কাহিনী, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।

৩) ড: মোহম্মদ মোহর আলি,  হিস্টরি অব দ্য মুসলিমস অফ বেঙ্গল, ২খন্ড ,রিয়াধ ১৯৮৮।

৪) অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, সিরাজদ্দৌলা, কল্লোল, কলকাতা।

৫) ড : সিরাজুল ইসলাম , বাংলাদেশের ইতিহাস , খন্ড ১ম ( ১৭৫৭-১৯৭১) সম্পাদনা , এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ ২০১৭ ।

৬) আ:কা: মো: যাকারিয়া, সিরাজউদ্দৌলা , প্রথমা , ঢাকা ।

;

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

  • Font increase
  • Font Decrease

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ও শিশুসাহিত্যিক ফখরুল হাসান। ২৩ জুন বিকেলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সংগীত ও নৃত্যকলা মিলনায়তনে তার হাতে সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ৬ লেখককে সম্মাননা, ‘শেখ হাসিনার জয় বিশ্বের বিস্ময়’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, আবৃত্তি, ছড়া পাঠ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

এ সময় সৈয়দ মাসুম, আর মজিব, এনাম আনন্দ, ফাহমিদা ইয়াসমিন, লুৎফর রহমান চৌধুরীকেও সম্মাননা দেওয়া হয়।

বঙ্গবন্ধু জন্মশতবর্ষ আন্তর্জাতিক পর্ষদ, বঙ্গবন্ধু লেখক পরিষদের আয়োজনে বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. শাহজাহান মৃধা বেনুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ও জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা।

প্রধান অতিথি ছিলেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন কবি অসীম সাহা, মারুফুল ইসলাম, তারিক সুজাত ও অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন।

কবিতা আবৃত্তি করেন জালাল উদ্দিন নলুয়া, ড. তপন বাগচী, শফিকুর রাহী, রিফাত নিগার শাপলা, আনতানুর হক, হানিফ খান, ইউসুফ রেজা, রোকশানা সাথী, জমশেদ ওয়াজেদ, মাসুদ আলম বাবুল, মাদবর রফিক, লুৎফর চৌধুরী, হাসনাইন সাজ্জাদী, গিয়াসউদ্দিন চাষা, হেনা খান, কৌমুদী নার্গিস, বোরহান মাসুদ, সৈয়দ একতেদার আলী, আলী নিয়ামত, মিহির কান্তি ভৌমিক, লুৎফা জালাল, তানিয়া মাহমুদ, শ্রাবণ রেজা, ইমরান পরশ, সৈয়দ তপু, মেরীনা সাঈদ, শাফিন প্রমুখ

;

সংশপ্তক শেখ হাসিনা



আবদুল হামিদ মাহবুব
আবদুল হামিদ মাহবুব

আবদুল হামিদ মাহবুব

  • Font increase
  • Font Decrease

 

সংশপ্তক শেখ হাসিনা

কাণ্ড অনেক করে

পদ্মা বুকে ‘পদ্মা সেতু’

ঠিক দিয়েছেন গড়ে।

 

কাণ্ড ওসব নয় সাধারণ,

ভুলতে কি আর পারি?

জয় বাংলা জোরসে হেঁকে

ঠিক তো দিলেন পাড়ি।

 

অপেক্ষাতে সবাই আছি

মনটা উচাটন

ওই দিনটা জানান দিয়ে

আসলো শুভক্ষণ!

 

বাংলাদেশের এমন জয়ে

বিশ্ব জানুক, কি সুখ?

সব বাঙালি বুকের পাতায়

সুখের গাথা লিখুক।

;