গি দ্য মোপাসাঁর জীবন এবং তার কয়েকটি উক্তি



যাকওয়ান সাঈদ
গি দ্য মোপাসাঁ

গি দ্য মোপাসাঁ

  • Font increase
  • Font Decrease

গি দ্য মোপাসাঁ ছিলেন ঊনিশ শতকের একজন চূড়ান্ত সৃষ্টিশীল লেখক। যাকে আধুনিক ছোটগল্পের জনক হিসেবেও বিবেচনা করা হয়। প্রায় তিনশোরও অধিক ছোটগল্প আছে এই লেখকের। এইসব ছোটগল্পে তিনি ওই সময়কার ফ্রেঞ্চ সংস্কৃতির নানাবিধ দৃষ্টিভঙ্গিকে উপস্থাপন করেছেন।

বিশেষত, ফরাসি-প্রুশিয় যুদ্ধের দুর্বিষহ সব চিত্রকে তিনি তুলে ধরেছিলেন তার লেখালেখির মাধ্যমে। এই যুদ্ধে যেই সাধারণ মানুষেরা আক্রান্ত হয়েছিল তাদের দুর্বিষহ পরিণতির কাহিনী তিনি বলেছিলেন। ২০ বছর বয়সে পড়াশোনা বাদ দিয়ে তাকেও বাধ্য হয়ে এই যুদ্ধে অংশ নিতে হয়েছিল। গি দ্য মোপাসাঁ ছোটগল্প ছাড়াও উপন্যাস, কবিতা এবং ট্রাভেলিং বই লিখেছেন।

১৮৫০ সালের ৫ আগস্ট তিনি ফ্রান্সের নরম্যান্ডিতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম গুস্তাভ দ্য মোপাসাঁ, আর মায়ের নাম লরা লি পয়টিভিন। এগারো বছর বয়সে তার বাবা এবং মায়ের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। বাবা-মায়ের বিবাহবিচ্ছেদের পরে তিনি মায়ের সঙ্গেই থাকতেন, আর স্থানীয় চার্চে পড়াশোনা করতেন। তাঁর মা ম্যালানকোলিয়ান নামক একটি রোগে আক্রান্ত ছিলেন। বলা হয়ে থাকে, তার বাবা-মায়ের এই বিচ্ছেদ আর মায়ের এই অসুস্থতা—এই দুই মর্মান্তিক অভিজ্ঞতাই তাকে সাহিত্যচর্চার প্রতি ধাবিত করে তুলেছিল। মায়ের অনেক চারিত্রিক প্রভাব তার মধ্যে লক্ষ করা যেত, যেমন মায়ের মতোই তিনি ছিলেন লাজুক ধরনের একজন মানুষ।

হাইস্কুলে পড়ার সময়ে ১৮৬৭ সালে তিনি গুস্তাভ ফ্লবেয়ার নামের একজন ফ্রেঞ্চ লেখকের সঙ্গে দেখা করেন। মূলত তার মা-ই তাকে গুস্তাভ ফ্লবেয়ারের সঙ্গে দেখা করতে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। কেননা, তার মা স্পষ্টভাবেই তার সাহিত্যপ্রীতির ব্যাপারটি বুঝতে পেরেছিলেন। আর তিনি নিজেও সাহিত্যের একজন বিশেষ অনুরাগী ব্যক্তি ছিলেন। মোপাসাঁর মায়ের প্রিয় লেখক ছিল উইলিয়াম শেক্সপিয়ার।

ফ্লবেয়ারের সঙ্গে মোপাসাঁর এই সাক্ষাত তার পরবর্তী জীবনেও প্রভূত উপকার বয়ে এনেছিল, অর্থাৎ নানাভাবেই ফ্লবেয়ার তার প্রতি সদয় হয়েছিলেন। ফ্লবেয়ারের এই পাশে দাঁড়ানো তার জীবনের প্রায় প্রধানতম এক ঘটনা। জীবন প্রসঙ্গে মোপাসাঁ লিখেছেন, ‘জীবনকে অর্থবহ করে তুলবার জন্যই এই জীবনের লড়াই’।

ফ্লবেয়ারের সাহায্যেই মোপাসাঁ নানান পত্রপত্রিকায় নিজের নামে ছোটগল্প আর আর্টিকেল প্রকাশ করতে আরম্ভ করেছিলেন। মোপাসাঁকে তিনি নিজের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন আর সত্যিকার অর্থেই তার অভিভাবক হয়ে উঠেছিলেন। ফলে মোপাসাঁর সাহিত্য এবং সাংবাদিকতার শুরু এই লেখকের হাতে হওয়াই স্বাভাবিক ছিল।

১৯৮০ সালে ‘ব্যুল দ্য সুইফ’ নামে তার একটি ছোটগল্প প্রকাশিত হয়, সেটাই তাকে লেখক হিসেবে বৃহৎ পরিণতি প্রদান করে। আজও এই গল্পটিকে মোপাসাঁর সেরা একটি গল্প হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ১৯৩৪ সালে এই গল্প থেকে নির্মাতা মিখাইল রম একটি চলচ্চিত্রও নির্মাণ করেছিলেন।

১৮৮০ সাল থেকে ১৮৯০ সালের মধ্যে মোপাসাঁ ছয়টি উপন্যাস প্রকাশ করেছিলেন। যদিও লেখালেখির এই স্বচ্ছন্দ্য-ধারাবাহিকতা আরো দীর্ঘকাল বজায় থাকতে পারত, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেটি হয়নি। ১৮৯২ সালে তিনি মাত্র ৪২ বছর বয়সে মারা যান।

মোপাসাঁ সিফিলিসে আক্রান্ত ছিলেন। ১৮৯২ সালের ২ জানুয়ারি তিনি গলার রগ কেটে আত্মহত্যার চেষ্টাও করেন। এই ঘটনার ৬ মাস পরে, জুলাই মাসের ৬ তারিখে এই লেখকের প্রয়াণ ঘটে।

ক্যালেন্ডারের পাতায় আজকের দিনটিও ৬ জুলাই, কেবল মাঝখানে কেটে গেছে একশো সাতাশ বছর। মৃত্যুর একশো সাতাশ বছরে পরেও বিশ্বসাহিত্যে গি দ্য মোপাসাঁ বহুলচর্চিত একটি নাম হিসেবেই জারি আছেন।
বার্তার পাঠকদের জন্য গি দ্য মোপাসাঁর বিখ্যাত কিছু উক্তি পেশ করা হলো। উক্তিগুলো পড়লে বোঝা যাবে, মোপাসাঁ একই সঙ্গে যেমন ছিলেন প্রেমিক মানুষ, তেমনই ছিলেন মানবতার প্রতি পরম অনুরাগী একজন লেখক।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/06/1562402091424.jpg

১. একটা বৈধ চুম্বন ততো মূল্যবান নয়, যতোটা মূল্যবান একটা চুরি-করা চুম্বন।

২. চুম্বন ব্যাপারটাই এক অমর ঘটনা। পর্যটকের মতো এটা ঘুরতে থাকে মানুষের ঠোঁট থেকে ঠোঁটে, এক শতবর্ষ থেকে আরেক শতবর্ষে, অনতিগম্য সময়কাল ধরে। নারী এবং পুরুষ উভয়েই এই চুম্বনকে অর্জন করে, তারপরে একে অপরকে সেটি প্রদান করে, তারপরে পালা করে মারা যায়।

৩. দেশপ্রেম জিনিসটা ধর্মের মতো। যেসব যুদ্ধগুলো ডিম পাড়ে, এটা তাদেরই একটা ডিম।

৪. মিলিটারিরা হলো পৃথিবীর চাবুক।

৫. আমাদের শ্বাসক্রিয়া, ঘুম, পানাহার, কাজকর্ম এবং স্বপ্ন, এইসকল কিছুর মানে একটাই—মৃত্যু। এমনকি বেঁচে থাকা মানেও মৃত্যুই।

৬. অতীত আমাকে আকর্ষিত করে আর বর্তমান আমাকে আতঙ্কিত করে। কেননা ভবিষ্যতের অর্থ হলো মারা যেতে হবে।

৭. প্রকৃতপক্ষেই নিঃসঙ্গতা আমাদের চিন্তাপ্রক্রিয়ার জন্য ক্ষতিকর। আমাদের চারপাশে সেসকল মানুষদের থাকার প্রয়োজন আছে যারা ভাবতে এবং কথা বলতে জানে। যখনই আমরা দীর্ঘকালের জন্য নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ব, তখনই আমাদের পরিণতি হবে কার্য-কর্মহীন প্রেতাত্মার মতো।

৮. সবকিছু মিথ্যা। সবকিছু সম্ভব। এবং সবকিছুই সন্দেহজনক।

৯. কোষ্ঠকাঠিন্য কিংবা জ্বরাক্রান্তির চাইতেও বরং একটা অসুস্থ চিন্তাই মানুষের শরীরকে আরো ভয়ঙ্করভাবে গ্রাস করে থাকে।

১০. জীবনে একটাই মাত্র ভালো ব্যাপার রয়েছে, সেটা হলো ভালোবাসা।

১১. আমি যদি পারতাম, সময়ের এই বয়ে চলাকে আমি থামিয়ে দিতাম। কিন্তু ঘড়িতে ঘণ্টাগুলো তো ঘণ্টাগুলোর পরে বয়েই চলল, আর মিনিটগুলোও চলল মিনিটগুলোর পিছে পিছে। মূলত প্রত্যেকটা সেকেন্ডই আমার সত্তার সূক্ষ্মতম একাকিত্মগুলোকে হরণ করে নিচ্ছে—কেবল আগামীকালকের ‘কচু’টাকে বাস্তবায়ন করবার জন্য। যদি আমি বর্তমানের এই সময়ের এই অনুভূতিটিকে পুনরায় আবার পেতাম!

১২. ভালোবাসায় অসুখী থাকা বরং ভালো, বিয়ে করে অসুখী থাকার চাইতে। অবশ্য কেউ কেউ উভয়টাকেই বাগে এনে ফেলতে পারে।

১৩. কথোপকথন ব্যাপারটা আসলে কী? আসলে মিস্ট্রি! এটা এমনই এক শিল্প, যা কখনোই একঘেয়েমি হয়ে ওঠে না। এটা চলতে থাকে প্রত্যেকটা নতুন বিষয়কে ছুঁয়ে ছুঁয়ে, খুঁটিনাটি যত আনন্দকে সঙ্গে করে। যেন কিছুই নেই, তবু এই না থাকারই বিমোহনের মধ্য দিয়ে তার যাত্রা।

১৪. তারাই মহৎ শিল্পী, যারা মানবতাকে নিজের চিন্তার ওপরে আরোপ করতে পারে।

১৫. ভাষা মূলত একটা ছলকলা, আর অতিব ঝলসানো এক ব্যাপার। কেননা এটা মানুষের মুখমণ্ডলের ওপরে থাকা এক মুখোশ। আমরা দেখতে পাই এটা মানুষের ঠোঁট দিয়ে বের হয়ে আসছে, আর সেই ঠোঁটগুলোই মানুষের চোখকে আমোদিত করছে। কিন্তু সাদা কাগজের ওপর যেইসব শব্দ আর বাক্য, কালো কালো, মূলত সেগুলোই মানুষের ভিতরকার সত্তাকে প্রকাশ করতে পারে।

হাসান হাফিজের একগুচ্ছ কবিতা



হাসান হাফিজ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ম্যানিলা ও নস্টালজিয়া

ও ম্যানিলা
তুমি আছো স্মৃতিপটে,
ওগো প্রিয় ম্যানিলাসুন্দরী
তৃষিতের ওষ্ঠ তুমি ভিজিয়েছো
স্যান মিগ্যুয়েল নামে বীয়ারে মাদকে
‘পিনোটুবুু’ অগ্নিগিরি
খুব কিন্তু দূরে নয়
দ্বীপ দেশ ফিলিপিন্স
ঔপনিবেশক স্মৃতি কী দুঃসহ
একটানা চারশো বছর
দীর্ঘ দীর্ঘকাল পরে
মুক্তিস্বাদ পেয়েছো যে তুমি
সেই কটু অম্লস্বাদ
স্মৃতি হয়ে বুকে বেঁধে
‘মুক্তি’ দ্যায় উপশম
সুতন্বী উচ্ছল হও মনোরমা
দ্বীপকন্যা সুছন্দা ম্যানিলা।

অসহ দংশন

না-বৃষ্টি না-রোদ
এমন ধূসর দিনে
কেন ছুঁতে চেয়েছে সে
তোমার পেলব হাত
শৈল্পিক আঙুল
চুম্বনের অধিকার
ওরা কিন্তু দ্যায় নি যুবাকে
সন্ধ্যার আঁধারবেলা
সেই স্মৃতি অনশ্বর
জ্বলজ্বলে নক্ষত্রস্পর্ধায়
অমলিন চিরক্ষণ জলরঙ ছবি হয়ে
জেগে থাকে ঠোকরায়
না-পাওয়ার অসীম তৃষ্ণায়...

একগুঁয়ে মাঝি

মন পোড়ে?
বৃষ্টি ওড়ে?
মনের তো ডানা নাই,
কীভাবে বৈদেশ যাবে
বন্ধুয়া-হদিস পাবে
প্রশ্ন এইটাই।

বৃষ্টি পড়ছে
আছড়ে পড়ছে
মৃত্তিকার আলিঙ্গনে
এবং সম্ভোগে
সার্থকতা জলের প্রেমের।
দেখেছ প্রেমের মড়া?
কোনোদিন ডুবেছে সে জলে?

মন পোড়ে?
আহা বাহা পুড়ুক জ্বলুক
পোড়াই নিয়তি
বাহক দুর্গতি
ছিল যে কপালে লেখা
কীভাবে খ-াবে?
মনের বৈরাগী মাঝি
ফিরে আসতে নয় রাজি
চড়েছে সে একগুঁয়ে
ভাঙাচোরা ডিঙি নৌকায়।

নিরালায় সন্ধ্যাকালে

যাও পাখি যাও
পরানবন্ধুরে গিয়া
স্মরণ করাও
দুঃখিনীরে একলা রাইখা
কী মজা সে পায়?
এবার নাগালে পেলে
রশি দিয়া বাইন্দা রাখব
সতত পঞ্চল বন্ধে
এইবার দেইখা নিব কীভাবে পলায়!
শরমের খেতা পুড়ি
ওরে পাইলে এই ঘুরি
উইড়া চলি পাতায় পাতায়
যাও পাখি বলো তারে
এবার সে আসতে পারে
দুই বন্ধু বসব গিয়া
পুরানা দীঘির পাড়ে
নিরালা সন্ধ্যায় কালে
প্রাচীন ঘাটলায়
ও বন্দু সারলী হাঁস
খুঁচিয়ে কী মজা পাস?
সবকিছু ছাইড়া ছুইড়া
নিজ গৃহে সোজা চইলা আয়!


গত্যন্তর নাই

বিশ্বাস ভেঙেছো তবু
তোমাকে বিশ্বাস করি
পুনরায় প্রতারিত হতে চাই
ক্ষতি আর কতটুকু হবে?
সর্বনাশ পোড়া ছাই
লানতের অন্ত নাই
তোমাদ্বারা সকলই সম্ভব
যদি অসম্ভব হয়
আমি তবে বেপথু নাচার
পথ খোলা নাই যে বাঁচার
আমার কী গতি হবে তবে?


আশাভঙ্গ

এতোটা পথ
পাড়ি দিলাম একা
ভেবেছিলাম
হয়তো পাবো দেখা।
জানতাম না অদর্শনই
এই কপালের লেখা।
ভেবেছিলাম সরল তুমি
এখন দেখি জটিল বক্ররেখা!


নৈকট্য তো ছিল না কপালে

ক.
খুঁজতে খুঁজতে একদিন
হয়তো পেয়ে যাবো
ভয় কিন্তু জাগরুক
পেলে পর নিশ্চিত হারাবো!

খ.
কাঁটা ও সংশয়
সমস্ত জীবনব্যাপী
ভিলেনের মতো জেগে রয়।

গ.
জারিজুরি সবই হলো ফাঁস।
জানতে না আমার হৃদয়মধ্যে
বাস করে অপরূপ আন্ধা সর্বনাশ?
আমি কিন্তু জানতাম
সে কারণে কাছে ঘেঁষতে
চাইতাম না মোটের উপর
নৈকট্য নিয়তি নয় জানা ছিল
কিন্তু করতে পারি নাই
তোমাকে ত্যাগের মতো ছিন্ন উপবাস।

 

;

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু



হাসিবুর রহমান
পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

  • Font increase
  • Font Decrease

 

কোন জাতির উত্থান-পতন, আবেগ, ভবিষ্যৎ নির্মাণে মিশে থাকে ইতিহাসের  সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম উপাদান । কেউ ইচ্ছে করলেই তাকে যেমন বদলে দিতে পারে না, ঠিক তেমনি আদর্শগত দিক থেকে কোন জাতিকে বিপথে চালিতে করতে পারে ভুল ইতিহাস। ভারত উপমহাদেশের ইতিহাসে অষ্টাদশ শতকের বাংলা নানা কারণেই তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে, বাংলার আর্থিক সমৃদ্ধির সুনাম সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল সেই সময়। শান্তি সমৃদ্ধির চূড়ান্ত এক পর্যায়ে ১৭৫৭ পলাশির অন্ধকার নেমে আসে এবং ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন ঘটনো হয়।

দ্বিসার্ধশত বছরের পলাশি যুদ্ধের বহুমাত্রিক আলোচনা হয়েছে ঠিকই কিন্তু নবাব সিরাজউদ্দৌলার রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা ও ব্যক্তিগত চরিত্র নিয়ে জনসমাজে বিভ্রান্তিকর, কাল্পনিক গল্পও ছড়ানো হয়েছে । দেশী-বিদেশী ঐতিহাসিকরা তাঁকে লম্পট, দুশ্চরিত্র, কটুভাষী, হৃদয়হীন রূঢ়  চতুষ্পদ পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট স্বভাবজাত বলে মিথ্যা ও কলঙ্কের অপবাদে মুড়ে দিয়েছেন। সমকালীন যুগের ফারসি ভাষার মুসলমান,  ইংরেজ লেখক কেউই তাঁর প্রতি সুবিচার করে কলম ধরেননি।

তবে, অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, নিখিল নাথ রায় আধুনিক কালে সুশীল চৌধুরীর মতো ব্যতিক্রমী ঐতিহাসিকরা  সিরাজউদ্দৌলার মত দেশপ্রেমিক নবাবকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে যেভাবে মূল্যায়ন করে বিপথগামী ইতিহাস চর্চার ধারাকে থমকে দিয়েছেন- এটাও ইতিহাসবেত্তাদের সততা, স্বচ্ছতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্বরূপ। 

বর্তমানে অধিকাংশ ঐতিহাসিক পলাশির যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে বিস্তর লেখালেখিতে আগ্রহী। কিন্তু তাঁরা দেখেন না, দেখতে চান না যে পলাশি হলো একটি  পরিণতি । ষড়যন্ত্র আর সামরিক আগ্রাসনের একটি সুদূরপ্রসারী ফলাফল। তাঁরা পলাশি পরবর্তী সময়ে ইংরেজ কর্তৃক ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার বৈধতা দিতে সিরাজের বিরুদ্ধে সীমাহীন মিথ্যা যুক্তির জাল বুনেছিল, আসলে এছাড়া ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে স্বীকৃতি দেওয়ার অন্য কোন বৈধ উপায় তাঁদের হাতে অবশিষ্ট ছিল না।

মাত্র চৌদ্দ মাসের শাসনকালে অবাধ্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঔদ্ধত্যকে  দমন করতে সিরাজের দৃঢ়তা, সাহসিকতা, কঠোরতা দেখিয়েছিলেন তা নিঃসন্দেহে প্রশংসাযোগ্য। বাংলার মাটিতে বিনা অনুমতিতে ইংরেজদের দুর্গ নির্মাণ, কিংবা কর্মচারীদের  অবাধ "ব্যক্তিগত বাণিজ্য" বন্ধ করা তাঁর কাছে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। একজন স্বাধীন নবাবের চোখে সার্বভৌমিকতার প্রশ্ন এখানে জড়িয়ে ছিল। কিন্তু সিরাজের দুর্ভাগ্য তাঁর দরবারের পদস্থ বিশ্বাসী অমাত্য গোষ্ঠী, অনেকেই ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের আশায় কোম্পানির ষড়যন্ত্রের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। জগৎ শেঠদের মতো দেশীয় বণিকরাও এই ষড়যন্ত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

ঘরে বাইরে শত্রু পরিবেশিত সিরাজ দৃঢ়তার সঙ্গে এই অশুভ শক্তির মোকাবেলায় সফল হননি বটে , কিন্তু তাঁর স্বদেশভূমি রক্ষার লড়াইকে হীন চোখে দেখা অনৈতিহাসিক। পলাশি নামক বিয়োগান্ত ঘটনার পর  তাঁকে  চরম অপমান আর অমর্যতার সম্মুখীন হতে হয়। যে নিষ্ঠুরতা তাঁর সঙ্গে পলাশির পর দেখানো হয়েছিল ইতিহাসে তা বিরল। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক সিরাজুল ইসলাম লিখেছেন, প্রকৃতপক্ষে সমকালীন শাসকশ্রেণীর মানদণ্ডে সিরাজউদ্দৌলার চারিত্রিক দৃঢ়তা, অত্যন্ত সাহসিকতা ও অসাধারণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধ বিস্ময়কর বটে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় সাম্প্রতিক কালেও ইংরেজদের ভারতবর্ষ দখলের বৈধতা দান করতে গিয়ে একশ্রেণীর ইতিহাসবিদ সিরাজকে নিয়ে নতুন নতুন কাহিনী, উপাখ্যান ম্যানুফ্যাকচার করে ইতিহাস হিসাবে প্রচার করে চলেছেন। তাঁরা বলেন-- সিরাজের মৃত্যু কোন শহীদের মৃত্যু নয় । কারণ তিনি মধ্যযুগীয় রাষ্ট্রব্যবস্থাকে রক্ষা করতে লড়াই করেছিলেন মাত্র, যেখানে জনসমাজের সঙ্গে তাঁর কোন সম্বন্ধ ছিল না। অথবা একথা বলা হয় যে বাংলার নবাব হিসেবে কেন্দ্রীয় মুঘল শাসকদের দ্বারা কোন লিখিত বৈধ অনুমোদন তাঁর ছিল না ইত্যাদি।

সিরাজের মৃত্যু কোন শহিদের মৃত্যু কিনা সে বিষয়ে বিতর্ক থাকা অকল্পনীয়। তাঁর দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলা ইতিহাস-বিরুদ্ধ। এছাড়া শাসনের বৈধতার দিক থেকে বাংলার নবাবরা নিয়মিত দিল্লি সম্রাটদের রাজস্ব প্রদান করতেন, সিরাজ ও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। দেশের অভিন্ন মুদ্রা ব্যবস্থা বাংলাতেও চালু ছিল। কাজেই  অভিযোগকারীরা কি ধরনের 'দেশপ্রেম' ও 'জাতীয়তাবোধ' সিরাজের কাছে প্রত্যাশা করছেন তার কোন ইতিহাস সম্মত ব্যাখ্যা হয় না। দেশকে রক্ষা করার দায়িত্ব তিনি অস্বীকার করেননি এখানেই তাঁর রাজনৈতিক গুরুত্ব ও ঐতিহাসিক অবদান।

সিরাজউদ্দৌলার নিরন্তর লড়াই এর সঙ্গে যুক্ত ছিল আপামর বাংলার মানুষের জীবন ভবিষ্যৎ। পলাশিতে যদি নবাবকে না হারতে হত তাহলে বাংলার ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হত নিশ্চয়। দীর্ঘ দু'শো বছরের ঔপনিবেশিক শাসন, শোষণের জর্জরিত দেশবাসীর মনে হীনমন্যতাপদের জন্ম নিত না। স্বাধীনতার শত্রুদের সেদিন যথার্থভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। দেশপ্রেমিক নবাবের মৃত্যুকে কেবল ক্ষমতার হাত বদল বলেই ভেবেছিল একশ্রেণীর মানুষ। ক্ষমতাসীন নবাবের লাশকে সেদিন জনগণের ঘৃণা ও অপমানের বস্তু করে তুলেছিল। নবাবের অনুগ্রহে যাদের একসময় জীবন জীবিকা নির্ভর করত তারাই দেশপ্রেমিক সিরাজকে নির্মমভাবে হত্যা করল, মৃতদেহটি পশুর মত ডাস্টবিনে ছুঁড়ে দিয়েছিল। সমকালীন যুগের এই ঘৃণ্য প্রতিশোধ যেকোনো জাতির কাছেই বড় লজ্জার।

 

অথচ যে নবাব চরম বিপদের মুহূর্তে দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি, কারোর প্রতি  শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি, তাঁর সেই মহানুভবতা ও উদারতাকে কেউ মূল্যায়ন করতে চায় না। ম্যালেশন যথার্থই মন্তব্য করে করেছেন  যে, পলাশির আগে-পরে একমাত্র সিরাজের বিশ্বাসঘাতকতা ও ষড়যন্ত্রের সঙ্গে কোন সম্পর্ক ছিল না।

একথা সত্যি যে, বাংলার নবাবদের মধ্যে সিরাজই বোধহয় দেশকে একটু বেশি ভালোবেসে ফেলেছিলেন। তিনি মুর্শিদকুলি খান, সুজাউদ্দিন, সরফরাজ বা আলিবর্দী খানের মতো গা ভাসিয়ে চলতে পারতেন তাহলে তাঁকে অন্তত অকালে প্রাণ দিতে হতো না। হতভাগ্য রাজ্যহারা নবাব জীবনের অন্তিম সময়ের প্রাণ ভিক্ষার জন্য প্রত্যেকের পদতলে লুটিয়ে পড়েছিলেন কিন্তু সেদিন তাঁর করুণ আর্তি শুনতে পাইনি কেউ। ফলে বাংলার ইতিহাসে চিরকাল কালো অধ্যায় হিসেবে ১৭৫৭ সালের ৩রা জুলাই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। তাঁকে জীবন ভিক্ষার পরিবর্তে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। নিষ্ঠুর, ঘৃণিত সেই হত্যাযজ্ঞ আজও মানুষের হৃদয়ে কম্পিত হয়। দেশ রক্ষার লড়াইয়ে পরাজিত হয়েও মানুষের মনে তিনি চিরদিন স্বাধীনতার স্পৃহায় অমর হয়েই থাকবেন, এটাই অকালপ্রয়াত নবাবের জন্য  শ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি।

(প্রাবন্ধিক আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক।)

 সহায়ক তথ্যসূত্র :

১) যদুনাথ সরকার ,  বেঙ্গল নবাবস, এশিয়াটিক সোসাইটি, কলকাতা ,১৯৫২

 ২) ডঃ সুশীল চৌধুরী, পলাশির অজানা কাহিনী, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।

৩) ড: মোহম্মদ মোহর আলি,  হিস্টরি অব দ্য মুসলিমস অফ বেঙ্গল, ২খন্ড ,রিয়াধ ১৯৮৮।

৪) অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, সিরাজদ্দৌলা, কল্লোল, কলকাতা।

৫) ড : সিরাজুল ইসলাম , বাংলাদেশের ইতিহাস , খন্ড ১ম ( ১৭৫৭-১৯৭১) সম্পাদনা , এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ ২০১৭ ।

৬) আ:কা: মো: যাকারিয়া, সিরাজউদ্দৌলা , প্রথমা , ঢাকা ।

;

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

  • Font increase
  • Font Decrease

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ও শিশুসাহিত্যিক ফখরুল হাসান। ২৩ জুন বিকেলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সংগীত ও নৃত্যকলা মিলনায়তনে তার হাতে সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ৬ লেখককে সম্মাননা, ‘শেখ হাসিনার জয় বিশ্বের বিস্ময়’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, আবৃত্তি, ছড়া পাঠ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

এ সময় সৈয়দ মাসুম, আর মজিব, এনাম আনন্দ, ফাহমিদা ইয়াসমিন, লুৎফর রহমান চৌধুরীকেও সম্মাননা দেওয়া হয়।

বঙ্গবন্ধু জন্মশতবর্ষ আন্তর্জাতিক পর্ষদ, বঙ্গবন্ধু লেখক পরিষদের আয়োজনে বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. শাহজাহান মৃধা বেনুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ও জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা।

প্রধান অতিথি ছিলেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন কবি অসীম সাহা, মারুফুল ইসলাম, তারিক সুজাত ও অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন।

কবিতা আবৃত্তি করেন জালাল উদ্দিন নলুয়া, ড. তপন বাগচী, শফিকুর রাহী, রিফাত নিগার শাপলা, আনতানুর হক, হানিফ খান, ইউসুফ রেজা, রোকশানা সাথী, জমশেদ ওয়াজেদ, মাসুদ আলম বাবুল, মাদবর রফিক, লুৎফর চৌধুরী, হাসনাইন সাজ্জাদী, গিয়াসউদ্দিন চাষা, হেনা খান, কৌমুদী নার্গিস, বোরহান মাসুদ, সৈয়দ একতেদার আলী, আলী নিয়ামত, মিহির কান্তি ভৌমিক, লুৎফা জালাল, তানিয়া মাহমুদ, শ্রাবণ রেজা, ইমরান পরশ, সৈয়দ তপু, মেরীনা সাঈদ, শাফিন প্রমুখ

;

সংশপ্তক শেখ হাসিনা



আবদুল হামিদ মাহবুব
আবদুল হামিদ মাহবুব

আবদুল হামিদ মাহবুব

  • Font increase
  • Font Decrease

 

সংশপ্তক শেখ হাসিনা

কাণ্ড অনেক করে

পদ্মা বুকে ‘পদ্মা সেতু’

ঠিক দিয়েছেন গড়ে।

 

কাণ্ড ওসব নয় সাধারণ,

ভুলতে কি আর পারি?

জয় বাংলা জোরসে হেঁকে

ঠিক তো দিলেন পাড়ি।

 

অপেক্ষাতে সবাই আছি

মনটা উচাটন

ওই দিনটা জানান দিয়ে

আসলো শুভক্ষণ!

 

বাংলাদেশের এমন জয়ে

বিশ্ব জানুক, কি সুখ?

সব বাঙালি বুকের পাতায়

সুখের গাথা লিখুক।

;