ক্ষমা করুন, ম্যাডাম, আপনার ছেলেকে আমরা খুন করেছি



হেনরী চুকুউয়েমেকা ওনিয়েমা
অলঙ্করণ কাব্য কারিম

অলঙ্করণ কাব্য কারিম

  • Font increase
  • Font Decrease

【 অনুবাদ ফজল হাসান

আপনি পাঁচ ছেলের জননী এবং ছেলেদের বয়স ১৮ থেকে ৩২ বছর। আপনার পরিবার স্বচ্ছল নয়, তবে কোনোভাবেই আপনাদের গরিবের কাতারে ফেলা যাবে না। আপনার সব ছেলেই শিক্ষিত। বড় দুজন ডিগ্রিধারী এবং তৃতীয় ছেলের প্রযুক্তির ওপর হাতে-কলমে শিক্ষা আছে। ছোট দুজন মাধ্যমিক স্কুলের পড়াশোনা সমাপ্ত করেছে। একসময় আপনার বড় ছেলে এক মাসের গর্ভবতী তার বিশ্ববিদ্যালয়ের বান্ধবীকে বিয়ে করার আনজাম করছে। আপনার কাছে খুবই বেদনাদায়ক যে, বড় ছেলের পুরুষ হওয়ার সময় স্বামী থাকবে না।

আপনার কাছে আরো বেদনাদায়ক বিষয় হলো, বর্তমানে দেশের যে অংশে আপনারা বসবাস করছেন, যা এখন স্বঘোষিত স্বাধীন প্রজাতন্ত্র, তার সঙ্গে আপনাদের প্রাক্তন মাতৃভূমির বাকি জায়গার যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। এত কিছুর পরিবর্তন সত্ত্বেও আপনি হৃদয়ের গভীরে বিগত দিনগুলোতে একসঙ্গে বসবাস করার স্মৃতি ধারণ করে আছেন। যাহোক, পুলের নিচ দিয়ে রক্তের নহর বয়ে গেছে এবং সব কিছু আলাদা হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর দিনগুলোতে মনে হয়েছিল সবই যেন অলীক, কিন্তু অন্যসব গৃহযুদ্ধের মতো কয়েক দিনের মধ্যে দেখা গেছে রক্তের স্রোত। আহতদের সংখ্যা বেড়ে গেছে এবং তাদের মধ্যে কয়েকজনকে আপনি চেনেন এবং ভালোবাসেন।

আপনার ছেলেরা নিজেদের কর্মকাণ্ডের প্রতি ছিল প্রবল বিশ্বাসী এবং অটল। সুতরাং আপনি দুঃখ পেলেও আশ্চর্য্যান্বিত হননি যখন দেখেছেন যে, আপনার বড় ছেলে তার বান্ধবীর সঙ্গে প্রচণ্ড বাকবিতণ্ডার পরেও সেনাবাহিনীতে যোগদান করেছে। ছয়মাস পরে যখন তার মৃতদেহ বাড়ি নিয়ে আসা হয় এবং বীরের মর্যাদায় (সে তার প্লাটুনকে অ্যামবুশের হাত থেকে রক্ষা করেছে) অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পাদন করা হয়। তার দ্বিতীয় ভাই, যে কিনা মেয়েদের সঙ্গে আমোদ-ফুর্তি করে সময় কাটাত এবং দেশের অস্থির সময় ও রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামাত না, আপনার অশ্রুভেজা চোখ অবজ্ঞা করে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার দুদিন পরে গৃহযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। আপনি তার মৃতদেহ দেখতে পাননি। তার এক বন্ধুর কাছ থেকে শুধু মৃত্যু-সংবাদ পেয়েছেন। আপনাদের শহর যখন শত্রুরা তছনছ করেছে, তখন আপনি প্রাণের ভয়ে অন্যত্র পালিয়ে গিয়েছেন। সেখানে আপনার সঙ্গে ছেলের সেই বন্ধু দেখা করেছিল।

শত্রুর বোমারু বিমানের আঘাতে আপনাদের প্রিয় শহর ধ্বংস হয়েছে এবং নিরীহ মানুষদের হত্যার কারণে ক্রুদ্ধ হয়ে তৃতীয় ও চতুর্থ ছেলে যুদ্ধে যোগদান করেছে। তারা যমজ এবং তাদের দুই দেহে এক হৃদয়। শীঘ্রই তারা অবরুদ্ধ ভূমির সাহসী যোদ্ধার তকমা পরে রূপকথার নায়ক হিসাবে পরিচিতি লাভ করে। সাহসী কমান্ডোরা যেসব গোলযোগপূর্ণ জায়গায় যায় যেখানে শয়তানও পা ফেলতে ভয় পায়, তাদের আত্মঘাতী বীরত্বের জন্য আচিলস্ এবং হেক্টর রীতিমতো লজ্জিত। এই দুঃসাহসী যমজ যখন এক সঙ্গে বিজয়ী কমান্ডো আক্রমণে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে গোপন অস্ত্রভাণ্ডার দখল করেছিল, তখন সারা দেশ কেঁপে উঠেছিল।

আপনি কাঁদেন, বিলাপ করেন এবং হাঁটু গেড়ে বসে প্রার্থনা করেন। আপনি ঈশ্বরের কাছে ফরিয়াদ জানান এবং বলেন : ‘বিজয় ঘোষণা করার দয়িত্ব কি আপনার নয়? তাহলে আপনি কেন এসব জীবন উৎসর্গ করাচ্ছেন, যা কোনো শহীদের করার কথা নয়। এবং তারপর....’

‘মা, আমি সৈনিক দলে যোগদান করব,’ আপনার সন্তান এসে বলল। সে শান্তশিষ্ট, ভদ্র এবং কনিষ্ঠ ছেলে, যে বাইবেল কলেজ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেছে। অথচ যুদ্ধ তার জীবন সংক্ষিপ্ত করেছে। তার অশ্রুসিক্ত দু চোখ সবার দৃষ্টিগোচর হবে এবং আপনি তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারবেন না। সব শেষ হয়ে গেছে এবং আপনি সমাপ্তি টানেন....

যখন বিউগলের করুণ সুর বেজে ওঠে, যখন আপনার ছেলের সৈন্যদলের সহকর্মীরা শেষবারের মতো একুশবার তোপধ্বনি করে, যখন তার কফিন উজ্জ্বল জাতীয় পতাকায় মোড়ানো হয়, যখন সেনাপ্রধান আবেগী কন্নাকে দমন করার জন্য দাঁত দিয়ে নখ কাটেন, যখন সহমর্মিতার নরম বাহু দিয়ে রাষ্ট্রপতির স্ত্রী কান্নাজড়িত চোখে আপনাকে জড়িয়ে ধরেন, নেতিবাচক ভঙ্গিতে দুপাশে মাথা দোলান এবং তাঁর স্বামীর কাছ থেকে একটা চিঠি আপনার হাতে তুলে দেন, তখন আপনি বোকার মতো কুর্নিশ করেন। সেই সময় উচ্চরিত শব্দের জন্য তামাম দুনিয়া বরফ হয়ে গেছে।

রাতে একাকিত্বের সময় আপনি চিঠি নিয়ে বসেন। সাধারণ কাগজে লেখা চিঠি এবং সাদামাটা খাম। খামের ওপর কেরানির হাতে রাষ্ট্রপতির নাম ও ঠিকানা স্পষ্ট করে লেখা। আপনি খাম খোলেন এবং চিঠি পড়া শুরু করেন :
‘.... মা, আপনাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য আমি কী বলতে পারি? জানি, কেউ আপনার পাঁচ ছেলেকে ফিরিয়ে আনতে পারবে না। আপনার সারা জীবনের শান্তির উৎস হিসাবে ঈশ্বর ওদের এই নশ্বর পৃথিবীতে পয়দা করেছিলেন। যারা আমাদের স্বাধীনতা, তীব্র আকাঙ্ক্ষা, নিরাপত্তা, আমাদের জন্য এক টুকরো ভূখণ্ডের জন্য মনে-প্রাণে ছিল উৎসর্গিত, আমি যদি তাদেরকে বীর হিসাবে আখ্যায়িত করি, যদিও কথাটা সত্য যে, তাতে আপনি যৎসামান্য সান্ত্বনা খুঁজে পাবেন। আমি যখন আপনার ত্যাগের কথা শুনেছি, তখন নিজেকে নানান প্রশ্ন করেছি, যা নিভৃতে আমার চোখের পানি ঝরিয়েছে। যুদ্ধ করার জন্য আমরা কি খুব তাড়াহুড়া করেছিলাম? আমরা কি নিজেদের দুর্দশার কারণগুলো সমঝোতার মাধ্যমে সমাধান করতে পারতাম না? নাকি দুদিকে খুব বেশি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল? উভয় পক্ষেরই যুক্তি-পাল্টা যুক্তি ছিল। আমি দুঃখের সঙ্গে বলছি যে, আমরা ওদের কথায় কর্ণপাত করিনি। ফায়ারিং স্কোয়াডে কয়েকজন চুপ করে ছিল। আমাদের তরুণ সমাজ আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করেছিল উভয় দলের উদ্দেশ্য এবং আশা-আকাঙ্ক্ষা, কিন্তু যারা অন্যায়ভাবে মারা গেছে, তাদেরকে বলা হয়নি যে শান্তির মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছানোর বিষয়টি তাদের জন্য অপমানের বিষয় ছিল না। অনুগ্রহ করুণ, ম্যাডাম, আমি আপনার এবং অন্যসব মায়েদের কাছে ক্ষমা চাইছি। আমাদের মাফ করে দিন। আমরা আপনাদের ছেলেমেয়েদের খুন করেছি। নিহতদের ক্ষতির কারণে আমার বিপরীত পক্ষ এবং আমি রীতিমতো অন্ধ ছিলাম এবং যারা জীবিত আছে, তাদের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতার কথা ভুলে গিয়েছিলাম। ঈশ্বর আমাদের প্রতি দয়া প্রদর্শন করুন।’

রাষ্ট্রপতির চিঠির কথাগুলো সত্য এবং যে কোনো মানুষের ব্যথিত হৃদয় থেকে জগদ্দল পাথর সরিয়ে ভারমুক্ত করবে। আপনি যেই আপনার হাস্যোজ্জ্বল ছেলের ছবির দিকে তাকাবেন, তখন কান্না আপনার মনের ব্যথাকে হালকা করবে। যাহোক, আপনার মস্তিষ্কের ভেতর নানান প্রশ্ন ঘুরপাক খায়। কিন্তু কেন? কিসের জন্য? কোন কারণে এসব নিষ্পাপ ছেলেগুলোর প্রাণ অকালে ঝরে গেল?

দুদিন পরে রাষ্ট্রপতি শত্রুর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করেন এবং সেই অনুষ্ঠান গণমাধ্যমে প্রচার করা হয়।

হেনরী চুকুউয়েমেকা ওনিয়েমা নাইজেরিয়ার সমকালীন কথাসাহিত্যে একটি পরিচিত নাম। তাঁর জন্ম ১৯৭৫ সালে। রাত্তিরে লেখালেখি ও দিনে শিক্ষকতা করা ছাড়াও তিনি মিডিয়ার সঙ্গে জড়িত এবং নেদারল্যান্ডের ‘দ্য আফ্রিকান বুলেটিন’ সংবাদপত্রের কলাম লেখক। তাঁর লেখা স্বদেশে এবং আফ্রিকার একাধিক দেশের বিভিন্ন ছাপা এবং অনলাইন ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে। বর্তমানে তিনি লাগোস শহরে বসবাস করেন।

ক্ষমা করুণ, ম্যাডাম, আপনার ছেলেকে আমরা খুন করেছি’ গল্পটি হেনরী চুকুউয়েমেকা ওনিয়েমার ‘ফরগিভ আস, ম্যাডাম, উই কিল্ড ইয়োর সান’ গল্পের অনুবাদ। ইংরেজিতে গল্পটি ‘ব্রিটল পেপার’ ম্যাগাজিনে ১৬ মার্চ ২০১৬ সালে প্রকাশিত হয় এবং সেখান থেকেই গল্পটি নেওয়া হয়েছে।

হাসান হাফিজের একগুচ্ছ কবিতা



হাসান হাফিজ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ম্যানিলা ও নস্টালজিয়া

ও ম্যানিলা
তুমি আছো স্মৃতিপটে,
ওগো প্রিয় ম্যানিলাসুন্দরী
তৃষিতের ওষ্ঠ তুমি ভিজিয়েছো
স্যান মিগ্যুয়েল নামে বীয়ারে মাদকে
‘পিনোটুবুু’ অগ্নিগিরি
খুব কিন্তু দূরে নয়
দ্বীপ দেশ ফিলিপিন্স
ঔপনিবেশক স্মৃতি কী দুঃসহ
একটানা চারশো বছর
দীর্ঘ দীর্ঘকাল পরে
মুক্তিস্বাদ পেয়েছো যে তুমি
সেই কটু অম্লস্বাদ
স্মৃতি হয়ে বুকে বেঁধে
‘মুক্তি’ দ্যায় উপশম
সুতন্বী উচ্ছল হও মনোরমা
দ্বীপকন্যা সুছন্দা ম্যানিলা।

অসহ দংশন

না-বৃষ্টি না-রোদ
এমন ধূসর দিনে
কেন ছুঁতে চেয়েছে সে
তোমার পেলব হাত
শৈল্পিক আঙুল
চুম্বনের অধিকার
ওরা কিন্তু দ্যায় নি যুবাকে
সন্ধ্যার আঁধারবেলা
সেই স্মৃতি অনশ্বর
জ্বলজ্বলে নক্ষত্রস্পর্ধায়
অমলিন চিরক্ষণ জলরঙ ছবি হয়ে
জেগে থাকে ঠোকরায়
না-পাওয়ার অসীম তৃষ্ণায়...

একগুঁয়ে মাঝি

মন পোড়ে?
বৃষ্টি ওড়ে?
মনের তো ডানা নাই,
কীভাবে বৈদেশ যাবে
বন্ধুয়া-হদিস পাবে
প্রশ্ন এইটাই।

বৃষ্টি পড়ছে
আছড়ে পড়ছে
মৃত্তিকার আলিঙ্গনে
এবং সম্ভোগে
সার্থকতা জলের প্রেমের।
দেখেছ প্রেমের মড়া?
কোনোদিন ডুবেছে সে জলে?

মন পোড়ে?
আহা বাহা পুড়ুক জ্বলুক
পোড়াই নিয়তি
বাহক দুর্গতি
ছিল যে কপালে লেখা
কীভাবে খ-াবে?
মনের বৈরাগী মাঝি
ফিরে আসতে নয় রাজি
চড়েছে সে একগুঁয়ে
ভাঙাচোরা ডিঙি নৌকায়।

নিরালায় সন্ধ্যাকালে

যাও পাখি যাও
পরানবন্ধুরে গিয়া
স্মরণ করাও
দুঃখিনীরে একলা রাইখা
কী মজা সে পায়?
এবার নাগালে পেলে
রশি দিয়া বাইন্দা রাখব
সতত পঞ্চল বন্ধে
এইবার দেইখা নিব কীভাবে পলায়!
শরমের খেতা পুড়ি
ওরে পাইলে এই ঘুরি
উইড়া চলি পাতায় পাতায়
যাও পাখি বলো তারে
এবার সে আসতে পারে
দুই বন্ধু বসব গিয়া
পুরানা দীঘির পাড়ে
নিরালা সন্ধ্যায় কালে
প্রাচীন ঘাটলায়
ও বন্দু সারলী হাঁস
খুঁচিয়ে কী মজা পাস?
সবকিছু ছাইড়া ছুইড়া
নিজ গৃহে সোজা চইলা আয়!


গত্যন্তর নাই

বিশ্বাস ভেঙেছো তবু
তোমাকে বিশ্বাস করি
পুনরায় প্রতারিত হতে চাই
ক্ষতি আর কতটুকু হবে?
সর্বনাশ পোড়া ছাই
লানতের অন্ত নাই
তোমাদ্বারা সকলই সম্ভব
যদি অসম্ভব হয়
আমি তবে বেপথু নাচার
পথ খোলা নাই যে বাঁচার
আমার কী গতি হবে তবে?


আশাভঙ্গ

এতোটা পথ
পাড়ি দিলাম একা
ভেবেছিলাম
হয়তো পাবো দেখা।
জানতাম না অদর্শনই
এই কপালের লেখা।
ভেবেছিলাম সরল তুমি
এখন দেখি জটিল বক্ররেখা!


নৈকট্য তো ছিল না কপালে

ক.
খুঁজতে খুঁজতে একদিন
হয়তো পেয়ে যাবো
ভয় কিন্তু জাগরুক
পেলে পর নিশ্চিত হারাবো!

খ.
কাঁটা ও সংশয়
সমস্ত জীবনব্যাপী
ভিলেনের মতো জেগে রয়।

গ.
জারিজুরি সবই হলো ফাঁস।
জানতে না আমার হৃদয়মধ্যে
বাস করে অপরূপ আন্ধা সর্বনাশ?
আমি কিন্তু জানতাম
সে কারণে কাছে ঘেঁষতে
চাইতাম না মোটের উপর
নৈকট্য নিয়তি নয় জানা ছিল
কিন্তু করতে পারি নাই
তোমাকে ত্যাগের মতো ছিন্ন উপবাস।

 

;

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু



হাসিবুর রহমান
পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

  • Font increase
  • Font Decrease

 

কোন জাতির উত্থান-পতন, আবেগ, ভবিষ্যৎ নির্মাণে মিশে থাকে ইতিহাসের  সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম উপাদান । কেউ ইচ্ছে করলেই তাকে যেমন বদলে দিতে পারে না, ঠিক তেমনি আদর্শগত দিক থেকে কোন জাতিকে বিপথে চালিতে করতে পারে ভুল ইতিহাস। ভারত উপমহাদেশের ইতিহাসে অষ্টাদশ শতকের বাংলা নানা কারণেই তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে, বাংলার আর্থিক সমৃদ্ধির সুনাম সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল সেই সময়। শান্তি সমৃদ্ধির চূড়ান্ত এক পর্যায়ে ১৭৫৭ পলাশির অন্ধকার নেমে আসে এবং ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন ঘটনো হয়।

দ্বিসার্ধশত বছরের পলাশি যুদ্ধের বহুমাত্রিক আলোচনা হয়েছে ঠিকই কিন্তু নবাব সিরাজউদ্দৌলার রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা ও ব্যক্তিগত চরিত্র নিয়ে জনসমাজে বিভ্রান্তিকর, কাল্পনিক গল্পও ছড়ানো হয়েছে । দেশী-বিদেশী ঐতিহাসিকরা তাঁকে লম্পট, দুশ্চরিত্র, কটুভাষী, হৃদয়হীন রূঢ়  চতুষ্পদ পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট স্বভাবজাত বলে মিথ্যা ও কলঙ্কের অপবাদে মুড়ে দিয়েছেন। সমকালীন যুগের ফারসি ভাষার মুসলমান,  ইংরেজ লেখক কেউই তাঁর প্রতি সুবিচার করে কলম ধরেননি।

তবে, অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, নিখিল নাথ রায় আধুনিক কালে সুশীল চৌধুরীর মতো ব্যতিক্রমী ঐতিহাসিকরা  সিরাজউদ্দৌলার মত দেশপ্রেমিক নবাবকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে যেভাবে মূল্যায়ন করে বিপথগামী ইতিহাস চর্চার ধারাকে থমকে দিয়েছেন- এটাও ইতিহাসবেত্তাদের সততা, স্বচ্ছতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্বরূপ। 

বর্তমানে অধিকাংশ ঐতিহাসিক পলাশির যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে বিস্তর লেখালেখিতে আগ্রহী। কিন্তু তাঁরা দেখেন না, দেখতে চান না যে পলাশি হলো একটি  পরিণতি । ষড়যন্ত্র আর সামরিক আগ্রাসনের একটি সুদূরপ্রসারী ফলাফল। তাঁরা পলাশি পরবর্তী সময়ে ইংরেজ কর্তৃক ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার বৈধতা দিতে সিরাজের বিরুদ্ধে সীমাহীন মিথ্যা যুক্তির জাল বুনেছিল, আসলে এছাড়া ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে স্বীকৃতি দেওয়ার অন্য কোন বৈধ উপায় তাঁদের হাতে অবশিষ্ট ছিল না।

মাত্র চৌদ্দ মাসের শাসনকালে অবাধ্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঔদ্ধত্যকে  দমন করতে সিরাজের দৃঢ়তা, সাহসিকতা, কঠোরতা দেখিয়েছিলেন তা নিঃসন্দেহে প্রশংসাযোগ্য। বাংলার মাটিতে বিনা অনুমতিতে ইংরেজদের দুর্গ নির্মাণ, কিংবা কর্মচারীদের  অবাধ "ব্যক্তিগত বাণিজ্য" বন্ধ করা তাঁর কাছে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। একজন স্বাধীন নবাবের চোখে সার্বভৌমিকতার প্রশ্ন এখানে জড়িয়ে ছিল। কিন্তু সিরাজের দুর্ভাগ্য তাঁর দরবারের পদস্থ বিশ্বাসী অমাত্য গোষ্ঠী, অনেকেই ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের আশায় কোম্পানির ষড়যন্ত্রের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। জগৎ শেঠদের মতো দেশীয় বণিকরাও এই ষড়যন্ত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

ঘরে বাইরে শত্রু পরিবেশিত সিরাজ দৃঢ়তার সঙ্গে এই অশুভ শক্তির মোকাবেলায় সফল হননি বটে , কিন্তু তাঁর স্বদেশভূমি রক্ষার লড়াইকে হীন চোখে দেখা অনৈতিহাসিক। পলাশি নামক বিয়োগান্ত ঘটনার পর  তাঁকে  চরম অপমান আর অমর্যতার সম্মুখীন হতে হয়। যে নিষ্ঠুরতা তাঁর সঙ্গে পলাশির পর দেখানো হয়েছিল ইতিহাসে তা বিরল। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক সিরাজুল ইসলাম লিখেছেন, প্রকৃতপক্ষে সমকালীন শাসকশ্রেণীর মানদণ্ডে সিরাজউদ্দৌলার চারিত্রিক দৃঢ়তা, অত্যন্ত সাহসিকতা ও অসাধারণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধ বিস্ময়কর বটে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় সাম্প্রতিক কালেও ইংরেজদের ভারতবর্ষ দখলের বৈধতা দান করতে গিয়ে একশ্রেণীর ইতিহাসবিদ সিরাজকে নিয়ে নতুন নতুন কাহিনী, উপাখ্যান ম্যানুফ্যাকচার করে ইতিহাস হিসাবে প্রচার করে চলেছেন। তাঁরা বলেন-- সিরাজের মৃত্যু কোন শহীদের মৃত্যু নয় । কারণ তিনি মধ্যযুগীয় রাষ্ট্রব্যবস্থাকে রক্ষা করতে লড়াই করেছিলেন মাত্র, যেখানে জনসমাজের সঙ্গে তাঁর কোন সম্বন্ধ ছিল না। অথবা একথা বলা হয় যে বাংলার নবাব হিসেবে কেন্দ্রীয় মুঘল শাসকদের দ্বারা কোন লিখিত বৈধ অনুমোদন তাঁর ছিল না ইত্যাদি।

সিরাজের মৃত্যু কোন শহিদের মৃত্যু কিনা সে বিষয়ে বিতর্ক থাকা অকল্পনীয়। তাঁর দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলা ইতিহাস-বিরুদ্ধ। এছাড়া শাসনের বৈধতার দিক থেকে বাংলার নবাবরা নিয়মিত দিল্লি সম্রাটদের রাজস্ব প্রদান করতেন, সিরাজ ও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। দেশের অভিন্ন মুদ্রা ব্যবস্থা বাংলাতেও চালু ছিল। কাজেই  অভিযোগকারীরা কি ধরনের 'দেশপ্রেম' ও 'জাতীয়তাবোধ' সিরাজের কাছে প্রত্যাশা করছেন তার কোন ইতিহাস সম্মত ব্যাখ্যা হয় না। দেশকে রক্ষা করার দায়িত্ব তিনি অস্বীকার করেননি এখানেই তাঁর রাজনৈতিক গুরুত্ব ও ঐতিহাসিক অবদান।

সিরাজউদ্দৌলার নিরন্তর লড়াই এর সঙ্গে যুক্ত ছিল আপামর বাংলার মানুষের জীবন ভবিষ্যৎ। পলাশিতে যদি নবাবকে না হারতে হত তাহলে বাংলার ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হত নিশ্চয়। দীর্ঘ দু'শো বছরের ঔপনিবেশিক শাসন, শোষণের জর্জরিত দেশবাসীর মনে হীনমন্যতাপদের জন্ম নিত না। স্বাধীনতার শত্রুদের সেদিন যথার্থভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। দেশপ্রেমিক নবাবের মৃত্যুকে কেবল ক্ষমতার হাত বদল বলেই ভেবেছিল একশ্রেণীর মানুষ। ক্ষমতাসীন নবাবের লাশকে সেদিন জনগণের ঘৃণা ও অপমানের বস্তু করে তুলেছিল। নবাবের অনুগ্রহে যাদের একসময় জীবন জীবিকা নির্ভর করত তারাই দেশপ্রেমিক সিরাজকে নির্মমভাবে হত্যা করল, মৃতদেহটি পশুর মত ডাস্টবিনে ছুঁড়ে দিয়েছিল। সমকালীন যুগের এই ঘৃণ্য প্রতিশোধ যেকোনো জাতির কাছেই বড় লজ্জার।

 

অথচ যে নবাব চরম বিপদের মুহূর্তে দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি, কারোর প্রতি  শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি, তাঁর সেই মহানুভবতা ও উদারতাকে কেউ মূল্যায়ন করতে চায় না। ম্যালেশন যথার্থই মন্তব্য করে করেছেন  যে, পলাশির আগে-পরে একমাত্র সিরাজের বিশ্বাসঘাতকতা ও ষড়যন্ত্রের সঙ্গে কোন সম্পর্ক ছিল না।

একথা সত্যি যে, বাংলার নবাবদের মধ্যে সিরাজই বোধহয় দেশকে একটু বেশি ভালোবেসে ফেলেছিলেন। তিনি মুর্শিদকুলি খান, সুজাউদ্দিন, সরফরাজ বা আলিবর্দী খানের মতো গা ভাসিয়ে চলতে পারতেন তাহলে তাঁকে অন্তত অকালে প্রাণ দিতে হতো না। হতভাগ্য রাজ্যহারা নবাব জীবনের অন্তিম সময়ের প্রাণ ভিক্ষার জন্য প্রত্যেকের পদতলে লুটিয়ে পড়েছিলেন কিন্তু সেদিন তাঁর করুণ আর্তি শুনতে পাইনি কেউ। ফলে বাংলার ইতিহাসে চিরকাল কালো অধ্যায় হিসেবে ১৭৫৭ সালের ৩রা জুলাই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। তাঁকে জীবন ভিক্ষার পরিবর্তে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। নিষ্ঠুর, ঘৃণিত সেই হত্যাযজ্ঞ আজও মানুষের হৃদয়ে কম্পিত হয়। দেশ রক্ষার লড়াইয়ে পরাজিত হয়েও মানুষের মনে তিনি চিরদিন স্বাধীনতার স্পৃহায় অমর হয়েই থাকবেন, এটাই অকালপ্রয়াত নবাবের জন্য  শ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি।

(প্রাবন্ধিক আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক।)

 সহায়ক তথ্যসূত্র :

১) যদুনাথ সরকার ,  বেঙ্গল নবাবস, এশিয়াটিক সোসাইটি, কলকাতা ,১৯৫২

 ২) ডঃ সুশীল চৌধুরী, পলাশির অজানা কাহিনী, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।

৩) ড: মোহম্মদ মোহর আলি,  হিস্টরি অব দ্য মুসলিমস অফ বেঙ্গল, ২খন্ড ,রিয়াধ ১৯৮৮।

৪) অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, সিরাজদ্দৌলা, কল্লোল, কলকাতা।

৫) ড : সিরাজুল ইসলাম , বাংলাদেশের ইতিহাস , খন্ড ১ম ( ১৭৫৭-১৯৭১) সম্পাদনা , এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ ২০১৭ ।

৬) আ:কা: মো: যাকারিয়া, সিরাজউদ্দৌলা , প্রথমা , ঢাকা ।

;

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

  • Font increase
  • Font Decrease

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ও শিশুসাহিত্যিক ফখরুল হাসান। ২৩ জুন বিকেলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সংগীত ও নৃত্যকলা মিলনায়তনে তার হাতে সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ৬ লেখককে সম্মাননা, ‘শেখ হাসিনার জয় বিশ্বের বিস্ময়’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, আবৃত্তি, ছড়া পাঠ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

এ সময় সৈয়দ মাসুম, আর মজিব, এনাম আনন্দ, ফাহমিদা ইয়াসমিন, লুৎফর রহমান চৌধুরীকেও সম্মাননা দেওয়া হয়।

বঙ্গবন্ধু জন্মশতবর্ষ আন্তর্জাতিক পর্ষদ, বঙ্গবন্ধু লেখক পরিষদের আয়োজনে বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. শাহজাহান মৃধা বেনুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ও জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা।

প্রধান অতিথি ছিলেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন কবি অসীম সাহা, মারুফুল ইসলাম, তারিক সুজাত ও অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন।

কবিতা আবৃত্তি করেন জালাল উদ্দিন নলুয়া, ড. তপন বাগচী, শফিকুর রাহী, রিফাত নিগার শাপলা, আনতানুর হক, হানিফ খান, ইউসুফ রেজা, রোকশানা সাথী, জমশেদ ওয়াজেদ, মাসুদ আলম বাবুল, মাদবর রফিক, লুৎফর চৌধুরী, হাসনাইন সাজ্জাদী, গিয়াসউদ্দিন চাষা, হেনা খান, কৌমুদী নার্গিস, বোরহান মাসুদ, সৈয়দ একতেদার আলী, আলী নিয়ামত, মিহির কান্তি ভৌমিক, লুৎফা জালাল, তানিয়া মাহমুদ, শ্রাবণ রেজা, ইমরান পরশ, সৈয়দ তপু, মেরীনা সাঈদ, শাফিন প্রমুখ

;

সংশপ্তক শেখ হাসিনা



আবদুল হামিদ মাহবুব
আবদুল হামিদ মাহবুব

আবদুল হামিদ মাহবুব

  • Font increase
  • Font Decrease

 

সংশপ্তক শেখ হাসিনা

কাণ্ড অনেক করে

পদ্মা বুকে ‘পদ্মা সেতু’

ঠিক দিয়েছেন গড়ে।

 

কাণ্ড ওসব নয় সাধারণ,

ভুলতে কি আর পারি?

জয় বাংলা জোরসে হেঁকে

ঠিক তো দিলেন পাড়ি।

 

অপেক্ষাতে সবাই আছি

মনটা উচাটন

ওই দিনটা জানান দিয়ে

আসলো শুভক্ষণ!

 

বাংলাদেশের এমন জয়ে

বিশ্ব জানুক, কি সুখ?

সব বাঙালি বুকের পাতায়

সুখের গাথা লিখুক।

;