ক্ষতচিহ্ন



মুস্তাক আহমদ মুস্তাক
অলঙ্করণ কাব্য কারিম

অলঙ্করণ কাব্য কারিম

  • Font increase
  • Font Decrease

অনুবাদ : ফজল হাসান

সিঁড়ি ঝাড়পোছ করার জন্য পিয়ারী এই নিয়ে তিনবার উপরে গিয়েছে। কিছুক্ষণ বসে থাকার জন্য ইতোমধ্যে সেখানে লালা সায়েব নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন। পিয়ারীর চোখেমুখে বিরক্তির চিহ্ন ফুটে উঠে। সে রাগান্বিত দৃষ্টিতে লালা সায়েবের দিকে তাকায়, কিন্তু একটি শব্দও উচ্চারণ করেনি। ভীষণ রাগে পিয়ারী ফুঁসতে থাকে। লালা সায়েব ধীরেসুস্থে বসেন। এরই মধ্যে বিকেলটা পশ্চিমে ঝুলে পড়েছে এবং ছায়া এসে ঢেকে দিয়েছে আঙিনা। সূর্যের মলিন আলোয় বাগানের একমাত্র ডালিম গাছের ঝোপের মাথা জ্বলজ্বলে দেখাচ্ছে। সবুজতা ছাড়া এবং পুষ্পবিহীন বেচারা বাগানটা দেখতে একগোছা শুকনো ও মরা ডালপালার মতো লাগে।

বাগানের মধ্যে ক্ষতচিহ্নের মতো দেখতে ডালিম ঝোপের জঞ্জাল কেটে ফেলার জন্য পিয়ারী অনেকবার তার স্বামীকে বলেছে। কিন্তু লালা সাহেব তাদের থামিয়েছেন। লালা সায়েবের সঙ্গে পিয়ারীর প্রায় প্রতিটি বিষয়ে, বিশেষ করে শীর্ণ-জীর্ণ ও শুষ্ক ডালিম গাছের ঝোপ নিয়ে, কথা কাটাকাটি হয়। তারপরও তারা একই বাড়িতে বসবাস করে।

কুড়ি বছরের বেশি সময় ধরে লালা সায়েব পেনশনে আছেন। অবসর নেওয়ার পরে প্রথম দিকে তিনি অফিসের কাছাকাছি সময়ে বাইরে বের হতেন। ঘরের মধ্যে অনেক ধরনের কাজকর্ম সেরে তিনি খবরের কাগজ পড়ার জন্য গ্রন্থাগারে যেতেন। এছাড়া তিনি নাপিতের দোকানে গল্পগুজব করে সময় কাটাতেন এবং সকল আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে দেখা করতেন। অনেক সময় রান্নাঘরে স্ত্রীর কাজেও সাহায্য করতেন। একদিন তার স্ত্রী দেহত্যাগ করে এবং তিনি ‘শর্করা রোগ’-এ আক্রান্ত হন। তাঁর জীবনে এমন এক সময় আসে যখন তিনি আশেপাশে হাঁটাচলা করতে পারেন না, এমনকি পেনশন তুলতেও যেতে পারেন না। তিনি হয় ঘরের মধ্যে বিশ্রাম করেন, নতুবা নির্বিকার বসে গভীর ভাবনায় নিমগ্ন থাকেন। মনের মধ্যে সামান্য পরিবর্তন আনার জন্য মাঝে মাঝে টেলিভিশন দেখেন। যখন কোনো কিছুই ভালো লাগে না, তখন তিনি বারান্দায় বসেন এবং ডালিম গাছের ঝোপের দিকে নির্বাক তাকিয়ে থাকেন।

রোদের বিবর্ণ আলোয় লালা সায়েবের ক্ষণস্থায়ী ভ্রান্ত ধারণা জন্মেছিল যে শুকনো ডালিম গাছে পুনরায় পাতা ধরবে এবং লাল ফুলে আবার সয়লাব হয়ে উজ্জ্বল দেখাবে। তাঁর মনে পড়ে, ত্রিশ কিংবা পঁত্রিশ বছর আগের দৃশ্য। তখন তাঁর মাটির ঘরের চারপাশে ডালিম ফুলে ভরা থাকত। তিন কন্যা সন্তানের জন্মের পরে ছেলের জন্ম হওয়ার সুবাদে বাড়িতে আনন্দ-উৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তাঁর সেই শিশু ছেলে স্কুলে যাওয়ার আগে বড় বোনদের সঙ্গে একই ডালিম বাগানে দৌড়াদৌড়ি করত। বোনেরা ছোট ভাইকে শাহজাদাহ্ (রাজকুমার) বলে ডাকত।

লালা সায়েব এবং তাঁর স্ত্রীর মনে হতো তারা দু জনেই জীবনের সমস্ত সুখ-শান্তি পেয়েছেন এবং সবটুকু আনন্দ উপভোগ করেছেন। তাঁদের কোনো কিছুতেই অভাব ছিল না, এমনকি কোনো ব্যাপারে তাঁরা নিঃসহায়ও ছিলেন না। দিনে দিনে শাহাজাদাহ্ বড় হতে থাকে। যেখানে ডালিম গাছের ঝোপ ছিল, সেখানেই লালা সায়েবের ভাইয়েরা নতুন বাড়িঘর তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেয়। তারা ডালিম গাছ কেটে ফেলে।

প্রথমে সাবা লালা নিজের জন্য বাড়ি তৈরি করেন। তারপর বাড়ি নির্মাণ করেন গোলাম রসুল এবং সব শেষে লালা সায়েব। মেয়ে বিয়ে দেওয়ার পরে লালা সায়েবের কাছে যা অর্থকড়ি অবশিষ্ট ছিল, তা দিয়ে তিনি পাকা বাড়ি তৈরি করেন। তার কারণ ছিল, শাহজাদা যেন চাচাত ভাইবোনের তুলনায় কখনোই নিজেকে গরীব না ভাবে।

বাড়ি তৈরি করার সময় প্রায় সবগুলো ডালিম গাছ কাটা হয়। বর্তমানে ডালিম ঝোপের যেটুকু অবশিষ্ট আছে, তা বাড়ির সীমানার একপাশে। লালা সায়েবের স্ত্রী দেখভাল করার কারণে বর্তমানের গাছগুলো কাটা হয়নি। কংক্রিটের দেওয়ালের পাশে থাকা সত্ত্বেও গাছগুলো প্রতিবছর ডালপালা গজিয়ে তরতাজা হতো। কিন্তু লালা সায়েবের স্ত্রী স্বর্গের পথে যাত্রা করলে গাছগুলো ক্রমশ শুকিয়ে যেতে থাকে।

লালা সায়েব অথৈ ভাবনার গভীরে হারিয়ে গেলে তাঁর চোখ আটকে থাকে শুষ্ক ডালিম গাছের ঝোপে। অকস্মাৎ পিয়ারী ঘরের ভেতর টেলিভিশন চালু করে। তখন সন্ধ্যার খবর হচ্ছিল। লালা সায়েব খবর শুনে চমকে ওঠেন যখন তিনি স্পষ্ট শুনেছেন, ‘মানবতার কারণে আজ দুইশ যুবককে চাকুরি দেওয়ার হুকুম জারি করা হয়েছে।’

‘তাহলে শেষপর্যন্ত সরকার একটা কিছু করার পদক্ষেপ নিয়েছে। আল্লাহ যদি সহায় থাকেন, তাহলে আমাদের শাহজাদাহ্ জীবনে সুস্থির হতে পারবে’—লালা সায়েব স্বগোক্তির মতো করে বললেন। একটু থেমে তিনি আপনমনে আরো বললেন, ‘বৃদ্ধ বয়সের প্রতিটি দিনই পাহাড়ের মতো ভারী মনে হয়। এখন আমি অন্য দুনিয়ায় যেতে চাই। কিন্তু সে কী করবে? সে একটা দোকান শুরু করেছে, কিন্তু কোনো সাফল্য নেই। আমি খুশি যে, সে আমার পেনশন থেকে সামান্য অর্থকড়ি নিয়ে কোনোভাবে চলছে। আমি আশাকরি সে শীঘ্রই একটা চাকুরি পাবে। তাহলে আমি শান্তিতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে পারব।’

এসব ভাবনা-চিন্তা মাথায় নিয়ে লালা সায়েব পুনরায় শুষ্ক ডালিম ঝোপের দিকে তাকান। গোধূলির আলো প্রায় নিভে গেছে। লন এবং সারিবদ্ধভাবে লাগানো ফুলগাছের সঙ্গে জরাজীর্ণ ডালিম ঝোপের শুকনো অংশ সত্যি বেমানান লাগছিল। একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে তিনি দেওয়ালে ভর করে উঠে দাঁড়ান এবং শোবার ঘরে প্রবেশ করেন।

একটু পরে পিয়ারী এসে তাঁকে ঔষধ খাওয়ার কথা জিজ্ঞেস করে। লালা সায়েব ঔষধ সম্পর্কে কিছুই বললেন না, বরং তিনি পিয়ারীকে জিজ্ঞেস করলেন সে খবর শুনেছে কি না।

‘তারা বলেছে যে, সরকার দুইশ যুবককে চাকুরি দেওয়ার হুকুম দিয়েছে’—পিয়ারী বলল। বলার সময় তার কপালে বিরক্তির রেখা ফুটে উঠে।
‘তাহলে তুমি শাহজাদাহকে বলছো না কেন যে সে কিছু অর্থকড়ি রোজগার করে এবং নিজের জীবন শুরু করে। সেটা আমার মৃত্যুকে সহজ করে দিবে’—লালা সায়েব খুবই ভীত গলায় বললেন।
‘কীসব আজেবাজে বলছেন? এই অশান্ত সময়ে যারা আত্মীয়-স্বজন হারিয়েছে, দুইশ চাকুরি তাদের জন্য’—মুখ ঝামটা দিয়ে বলল পিয়ারী। তারপর সে আরো বলল, ‘আলতামাশ, শাহজাদাহ্’র বন্ধু, আপনি ওকে চেনেন, চাকরির নিয়োগপত্র পেয়েছে। আপনি তো জানেন, ওর বাবা পেনশনের টাকা তুলতে ব্যাংকে যাচ্ছিলেন এবং পথেই তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়। আলতামাশ শুধু চাকুরিই পায়নি, তার সঙ্গে ক্ষতিপূরণ হিসেবে এক লক্ষ রুপিও পেয়েছে’—বলেই পিয়ারী আরেকবার মুখ ঝামটা দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।

পিয়ারীর কথা শোনার পরে লালা সায়েবের সারা শরীরে ঠান্ডা ঘামের স্রোত বয়ে যায়। তিনি রীতিমতো স্তম্ভিত, হতবাক। তিনি অনুভব করতে শুরু করেন যে, কয়েকজন ক্রুদ্ধ লোক কুঠার নিয়ে এসে শুষ্ক ডালিম গাছের ঝোপ কেটে পরিষ্কার করছে।

সমকালীন কাশ্মিরী সাহিত্যের অন্যতম লেখক মুস্তাক আহমদ মুস্তাক। তিনি একজন ছোটগল্প লেখক। এছাড়াও তিনি কাশ্মিরের একজন প্রসিদ্ধ মিডিয়া ব্যক্তিত্ব। দ্বিতীয় ছোটগল্প সংকলন ‘দ্য স্কার’-এর জন্য তিনি ২০১৮ সালে সাহিত্য অ্যাকাডেমির ‘শ্রেষ্ঠ গল্পগ্রন্থ’ পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়া ২০১২ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম গল্প সংকলন এবং প্রকাশের পরপরই পাঠক সমাজে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করে। এর জন্য তিনি ২০১৪ সালে ‘জম্মু ও কাশ্মির অ্যাকাডেমি অব আর্ট, কালার এবং লেঙ্গুয়েজ’ থেকে কাশ্মিরের শ্রেষ্ঠ ছোটগল্প সংকলন পুরস্কার অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি শ্রীনগরে বসবাস করেন এবং সেখানে রেডিও কাশ্মিরের আঞ্চলিক সংবাদ বিভাগের প্রধান কর্মকর্তা হিসেবে পেশাগতভাবে নিয়োজিত আছেন।

‘ক্ষতচিহ্ন’ গল্পটি মুস্তাক আহমদ মুস্তাকের ‘দ্য স্কার’ গল্পের অনুবাদ। কাশ্মিরী ভাষা থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন প্রফেসর শাফি শৌক। ইংরেজিতে গল্পটি ‘কাশ্মির লিট’ সাহিত্য ম্যাগাজিনে (৩০ জানুয়ারি ২০১৯) প্রকাশিত হয় এবং বাংলায় অনুবাদের জন্য সেখান থেকেই নেওয়া হয়েছে।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

  • Font increase
  • Font Decrease

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ও শিশুসাহিত্যিক ফখরুল হাসান। ২৩ জুন বিকেলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সংগীত ও নৃত্যকলা মিলনায়তনে তার হাতে সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ৬ লেখককে সম্মাননা, ‘শেখ হাসিনার জয় বিশ্বের বিস্ময়’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, আবৃত্তি, ছড়া পাঠ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

এ সময় সৈয়দ মাসুম, আর মজিব, এনাম আনন্দ, ফাহমিদা ইয়াসমিন, লুৎফর রহমান চৌধুরীকেও সম্মাননা দেওয়া হয়।

বঙ্গবন্ধু জন্মশতবর্ষ আন্তর্জাতিক পর্ষদ, বঙ্গবন্ধু লেখক পরিষদের আয়োজনে বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. শাহজাহান মৃধা বেনুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ও জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা।

প্রধান অতিথি ছিলেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন কবি অসীম সাহা, মারুফুল ইসলাম, তারিক সুজাত ও অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন।

কবিতা আবৃত্তি করেন জালাল উদ্দিন নলুয়া, ড. তপন বাগচী, শফিকুর রাহী, রিফাত নিগার শাপলা, আনতানুর হক, হানিফ খান, ইউসুফ রেজা, রোকশানা সাথী, জমশেদ ওয়াজেদ, মাসুদ আলম বাবুল, মাদবর রফিক, লুৎফর চৌধুরী, হাসনাইন সাজ্জাদী, গিয়াসউদ্দিন চাষা, হেনা খান, কৌমুদী নার্গিস, বোরহান মাসুদ, সৈয়দ একতেদার আলী, আলী নিয়ামত, মিহির কান্তি ভৌমিক, লুৎফা জালাল, তানিয়া মাহমুদ, শ্রাবণ রেজা, ইমরান পরশ, সৈয়দ তপু, মেরীনা সাঈদ, শাফিন প্রমুখ

;

সংশপ্তক শেখ হাসিনা



আবদুল হামিদ মাহবুব
আবদুল হামিদ মাহবুব

আবদুল হামিদ মাহবুব

  • Font increase
  • Font Decrease

 

সংশপ্তক শেখ হাসিনা

কাণ্ড অনেক করে

পদ্মা বুকে ‘পদ্মা সেতু’

ঠিক দিয়েছেন গড়ে।

 

কাণ্ড ওসব নয় সাধারণ,

ভুলতে কি আর পারি?

জয় বাংলা জোরসে হেঁকে

ঠিক তো দিলেন পাড়ি।

 

অপেক্ষাতে সবাই আছি

মনটা উচাটন

ওই দিনটা জানান দিয়ে

আসলো শুভক্ষণ!

 

বাংলাদেশের এমন জয়ে

বিশ্ব জানুক, কি সুখ?

সব বাঙালি বুকের পাতায়

সুখের গাথা লিখুক।

;

স্বপ্নের পদ্মা সেতু



রিঝুম ইতি
স্বপ্নের পদ্মা সেতু

স্বপ্নের পদ্মা সেতু

  • Font increase
  • Font Decrease

আমি জন্মেছি বাংলায়-

গর্বিত আমি,
শেখ হাসিনার মহিমায়।
পেয়েছি আমি,
স্বপ্নের পদ্মা সেতু।
একদিন যেটা,
স্বপ্নই ছিলো শুধু।
আজ, পদ্মাসেতুর প্রয়োজন -
বুঝবে সেই,
ভুক্তভুগী যেজন।
মাঝরাতে-
বেড়েছিলো মায়ের অসুখ।
ফেরিঘাটে-
গুণেছি শুধু প্রহর।
অবশেষে -
পারিনি মাকে বাঁচাতে,
পেরেছো কি দায় এড়াতে?
অভাবের সংসার-
একটা চাকরি,খুব দরকার।
একদিন-
ডাক পড়লো আমার,
ইন্টারভিউ দেবার।
পড়লাম এসে-
ফেরিঘাটের জ্যামে,
স্বপ্ন নষ্ট-
কিছু সময়ের দামে।
বাংলাদেশে-
হয়নি কোন চাকরি,
ভেবেছি তাই-
বিদেশ দেবো পাড়ি।
ভিটেমাটি সব বেঁচে,
সব টাকা যোগাড় করে।
রওনা দিলাম ভোরে,
চারপাশের-
কুয়াশা ঘিরে ধরে।
ফেরি চলাচল বন্ধ,
হারালো,জীবনের ছন্দ।
সারা বছর-
হাড়ভাংগা পরিশ্রমে,
জন্মাই ফসল-বাংলার মাটির বুকে।
পাইনা ভালো দাম,
এই কি তবে-
আমার ঘামের দাম।
শহরে আমি-
সবজি বেঁঁচবো দামে,
কিন্তু-
ঘাটে সবজি যাবে পঁচে।
শুধু-
পাইনি সুবিধা আমি,
পেয়েছে আরো-
তিন কোটি বাঙালি।
হাজারো-
ব্যর্থতার গল্প,
এভাবেই-
রচনা হতো।
হয়েছে স্বপ্ন পূরণ,
পদ্ম সেতুর দরুণ।

লেখক-রিঝুম ইতি, অনার্স- ১ম বর্ষ, প্রাণীবিদ্যা, কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ

;

সত্য-মিথ্যার মাঝখানে!



ড. মাহফুজ পারভেজ
প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

  • Font increase
  • Font Decrease

১.

ভিক্ষুকের ছদ্মবেশে ইউলিসিস প্রবেশ করেছিলেন নিজেরই প্রাসাদে, ইথাকায়। ইথাকা সাধারণত ইতিহাসে চিহ্নিত হয় হোমারের ইথাকা নামে। ওডিসিয়াস-এর বাড়ি। যে দ্বীপটিতে বিলম্বিত প্রত্যাবর্তন ঘিরে ক্লাসিকাল গ্রিক গল্প 'ওডিসি' আবর্তিত।

প্রত্নতাত্ত্বিককাল থেকেই ইথাকাকে পৌরাণিক বীরের বাড়ি হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। ওডিসি'তে হোমার ইথাকাকে এভাবে বর্ণনা করেন:

"পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ইথাকাতে বাস করুন, সেখানে এক পাহাড়, নেরিটন। বনের সাথে বসতি। অনেকগুলো দ্বীপের একটি। কাঠবাদাম জ্যাসিয়েন্টসকে ঘিরে রেখেছে। ইথাকা নিজেই মূল ভূখন্ডের কাছাকাছি ঘেঁষার দিকে খুব আগ্রহী। অন্যরা ভোর ও সূর্যের দিকে পৃথক হয়ে পড়েছে। কিন্তু অতিপ্রাকৃত দ্বীপ ইথাকা যুবকদের জন্য একজন ভাল নার্সের মতো প্রণোদন জাগ্রতকারী। "

২.

ইথাকায় ইউলিসিসের ফিরে আসার মধ্যে পেরিয়ে গিয়েছিল কুড়ি বছর। এতই প্রাচীন তাঁর অনুপস্থিতি যে, স্ত্রী পেনেলোপির একাধিক প্রণয়প্রার্থী তাঁরই প্রাসাদে এসে জড়ো হয়েছে, বসবাস করছে এই আশায় যে, হয়তো এবার পেনেলোপি-কে পাওয়া যাবে।

পেনেলোপি প্রথমে অপেক্ষায় ছিলেন, স্বামী ফিরবেন। তাই তাঁর প্রণয়াকাঙ্ক্ষীদের দূরে রাখতেন এক চতুর ছলনায়। সকলকে বলতেন, তিনি ইউলিসিসের পিতা লেয়ার্তেসের জন্য একটি শবাচ্ছাদনবস্ত্র বুনছেন, বোনা শেষ হলেই সাড়া দেবেন মনোমতো এক ভালবাসার আবেদনে। কিন্তু সে-বোনা অনন্তকাল ধরে যেন চলতে থাকল, চলতেই থাকল। আসলে, সকালের বুনন রাতে বিনষ্ট করে ফেলতেন তিনি।

ইউলিসিস ফিরবেন, সময় ক্রয় করে চলেছেন পেনেলোপি তাই। এটাই ছিল সত্য। আর সব মিথ্যা।

অবশেষে একটা সময় এমন এল, যখন সমস্ত আশা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ল। দু’দশক পেরিয়ে গেল যে। ইউলিসিস সম্ভবত আর ফিরবেন না, তাঁদের পুত্র টেলেম্যাকাস-ও বড় হয়ে গিয়েছে। এবার তা হলে পেনেলোপি অন্য পুরুষের কাছে নিজেকে সমর্পণ করতে পারেন।

এমনই এক ক্ষণে ফিরে এলেন ইউলিসিস। তবে, ভিক্ষুকের ছদ্মবেশে। তারপর যখন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে স্বয়ম্বরসভা, তখন দেখা গেল, এই ভিক্ষুকই হলেন সেরা পাণিপ্রার্থী পেনেলোপির। স্বপরিচয়ে প্রত্যাবর্তন এবার তাঁর। একে একে হত্যা করলেন স্ত্রী-র সকল পাণিপ্রার্থীকে। তিনিই তো অধিকর্তা, প্রমাণ করতে হবে তাঁকে। প্রমাণ করলেনও তিনি।

৩.

লুইজ় গ্লিক-এর 'মেডোল্যান্ডস' কবিতাগ্রন্থে ইউলিসিস-পেনেলোপির যে-মিথ, তার ভেতর এক গাঢ় অন্তরঙ্গতা আছে। 'গাঢ়' শব্দটা বললে নিমেষে মাথায় আসে বাংলা ভাষার সেই কবিকে, শহরের পথহাঁটা যাঁকে স্মরণ করিয়ে দিত, ‘বেবিলনে একা একা এমনই হেঁটেছি আমি রাতের ভিতর’।

বস্তুত, অনুভব বা বোধ গাঢ় না-হলে স্মৃতি অবাধ বিচরণ করতে পারে না। জীবনের স্মৃতি প্রস্তরীভূত হতে পারে না কালাতিক্রমী কল্পস্মৃতির সঙ্গে। যেমনভাবে, শরীরের শত প্রলোভন থাকা সত্ত্বেও মন মিশতে পারে না মনের সঙ্গে।

কারো কারো কবিতাভাষায় প্রচ্ছন্ন রয়েছে সেই গাঢ় অনুভব, যে-কারণে কবিতা আর জীবন পাশাপাশি বসবাস করতে পারে। পুরাণকাহিনিকণা আর বাস্তবের খণ্ডাংশ একাকার হতে পারে। পৌরাণিক আখ্যান পেরিয়ে সামনে এসে দাঁড়াতে পারেন একজন ইউলিসিস। একজন পেনেলোপি নব-নির্মাণে উত্থিত হতে পারেন। কালান্তরের দাগ মুছে আমাদের কালের নারী-পুরুষে পরিণত হতে পারেন তাঁরা।

৪.

বাস্তবের জীবনে ছুঁয়ে যাওয়া পৌরাণিক ভাষ্যের অপর নাম 'মিথ'। আদিতে যা গ্রিক শব্দ 'mythos' থেকে উদ্ভূত।  শব্দটি হোমারের বিভিন্ন কাজে প্রচুর দেখা গেছে। এমন কি হোমার যুগের কবিরাও এই শব্দটির ব্যাপক ব্যবহার করেছেন তাদের সাহিত্য কর্মে।

মূলগত অর্থে 'mythos' শব্দটি সত্য অথবা মিথ্যার মাঝে পার্থক্য বোঝাতে প্রয়োগ করা হয়। David Wiles এর মতে, প্রাচীন গ্রিসে শব্দটি বিপুল তাৎপর্য বহন করতো। এটি ব্যবহার করা হত মিথ্যাচারমূলক ধর্মীয় বা সামাজিক ব্যাপারগুলোকে উপস্থাপন করার সময়।

আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, মিথ নিজেই এখন সত্য ও মিথ্যার মাঝখান থেকে জীবনের বাস্তবে রূপান্তরিত হয়েছে। 'এটা ছিল' বা 'এটা হতে পারতো' ধরনের বহু মিথ প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে সত্যের চেয়ে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ অবয়বে। কিংবা মিথ প্রতিষ্ঠিত করতে দাঙ্গা, হাঙ্গামা, হত্যাকাণ্ড ও রক্তপাতের বন্যা বইছে। একদা মিথ্যাচারমূলক ধর্মীয় বা সামাজিক ব্যাপারগুলোকে উপস্থাপন করতো যে মিথ, তা-ই এখন ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার মজবুত হাতিয়ারে পরিণত হয়ে হত্যা করছে মানুষ ও মানবতাকে।

৫.

সত্য আর মিথ্যার স্পষ্ট বিভাজনের পাশে মিথ দাঁড়িয়ে আছে অমীমাংসিত উপস্থিতিতে। কারো কাছে তা সত্য, কারো কাছে মিথ্যা, কারো কাছে অনির্ধারিত চরিত্রে। ব্যক্তি বা সামাজিক চর্চার বাইরে সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমেও সত্যের পাশাপাশি মিথ্যা ও মিথের বাড়বাড়ন্ত।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে মার্কিন দেশে সাংবাদিকতা বললেই 'ফেইক নিউজ' শব্দটি সামনে চলে আসতো৷ বিরুদ্ধে গেলে মিথ্যা বা ফেইক বলাটা এখন ক্ষমতাসীনদের ট্রেন্ড বা ট্রেডমার্ক৷

এদিকে, তথ্যের সুনামির মধ্যে কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তা আলাদা করা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে৷ এর পেছনে কার দায় সবচেয়ে বেশি, তা এক গভীর গবেষণার বিষয়।

প্রতিদিন সামাজিক মাধ্যমে ও সংবাদ প্রবাহে কতো কতো সংবাদ আসে৷ আজকাল সবচেয়ে জরুরি আর গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো ফেসবুকে পাওয়া যায় শেয়ার-কমেন্টের কারণে৷ কিন্তু  ধীরে ধীরে এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটছে। এখন সত্য, মিথ্যা বা মিথ ফেসবুক স্ট্যাটাস বা কমেন্টে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে না। সংবাদমাধ্যমও সঠিক তথ্য দেওয়ার চেয়ে কিভাবে প্রকাশ করলে ক্লিক আর শেয়ার বাড়বে, সেদিকে বেশি মনোযোগী৷

ফলে সত্য, মিথ্যা, মিথের ত্রিশঙ্কু পরিস্থিতি চারপাশে। আর মাঝখানে অসহায় মানুষের বিপন্ন অবস্থান।

পাদটীকা: ইউলিসিস আইরিশ লেখক জেমস জয়েস (জন্ম-২ ফেব্রুয়ারি ১৮৮২, মৃত্যু-১৩ জানুয়ারি ১৯৪১, বয়স ৫৮)-এর কালজয়ী সৃষ্টি। ১৯২২ সালে এই গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। অধিকাংশ সাহিত্য সমালোচক ইউলিসিস-কে ইংরেজি ভাষায় লিখিত বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ উপন্যাস বলে গণ্য করে থাকেন। ইউলিসিস-এর কাহিনী একটিমাত্র দিনকে ঘিরে। ১৯০৪ সালের ১৬ জুন। এই সাধারণ একটি দিনে এক সাধারণ নাগরিক লেওপোল্ড ব্লুম (Leopold Bloom) ডাবলিন শহরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত ঘুরে বেড়ান নানা কাজে। প্রাচীন গ্রিক কবি হোমার-এর রচিত মহাকাব্য ওডিসি-র সাথে উপন্যাসটির অনেক সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। ওডিসি কাব্যের বীর ইউলিসিস-এর নামেই উপন্যাসের নামকরণ। জয়েস-এর ভক্তরা ১৬ জুন দিনটিকে ব্লুম-দিবস (Bloomsday) হিসেবে পালন করে থাকেন। জয়েসের ইউলিসিস বিশাল এক গ্রন্থ। কোন কোন সংস্করনের দৈর্ঘ্য হাজার পৃষ্ঠার উপরে চলে গিয়েছে। বিগত আশি বছর ধরে সাহিত্য বিশারদরা বইটির চুলচেরা বিশ্লেষণ করে যাচ্ছেন। বইটি সাহিত্যাঙ্গণে অনেক বিতর্কেরও জন্ম দিয়েছে। বিংশ শতকের শুরুতে আধুনিকতাবাদ (modernism) নামে যে সাহিত্যধারার সৃষ্টি হয়, ইউলিসিস তার অতি উৎকৃষ্ট একটি উদাহরণ। বিরতিহীন চৈতন্যবর্ণনার (stream of consciousness) অনবদ্য প্রয়োগের জন্যে উপন্যাসটি যথার্থই বিখ্যাত। এ ছাড়াও জয়েস-এর অভিনব গদ্যশৈলী, গদ্য নিয়ে বিচিত্র সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা, কুশলী চরিত্রায়ন ও চমৎকার রসবোধ বইটিকে স্বতন্ত্রতা এনে দিয়েছে। তবে বইটি বেশ দুরূহপাঠ্য যে কারণে কেউ কেউ এর সমালোচনা করেছেন। ১৯৯৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত প্রকাশক মডার্ন লাইব্রেরি শতাব্দীর সেরা ১০০টি ইংরেজি উপন্যাসের তালিকা প্রনয়ন করে। ইউলিসিস তালিকার শীর্ষে স্থান পায়। ২০২২ সাল জেমস জয়েসের ইউলিসিস প্রকাশের শতবর্ষ।

ড. মাহফুজ পারভেজ,  প্রফেসর,  রাজনীতি বিজ্ঞান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম

;