জুতোর বাক্সে ভালোবাসা



সঞ্জয় দে

  • Font increase
  • Font Decrease

‘চাকরিটা আমি পেয়ে গেছি, বেলা সত্যি’-র মতো সান ডিয়েগো শহরে একটা পেটে-ভাতে চাকরি জুগিয়ে ফেলেছি কয়েক মাস হলো; তবে এখন পর্যন্ত একটা চার চাকার যান কেনবার মতো পয়সা জুগিয়ে উঠতে পারিনি। ওদিকে এ-শহরে গাড়ি না থাকার মানে হচ্ছে হাত-পা গুটিয়ে বস্তাবন্দি হয়ে থাকা। ট্রাম-ট্রেন দূরে থাক, বাস টেম্পোরও কোনো ব্যবস্থা নেই। তবে আমার কিন্তু সে-অর্থে তেমন কোনো ঝামেলা হচ্ছে না। হাউসমেট মিস্টার ব্রুস ওয়াং প্রতিদিন নিষ্ঠার সাথে আমাকে অফিস নেওয়া আর সপ্তাহান্তে কাছের এক ভিয়েতনামিজ দোকান ভিন হুং-এ নেবার কাজটি করে যাচ্ছেন। ভদ্রলোকের স্ত্রী আর তিন কন্যা থাকে টরেন্টোতে। আকালের বাজারে আমাকে শেষ মুহূর্তে পেয়ে বাড়িতে এনে তুলেছেন ভাড়া শেয়ার করার জন্যে। সাথে কথা দিয়েছেন, আমার যাতায়াতের ব্যাপারটি দেখবেন বলে। ভদ্রলোক যুবাকালে বেইজিং-এর কলেজ থেকে পাশ করার পর পরই দীর্ঘদিনের প্রণয়িনীর গলায় মালা পরান; আর তার পরের বছরই ওয়াং পত্নীর কোল জুড়ে আসে প্রথম কন্যাসন্তান। চীনে তখন চলছে ‘এক সন্তান, সুখী পরিবার’ নীতি। এই নীতি কিন্তু মিসেস ওয়াংকে সুখী করতে পারেনি। পরের বছরই তার সাধ হয় আরেকটি সন্তানের। কিন্তু চীনে বাস করে তেমন ইচ্ছে ফলালে জেল জরিমানার সম্ভাবনা প্রবল। অগত্যা ওয়াং শুধুমাত্র স্ত্রীর ইচ্ছে চরিতার্থের জন্যে পাড়ি জমালেন কানাডায়। সেখানে একটি নয়, আরো দু দুটি সন্তানের জন্ম হলো। এরপর তাঁদের মাথায় এলো ভিন্ন এক খায়েশ। তিন তিনটে সন্তান তো হলো, এবারে একটি সামনে-পেছনে উঠোনওয়ালা বিশাল বাড়ি চাই। টরেন্টোতে ওয়াং যে টাকা কামান, ও দিয়ে ওই আক্রার বাজারে বিশাল বাড়ি কেনা সম্ভব নয়। এবারে ওয়াংপত্নী তার পশ্চাৎদেশে খেজুরের কাঁটা দিয়ে খুঁচিয়ে বলতে লাগলেন, ‘তুমি না হয় এবারে আমেরিকায় একটা চাকরির চেষ্টা করো। শুনেছি, আমেরিকায় নাকি মেলা টাকা; আমেরিকা মানেই বিশাল গাড়ি, বিশাল বাড়ি।’ বৌয়ের এই অভিলাষে ত্যাক্ত হয়ে ওয়াং একদিন সত্যি সত্যি চাকরি নিয়ে আমেরিকায় পাড়ি জমান। তবে যে বৌয়ের ধাক্কায় তার এই আমেরিকা অবধি ছুটে আসা, সেই বৌকেই এখন পর্যন্ত এখানে আনতে পারেননি কী এক ভিসাপত্রের ঝামেলায়। মি. ওয়াং এখন খেয়ে না-খেয়ে টাকা জমাচ্ছেন; শুনছি, সামনের বসন্তে ওয়াংপত্নী বালবাচ্চা আর লোটা কম্বলসহ একেবারে ক্যানাডার পাট চুকিয়ে এখানে আসবেন। ততদিন পর্যন্ত এই ভাড়া ফ্ল্যাটের অতিরিক্ত গুমটিঘরটি নিশ্চিতভাবেই আমার নিবাস।

ওয়াংয়ের বাড়ির খুব কাছেই একটি কমিউনিটি লাইব্রেরি। সেখানে হেঁটেই যাওয়া যায়। আমি শনিবারের বিকেলগুলোতে সেখানে মাঝেসাঝে যাই। ঠিক বই পড়তে যাই, তেমন নয়। ওখানে বেশ কিছু ভালো ডিভিডির কালেকশন আছে। এইতো কিছুদিন আগে নিয়ে এলাম দ্যা সোভিয়েত স্টোরি আর দ্যা কোল্ড ওয়ার নামক দুটো ডকুমেন্টারির ডিভিডি। তো সেই লাইব্রেরিতেই একদিন একটি পোস্টার আমার নজরে আসে। করিডরের বাঁ-দিকের একটি দরজায় সাঁটা। সেখানে লেখা রয়েছে, নামমাত্র দক্ষিণার বিনিময়ে লাইব্রেরির একটি ঘরে নাচ শেখানো হবে। আগ্রহীরা সত্তর যোগাযোগ করুন। ভেবে দেখলাম, হাতে যেহেতু বেশ খানিকটা সময় আছে আর এটা যেহেতু হাঁটা পথের মাঝেই—নাচের ক্লাসে কয়েকদিন ঢুঁ মারলে মন্দ হয় না। ঢাকায় ধানমন্ডি লেকের ধারে রুশ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে একসময় সালসা শিখেছিলাম। আমি হয়তো তাই পুরোপুরি আনাড়ি ছাত্র নই, হাতেখড়ি আছে আমার। তো সাহস করে একদিন পৌঁছে গেলাম নাচের ক্লাসে। শুরুতেই কিছুটা হতোদ্যম হতে হলো। ক্লাসের যারা ছাত্র ছাত্রী, তাঁদের প্রায় সকলেরই বয়স সত্তরের কোঠায়। অবসর জীবনের নিঃসঙ্গতা ঘোঁচাতে নাচের ক্লাসে মজেছেন। বুড়োরা ঝকমকে বাটিকের শার্ট আর বুড়িরা চড়া মেকআপ লাগিয়ে বাহুলগ্না হয়ে তুমুল ছন্দে নাচছেন। এতসব মানুষের মাঝে কেবল মাত্র দুজন রমণীর বয়স হয়তো ত্রিশের কোঠায়। চেহারা সুরতে মনে হলো দুজনেই হিস্পানিক। এঁদের একজনের গা দিয়ে ভুরভুর করে বেরোচ্ছে পেঁয়াজের গন্ধ। সে গন্ধ এতটাই প্রবল যে, তিনি আমাকে নাচের জন্যে জাপটে ধরলেও আমাকে পাশ কাটাতে হয়। সুতরাং রইল বাকি এক। এই যে একজন, ওর নাম ভেনেসা। আশপাশেই নাকি থাকে, আর কাজ করে একটি কোম্পানির কেরানি পদে। এ শহরে ভেনাসাও আমার মতোই নবাগত।  এতকাল ও ছিল ভেনচুরা কাউন্টি নামক শহরে। সেখানেই ওর পরিবার।

/uploads/files/ftwFm6xeBiG5wbihqODWF2ta782PpFUhCsRVBs9C.jpeg
নাচের ক্লাসে একই জনের সাথে বহুক্ষণ নাচা যায় না। কারণ, কিছুক্ষণ পর পরই নাচের মাস্টারের রব ভেসে ওঠে—‘জেন্টলম্যান রোটেট, রোটেট প্লিজ।’ মানে হলো, সঙ্গী বদল করে আর কাউকে ধরুন। একজনের সাথেই আঠার মতো লেগে থাকলে মন হয়তো নাচের ছন্দ থেকে পথ খুঁজে নেবে সঙ্গীর কোমরসন্ধিতে। যদিও এই রোটেশনের ব্যাপারটাতে আমার চরম অনীহা। আমি চেষ্টা করি, ঘুরে ফিরে ওই ভেনেসাতেই আটকে থাকতে। ওভাবেই ‘স্লো, স্লো, কুইক কুইক, স্লো’—এই রিদমের মাঝে সেরে নিই টুকটাক আলাপ। তৈরি হয় কিঞ্চিৎ ঘনিষ্ঠতা।

ভেনেসা একটি ছাই রঙের মাজদা গাড়ি চালায়। গাড়ির ছাদের ওপর মেছতা রোগীর মতো কালশিটে দাগ। আর সিটবেল্টের যে ধরন, ও থেকে অনুমান করা যায় গাড়িটি কম করে হলেও বিশ বছরের পুরনো। প্যাসেঞ্জার সিটের পায়ের কাছটায় কিছু দুমড়ানো মুচড়ানো কাগজের টুকরো। তা থেকে দু একটা উঁকি দেওয়া কাগজ জানান দেয়, তারা টেলিফোন কিংবা বিদ্যুতের বিল। মোটামুটি ভাগাড়ের মতো এই গাড়িটির সওয়ারি আজ আমি। গত সপ্তাহেই ভেনেসা আমন্ত্রণ জানিয়েছিল ওর এই বাহনে চড়ে সান ডিয়েগোর হারবার এলাকায় যাবার। ঠিক বেড়াতে নয়। ওখানে ওর এক গাতক বন্ধুদল আসবে নানা বাদ্যযন্ত্রসহ। ভেনেসা ওখানে যাবে তাঁদেরকে কিছুটা সঙ্গ দিতে। আমাকে সে-কথা জানিয়ে সহযাত্রী হবার প্রস্তাব দিলে আমি এক কথায় লুফে নিই। ছুটির দিনে আমার তো আর করার মতো তেমন কিছু নেই! মি ওয়াং এই সময়টায় গম্ভীর মুখে চীনে সওদার দোকান থেকে আনা ফ্রি পত্রিকায় চীনে ভাষার পাজল মেলান। ও সময়ে তাঁর সাথে খেজুরে আলাপ করা যায় না। বাড়িতে বসে তাই অলস হাওয়া না খেয়ে যদি হারবারের  নোনা বাতাস খাওয়া যায়, তবে হয়তো মন্দ হয় না।

ভেনেসার পরনে আজ ফ্রি-কাট সাদা ধবধবে প্যান্ট, আর ঊর্ধ্বাঙ্গে সিল্কের টপস। হারবারে ঠিক এমনতর রক্ষণশীল পোশাকে খুব কম লোকেই যায়। এর পেছনে অবশ্য একটা ব্যাখ্যা আছে। কিছুদিন আগে কথায় কথায় জানিয়েছিল, ওর পরিবার কট্টর ক্যাথলিক। বড় ভাইটি স্থানীয় গির্জার প্যাস্টর। ক্যাথলিক মতে জন্মনিয়ন্ত্রণকে ‘না’ বলায় এখন পর্যন্ত পাঁচ পাঁচটি সন্তান তাঁর। তবে আর্থিক সঙ্গতি নাকি তেমন নয়। এ কথাগুলো ভেনেসার কাছ থেকে জেনেছি একদিন নাচের ক্লাসে ঢোকার আগে। সেদিন নিজের মায়ের সাথে করিডরে দাঁড়িয়ে বেশ চড়া গলায় বাৎচিত করছিল। টেলিফোন রাখার পর আমি কাছে গিয়ে নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘এনিথিং রং?’ তাতে করে ও হড়বড়িয়ে মায়ের ওপর ঝাল ঝরিয়ে যা বলল তার সারাংশ হলো এই—ভেনেসার মা-বাবা ক্যাটারিংয়ের ব্যবসা চালাত। সেই ব্যবসা লাটে ওঠায় ভেনেসা প্রতি মাসে মা-বাবাকে কিছু পয়সা পাঠায়। কিন্তু বুড়োবুড়ি সেগুলো নিজেদের পেছনে খরচ না করে সব ঢালে এই বড় ভাইয়ের পাঁচ সন্তানকে এটা-সেটা কিনে দেবার কাজে। ক্রোধে রাঙামুখী হয়ে ভেনেসা বলে, ‘দে আর জাস্ট এক্সপ্লয়েটিং মাই প্যারেন্ট’স ইমোশন। সঙ্গতি না থাকার পরও একের পর এক বাচ্চা নেওয়ায় ওদের সংসারে অভাব লেগেই আছে। সেসব জানিয়ে আমার মা-বাপের কাছে এসে যখন ঘ্যান-ঘ্যান করে, তখন তাঁরাও নাতি পুতির মুখের দিকে তাকিয়ে সব টাকা খরচ করে ফেলে। ওদিকে সেই টাকাটা কিন্তু আমার পাঠানো টাকা। বোঝো অবস্থাটা।’ তো সেইসব আলাপের মাঝেই উঠে আসে ওর পরিবারের কিছু গোঁড়ামির কথা। ওর মায়ের নাকি ফতোয়া আছে, নন-ক্যাথলিকদের সাথে বন্ধুত্ব করাটাও এক ধরনের পাপ। যদিও পরিহাসের ব্যাপার হলো, ভেনেসার ছোট বোন, যে কিনা এই মুহূর্তে থাকে সান ফ্রানসিস্কোতে, সে কিন্তু চুটিয়ে এক সৌদি যুবকের সাথে লিভ টুগেদার করছে। সে কথা জানলে হয়তো ওর মায়ের হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হবার সম্ভাবনা আছে।

/uploads/files/pEy3FTXkOhpCyiJS9962bkBj1qmGCNawwOd72EFY.png
হারবারে পৌঁছে গাড়ি পার্ক করা নিয়ে বিরাট এক ঝামেলার মধ্যে পড়তে হয়। আজ তো শনিবার। রাজ্যের লোক যেন ভেঙে পড়েছে এখানে। পথের পাশের মিটার পার্কিংগুলো সব দখল। বেশ কয়েকবার ঘুরপাক খাবার পর নিতান্তই ভাগ্যবশে একটি জায়গা আমাদের মেলে। সেখানে স্যাত করে গাড়িটি পার্কিং করে ভেনেসা মিটারে পয়সা ভরতে যায়। আমি সেই ফাঁকে নেমে আশেপাশে নজর বুলাই। উল্টোদিকের ফুটপাথে দেখি, এক ভবঘুরে শপিং মলের কার্টে নিজেদের যাবতীয় সংসারটিকে ঠেলেঠুলে বসিয়ে পাশে বসে ঝিমুচ্ছেন। সামনে শিপিংবক্স থেকে কেটে নেওয়া এক টুকরো কাগজে লেখা, ‘মিথ্যে কেন বলব? বিয়ার খাবার জন্যেই কিছু পয়সা চাইছি।’ এর সামনে দিয়ে সে মুহূর্তে পাঁচ-দশটি ছোট কুকুরের দল নিয়ে হেঁটে যায় বাঁ-হাতে ফুল লতাপাতার উল্কি আঁকা এক যুবতী। দলের একেবারে শেষ কুকুরটির পেছনের পায়ে বাঁধা একটি হুইল। বাকিগুলো হাঁটছে কিছুটা খুঁড়িয়ে। মেয়েটি খুব সম্ভবত কোনো পঙ্গু কুকুর সেবা কেন্দ্রের স্বেচ্ছাসেবক। সবগুলো কুকুরের গলায় বাঁধা চেনের প্রান্তকে নিজের মুঠিতে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে মেয়েটি ফুরফুরে মেজাজে সামনে এগিয়ে যায়।

মিটারে পয়সা ভরে ভেনেসা ফিরে আসে। আমরা হাঁটতে থাকি কংক্রিটে বাঁধানো পথ ধরে। খুব কাছেই এসে একটি রিকশা হার্ড ব্রেক করে। এ সেই বঙ্গদেশের রিকশা নয়। বরং ও ধরনের কিছু একটা। এঁদের অনুমতি আছে কেবল এই হারবারের আশপাশে লোকেদের নিয়ে ঘুরবার। রিক্সার পাদানির জায়গাটি থাকা টেপরেকর্ডার থেকে ভেসে আসছে আরবি গান। যানটি চালাচ্ছে ফ্যাশন দুরস্ত এক যুবা। জেল দিয়ে পেছনে ব্যাকব্রাশ করা চুল। হাতের কবজিতে বেঁধে রাখা কয়েকটি মালা। আমরা তো আর এখানে প্রমোদ ভ্রমণে আসিনি, তাই গাঁটের টাকা খরচ করে রিকশায় চড়বার মানে হয় না; আর ও জিনিসে তো এ জীবনে কম চড়িনি!

হারবারের ডান দিকে বিশাল এক যুদ্ধজাহাজ। নানা যুদ্ধ শেষ করে অবসর নিয়ে এটি এখন ডেরা বেঁধেছে এই হারবারের কোণে। কম পয়সায় খাটবার মতো লোক নিয়ে জাহাজ ভাঙা শিল্প এদেশে গড়ে ওঠেনি, ওদিকে দৈত্যের মতো এমন এক জাহাজকে ডুবিয়েও দেওয়া যায় না। তাই একসময় ঠিক হলো, জাহাজটিকে যদি এই হারবারে বেঁধে রেখে একটা জাদুঘর মতন করা যায়, তবে হয়তো জাহাজটি মরে গিয়েও বেঁচে যায়। সেটাই হলো পরে। লোকে এখন পয়সা খরচ করে ভেতরে গিয়ে দেখে আসে নাবিকদের থাকার স্থল আর যুদ্ধ বিমানের কংকালগুলো। এই জাহাজের পাশ দিয়ে হাঁটার সময়ে নিজেকে হস্তীর সম্মুখে পিপীলিকাসম মনে হয়। হয়তো সেসব নিয়েই ভাবছিলাম কয়েক মুহূর্ত। কোন সময়ে যে একজন চৈনিক ভদ্রলোক হাতে একখানা লিফলেট গুঁজে দিয়ে গেছে টের পাইনি। এখন সম্বিত ফিরে পেয়ে তাতে নজর বুলিয়ে যা বুঝলাম—এঁরা ফালুন গং নামক চীন দেশের এক সাধক সম্প্রদায়। তা চীনের বর্তমান কম্যুনিস্ট সরকার এঁদের ওপর ব্যাপক নাখোশ। সুযোগ পেলেই পাইকারি হারে ঢুকিয়ে দেয় জেলে। সেটুকুও হয়তো মেনে নেয়া যেত। কিন্তু ফালুন গং গ্রুপ জেল থেকে পলাতক কয়েক সদস্যের মাধ্যমে জেনেছে—জেলে অন্তরিন বাকি সদস্যদের শরীর থেকে অনেক সময়েই সরিয়ে ফেলা হয় কিডনির মতো মূল্যবান প্রত্যঙ্গ। আর সেজন্যেই এই দল চাচ্ছে ব্যাপক প্রচারণার মাধ্যমে ঘটনাটিকে বিশ্ববাসীর নজরে আনতে।

/uploads/files/1deJKH6VHifKemIs4JlwnP0l5VpioCwmSVuoZuAH.jpeg
ভেনেসা ততক্ষণে সরে গেছে কিছুটা ডান দিকের কোণে। সেখানে চার জনে মিলে বসিয়ে ফেলেছে গানের জমজমাট আসর। তাঁদের হাতে বেহালা, গিটার, একর্ডিয়ান আর চেলো। যিনি লিড গায়ক তার গায়ে একটি ছাই রঙের টি শার্ট। মাথায় প্রথাগত মেক্সিকান খড়ের টুপি। বিশাল সেই টুপির চাতালে ঢাকা পড়েছে মুখের একাংশ। পাশেই রাখা সাউন্ডবক্স থেকে ঝুলে থাকা মাইক্রোফোনটি আঁকড়ে ধরে ভদ্রলোক দুলে দুলে গান করেন; আর গানের মাঝে সকল দর্শকের দিক থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে ভেনেসার দিকে তাকিয়ে হাসেন। সেই অর্থপূর্ণ হাসি দেখে আন্দাজ করি, এ-ই হয়তো ওর সেই গাতক বন্ধুদল।  দলের সামনে পেতে রাখা গিটারের শূন্য বাক্স। লোকে দু চার মিনিট গান শুনে সেখানে রেখে যাচ্ছে কয়েকটি কয়েন।

আমি স্প্যানিশ বুঝি না। ভেনেসা তাই তর্জমা করে গানের কয়েকটি লাইন আমাকে শোনায়—‘আই ডু নট নো হোয়াট টু ডু, আই ফেল ইন লাভ উইথ ইউ ইন এ ডে, এন্ড ডু নট নো হোয়াই, ইউ মেইড মাই লাইফ রিবর্ন।’ সে তো বুঝলাম, কিন্তু একদিনের মাঝেই হাবুডুবু প্রেমে পড়া কি আদৌ সম্ভব?—মুচকি হেসে ভেনেসাকে জিজ্ঞেস করি। আমার কথার জবাব দেবার মতো কোনো ব্যাগ্রতা ওর মাঝে ক্রিয়া করে না, বরং ওর দৃষ্টি ব্যস্ত থাকে লিড গায়কের সাথে অদৃশ্য তরঙ্গ স্থাপনে। আমি তাই ওকে কিছুটা স্পেস ছেড়ে দিয়ে বাঁ-পাশে আরো কিছুটা দূরে এক ভাস্কর্যের দিকে হেঁটে যাই। এটির সামনে প্রচুর মানুষের জটলা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার পর জাহাজে করে নৌ সেনারা যখন নিউ ইয়র্কে ফিরে এলো, তখন তাঁরা যুদ্ধ জয়ের আনন্দে উদ্বেলিত, প্রজ্জ্বল; তাঁদেরকে এক নজর দেখতে আর ফুল ছুঁড়ে দিতে বন্দরে সমবেত হলো হাজারও নারী। সেই নৌ সেনাদের মাঝে একজন তেমনই এক যুবতীকে ঠেসে ধরে ওষ্ঠাধরে প্রগাঢ় চুম্বনের প্রলেপ এঁকে দিলো। সেই মুহূর্তটিকে ক্যামেরায় বন্দি করে নিল টাইমস ম্যাগাজিনের এক সাংবাদিক। পরে যুদ্ধ পরিসমাপ্তির যে আনন্দ, তার সমার্থক হয়ে গেল টাইমের কভার পেইজে ছাপা সেই ছবিটি। আরো পরে সেই ছবিটিকে সম্বল করেই গড়া হলো বিশাল ভাস্কর্য। নিয়ম হয়ে গেল, ভাস্কর্যটি কয়েক বছর করে আমেরিকার বিভিন্ন শহরে থাকবে। সেই ঘূর্ণনের সাথী হয়ে ভাস্কর্যটি এ-মুহূর্তে এ শহরের হারবারে। লোকে তাই হুমড়ি খেয়ে পড়েছে এর সামনে ছবি তোলার জন্যে। অনেকে আবার প্রেয়সীকে জাপটে ধরে সেই ভাস্কর্যের নাবিকের ভঙ্গিমাতেই ছবি তুলছে। পত্রবিহীন কোরাল গাছের তলে দাঁড়িয়ে যখন এসব তামাশা দেখছি, তখন হঠাৎ পেছন থেকে ভেনেসার কণ্ঠ শুনতে পাই—‘ইসনট ইট এ লাভলি স্ট্যাচু?’ আমি মাথা দোলাই। তারপর দূরের গানের দলের দিকে ইঙ্গিত করে বলি, ‘তুমি চাইলে ওদিকটায় আরো কিছু সময় কাটাতে পারো। আমি আছি এখানে।’ ‘দ্যাটস ওকে, চলো আমরা এই ট্রেইলে কিছুটা দূর হাঁটি। ওরা ওখানে বহুক্ষণ গান করবে। ফিরে আসার পথে না হয় আবার থামা যাবে।’

ডান পাশের এক ফিশ রেস্তোরাঁ থেকে তাজা মাছ ভাজার চনমনে গন্ধ ভেসে আসছে। তার সামনে খদ্দেরদের লাইন। আমরা সেটিকে পেরিয়ে আরো কিছুটা দূর হেঁটে গেলে এক কাকাতুয়া পাখিওয়ালা আমাকে হাত নেড়ে ডাকেন। তার আদরের পাখিটি নাকি আমার হাতে কিছুক্ষণের জন্যে বিশ্রাম নিতে চায়। অগত্যা সেই পাখিটিকে ডান কবজিতে আশ্রয় দিতে হলো। সেটি দেবার বিনিময়ে আমাকে খোয়াতে হলো জামার সবচেয়ে উপরের বোতামটি। সেয়ানা কাকাতুয়া কোন সময়ে যে ঠোকর দিয়ে বোতামখানি খেয়ে ফেলেছে টেরই পাইনি। দেখি, ভেনেসা খিক খিক করে হাসছে আমার দশা দেখে। আমি কিছুটা অপ্রস্তুত অবস্থায় পাখিটিকে মূল মালিকের হাওলায় ছেড়ে এসে পাশের এক দূর্বা ঘাসের জমিনে ধপ করে বসে পড়ি।

/uploads/files/rCFdf4gX5jRTfbo4jBLZ0i13EeFg9maFxDOyKxKV.jpeg
অনতিদূরে খাড়ির মাঝে বেঁধে রাখা কয়েকটি নৌকো। ঢেউয়ের আঘাতে তারা প্রবলভাবে দুলছে। আর তীরের কাছটায় নোটিশ টানিয়ে লেখা, ‘এখানে সাঁতার কাটা কিংবা মাছ ধরা নিষিদ্ধ।’ আমার থেকে একটু দূরে ঘাসের মাঝেই হঠাৎ মাথা ফুঁড়ে দাঁড়িয়ে গেছে বিশাল আরবান ট্রি। তার তলে আকাশের দিকে মুখ করে শুয়ে সুতো টেনে ঘুড়ি ওড়াচ্ছে দু যুবক-যুবতী। যেন আকাশের দিকে তুলি টেনে কিছু একটা আঁকার চেষ্টা। ভেনেসার নাকের অগ্রভাগে বিন্দু বিন্দু স্বেদ। সাগরের নীল জলের প্রতিফলন সেই বিন্দুতে সমাপতিত হয়ে সৃষ্টি করে উজ্জ্বল আলোকস্ফটিক। আমি ঘাসের ওপর শুয়ে ভেনেসার দিকে মুখ ফিরিয়ে জিজ্ঞেস করি, ‘সো দিস সিঙ্গার গাই, ইজ হি জাস্ট এ ফ্রেন্ড অফ ইওরস?’ কামরাঙার কোয়ার মতো ঠোঁটটিকে উলটে কৌতুকপূর্ণ স্বরে ও জবাব দেয়, ‘কেন তুমি কি ভেবেছিলে ও আমার নাগর?’ এ বলে ভেনেসা খলখলিয়ে হেসে ওঠে। তারপর বহু দূরের অস্পষ্ট করোনাড দ্বীপের সেতুর দিকে তাকিয়ে সেই লিড গায়ক আর ওর জীবনের কিছু যোগবিন্দুকে আমার সামনে তুলে ধরে।

ভেনেসার পরিবার ওর খুব ছোটবেলায় মেক্সিকো থেকে আমেরিকায় চলে এলেও ও রয়ে গিয়েছিল দিদার কাছে গুয়াদেলরাহা শহরে। সেই শহরের হাইস্কুলে ওর সহপাঠী ছিল এই লিড গায়ক, আলবার্তো। বলা চলে, ও ছিল আলবার্তোর হাইস্কুল সুইটহার্ট। তবে এর মাঝেই জীবন অন্য দিকে মোড় নেয়। আলবার্তোর মায়ের তখন এক অদ্ভুত মানসিক রোগ ছিল। ছেলেকে সে সহ্য করতে পারত না। কারণে-অকারণে বেধড়ক পেটাত। মায়ের অত্যাচারে অতীষ্ট হয়ে হাইস্কুলের গণ্ডি পেরুবার আগেই একদিন আলবার্তো ঘর ছেড়ে ফেরারি হয়। ওদিকে ভেনেসা এর কয়েক বছর পর মা-বাপের কাছে আমেরিকায় চলে আসে। আলবার্তো ওর জীবন থেকে বেমালুম হারিয়ে যায়। ভেনেসার জীবনও নানা চোরাগলিতে ঘুরপাক খায় এতটা বছর। তারপর এই দু বছর আগে মেক্সিকোতে নিজ শহরে বেড়াতে গিয়ে ভেনেসা যায় গির্জার রবিবাসরীয় প্রার্থনায়। সেখানে গিয়ে দেখে, যুবা বয়েসী যাজকদের একজনকে বড্ড যেন চেনা চেনা লাগে।

আলবার্তোর মায়ের পরে পাকস্থলীর ক্যান্সার ধরা পড়েছিল। কী করে যেন আলবার্তোর কানে ঠিকই পৌঁছে যায় মায়ের এই অন্তিম দশার কথা। যেই মায়ের কারণে তাঁকে ঘর ছাড়তে হয়েছিল, সেই মাকেই শেষ সময়টায় আলবার্তো প্রাণ সঁপে দিলো। কিন্তু ভদ্রমহিলা শেষতক বাঁচলেন না। জীবনের এই লুকোচুরি খেলায় শ্রান্ত হয়ে আলবার্তো শরণ নিল যীশুর। গুয়াদেলরাহার সেই সমুদ্রমুখী গির্জাতে সেভাবেই ভেনেসার সাথে আলবার্তোর পুনর্মিলন।

শৈশবের সেই কুসুম কুসুম রোমান্টিকতা এখন আর নেই। তার বদলে এখন দু জনের মাঝে যা আছে, সেটি নিখাদ বন্ধুত্বপূর্ণ মমতা। আর সেই মমতা এক সময় খুঁজে পায় সমধারা। আলবার্তো গির্জার অধীনে কাজ করছিল স্থানীয় দরিদ্র শিশুদের নিয়ে। ওদিকে প্রথম যৌবনে ঘটানো একটি গর্ভপাতের পর ভেনেসার আর কোনোদিন মা হয়ে ওঠা হয়নি। তাই পথশিশুদের নিয়ে কিছু একটা করার উদগ্র বাসনা তার মাঝেও ছিল। ভেনেসা আলবার্তোকে প্রস্তাব দেয়, এই শিশুদের জন্যে আমেরিকা থেকে কিছু অর্থ সাহায্য উত্তোলন করলে কেমন হয়? আলবার্তো তো এমনিতেই ওর সেই ভবঘুরে জীবনে গিটার বাজিয়ে পয়সা তুলত। এবারেও না হয় তেমন কিছু করুক ক’টা দিন আমেরিকায় এসে। তারপর যে টাকা পাওয়া যাবে তা নিয়ে ভেনেসা আলবার্তোর দলের সাথে পৌঁছে যাবে গুয়াদেলরাহায়। ওখানে বাচ্চাদের জন্যে খেলনা কেনা হবে। স্থানীয় এক জুতোর দোকানদার বলেছেন, বিনা মূল্যে তিনি কিছু জুতোর বাক্স দেবেন। তারপর সেই বাক্সে খেলনা ভরে বিলানো হবে শহরের প্রায় কয়েকশো দরিদ্র শিশুর মাঝে।

/uploads/files/E9MegAiKnkSqvFEYywFIyrMhu0yMzyRtZpHqAaP2.jpeg
ভেনেসার বয়ানটি শেষ হলে আমি আকাশে উড়তে থাকা বাহারি ঘুড়িগুলোর দিকে তাকাই। সেই মুহূর্তে একটি ঘুড়ি আরেকটির হাতে ধরাশায়ী হয়ে সুতো ছিঁড়ে উড়ে যাচ্ছে দূর সমুদ্রের দিকে। তবে সেটিকে কেউ তাড়া করছে না। বরং ঘাসের চাদরে শুয়ে থাকা ঘুড়ির মালিক বেশ আমোদ নিয়ে দৃশ্যটি দেখছেন। পাশেই রোদ চশমা পরে পা ভাঁজ করে বসে থাকা প্রেয়সী কিছুটা যেন সরে আসে তার দিকে। তারপর ভালোবাসা অনিবার্য পথ খুঁজে নেয় তাঁদের দ্বৈত ওষ্ঠাধরে।

স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক



তৌফিক হাসান, কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তা২৪.কম
স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক

স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক

  • Font increase
  • Font Decrease

আমেরিকা ভ্রমণে বাঙালির অন্যতম গন্তব্যের একটি হচ্ছে স্ট্যাচু অব লিবার্টি। স্ট্যাচু অব লিবার্টির সামনে দাঁড়িয়ে একটা ছবি না উঠলে যেন আমেরিকাপূর্ণই হবে না! আমেরিকার গর্বের সিম্বলিক আইকন হচ্ছে এই স্ট্যাচু অব লিবার্টি। ভাস্কর্যটি আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক। তাই বাংলাদেশ থেকে রওনা হবার আগেই গন্তব্য হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছিল নিউইয়র্কের স্ট্যাচু অব লিবার্টি।

পরিকল্পনা ছিল আমার স্ত্রীর এবং তার ছোট বোনের পরিবারের সকলে মিলে একসাথে স্ট্যাচু অফ লিবার্টি দেখতে যাব। কিন্তু ভায়রা ভাইয়ের বিশেষ কাজ পরে যাওয়ায় সিদ্ধান্ত হলো তার এক বন্ধু নীলফামারীর জিএম ভাই আমাদের ড্রাইভ করে নিয়ে যাবে নিউইয়র্কে। যাত্রার দিন ঘড়ির কাটা মেপে জিএম ভাই হাজির, রেডি হয়েই ছিলাম তাই ঝটপট বেরিয়ে পরলাম। পেনসিলভেনিয়ার লেভিট্টাউনে তখন সকাল ৮টা বাজে, বাসা থেকে বের হবার সাথে সাথেই সূর্য মামার ঝাঁজ বুঝতে পারলাম। সূর্য এমন তেতেছে দিনটা যে খুব একটা সুখকর হচ্ছে না তা বেশ বুঝতে পারলাম। বিগত কয়েক বছরের তুলনায় এবারের গ্রীষ্মে বেশি গরম অনুভূত হচ্ছে আমেরিকাতে। স্থানীয়দের মতে এরকম গরম বিগত কয়েক বছরে তারা দেখতে পায়নি। শুধু আমেরিকাতে নয়, এই বছর ইউরোপেও বেশ গরম অনুভূত হচ্ছে আর আমাদের দেশের কথা না হয় নাই বললাম।

লিবার্টি আইল্যান্ড

গাড়ির চাকা সচল আবার কিছুক্ষণ পরেই আমরা আই-৯৫ হাইওয়েতে গিয়ে পড়লাম, এই এক রাস্তা ধরেই প্রায় দুই থেকে আড়াই ঘণ্টায় আমরা পৌঁছে যাবো নিউইয়র্কের ম্যানহাটানে। ৫৫ মাইল বেগে ছুটে চলছে আমাদের গাড়ি আর ঠান্ডা হাওয়ায় বসে আমরা গান শুনছি। হঠাৎ ড্যাশবোর্ডে চোখ পড়তেই খানিকটা আঁতকে ওঠার মতো অবস্থা হলো। কারণ সেখানে উইন্ড স্ক্রিনের তাপমাত্রা দেখাচ্ছে ১০০ ডিগ্রী ফারেনহাইট। কপালে ভোগ আছে তা পরিষ্কার হয়ে গেল। চলতে চলতে প্রায় ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই আমরা নিউইয়র্কের ম্যানহাটান এলাকার ব্যাটারি পার্কে পৌঁছে গেলাম, এখান থেকেই যেতে হবে লিবার্টি আইল্যান্ডে। এবার পার্কিং এর জায়গা খোঁজার পালা। নিউইয়র্কে গাড়ি পার্কিং করা বেশ ঝামেলার তার মধ্যে আমরা গিয়েছে ফোর্ডের ট্রানজিট নামের বেশ বড়সড় একটি ভ্যান। যত প্রাইভেট পার্কিংয়েই যাচ্ছি সবাই না করে দিচ্ছে যে এত বড় ভ্যানের জন্য কোন জায়গা খালি নেই। কোথায় গেলে পেতে পারি সেই হদিসও কেউ দিতে পারছে না দেখে মেজাজ কিঞ্চিৎ খারাপ হতে শুরু করলো। অবশেষে প্রায় ঘণ্টাখানেক পরে আমরা এক পার্কিং খুঁজে পেলাম। গাড়ি পার্ক করেই ছুটলাম ফেরি টার্মিনালের দিকে। জনপ্রতি ২৩ ডলার করে অনলাইনে টিকিট করাই ছিল।  ওই টিকিটে ভাস্কর্যটির উপরে উঠা এবং এলিস আইল্যান্ড ভ্রমণ অন্তর্ভুক্ত।

 

লিবার্টি আইল্যান্ডে যাবার ফেরি

গ্রীষ্মকালে স্ট্যাচু অব লিবার্টিতে প্রচুর পর্যটক যায়। আপনি যদি অনলাইনে টিকিট না করে যান তাহলে ব্যাটারি পার্ক ফেরি টার্মিনালে যে টিকিট কাউন্টার আছে সেখানেও করতে পারবেন কিন্তু ঘণ্টাখানেক লাইনে দাঁড়াতে হতে পারে। আমাদের যেহেতু অনলাইন টিকিট কাটা ছিল তাই আমরা সরাসরি ফেরি টার্মিনাল চলে যাই। মোটামুটি এয়ারপোর্ট গ্রেড সিকিউরিটি সম্পন্ন করে জ্যাকেট, জুতা, ব্যাগ, বেল্ট এবং ওয়ালেট সবকিছু স্ক্যান করিয়ে ফেরিতে উঠার অনুমতি মেলে। ফেরিতে উঠিই তড়িঘড়ি করে ছাদে চলে যাই ভালো ভিউ পাবার জন্য। তবে রোদের তীব্রতায় সেখানে বেশ কষ্ট হচ্ছিল, বিশেষ করে বাচ্চাদের। ফেরি ছাড়ার পর খানিকটা আরাম বোধ হলো বাতাস শুরু হয় বলে। ফেরি ছাড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা পৌঁছে যাই লিবার্টি আইল্যান্ডে বা স্ট্যাচু অব লিবার্টির বাড়িতে। এই ভাস্কর্যটি আমেরিকার আইকনিক সিম্বল হলেও এটা কিন্তু আমেরিকানরা তৈরি করেনি। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ জয়ে আমেরিকানদের বিশেষভাবে সাহায্য করেছিল ফ্রান্স। আমেরিকার স্বাধীনতা অর্জনের ১০০ বছর পূর্তিতে দুই দেশের বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে, ১৮৮৬ সালে ফ্রান্সের জনগণের পক্ষ থেকে ভাস্কর্যটি আমেরিকাকে উপহার দেয়া হয়। ফ্রান্সে পুরোপুরি তৈরি করার পর বিশাল এই ভাস্কর্যটি খুলে ২০০টি বাক্সে ভরে জাহাজে করে আমেরিকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

লিবার্টি আইল্যান্ড জেটি

১৯২৪ সাল পর্যন্ত ভাস্কর্যটির নাম ছিল লিবার্টি এনলাইটেনিং দ্য ওয়াল্ড, পরবর্তীতে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় স্ট্যাচু অব লিবার্টি। ১৫১ ফুট ১ ইঞ্চি উচ্চতার ভাস্কর্যটির ডান হাতে রয়েছে প্রজ্জলিত মশাল এবং বাম হাতে রয়েছে আইনের বই। স্ট্যাচু অব লিবাটির মাথার মুকুটে রয়েছে সাতটি কাটা, যা সাত মহাদেশ এবং সাত সমুদ্র কে নিদের্শ করে। মাটি থেকে মূল বেদি সহ এর উচ্চতা ৩০৫ ফুট ১ ইঞ্চি। ভাস্কর্যটির নাকের র্দৈঘ্য ৬ ফুট ৬ ইঞ্চি এবং এর এক কান থেকে আরেক কানের দূরত্ব ১০ ফুট। মূর্তিটির ওজন প্রায় আড়াই লক্ষ কেজি। ভাস্কর্যটির পায়ের কাছে পরে থাকা শেকল আমেরিকার মুক্তির প্রতীক। স্ট্যাচু অব লিবার্টির ভেতরে দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে একেবারে মাথায় ওঠা যায়। ভাস্কর্যটির মুকুটে রয়েছে ২৫ টি জানালা, যা অনেকটাই ওয়াচ টাওয়ার হিসেবে কাজ করে।

মজার ব্যাপার হলো যে স্ট্যাচু অফ লিবার্টির ছবি দেখলেই সবাই আমেরিকা ঠাওর করতে পারে সেটা কিন্তু আসলে আমেরিকার কথা ভেবে তৈরি করা হয়নি।ফরাসি ভাস্কর ফ্রেডেরিক অগাস্ট বার্থোল্ডি এটির রূপকার। রোমান দেবী লিবার্টাসের আদলেবার্থোল্ডি এই বিশ্বখ্যাত ভাস্কর্য টিডিজাইন করেছিলেন তবে মুখমন্ডলটি ডিজাইনে তার মায়ের মুখের প্রভাব আছে বলে জানা যায়। ভাস্কর্যটির ভিতরের কাঠামো ডিজাইন করতে তিনি বিখ্যাত গুস্তাভ আইফেলের সাহায্য নিয়েছিলেন। গুস্তাভ আইফেল কিন্তু ফ্রান্সের আইকন আইফেল টাওয়ারের রূপকার।

স্ট্যাচু অব লিবার্টি

প্রাথমিকভাবে বার্থোল্ডি ঠিক করেছিলেন তার এই স্বপ্নের শিল্পকর্মকে তিনি সুয়েজ খালের তীরে স্থাপন করবেন এবং সেই মোতাবেক সুয়েজ কর্তৃপক্ষ ও মিশর সকারের সাথে আলোচনার পর ঠিক হলো সুয়েজ খালের তীরেই স্থাপন করা হবে এই ভাস্কর্যটিকে, নামও ঠিক করা হলো 'ইজিপ্ট ব্রিঙিং লাইট টু এশিয়া'। পরবর্তীতে নানা জটিলতায় ভাস্কর্যটি মিশরে স্থাপন না করা গেলে বার্থোল্ডি আমেরিকায় আসেন তার শিল্পকর্মটির একটা হিল্লে করতে।

শুরুর দিকে আমেরিকাবাসীরাও খুব একটা আগ্রহ দেখাননি এই ভাস্কর্য নিয়ে। তবে অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের পর শেষ পর্যন্ত ভাস্কর্যটি স্থাপন করা হয় যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান শহর ও একদার রাজধানী নিউইয়র্কের হাডসন নদীর মুখে লিবার্টি আইল্যান্ডে। আমরা সেই আইল্যান্ডে পৌঁছে ফেরি থেকে নেমেই সারিবদ্ধ ভাবে এগোতে থাকলাম ভাস্কর্য পানে। কাছে গিয়ে ভাল করে দেখতে লাগলাম বিশ্বখ্যাত সেই ভাস্কর্য। ভাস্কর্যটি তামায় তৈরি হলেও বর্তমানে এর গায়ের রঙ বর্তমানে সবুজ আকার ধারণ করেছে। সময়ের আবর্তে  আটলান্টিক মহাসাগরের নোনা জলের ওপর দিয়ে ভেসে আসা বাতাসের সাথে বিক্রিয়ার ফলে তামার বহিরাবরণের এই সবুজ সাজ। ভাস্কর্য চত্বর ভাল করে ঘুরে, মুর্তিটিকে ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে কিছু ছবি তুলে হাঁটা দিলাম এটির মাথার যাবার জন্য। আবারও সিকিউরিটি চেক করাতে হলো। বয়স্ক এবং অপারগ মানুষের জন্য লিফটের ব্যবস্থা আছে সেখানে তবে আমরা সিঁড়ি বেয়েই উঠতে লাগলাম। প্রায় ১০ তলা সমান উঁচু প্যাডেস্টালে পৌঁছার পর আমাদের থামতে হলো কারণ কোভিডের কারণে একদম মাথা পর্যন্ত উঠা বন্ধ আছে যদিও মাথার মুকুট পর্যন্ত উঠার জন্য টিকিট কাটা ছিল আমাদের।

প্যাডেস্টালের ওপর থেকেই মূল ভাস্কর্যের শুরু। সেখান থেকে ভাস্কর্যটির ভিতর দিয়ে উঠতে যাওয়াটা খানিকটা কঠিনই বলা চলে কারণ এর থেকে উপরের দিকে উঠতে হলে বেশচাপা প্যাঁচানো প্যাঁচানো খাড়াসিঁড়ি বাইতে হবে। উপর যাওয়া বারণ বিধায় নিচ থেকে তাকিয়ে উপরের দিকে দেখলাম। গ্লাস লাগানো থাকাতে মোটামুটি অনেকটা অংশ দেখা যায়। প্যাডেস্টালে কর্মরত সিকিউরিটি অফিসার খানিকাটা ব্রিফিং দিলেন এবং বললেন যে এই ভাস্কর্যের ভিতরের কাঠামোর সঙ্গে আইফেল টাওয়ারের খানিকটা মিল আছে। দেখিয়ে দিলেন কোন কর্নার থেকে দেখলে আইফেল টাওয়ারের মতো মনে হবে। প্যারিসের আইফেল টাওয়ার কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে আমার। তাই সিকিউরিটি অফিসারের দেখিয়ে দেয়া অংশ দিয়ে তাকিয়ে ভিতরের কাঠামোর সাথে আইফেল টাওয়ারের বেশ সাদৃশ্য পেলাম।

মূল ভাস্কর্যের ভিতরের কাঠামো

প্যাডেস্টালে বা ভাস্কর্যের পাদদেশে খানিকক্ষণ সময় কাটিয়ে ছবি-টবি তুলে নামার পথ ধরলাম।সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে আমার স্ত্রীর তেষ্টা পেয়ে গেল। নিচে নামার পর পানি খাবে না লেমনেড খাবে জিজ্ঞেস করাতে সে বলল লেমনেড খাবে। অগত্যা লেমনেড তথা খাস বাংলায় লেবুর শরবত অর্ডার করলাম। প্লাস্টিক গ্লাসে অর্ধেক বরফের উপর আধখানা ফ্রেস লেবু, দুই চামচ চিনি আর পানি এই হলো লেমনেড। আমাদের মোট ১১ জনের জন্য বিল আসলো ১৮৬ ডলার। এমনিতেই ভীষণ গরম তার উপর লেবু পানির বিল দেখে গায়ের জ্বালা আরও বেড়ে গেল। নিজেকে আর ধরে রাখতে না পেরে স্ত্রীকে বলেই ফেললাম বাংলাদেশ তোমাকে কখনো লেবুর শরবত খেতে দেখিনি আর এখানে এসে তুমি ১৮৬ ডলার নামিয়ে দিলে। বউ মুখে কিছু না বলে আমার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে থাকলো যেন আমার থেকে বড় কিপ্টে সে জীবনেও দেখেনি। শ্যালিকা আমার পাশে ছিল বলেই সেই যাত্রা রক্ষা পেলাম।

লিবার্টি আইল্যান্ড ঘোরা শেষ, মিউজিয়াম না দেখেই ফেরির পথ ধরলাম কারণ আমাদের পরের গন্তব্য এলিস আইল্যান্ড। ফেরিরে উঠার সময় কাঠের পাটাতনের বাহিরের দিকে স্টিল স্ট্রাকচারের গর্তে প্রচুর কয়েন দেখতে পেলাম। ইউরোপিয়ান-আমেরিকানরা এরকম হাজারো কয়েন প্রতিবছর নানা ধরনের মনোবাসনা নিয়ে পানিতে ছুঁড়ে মারে। এখনেও হয়তো তেমনি কিছু হয়েছে, কিছু অংশ গিয়ে সাগরে পরেছে বাকিটা পল্টুনের স্টিল স্ট্রাকচারের গ্যাপে আটকে গিয়েছে।

ফেরিতে উঠেই আবারো ছাদে চলে গেলাম, সমান্য পরেই চলে আসলাম এলিস আইল্যান্ডে। এলিস আইল্যান্ড একসময় একসময় ছিল অভিবাসীদের  ইমিগ্রেশন সেন্টার। এখানে ইমিগ্রেশন শেষ করে তারা আমেরিকার বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়তো। ১৮৯২ সাল থেকে ১৯৫৪ সালে বন্ধ হয়ে যাবার আগ পর্যন্ত ৬০ বছরে প্রায় ১২ মিলিয়ন অভিবাসীর ইমিগ্রেশন হয়েছিল এই আইল্যান্ডে। অনুমান করা যায় যে বর্তমান মার্কিন নাগরিকদের প্রায় ৪০ শতাংশের পূর্বপুরুষদের মধ্যে কেউ না কেউ এই দ্বীপের মাধ্যমে আমেরিকাতে অভিবাসিত হয়েছিল।

এলিস আইল্যান্ড ইমিগ্রেশন রেজিস্ট্রেশন হল

ইমিগ্রেশন সেন্টারটিকে বর্তমানে স্মৃতিশালা হিসেবে বেশ সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা হয়েছে। ইমিগ্রেশন হল, লাগেজ রুম সহ পুরো ইমারতটি ভাল করে ঘুরে দেখলাম। প্রচুর পিক্টোরিয়াল ডিসপ্লে আছে যেগুলো পড়তে গেলে অনেক সময়ের দরকার। বিল্ডিঙে দুই ফ্লোরে দুটো থিয়েটারও আছে পুরো ইতিহাসের উপর মুভি দেখানোর জন্য। আমাদের সময় কম থাকাতে মুভি না দেখেই ফিরতে শুরু করলাম কারণ ততক্ষণে দিনের আলো কমতে শুরু করেছে।

;

ধারাবাহিক উপন্যাস ‘রংধনু’-২



মাহফুজ পারভেজ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

[দ্বিতীয় কিস্তি]

মেয়ের ব্রোকেন ফ্যামিলির বেহাল দশার খবর জেনে একদিন ম্যারির মা এসে হাজির। যথেষ্ট বৃদ্ধ হলেও মিসেস অ্যানি গিলবার্ট, ম্যারির মা, এখনো বেশ শক্তপোক্ত ও কর্মঠ। মা আসায় বাড়িটি কিছুটা প্রাণ পেলো। মেয়ে আর নাতীকে নিয়ে মিসেস অ্যানি গিলবার্ট চারপাশে আনন্দময় একটি পরিবেশ গড়ে তুললেন। তারপর কিছুদিনের মধ্যেই তিনি রুদ্রমূর্তি ধারণ করলেন। ক্রুসেড ঘোষণার মতো তিনি বাড়ি থেকে ক্যাভিনের যাবতীয় স্মৃতি মুছে ফেলতে লাগলেন। তার পরিত্যক্ত জামা-কাপড়, বইপত্র, এমনকি দেয়ালে ঝুলানো একটি হাস্যোজ্জ্বল ছবিও মিসেস অ্যানি গিলবার্টের ক্ষোভ থেকে রেহাই পেলো না। তিনি সময় পেলেই গজগজ করে ক্যাভিনকে অভিসম্পাত করেন এবং তার মেয়ের সকল দুর্গতির জন্য তাকে আসামী করে অভিযোগ করতে থাকেন। মিসেস অ্যানি গিলবার্টের চোখে পৃথিবীর একমাত্র মন্দ লোক এবং তাদের চরম শত্রু ক্যাভিন।

ক্যাভিনের প্রতি মায়ের প্রচণ্ড ক্ষোভের কোনো প্রতিক্রিয়া জানান না ম্যারি। ক্যাভিন সম্পর্কে কোনো কিছু জানতে চাইলেও উত্তর দেন না। ক্যাভিনের প্রসঙ্গ এলেই ম্যারি নিশ্চুপ থাকেন। যদিও ক্যাভিনের পক্ষে বলার মতো কোনো যুক্তি কিংবা বাস্তবতা তার কাছে নেই। আবার ওর বিরুদ্ধে কিছু বলতেও ম্যারির মন সায় দেয় না। চুপচাপ ম্যারি ভাবেন, “সব কিছু মুছে ফেললে কিংবা সব জিনিস ফেলে দিলেই স্মৃতিরা হারিয়ে যাবে? স্মৃতি তো বস্তুগত বিষয় নয়। সত্ত্বার সঙ্গে মিশে থাকা স্মৃতি সহজে হারায় না।”

মিসেস অ্যানি গিলবার্ট কিছুদিনের মধ্যেই পুরো বাড়ি থেকে ক্যাভিনের অস্তিত্ব সাফ করে দিলেন। ক্যাভিন নামে একজন এই বাড়ির বাসিন্দা ছিল, এমন কোনো চিহ্নই আর রইল না। এখানেই থেমে থাকলেন না তিনি। পাড়ায়, বাজারে, যখন যেখানে যান, সেখানেই ক্যাভিনের একটি নিগেটিভ ইমেজ তৈরিতে ব্যস্ত হলেন। মিসেস অ্যানি গিলবার্ট আসলে খুব নেতিবাচক ও পরচর্চ্চাকারী মানুষ নন। কিন্তু তিনি বিশ্বাস করেন, মেয়ের জীবন থেকে চলে যাওয়া ক্যাভিনের স্মৃতিগুলো ওর মন থেকে মুছে ফেলনে নতুন একটা পরিবেশ তৈরি হবে। ম্যারি হয়ত নতুন জীবনও শুরু করতে পারবে। তিনি মেয়ের জন্য গোপনে যুৎসই পাত্র খুঁজতেও তৎপর হলেন। মা হিসেবে এসব কাজকে তিনি তার দায়িত্ব মনে করেন।

মিসেস অ্যানি গিলবার্টকে দোষ দেওয়া যায় না। কন্যার স্বার্থচিন্তায় সব মায়েরাই এমন করেন। তিনি কোনো ষড়যন্ত্র বা গোপন লুকোছাপার আশ্রয় নেন নি, সব কিছু প্রকাশ্যেই করছেন। ম্যারিকেও তিনি পরিস্কার জানিয়ে দিয়েছেন, “তোমাকে এভাবে একাকী ও নিঃসঙ্গভাবে কাটাতে আমি দেবো না। আমার জীবনে তুমি আর তোমার ভাই পিটার ছাড়া কেউ নেই। পিটার ফিলাডেলফিয়ায় চাকরি নিয়ে বেশ আছে। ওকে নিয়ে চিন্তা নেই। তোমার ছেলে টমাসকে নিয়ে আমি থাকবো আর তুমি নতুন করে জীবন শুরু করবে।”

মায়ের দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে পরিকল্পনাগুলো শুনেন ম্যারি। তিনি স্পষ্ট ভাষায় সম্মতি কিংবা অসম্মতি জানান না। তিনি জানেন, বিধবা মায়ের সঙ্গে তর্ক অর্থহীন। তিনি এসেছেন সাহার্য্য করতে। তাকে মোটেও বিমুখ করা যাবে না। তর্ক-বিতর্ক করে পরিবেশ বিষিয়ে লাভ নেই। বরং চুপ থাকলে এক সময় মা হাল ছেড়ে দেবেন।

কিন্তু মিসেস অ্যানি গিলবার্ট কঠিন প্রকৃতির মানুষ। সহজে হাল ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নন মোটেই। তিনি চা কিংবা কফি পানের জন্য চেনাজানা তরুণদের বাসায় আমন্ত্রণ জানাতে শুরু করেন। ভদ্রতা স্বরূপ ম্যারিকে তাদের সঙ্গ দিতে হয়। তবে নতুন জীবন শুরুর প্রসঙ্গ এলেই ম্যারি প্রসঙ্গান্তরে কিংবা আলোচনা থেকে কোনো উছিলায় সন্তর্পণে সরে আসেন।

বিরক্ত মিসেস অ্যানি গিলবার্ট এক সময় মেয়ের কাছে সোজাসুজি জানতে চান,

“তোমার আসল পরিকল্পনা আমাকে বলো? মধ্য ত্রিশ বয়সের একজন নারী হিসেবে বাকী জীবন একা থাকা তোমার পক্ষে দুরূহ।”

“আমি জানি। কিন্তু এখনই নতুন করে আবার জীবন শুরুর ব্যাপারে আমি মনস্থির করতে পারি নি। আমাকে কিছু সময় দাও।”

এরপর আর কথা চলে না। মিসেস অ্যানি গিলবার্ট চুপ করে ঘরের কাজে মন দেন। তার সন্দেহ হয়, তবে কি ক্যাভিন গোপনে এখনো যোগাযোগ রাখছে? কৌশলে নানা রকমের তদন্ত করে তিনি শঙ্কামুক্ত হন। না, ক্যাভিনের বিন্দুমাত্র সন্ধান এই তল্লাটের কেউ জানে না। ম্যারির সঙ্গেও সামান্যতম যোগাযোগ নেই বেচারার। তাহলে ম্যারি এমন করছে কেন? কেন তার সিদ্ধান্তহীনতা? মিসেস অ্যানি গিলবার্ট এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে মেয়ের আচরণ ও চাল-চলনের দিকে বিশেষ মনোযোগী হন।

প্রথম প্রথম মিসেস অ্যানি গিলবার্ট কিছুই টের পান নি। তার গভীর ঘুমের বাতিক। একবার ঘুমালে কিছুই টের পান না তিনি। একরাতের মধ্য প্রহরে ঘুম ভেঙে দেখেন ম্যারি ঘরে নেই। টমাস একাকী ঘুমাচ্ছে বিছানায়। বাথরুম থেকেও কোনো শব্দ আসছে না। চিন্তিত মিসেস অ্যানি গিলবার্ট অবশেষে ম্যারির দেখা পেলেন বাগানে পাইন গাছের নিচে। জানালা দিয়ে অন্ধকারে ডুবে থাকা চরাচরে ঈষৎ আলোর ঝলকানির মতো ম্যারিকে দেখা যাচ্ছে। ম্যারির কফি রঙা খয়েরি চুল কালো বাতাসে অনামা রঙের আদলে অদ্ভুত শিহরণে দুলছে।

পর পর কয়েক রাত ঘাপটি মেরে মিসেস অ্যানি গিলবার্ট মেয়ের গতিবিধি অনুসন্ধান করেন। অবশেষে তিনি নিশ্চিত হন যে, রাতের নিস্তব্ধতাকে খানখান করে দিয়ে বাড়ির দেওয়ালঘড়ি মধ্যরাত্রির জানান দিলে ম্যারি বিছানা ছেড়ে দেয়। ঠিক বারোটায় চকিতে উঠে দাঁড়ায় ম্যারি। তারপর ধীর পায়ে পৌঁছে যায় বাগানে। খানিক পায়চারী পর স্থির হয় পাইনের তলে।

আরও পড়ুন: ধারাবাহিক উপন্যাস 'রংধনু'-১

মিসেস অ্যানি গিলবার্টের স্মরণ শক্তি বেশ। তাই তিনি খুবই হতবাক হন ম্যারি মধ্যরাতের অদ্ভুত অভ্যাসের কারণে। কারণ, তিনি বিলক্ষণ জানেন, ম্যারি ছোটবেলা থেকেই ভীষণ ভাবে ভূত বিশ্বাস করে। গ্রামের দিকে তো বটেই, খাস শহরেও সন্ধ্যার পর ঘরের বাইরে বের হতে ভয় পেতো তার মেয়ে। তাদের এই ক্যাম্পাস সিটির আবাসকে নামেমাত্র শহর বললেও আসলে এটি এক প্রত্যন্ত গ্রাম। সুনির্দিষ্টভাবে একে গ্রাম বলাও ভুল হবে। শহর পেরিয়ে পাহাড়তলির ওপর ইতস্তত ছড়িয়ে থাকা কয়েকটা কাঠের বাড়ির একটি আবাসিক ব্লক আর চারপাশে সীমাহীন বন-জঙ্গল। সাঁঝবেলাতেই নিঝুম রাত নেমে আসে জায়গাটিতে। এখানে তার নিজেরও কেমন একটা ভয়-ভয় করে। অথচ তার ভীতু মেয়েটি দ্বিধাহীন পদক্ষেপে দিব্যি মাঝরাতে বাগানে ঘুরছে?

পরদিন নাস্তার টেবিলে ম্যারিকে চেপে ধরেন মিসেস অ্যানি গিলবার্ট।

“ওতো রাতে বাগানে তোমার কি কাজ থাকে?”

ম্যারি প্রশ্ন শুনেও খানিক চমকিত হলেও নির্বিকার থাকেন। তার অভিব্যক্তিতে মনে হয়, ঘটনাটি যেন অতি স্বাভাবিক বিষয়। এতে অবাক হওয়া বা প্রশ্ন করার মতো কিছু নেই। মায়ের কৌতূহল নিবৃত্ত করতে তিনি সংক্ষিপ্ত উত্তর দেন,

“আমি পাইন গাছের সান্নিধ্যে যাই।”

“পাইন গাছের কাছে? কেন? তা-ও এতো রাতের বেলা?”

“কারণ আমি খুবই একেলা। পাইন গাছের মতো একাকী।”

মিসেস অ্যানি গিলবার্টের চোখে বিস্ময়। তার মুখ লা-জওয়াব। মেয়ের এমন কথার কি উত্তর দেবেন তিনি জানেন না। এরকম কথা কখনো কারো কাছে শুনেছেন বলে তিনি মনে করতে পারেন না। সম্বিৎ হারানোর মতো অবস্থা হলেও মিসেস অ্যানি নিজেকে সামলে নিয়ে মেয়ের সঙ্গে আলাপ জারি রাখেন।

“সব মানুষই কম-বেশি একাকী। পাইনের মতো একেলা হওয়ার কি আছে?”

“আমি আসলেই পাইনের মতো একেলা। না পারছি কাউকে ছায়া দিতে। না পারছি ঝড়-বাদল-দুর্যোগ সামাল দিতে। রাত হলে আমি আমার দোসর পাইনের কাছে চলে যাই নিঃসঙ্গতা কাটাতে।”

মিসেস ম্যারি আর কোনো কথা বলতে পারেন না। তার চোখ ছলছল করছে। তিনি ঘরের অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে মেয়ের কাছ থেকে নিজেকে আড়াল করেন।

[পরবর্তী কিস্তি আগামী শুক্রবার]

;

আমেরিকার স্বাধীনতার প্রতীক লিবার্টি বেল



তৌফিক হাসান, কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তা২৪
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

পেনসিলভেনিয়াকে বলা হয় আমেরিকার জন্মস্থান। পেনসিলভানিয়া একসময় একটি বৃটিশ উপনিবেশ ছিল এবং এরকম মোট ১৩টি বৃটিশ উপনিবেশ মিলেই তৈরি হয়েছে আজকের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা আমেরিকা। ১৪৯২ খ্রিষ্টাব্দে ক্রিস্টোফার কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে আমেরিকায় ইউরোপিয়ান সাম্রাজ্যবাদীদের বাণিজ্যিক ও সামরিক সম্পর্ক শুরু হয়। যদিও ভাইকিংসরা কলম্বাসের অনেক অনেক আগেই আমেরিকায় পৌঁছেছিল কিন্তু কলম্বাসের পদার্পণের পরেই এই মহাদেশ ইউরোপিয়ানদের আকর্ষিত করে এবং এক সময় ইংরেজদের দখলে চলে যায় আজকের এই আমেরিকা। ১৭৭৬ খ্রিষ্টাব্দের ৪ জুলাই উত্তর আমেরিকার ১৩টি উপনিবেশের প্রতিনিধি পেনসিলভানিয়ার ফিলাডেলফিয়ায় সম্মেলনে আয়োজন করে আনুষ্ঠানিকভাবে ইংরেজদের থেকে ‘স্বাধীনতা ঘোষণা’ করেন।

ইনডিপেন্ডেন্স হল

আজকের আমেরিকা প্রতিষ্ঠার বিপ্লবে পেনসিলভানিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। প্রথম ও দ্বিতীয় মহাদেশীয় কংগ্রেস আহবান করা হয়েছিল পেনসিলভেনিয়ার অন্যতম জনবহুল শহর ফিলাডেলফিয়াতে। ফিলাডেলফিয়ার তৎকালীন স্টেট হাউজে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র লেখা ও স্বাক্ষরিত হয় যা বর্তমানের ইন্ডিপেন্ডেন্স হল নামে পরিচিত । ১৭৫৩ খ্রিষ্টাব্দে স্টেট হাউজে স্থাপন করা হয় এক প্রকান্ড বেল বা ঘণ্টা। বেলটি কেবল বিশেষ বিশেষ মুহূর্তেই বাজানো হত। সেই বেল বা ঘণ্টাটি বাজিয়ে আইন প্রনেতারা তাদের মিটিং ডাকতেন এবং শহরের লোকজনকে একসঙ্গে জড়ো করতেন তাদের ঘোষণা বা নির্দেশনা শোনানোর জন্য। পরবর্তিতে ১৮৩৯ খ্রিষ্টাব্দে সেই ঘণ্টাই লিবার্টি বেল হিসেবে স্বীকৃত হয়। বেলটি লন্ডনের হোয়াইটচ্যাপেল বেল ফাউন্ড্রি দ্বারা তৈরি করা হয়েছিল। সেই সময়ে প্রায় ১০০ পাউন্ডে কেনা হয়েছিল এবং ১৭৫২ খ্রিষ্টাব্দের আগস্ট মাসে আমেরিকার ফিলাডেলফিয়া শহরে ডেলিভারি করা হয়েছিল। লিবার্টি বেলের ওজন প্রায় ২০৮০ পাউন্ড বা ৯৪৩ কেজি। বেলের নিচের অংশের পরিধি ১২ ফুট এবং উপরের দিকে মুকুটের পরিধি ৩ ফুট। আমেরিকাতে আনার পর বেলটি প্রথমবার পরীক্ষামূলক বাজানোর সময়ই ফেটে যায়, স্থানীয় কারিগর মিঃ জন পাস এবং মিঃ জন স্টো ঘণ্টাটি গলিয়ে আবার নতুন করে তৈরি করেছিলেন।

লিবার্টি বেল

পেনসিলভানিয়া পৌঁছেই আমরা পরিকল্পনা করলাম প্রথমেই আমেরিকার স্বাধীনতার সূতিকাগার ইনডিপেন্ডেস হল এবং লিবার্টি বেল দেখতে যাবো। আমেরিকাতে গিয়ে আমরা উঠেছিলাম ভায়রা ভাই আহমেদ মাহিয়ান মিথুনের বাসায়, খুব সুন্দর ৩ তলা বিশিষ্ট ইনডিভিজুয়াল হাউজ সাথে বিশাল ব্যাকইয়ার্ড। ব্যাকইয়ার্ডের সবুজ ঘাস যেন তুলতুলে কার্পেট, আমার ছোট মেয়ের দারুন পছন্দ হলো তার খালামনির বাসা। এবারের আমেরিকা যাত্রা কিছুটা আমার ছোট মেয়ের ইচ্ছেতেই হয়েছে, ৫ বছর বয়সে সে বাবার থেকে বড় ট্রাভেলার হয়েছে। কয়েকদিন পর পর কান্নাজুড়ে দিত আমেরিকা যাবে বলে, তাই হয়তো আমেরিকা যেতে পেরে তার খালামনির বড়সড় বাড়িতে লাফাতে-ঝাঁপাতে পেরে সে মহাখুশি। ঢাকাতে আমাদের  ছোট্ট ফ্লাটে বাচ্চাদের লাফঝাঁপের সুযোগ একেবারে নেই। যেদিন আমেরিকা পৌঁছলাম তার পরেরদিন বরিশালের এক ছোটভাই পলাশ আমাদের সবাইকে গাড়িতে করে নিয়ে গেল ৫২৬ মার্কেট স্ট্রিটের ইনডিপেন্ডেন্স হল এরিয়াতে, লক্ষ্য লিবার্টি বেল দেখা!

লিবার্টি বেল

লিবার্টি বেল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার একটি প্রতীক। অনেকেই বলেন ৪ জুলাই ১৭৭৬ তারিখে, মহাদেশীয় কংগ্রেসের স্বাধীনতার ঘোষণা গ্রহণের সংকেত দেওয়ার জন্য ঘণ্টা বাজানো হয়েছিল আসলে তা সঠিক নয়। প্রকৃত ইতিহাস হলো তার ৪ দিন পরে ৮ জুলাই স্বাধীনতা ঘোষণাপত্র পাঠ উদযাপনের জন্য বাজানো হয়েছিল। বেলটি ১৮৪৬ সালে জর্জ ওয়াশিংটনের জন্মদিন উদযাপন করার জন্য বাজানোর সময় এমনভাবে ফেটে যায় যা ঠিক করা সম্ভব হয়নি।

১৭৭৬ সালে আমেরিকার স্বাধীনতা ঘোষণা হলেও বৃটিশদের সাথে খণ্ড খণ্ড যুদ্ধ চলে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত। যুদ্ধ চলাকালে ১৯৭৭ সালে অতিরিক্ত শক্তি সঞ্চয় করে ব্রিটিশ বাহিনী যখন ফিলাডেলফিয়ায় প্রবেশ করে, তখন কিন্তু এই বেলটি পেনসিলভানিয়ার অ্যালেনটাউন গির্জায় লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৮৩৫ সালে আবার এটিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় ইন্ডিপেন্ডেন্স হলে। ২০০৩ সালে ইনডিপেন্ডেন্স হল সংলগ্ন ইনডিপেন্ডেস ন্যাশনাল হিস্টোরিক পার্কের এক পাশে লিবার্টি বেল সেন্টার তৈরি করে সেখানে স্থানান্তর করা হয়। লিবার্টি বেল সেন্টারে প্রবেশে কোন টিকিট কাটতে হয় না। তবে প্রবেশে বেশ কড়াকড়ি রয়েছে, ভালরকম সিকিউরিটি চেক সম্পন্ন হবার পরেই ঢুকতে পাবেন সেখানে। হলের গেটে পৌঁছে সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে ঢুকে পরলাম হলে। শুরুতেই নানান পিক্টোরিয়াল ডিসপ্লে রুম। এরকম কয়েকটা রুম পেরিয়ে পৌঁছে গেলাম বেলটির কাছে। বেলটির কাছে বেশ ভিড় পেলাম, সবাই বেলের সাথে ছবি তোলার জন্য লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিছু সময় অপেক্ষা করে আমরাও ছবি তুললাম আমেরিকার স্বাধীনতা এবং মুক্তির প্রতীকের সাথে। প্রতি বছর প্রায় দুই মিলিয়ন মানুষ এই বিখ্যাত লিবার্টি বেল দেখতে আসে। আমেরিকার পেনসিলভানিয়ায় ঘুরতে গেলে অবশ্যই দেখতে যাবেন আমেরিকার ইতিহাস এবং স্বাধীনতার এই প্রতীক লিবার্টি বেল।

;

পার্বত্য চট্টগ্রাম 'শান্তিচুক্তির দুইযুগ' গ্রন্থের প্রিঅর্ডার রকমারি'তে



কনক জ্যোতি, কন্ট্রিবিউটিং করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
প্রিঅর্ডার শুরু হয়েছে 'শান্তিচুক্তির দুইযুগ: সম্প্রীতি ও উন্নয়নের পথে পার্বত্য চট্টগ্রাম-বিদ্যমান সমস্যা ও সমাধানের রূপরেখা' শীর্ষক গবেষণা গ্রন্থের।

প্রিঅর্ডার শুরু হয়েছে 'শান্তিচুক্তির দুইযুগ: সম্প্রীতি ও উন্নয়নের পথে পার্বত্য চট্টগ্রাম-বিদ্যমান সমস্যা ও সমাধানের রূপরেখা' শীর্ষক গবেষণা গ্রন্থের।

  • Font increase
  • Font Decrease

 

প্রিঅর্ডার শুরু হয়েছে 'শান্তিচুক্তির দুইযুগ: সম্প্রীতি ও উন্নয়নের পথে পার্বত্য চট্টগ্রাম-বিদ্যমান সমস্যা ও সমাধানের রূপরেখা' শীর্ষক গবেষণা গ্রন্থের। এক বছরের মাঠ পর্যায়ের নিবিড় গবেষণার ভিত্তিতে রচিত হয়েছে গ্রন্থটি, যার প্রিঅর্ডার শুরু হয়েছে রকমারি.কম-এ। গ্রন্থটির লেখক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও বার্তা২৪.কম-এর অ্যাসোসিয়েট এডিটর ড. মাহফুজ পারভেজ।

গ্রন্থ সম্পর্কে লেখক ড. মাহফুজ পারভেজ জানান, বাঙালিসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর আবাসস্থল পার্বত্য চট্টগ্রাম আয়তনে বাংলাদেশের দশ ভাগের এক ভাগ হলেও এমন বৈচিত্র্যময় অঞ্চল পৃথিবীতে খুব কমই আছে, যেখানে এতোগুলো জনজাতি জড়াজড়ি করে একসঙ্গে রয়েছে অনেক বছর ধরে। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিঃসন্দেহে প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে একটি অত্যন্ত মূল্যবান ঐতিহ্যগত অঞ্চল।

চিরায়তভাবে শান্তিপূর্ণ অঞ্চলটি একসময় অশান্ত হয়ে উঠেছিল। অনেক রক্তপাত ও ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতের পর অবশেষে ১৯৯৭ সালে শান্তিচুক্তি সম্পাদন হওয়ায় শান্তি, সম্প্রীতি, উন্নয়ন, স্থিতিশীলতা ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সহাবস্থানের উদার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামে। সশস্ত্র বিদ্রোহী বিচ্ছিন্নতাবাদীরা আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে অস্ত্র সমর্পণ করেছেন। বাস্তুচ্যুৎ ও শরণার্থীদের প্রত্যাবর্তন ও পুনর্বাসন হয়েছে। নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক ধারা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে অশান্ত পার্বত্যাঞ্চলে নিশ্চিত হয়েছে জনগণের শান্তি, সমৃদ্ধি, উন্নয়ন, জনঅংশগ্রহণ ও স্থিতিশীলতা, যা দুইযুগ স্পর্শ করেছে ২০২১ সালে।

ড. মাহফুজ পারভেজ বলেন, শান্তিচুক্তির দুইযুগের অভিজ্ঞতায় শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়নের গতিবেগে সমগ্র পার্বত্য জনপদ ও বাসিন্দারা মুখরিত হলেও সেখানে নানা কারণে সঙ্কটের আগুন ধূমায়িত হচ্ছে। বিচ্ছিন্ন সন্ত্রাস, নাশকতা, হত্যা, গুম, চাঁদাবাজি, অপহরণ প্রভৃতি সমগ্র অঞ্চলের নিরাপত্তা ও জনজীবনের শান্তি বিঘ্নিত করার মাধ্যমে উন্নয়ন-অগ্রযাত্রা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের মতো ঘটনা ঘটছে মহল বিশেষের উস্কানি ও অপতৎপরতায়। ফলে মাঝে মধ্যেই উত্তপ্ত ও অস্থির পার্বত্যাঞ্চলে কখনো কখনো শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়নের ইতিবাচক অর্জনসমূহ বিনষ্টের অপচেষ্টা চলছে।

তাই নিবিড় গবেষণার আওতায় এনে শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়নের পথে চলমান পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্জনসমূহ পর্যালোচনা এবং বিদ্যমান সমস্যাগুলো শনাক্তকরণ ও সমাধানের রূপরেখা প্রণয়ন জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করেন গবেষক ড. মাহফুজ পারভেজ।

১৯৯৭ সালে শান্তিচুক্তি প্রণীত হওয়ার পর প্রথম গবেষণা গ্রন্থ ‘বিদ্রোহী পার্বত্য চট্টগ্রাম ও শান্তিচুক্তি’ (১৯৯৯) প্রকাশ করেন বর্তমান লেখক-গবেষক ড. মাহফুজ পারভেজ। ২০০০ সালে লেখকের ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানবাধিকার’ বিষয়ক গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করে ইনস্টিটিউট অব অ্যাপ্লাইড এন্থ্রোপলজি। ২০০৩ সালে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) উন্নয়ন পরিকল্পনায় পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রসঙ্গে সামাজিক বিষয়ে গবেষণায় যুক্ত থাকেন লেখক। তিনি ২০০৬ সালে সফল ভাবে সম্পন্ন করেন পার্বত্য চট্টগ্রামের সংঘাত ও শান্তি বিষয়ক পিএইচডি গবেষণা। ২০০৯ সালে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের অর্থায়নে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আরেকটি গবেষণা পরিচালনা করেন তিনি। দীর্ঘ গবেষণা ও পর্যবেক্ষণের ধারাবাহিকতায় ‘শান্তিচুক্তির দুইযুগ: সম্প্রীতি ও উন্নয়নের পথে পার্বত্য চট্টগ্রামÑবিদ্যমান সমস্যা ও সমাধানের রূপরেখা’ শীর্ষক অংশগ্রহণ ও পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণায় পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তিপূর্ণ উত্তরণ ও অর্জনের পথে বিদ্যমান সমস্যাগুলো ও এর সমাধান তুলে ধরা হয়েছে, যা সমাজ, রাজনীতি, জাতিগত চর্চা, শান্তি ও সংঘাত বিষয়ক অধ্যয়ন এবং নীতিপ্রণেতাদের কাজে লাগার পাশাপাশি সাধারণ পাঠকের আগ্রহ মিটাবে বলে গবেষক মনে করেন।

গবেষক ড. মাহফুজ পারভেজ (জন্ম: ৮ মার্চ ১৯৬৬, কিশোরগঞ্জ শহর)-এর প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে: গবেষণা-প্রবন্ধ: বিদ্রোহী পার্বত্য চট্টগ্রাম ও শান্তিচুক্তি; দারাশিকোহ: মুঘল ইতিহাসের ট্র্যাজিক হিরো; দ্বিশত জন্মবর্ষে বিদ্যাসাগর; প্রকাশনা শিল্প, স্টুডেন্ট ওয়েজ, মোহাম্মদ লিয়াকতউল্লাহ। উপন্যাস: পার্টিশনস; নীল উড়াল। ভ্রমণ: রক্তাক্ত নৈসর্গিক নেপালে। গল্প: ইতিহাসবিদ; ন্যানো ভালোবাসা ও অন্যান্য গল্প; বুড়ো ব্রহ্মপুত্র। কবিতা: মানব বংশের অলংকার; আমার সামনে নেই মহুয়ার বন; গন্ধর্বের অভিশাপ। অগ্রসর ও জনপ্রিয় মাল্টিমিডিয়া নিউজ পোর্টাল বার্তা২৪.কম-এর প্রকাশিত হচ্ছে তার নতুন উপন্যাস 'রংধনু', যা অচিরেই গ্রন্থাকারে প্রকাশ পাবে।

ড. মাহফুজ পারভেজ রচিত 'শান্তিচুক্তির দুইযুগ: সম্প্রীতি ও উন্নয়নের পথে পার্বত্য চট্টগ্রাম-বিদ্যমান সমস্যা ও সমাধানের রূপরেখা' গ্রন্থ প্রিঅর্ডার করা যাবে রকমারি.কম-এর লিংকে

;