অন বেয়িং অ্যা রাইটার



ভি এস নাইপল

  • Font increase
  • Font Decrease

অনুবাদ আফসানা বেগম

সত্যিই জানি না কী করে আমি লেখক হয়ে উঠলাম। এই পেশায় অগ্রগতির পথে নির্দিষ্ট কিছু দিন-তারিখ আমি উল্লেখ করতে পারি বটে। কিন্তু তারপরেও পুরো বিষয়টি ধোঁয়া ধোঁয়াই রয়ে যাবে। কারণ প্রক্রিয়াটি রহস্যময়, যেমন ধরা যাক, লেখক হতে গেলে—সবচেয়ে প্রথমে থাকতে হবে লেখক হওয়ার বাসনা, নিজেকে অন্যদের থেকে পৃথক ভাবার কিংবা লেখক হিসেবে পরিচিত হওয়ার পরিকল্পনা। কী নিয়ে লিখব সেটা ভাবার অনেক অনেক আগেই ওই দৃঢ় ইচ্ছেটুকু থাকা জরুরি।

১৯৫০ সালে অক্সফোর্ডে প্রথম বর্ষে পড়ার সময়টা আমার মনে পড়ে, অনেক দূর হেঁটে যেতাম আমি, মনে পড়ে ওই রাস্তাগুলো, হেমন্তের ঝরা পাতা বিছানো, শুকনো পাতায় আলোড়ন তুলে গাড়ি আর ট্রাকগুলো দ্রুত ছুটে যেত—সেদিকে তাকিয়ে আমি ভাবতে থাকতাম কী নিয়ে লেখা যায়। লেখক হব বলে অক্সফোর্ডে ঢোকার চেষ্টায় স্কলারশিপ বাগানোর জন্য কতই না কষ্ট করেছি। কিন্তু তখন আমি খোদ অক্সফোর্ডে, অথচ জানি না কী নিয়ে লেখা শুরু করব। তখন যেন আমাকে কিছু তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিল, নিশ্চিত জানি, লিখবার জন্য ওরকম হন্যে হয়ে না ঘুরলে আমার হয়তো কখনো লেখাই হতো না। মনের মধ্যে সেই ইচ্ছেটা লালন করে চলা ছিল যেমন আনন্দদায়ক তেমনই লোভনীয়—মস্কো থেকে ফিরে যাবার সময়ে নেপোলিয়নের সৈন্যদের জন্য যেমন লোভনীয় ছিল ঘুম।

একখানে বসে একটা বই লিখে ফেলার ব্যাপারটা আমার কাছে হঠাৎ খুব মেকি মনে হতো। আজ এত বছর পরেও সেই অনুভূতিটা আমাকে কখনো আচ্ছন্ন করে রাখে, আমি যখন একটা লেখা শুরু করি—তার মানেই হলো আমি কিছু সাজানো আর বানানো কাজের ব্যাপারে ভাবছি। মাথায় সব সময় কোনো নির্দিষ্ট কাহিনী বা ঘটনা থাকে না। আবার বলতে গেলে মাথায় অনেক কিছুই হয়তো থাকে; তেমন কিছু না ভেবেই আমি সম্পূর্ণ কল্পনা থেকে কোনো কাহিনীর শুরুটা লিখে ফেলি; লিখতে থাকি যতক্ষণ কোনো গন্তব্য না পাই—সেই সাজানো ঘটনার ভেতর দিয়ে এগোতে থাকি—একসময় সেটা আমাকে ঘায়েল করে ফেলে, আর তারপর আমার সারা জীবনের অর্জিত অভিজ্ঞতায় আমি অজানার উদ্দেশে রওনা দেই। আর এখনো এটাই সবচেয়ে রহস্যময়—সাজানো, বানানো, কৃত্রিম কতকগুলো বিষয়কে আশ্রয় করে একজনকে তার আত্মার, হৃদয়ের আর স্মৃতি ভাণ্ডারের গভীরতম অনুভূতি খুঁজে বের করতে হবে এবং তাকে স্পর্শও করতে হবে।

সাহিত্যের সবরকম ক্ষেত্রই আসলে কৃত্রিম, আর সেগুলো ক্রমাগত বদলে যেতে থাকে, বদলায় সংস্কৃতির নতুন ধারা আর আমেজের সাথে তাল মেলাতে গিয়ে। ধরা যাক, সাহিত্য বোদ্ধা একজন মানুষ একটি মঞ্চনাটক লিখবে বলে ভাবল; তাকে তখন কিছু কল্পনা সাজাতে হবে যেটা বলতে গেলে আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারি না—কাহিনীটা বিভিন্ন দৃশ্যে আর ছোট ছোট পালায় ভাগ করে নিতে হবে; হয়তো সাদা কাগজে একের পর এক লাইন লিখে যেতে হবে না, কিন্তু অভিনেতার কাছে স্পষ্ট করে তুলতে পালার একেকটা অংশ বর্ণনা করতে হবে ঠিকই। মঞ্চনাটক লিখেছেন, এমন একজনের কাছে জেনেছি, নাটকের দৃশ্যের পর দৃশ্য সাজাতে গিয়ে তিনি নিজেকে সেই নাটকের সামনের সারিতে বসা একজন দর্শক হিসেবে কল্পনা করেন।

আগেকার দিনে যখন রেডিও বা রেকর্ড ছিল না, ছাপানো কাগজ যে যুগে রাজত্ব করত, তখন কেউ চাইলে একটা কাহিনীকে এমনভাবে সাজাতে পারত যেন সেটি অনেকগুলো ভাগে ভাগ হয়ে যায় আর মাসের পর মাস ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকে, এভাবে ভল্যিউমের পর ভল্যিউম হয়ে যেত। তারও আগে, লেখা হয়েছিল গীতিকবিতা অথবা গীতিনাট্য, কখনো ছন্দ মেলানো, কখনো আবার ছন্দবিহীন; এমনকি গীতিমহাকাব্যও।

এর সবকিছুই এখন আমাদের চোখে কৃত্রিম, কিন্তু আজকের আধুনিক উপন্যাসকে যেমন পাঠকের কাছে বাস্তব বলে মনে হয়, সে সময়ে গীতিনাট্যকেও দর্শকের কাছে তেমনই বাস্তব মনে হতো। প্রকৃতপক্ষে উপন্যাসমাত্রই কৃত্রিম, কৃত্রিম তার কাহিনীর সরলতা কিংবা জটিলতায়, বানানো দৃশ্যকল্পে, সাধারণ জীবনযাপনের ছন্দে কোনো সংকট এবং তার থেকে উত্থানের ধারাবাহিক বর্ণনায়। আমি আসলে খুব সরাসরি বলতে চাচ্ছি যে এই কৃত্রিমতার অনুভূতি লেখালেখির শুরু থেকেই আমার ভেতরে কাজ করত, যখন আমি লিখতে শুরু করতাম, ভাবতাম আমার জীবনের অভিজ্ঞতার কোন অংশকে সেই লেখার আওতায় কী করে ফেলা যায়—বলতে গেলে, নিজের স্মৃতির ভেতরে পাগলের মতো হাতড়ে বেড়াতাম, পইপই করে খুঁজতাম কী করে সাহিত্যের ওই ক্ষেত্রটিতে সাজানো ঘটনার আবহে আমার অর্জিত কোনো অভিজ্ঞতাকে মিলিয়ে দিতে পারি।

সাহিত্যের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট রূপে বিন্যাস বা নির্মাণের প্রয়োজন: অভিজ্ঞতাকে সেখানে মিশিয়ে দিতে হবে সাবলীলভাবে, যেন অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু কিছু কিছু নির্মানের ক্ষেত্রে, যেমন কাপড়চোপড়ের ফ্যাশনের ক্ষেত্রে এই কৃত্রিমতার ব্যাপারটা মাঝে মধ্যে চরমে পৌঁছায়। আর তখন সেখানে নিজস্ব অভিজ্ঞতার প্রতিফলনে তাকে আরও তীক্ষ্ণ করার পরিবর্তে অনেক বেশি কল্পনার আশ্রয় নিতে হয়, গাঁজাখুরি কল্পনার ভারে বিষয়টি তখন হয়ে দাঁড়ায় একটা বোঝার মতো। ট্রলোপ (ইংরেজ ঔপন্যাসিক অ্যান্থনি ট্রলোপ - অনুবাদক) যেমন কাল্পনিক একটা পরিস্থিতির অবতারণা করতেন—তিনি ছিলেন রীতিমতো একজন সমাজ গবেষক, সমাজ এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরের কর্মদক্ষতা সম্পর্কে তার জ্ঞান ছিল প্রখর, বলা যেতে পারে সেই জ্ঞানের গভীরতা ছিল ডিকেন্সের (ইংরেজ লেখক চার্লস ডিকেন্স। - অনুবাদক) চেয়েও বেশি, যেন এক মোহিনী শক্তি। অথচ ট্রলোপ, যিনি কিনা অকল্পনীয় পরিস্থিতি তৈরি করতেন, তাকে নিয়ে আমার এক ধরনের সমস্যা আছে, তার লেখার প্রারম্ভিক কয়েকটি পাতায় যে সামাজিক চিন্তা এবং দার্শনিক মতামতের পরিচয় পাওয়া যায়, তার সাথে মিলিয়ে পরে উদ্ভুত সেই জটিল পরিস্থিতির জট ধীরে ধীরে খোলা সহজ নয়। ঠাকরের (ভারতীয় বংশদ্ভূত ইংরেজি ভাষার সাহিত্যিক উইলিয়াম ঠাকরে। - অনুবাদক) লেখার বিষয়েও আমার একই কথা বলার আছে: পড়তে পড়তে এগুতে থাকলে মনে হয় বাচনভঙ্গিটি টিকিয়ে রাখার জোর চেষ্টা আর প্লটের জটিলতা যেন তার ঘাড়ে আলগা বোঝার মতো চেপে বসেছে।

বর্ণনামূলক সাহিত্য থেকে আনন্দ পাওয়ার ক্ষেত্রে বিগত প্রায় একশো বছরে আমাদের রুচির অনেক পরিবর্তন হয়েছে। গত শতাব্দীর সমস্ত সাহিত্য, সিনেমা আর টেলিভিশনে প্রচারিত সব অনুষ্ঠান আমাদের রুচির পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করেছে। আজ একথা অনায়াসে বলতে পারি যে, ঊনিশ শতকের ইংরেজি ভাষার যেসব ঔপন্যাসিকেরা আমাকে উপন্যাস পড়ার প্রকৃত আনন্দ দেয়—যখন তাদের লেখার জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে মানুষের জীবন দেখা যায়, মানুষের সেই প্রতিকৃতি আমাকে উৎসাহিত করে—তবে দুঃখের বিষয় হলো, তাদের নিজেদের সময়ে সেই লেখকদের আদৌ ঔপন্যাসিক হিসেবে ভাবা হয়নি।

রিচার্ড জেফারিসের (ইংরেজ লেখক, ১৮৪৮-১৮৮৭। - অনুবাদক) মতো লেখকদের কথা আমি প্রায়ই ভাবি, যার লেখায় খামারে কাজ করা মানুষদের জীবনযাত্রা এমন সূক্ষ্মভাবে উঠে আসে, তাদের সম্পর্কে তার জ্ঞান এত বিস্তৃত আর বর্ণনা এত প্রাঞ্জল যে মনে হয় সেই শ্রেণির সব মানুষের পুরো জীবনটাই উঠে এসেছে তার লেখায়। অথবা যদি উইলিয়াম হ্যাজলিটের (ইংরেজ লেখক, ১৭৭৮-১৮৩০। - অনুবাদক) কথা বলি, বা চার্লস ল্যাম্ব (ইংরেজ লেখক, ১৭৭৫-১৮৩৪। - অনুবাদক), তাদের টানটান বর্ণনা, আঁটোসাটো অথচ আবেগী বাক্য, খুব সাধারণ ব্যাপার কিন্তু নয়, হেলাফেলা করে লিখে তারা বিখ্যাত হননি। তারপর যদি বলি উইলিয়াম কবেটের কথা, তিনি সেই সাংবাদিক আর প্যামফলেট লেখক, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের ব্যাপারে যার লেখাগুলো তীক্ষ্ণ, বিস্ময়কর গদ্যভঙ্গিমা, মাঝে মাঝে ভয়ানক সংস্কারের প্রতিজ্ঞা, গ্রাম্য মানুষদের জীবন, তাদের খাবারের অভ্যাস, সেখানকার রাস্তা, মাঠঘাট, এমনকি গ্রাম্য হোটেলের বর্ণনাও নিখুঁত তার। এই লেখকদের মধ্যে সবাই তাদের লেখার ধারায় সেই সময়ের উপন্যাসের ধারাটি বজায় রেখেছেন। নিজেদের প্রতিভার সাথে যুক্ত হয়েছে সময়ের প্রচলিত কাঠামো। তবে সেই কাঠামো ভেঙেচুরে প্রত্যেকে, পাঠককে যে যতটুকু আনন্দ দিতে পারেন সেভাবেই নির্মান করেছেন তাদের নিজস্ব ধারা।

কঠোর পরিশ্রমী প্রতি লেখককেই নিজস্ব ধারা তৈরি করতে হবে; আগে যা কিছু লেখা হয়েছে তাকেই আরেকটু বাড়িয়ে চড়িয়ে লেখার দায়িত্ব নিয়ে সে আসেনি। আর সেভাবেই সচেতন একজন লেখক তার নিজস্ব ধারাটির ব্যাপারে ভাববে, সিদ্ধান্ত নেবে; কারণ সে জানে তাকে কী করতে হবে। তবে সে অতীতে যা কিছু পড়েছে বা চর্চা করেছে তার প্রভাব তার লেখার উপরে চলে আসতেই পারে, ধারা সৃষ্টির সময়ে আগের সেই লেখকদের অভিজ্ঞতার ছায়া তার লেখায় পড়তে পারে, সুনির্দিষ্টভাবে নিজস্ব ধারা নির্মিত না-ও হতে পারে।

মৃত্যুর পরেও ফিলিপ লারকিন (ইংরেজ কবি, ১৯২২-১৯৮৫)—এখনো তার নিজস্ব এবং খুবই চমৎকার ধারা নিয়ে বেঁচে আছেন, বিশেষ করে তার শেষের দিকের লেখাগুলোর কথা যদি ধরা যায়। তিনি মনে করতেন সাহিত্যের ধারা এবং উপজীব্য বিষয় বস্তুত অদৃশ্য। ফিলিপ বেশ ধীরে কাজ করতেন, বলেছিলেন, “তুমি যখন কিনা আবিষ্কার করছো কী বলতে চাও, কিভাবে বলতে চাও, তাহলে সেজন্যে সময় তো লাগবেই।” কথাটি শুনতে যতটা সরল, তার অন্তর্নিহিত অর্থটি ততটাই গভীর। সাহিত্য সংগীতের মতো বিষয় নয়, এতে শুধু তরুণেরা আগ্রহী হবে তাও নয়; সাহিত্যকে কোনো নির্দিষ্ট বেড়াজালে ফেলাই যায় না। একজন লেখক যে জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা খুঁজে বেড়ান, ছড়িয়ে দিতে চান, সেটা সম্পূর্ণ সামাজিক এবং আবেগতাড়িত; এটা গুছিয়ে নিতে সময় লাগে, কিসের ভেতর দিয়ে তিনি যাচ্ছেন সেটা বুঝতে এবং পুরো প্রক্রিয়াটি সাজাতে তার জীবনের সিংহভাগ পেরিয়ে যেতে পারে। এই বিষয়টি কৌশলগত এবং নিবিড় তত্ত্বাবধান দাবি করে, কারণ এতকিছুর পরে পুরো অভিজ্ঞতাটি হারিয়ে গেলে চলবে না, ফলাফল যে আকৃতিতে আসার কথা ছিল, তা থেকে বেরিয়ে অন্য আকৃতি নিলে চলবে না। প্রতি লেখকের নিজস্ব রীতি বা ধারার পেছনে রয়েছে তার নিজস্ব অভিজ্ঞতার ছায়া।

সাহিত্যে কোন ধারাকে অনুসরণ করব, তাতে কী ধরণের শব্দের ব্যবহার করব, এসব নিয়ে আমি বরাবরই বেশ সতর্ক ছিলাম, কারণ কাজের শুরুতেই আমি বুঝতে পেরেছিলাম, যে সাহিত্য আমি এতদিন ধরে জেনেছি, পড়েছি আর যে সাহিত্য আমি সৃষ্টি করতে চাই, মনের ভেতরে লালন করি, এই দুইয়ের মধ্যে একটা তফাৎ আছে। আমার অতীতের ভালো লাগা আর যে বিন্দুতে আমি পৌঁছতে চাই তার মধ্যে আছে এক ধরনের অনৈক্য। এই সাধারণ ব্যাপারটা অনুধাবনের পরপরই আমার কাছে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে গেল যে প্রচলিত সাহিত্যের অন্ধ অনুকরণের কোনো মানে নেই। 

জেমস জয়েস (আইরিশ কবি এবং ঔপন্যাসিক, ১৮৮২-১৭৪১। - অনুবাদক) তার প্রথমদিককার একটি লেখায় নিজের অস্বস্তির কথা উল্লেখ করেছিলেন—অথবা বলতে চেয়েছিলেন ইংরেজি সাহিত্যে তার গুরুর কথা, “আজ আমি এবং আমরা যে ভাষায় কথা বলি, তিনিও সেই ভাষায়ই বলতেন। বাড়ি, ঈশ্বর, পানশালা, প্রভু, এই শব্দগুলো তার থেকে আমার ঠোঁটে কি খুবই অন্যভাবে উচ্চারিত হয়! আমি তার মতো করে কথা না বলে থাকতে পারি না, তার আত্মাকে না ছুঁয়ে আমি লিখতে পারি না...তার ভাষার কারুকাজের ওপরে আমার হৃদয় অস্থির ঘোরাফেরা করতে থাকে।”

জেমস জয়েস ছিলেন স্বকীয়ত্বের ব্যাপারে নিরিক্ষায় পটু—লেখার বস্তুগত বিষয় থেকে তার লেখনীর ধারা পৃথক দিশায় প্রবাহিত হতো। অবশ্য এখানে আমি জেমস জয়েসের ভাষা বা শব্দের ব্যবহার নিয়ে কথা বলছি না। ইংরেজি সাহিত্য পড়তে গিয়ে আমি ভাষাগত সমস্যা বোধ করিনি—ভাষা তো ভাষার মতোই। কিন্তু একটি বিষয়ে আমি বরাবর ভাবতাম, শব্দের ব্যবহারিক অর্থের ব্যাপারে, একই শব্দ স্থান ভেদে কতরকম অর্থ প্রকাশ করতে পারে। বাগান, বাড়ি, গাছপালা, মালি, জায়গা-জমি, এসব শব্দকে ইংল্যান্ডের একজন যেভাবে বোঝে, ত্রিনিদাদের একজনের কাছে সেগুলো কতই না আলাদাভাবে ধরা দেয়। ত্রিনিদাদের ব্যক্তির কাছে হয়তো এসবের মানে ক্ষেতখামার, কৃষিকাজের কারণে একসাথে বসবাসরত গুচ্ছ পরিবার। এখন প্রশ্ন হলো, আমার নিজের কাছে যে শব্দ যে অর্থ প্রকাশ করে তা দিয়ে তবে কী করে আমি সঠিকভাবে, সততার সাথে যা লিখতে চাই তার সবটা ব্যক্ত করতে পারব? সবখানের সব পাঠক কি আমার সেই লেখা তাদের অতীতের পঠিত সাহিত্যের সাথে সামঞ্জস্য রেখে একইভাবে গ্রহণ করতে পারবে? আমার মনে হতো জীবনে আমি যা দেখেছি তাকেই উপস্থাপন করতে হবে, আর এভাবেই নিজেকে লেখক বা উপস্থাপক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারব; আমাকে সবকিছু সবিস্তারে বর্ণনা করে যেতে হবে। আমার লেখক হওয়ার পথে এই কাজটিই আমি বিভিন্নভাবে করতে চেষ্টা করেছি। প্রাথমিকভাবে, বছরদুয়েক পরিশ্রমের পরে আমি একটি লেখা শেষ করেছিলাম, যা শেষ পর্যন্ত আমার মনে হয়েছিল, যা বলতে চাই, যেভাবে বলতে চাই তা যেন বলে উঠতে পেরেছি।

আমার লক্ষ্য ছিল সত্যের অনুসন্ধান, নির্দিষ্ট অভিজ্ঞতার আলোকে সত্যকে প্রতিষ্ঠা করা, লেখকের প্রতিচ্ছবির ভেতর দিয়ে সত্যের উৎস খোঁজা। কিন্তু সেই লেখাটি যখন শেষ করেছিলাম, তারপরেও দেখলাম লেখা তৈরির পুরো প্রক্রিয়াটি বরাবরের মতোই আমার কাছে রহস্যময় রয়ে গেল।

ফরাসি সমালোচক সান্তে ব্যুভে ভাবতেন একজন লেখকের ব্যাক্তিগত জীবন আলোচনা করলে তার লেখার ধারার কারণ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়। সান্তে ব্যুভের ধারণার আক্রমণাত্মক বিরোধিতা করে অদ্ভুত এক বই প্রকাশ করেছিলেন প্রুস্ত (ফরাসি ঔপন্যাসিক মার্সেল প্রুস্ত। - অনুবাদক)। বইটি ছিল একেবারে ব্যতিক্রমী এক সৃষ্টি, একেবারে নতুন ধরণের এবং চমকপ্রদ, কিছুটা আত্মজীবনী, কিছুটা সাহিত্য সমালোচনা আর কিছুটা আবার কল্পকাহিনী, বইটির নাম ছিল সান্তে ব্যুভের বিরুদ্ধে। সেই বইয়ে সমালোচনা করা হয়েছিল বস্তত একজন সমালোচকের, একই সাথে তুলে ধরা হয়েছিল লেখার প্রতি একজন লেখকের টান, বর্ণিত হয়েছিল লেখকের নিজস্বতা এবং তার সৃষ্টির কৃত্রিমতার স্বরূপ।

“এই ধ্যান ধারণা”—প্রুস্ত বলেন (সিলভিয়া টনসেন্ড ওয়ার্নারের অনুবাদে)—আর তিনি বলছিলেন সান্তে ব্যুভের ধ্যান ধারণা সম্পর্কে—“শিক্ষাদীক্ষার মাধ্যমে আমরা জীবনে যা অর্জন করি সেসব যেন তার মধ্যে নেই, জানেনও না যে একটি লেখা একজন মানুষ লেখে তার নিজের চরিত্রের বাইরে দাঁড়িয়ে, আপন চরিত্র হলো যেখানে আমরা আমাদের নিজস্ব অভ্যাস, নিজস্ব দোষগুণের চর্চা করি।” আর তার কয়েক পাতা পরে সেখানেই প্রুস্ত আরো যোগ করেছেন: “লেখকের লেখনীর উপলক্ষ যাচাই করলে বোঝা যায় যে তার সৃষ্টিতে রয়েছে ভাসা-ভাসা ব্যাপারস্যাপার বা শূন্যতার চেয়েও বেশি কিছু, অথচ তার ব্যক্তিগত জীবনে নিশ্চয়ই রয়ে গেছে আরো গভীর বা জটিলতর কোনো ঘটনা, একজনের একান্ত জীবনের যাবতীয় অর্জন থেকে নিংড়ানো নির্যাসটুকু সে তার লেখায় ঢালতে পারে, একাকিত্বে লেখক সেই লেখাটি সাজিয়ে নেয় কেবল নিজের জন্য, পরবর্তী কালে তা জনসমক্ষে প্রকাশ পায়। নিজের জীবনে মানুষ যা কিছু চর্চা করে—যেমন অন্যের সাথে কথোপকথনের সময়ে, যতই পরিশুদ্ধ করে বলুক না কেন.. —তা নিজের অবচেতন মনের অগভীর কথাবার্তাই মাত্র, সেসব কথা কিছুতেই ব্যক্তির ভেতরকার সেই লালিত অনুভূতি নয় যা কিনা পৃথিবীর আর সব কিছুকে একদিকে সরিয়ে রেখে লিখে ফেলা যায়, যা কিনা লেখা যায় আপন মনে পৃথিবীর এমাথা-ওমাথা পরিভ্রমণ করতে করতে।”

এটা অবশ্য কৌতুহল উদ্দীপক—তবে কিছুতেই বিস্ময়কর নয় যে, লেখকের লেখক সত্তা নিয়ে প্রায় একই ধরনের অনুভূতি প্রকাশ করেছেন আরেক বিখ্যাত লেখক, সমরসেট মম। তার বিখ্যাত কল্পকাহিনী কেকস আর অ্যালি-তে অতুলনীয় টমাস হার্ডি চরিত্র সৃষ্টি করতে গিয়ে, একটার পর একটা আকস্মিক ঘটনার অবতারণা করে (যার জন্য অবশ্য তিনি বেশ সমালোচনার মুখেও পড়েছিলেন) দেখিয়েছেন যে ওয়েসেক্সের বিয়োগান্তক কাহিনী রচয়িতা একজন ঔপন্যাসিকের নিজস্ব জীবন কত অদ্ভুতভাবে সাধারণ হতে পারে, আর এজন্যেই লেখালেখির বিষয়টা রহস্যময়। “আমার এমনটাই মনে হয়”—মম পরিশেষে বলেন—“একজন লেখকের ভেতরের মানুষটা, যে তার মৃত্যু পর্যন্ত থাকে অচেনা এবং একাকি, কিন্তু সেই ভেতরের মানুষটা, যে সবার অজান্তে জীবন যাপন করেছিল, তার ছায়ামূর্তি অথবা আত্মা, স্বরচিত সমস্ত বইগুলো এবং তার নিজস্ব জীবনের মাঝখানে কোথাও অদৃশ্য হয়ে ঘোরাফেরা করতে থাকে, আর দুটো পুতুল সত্তার বিয়োগান্তক পরিণতি দেখে শ্লেষের হাসি হাসে...”

(২৩ এপ্রিল, ১৯৮৭, নিউ ইয়র্ক বুক রিভিউ)

ভি এস নাইপল
১৯৩২ সালের ১৭ অগাস্ট বিদ্যাধর সূর্যপ্রসাদ নাইপল জন্মেছিলেন ত্রিনিদাদে। নোবেল বিজয়ী এই লেখক একাধারে ত্রিনিদাদ এবং ইংল্যান্ডের নাগরিক। তিনি ইংরেজি ভাষায় উপন্যাস, ভ্রমণ কাহিনী এবং প্রবন্ধ রচনা করেছেন। তিনি প্রায় পঞ্চাশ বছর ব্যাপী লেখালেখি করেছেন এবং ফিকশন, নন-ফিকশন মিলিয়ে তার বইয়ের সংখ্যা তিরিশের বেশি। তার বিখ্যাত রচনার মধ্যে রয়েছে, এ হাউজ অফ মিস্টার বিশ্বাস, ইন এ ফ্রি স্টেট, এ বেন্ড ইন দ্য রিভার, দ্য এনিগমা অফ অ্যারাইভাল, এ ওয়ে ইন দ্য ওয়ার্ল্ড, আরলি ত্রিনিদাদ নভেলস।

তিনি ১৯৭১ সালে বুকার এবং ২০০১ সালে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন। নোবেল কমিটি পুরস্কারের আয়োজনে উল্লেখ করে, ‘তার লেখা ভুলে যাওয়া ইতিহাসকে নতুন আঙ্গিকে আমাদের সামনের তুলে ধরার প্রয়াস পায়।’ সেখানে আরো বলা হয়, ‘আধুনিক মানসিতাই তার লেখায় ঐতিহ্যের মোড়কে ঢাকা।’    

উপন্যাস, প্রবন্ধ এবং ভ্রমণ কাহিনী, প্রত্যেকটিই তার কলমে হয়ে উঠেছে অসামান্য। তবে ১৫৬৬ থেকে ১৫৬৮ সালের মধ্যে রচিত তার রম্য উপন্যাস আরলি ত্রিনিদাদ তাকে ব্যাপক জনপ্রিয়তা এনে দেয়।

ইন্ডিয়া থেকে অভিবাসী হয়ে তাঁর পরিবার ত্রিনিদাদে গিয়ে বসবাস শুরু করেছিল। তাঁর বাবা ছিলেন ত্রিনিদাদ গার্ডিয়ান পত্রিকার সাংবাদিক। তারা ভারতীয় ব্রাহ্মণ পরিবার হলেও ধীরে ধীরে বাড়িতে ধর্মীয় নীতি আর কঠোর নিয়মকানুনের ব্যবহার বন্ধ হয়ে যায়। বাড়িতেও তারা ইংরেজি ভাষা ব্যবহার করতেন।

ভি এস নাইপল তার কল্পকাহিনী এবং ভ্রমণ কাহিনীতে তৃতীয় বিশ্বকে কর্কশ এবং আবেগবিহীনভাবে তুলে ধরেছেন বলে সমালোচিত হয়েছিলেন।

২০১৮ সালের ১২ অগাস্ট, লন্ডনে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

হাসান হাফিজের একগুচ্ছ কবিতা



হাসান হাফিজ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ম্যানিলা ও নস্টালজিয়া

ও ম্যানিলা
তুমি আছো স্মৃতিপটে,
ওগো প্রিয় ম্যানিলাসুন্দরী
তৃষিতের ওষ্ঠ তুমি ভিজিয়েছো
স্যান মিগ্যুয়েল নামে বীয়ারে মাদকে
‘পিনোটুবুু’ অগ্নিগিরি
খুব কিন্তু দূরে নয়
দ্বীপ দেশ ফিলিপিন্স
ঔপনিবেশক স্মৃতি কী দুঃসহ
একটানা চারশো বছর
দীর্ঘ দীর্ঘকাল পরে
মুক্তিস্বাদ পেয়েছো যে তুমি
সেই কটু অম্লস্বাদ
স্মৃতি হয়ে বুকে বেঁধে
‘মুক্তি’ দ্যায় উপশম
সুতন্বী উচ্ছল হও মনোরমা
দ্বীপকন্যা সুছন্দা ম্যানিলা।

অসহ দংশন

না-বৃষ্টি না-রোদ
এমন ধূসর দিনে
কেন ছুঁতে চেয়েছে সে
তোমার পেলব হাত
শৈল্পিক আঙুল
চুম্বনের অধিকার
ওরা কিন্তু দ্যায় নি যুবাকে
সন্ধ্যার আঁধারবেলা
সেই স্মৃতি অনশ্বর
জ্বলজ্বলে নক্ষত্রস্পর্ধায়
অমলিন চিরক্ষণ জলরঙ ছবি হয়ে
জেগে থাকে ঠোকরায়
না-পাওয়ার অসীম তৃষ্ণায়...

একগুঁয়ে মাঝি

মন পোড়ে?
বৃষ্টি ওড়ে?
মনের তো ডানা নাই,
কীভাবে বৈদেশ যাবে
বন্ধুয়া-হদিস পাবে
প্রশ্ন এইটাই।

বৃষ্টি পড়ছে
আছড়ে পড়ছে
মৃত্তিকার আলিঙ্গনে
এবং সম্ভোগে
সার্থকতা জলের প্রেমের।
দেখেছ প্রেমের মড়া?
কোনোদিন ডুবেছে সে জলে?

মন পোড়ে?
আহা বাহা পুড়ুক জ্বলুক
পোড়াই নিয়তি
বাহক দুর্গতি
ছিল যে কপালে লেখা
কীভাবে খ-াবে?
মনের বৈরাগী মাঝি
ফিরে আসতে নয় রাজি
চড়েছে সে একগুঁয়ে
ভাঙাচোরা ডিঙি নৌকায়।

নিরালায় সন্ধ্যাকালে

যাও পাখি যাও
পরানবন্ধুরে গিয়া
স্মরণ করাও
দুঃখিনীরে একলা রাইখা
কী মজা সে পায়?
এবার নাগালে পেলে
রশি দিয়া বাইন্দা রাখব
সতত পঞ্চল বন্ধে
এইবার দেইখা নিব কীভাবে পলায়!
শরমের খেতা পুড়ি
ওরে পাইলে এই ঘুরি
উইড়া চলি পাতায় পাতায়
যাও পাখি বলো তারে
এবার সে আসতে পারে
দুই বন্ধু বসব গিয়া
পুরানা দীঘির পাড়ে
নিরালা সন্ধ্যায় কালে
প্রাচীন ঘাটলায়
ও বন্দু সারলী হাঁস
খুঁচিয়ে কী মজা পাস?
সবকিছু ছাইড়া ছুইড়া
নিজ গৃহে সোজা চইলা আয়!


গত্যন্তর নাই

বিশ্বাস ভেঙেছো তবু
তোমাকে বিশ্বাস করি
পুনরায় প্রতারিত হতে চাই
ক্ষতি আর কতটুকু হবে?
সর্বনাশ পোড়া ছাই
লানতের অন্ত নাই
তোমাদ্বারা সকলই সম্ভব
যদি অসম্ভব হয়
আমি তবে বেপথু নাচার
পথ খোলা নাই যে বাঁচার
আমার কী গতি হবে তবে?


আশাভঙ্গ

এতোটা পথ
পাড়ি দিলাম একা
ভেবেছিলাম
হয়তো পাবো দেখা।
জানতাম না অদর্শনই
এই কপালের লেখা।
ভেবেছিলাম সরল তুমি
এখন দেখি জটিল বক্ররেখা!


নৈকট্য তো ছিল না কপালে

ক.
খুঁজতে খুঁজতে একদিন
হয়তো পেয়ে যাবো
ভয় কিন্তু জাগরুক
পেলে পর নিশ্চিত হারাবো!

খ.
কাঁটা ও সংশয়
সমস্ত জীবনব্যাপী
ভিলেনের মতো জেগে রয়।

গ.
জারিজুরি সবই হলো ফাঁস।
জানতে না আমার হৃদয়মধ্যে
বাস করে অপরূপ আন্ধা সর্বনাশ?
আমি কিন্তু জানতাম
সে কারণে কাছে ঘেঁষতে
চাইতাম না মোটের উপর
নৈকট্য নিয়তি নয় জানা ছিল
কিন্তু করতে পারি নাই
তোমাকে ত্যাগের মতো ছিন্ন উপবাস।

 

;

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু



হাসিবুর রহমান
পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

  • Font increase
  • Font Decrease

 

কোন জাতির উত্থান-পতন, আবেগ, ভবিষ্যৎ নির্মাণে মিশে থাকে ইতিহাসের  সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম উপাদান । কেউ ইচ্ছে করলেই তাকে যেমন বদলে দিতে পারে না, ঠিক তেমনি আদর্শগত দিক থেকে কোন জাতিকে বিপথে চালিতে করতে পারে ভুল ইতিহাস। ভারত উপমহাদেশের ইতিহাসে অষ্টাদশ শতকের বাংলা নানা কারণেই তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে, বাংলার আর্থিক সমৃদ্ধির সুনাম সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল সেই সময়। শান্তি সমৃদ্ধির চূড়ান্ত এক পর্যায়ে ১৭৫৭ পলাশির অন্ধকার নেমে আসে এবং ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন ঘটনো হয়।

দ্বিসার্ধশত বছরের পলাশি যুদ্ধের বহুমাত্রিক আলোচনা হয়েছে ঠিকই কিন্তু নবাব সিরাজউদ্দৌলার রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা ও ব্যক্তিগত চরিত্র নিয়ে জনসমাজে বিভ্রান্তিকর, কাল্পনিক গল্পও ছড়ানো হয়েছে । দেশী-বিদেশী ঐতিহাসিকরা তাঁকে লম্পট, দুশ্চরিত্র, কটুভাষী, হৃদয়হীন রূঢ়  চতুষ্পদ পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট স্বভাবজাত বলে মিথ্যা ও কলঙ্কের অপবাদে মুড়ে দিয়েছেন। সমকালীন যুগের ফারসি ভাষার মুসলমান,  ইংরেজ লেখক কেউই তাঁর প্রতি সুবিচার করে কলম ধরেননি।

তবে, অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, নিখিল নাথ রায় আধুনিক কালে সুশীল চৌধুরীর মতো ব্যতিক্রমী ঐতিহাসিকরা  সিরাজউদ্দৌলার মত দেশপ্রেমিক নবাবকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে যেভাবে মূল্যায়ন করে বিপথগামী ইতিহাস চর্চার ধারাকে থমকে দিয়েছেন- এটাও ইতিহাসবেত্তাদের সততা, স্বচ্ছতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্বরূপ। 

বর্তমানে অধিকাংশ ঐতিহাসিক পলাশির যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে বিস্তর লেখালেখিতে আগ্রহী। কিন্তু তাঁরা দেখেন না, দেখতে চান না যে পলাশি হলো একটি  পরিণতি । ষড়যন্ত্র আর সামরিক আগ্রাসনের একটি সুদূরপ্রসারী ফলাফল। তাঁরা পলাশি পরবর্তী সময়ে ইংরেজ কর্তৃক ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার বৈধতা দিতে সিরাজের বিরুদ্ধে সীমাহীন মিথ্যা যুক্তির জাল বুনেছিল, আসলে এছাড়া ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে স্বীকৃতি দেওয়ার অন্য কোন বৈধ উপায় তাঁদের হাতে অবশিষ্ট ছিল না।

মাত্র চৌদ্দ মাসের শাসনকালে অবাধ্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঔদ্ধত্যকে  দমন করতে সিরাজের দৃঢ়তা, সাহসিকতা, কঠোরতা দেখিয়েছিলেন তা নিঃসন্দেহে প্রশংসাযোগ্য। বাংলার মাটিতে বিনা অনুমতিতে ইংরেজদের দুর্গ নির্মাণ, কিংবা কর্মচারীদের  অবাধ "ব্যক্তিগত বাণিজ্য" বন্ধ করা তাঁর কাছে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। একজন স্বাধীন নবাবের চোখে সার্বভৌমিকতার প্রশ্ন এখানে জড়িয়ে ছিল। কিন্তু সিরাজের দুর্ভাগ্য তাঁর দরবারের পদস্থ বিশ্বাসী অমাত্য গোষ্ঠী, অনেকেই ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের আশায় কোম্পানির ষড়যন্ত্রের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। জগৎ শেঠদের মতো দেশীয় বণিকরাও এই ষড়যন্ত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

ঘরে বাইরে শত্রু পরিবেশিত সিরাজ দৃঢ়তার সঙ্গে এই অশুভ শক্তির মোকাবেলায় সফল হননি বটে , কিন্তু তাঁর স্বদেশভূমি রক্ষার লড়াইকে হীন চোখে দেখা অনৈতিহাসিক। পলাশি নামক বিয়োগান্ত ঘটনার পর  তাঁকে  চরম অপমান আর অমর্যতার সম্মুখীন হতে হয়। যে নিষ্ঠুরতা তাঁর সঙ্গে পলাশির পর দেখানো হয়েছিল ইতিহাসে তা বিরল। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক সিরাজুল ইসলাম লিখেছেন, প্রকৃতপক্ষে সমকালীন শাসকশ্রেণীর মানদণ্ডে সিরাজউদ্দৌলার চারিত্রিক দৃঢ়তা, অত্যন্ত সাহসিকতা ও অসাধারণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধ বিস্ময়কর বটে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় সাম্প্রতিক কালেও ইংরেজদের ভারতবর্ষ দখলের বৈধতা দান করতে গিয়ে একশ্রেণীর ইতিহাসবিদ সিরাজকে নিয়ে নতুন নতুন কাহিনী, উপাখ্যান ম্যানুফ্যাকচার করে ইতিহাস হিসাবে প্রচার করে চলেছেন। তাঁরা বলেন-- সিরাজের মৃত্যু কোন শহীদের মৃত্যু নয় । কারণ তিনি মধ্যযুগীয় রাষ্ট্রব্যবস্থাকে রক্ষা করতে লড়াই করেছিলেন মাত্র, যেখানে জনসমাজের সঙ্গে তাঁর কোন সম্বন্ধ ছিল না। অথবা একথা বলা হয় যে বাংলার নবাব হিসেবে কেন্দ্রীয় মুঘল শাসকদের দ্বারা কোন লিখিত বৈধ অনুমোদন তাঁর ছিল না ইত্যাদি।

সিরাজের মৃত্যু কোন শহিদের মৃত্যু কিনা সে বিষয়ে বিতর্ক থাকা অকল্পনীয়। তাঁর দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলা ইতিহাস-বিরুদ্ধ। এছাড়া শাসনের বৈধতার দিক থেকে বাংলার নবাবরা নিয়মিত দিল্লি সম্রাটদের রাজস্ব প্রদান করতেন, সিরাজ ও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। দেশের অভিন্ন মুদ্রা ব্যবস্থা বাংলাতেও চালু ছিল। কাজেই  অভিযোগকারীরা কি ধরনের 'দেশপ্রেম' ও 'জাতীয়তাবোধ' সিরাজের কাছে প্রত্যাশা করছেন তার কোন ইতিহাস সম্মত ব্যাখ্যা হয় না। দেশকে রক্ষা করার দায়িত্ব তিনি অস্বীকার করেননি এখানেই তাঁর রাজনৈতিক গুরুত্ব ও ঐতিহাসিক অবদান।

সিরাজউদ্দৌলার নিরন্তর লড়াই এর সঙ্গে যুক্ত ছিল আপামর বাংলার মানুষের জীবন ভবিষ্যৎ। পলাশিতে যদি নবাবকে না হারতে হত তাহলে বাংলার ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হত নিশ্চয়। দীর্ঘ দু'শো বছরের ঔপনিবেশিক শাসন, শোষণের জর্জরিত দেশবাসীর মনে হীনমন্যতাপদের জন্ম নিত না। স্বাধীনতার শত্রুদের সেদিন যথার্থভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। দেশপ্রেমিক নবাবের মৃত্যুকে কেবল ক্ষমতার হাত বদল বলেই ভেবেছিল একশ্রেণীর মানুষ। ক্ষমতাসীন নবাবের লাশকে সেদিন জনগণের ঘৃণা ও অপমানের বস্তু করে তুলেছিল। নবাবের অনুগ্রহে যাদের একসময় জীবন জীবিকা নির্ভর করত তারাই দেশপ্রেমিক সিরাজকে নির্মমভাবে হত্যা করল, মৃতদেহটি পশুর মত ডাস্টবিনে ছুঁড়ে দিয়েছিল। সমকালীন যুগের এই ঘৃণ্য প্রতিশোধ যেকোনো জাতির কাছেই বড় লজ্জার।

 

অথচ যে নবাব চরম বিপদের মুহূর্তে দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি, কারোর প্রতি  শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি, তাঁর সেই মহানুভবতা ও উদারতাকে কেউ মূল্যায়ন করতে চায় না। ম্যালেশন যথার্থই মন্তব্য করে করেছেন  যে, পলাশির আগে-পরে একমাত্র সিরাজের বিশ্বাসঘাতকতা ও ষড়যন্ত্রের সঙ্গে কোন সম্পর্ক ছিল না।

একথা সত্যি যে, বাংলার নবাবদের মধ্যে সিরাজই বোধহয় দেশকে একটু বেশি ভালোবেসে ফেলেছিলেন। তিনি মুর্শিদকুলি খান, সুজাউদ্দিন, সরফরাজ বা আলিবর্দী খানের মতো গা ভাসিয়ে চলতে পারতেন তাহলে তাঁকে অন্তত অকালে প্রাণ দিতে হতো না। হতভাগ্য রাজ্যহারা নবাব জীবনের অন্তিম সময়ের প্রাণ ভিক্ষার জন্য প্রত্যেকের পদতলে লুটিয়ে পড়েছিলেন কিন্তু সেদিন তাঁর করুণ আর্তি শুনতে পাইনি কেউ। ফলে বাংলার ইতিহাসে চিরকাল কালো অধ্যায় হিসেবে ১৭৫৭ সালের ৩রা জুলাই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। তাঁকে জীবন ভিক্ষার পরিবর্তে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। নিষ্ঠুর, ঘৃণিত সেই হত্যাযজ্ঞ আজও মানুষের হৃদয়ে কম্পিত হয়। দেশ রক্ষার লড়াইয়ে পরাজিত হয়েও মানুষের মনে তিনি চিরদিন স্বাধীনতার স্পৃহায় অমর হয়েই থাকবেন, এটাই অকালপ্রয়াত নবাবের জন্য  শ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি।

(প্রাবন্ধিক আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক।)

 সহায়ক তথ্যসূত্র :

১) যদুনাথ সরকার ,  বেঙ্গল নবাবস, এশিয়াটিক সোসাইটি, কলকাতা ,১৯৫২

 ২) ডঃ সুশীল চৌধুরী, পলাশির অজানা কাহিনী, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।

৩) ড: মোহম্মদ মোহর আলি,  হিস্টরি অব দ্য মুসলিমস অফ বেঙ্গল, ২খন্ড ,রিয়াধ ১৯৮৮।

৪) অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, সিরাজদ্দৌলা, কল্লোল, কলকাতা।

৫) ড : সিরাজুল ইসলাম , বাংলাদেশের ইতিহাস , খন্ড ১ম ( ১৭৫৭-১৯৭১) সম্পাদনা , এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ ২০১৭ ।

৬) আ:কা: মো: যাকারিয়া, সিরাজউদ্দৌলা , প্রথমা , ঢাকা ।

;

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

  • Font increase
  • Font Decrease

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ও শিশুসাহিত্যিক ফখরুল হাসান। ২৩ জুন বিকেলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সংগীত ও নৃত্যকলা মিলনায়তনে তার হাতে সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ৬ লেখককে সম্মাননা, ‘শেখ হাসিনার জয় বিশ্বের বিস্ময়’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, আবৃত্তি, ছড়া পাঠ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

এ সময় সৈয়দ মাসুম, আর মজিব, এনাম আনন্দ, ফাহমিদা ইয়াসমিন, লুৎফর রহমান চৌধুরীকেও সম্মাননা দেওয়া হয়।

বঙ্গবন্ধু জন্মশতবর্ষ আন্তর্জাতিক পর্ষদ, বঙ্গবন্ধু লেখক পরিষদের আয়োজনে বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. শাহজাহান মৃধা বেনুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ও জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা।

প্রধান অতিথি ছিলেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন কবি অসীম সাহা, মারুফুল ইসলাম, তারিক সুজাত ও অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন।

কবিতা আবৃত্তি করেন জালাল উদ্দিন নলুয়া, ড. তপন বাগচী, শফিকুর রাহী, রিফাত নিগার শাপলা, আনতানুর হক, হানিফ খান, ইউসুফ রেজা, রোকশানা সাথী, জমশেদ ওয়াজেদ, মাসুদ আলম বাবুল, মাদবর রফিক, লুৎফর চৌধুরী, হাসনাইন সাজ্জাদী, গিয়াসউদ্দিন চাষা, হেনা খান, কৌমুদী নার্গিস, বোরহান মাসুদ, সৈয়দ একতেদার আলী, আলী নিয়ামত, মিহির কান্তি ভৌমিক, লুৎফা জালাল, তানিয়া মাহমুদ, শ্রাবণ রেজা, ইমরান পরশ, সৈয়দ তপু, মেরীনা সাঈদ, শাফিন প্রমুখ

;

সংশপ্তক শেখ হাসিনা



আবদুল হামিদ মাহবুব
আবদুল হামিদ মাহবুব

আবদুল হামিদ মাহবুব

  • Font increase
  • Font Decrease

 

সংশপ্তক শেখ হাসিনা

কাণ্ড অনেক করে

পদ্মা বুকে ‘পদ্মা সেতু’

ঠিক দিয়েছেন গড়ে।

 

কাণ্ড ওসব নয় সাধারণ,

ভুলতে কি আর পারি?

জয় বাংলা জোরসে হেঁকে

ঠিক তো দিলেন পাড়ি।

 

অপেক্ষাতে সবাই আছি

মনটা উচাটন

ওই দিনটা জানান দিয়ে

আসলো শুভক্ষণ!

 

বাংলাদেশের এমন জয়ে

বিশ্ব জানুক, কি সুখ?

সব বাঙালি বুকের পাতায়

সুখের গাথা লিখুক।

;