সারথি



গুলজার
অলঙ্করণ শতাব্দী জাহিদ

অলঙ্করণ শতাব্দী জাহিদ

  • Font increase
  • Font Decrease

অনুবাদ ফজল হাসান

গেইটওয়ে অব ইন্ডিয়া ঘাটের জেটি থেকে দিনের প্রথম বাষ্পচালিত ফেরী সকাল সাড়ে সাতটায় এলিফ্যান্টা কেইভ-এর উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। তাই মারুতিকে সকাল সাড়ে ছ’টার মধ্যে সেখানে হাজির হতে হয়। তার দৈনিক কাজকর্ম নির্ধারিত, যেমন ফেরীর পাটাতন ঝাড়ু দেওয়া, আগের রাতের যাত্রীদের ফেলে যাওয়া ময়লা জিনিসপত্র তুলে নেওয়া এবং সবশেষে পাটাতন ধুয়েমুছে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা। এক ফেরীর কাজ শেষ করেই সে অন্য ফেরীতে যায়। এই হলো তার নিত্যদিনের সাত-সকালের ধরাবাঁধা কাজের তালিকা।

মারুতির কাজে মনিব নারাসিংঘা রাও বেজায় খুশি, তবে তার মুখ অত্যন্ত জঘন্য। নিজের জিহ্বার প্রতি কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই এবং অশ্রাব্য গালিগালাজ লেগে থাকে ঠোঁটের ফাঁকে। তবে একথা সত্যি যে, সে যেসব শব্দ উচ্চারণ করে, আসলে তা বোঝাতে চায় না। কিন্তু তার প্রতিটি কথাই মারুতির কানে অশ্লীল শোনায়। নারাসিংঘা রাওয়ের পরনের লুঙ্গি উরুর উপরে বাঁধা থাকে। তার কপালে ছয়-আঙুল প্রশস্ত একটা বিশাল তিলক। সেখানে সে মলম মাখে। নিশ্চয়ই সে খুব সকালে ঘুম থেকে জেগে ওঠে।

মারুতির ধোয়ামোছার কাজ শেষ হলে ফেরীতে চড়ার জন্য নানান কিসিমের মানুষ এসে জেটিতে লাইন ধরে দাঁড়ায়। বিদেশি পর্যটকেরা, বিশেষ করে আমেরিকা এবং জাপান থেকে আগত, তাদের ট্যুর গাইডের তত্ত্বাবধানে দল বেঁধে জড়ো হয়। দিনের প্রথম ফেরীতে আরোহণ করার জন্য প্রায় সময়ই জেটির অনতিদূরে তাজ হোটেল থেকে পর্যটকরা ধীরেসুস্থে বেরিয়ে এসে জেটিতে পৌঁছে। তাদের হাতে থাকে ছোট ব্যাগ, মাথায় বিভিন্ন ধরনের হ্যাট এবং কাঁধে ঝোলানো থাকে ক্যামেরা ও বাইনোক্যুলার। দ্বিতীয় ফেরীতে কাজ করার সময় মারুতির মনে প্রথম ফেরীতে কাজ করার স্মৃতি মনে থাকে না। প্রথম ফেরী ছেড়ে যাওয়ার পরপরই যাত্রীরা দ্বিতীয় ফেরীতে ওঠার জন্য রীতিমত হুমড়ি খেয়ে পড়ে, এমনকি অনেক সময় মারুতির কাজ শেষ করার আগেই তারা উঠতে শুরু করে। তখন মারুতির চেহারা বিগড়ে যায়। কেননা দ্বিতীয় ফেরীর যাত্রীরা সৌখিন এবং ভদ্র নয়। উল্টোদিকে তাদের চাহিদা অনেক বেশি। তাই সে সকলের উদ্দেশ্যে গালিগালাজ না করে বরং হালকাভাবে অভিসম্পাত দেয়। ক্রমশ যাত্রীদের ওপর বিরক্তি জমা হয়ে ভারি হতে থাকে এবং তা তার শরীরের চামড়ায় কষাঘাত করে। রোদের তেজ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কষাঘাত আরো বেশি প্রকট হয়।

নারাসিংঘা রাও তিনটি ফেরীর মালিক। তার সবগুলো ফেরী গেইটওয়ে এবং এলিফ্যান্টার মাঝে যাতায়াত করে। ফেরীগুলো একপাশের যাত্রীদের উদরে পুরে অন্য পাশে নিয়ে উগড়ে দেয়। শুধু মেঝেতে পড়ে থাকে আবর্জনা, যেমন চানাচুরের খালি প্যাকেট, চিনাবাদামের খোসা, কমলার খোসা, চকলেট মোড়ানোর কাগজ, ক্যান্ডি, যাত্রীদের উদগীরণ, জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ির খালি প্যাকেট, ভাঙা নেকলেসের পুঁতি, কারো ফেলে যাওয়া টুপি এবং অন্য কারো রুমাল। এসব জিনিসপত্র তুলে পরিষ্কার করতে মারুতির হাত প্রায় অবশ হয়ে যায়।

সমুদ্রের পানিতে কোনো কিছু ছুঁড়ে ফেলার জন্য যাত্রীদের অনুমতি নেই। কিন্তু যাত্রীরা আকছার তাই করে। মারুতির চোখে পড়লেও সে কখনোই কাউকে বাধা দেয় না। যাত্রীরা যদি তার কাজ কিছুটা লাঘব করতে চায়, তাহলে সে বাধা দেওয়ার কে? ফেরীর পাটাতন থেকে বমি পরিষ্কার করা সবচেয়ে কঠিন কাজ। যারা জীবনে প্রথম সমুদ্র যাত্রা করে, প্রধানত তাদের মাঝেই বমি করার প্রবণতা বেশি। অনেকে রেলিংয়ের ওপর ঝুকে পড়ে এবং সেখানেই উদগীরণ করে। অনেক সময় তারা নিজেদের কাপড়চোপড়ে, এমনকি বসার বেঞ্চিতেও বমি করে। জোয়ারের সময় পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি খারাপ হয়। তখন যাত্রীদের মধ্যে অনেকেই যে সমস্ত খাবার গলাধঃকরণ করে, পুরোটাই উগড়ে দেয়। নারাসিংঘা রাও যাত্রীদের সতর্ক করে দিয়েছে যে, যারা বমি করবে, তারা তৎক্ষণাৎ ট্যাঙ্ক থেকে পানি তুলে নিজেরা পরিষ্কার করবে। প্রতিদিন নিচু হয়ে পাটাতন থেকে বমি সাফ করার জন্য মারুতির পিঠের ব্যথা বেড়ে দ্বিগুণ হয়। মাঝে মাঝে মনিব তাকে তাড়িয়ে দেয়। এসব ফেরীতে সে নিচুশ্রেণির লোকজনের মধ্যেও নিম্নতম—সে আসলে মেথর—সাধারণ ঝাড়ুদার। সুতরাং যাত্রীরা যা চায়, তারা তাই করতে তাকে বাধ্য করে। ফেরীর সারেং বাক্স করে দুপুরের খাবার নিয়ে আসে, কিন্তু সেই খাবার সে থালায় নিয়ে খায়। মারুতি ময়লা লাঞ্চবাক্স এবং থালাবাসন ধুয়েমুছে পরিষ্কার করে এবং ঝুড়িতে রাখে, যেন বিকেলে যাওয়ার সময় সারেং বাড়ি নিয়ে যেতে পারে।

উত্তাল সমুদ্রের মাঝে মারুতি প্রতিদিন পুরো দশঘণ্টা কাজ করে। ফেরী যখন অন্য ঘাটে পৌঁছে, তখন কঠোর পরিশ্রমের জন্য তার হাড়মাংস ব্যথা করে। সেই সময় কাজ করার মতো শরীরে কোনো শক্তি থাকে না।

মারুতির মাকে নারাসিংঘা রাও কটূক্তি করেছে এবং জবাবে মারুতির মা বলেছে, ‘তাহলে আপনি কেন ফেরী পরিষ্কার করেন না … তা নাহলে সকালে আপনি নিজেই নিজের পাছা চাপড়াবেন।’

মালিকের কথার পিঠে কথা বলার শক্তি নেই মারুতির। সে শুধু আকারে-ইঙ্গিতে বলল, ‘সকালে … এখন শ্বাস ফেলার মতো শক্তি নেই।’ তার মনে হয়, সমস্ত অঙ্গপত্যঙ্গ যেন প্রাণহীন।

জনতার ভীড়ের মাঝে ফাঁকফোকর গলিয়ে মারুতি কোনোভাবে চার্চগেইটের কাছে পৌঁছে। তারপর সে স্থানীয় ট্রেনে চড়ে। ক্লান্তিতে তার শরীর নুইয়ে পড়ে এবং চোখের পাতা বন্ধ হয়ে আসে। যোগেশ্বরীতে যাত্রীরা প্রায় তাকে ধাক্কা দিয়ে ট্রেন থেকে নামিয়ে দেয়। এ-টা নিত্যদিনের ঘটনা।

মারুতি কোনোভাবে শরীরে সামান্য শক্তি সঞ্চয় করে এবং রীতিমত টলতে টলতে বড় রাস্তার পাশে উঁচু জায়গায় গিয়ে দাঁড়ায়। সেখানে শহরতলী সাওয়ান্ত নগরে যাওয়ার ১০৯ নম্বর বাস থামে। অন্য সব দিনের মতো তুলসিবাই কলসি থেকে চকচকে বাটিতে পানি ঢালে এবং হাতে নিয়ে বলে, ‘ক্লান্ত? এই নাও, খাও।’

মারুতি কনুই দিয়ে দেহের ভর রক্ষা করে এবং এক নিঃশ্বাসে পুরো বাটির পানি পান করে। তার মনে হয়, পান করা পানি যেন গলা ভিজিয়ে মুহূর্তেই শরীর-মনকে শীতল করেছে।

তুলসি এসে মারুতির পাশে খাটিয়ায় বসে এবং ব্যথায় কাতর পায়ে চাপ দিয়ে দিনের সব ঘটনা একের পর এক বলতে শুরু করে।

শ্বশুরবাড়ি থেকে লক্ষী এসেছে। ওর শ্বশুর-শাশুড়ি নাসিকে গিয়েছে।

মারুতি চোখের পাতা বন্ধ করে। পলকে মুহূর্ত সময় চলে যায়। তুলসি আরেকবার বলল, ‘ছোট্টি খুব দুষ্ট হয়েছে … ভাবতে পারো, আমাকে সে নানী ডাকে! এবং তোমাকে তোমার নাম ধরে ডাকে। সে জিজ্ঞাসা করে, তুমি কখন আসবে … আধো বুলি এবং তোতলামির ভঙ্গিতে বলে, ‘মালুতি কখন আসবে? কখন?’

মারুতির দুশ্চিন্তাপীড়িত মুখমণ্ডলে এক টুকরো হাসি ফুটে উঠে, যা তার সারা মুখের ওপর জমে থাকা ক্লান্তির রেখা মুছে দেয়।
‘সে হিন্দীতে কথা বলে!’
‘ওহ্, হ্যাঁ।’
‘মারাঠি শিখেনি?’
‘শিখে নিবে। এখনও ঢের সময় আছে।’
মারুতির শরীর থেকে সারাদিনের ক্লান্তি-অবসাদ ক্রমশ মিলিয়ে যেতে থাকে। ভাঁজ করা বাহুর ওপর সে মাথা এলিয়ে দেয়।
‘ওরা কেমন করে ফিরে গেছে?’
‘ওরা যায়নি … সিনেমা দেখতে গেছে।’
‘ছোট্টিও?’
‘পুচকি দুষ্টটা এক মুহূর্তের জন্যেও মাকে কোথাও যেতে দেয় না। মা কী করবে? তাই ওরা সঙ্গে করে নিয়ে গেছে।
মারুতি ঘোঁতঘোঁত করে একটা দীর্ঘশ্বাস টেনে নেয় বুকের ভেতর।
‘এবং কার্তিক? সে কোথায়?’
‘আজ আবারও সে স্কুলে কার সঙ্গে মারামারি করেছে।’
‘হারামজাদা …!’
মারুতি চট করে ঘোরে এবং উঠে দাঁড়ায়।
‘হতচ্ছারা, প্রতিদিন স্কুলে মার খায় এবং বাড়ি আসে … ভিতু কোথাকার। ঘটি। মারাঠিদের জন্য সে রীতিমত লজ্জাজনক!’
তুলসিও উঠে দাঁড়ায়।
‘যাও … হাত-মুখ ধুয়ে এসো … আমি পোহা রান্না করেছি … সামান্য খেয়ে নাও।’

মারুতি একটা তোয়ালে টেনে নেয় এবং স্নান করার জন্য এক কোণে মাথা নিচু করে বসে। ‘আমার ধূতি-কুর্তা নিয়ে এসো,’ সে বলল।

চুলায় আগুন জ্বলছে। বাতিও জ্বলছে। ঘরের ভেতর মারুতি হাত ভাঁজ করে মূর্তির সম্মুখে উপাসনা করে এবং বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়ে। তার পরনে ধোওয়া ধূতি-কুর্তা।

কার্তিক ঘরে প্রবেশ করে। মারুতি রীতিমত কার্তিকের ওপর ঝাপিয়ে পড়ে এবং দু’হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে হালকাভাবে বিছানায় ছুঁড়ে দেয়। তারপর সে কার্তিককে চেপে ধরে আদর করে।
‘এসো, দুষ্ট। এসে আমার সঙ্গে কুস্তি করো।’

কার্তিকের সুড়সুড়ি লাগে ।

মারুতি বলল, ‘কাল থেকে শরীরে সরিষার তেল মাখবে, আখড়ায় যাবে এবং সেখানে কুস্তি শিখবে।’
কার্তিক হাসতে থাকে। বাতাসে কেরোসিনের জ্বলন্ত চুলার শোঁ শোঁ শব্দের মাঝেও তুলসি সব কিছু শুনতে পেয়ে বলল, ‘কেন ওকে এসব বাজে জিনিস শেখার কথা বলছো?’
‘ওকে আমি সঠিক জিনিস শেখার কথাই বলেছি। একজন মারাঠির ছেলে হবে অতিশয় বুদ্ধিমান মারাঠি।’

বাবু দরজার বাইরে এসে দাঁড়ায় এবং ঘর থেকে বেরিয়ে আসার জন্য মারুতিকে ডাকে।

‘কী বললে, মারুতি? পাটকারের সভায় যেতে চাচ্ছো?’
খোলির ভেতর থেকে মারুতি বলল, ‘হায় কপাল, তোমার কি আদৌ কোনো ধারণা আছে যে, লোকজন সেখানে কেন যায়? আমার বউ বলেছে, ওখানে গিয়ে তোমরা সবাই আন্ডা চুলকাও।’
হেঁশেল থেকে তুলসি দু’জনকেই অভিসম্পাত করে, ‘ধিক্, তোমাদের দূর্ভোগ!’

মারুতি বের হয়ে আসে।

‘শুনেছো, বউ কী বলেছে?’

স্থানীয় মদিরার কারখানায় সভা শেষে তারা বাক-বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ে। তারা বাবা আমবেটকার থেকে মেধা পাটকার, চবন থেকে পাওয়ার—সবাইকে নিয়ে চুলচেরা আলোচনা-সমালোচনা করে।

মাঝ রাতে যখন কয়েকজন মাতাল সরু রাস্তার নিস্তব্ধতাকে ভেঙে চুরমার করে, তখন তুলসি বিছানা ছেড়ে ওঠে। সে চুলা জ্বালিয়ে পুনরায় খাবার গরম করে। বারান্দার তার মেয়ের জামাই ঘুমিয়েছে। মারুতির বিছানা মেয়ের জামাইয়ের পাশে। মারুতি ঘরের ভেতর ঢোকে এবং আপন মনে হাসে। কার্তিক কাঠের বিছানায় ঘুমিয়ে আছে। লক্ষীও গভীর ঘুমে বিভোর। তার পাশেই পিচ্চিটা দোলনায় ঘুমিয়ে আছে। মারুতি পিচ্চির মাথায় হাত রাখে এবং গাল টিপে। তারপর পিচ্চির ঠোঁট টিপে সে অনুকৃতি করে বলল, ‘মালুতি এসেছে।’

তুলসি তিরস্কারের ভঙ্গিতে বলল, ‘ওকে ঘুমাতে দাও। এখন জাগাতে হবে না।’

লক্ষী জেগেছে। সে বাবাকে জড়িয়ে ধরে। ছোট্টিও উঠে গেছে। কার্তিক অন্যপাশে ঘুরে শোয় এবং বিড়বিড় করে, ‘বাপু!’ মেয়ের জামাই মাথা নুইয়ে মারুতির পা ছোঁয়।

এখন মারুতি নিচুশ্রেণির লোকজনের মধ্যে নিম্নতম নয় … এমনকি মেথরও নয়। সে পুরো পরিবারের ক্যাপ্টেন, একজন সারথি, যে সাতটি ঘোড়ায় বাঁধা রথের চালক।

[মূল গল্পে পাদটীকা নেই। পাঠকের সুবিধার্থে অপরিচিত শব্দের ব্যাখ্যা দেওয়া হলো। - অনুবাদক]।
ব্যাঙ্গাত্বক শব্দ, যা মহারাষ্ট্রের বংশধর কিংবা সেই এলাকার লোকজনকে কৌতুক করে বলা হয়। সাধারণত সংস্কৃতিহীন এবং অশিক্ষিত লোকদের বোঝাতে ‘ঘটি’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়।
চিড়া দিয়ে তৈরি একধরনের হালকা খাবার। অল্প ভাজা চিড়ার সঙ্গে বাদাম, মনাক্কা, এলাচি এবং স্বাদ অনুযায়ী চিনি মিশিয়ে মধ্যপ্রদেশে সকালের নাস্তা হিসাবে পোহা খাওয়ার রেওয়াজ আছে। অন্যদিকে মহারাষ্ট্রে হালকা ভাজা সরিষা, হলুদ, কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজকুচি ও বাদামের সঙ্গে চিড়া ভেজে মশলাযুক্ত ঝোলের সঙ্গে মিশিয়ে পোহা রান্না করা হয়। ভারতের পশ্চিমাঞ্চলে পুদিনার চাটনি দিয়েও নাস্তা হিসাবে পোহা খাওয়া হয়।
যেখানে থাকা-খাওয়ার সঙ্গে ভারতীয় মার্শাল আর্টস্ শেখানো হয় অথবা ধর্মীয় শিক্ষা লাভ করে সন্ন্যাসী হওয়া যায়।
মারাঠি বা হিন্দিতে এক কক্ষের ঘর। তবে অনেক ক্ষেত্রে অ্যাপার্টমেন্টের প্রতিশব্দ হিসাবেও ব্যবহার করা হয়।

গুলজার ভারতের প্রথিতযশা গীতিকার, চিত্রনাট্যকার, চলচ্চিত্র পরিচালক, কবি, ছোটগল্প লেখক এবং ঔপন্যাসিক। তাঁর আসল নাম সাম্পুরাণ সিং কালরা। তৎকালীন অখণ্ড ভারতের পাঞ্জাব (বর্তমানে পাকিস্তানে) প্রদেশের ঝিলাম জেলার দিনা শহরে তিনি ১৯৩৪ সালের ১৮ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন। মূলত হিন্দি, উর্দু এবং পাঞ্জাবি ভাষায় সাহিত্য রচনা করলেও ভারতের বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষায় লেখালেখি করেন। ‘টু’ তাঁর একমাত্র উপন্যাস, যা ভারত-পাকিস্তান বিভক্তির পরে শরণার্থীদের করুণ কাহিনী নিয়ে রচিত। তিনি তিনটি কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন। ‘রাভি পার অ্যান্ড আদার স্টোরিজ’ (১৯৯৭) এবং ‘হাফ এ রুপি স্টোরিজ’ (২০১৩) ইংরেজিতে প্রকাশিত তাঁর ছোটগল্প সংকলন। তবে ‘রাভি পার অ্যান্ড আদার স্টোরিজ’ থেকে চারটি গল্প নিয়ে ২০০২ সালে প্রকাশিত হয়েছে ‘সীমা অ্যান্ড আদার স্টোরিজ’। কাব্যিক ভাষায় চরিত্র চিত্রণের, বিশেষ করে শব্দ প্রয়োগের, জন্য তাঁকে ‘মাস্টার ওয়ার্ডস্মিথ’ বা ‘শব্দ কারিগর’ হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়।

গুলজারের কর্মজীবন শুরু হয়েছে সঙ্গীত পরিচালক হিসাবে। পরবর্তীতে তিনি গীতিকার, চিত্রনাট্যকার এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসাবে সুপরিচিতি লাভ করেন। গীতিকার হিসাবে তিনি ২০০৪ সালে ‘পদ্ম ভূষণ’ এবং ২০০২ সালে ‘সাহিত্য অ্যাকাডেমি’ পুরস্কার অর্জন করেন। এছাড়া তিনি ‘দাদাসাহেব ফালকে’ পুরস্কারসহ একাধিক জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড লাভ করেছেন। ‘স্লামডগ মিলিনিয়র’ চলচ্চিত্রের গান ‘জয় হো’ সঙ্গীত রচনার জন্য তিনি অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড এবং গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডও অর্জন করেছেন। তিনি ২০১৩ সালের এপ্রিলে আসাম ইউনিভার্সিটির চ্যান্সেলার হিসাবে নিযুক্ত হন। ১৯৭৩ সালে বলিউডের বিখ্যাত নায়িকা রাখীর সঙ্গে ‘সাত পাকে বাঁধা’ পড়েন।

গল্পসূত্র
‘সারথি’ গল্পটি গুলজারের ইংরেজিতে অনূদিত ‘দ্য চ্যারিওটিয়্যার্স’ গল্পের অনুবাদ। হিন্দি থেকে গল্পটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন সঞ্জয় শেখর। গল্পটি লেখকের ‘হাফ এ রুপি স্টোরিজ’ ছোটগল্প সংকলন থেকে নেওয়া।

ওমিক্রণে থমকে গেছে বইমেলার আয়োজন



সজিব তুষার, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

এবারও থমকে গেছে লেখক পাঠকের প্রাণের আসর অমর একুশে বইমেলা প্রাঙ্গণ। তুমুল উৎসাহ আর ব্যাপক উদ্দীপনা নিয়ে কাজ শুরু হলেও কোভিড- ১৯ এর ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট আতঙ্ক থামিয়ে দিয়েছে কাজ। একটা বড় অংশের কাঠামো তৈরি হয়ে গেলেও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাঙ্গণে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরে আছে গর্ত আর স্তূপ স্তূপ বাঁশ।

বরাবরের মত এ বছরেও ১ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়ার কথা অমর একুশে বইমেলা-২০২২। সে অনুযায়ী, কাজ শুরু করে দিয়েছিলো আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি। প্রায় শেষ হয়ে এসেছিলো প্রকাশনী গুলোর রেজিস্ট্রেশন ও লটারি পূর্ববর্তী কার্যক্রম। কাজ চলার মাঝেই বাঁধ সাধে বৈশ্বিক মহামারী কোভিড-১৯ নতুন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রন।

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

গত ১৬ জানুয়ারি সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ গণমাধ্যমকে জানান, 'করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতির কারণে আপাতত দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিত করা হয়েছে বইমেলা। মেলার পূর্ণ প্রস্তুতি রয়েছে বাংলা একাডেমির। সংক্রমণ পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকেই শুরু করা যেতো বইমেলা'। 

সরকারের এই ঘোষণার পর থমকে গেছে পুরো উদ্যমে শুরু হওয়া মেলার স্টল তৈরির কাজ। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গিয়ে দেখা যায়, স্টল তৈরির জন্য মাঠে কাঠামোর বেশ খানিকটা তৈরি হয়ে আছে। জায়গায় জায়গায় পুঁতে রাখা রয়েছে বাঁশ। কিন্তু কাজ করতে দেখা যায়নি কোনও শ্রমিককে।

এবারের বই মেলায় প্রথম বই প্রকাশ হবে এমন এক তরুণ লেখক বায়েজিদ হোসেন বলেন, 'ফেব্রুয়ারিতে বইমেলা আমাদের রক্তে গেঁথে গেছে। বৈশ্বিক মহামারী করোনার তোপে পণ্ড হয় গতবারের মেলাও। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো রাস্তায় বসে যাবে। এমন চলতে থাকলে খুব দ্রুতই অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হবেন তারা। এখন পর্যন্ত যেটুকু টিকে আছে সেটা নষ্ট করে ফেললে; শিল্প সংস্কৃতির আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না'।

যথোপযুক্ত স্বাস্থ্যবিধি মেনে বইমেলা সঠিক সময়ে শুরু করার পক্ষে কথা বলেন তিনি।

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গ্রন্থিক'র প্রকাশক রাজ্জাক রুবেল বলেন, 'গতবারের মেলার অভিজ্ঞতার পর এবছর আর রিস্ক নেব বলে মনে হচ্ছে না। সম্ভব হলে জমা দেওয়া টাকাটা ফেরত আনার ব্যবস্থা করবো'।

স্টলের রেজিস্ট্রেশন ও অন্যান্য বাবদ খরচের কথা উল্লেখ করে বলেন, 'দুটা স্টলের জন্য জমা দিতে হয়েছে আগের থেকেও বেশি। ডেকোরেশন খরচ। স্টলের লোকের খরচ। তাদের এমন সিদ্ধান্তে আমি কোনভাবেই লস আটকাতে পারবো না'।

এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমিতে গেলে কেউ কিছু বলতে পারেন নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মচারী জানান, "মহাপরিচালক- প্রকাশক ও সংশ্লিষ্টদের সাথে মিটিং করে সিদ্ধান্ত জানানো পর্যন্ত কেউ কিছু বলতে পারবো না"।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে থেকে তোলা বইমেলার প্রস্তুতিকালীন কাজের একাংশের ছবি। ছবি- বার্তা২৪.কম

 

এর আগে বইমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ও বাংলা একাডেমির পরিচালক জালাল আহমেদ গণমাধ্যমকে জানান, স্বাস্থ্যবিধি মেনে পহেলা ফেব্রুয়ারি থেকেই নেওয়া হচ্ছে বইমেলা শুরুর প্রস্তুতি। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গত বছরও মহামারী করোনাভাইরাসের কারণে দেড় মাস পিছিয়ে ১৮ মার্চ থেকে শুরু হয় অমর একুশে বইমেলা। আবার নির্ধারিত সময়ের দুদিন আগে ১২ এপ্রিলই টানে ইতি। সম্প্রতি করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় বিধিনিষেধ আরোপ করেছে সরকার। তবে দু'সপ্তাহ পিছিয়ে দিলে আদতে বই মেলা হবে কি না এ নিয়ে সন্দিহান অনেকেই। বইমেলা মানেই হাজার মানুষের ভিড়। লেখক পাঠকের সমারোহ। তবে একের পর এক মেলায় ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকলে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গুলো মেলা করবে কি না তা নিয়েও শঙ্কায় আছেন সচেতন মহল।

স্বাস্থ্যবিধি মেনেই মেলা হোক চান বড় একটা অংশের নেটিজানরা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে বেশ আলোচনাও তুলছেন তারা।


উল্লেখ্য, মুক্তধারা প্রকাশনীর মালিক চিত্তরঞ্জন সাহা বাংলা একাডেমির গেইটে ১৯৭২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষা দিবসের অনুষ্ঠানে চট বিছিয়ে শুরু করেন বই বিক্রি। ১৯৭৭ সালে তার সঙ্গে যোগ দেন আরও অনেকে। ১৯৭৮ সালে এ বইমেলার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয় বাংলা একাডেমিকে। তখন মহাপরিচালক ছিলেন আশরাফ সিদ্দিকী। পরের বছরই বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি যুক্ত হয় মেলার সঙ্গে।

মনজুরে মওলা বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্বে থাকার সময় ১৯৮৩ সালে 'অমর একুশে গ্রন্থমেলা' নামে এ মেলা আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হলেও তা আর করা যায়নি। পরের বছর বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গণে আসর বসে 'অমর একুশে বইমেলা'র। ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি জুড়ে কাগজের বইয়ের মুহুর্মুহু গন্ধ মাখা বইমেলাই যেন দর্শনার্থীদের মনে করিয়ে দেয় ভাষা সংগ্রামের কথা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঢাকার জ্যাম ঠেলেও ফেব্রুয়ারিতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাণের গন্তব্য হয়ে দাঁড়ায় ভাষা ও বইপ্রেমী মানুষের কাছে। সবাই চায় বইমেলা ফিরে পাক তার আগের জৌলুশ। বইয়ের সাথে ভবিষ্যত প্রজন্মের এই মিল বন্ধনের পুণ্যভূমি বেঁচে থাকুক সব অশুভ ছায়া থেকে।

;

অন্বেষণ মানে তো খোঁজ, এই খোঁজ হল আত্ম-অন্বেষণ...



সুবর্ণা মোর্শেদা, চিত্রশিল্পী
সুবর্ণা মোর্শেদা

সুবর্ণা মোর্শেদা

  • Font increase
  • Font Decrease

নিজেকে খোঁজার যে তাগিদ, আমার মধ্যে সেটা সবসময়ই কাজ করে। এই তাগিদ থেকেই আমার কাজের শুরু বলা যেতে পারে। সবসময় মনে হয়, নিজেকে খোঁজার চেয়ে কঠিন কিছু নাই। গত দুই বছরে সেই খোঁজার তাগিদ আরো তীব্র হয়ে উঠেছে। এই সময়ে অন্যদের সঙ্গে যখন কথা বলেছি, তার মাঝেও নিজেকেই খোঁজার চেষ্টা চলতো। লকডাউনের বেশ আগে থেকেই নিজেকে অনেক বেশি আইসোলেশনে নিয়ে যাই আমি—একটা নিরঙ্কুশ একাকীত্বের মধ্যে চলে আত্ম-অনুসন্ধানের কাজ। সো, লকডাউন আমার জন্য খুব নতুন কিছু ছিলো না। শুধু বাবা-মায়ের সঙ্গে নতুন করে থাকাটা ছিলো একেবারে নতুন।


২০১৯-এর একটা সময় আমি খুব অন্ধকারে ডুবে যাই। স্বভাবগত দিক থেকে রঙিন মানুষ হয়েও একটা গভীর ব্যক্তিগত কারণে আমার জীবন হয়ে পড়ে সম্পূর্ণ সাদা-কালো। আর এ সময়টাতেই নিভৃতে অনেকগুলো কাজ করে ফেলি। কখনো লিথোগ্রাফ, কখনো পেন্সিল স্কেচ আর কাগজে সেলাই করে করা এ-কাজগুলোই আমাকে সেই গভীর অন্ধকারেও বেঁচে থাকার প্রেরণা যুগিয়েছে। কাগজে সেলাই করে শিল্পকর্ম নির্মাণের একটা আলাদা আনন্দ আছে। সেটা হলো স্পর্শের আনন্দ।


এই স্পর্শকে কেমন করে দেখাবো! সেলাইয়ের উঁচু-নিচু অংশগুলোকে আমি বলি স্পর্শের প্রতীক। এর মধ্য দিয়ে স্পর্শের অনুভূতিকে অন্যের মনে সঞ্চার করা যায়। বড় হওয়ার পর, জীবনে এই প্রথম আমি মায়ের সাথে বাবার সাথে এতো দীর্ঘ সময় আমি কাটানোর অবকাশ পেয়েছি। আমার মায়ের গাছ লাগানোর শখ অনেক আগে থেকেই। সেই শখ লকডাউনে আরো তীব্র হলো।

তাঁর লাগানো গাছগুলো যতো বড় হচ্ছিলো, আর তাঁর বয়স যেন ততোই কমছিলো। গাছে ফল ধরা, ফুল ধরা দেখে তাঁর কী যে এক আনন্দ! সব মিলে যেন এক অপার্থিব অনুভূতি! তো, আমি তাঁকে একজন সফল চাষী হিসেবে ঘোষণা করলাম। দীর্ঘদিন ধরে আমি গন্ধ, স্পর্শ নিয়ে কাজ করি। এবার মায়ের গন্ধের সঙ্গে যোগ হলো মায়ের বাগানের গন্ধ-স্পর্শ।


গাছগুলোর পাতা যখন ঝরে পড়ে, সে-পাতার রং, শেইপকে আমার কাজের সঙ্গে সংযুক্ত করা আর স্পর্শগুলোকে ধরার জন্যই আমার কাগজে সেলাই করার কাজ। আমার ঘুমের সমস্যা আছে। রাতে ঘুম হয় না বা হতো না সেই অন্ধকার সময়গুলোতে। ঘুম না হওয়ার কারণে যে সকালে খারাপ লাগতো তা-ও না। সকালের গন্ধ আমার খুব প্রিয়।


এরমধ্যেই হলো মায়ের করোনা। দীর্ঘ ১ মাস ধরে মায়ের সিরিয়াস কন্ডিশন । আমি বুঝতে পারতাম, গাছগুলোও মাকে খুব মিস করছে। এদিকে মা তো হসপিটালে অক্সিজেন নিতে ব্যস্ত! ২৪ ঘন্টাই মায়ের সঙ্গে থাকি। তাঁর অক্সিজেন স্যাচুরেশন কমে যাওয়া-- কখনও ভালো, কখনও মন্দ। অবশেষে মায়ের জয়ী হয়ে ঘরে ফেরা। তাঁর সঙ্গে আবার তাঁর গাছেদের সেই নিবিড় সম্পর্ক--গভীর বন্ধুত্ব!

পুরো সময়টাই যেন কবিতার মত, প্রেমের কবিতা! আমার সাদা-কালো ক্যানভাসে ছড়িয়ে দেওয়া রঙের মত! অন্ধকারে অপরূপ আলোর মত। আমার ছবিগুলো যেন জীবনের মত! আমার জীবন যেন আমার ছবির মতো!

সকলকে আমন্ত্রণ!


চিত্রকর্ম প্রদর্শনী: ‘অন্বেষণ’
শিল্পী: সুবর্ণা মোর্শেদা (তৃতীয় একক প্রদর্শনী)
স্থান: ইএমকে সেন্টার
প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন: অধ্যাপক জামাল আহমেদ, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, তাওহিদা শিরোপা।
মাধ্যম: লিথোগ্রাফ, সায়ানোটাইপ, পেন্সিল স্কেচ, জলরংসহ বিভিন্ন মাধ্যম
সংখ্যা: মোট ৪২টি শিল্পকর্ম
চলবে: ১৫-৩০ জানুয়ারি
শো কিউরেটর: রেজাউর রহমান

;

কল্পনা ও ইতিহাসের ট্রাজিক নায়িকা আনারকলি



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

আনারকলির নাম উচ্চারিত হলে উত্তর-পশ্চিম ভারতের আবহে এক করুণ-মায়াবী প্রেমকাহিনী সবার মনে নাড়া দেয়। ইতিহাস ও কল্পকথায় আবর্তিত এই রহস্যময়ী নতর্কীর পাশাপাশি শাহজাদা সেলিম তথা সম্রাট জাহাঙ্গীর, সম্রাট আকবর, সম্রাজ্ঞী যোধা বাঈ চোখের সামনে উপস্থিত হন। ভেসে আসে পরামক্রশালী মুঘল আমলের অভিজাত রাজদরবার ও হেরেম। ব্রিটিশ ঔপনিবেশ-পূর্ব উপমহাদেশের ঐতিহ্য, সমৃদ্ধি, সাংস্কৃতিক দ্যুতি, বহুত্ববাদী পরিচিতির রাজকীয় অতীত এসে শিহরিত করে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের দেশগুলোর নাগরিকদের। 

১৫২৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ১৮৫৭ সালে অস্তমিত ৩৩১ বছরের বিশ্ববিশ্রুত মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাসে বহু সম্রাট, শাহজাদা, শাহজাদীর নাম বীরত্বে ও বেদনায় লিপিবদ্ধ রয়েছে। কিন্তু আনারকলির নাম বিশ্বস্ত ঐতিহাসিক বিবরণের কোথাও লেখা নেই, যদিও মুঘল হেরেমের এই রহস্যময়ী নারীর নাম আজ পর্যন্ত শিল্প-সাহিত্য-চলচ্চিত্র ও লোকশ্রুতিতে প্রবাহিত হচ্ছে। সম্রাজ্ঞী, শাহজাদী কিংবা কোনও পদাধিকারী না হয়েও মুঘল সংস্কৃতির পরতে পরতে মিশে থাকা কে এই নারী, আনারকলি, যিনি শত শত বছর ধরে মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হচ্ছেন, এমন জিজ্ঞাসা অনেকেরই। ইতিহাসে না থাকলেও শিল্প, সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে চিত্রিত হচ্ছেন তিনি অকল্পনীয় জনপ্রিয়তায়। ইতিহাস ও মিথের মিশেলে তাকে নিয়ে আখ্যান ও কল্পকথার কমতি নেই। তার নামে প্রতিষ্ঠিতি হয়েছে মাজার, সমাধি স্মৃতিসৌধ, প্রাচীন বাজার, মহিলাদের পোষাকের নান্দনিক ডিজাইন। ইতিহাসের রহস্যঘেরা এই নারীকে নিয়ে নির্মিত হয়েছে ইতিহাস সৃষ্টিকারী চলচ্চিত্র ‘মুঘল-ই-আজম’। রচিত হয়েছে অসংখ্য গ্রন্থ ও গবেষণা।

যদিও বাংলা ভাষায় আনারকলিকে নিয়ে আদৌ কোনও গ্রন্থ রচিত হয়নি, তথাপি উর্দু সাহিত্যে তাকে নিয়ে রয়েছে একাধিক নাটক ও উপন্যাস। ইংরেজিতে রয়েছে বহু গ্রন্থ। বিশেষত উর্দু ভাষার বলয় বলতে উত্তর ও পশ্চিম ভারতের যে বিশাল এলাকা পূর্বের বিহার থেকে পশ্চিমে পাঞ্জাব পর্যন্ত প্রসারিত, সেখানে আনারকলি একটি অতি পরিচিত ও চর্চিত নাম। সাহিত্যে ও লোকশ্রুতিতে তিনি এখনও জীবন্ত। অবিভক্ত পাঞ্জাবের রাজধানী লাহোরে রয়েছে আনারকলি মাকবারা। মাকবারা হলো কবরগাহ, সমাধিসৌধ। মুঘল স্মৃতিধন্য শহর দিল্লি, লাহোরে আছে আনারকলি বাজার। সাহিত্য ও লোককথার মতোই আনারকলিকে নিয়ে নির্মিত নানা লিখিত ও অলিখিত উপাখ্যান। 

অথচ মুঘল রাজদরবার স্বীকৃত ইতিহাস বিষয়ক গ্রন্থগুলোর কোথাও উল্লেখিত হন নি আনারকলি। প্রায়-প্রত্যেক মুঘল রাজপুরুষ লিখিত আকারে অনেক স্মৃতি ও ঐতিহাসিক বিবরণ লিপিবদ্ধ রাখলেও তার নাম আসে নি কোনও মুঘলের আত্মস্মৃতি বা ইতিহাস গ্রন্থে। তাহলে কেবলমাত্র একটি কাল্পনিক চরিত্র হিসেবে তার নাম অর্ধ-সহস্র বছর ধরে লোকমুখে প্রচারিত হলো কেন এবং কেমন করে? সত্যিই আনারকলি বলে কেউ না থাকতেন কেমন করে সম্ভব হলো পাঁচ শতাধিক বছর ধরে নামটি টিকে থাকা? এসব খুবই বিস্ময়কর বিষয় এবং আশ্চর্যজনক ঐতিহাসিক প্রশ্ন।

ভারতবর্ষে মুঘল ইতিহাসের এক রহস্যময় নারী চরিত্র রূপে আনারকলিকে নিয়ে আগে বহু চর্চা হলেও সবচেয়ে সফল ও ব্যাপকভাবে তিনি চিত্রিত হয়েছেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের কেন্দ্রস্থল বলিউডের ইতিহাস সৃষ্টিকারী সেরা জনপ্রিয় ও ব্যবসা সফল ছবি ‘মুঘল-ই-আজম’-এ। ছবির কাহিনী মুঘল-ই-আজম তথা শাহানশাহ জালালউদ্দিন মোহাম্মদ আকবরের দরবারে আবর্তিত। আকবরপুত্র শাহজাদা সেলিম, যিনি পরবর্তীতে হবেন সম্রাট জাহাঙ্গীর, মুঘল দরবারের এক নবাগত নর্তকী আনারকলির প্রেমে বিভোর। দীর্ঘ ছবিটি সেলিম-আনারকলির প্রণয়ের রোমান্টিকতায় ভরপুর। কিন্তু সম্রাট আকবর সেই ভালোবাসা মেনে নিতে নারাজ। প্রচণ্ড ক্রোধে আকবর আনারকলিকে শাহজাদার জীবন থেকে সরিয়ে দিয়েই ক্ষান্ত হন নি, সম্রাটপুত্রকে ভালোবাসার অপরাধে তুচ্ছ নর্তকী আনারকলিকে জীবন্ত কবরস্থ করেন। 

প্রশ্ন হলো, সত্যিই যদি আনারকলি নামে কোনও চরিত্র না-ই থাকবে, তাহলে এতো কাহিনীর উৎপত্তি হলো কেমন করে? সাহিত্যে ও চলচ্চিত্রে আনারকলিকে কেন্দ্র করে যা বলা হয়েছে বা দেখানো হয়েছে, তার সত্যতা কতটুকু? সত্যিই কি আনারকলিকে জীবন্ত কবর দেওয়া হয়েছিল? নাকি আনারকলি বলে ইতিহাসে কোনও চরিত্রই ছিল না? নাকি সব কিছুই লোকমুখে ছড়িয়ে পড়া কোনও মিথ, উপকথা বা গল্প? এসব প্রশ্নের উত্তর শত শত বছরেও মেলে নি।

আনারকলি যদি ‘কাল্পনিক’ হবেন, তাহলে, মুঘল আমলে ভারতে আগত ইংরেজ পরিব্রাজকের বর্ণনায়, লখনৌর লেখকের উপন্যাসে, লাহোরের নাট্যকারের নাটকে, বলিউডের একাধিক সিনেমায় আনারকলি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হবেন কেন? কেন শত শত বছর কোটি কোটি মানুষ আনারকলির নাম ও করুণ ঘটনায় অশ্রুসিক্ত হচ্ছেন? কেন আনারকলির নামে ভারতের প্রাচীন শহরগুলোতে থাকবে ঐতিহাসিক বাজার? লাহোরে পাওয়া যাবে তার কবরগাহ, যেখানে শেষ বয়সে শাহজাদা সেলিম তথা সম্রাট জাহাঙ্গীর হাজির হয়ে নির্মাণ করবেন সমাধিসৌধ আর রচনা করবেন করুণ প্রেমের কবিতা?

এসব প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানের জন্যে ‘কিছুটা ঐতিহাসিক, কিছুটা কাল্পনিক চরিত্র আনারকলি’ ও তাকে ঘিরে প্রবহমান প্রাসঙ্গিক ঘটনাবলীর ঐতিহাসিক পর্যালোচনা ভিত্তিক এই রচনা। আমার রচিত ‘দারাশিকোহ: মুঘল ইতিহাসের ট্র্যাজিক হিরো’ (প্রকাশক: স্টুডেন্ট ওয়েজ) গ্রন্থটি পাঠকপ্রিয়তা লাভ করায় মুঘল মূল-ইতিহাসের বাইরের এই রহস্যময়ী চরিত্র ও আখ্যানকে বাংলাভাষী পাঠকের সামনে উপস্থাপনে উৎসাহী হয়েছি। উর্দু ও ইংরেজিতে আনারকলির ঘটনাবলী ও প্রাসঙ্গিক ইতিহাস নিয়ে বহু লেখালেখি হয়েছে। যেগুলো থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছি। আনারকলির প্রসঙ্গে তাকে নিয়ে নির্মিত অবিস্মরণীয় চলচ্চিত্র ‘মুঘল-ই-আজম’ সম্পর্কেও আলোকপাত করেছি। চেষ্টা করেছি ইতিহাস ও মিথের মধ্যে লুকিয়ে থাকা মুঘল হেরেমের রহস্যময়ী নতর্কী ও বিয়োগান্ত প্রেমের নায়িকা আনারকলিকে অনুসন্ধানের।

;

সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় করোনায় আক্রান্ত



আন্তর্জাতিক ডেস্ক, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। মঙ্গলবার (১১ জানুয়ারি) তাঁর কোভিড–১৯ পরীক্ষায় পজিটিভ আসে। বতর্মানে তিনি নিজ বাড়িতেই আইসোলেশনে আছেন।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, বইমেলার উদ্বোধনের জন্য গত ২ জানুয়ারি মালদহ গিয়েছিলেন শীর্ষেন্দু। সেই বইমেলা স্থগিত হয়ে যায়। মালদহ থেকে বাড়ি ফিরে আসার পর তাঁর সর্দি, কাশি এবং শারীরিক দুর্বলতা দেখা দেয়। সন্দেহ হলে সোমবার তিনি নমুনা পরীক্ষা করান। মঙ্গলবার কোভিড–১৯ পরীক্ষায় পজিটিভ আসে। এ খবর তিনি নিজেই জানিয়েছেন।

লেখক বলেন, ‘জ্বর আসেনি কখনও। উপসর্গ হিসেবে ক্লান্তি, দুর্বলতার সঙ্গে স্বাদহীনতা রয়েছে।

;