গ্যাসের দাম বৃদ্ধির নেতিবাচক প্রভাব পড়বে জনজীবনে



রেজা-উদ্-দৌলাহ্ প্রধান, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

জ্বালানি হিসেবে অপরিহার্য গ্যাস। গৃহস্থালি কাজ, শিল্প-কারখানা পরিচালনায় গ্যাস ছাড়া চিন্তাও করা যায় না। পরিবহন সেক্টরেও গ্যাস নিত্যপ্রয়োজনীয়। কিন্তু নতুন অর্থবছরের শুরুতে রাজধানীবাসীর জন্য এল দুঃসংবাদ। আগামি সোমবার (১ জুলাই) থেকে ভোক্তা পর্যায়ে বাড়ছে গ্যাসের দাম। দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে শঙ্কা নগরবাসীদের।

তারা বলছেন, গ্যাস নিয়ে যে দুর্নীতি হয়, গ্যাস চুরি হয়, সেগুলো যদি নিয়ন্ত্রণ করা যেত, দুর্নীতি অনিয়ম রোধ করা যেত তাহলে হয়ত গ্যাসের দাম না বাড়িয়েও বাজারমূল্যের মধ্যে সমন্বয় ঘটানো সম্ভব হত। এটা নিয়ে উচ্চ আদালতেরও পর্যবেক্ষণ রয়েছে। অথচ সেটা না করে গ্যাসের মূল্য যেভাবে আটটি ক্ষেত্রে বৃদ্ধি করা হয়েছে তার সার্বিক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের দিনযাপনে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পাওয়াটা শুধু সময়ের ব্যাপার মাত্র।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নতুন নির্ধারিত দাম অনুযায়ী, গৃহস্থালিতে ব্যবহারের জন্য প্রতি মাসে গ্রাহকদের এক বার্নার চুলার জন্য গ্যাসের দাম ৯২৫ টাকা ও দুই বার্নার চুলার জন্য ৯৭৫ টাকা গুনতে হবে।

সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ব্যবহৃত সিএনজি’র দাম নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি ঘনমিটার ৪৩ টাকা। এছাড়া বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে হোটেল ও রেস্টুরেন্টের জন্য প্রতি ঘনমিটার ২৩ টাকা এবং ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের জন্য গ্যাসের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি ঘনমিটার ১৭ টাকা ৪ পয়সা।

বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত গ্যাস প্রতি ঘনমিটার ৪ টাকা ৪৫ পয়সা, ক্যাপটিভ পাওয়ারে ১৩ টাকা ৮৫ পয়সা, সার কারখানায় ৪ টাকা ৪৫ পয়সা এবং শিল্প কারখানা ও চা বাগানে ১০ টাকা ৭০ পয়সা করা হয়েছে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম। এছাড়া মিটারভিত্তিক গ্যাসের দাম প্রতি ঘনমিটার করা হয়েছে ১২ টাকা ৬০ পয়সা।

বিইআরসি’র এ সংক্রান্ত ঘোষণায় বলা হয়েছে, বিএআরসি আইন ২০০৩-এর ধারা ২২ (খ) ও ৩৪ অনুযায়ী তিতাস, বাখরাবাদ, জালালাবাদ, কর্ণফুলী, সুন্দরবন ও পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানির ভোক্তা পর্যায়ে প্রাকৃতিক গ্যাসের মূল্যহার বাড়ানো হলো। তবে বাণিজ্যিক গ্রাহকশ্রেণির অন্তর্ভুক্ত ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প গ্রাহকদের মূল্যহার অপরিবর্তিত থাকবে। এ ক্ষেত্রে বিদ্যমান ন্যূনতম চার্জ প্রত্যাহার করা হয়েছে। এছাড়া গৃহস্থালি ছাড়া অন্য গ্রাহকশ্রেণির ক্ষেত্রে প্রতি ঘনমিটার মাসিক অনুমোদিত লোডের বিপরীতে ১০ পয়সা হারে ডিমান্ড চার্জ আরোপ করা হয়েছে।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলো কমিশনের কাছে গড়ে ১০২ ভাগ গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়। পরে মার্চ মাসে গণশুনানি করে কমিশন। শুনানির ৯০ দিনের মধ্যে দামের বিষয়ে ঘোষণা দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। সেই নিয়ম অনুযায়ী, রোববার (৩০ জুন) বিকেলে গ্যাসের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হয়।

বিতরণ কোম্পানিগুলো বলছে, আমদানি করা এলএনজির প্রতি হাজার ঘনফুটের মূল্য ১০ ডলার বা ৮২০ টাকা (প্রতি ডলার ৮২ টাকা হিসাবে), অন্যদিকে দেশে উৎপাদিত প্রতিহাজার ঘনফুট গ্যাসের দাম ১২ টাকা ১৯ পয়সা। দেশের অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্র থেকে দৈনিক ২ হাজার ৭১৬ মিলিয়ন ঘনফুট এবং আমদানি করা এলএনজি ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহের হিসাবনিকাশ করে এবার গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

বিতরণ কোম্পানিগুলোর আবেদনে বলা হয়েছে, সরকার জ্বালানি চাহিদা মেটাতে এলএনজি আমদানি করছে। এখন প্রতিদিন ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ করা হচ্ছে। বছরের মাঝামাঝি সময়ে যা বেড়ে দাঁড়াবে অন্তত ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুটে। বাড়তি দরে এই গ্যাস কিনে কম দামে সরবরাহ করা হবে। এতে করে জ্বালানি খাতে বিশাল ঘাটতি তৈরি হবে। যে কারণে গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করে কোম্পানিগুলো।

তবে এলএনজি আমদানির ফলে বেশি ভর্তুকি যাচ্ছে বিধায় যে মূল্য সমন্বয়ের দাবি তুলেছে গ্যাস কোম্পানিগুলো সেটার সঙ্গে একমত নন বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভার্শন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ফারহান নূর। তিনি বার্তা২৪.কমকে বলেন, ‘বিশ্ববাজারে এলএনজির যে দাম আমারা তার সমান দামেই এতদিন বিক্রি করে আসছি। অথচ আমাদের সিএনজির দাম ৩টাকা বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে পরিবহন খরচ যেমন বাড়বে ঠিক তেমনি অন্যান্য সেক্টরেও তার প্রভাব পড়বে ‘

তার মতে, অবৈধ সংযোগ বন্ধ না করা গেলে মুষ্টিমেয় কিছু লোক লাভবান হবে অন্যদিকে মূল্য সমন্বয় করে লাভ তো দূরে থাকা শুধু জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়বে।

কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশ সভাপতি গোলাম রহমান বার্তা২৪.কমকে বলেন, ‘দুর্নীতি ছাড়া গ্যাসের কোনো কাজ হয় না। দুর্নীতি বন্ধ করা গেলে গ্যাসের দাম না বাড়ালেও চলত। এখন দেখার বিষয় এই মূল্যবৃদ্ধি জনজীবনে কী প্রভাব আনে। তবে যেহেতু গ্যাসের সঙ্গে বিদ্যুৎ,পরিবহণ সবই সংশ্লিষ্ট তাহলে অচিরেই এর একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়বে জনজীবনে।

রাজধানীর উত্তর শ্যাওরাপাড়া এলাকায় পাঁচ বছর ধরে বসবাস করছেন ব্যবসায়ী আলমগীর হোসেন। তিনি বার্তা২৪.কমকে বলেন, ‘আমাদের এখনো অনেক সময় নিরবিচ্ছিন্ন গ্যাস পাওয়া যায় না। আবার গ্যাস থাকলেও তার চাপ কম, নিভু নিভু আগুন জ্বলে। তবুও আমরা দুই চুলার জন্য ৮০০ টাকা দিতাম। এখন ৯৭৫ টাকা দিতে হলে কি গ্যাস ঠিকমত পাওয়া যাবে? যদি সেটা না হয় তাহলে দাম বাড়বে কেন?’

উল্লেখ্য, সর্বশেষ ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে গ্যাসের দাম গড়ে ২২ দশমিক ৭০ শতাংশ বাড়ানো হয়। ওই বছরের মার্চ ও জুলাই থেকে দুই ধাপে তা কার্যকর করার কথা থাকলেও মার্চে দাম কার্যকর হয়। আর জুলাই মাসের দাম হাইকোর্টের আদেশে স্থগিত করা হয়।