টাউটময় আদালত!



মবিনুল ইসলাম, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
তারা নিজেদের আইনজীবী বলে পরিচয় দিতেন, ছবি: সংগৃহীত

তারা নিজেদের আইনজীবী বলে পরিচয় দিতেন, ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

রিমি জাহান ঢাকার নিম্ন আদালতে পাঁচ বছর শিক্ষানবীস আইনজীবী হিসেবে কাজ করেছেন। এরপর ২০১৮ সালে বার কাউন্সিল পরীক্ষার পর তিনি আইনজীবী হিসেবে বার কাউন্সিলের সনদ পেয়েছেন প্রচার করে আইনজীবী মহিলা কমনরুমে পাঁচ কেজি মিষ্টি এনে সবাইকে খাইয়েছেন।

এরপর কোর্ট গাউন পরে দুই বছর ওকালতি করার পর গত ৬ মে তিনি টাউট উচ্ছেদ কমিটির হাতে ধরা খান।

ধরা খেয়ে রিমি স্বীকার করেন, মূলত তিনি এইচএসসি পাস। পাঁচ বছর শিক্ষানবীস হিসেবে থাকার পর ২০১৮ সালে সুফিয়া খানম রিমি নামে একজন আইনজীবী সনদপ্রাপ্ত হলে তিনি রিমি জাহান থেকে রাতারাতি হয়ে যান সুফিয়া খানম রিমি। সুফিয়া খানম রিমি নামে ঢাকা আইনজীবী সমিতির ভুয়া পরিচয়পত্র তৈরি করে বনে যান আইনজীবী।

তানজিমা তাসকিন আদুরি হাইকোর্টের আইনজীবী পরিচয় দিয়ে হাইকোর্টে গাউন পরে শুনানি করতেন। তার ফেসবুক ওয়ালে তিনি লেখেন, এলএলবি অনার্স, এলএলএম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। দেশের শীর্ষ আইনজীবীদের সঙ্গে তার ছবিও ফেসবুকে শোভা পায়। গত ৮ মে হাইকোর্টের টাউট উচ্ছেদ কমিটির হাতে ধরা খেয়ে স্বীকার করেন, তিনি আইনজীবী নন।

মোহাম্মদ ইউনুস আইনজীবী হিসেবে মামলা মোকদ্দমা পরিচালনা করে আসছিলেন। আইনজীবী হিসেবে তিনি রীতিমতো চেম্বার নিয়ে ভিজিটিং কার্ড ছাপিয়ে দীর্ঘদিন প্র্যাকটিস করে আসছিলেন। কার্ডে হাইকোর্ট চেম্বারের ঠিকানাও দেওয়া আছে। গত ১২ মে ঢাকা বারের টাউট উচ্ছেদ কমিটির হাতে ধরা খেয়ে তিনিও স্বীকার করেন যে তিনি আইনজীবী নন। মামলা দিয়ে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

গত ১৭ এপ্রিল গাজীপুর জেলা ও দায়রা জজ আদালত থেকে চারজন টাউট আটক করা হয়। পরে তাদের মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। তারা নিজেদের কখনও আইনজীবী, কখনও নিকাহ রেজিস্ট্রার (কাজী) পরিচয় দিয়ে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করতেন।

প্রতারণার অভিযোগে গত বছরের ১ আগস্ট নারায়ণগঞ্জ আদালতে একজন পুরুষ ও এক নারীকে আটক করা হয়। তারা কখনও আইনজীবী, কখনও আইনজীবীর সহকারী, কখনও পেশকার কিংবা কখনও বিচারকদের সঙ্গে গোপন সম্পর্ক রয়েছে বলে প্রচার করতেন। মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করতেন।

আইন আদালতের সঙ্গে টাউটদের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। যেখানে আদালত, আইনজীবী সেখানেই টাউট। আইন অঙ্গনে টাউট বলতে বোঝায়, আইনজীবী না হয়েও আইনজীবী পরিচয় দিয়ে মামলা মোকদ্দমা পরিচালনা এবং বিচারপ্রার্থীদের আইনজীবী পরিচয় দিয়ে ঠকানো বা প্রতারণা করা।

দেশের আদালত অঙ্গণে বর্তমানে টাউটের সংখ্যা বেড়ে গেছে। ঢাকায় আইনজীবীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় টাউটের সংখ্যাও বেশি।

ঢাকা আইনজীবী সমিতি সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালে ঢাকার নিম্ন আদালতে ৩১ জন টাউট ধরা হয়। তাদের মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া আরও কিছু সংখ্যক টাউটকে মুচলেকা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

Tout
তারা নিজেদের আইনজীবী বলে পরিচয় দিতেন, ছবি: সংগৃহীত

ঢাকা আইনজীবী সমিতির কার্যকরী কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট ফারহানা আক্তার লুবনা বার্তা২৪.কমকে জানান, চলতি বছরে এ পর্যন্ত প্রায় ১৫ জন টাউটকে আটক করা হয়েছে। একই সময়ে হাইকোর্টসহ দেশের বিভিন্ন আইনজীবী সমিতিতে অনেক টাউট আটক করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, টাউট ধরলেই বিভিন্ন মহল থেকে তাদের ছেড়ে দেওয়ার চাপ আসে। অনেক সিনিয়র আইনজীবীর অনুরোধে তাদের ছেড়ে দিতে হয়, যা দুঃখজনক।

অ্যাডভোকেট কাজী হেলাল উদ্দিন বলেন, টাউটিং বা প্রতারণা ন্যায় বিচারের অন্তরায়। আদালতে বিচারপ্রার্থীদের ক্ষতির কারণ। তাদের প্রশ্রয় না দিয়ে টাউট নির্মূলে সিনিয়র আইনজীবীদের এগিয়ে আসতে হবে।