কাজী নজরুল, 'রুবাইয়াত-ই-হাফিজ' ও ছায়ানট কলকাতা



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
হাফিজের মাজার, ইনসেটে কবি নজরুল

হাফিজের মাজার, ইনসেটে কবি নজরুল

  • Font increase
  • Font Decrease

পারস্যের মহাকবি হাফিজের কথা বিশ্বের সবাই জানেন, যিনি প্রিয়ার তিলের জন্য সমরখন্দ-বোখারা নগরী পর্যন্ত দিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। প্রেম ও অধ্যাত্ম্যের গভীর উপলব্ধি মাখিয়ে কবি হাফিজ যে রুবাইয়াত নামের সুললিত কথামালা রচনা করেছিলেন, তা বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন আরেক মহান কবি কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬)।

হাফিজের রচনার সঙ্গে নজরুলের পরিচয় হয়েছিল উর্দু, ফারসি সাহিত্যে অবগাহনের সুযোগ। হাফিজের অবিস্মরণীয় কবিতা পাঠের তৃষ্ণা মিটাতে সক্ষম হন নজরুল জন্মভূমি বাংলা থেকে দূরে পশ্চিম এশীয় রণাঙ্গনে। নজরুল নিজেই জানাচ্ছেন সে কথা:

'আমি তখন স্কুল পালিয়ে যুদ্ধে গেছি। সে ইংরিজি ১৯১৭ সালের কথা। সেইখানে প্রথম আমার হাফিজের রচনার সাথে পরিচয় হয়।

আমাদের বাঙালি পল্টনে একজন পাঞ্জাবি মৌলবি সাহেব থাকতেন। একদিন তিনি দীওয়ান- ই- হাফিজ থেকে কতকগুলি কবিতা আবৃত্তি করে শোনান। শুনে আমি এমনই মুগ্ধ হয়ে যাই যে, সেইদিন থেকেই তাঁর কাছে ফারসি  ভাষা ও সাহিত্য গভীরভাবে শিখতে আরম্ভ করি।

'রুবাইয়াত-ই-হাফিজ' উপস্থাপনায় শিল্পী সোমঋতা মল্লিক ও বাচিকশিল্পী দেবাশিস বসু

তাঁরই কাছে ক্রমে ফারসি কবিদের প্রায় সমস্ত বিখ্যাত কাব্যই পড়ে ফেলি। তখন থেকেই আমার হাফিজের 'দীওয়ান' অনুবাদের ইচ্ছা হয়। কিন্তু তখনও কবিতা লিখবার মতো যথেষ্ট সাহস সঞ্চয় করে উঠতে পারিনি। এর বৎসর কয়েক পরে হাফিজের 'দীওয়ান' অনুবাদ করতে আরম্ভ করি। অবশ্য তাঁর রুবাইয়াৎ নয়, গজল। বিভিন্ন মাসিক পত্রিকায় তা প্রকাশিতও হয়েছিল। ত্রিশ-পঁয়ত্রিশটি গজল অনুবাদের পর আর আমার ধৈর্যে কুলোল না, এবং ওইখানেই ওর ইতি হয়ে গেল। তারপর এস. সি. চক্রবর্তী এন্ড সন্সের সত্বাধিকারী মহাশয়ের জোর তাগিদে ওর অনুবাদ শেষ করি। যেদিন অনুবাদ শেষ হল, সেদিন আমার খোকা বুলবুল চলে গেছে! আমার জীবনের যে ছিল প্রিয়তম, যা ছিল শ্রেয়তম তারই নজরানা দিয়ে শিরাজের বুলবুল কবিকে বাংলায় আমন্ত্রণ করে আনলাম।'

নজরুলের হাত ধরে বাংলায় পারস্য প্রতিভা নজরুলের আগমন কেবল ঐতিহাসিকই নয়, বেদনামিশ্রিতও। কবি কাজী নজরুল ইসলাম  সর্বাধিক উদ্বুদ্ধ অনুপ্রেরিত-আলোড়িত হয়েছিলেন ফারসি কবিদের দ্বারা। তিনজন ফরাসি কবির কবিতা নজরুল অনুবাদ করেন : ওমর খৈয়াম (-১১২৩), জালালউদ্দীন রুমি (১২০৭-৭৩) এবং শামসুদ্দীন মুহম্মদ হাফিজের (১৩২৫-৮৯)।

এঁদের মধ্যেও আবার নজরুল সর্বাধিক উজ্জীবিত ছিলেন হাফিজ-এর কবিতায়। নজরুলের বন্ধু কমরেড মুজফফর আহমদ (১৮৮৯-১৯৭৩) নজরুলের করাচি থেকে কলকাতায় ফেরার পরে বর্ণনায় লিখছেন : ‘কৌতূহলের বশে আমরা তার গাঁটরি বোঁচকাগুলি খুলে দেখলাম।... কবিতার খাতা, গল্পের খাতা, পুঁথি-পুস্তক, মাসিক পত্রিকা এবং রবীন্দ্রনাথের গানের স্বরলিপি, ইত্যাদিও ছিল। পুস্তকগুলির মধ্যে ছিল ইরানের মহাকবি হাফিজের দিওয়ানের একখানা খুব বড় সংস্করণ। তাতে মূল ৭টির প্রতি ছত্রের নিচে উর্দু তরজমা দেওয়া ছিল। অনেক দিন পরে আমারই কারণে নজরুল ইসলামের এই গ্রন্থখানা, আরো কিছু পুস্তক, কিছু চিঠিপত্র, অনেক দিনের পুরানো কবিতার খাতা, বিছানা, কিট-ব্যাগ, সুটকেস এবং ‘ব্যথার দান' পুস্তকের উৎসর্গে বর্ণিত মাথার কাঁটা সোয়া যায়।' (পৃ. ৪৯, ‘কাজী নজরুল ইসলাম : স্মৃতিকথা' তৃ মুদ্রণ ১৯৬৯)।

মুজফফর আহমদ বর্ণিত এই হাফিজের দিওয়ান বইটির বড়ো সংস্করণের বইটি থেকেই নজরুল তর্জমা করতে শুরু করেন। ‘মোসলেম ভারত' পত্রিকায়। ১৯২০ সালে। অন্যান্য পত্রিকাতেও আরো লেখা প্রকাশিত হয়। কী আছে হাফিজের দিওয়ান বইটিতে?- পার্বতীচরণ ভট্টাচার্য জানাচ্ছেন, ‘হাফিজের দিওয়ান ৫০০ গজল, তিনটি সুদীর্ঘ নীতিকবিতা, বহু রুবাই এবং কিছু মসনবীর ও কসীদার সমষ্টি। একমাত্র পুত্রের অকালমৃত্যুতে তার একটি মরসিয়াও আছে।'

নজরুলের জীবনে হাফিজের আবির্ভাব ও অনুবাদের ইতিহাস স্বল্পজনের জানা। সেই স্মরণীয় ঐতিহাসিক-সাহিত্যিক ঘটনাকে তুলে আনার মহতী উদ্যোগ নিয়েছে ছায়ানট কলকাতা, যে সংগঠন নজরুলের জীবন, সাহিত্য, কর্ম ও দর্শন নিয়ে নিরবচ্ছিন্ন কাজ করে চলেছে।

ছায়ানট প্রধান বিশিষ্ট শিল্পী সোমঋতা মল্লিক বার্তা২৪.কমকে জানান, 'প্রতিবছর নজরুল মেলা আয়োজনের পাশাপাশি আমরা বিভিন্ন প্রকাশনা ও ডকুমেন্টারিতে নজরুলকে উপস্থাপনের প্রচেষ্টা গ্রহণ করেছি। তারই অংশ হিসেবে ছায়ানট (কলকাতা)-র নিবেদনে করেছে বিশিষ্ট বাচিকশিল্পী দেবাশিস বসুর কন্ঠে কাজী নজরুল ইসলামের অনূদিত গ্রন্থ 'রুবাইয়াত-ই-হাফিজ'-এর সম্পূর্ণ পাঠ।'

খুব শীঘ্রই অডিও অ্যালবাম হিসেবে ও বিভিন্ন ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশিত হতে চলেছে এই স্মরণীয় কাজটি, যার ভাবনা ও পরিকল্পনায় শিল্পী সোমঋতা মল্লিক, প্রকাশনা ও বিশ্ব-পরিবেশনায় কোয়েস্ট ওয়ার্ল্ড, নির্মাণ-সৃজনে স্বাগত গঙ্গোপাধ্যায়।

কাজী নজরুল অনূদিত 'রুবাইয়াত-ই-হাফিজ'-এর উপস্থাপনার মাধ্যমে ছায়ানট কলকাতা বাংলা সাহিত্যের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধতর করবে। মহাকবি হাফিজ আর মহত্তম কবি নজরুলের সুবাধে পারস্য সাহিত্যের দ্যুতিময় জ্যোতিতে আবার উদ্ভাসিত হবে বৃহত্তর বাংলাভাষী পাঠক শ্রোতা মণ্ডলী।