অভিবাসে একা বেঁচে থাকা কবি

ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
কবি শাকিল রিয়াজ। ছবি: বার্তা২৪.কম

কবি শাকিল রিয়াজ। ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

বরিশাল, ফরিদপুর, ঢাকা হয়ে সুদূর সুইডেনের অভিবাসে একা বেঁচে আছেন এক কবি। প্রবাসের অতল দূরত্বময় নিঃসঙ্গ ভূগোলে তিনি বেঁচে আছেন প্রিয় অবলম্বন কবিতাকে নিয়ে। নিজের ৫০ বছরের প্রাক্কালে করোনা দংশিত অভিবাসী প্রহরে তিনি জানাচ্ছেন জীবন ও কবিতার সমান্তরালে বয়ে যাওয়া অভিজ্ঞান:

পৃথিবীরা মরে যায় যার যার গৃহে
আমার অভিবাসে আমি একা বেঁচে থাকি
একাই বেঁচে থাকি এই মায়াহীন অনাত্মীয় সন্ধ্যায়
দিকভ্রষ্ট ট্রেনে মন খারাপ করে কোথাও
চলে যাবার মতো বেঁচে থাকি।
একটি প্রাণোচ্ছল অপেক্ষাকে পাশের চেয়ারে বসিয়ে রেখেছি
জন্মান্তরের আশায়। জীবন সহজ হোক নতুন অধ্যায়ে।
কাল তোমার ছুটি শেষ হবে নবোঢ়া
কাল তুমি অফিসে ফিরবে
কাল তুমি আমার ছায়াচ্ছন্ন চোখে তাকিয়ে
অনিদ্রার সাগর থেকে তুলতে চাইবে দু‘ফোটা তেষ্টা
তোমার ভ্রমণতপ্ত চিবুকের দিকে
একবারও তাকাবো না কাল।
আমি বারবারই একা বেঁচে থাকি
তোমাদের সুখসন্তপ্ত মৃত্যুবিলাসের শহরে
অহেতুক কিছু ব্যথা নিয়ে দুঃসহ বেঁচে থাকি।
কেন তুমি বেড়াতে যাও দূরে? ভূমধ্যসাগরে?
সান্তোরিনির শাদা পাথরে রোদ হয়ে পড়ে থাকা গ্রীষ্মকাল
ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালে
তুমি কি জলপাই বনে গিয়ে কাপড় পাল্টিয়েছিলে?
তোমার শরীরে জলপাইয়ের গন্ধ লেগে আছে।
জলপাই তোমাকে কী করেছে?
বলো, কী করেছে?
কাল আমার চোখের দিকে তাকিয়ে
ভূমধ্যসাগরে তোমার স্নানের গল্প বলবে
আর জলপাইয়ের কথা বলতে গিয়ে
মুখ ভরে যাবে মনে পড়ার লালায়...
আরো দুই পঙক্তি হলে শেষ হতে পারতো এই কবিতা
অথচ আমার চোখ থমকে গেল
ভূমধ্যসাগরের মিহি গভীরতায়
আমার শ্বাস রুদ্ধ হলো জলপাইয়ের নিলাজ গন্ধে।

অথচ তার থাকার কথা ছিল পদ্মা, ধানসিঁড়ি কিংবা নিদেনপক্ষে বুড়িগঙ্গার তীরে। কিন্তু বিশ্বায়নের দুনিয়া রেহাই দেয়নি বাংলার এক ভূমিপুত্র-কবিকেও। মাতাল হাওয়ায় ভাসিয়ে নিয়েছে উত্তর গোলার্ধের শেষতম উপান্তে। নর্থ সী, মেডিটোরিয়ান পেরিয়ে দাক্ষা ও অলিভ কুঞ্জে।

নব্বুই দশকের কবিতায় শাকিল রিয়াজ উজ্জ্বল উপস্থিতিতে আবির্ভূত হয়েছিলেন। কবি ছাড়াও তিনি ছিলেন সাংবাদিক, কলামিস্ট। গ্রামের বাড়ি বরিশালের মুলাদী উপজেলায়। জন্ম নারায়ণগঞ্জ। পিতা মো. মজিবুল ইসলাম, মাতা ফৌজিয়া ইসলাম।

শৈশব-কৈশোর কেটেছে ফরিদপুরে। ফরিদপুর জেলা স্কুল, রাজেন্দ্র কলেজ, অতঃপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতায় এম এ। সুইডিশ ভাষা, সাহিত্য ও সমাজ কল্যাণ বিষয়ে পড়েছেন স্টকহোম ইউনিভার্সিটিতে। ভেল্যু-বেইজড লিডারশিপ কোর্স করেছেন ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউট থেকে। স্টকহোমের স্কুল অব কমপিটেন্স ডেভেলপমেন্ট পড়েছেন কোয়ালিফায়েড রিসার্চিং নিয়ে।

স্কুল-জীবনেই লেখালেখিতে হাতেখড়ি। সাংবাদিকতায় দীক্ষাও স্কুল জীবনে। ফরিদপুর জেলা স্কুলে অধ্যয়নকালে জাতীয় পত্রপত্রিকায় লেখালেখি প্রকাশিত হয়। প্রকাশিত হয় ফরিদপুরের স্থানীয় পত্রপত্রিকায়ও। উচ্চমাধ্যমিকে পাঠকালে সম্পাদনা করেছেন কলেজ শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে প্রকাশিত পত্রিকা “রক্তাক্ত সংলাপ”। ফরিদপুরে লিটলম্যাগ আন্দোলনের প্রথমদিকের কলাকুশলী।

ঢাকায় এসে প্রথম কাজ করেন মাসিক নতুন ঢাকা ডাইজেস্টে। কবি ফজল শাহাবুদ্দীন সম্পাদিত নান্দনিক পত্রিকায় যোগ দেন সহকারী সম্পাদক হিসেবে। তাঁরই সম্পাদিত সাহিত্য পত্রিকা 'কবিকণ্ঠ'তে কাজ করেছেন সহযোগী সম্পাদক হিসেবে। যৌথভাবে সম্পাদনা করেছেন লিটলম্যাগ ‘চোখ’ ও ‘শিরোনাম’।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠকালেই মূলধারার সাংবাদিকতার সঙ্গে জড়িত। দৈনিক জনকণ্ঠের প্রতিষ্ঠালগ্নের অন্যতম কুশলী। কাজ করেছেন ফিচার ও সম্পাদীয় বিভাগে বিভাগীয় সম্পাদক হিসেবে। বাংলাদেশ টেলিভিশনে কাজ করেছেন গবেষক ও উপস্হাপক হিসেবে। সংযুক্ত ছিলেন বাংলাদেশ বেতারের সঙ্গে। নব্বইর গণ আন্দোলনে জড়িয়ে কারাভোগ করেন এই সাহিত্যকর্মী।

শাকিলের প্রকাশিত কাব্যগ্রন্হ চারটি। একাকি পুরুষ একাকী রমণী, পোড়ে প্রেম পুরোটাই, মকর রাশির মেয়ে, নিজের ছায়াকে বৃষ্টিতে ভিজিয়ে মজা লুটি। প্রবন্ধগ্রন্হ 'অন্যান্য এবং আত্মহত্যার স্বপক্ষে'। কিশোর উপন্যাস ‘দ্বীপ বিভীষিকা’।

১৭ অক্টোবর ১৯৭০ সালে জন্মগ্রহণকারী কবি শাকিল রিয়াজকে নিবিড় নৈকট্যে পেয়েছি জীবনের একটি দীর্ঘ পর্যায়ে। ২০০৩ সাল থেকে সুইডেন প্রবাসী এই কবি এখনো আমাদের কাছেই আছেন বাংলা বর্ণমালার প্রলেপে নির্মিত কবিতার অদৃশ্য সেতুর মায়াবী সম্পর্কের বিন্যাসে।