ভ্রাতৃদ্বন্দ্বের পটভূমিতে দারাশিকোহ



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
গ্রাফিক্স: বার্তা২৪.কম

গ্রাফিক্স: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

দারাশিকোহর প্রতি পিতা সম্রাট শাহজাহানের অতিরিক্ত আনুক‚ল্য, পক্ষপাত ও পৃষ্ঠপোষকতা অপর তিন ভাই স্বাভাবিক কারণেই ভালোভাবে গ্রহণ করতে পারেননি। মুঘল দরবারে ভাইদেও আত্মীয়-স্বজন এবং পক্ষের লোকজনও দারার বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করেন। দারার নতুন ধরনের ধর্মীয় মতবাদ তার বিরোধিতার উর্বর ক্ষেত্র প্রস্তুত করে দেয়। বিরোধীরা দারার ধর্মমতকে কঠোর সমালোচনা করে এবং তার বিরুদ্ধে ঐক্য গড়তে বিশেষভাবে কাজে লাগায়।

ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক কারণে অপর তিন ভাই, যথা শুজা, আওরঙ্গজেব ও মুরাদ আগে থেকেই দারার প্রতি বিক্ষুব্ধ ছিলেন এবং দারার অতিরিক্ত ক্ষমতা লাভ ও মুঘল সা¤্রাজ্যের উত্তরাধিকার হওয়ার উজ্জ্বল সম্ভাবনাকে মেনে নিতে পারেন নি। এমতাবস্থায়, সকলেই দারার ধর্মীয় মতবাদকে কঠোর সমালোচনা শুরু করেন, যা মুঘল দরবারে ও সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে দারা সম্পর্কে বিরূপ মনোভাবে সৃষ্টি করে। সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেম সমাজও দারার মতামতের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। পরিস্থিতি এমন আকার ধারণ করে যে, দারাশিকোহকে ‘মুরতাদ’ বা ইসলাম ধর্মত্যাগীর মতো মারাত্মক অভিযোগে বিদ্ধ করা হয়।

প্রতিপক্ষ দারাশিকোহর বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ উত্থাপন করেন, তার মধ্যে মূল কয়েকটি হলো: ১. তিনি ব্রাহ্মণ, যোগী ও সন্ন্যাসীদের সাহচর্যে থাকেন: ২. তিনি এদেরকেই তার প্রকৃত আধ্যাত্মিক পথ প্রদর্শক মনে করেন; ৩. তিনি ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞান আহরণের বদলে অন্যান্য ধর্মের গ্রন্থগুলো পঠন, পাঠন ও অনুবাদে অধিক সময় ব্যয় করেন; ৪. তিনি হিন্দি ভাষায় ‘প্রভু’ লেখাঙ্কিত আংটি ও অলঙ্কার পরিধান করেন; ৫. তিনি মুসলমানদের জন্য অবশ্য পালণীয় পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, রমজানের রোজা এবং অন্যান্য ফরজ ও ওয়াজিব আমল বর্জন করেন।

স্বাভাবিকভাবেই এইসব অভিযোগ মুঘল পরিমণ্ডলে ও সর্বসাধারণের মধ্যে দারা সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণার জন্ম দেয় ও তিনি ক্রমেই তার জনসমর্থন ও জনপ্রিয়তা হারাতে থাকেন। বিরোধী পক্ষ এটাই চেয়েছিল যে, ক্ষমতার পৃষ্ঠপোষকতা পেলেও দারা যেন শক্তিশালী হতে না পারে। বাস্তবে ঘটেও তাই। তিনি ক্ষমতার কাছাকাছি অবস্থান করেও তার বিরুদ্ধে গৃহীত সমালোচনামূলক পদক্ষেপ সম্পর্কে অবহিত হতে ও প্রতিবিধান করতে ব্যার্থ হন।

তদুপরি দারার একটি চিঠি প্রকাশিত হলে তার পরধর্মের প্রতি পক্ষপাতের বিষয়টি উন্মোচিত হয় এবং রাজদরবারের মুসলিম সেনাপতি ও আমত্যগণ দারাকে তাদের স্বার্থের বিরোধী ভাবার সুযোগ পায়। ১৬৫৩ সালে জয়পুরের কট্টর হিন্দু-রাজপুত রাজা জয় সিংহকে লিখিত এক পত্রে দারা উল্লেখ করেন যে, ‘রাজপুত জাতি তার নিকট অতি প্রিয়। তিনি সর্বদা মুঘল রাজদরবারে রাজপুতদের স্বার্থের প্রতি নজর রাখেন।’ ঐতিহাসিক লেনপুল, যদুনাথ সরকার প্রমুখ ঐতিহাসিক এমন আরো দৃষ্টান্ত উপস্থান করে দারার রাজনৈতিক দূরদৃষ্টির অভাবকে চিহ্নিত করেন। প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে তার উদাসীনতা ও সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণে অপারগতাকেও অনেকেই দারার রাজনৈতিক ভাগ্য বিপর্যয়ের পেছনে অন্যতম কারণ বলে মনে করেন।

দারার রাজনৈতিক বিপর্যয়ের পেছনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল তার ব্যক্তিত্বের কতিপয় দুর্বলতা। দারা ছাড়া সম্রাট শাহজাহানের বাকী তিন পুত্রই ছিলেন যোগ্য সেনাপতি, যোদ্ধা ও রাজনৈতিক মাঠের বাস্তব অভিজ্ঞতাসম্পন্ন। পিতার কাছে দরবারের আরাম-আয়েশে বসবাস করে দারা তেমনভাবে রাজনৈতিক-সামরিক দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পান নি। উপরন্তু, দারার প্রতি পিতার অশেষ স্নেহ-মমতা তার স্বভাব বিগড়ে দেয়। তাকে সর্বদা দরবারে রাখা হয় এবং একমাত্র কান্দাহারের অসফল ও ব্যার্থ তৃতীয় অবরোধের সময় ছাড়া তাকে কখনোই কোনো সামরিক দায়িত্ব বা গুরুত্বপূণ প্রশাসনিক কাজ করতে দেওয়া হয়নি। এমনকি, একমাত্র দারাকেই তার অধীনস্থ প্রদেশগুলোকে প্রতিনিধি মারফত শাসনের শাহি ফরমান বা আদেশ প্রদান করা হয়, যেখানে অন্য সকল যুবরাজের জন্য স্ব স্ব প্রদেশে থেকে শাসনকার্য পরিচালনা করা ছিল বাধ্যতামূলক। ফলে এইসব অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধা দারাশিকোহর ব্যক্তিত্ব ও অভিজ্ঞতা অর্জনের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাবই বিস্তার করে। তদুপরি তিনি ধর্মীয়, রাজনৈতিক কারণে প্রতিদ্বন্দ্বী ভাইদের টার্গেটে পরিণত হন। ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের প্রশ্নে তাকে ঘিরে তৈরি হয় ভ্রাতৃদ্বন্দ্বের ঊর্বর পটভূমি।

আরও পড়ুন: দারা ও আওরঙ্গজেব: অভিন্ন শৈশব, বিপরীত চরিত্র

দারাশিকোহ: যিনি হতে পারতেন মুঘল সম্রাট

সম্রাট শাহজাহানের পছন্দের দারাশিকোহ