ভাওয়াইয়া সম্রাট আব্বাস উদ্দীন



ড. মাে. এরশাদুল হক, লােকসংস্কৃতি গবেষক ও প্রাবন্ধিক
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

আব্বাস উদ্দীন (১৯০১-১৯৫৯) বাংলার লােকগানের এক ধ্রুপদী সঙ্গীত ব্যক্তিত্ব। সঙ্গীতাঙ্গনে তথা আধুনিক কাব্যগীতি, দেশাত্মবােধক গান, ইসলামী গান, ভাওয়াইয়া সঙ্গীত এবং পল্লীগীতিতে এই শিল্পীর অবদান তুলনারহিত। বিশেষ করে লােকগানের অন্যতম ধারা ভাওয়াইয়া সঙ্গীতকে নাগরিক মনে জনপ্রিয় করে তােলার পেছনে তাঁর কৃতিত্ব অসামান্য। তােরষা, ধরলা, দুধকুমার, তিস্তা, কালজানি বিধৌত উত্তরবঙ্গের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ভাওয়াইয়া

সঙ্গীতের অন্যতম অনুষঙ্গ করে মৈষাল-মাহুত-গাড়িয়ালের মাধ্যমে বিরহী নারীর আকুতি, মন-মনন, চিন্তা-চেতনাকে অত্যন্ত চমৎকারভাবে উপস্থাপন করেছেন। শিল্পী এ কাজ অত্যন্ত দক্ষতার সাথে করতে সক্ষম হয়েছেন কারণ, তাঁর এই সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে জন্ম এবং বেড়ে ওঠা।

আব্বাসউদ্দীনের জন্ম কোচবিহার জেলার তুফানগঞ্জের বলরামপুর গ্রামের এক নৈসর্গিক পল্লীতে। একদিকে দিগন্ত বিস্তৃত মাঠ, অন্যদিকে কালজানি নদী। এমন প্রাকৃতিক পরিবেশে কৃষক-শিল্পীর উদাস করা কণ্ঠে ভাওয়াইয়ার সুর দিনরাত অনুরণিত হতাে।

ভাওয়াইয়া যেনাে ছিল কর্মজীবী মানুষের প্রধান কর্মসঙ্গীত। হালুয়া হাল বাইতে বাইতে কিংবা কৃষক ক্ষেত নিড়াতে নিড়াতে তাদের ভরাট কণ্ঠে ধ্বনিত হতাে ভাওয়াইয়া গান-
ক’ ভাবী মাের বঁধূয়া কেমন আছে রে?
তাের বধূয়া আছে রে ভালাে
দিন কতক কন্যার জ্বর গেইছে রে
ও কি কন্যা চায়া পাঠাইছে জিয়া মাগুর মাছ রে।

তাঁর চিন্তা-চেতনায়, মন-মননে ভাওয়াইয়া গান আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। বিশেষ করে শ্রমজীবী মানুষদের কণ্ঠে গীত ভাওয়াইয়া গানের সুর তাঁর সমস্ত সত্তাকে যেনাে আলােড়িত করতাে। এ প্রসঙ্গে তিনি নিজেই বলেন, সেই সব গানের সুরেই আমার মনের নীড়ে বাসা বেঁধেছিল ভাওয়াইয়া গানের পাখি। এখান থেকেই মূলত আব্বাসউদ্দীনের ভাওয়াইয়া গানের হাতেখড়ি। তিনি কোন সঙ্গীত গুরুর কাছে নয়, রং গানের শিক্ষা নিয়েছেন প্রকৃতির সহজ-সরল সুর-পাঠ থেকে।

ভাওয়াইয়া সঙ্গীতে ঝুঁকে পড়ার আরেকটি ঘটনা তিনি উল্লেখ করেছেন এভাবে-
বাড়ি থেকে দু'মাইল দূরে ঝাপই নদীতে জাল দিয়ে মাছ ধরতে গিয়েছি। ... অকস্মাৎ বাঁশির মত মিষ্টি কণ্ঠ কানে এল। অমন অপূর্ব মধুময় কণ্ঠ আমার জীবনে আর শুনি নি।... স্বর ক্রমশঃ নিকটবর্তী। তারপর দেখি মহিষের পিঠে মহিষের মত বা তার চাইতেও কালাে একটি ছেলে গাইতে গাইতে মহিষটাকে পানি খাওয়াবার জন্য নদীতে নামিয়ে দিয়েছে। হঠাৎ আমাকে দেখতে পেয়ে গান তার বন্ধ হয়ে গেল। কাছে গিয়ে কত অনুনয় করলাম- সিগারেট দিতে চাইলাম- আর কিছুতেই তাকে রাজী করতে পারলাম না। জীবনে অমন কণ্ঠ আর শুনি নি। দ্রি. আব্বাসউদ্দীন আহমদ, আমার শিল্পী জীবনের কথা, ১৯৬৫) মৈষালের এই গানই তার মনে গভীরভাবে দাগ কেটেছিল। এবং এখান থেকেই তিনি আরাে বেশি ভাওয়াইয়া গানের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। কালক্রমে তিনি হয়ে ওঠেন ভাওয়াইর সম্রাট। দেশের সীমানা পেরিয়ে বিশ্বে ভাওয়াইয়া সঙ্গীতকে জনপ্রিয় করে তুলতে সক্ষম হন। তাঁরই পদাঙ্ক অনুসরণ করে ভাওয়াইয়া আজ ক্রমান্বয়ে বিকশিত হচ্ছে। লােকসংস্কৃতির অঙ্গনে ভাওয়াইয়া সঙ্গীত যতদিন টিকে থাকবে ততদিন ভাওয়াইয়া সম্রাট আব্বাসউদ্দীনকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে।

বুধবার (৩০ ডিসেম্বর) মহান এই প্রবাদপুরুষ সঙ্গীত শিল্পীর ৬১তম প্রয়াণ দিবস। এই দিনে ভাওয়াইয়া মােদী, সঙ্গীত শিল্পী, অনুরাগী, গবেষক সকলেই বিনম্র শ্রদ্ধায় মহান এই শিল্পীর অবদান কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করছে। লােকসংস্কৃতির অন্যতম আঙ্গিক লােকগানে চিরভাস্বর হয়ে থাকবেন ভাওয়াইয়া সম্রাট আব্বাসউদ্দীন।