স্মৃতি তর্পণ: বুরহান সিদ্দিকী



হারুন হাবীব
স্মৃতিতে বুরহান সিদ্দিকী।

স্মৃতিতে বুরহান সিদ্দিকী।

  • Font increase
  • Font Decrease

বুরহান সিদ্দিকীর মৃত্যু সংবাদ পেলাম। গুণী শিল্পী ও মানবিক এই সজ্জনের সাথে আমার সম্পর্ক ১৯৯০ সাল থেকে, যখন তিনি বাংলাদেশ পুলিশের এসপি। এরপর হয়েছেন দেশের পুলিশ বাহিনী প্রধান এবং  সরকারের সচিব।

অসামান্য মানুষ, যার সাথে প্রথম দেখার একটা ইতিহাস আছে। দক্ষিণ আফ্রিকার সুদীর্ঘ বর্ণবাদী শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভ করবে নামিবিয়া। ২৭ বছর, ৬ মাস ৬ দিনের কারাবরণ শেষে সদ্য মুক্তি পেয়েছেন নেলসন ম্যান্ডেলা, আগ্রহের শেষ নেই আমার, যদি একটা সাক্ষাৎকার নিতে পারতাম।

ঠিক এ সময়েই মা বিদায় নিলেন। তখনো মাতৃশোক কাটিয়ে উঠতে পারিনি। এরপরেও বার্তা সংস্থার প্রতিবেদক হিসেবে পৌঁছলাম বম্বে, এরপর ইথিয়পিয় এয়ারলাইন্সে চেঁপে জিম্বাবুয়ে এবং দক্ষিণ আফ্রিকা হয়ে দীর্ঘ গেরিলা যুদ্ধে ক্ষত বিক্ষত নামিবিয়ার উইন্ডহকে।

এওয়াইবিআই সিদ্দিকী বা বুরহান সিদ্দিকী তখন নামিবিয়ায় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষি বাংলাদেশি পুলিশ বাহিনীর প্রধান। বিমান বন্দরে স্বাগত জানালেন, সঙ্গে সঙ্গীতশিল্পী স্ত্রী রেহেনা সিদ্দিকী ও ছোট্ট মেয়ে প্রাঙ্গন। তুললেন গাড়িতে,আনলেন নিজের বাড়িতে। বেশ কিছুদিন কাটিয়েছি নামিবিয়ায়, পেয়েছি  তাঁর পরম  সাহচার্য ।

স্মৃতিতে বুরহান সিদ্দিকী

২০ মার্চ ১৯৯০, শেষ রাত, একটু পরেই ২১ মার্চ, দীর্ঘ ঔপনিবেশিক ও বর্ণবাদী শাসন শেষে স্বাধীনতার প্রথম সূর্য উঠবে নামিবিয়ার মাটিতে। হাজারো কালো মানুষের ভিড়ে উপচে পড়ছে উইন্ডহক স্টেডিয়াম। সারা দুনিয়া থেকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগণ এসেছেন ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানে। দেখা হলো আমেরিকার প্রবাদতুল্য কৃষ্ণাঙ্গ মানবতাবাদী জেসি জ্যাকসন, ভারতের সদ্য বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীসহ অনেক বিশ্বখ্যাত মানুষের সাথে। 

দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট ডি ক্লার্ককেও দেখলাম, কথা বলার সুযোগ হলো না। সেই অনুষ্ঠানেই যৎসামান্য কথা হল ইতিহাসের অপরাজেয় বীর নেলসন ম্যান্ডেলার সঙ্গে ।

দেশে ফিরেই প্রত্যক্ষদর্শী অভিজ্ঞতায় লিখে ফেলি নামিবিয়ার স্বাধীনতার ওপর একটি পুস্তক, 'সূর্যোদয় দেখে এলাম’। মফিদুল হকের জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনীর বইটি দ্রুত পাঠালাম বুরহান ভাইয়ের কাছে। তিনি তখন বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত । সাথে সাথে বইটি পৌঁছে দিলেন তিনি দেশটির স্বাধীনতার প্রাণপুরুষ ও প্রথম রাষ্ট্রপতি স্যাম নওমার কাছে। ছবিও পাঠালেন আমাকে।

সম্ভবত গত বছরেই আফ্রিকার মাটিতে দেশের শান্তিরক্ষি বাহিনীর ৩০ বছর পূর্তি উদযাপন করলেন তিনি ব্যক্তিগত ভাবে, পুলিশ বাহিনীর সাবেক সদস্যদের অনেকেই যোগ দিয়েছিলেন তাতে। তাঁর অনুরোধে আমাকেও স্মৃতিতর্পন করতে হল। সেদিনের ছোট্ট প্রাঙ্গনকে দেখলাম অনেক বড় হয়েছে। বুরহান ভাইয়ের স্নেহধন্য প্রথম আলোর তৎকালীন বার্তা সম্পাদক শরিফুজ্জামান পিন্টুকেও দেখলাম। সেই শেষ দেখা। করোনার মধ্যে একবার মাত্র কথা। এরপর এল আকস্মিক মৃত্যু সংবাদ।

অসামান্য মানুষ বুরহান সিদ্দিকী, অজস্র প্রণতি, অভিবাদন তাঁকে ।

লেখক: হারুন হাবীব, মুক্তিযোদ্ধা, কথাশিল্পী, সিনিয়র সাংবাদিক।