ভূমিচ্যুতির অন্তহীন বেদনার কথাকার নোবেলজয়ী রাজ্জাক



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
ভূমিচ্যুতির অন্তহীন বেদনার কথাকার নোবেলজয়ী রাজ্জাক

ভূমিচ্যুতির অন্তহীন বেদনার কথাকার নোবেলজয়ী রাজ্জাক

  • Font increase
  • Font Decrease

অদ্ভুত এক দেশের মানুষ ২০২১ সালে সাহিত্যে নোবেলজয়ী আবদুল রাজ্জাক গুনারহ। তার স্বদেশ তানজানিয়া একটি যুক্তপ্রজাতন্ত্র, ভারত মহাসাগরের তীরে অবস্থিত পূর্ব আফ্রিকান দেশ। জাতিগত বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ এই দেশটিতে প্রায় ১০০টির মতো ভিন্ন ভাষা প্রচলিত। ১৯৬৪ সালে তাঙ্গানিকা ও জাঞ্জিবার দেশ দুইটির একটি মিলিত ফেডারেশন হিসেবে তানজানিয়া প্রতিষ্ঠা করা হয়। তাঙ্গানিকার "তান" এবং জাঞ্জিবারের "জান" শব্দাংশ দুইটি থেকে দেশটির নাম "তানজানিয়া" রাখা হয়েছে।

তানজানিয়ার সাহিত্যিক ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি প্রাথমিকভাবে মৌখিক। প্রধান মৌখিক সাহিত্যিক উপন্যাসগুলোতে লোককাহিনী, কবি, কৌতুক, প্রবাদ এবং গান অন্তর্ভুক্ত। তানজানিয়ার রেকর্ডকৃত মৌখিক সাহিত্যের সবচেয়ে বড় অংশটি সোয়াহিলি ভাষায়, যদিও প্রতিটি দেশের ভাষাগুলোর নিজস্ব মৌখিক ঐতিহ্য রয়েছে। মাল্টিগ্রেনারনাল সোশ্যাল স্ট্রাকচারের ভাঙনের কারণে দেশটির মৌখিক সাহিত্য হ্রাস পেয়ে আধুনিকায়ন বৃদ্ধি পেয়েছে।

আবদুল রাজ্জাকের দেশ তানজানিয়ায় লিখিত সাহিত্য-ঐতিহ্য তুলনামূলকভাবে অবাস্তব। তানজানিয়ায় বইগুলো প্রায়ই ব্যয়বহুল এবং কঠিন হয়। বেশিরভাগ তানজানিয়ান সাহিত্য সোয়াহিলি বা ইংরেজিতে। প্রধান তানজানিয়ান সাহিত্যিক হলেন শাবন রবার্ট (সোহেলি সাহিত্যের পিতা হিসেবে বিবেচিত), মোহাম্মদ সালে ফারসি, ফারজী কাতালাম্বুল্লা, আদম শাফি আদম, মুহাম্মদ সাঈদ আবদুল্লাহ, সাইদ আহমেদ মোহাম্মদ খামিস, মোহাম্মদ সুলেইমান মোহামেদ, ইউফ্রেসি কিজিলাহাবি, গ্যাব্রিয়েল রুহম্মিকা, ইব্রাহিম হুসেন, মে মাতৃরু বালিসিড্য, আবদুল রাজক গুনারহ এবং পেনিনা ওমলা।

আবদুর রাজ্জাক আফ্রিকাকে আবার বিশ্বসাহিত্যের স্পটলাইটে নিয়ে এসেছেন। পুনর্যাত্রা ঘটিয়েছেন ভারত মহাসাগরীয় বিস্তৃত তটরেখার। ৭৩ বছর বয়সি কথাসাহিত্যিককে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হল ‘ঔপনিবেশিকতার অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে তার আপসহীন সংগ্রাম এবং সংস্কৃতি ও মহাদেশীয় পরিসরে উদ্বাস্তু মানুষের কণ্ঠস্বরকে সাহসের সঙ্গে তুলে ধরার জন্য।’

তাঁর জন্ম ১৯৪৮ সালে। ১৯৬০-এর দশকে তিনি উদ্বাস্তু হিসেবে ইংল্যান্ডে উপস্থিত হন। ১৯৬৩ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতা থেকে জাঞ্জিবার মুক্ত হয়। কিন্তু সেই সময় সে দেশে শুরু হয় আরব-বংশোদ্ভূতদের বিরুদ্ধে অত্যাচার এবং গণহত্যা। তিনি ও তাঁর পরিবার আক্রমণের লক্ষ্য হয়ে পড়লে তাঁদের দেশ ছেড়ে চলে যেতে হয়। ১৯৮৪ সালের আগে তিনি আর স্বভূমিতে ফিরে যেতে পারেননি।

এই ভূমিচ্যুতর অন্তহীন বেদনা তাঁকে উত্তর-ঔপনিবেশিকতাবাদের দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করতে বাধ্য করে। পরবর্তী কালে তিনি ক্যান্টারবেরির ইউনিভার্সিটি অব কেন্ট-এ ইংরেজি এবং উত্তর-ঔপনিবেশিক সাহিত্যের অধ্যাপক হিসেবে কাজ শুরু করেন। হাতে তুলে নেন ওলে সোইঙ্কা, গুগি ওয়া থিয়োঙ্গো-এর মতো লেখকদের সাহিত্য বিষয়ে পাঠদানের কাজ। পাশাপাশি নিজেও কলম ধরেন ভূমিচ্যুত মানুষের বেদনা ও ফেলে আসা দেশের স্মৃতি ও সত্তাকে ব্যক্ত করতে।

আবদুল রাজ্জাক ইংরেজি সাহিত্যের মূলধারার চেনা ছক ও কাঠামো থেকে বেরিয়ে এসে উপনিবেশ-উত্তর চৈতন্যকে তুলে ধরাকেই প্রাথমিক কর্তব্য হিসেবে মনে করেছেন। ২০০৫ সালে প্রকাশিত উপন্যাস ‘ডেসারশন’-এ তিনি এমন এক প্রেমকে তুলে ধরেন, যা তাঁর ভাষায় ‘সাম্রাজ্যবাদী রোমান্স’-এর একেবারে বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছে।

তাঁর উপন্যাস ও ছোটগল্পে তিনি সচেতন ভাবে এড়িয়ে গিয়েছেন প্রাক-ঔপনিবেশিক আফ্রিকার ‘ছায়াসুনিবিড় শান্তির নীড়’-গোছের স্মৃতিকাতরতার পুনর্নিমাণকে। বরং দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা দাস ব্যবসা, ভারত মহাসাগরের দ্বীপভূমিগুলোর আকাশে ঘনিয়ে থাকা বিভিন্ন পরস্পর-বিরোধী সংস্কৃতির মেঘকে তিনি লিখতে চেয়েছেন। দেখাতে চেয়েছেন তথাকথিত বিশ্বায়নের অনেক আগেই ভারত মহাসাগরে বাণিজ্য ও রাজনীতি জাঞ্জিবারের মতো দ্বীপভূমিতে বহুমাত্রিক সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছিল। জলজ সংযোগ পথে বিশ্বায়নের সাংস্কৃতিক অনুধাবনে তাঁর পারঙ্গমতা প্রশ্নাতীত বলে প্রতীয়মান হয়েছে।

আবদুল রাজ্জাক যে কোনও ‘পিছুটান’-কে প্রশ্ন করেন তাঁর উপন্যাসে। সেই ‘টান’-এর পিছনে ক্রিয়াশীল প্রাচীন উপনিবেশ ও এখনও সক্রিয় বন্ধনগুলোকে বুঝতে চান বারবার। প্রথম উপন্যাস ‘মেমরি অব ডিপার্চার’ (১৯৮৭)-এ তিনি তৃতীয় বিশ্বের বিপ্লব-স্বপ্নের সেই ভঙ্গুরতাকে লিখে রেখেছিলেন, যার সাক্ষী ছিল এশিয়া ও আফ্রিকার অগণিত দেশের সঙ্গে উপমহাদেশও। ১৯৮৮ সালের উপন্যাস ‘পিলগ্রিমস’-এ তিনি এমন এক যাত্রাকে আঁকেন, যেখানে আত্মপরিচয়, স্মৃতি এবং আত্মীয়তার বোধগুলো চলে আসে প্রশ্নের সামনে। ১৯৯৪ সালের উপন্যাস ‘প্যারাডাইস’ তাঁকে পৃথিবীময় খ্যাতি এনে দেয়, যাতে লোকপু্রাণকথার সঙ্গে সংলাপ ঘটে চলমান-ভাসমান সাম্প্রতিকের। উপনিবেশ-নির্ধারিত উপন্যাসের সীমানা অতিক্রম করে রচিত আখ্যানে তাঁর সৃষ্টিশীলতার সুগভীর বিন্যাস স্পষ্টতর হয়। ১৯৯৬ সালে ‘অ্যাডমায়ারিং সাইলেন্স’ এবং ২০০১ সালে ‘বাই দ্য সি’-তে নীরবতাকে ভূমিচ্যুত মানুষের এক বড় অস্ত্র হিসেবে তুলে ধরেন তিনি। তাঁর সর্বশেষ উপন্যাস ‘আফটারলাইভস’ প্রকাশিত হয়েছে ২০২০ সালে, যা তাঁর দর্শনের ধারাবাহিকতার বিকশিত রূপ।

মাত্র ১০টি উপন্যাস ও একটি ছোটগল্পের সংকলন প্রকাশিত হলেও আবদুল রাজ্জারের প্রতিটি কাজই গবেষণালব্ধ এবং সুপরিকল্পিত। শুধু কথাশিল্পীই নয়, লেখায় চিন্তার বহুমাত্রিক দীপ্তিতে তিনি উত্তর-ঔপনিবেশিক চিন্তকদের মধ্যে তিনি উল্লেখযোগ্য স্থান লাভ করেছেন।

তাঁর নোবেল প্রাপ্তি এক বিশেষ ঘরানার সাহিত্যের দিকেই আবার নজর ফেরায় নি, বিশ্বকে তাকাতে বাধ্য করেছে তাদের দিকে, যারা ছিল বঞ্চিত, অবহেলিত ও বাস্তুহারা। সবার নজর এখন তানজানিয়ার নামের এক যৌথ দেশের দিকে, যার উত্তরে কেনিয়া ও উগান্ডা, পূর্বে ভারত মহাসাগর, দক্ষিণে মোজাম্বিক, মালাউই ও জাম্বিয়া এবং পশ্চিমে গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, বুরুন্ডি ও রুয়ান্ডা। ভারত মহাসাগরের জাঞ্জিবার ও পেম্বা দ্বীপ এবং আরও কিছু ভারত মহাসাগরীয় দ্বীপ দেশটির সীমান্তের অন্তর্ভুক্ত। তানজানিয়ার মোট আয়তন ৯৪৫,১০০ বর্গকিলোমিটার। দারুস সালাম দেশের বৃহত্তম শহর ও প্রশাসনিক রাজধানী। দেশটির আইন প্রণয়ন কেন্দ্র বর্তমানে ছোট শহর দোদোমাতে অবস্থিত। দোদোমাকে ভবিষ্যতে দেশের রাজধানী করার পরিকল্পনা রয়েছে।

তানজানিয়া আফ্রিকার ১৩ তম বৃহত্তম এবং পৃথিবীর ৩১ তম বৃহত্তম দেশ। তানজানিয়া উত্তরপূর্বে পর্বতমালার এবং ঘন ঘন বন, যেখানে প্রসিদ্ধ কিলিমানজারো পর্বত অবস্থিত। আফ্রিকার গ্রেট লেকগুলোর তিনটি আংশিকভাবে তানজানিয়া মধ্যে। উত্তর ও পশ্চিমে লেক ভিক্টোরিয়া, আফ্রিকা এর বৃহত্তম হ্রদ এবং লেক ট্যানগানিয়ান, যা মহাদেশের গভীরতম হ্রদ, তার অনন্য প্রজাতির মাছের জন্য পরিচিত। দক্ষিণপশ্চিমাঞ্চলে লবণ নিশা সেন্ট্রাল তানজানিয়া একটি বিশাল প্লেটু।

কুলাম্বো নদীর জল আরও দক্ষিণে রুখওয়া নদী হয়ে জাম্বিয়া সীমান্তের কাছে লেক টানগানিকের দক্ষিণ-পূর্ব তীরে শেষ হওয়া পর্যন্ত যে বিপুল জনজাতি ও জনপদকে স্পর্শ করেছে, আবদুর রাজ্জাক তাদের হৃত কণ্ঠস্বরকে পুনরাবিষ্কার করেছেন। পুনরাবৃত্তি করেছেন গৃহহীন, বাস্তুহারা মানবপ্রবাহের প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রলম্বিত বুকচাপা হাহাকার। জীবনহারা-প্রান্তিক মানুষের সাহিত্যিক বিনির্মাণের মাধ্যমে আবদুর রাজ্জাক প্রায়-লুপ্ত হয়ে যাওয়া মানববংশকে জীবন্ত করেছেন।