কলকাতায় অনুষ্ঠিত হলো বাংলা কবিতা উৎসব



কলকাতা থেকে কাজল চক্রবর্তী
বাংলা কবিতা উৎসব, কলকাতা

বাংলা কবিতা উৎসব, কলকাতা

  • Font increase
  • Font Decrease

কলকাতা: কলকাতা থেকে প্রকাশিত সাংস্কৃতিক খবর সাহিত্যপত্রের আয়োজনে ৩৪ ও ৩৫তম বাংলা কবিতা উৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত ৪ ডিসেম্বর এ অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন কবি কমল দে সিকদার। তিনি বলেন, এত বছর ধরে একক উদ্যোগে একটা লিটিল ম্যাগাজিন কীভাবে চালাচ্ছেন সম্পাদক কাজল চক্রবর্তী ভাবলে আশ্চর্য হতে হয়, শুধু তাই নয় এই পত্রিকার প্রায় প্রতিটি সংখ্যা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে এত সমৃদ্ধ হয়ে প্রকাশিত হয়, সচেতন পাঠক সংগ্রহে রাখতে বাধ্য হন। আরো বিস্ময়ের জায়গা এই যে, একটা লিটিল ম্যাগাজিন কী করে পাঁচ হাজার টাকা অর্থমূল্যের সাহিত্য-পুরস্কার দেয়।

উৎসবের শুরুতে পৃথিবীজুড়ে কোভিডে মৃত মানুষদের স্মরণে ১ মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। উৎসবটি হওয়ার কথা ছিল দুদিনব্যাপী, ৪ ও ৫ ডিসেম্বর। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে একদিনে সীমাবদ্ধ রাখা হয়। সূচনা হয়েছিলো ১৯৮৭ সালের ২০ ডিসেম্বর। ভারত-বাংলাদেশের কবিদের নিয়ে এই উৎসব হয়ে আসছে। এবছর সল্টলেকের পূর্বশ্রী প্রেক্ষাগৃহে কোভিড বিধি মেনে অনুষ্ঠিত হলো ৩৪-৩৫তম বাংলা কবিতা উৎসব।

প্রধান অতিথি রথীন কর তার অভিভাষণে বলেন, কাজল চক্রবর্তীর এসব কাজের পাশাপাশি যে কাজটি আমাকে মুগ্ধ করে সেটা হলো বিভিন্ন ব্যক্তিকে নিয়ে সম্পাদিত প্রামাণ্য গ্রন্থগুলো।

সাংস্কৃতিক খবরের ১৭৪তম উৎসব সংখ্যাটির আনুষ্ঠানিক মোড়ক উন্মোচন করেন মাসুদ করিম, এবং কাজল চক্রবর্তীর হাইকু কাব্যগ্রন্থটির আনুষ্ঠানিক মোড়ক উন্মোচন করেন কবি রুনা রায়।

সম্পাদকের কিছুকথা বলতে গিয়ে কাজল চক্রবর্তী জানান, ১৯৯৬ সাল থেকে পূর্বাঞ্চল সংস্কৃতি কেন্দ্র আমাদের সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রেক্ষাগৃহ দিয়ে সহযোগিতা করে আসছে। আপনারা জানেন, শহর কোলকাতায় একবছর আগেই কোনো হল পাবার নিশচয়তা কেউ জোগাড় করতে পারে না। পূর্বাঞ্চল সংস্কৃতি কেন্দ্র আমাদের জন্য সেটা করে, আমি আজ জানিয়ে রাখছি আগামী বছরের ডিসেম্বর মাসের প্রথম রোববার ৩৬তম বাংলা কবিতা উৎসব হবে এখানেই।

তিনি বলেন, আপনারা ভাবতেই পারেন কবিতা হলো একান্তে পাঠের বিষয়, সেখানে উৎসব কেন? হ্যাঁ! আমিও আপনাদের সঙ্গে সহমত, কবিতা নিয়ে উৎসব হয় না তবে এই ‘উৎসব’ শব্দটি কেন? উৎসব শব্দটি আমাদের বিভিন্ন কবির স্বকণ্ঠের সঙ্গে পরিচয় ঘটায়, আর যেটা হয় সেটা মেলবন্ধন। মাতৃভাষার দেশ বাংলাদেশ থেকে যারা এসেছেন তাঁরা আমাদের ভালোবেসে নিজ দায়িত্বে এসেছেন। আমার সামান্য সামর্থে আমি বাংলাদেশের কবিদের একহাজার টাকা ও পশ্চিমবাংলার কবিদের দুশো টাকা দিয়ে সঙ্গে স্মারক, সাংস্কৃতিক খবরের উৎসব সংখ্যা দিয়ে শ্রদ্ধা জানাবো।

বাংলা কবিতা উৎসবে প্রদত্ত হয় 'সাংস্কৃতিক খবর পদক', 'বিষ্ণু দে পুরস্কার' ও 'সমীর চন্দ পুরস্কার'। ভিসার জটিলতার কারণে কবি মাহমুদ কামাল ও কবি সাবেদ আল সাদ ২০২১ সালের ‘বিষ্ণু দে পুরস্কার (২০২১)’ নিতে আসতে পারেননি। একই কারণে ‘সাংস্কৃতিক খবর পদক (২০২১) গ্রহণ করতে পারেননি কবি ও সাংবাদিক আবদুর রশীদ চৌধুরী।

২০২০ সালের বিষ্ণু দে পুরস্কার গ্রহণ করেন কবি গৌরশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি জানান, পেশায় চিকিৎসক হলেও আমাদের সাহিত্যের পাঠ নিতে হতো, সেই পাঠ নিতে গিয়ে আমি শ্রদ্ধেয় কবি বিষ্ণুদের ছাত্র ছিলাম একসময়, তাঁর নামাঙ্কিত এই পুরস্কার আমাকে আরো ভালো লেখার প্রেরণা জোগাবে।

সাংস্কৃতিক খবর পদক (২০২০) প্রতিনিধি মারফৎ গ্রহণ করেন কবি স্বপন রায়।

উৎসব মঞ্চে এবছর প্রথম প্রদান করা হয় ‘সমীর চন্দ পুরস্কার (২০২১)। এই পুরস্কার প্রবর্তনের বিষয়ে সাংস্কৃতিক খবর সম্পাদক কাজল চক্রবর্তী জানান, সমীর আমার স্কুলের বন্ধু, স্কুলের পাঠ শেষ করে সমীর আর্ট কলেজে ভর্তি হয়। শৈশব থেকেই ওর আঁকা প্রতি ঝোক ছিলো সেটা আভিধানিক হয় আর্ট কলেজের পাঠান্তে। একসময়ে বোম্বের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে বিখ্যাত আর্ট ডিরেকটার হিসেবে নিজের জায়গা করে নেয় সমীর। ওর জীবদ্দশায় সর্বশেষ শিল্প নির্দেশিত ফিল্মদুটো হলো ‘রাবন’ ও ‘মনের মানুষ’। ওঁর অকাল প্রয়াণে এবছর থেকে ‘সমীর চন্দ পুরস্কার’ চালু হলো।

এই পুরস্কার গ্রহণ করেন মাসুদ করিম ডঃ আনিসুজ্জামানকে নিয়ে নির্মিত তথ্যচিত্র ‘বাতিঘর’এর জন্য। পুরস্কার গ্রহণ করে তিনি জানান, সমীর চন্দ পুরস্কার অবশ্যই আমাকে আরো ভালো কাজ করতে প্রেরণা দেবে। ধন্যবাদ জানাচ্ছি সাংস্কৃতিক খবরকে আমাকে নির্বাচন করার জন্য।

এরপর বাংলাদেশ থেকে আগত চারজন কবি জরিনা আখতার, নাসরীন সুলতানা, সৈয়দা নাজনীন আখতার, ইসমত জেরিন স্মিতা একসঙ্গে মঞ্চে ওঠেন। জরিনা শুরু করেন কবিতা, কানে জেগে থাকে সেই অমোঘ লাইন 'রঙিন ঘুড়ি ওড়াতে চায় মন'। ইসমত জেরিন স্মিতা একপা এগিয়ে বলেন, সময়কে আলিঙ্গন করে সে আমার প্রেম।

পরের পর্বে কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গের জেলার কবিরা মঞ্চে উঠে আসেন। সৌমিত বসু কবিতা পড়াবার আগে জানান, যে সময়ে মুড়িমুড়কির মতো কবিতা নিয়ে উৎসব হতো না সেইসময়ে এই কবিতা উৎসব ছিলো, আজ এতবছর ধরে চলমান এই উৎসবে ইতিহাস জড়িয়ে আছে। ইতিহাসের অন্য দিকটা এইরকম আমাদের আশির দশককে একা সাংস্কৃতিক খবরের সম্পাদক কাজল চক্রবর্তী পাদপ্রদীপের আলোয় এনেছে, কাজলের উপন্যাস, গল্প, কবিতা কতদূর কী থাকবে সেটা আমরা কেউই জানি না, মহাকাল জানে, কিন্তু যেটা আমরা জানি আশির দশকের জন্য কাজলের এই পরিশ্রম সবাই মনে রাখতে বাধ্য। একে একে আশির দশকের সুমিত্রা দত্তচৌধুরী, অলোক বিশ্বাস, অদীপ ঘোষ, গৌতমকুমার দে, কাশীনাথ দাস চাকলাদার, পীযূষ বাকচি, পঙ্কজ মন্ডল প্রায় এক রকমের কথা বলেন, পড়েন কবিতা।

এরপর মঞ্চে আসেন অমল কর, বিমল রায়, সসীমকুমার বাড়ৈ, খগেশ্বর দাস, রুহুল আমিন হক মন্ডল, অরিন্দম চট্টোপাধ্যায়, নবনীতা বসু হক, তাজিমুর রহমান, ভবানীশংকর চক্রবর্তী ও মোহাম্মদ সাদউদ্দীন।

শেষের ঠিক আগের পর্বে কবিতা পড়েন দর্পণা গঙ্গোপাধ্যায়, অভিজিৎ বিশ্বাস, শ্রী পিনাকী রায়, অনিমেষ চন্দন, শঙ্খশুভ্র পাত্র, শোভন বিশ্বাস, সন্দীপ জানা, অনিন্দিতা মুখার্জী সাহা, অনিমেষ রায়, মৃন্ময় ভৌমিক, শ্রীরাজীব দত্ত, মধুবন চক্রবর্তী, রীতা বেরা পাল ও প্রলয় বসু। সকলেই কবিতা পাঠে স্বমহিমায় উজ্জ্বল ছিলেন।

শেষ পর্বে মঞ্চে আসেন সল্টলেকের বাসিন্দা কবি রথীন কর, ইমানুল হক, অনিল দা ও কাজল চক্রবর্তী। প্রত্যেকেই তাদের পাঠে ছিলেন অনন্য। এঁদের কবিতা পাঠের আগে মঞ্চে আসেন বাংলাদেশ সরকারের প্রথম সচিব (প্রেস) শ্রী রঞ্জন সেন। তাকে ফলক, পত্রিকা ও গ্রন্থ দিয়ে বরণ করে নেন রীতা বেরা পাল। 

শ্রী রঞ্জন সেন তাঁর শুভেচ্ছা ভাষণে জানান, আমি এই রকম উদ্যোগে সামিল হতে পেরে খুশি, বাংলাদেশের রূপকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের সুযোগ্য কন্যা আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে বর্তমান বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে, সেই রাষ্ট্রটির ভাষাও বাংলা। এটাও বাংলা কবিতা উৎসব। এখানে বাংলাদেশের কবিদের উপস্থিতির কথাও জানলাম। আমি একটা বিশেষ কাজে আটকে পড়ায় সময়মতো আসতে পারিনি, আমাকে মার্জনা করবেন। আমি এই বাংলা কবিতা উৎসবের উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধি কামনা করছি।

ঘড়ির কাটা সে সময়ে রাত আটটা পার করে ফেলেছে, উৎসব শেষ করার আগে কাজল চক্রবর্তী উপস্থিত সকলকে মঞ্চে ডেকে নেন, কবি নাসরীন সুলতানার আনা ঢাকার মিষ্টি দিয়ে সকলকে আপ্যায়ন করে ৩৪-৩৫ তম বাংলা কবিতা উৎসব শেষ হয়।

আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার পেলেন আহমদ রফিক ও মাসরুর আরেফিন



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক এবং কথাসাহিত্যিক মাসরুর আরেফিন

ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক এবং কথাসাহিত্যিক মাসরুর আরেফিন

  • Font increase
  • Font Decrease

আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার পেলেন দুই প্রজন্মের দুই কথাসাহিত্যিক।

আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার-২০১৯ পেয়েছেন ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক এবং কথাসাহিত্যিক মাসরুর আরেফিন। ‘ভাষা আন্দোলন: টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া’ প্রবন্ধের জন্য আহমদ রফিককে এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ‘আগস্ট আবছায়া’ উপন্যাসের জন্য মাসরুর আরেফিনের নামের পাশে যোগ হয়েছে পুরস্কারটি।

করোনা মহামারির কারণে এবার অনলাইনের মাধ্যমে নির্বাচিত দুই প্রজন্মের দুই কথাসাহিত্যিককে সম্মাননা জানানো হয়। গত ১৫ জানুয়ারি এই আয়োজনে প্রধান অতিথি ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার। এছাড়া ছিলেন আইএফআইসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী শাহ এ সারওয়ার।

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে সমসাময়িক লেখকদের স্বীকৃতি দিতে আইএফআইসি ব্যাংক ২০১১ সালে চালু করে ‘আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার’। প্রতিবছর পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত করা হয় সেরা দুটি বই। নির্বাচিত প্রত্যেক লেখককে পাঁচ লাখ টাকা, ক্রেস্ট ও সম্মাননাপত্র পেয়ে থাকেন।

;

ওমিক্রণে থমকে গেছে বইমেলার আয়োজন



সজিব তুষার, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

এবারও থমকে গেছে লেখক পাঠকের প্রাণের আসর অমর একুশে বইমেলা প্রাঙ্গণ। তুমুল উৎসাহ আর ব্যাপক উদ্দীপনা নিয়ে কাজ শুরু হলেও কোভিড- ১৯ এর ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট আতঙ্ক থামিয়ে দিয়েছে কাজ। একটা বড় অংশের কাঠামো তৈরি হয়ে গেলেও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাঙ্গণে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরে আছে গর্ত আর স্তূপ স্তূপ বাঁশ।

বরাবরের মত এ বছরেও ১ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়ার কথা অমর একুশে বইমেলা-২০২২। সে অনুযায়ী, কাজ শুরু করে দিয়েছিলো আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি। প্রায় শেষ হয়ে এসেছিলো প্রকাশনী গুলোর রেজিস্ট্রেশন ও লটারি পূর্ববর্তী কার্যক্রম। কাজ চলার মাঝেই বাঁধ সাধে বৈশ্বিক মহামারী কোভিড-১৯ নতুন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রন।

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

গত ১৬ জানুয়ারি সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ গণমাধ্যমকে জানান, 'করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতির কারণে আপাতত দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিত করা হয়েছে বইমেলা। মেলার পূর্ণ প্রস্তুতি রয়েছে বাংলা একাডেমির। সংক্রমণ পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকেই শুরু করা যেতো বইমেলা'। 

সরকারের এই ঘোষণার পর থমকে গেছে পুরো উদ্যমে শুরু হওয়া মেলার স্টল তৈরির কাজ। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গিয়ে দেখা যায়, স্টল তৈরির জন্য মাঠে কাঠামোর বেশ খানিকটা তৈরি হয়ে আছে। জায়গায় জায়গায় পুঁতে রাখা রয়েছে বাঁশ। কিন্তু কাজ করতে দেখা যায়নি কোনও শ্রমিককে।

এবারের বই মেলায় প্রথম বই প্রকাশ হবে এমন এক তরুণ লেখক বায়েজিদ হোসেন বলেন, 'ফেব্রুয়ারিতে বইমেলা আমাদের রক্তে গেঁথে গেছে। বৈশ্বিক মহামারী করোনার তোপে পণ্ড হয় গতবারের মেলাও। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো রাস্তায় বসে যাবে। এমন চলতে থাকলে খুব দ্রুতই অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হবেন তারা। এখন পর্যন্ত যেটুকু টিকে আছে সেটা নষ্ট করে ফেললে; শিল্প সংস্কৃতির আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না'।

যথোপযুক্ত স্বাস্থ্যবিধি মেনে বইমেলা সঠিক সময়ে শুরু করার পক্ষে কথা বলেন তিনি।

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গ্রন্থিক'র প্রকাশক রাজ্জাক রুবেল বলেন, 'গতবারের মেলার অভিজ্ঞতার পর এবছর আর রিস্ক নেব বলে মনে হচ্ছে না। সম্ভব হলে জমা দেওয়া টাকাটা ফেরত আনার ব্যবস্থা করবো'।

স্টলের রেজিস্ট্রেশন ও অন্যান্য বাবদ খরচের কথা উল্লেখ করে বলেন, 'দুটা স্টলের জন্য জমা দিতে হয়েছে আগের থেকেও বেশি। ডেকোরেশন খরচ। স্টলের লোকের খরচ। তাদের এমন সিদ্ধান্তে আমি কোনভাবেই লস আটকাতে পারবো না'।

এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমিতে গেলে কেউ কিছু বলতে পারেন নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মচারী জানান, "মহাপরিচালক- প্রকাশক ও সংশ্লিষ্টদের সাথে মিটিং করে সিদ্ধান্ত জানানো পর্যন্ত কেউ কিছু বলতে পারবো না"।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে থেকে তোলা বইমেলার প্রস্তুতিকালীন কাজের একাংশের ছবি। ছবি- বার্তা২৪.কম

 

এর আগে বইমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ও বাংলা একাডেমির পরিচালক জালাল আহমেদ গণমাধ্যমকে জানান, স্বাস্থ্যবিধি মেনে পহেলা ফেব্রুয়ারি থেকেই নেওয়া হচ্ছে বইমেলা শুরুর প্রস্তুতি। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গত বছরও মহামারী করোনাভাইরাসের কারণে দেড় মাস পিছিয়ে ১৮ মার্চ থেকে শুরু হয় অমর একুশে বইমেলা। আবার নির্ধারিত সময়ের দুদিন আগে ১২ এপ্রিলই টানে ইতি। সম্প্রতি করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় বিধিনিষেধ আরোপ করেছে সরকার। তবে দু'সপ্তাহ পিছিয়ে দিলে আদতে বই মেলা হবে কি না এ নিয়ে সন্দিহান অনেকেই। বইমেলা মানেই হাজার মানুষের ভিড়। লেখক পাঠকের সমারোহ। তবে একের পর এক মেলায় ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকলে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গুলো মেলা করবে কি না তা নিয়েও শঙ্কায় আছেন সচেতন মহল।

স্বাস্থ্যবিধি মেনেই মেলা হোক চান বড় একটা অংশের নেটিজানরা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে বেশ আলোচনাও তুলছেন তারা।


উল্লেখ্য, মুক্তধারা প্রকাশনীর মালিক চিত্তরঞ্জন সাহা বাংলা একাডেমির গেইটে ১৯৭২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষা দিবসের অনুষ্ঠানে চট বিছিয়ে শুরু করেন বই বিক্রি। ১৯৭৭ সালে তার সঙ্গে যোগ দেন আরও অনেকে। ১৯৭৮ সালে এ বইমেলার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয় বাংলা একাডেমিকে। তখন মহাপরিচালক ছিলেন আশরাফ সিদ্দিকী। পরের বছরই বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি যুক্ত হয় মেলার সঙ্গে।

মনজুরে মওলা বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্বে থাকার সময় ১৯৮৩ সালে 'অমর একুশে গ্রন্থমেলা' নামে এ মেলা আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হলেও তা আর করা যায়নি। পরের বছর বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গণে আসর বসে 'অমর একুশে বইমেলা'র। ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি জুড়ে কাগজের বইয়ের মুহুর্মুহু গন্ধ মাখা বইমেলাই যেন দর্শনার্থীদের মনে করিয়ে দেয় ভাষা সংগ্রামের কথা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঢাকার জ্যাম ঠেলেও ফেব্রুয়ারিতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাণের গন্তব্য হয়ে দাঁড়ায় ভাষা ও বইপ্রেমী মানুষের কাছে। সবাই চায় বইমেলা ফিরে পাক তার আগের জৌলুশ। বইয়ের সাথে ভবিষ্যত প্রজন্মের এই মিল বন্ধনের পুণ্যভূমি বেঁচে থাকুক সব অশুভ ছায়া থেকে।

;

অন্বেষণ মানে তো খোঁজ, এই খোঁজ হল আত্ম-অন্বেষণ...



সুবর্ণা মোর্শেদা, চিত্রশিল্পী
সুবর্ণা মোর্শেদা

সুবর্ণা মোর্শেদা

  • Font increase
  • Font Decrease

নিজেকে খোঁজার যে তাগিদ, আমার মধ্যে সেটা সবসময়ই কাজ করে। এই তাগিদ থেকেই আমার কাজের শুরু বলা যেতে পারে। সবসময় মনে হয়, নিজেকে খোঁজার চেয়ে কঠিন কিছু নাই। গত দুই বছরে সেই খোঁজার তাগিদ আরো তীব্র হয়ে উঠেছে। এই সময়ে অন্যদের সঙ্গে যখন কথা বলেছি, তার মাঝেও নিজেকেই খোঁজার চেষ্টা চলতো। লকডাউনের বেশ আগে থেকেই নিজেকে অনেক বেশি আইসোলেশনে নিয়ে যাই আমি—একটা নিরঙ্কুশ একাকীত্বের মধ্যে চলে আত্ম-অনুসন্ধানের কাজ। সো, লকডাউন আমার জন্য খুব নতুন কিছু ছিলো না। শুধু বাবা-মায়ের সঙ্গে নতুন করে থাকাটা ছিলো একেবারে নতুন।


২০১৯-এর একটা সময় আমি খুব অন্ধকারে ডুবে যাই। স্বভাবগত দিক থেকে রঙিন মানুষ হয়েও একটা গভীর ব্যক্তিগত কারণে আমার জীবন হয়ে পড়ে সম্পূর্ণ সাদা-কালো। আর এ সময়টাতেই নিভৃতে অনেকগুলো কাজ করে ফেলি। কখনো লিথোগ্রাফ, কখনো পেন্সিল স্কেচ আর কাগজে সেলাই করে করা এ-কাজগুলোই আমাকে সেই গভীর অন্ধকারেও বেঁচে থাকার প্রেরণা যুগিয়েছে। কাগজে সেলাই করে শিল্পকর্ম নির্মাণের একটা আলাদা আনন্দ আছে। সেটা হলো স্পর্শের আনন্দ।


এই স্পর্শকে কেমন করে দেখাবো! সেলাইয়ের উঁচু-নিচু অংশগুলোকে আমি বলি স্পর্শের প্রতীক। এর মধ্য দিয়ে স্পর্শের অনুভূতিকে অন্যের মনে সঞ্চার করা যায়। বড় হওয়ার পর, জীবনে এই প্রথম আমি মায়ের সাথে বাবার সাথে এতো দীর্ঘ সময় আমি কাটানোর অবকাশ পেয়েছি। আমার মায়ের গাছ লাগানোর শখ অনেক আগে থেকেই। সেই শখ লকডাউনে আরো তীব্র হলো।

তাঁর লাগানো গাছগুলো যতো বড় হচ্ছিলো, আর তাঁর বয়স যেন ততোই কমছিলো। গাছে ফল ধরা, ফুল ধরা দেখে তাঁর কী যে এক আনন্দ! সব মিলে যেন এক অপার্থিব অনুভূতি! তো, আমি তাঁকে একজন সফল চাষী হিসেবে ঘোষণা করলাম। দীর্ঘদিন ধরে আমি গন্ধ, স্পর্শ নিয়ে কাজ করি। এবার মায়ের গন্ধের সঙ্গে যোগ হলো মায়ের বাগানের গন্ধ-স্পর্শ।


গাছগুলোর পাতা যখন ঝরে পড়ে, সে-পাতার রং, শেইপকে আমার কাজের সঙ্গে সংযুক্ত করা আর স্পর্শগুলোকে ধরার জন্যই আমার কাগজে সেলাই করার কাজ। আমার ঘুমের সমস্যা আছে। রাতে ঘুম হয় না বা হতো না সেই অন্ধকার সময়গুলোতে। ঘুম না হওয়ার কারণে যে সকালে খারাপ লাগতো তা-ও না। সকালের গন্ধ আমার খুব প্রিয়।


এরমধ্যেই হলো মায়ের করোনা। দীর্ঘ ১ মাস ধরে মায়ের সিরিয়াস কন্ডিশন । আমি বুঝতে পারতাম, গাছগুলোও মাকে খুব মিস করছে। এদিকে মা তো হসপিটালে অক্সিজেন নিতে ব্যস্ত! ২৪ ঘন্টাই মায়ের সঙ্গে থাকি। তাঁর অক্সিজেন স্যাচুরেশন কমে যাওয়া-- কখনও ভালো, কখনও মন্দ। অবশেষে মায়ের জয়ী হয়ে ঘরে ফেরা। তাঁর সঙ্গে আবার তাঁর গাছেদের সেই নিবিড় সম্পর্ক--গভীর বন্ধুত্ব!

পুরো সময়টাই যেন কবিতার মত, প্রেমের কবিতা! আমার সাদা-কালো ক্যানভাসে ছড়িয়ে দেওয়া রঙের মত! অন্ধকারে অপরূপ আলোর মত। আমার ছবিগুলো যেন জীবনের মত! আমার জীবন যেন আমার ছবির মতো!

সকলকে আমন্ত্রণ!


চিত্রকর্ম প্রদর্শনী: ‘অন্বেষণ’
শিল্পী: সুবর্ণা মোর্শেদা (তৃতীয় একক প্রদর্শনী)
স্থান: ইএমকে সেন্টার
প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন: অধ্যাপক জামাল আহমেদ, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, তাওহিদা শিরোপা।
মাধ্যম: লিথোগ্রাফ, সায়ানোটাইপ, পেন্সিল স্কেচ, জলরংসহ বিভিন্ন মাধ্যম
সংখ্যা: মোট ৪২টি শিল্পকর্ম
চলবে: ১৫-৩০ জানুয়ারি
শো কিউরেটর: রেজাউর রহমান

;

কল্পনা ও ইতিহাসের ট্রাজিক নায়িকা আনারকলি



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

আনারকলির নাম উচ্চারিত হলে উত্তর-পশ্চিম ভারতের আবহে এক করুণ-মায়াবী প্রেমকাহিনী সবার মনে নাড়া দেয়। ইতিহাস ও কল্পকথায় আবর্তিত এই রহস্যময়ী নতর্কীর পাশাপাশি শাহজাদা সেলিম তথা সম্রাট জাহাঙ্গীর, সম্রাট আকবর, সম্রাজ্ঞী যোধা বাঈ চোখের সামনে উপস্থিত হন। ভেসে আসে পরামক্রশালী মুঘল আমলের অভিজাত রাজদরবার ও হেরেম। ব্রিটিশ ঔপনিবেশ-পূর্ব উপমহাদেশের ঐতিহ্য, সমৃদ্ধি, সাংস্কৃতিক দ্যুতি, বহুত্ববাদী পরিচিতির রাজকীয় অতীত এসে শিহরিত করে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের দেশগুলোর নাগরিকদের। 

১৫২৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ১৮৫৭ সালে অস্তমিত ৩৩১ বছরের বিশ্ববিশ্রুত মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাসে বহু সম্রাট, শাহজাদা, শাহজাদীর নাম বীরত্বে ও বেদনায় লিপিবদ্ধ রয়েছে। কিন্তু আনারকলির নাম বিশ্বস্ত ঐতিহাসিক বিবরণের কোথাও লেখা নেই, যদিও মুঘল হেরেমের এই রহস্যময়ী নারীর নাম আজ পর্যন্ত শিল্প-সাহিত্য-চলচ্চিত্র ও লোকশ্রুতিতে প্রবাহিত হচ্ছে। সম্রাজ্ঞী, শাহজাদী কিংবা কোনও পদাধিকারী না হয়েও মুঘল সংস্কৃতির পরতে পরতে মিশে থাকা কে এই নারী, আনারকলি, যিনি শত শত বছর ধরে মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হচ্ছেন, এমন জিজ্ঞাসা অনেকেরই। ইতিহাসে না থাকলেও শিল্প, সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে চিত্রিত হচ্ছেন তিনি অকল্পনীয় জনপ্রিয়তায়। ইতিহাস ও মিথের মিশেলে তাকে নিয়ে আখ্যান ও কল্পকথার কমতি নেই। তার নামে প্রতিষ্ঠিতি হয়েছে মাজার, সমাধি স্মৃতিসৌধ, প্রাচীন বাজার, মহিলাদের পোষাকের নান্দনিক ডিজাইন। ইতিহাসের রহস্যঘেরা এই নারীকে নিয়ে নির্মিত হয়েছে ইতিহাস সৃষ্টিকারী চলচ্চিত্র ‘মুঘল-ই-আজম’। রচিত হয়েছে অসংখ্য গ্রন্থ ও গবেষণা।

যদিও বাংলা ভাষায় আনারকলিকে নিয়ে আদৌ কোনও গ্রন্থ রচিত হয়নি, তথাপি উর্দু সাহিত্যে তাকে নিয়ে রয়েছে একাধিক নাটক ও উপন্যাস। ইংরেজিতে রয়েছে বহু গ্রন্থ। বিশেষত উর্দু ভাষার বলয় বলতে উত্তর ও পশ্চিম ভারতের যে বিশাল এলাকা পূর্বের বিহার থেকে পশ্চিমে পাঞ্জাব পর্যন্ত প্রসারিত, সেখানে আনারকলি একটি অতি পরিচিত ও চর্চিত নাম। সাহিত্যে ও লোকশ্রুতিতে তিনি এখনও জীবন্ত। অবিভক্ত পাঞ্জাবের রাজধানী লাহোরে রয়েছে আনারকলি মাকবারা। মাকবারা হলো কবরগাহ, সমাধিসৌধ। মুঘল স্মৃতিধন্য শহর দিল্লি, লাহোরে আছে আনারকলি বাজার। সাহিত্য ও লোককথার মতোই আনারকলিকে নিয়ে নির্মিত নানা লিখিত ও অলিখিত উপাখ্যান। 

অথচ মুঘল রাজদরবার স্বীকৃত ইতিহাস বিষয়ক গ্রন্থগুলোর কোথাও উল্লেখিত হন নি আনারকলি। প্রায়-প্রত্যেক মুঘল রাজপুরুষ লিখিত আকারে অনেক স্মৃতি ও ঐতিহাসিক বিবরণ লিপিবদ্ধ রাখলেও তার নাম আসে নি কোনও মুঘলের আত্মস্মৃতি বা ইতিহাস গ্রন্থে। তাহলে কেবলমাত্র একটি কাল্পনিক চরিত্র হিসেবে তার নাম অর্ধ-সহস্র বছর ধরে লোকমুখে প্রচারিত হলো কেন এবং কেমন করে? সত্যিই আনারকলি বলে কেউ না থাকতেন কেমন করে সম্ভব হলো পাঁচ শতাধিক বছর ধরে নামটি টিকে থাকা? এসব খুবই বিস্ময়কর বিষয় এবং আশ্চর্যজনক ঐতিহাসিক প্রশ্ন।

ভারতবর্ষে মুঘল ইতিহাসের এক রহস্যময় নারী চরিত্র রূপে আনারকলিকে নিয়ে আগে বহু চর্চা হলেও সবচেয়ে সফল ও ব্যাপকভাবে তিনি চিত্রিত হয়েছেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের কেন্দ্রস্থল বলিউডের ইতিহাস সৃষ্টিকারী সেরা জনপ্রিয় ও ব্যবসা সফল ছবি ‘মুঘল-ই-আজম’-এ। ছবির কাহিনী মুঘল-ই-আজম তথা শাহানশাহ জালালউদ্দিন মোহাম্মদ আকবরের দরবারে আবর্তিত। আকবরপুত্র শাহজাদা সেলিম, যিনি পরবর্তীতে হবেন সম্রাট জাহাঙ্গীর, মুঘল দরবারের এক নবাগত নর্তকী আনারকলির প্রেমে বিভোর। দীর্ঘ ছবিটি সেলিম-আনারকলির প্রণয়ের রোমান্টিকতায় ভরপুর। কিন্তু সম্রাট আকবর সেই ভালোবাসা মেনে নিতে নারাজ। প্রচণ্ড ক্রোধে আকবর আনারকলিকে শাহজাদার জীবন থেকে সরিয়ে দিয়েই ক্ষান্ত হন নি, সম্রাটপুত্রকে ভালোবাসার অপরাধে তুচ্ছ নর্তকী আনারকলিকে জীবন্ত কবরস্থ করেন। 

প্রশ্ন হলো, সত্যিই যদি আনারকলি নামে কোনও চরিত্র না-ই থাকবে, তাহলে এতো কাহিনীর উৎপত্তি হলো কেমন করে? সাহিত্যে ও চলচ্চিত্রে আনারকলিকে কেন্দ্র করে যা বলা হয়েছে বা দেখানো হয়েছে, তার সত্যতা কতটুকু? সত্যিই কি আনারকলিকে জীবন্ত কবর দেওয়া হয়েছিল? নাকি আনারকলি বলে ইতিহাসে কোনও চরিত্রই ছিল না? নাকি সব কিছুই লোকমুখে ছড়িয়ে পড়া কোনও মিথ, উপকথা বা গল্প? এসব প্রশ্নের উত্তর শত শত বছরেও মেলে নি।

আনারকলি যদি ‘কাল্পনিক’ হবেন, তাহলে, মুঘল আমলে ভারতে আগত ইংরেজ পরিব্রাজকের বর্ণনায়, লখনৌর লেখকের উপন্যাসে, লাহোরের নাট্যকারের নাটকে, বলিউডের একাধিক সিনেমায় আনারকলি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হবেন কেন? কেন শত শত বছর কোটি কোটি মানুষ আনারকলির নাম ও করুণ ঘটনায় অশ্রুসিক্ত হচ্ছেন? কেন আনারকলির নামে ভারতের প্রাচীন শহরগুলোতে থাকবে ঐতিহাসিক বাজার? লাহোরে পাওয়া যাবে তার কবরগাহ, যেখানে শেষ বয়সে শাহজাদা সেলিম তথা সম্রাট জাহাঙ্গীর হাজির হয়ে নির্মাণ করবেন সমাধিসৌধ আর রচনা করবেন করুণ প্রেমের কবিতা?

এসব প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানের জন্যে ‘কিছুটা ঐতিহাসিক, কিছুটা কাল্পনিক চরিত্র আনারকলি’ ও তাকে ঘিরে প্রবহমান প্রাসঙ্গিক ঘটনাবলীর ঐতিহাসিক পর্যালোচনা ভিত্তিক এই রচনা। আমার রচিত ‘দারাশিকোহ: মুঘল ইতিহাসের ট্র্যাজিক হিরো’ (প্রকাশক: স্টুডেন্ট ওয়েজ) গ্রন্থটি পাঠকপ্রিয়তা লাভ করায় মুঘল মূল-ইতিহাসের বাইরের এই রহস্যময়ী চরিত্র ও আখ্যানকে বাংলাভাষী পাঠকের সামনে উপস্থাপনে উৎসাহী হয়েছি। উর্দু ও ইংরেজিতে আনারকলির ঘটনাবলী ও প্রাসঙ্গিক ইতিহাস নিয়ে বহু লেখালেখি হয়েছে। যেগুলো থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছি। আনারকলির প্রসঙ্গে তাকে নিয়ে নির্মিত অবিস্মরণীয় চলচ্চিত্র ‘মুঘল-ই-আজম’ সম্পর্কেও আলোকপাত করেছি। চেষ্টা করেছি ইতিহাস ও মিথের মধ্যে লুকিয়ে থাকা মুঘল হেরেমের রহস্যময়ী নতর্কী ও বিয়োগান্ত প্রেমের নায়িকা আনারকলিকে অনুসন্ধানের।

;