সাঈদ চৌধুরী: চিত্তে উড়ে জালালী কইতর



মুসা আল হাফিজ
সাঈদ চৌধুরী

সাঈদ চৌধুরী

  • Font increase
  • Font Decrease

আপনি গল্পকার। প্রত্যক্ষের আড়ালে জীবনের যে জটিলতা ও রহস্যময়তা, তাকে আপনি বয়ন করেন। সেই বয়নে চরিত্রের প্রতি আপনি পক্ষপাতশূন্য, আবেগ বিষয়ে ঘোরাহত কিন্তু নির্বিকার, শিল্পী হিসেবে অঙ্গীকারাবদ্ধ কিন্তু নিরাসক্ত, পরিবেশ বিষয়ে বহুদর্শী ও সচেতন, বিচারবুদ্ধি সম্পর্কে আপনি নাছোড়, নিরাপোষ। আপনার মনোযোগ মূলত স্বরূপ সন্ধানে।

হ্যাঁ, আপনি গল্পকার। চোখ আপনার চাই। নিজের চোখ। এক জোড়া, কয়েক জোড়া, কিংবা কয়েক শত ... জ্বলজ্বলে, ড্যাবড্যাবে চোখ। রঞ্জনরশ্মি তাতে থাকবে, সব ঘষে ঘষে যাচাই করার ক্ষমতা সরবরাহ করবে সেই চোখ, শব্দে, বাক্যে, চরিত্রে, প্লটে সেই চোখের জ্যোতি জ্বলতে থাকবে। এর ভেতরে থাকবে অভিজ্ঞতা, বাইরে থাকবে শিল্পরূপায়ন।

এই যে আমরা চোখ নিয়ে কথা বলছি, উপলক্ষ তৈরি করে দিয়েছে সাঈদ চৌধুরীর একগুচ্ছ গল্প। গল্পগুলোতে আন্তরজীবনের অন্তরীণ ভাষা যতোটা বন্ধনমুক্ত হয়েছে, তার চেয়ে বেশি হয়েছে বাইরের চিত্রপট। সাঈদ চৌধুরীর দেখার চোখ ভ্রামণিকের কথা মনে করিয়ে দেয়। যার দৃষ্টি ও সৃষ্টির একপ্রান্তে সবুজ-শ্যামলে, প্রাণে ও অধ্যাত্মে পল্লবিত সিলেট, আরেক প্রান্তে টেমসের তীর, ব্রিটেন-ইউরোপ।

সাঈদ চৌধুরী মানুষের জীবন যাপনের বিচিত্র অনুষঙ্গকে দেখেছেন দুনিয়ার নানা প্রান্তে ঘুরে ঘুরে। তার প্রান্ত যেখানেই যাক, শেকড় থেকেছে বাংলায়, দেশ মৃত্তিকায় আর স্বকীয় আত্মপরিচয়ে। যে পরিচয় জন্ম নিয়েছে মুসলিম ঐতিহ্য থেকে। তার আলোকের ঝরণাধারা স্থির মূল্যবোধ থেকে উড়নচণ্ডী এই সমাজ ও সময়কে দেখার ও দেখানোর একটি প্রতিবেদন। এই দেখা ও দেখানোর মূল লক্ষ্য ও কেন্দ্র হলো আলোয় প্রত্যাবর্তনের ব্যাকুলতা।


গল্প অনেক রকম। ব্যক্তির যে নিজস্ব যাপন, সেই যাপনের পটভূমি থেকে যখন গল্প তৈরী হয় আর তার চরিত্র সমূহ বিকশিত হয়, একে আমরা লিপ্তধারার গল্প বলতে পারি। সাঈদ চৌধুরী মূলত লিপ্তধারার গল্পকার। ফলে তার চরিত্রগুলোকে তার জীবনের যাপন থেকে যেমন আলাদা মনে হয় না, তেমনি তার পরিবেশ চিত্রায়নও তার যাপনশীলতার অংশ।

আলোক ঝরণাধারা গল্পের হান্নানা থাকেন সিলেটে, যেখানে একদিকে চাষণীপীরের মাজার, অপরদিকে অসংখ্য বানরের বসবাস। যখন মাজার হাজির হলো, মনষ্কামনাও হাজির। হান্নানা আপন মনোবাসনা পুরণের আশায় মাজারে মান্নত করেন, তবে গল্পের আলাল একে পছন্দ করে না। যদিও পশুপাখির প্রতি তার অনুরাগ প্রবল।

আলালের হৃদয়ে বসবাস করে সামিয়া। ভালোবাসা দিবসে তারা বিনিময় করে ফুল। এই ফুল ক্রয়ে দোকানযাত্রায় লেখক হাজির করেন ভালোবাসা দিবসের আড়ালে বাণিজ্যের পসরাকে। গল্পের প্রধান চরিত্র পলাশ থাকেন ইংল্যান্ডে, ফিরে আসেন সিলেটে, স্ত্রী মারা গেছেন এখানেই। বিয়ে করতে চান না। কিন্তু পরিবার মনে করে, প্রয়োজন হাজির করে। গল্পের সমাপ্তি ইতিবাচকতায়। রঙধনুর রঙের ছটায় সুদর্শন পরীর মতো হানিফা জড়িয়ে ধরে তার বাবাকে।

এই একটি গল্প সাঈদ চৌধুরীর গল্পমানসকে চিহ্নিত করার জন্য চাবিগল্পের কাজ করতে পারে। এখানে তার রূপদক্ষতা চিহ্নিত, প্রকৃতিকে বয়ানের যে মনোজ্ঞ রুচিবাগীশী, সাঈদে তা প্রতিফলিত। দৃশ্য- কী লন্ডনে, কী সিলেটে; গুচ্ছ গুচ্ছ আর্ট হয়ে ধরা দিয়েছে। এই গল্পের কেন্দ্রে আছে পারিবারিক বন্ধন, শুভবোধ। যখন পরিবার ভাঙছে, মানুষ মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন হচ্ছে, শিথিল হচ্ছে ভ্রাতৃবোধ। সাঈদ চৌধুরী তার গল্পে যুথবদ্ধ একটি পরিবারের পাটাতনে এই অবক্ষয় থেকে উদগতি কামনা করেছেন। যেভাবে অন্য এক গল্পে তিনি মারওয়ানের জবানে হাজির করেন বিয়ের যুক্তি ও প্রয়োজন, গল্পের নায়িকা সাবিহা যখন বিয়ের বিপক্ষে।  

কিন্তু এখানে কি স্পষ্ট কোনো প্রতিবাদ আছে? আছে, কিন্তু তা চিত্কৃত নয়, প্রচ্ছন্ন। গল্পকারের স্বার্থকতার জন্য এটি জরুরী। সাঈদ চৌধুরী যে কাব্যিক, এর সাক্ষ্য রয়েছে তার বাক্যে, স্থাপত্যে। কবির গদ্য বলে যে একটা কথা, তা বাংলা গল্পকথনে শক্তিশালী ঐতিহ্য গড়েছে। সাঈদ সে ঐতিহ্যের ফসল। এই কাব্যগন্ধ ভাষার মধ্যে একটি তন্ময়তা নিশ্চিত করে, যা গল্পের লাবণ্যে আনে বিশেষ মাত্রা।

সাঈদ চৌধুরীর অন্যসব গল্পে নজর বুলাই। সৌভাগ্যের স্বর্ণ সুড়ঙ্গ দিয়ে দেখা যায় প্রবাস, একটি পরিবার, সিলেট, সিলেটের টেকেরঘাট, প্রাকৃতিক সম্পদ, চুনাপাথর, কক্সবাজারে সমুদ্র সৈকত, মাটির তলের রত্ন, একটি গ্রামে শীতের সকাল, আনাসের বাড়ী, ভরপুর গাছপালা, বর্ষা, ফুল-ফল, শাক-সবজি, এরই মাঝে বরকত-ফারিয়ার প্রেম। গল্পের আনাস সঙ্গদোষের অনুতাপে পুড়ে। ভাগ্যের উদার অনুগ্রহ তাকে দেয় উন্নত মানবিক জীবনের সম্ভাবনা। সেই সম্ভাবনা সবার মধ্যেই রয়েছে এবং সাঈদ চৌধুরী চান এর যথাবাস্তবায়ন।  

কিন্তু আরবান জীবনের দু:সহ অবক্ষয়ের পাশাপাশি চিরায়ত গ্রামীন সমাজও তো ডুবে আছে ঝগড়া, প্রতারণা, স্বার্থসংঘাত ইত্যাদিতে। মানবিকতা গল্পে এর চিত্র বাংলাদেশী লোকজীবনের এক ব্যথিত প্রেক্ষাপটের জানান দেয়। গ্রামে ঢুকে পড়া গাঁজা, দেশীয় অস্ত্র, দা, ছুরি ইত্যাদি দেখা যাচ্ছে। সেগুলো প্রতারণার হাতিয়ার হচ্ছে। ক্ষমতার প্রশ্রয়ে নির্দোষকে বানানো হচ্ছে দোষী।

চলমান ও জ্বলন্ত সংকট সাঈদ চৌধুরীকে বিচলিত করেছে, তার গল্পে আছে দুর্ভিক্ষের ছায়া, করোনায় বাবা হারানো ফারহানার দু:খাকুল বাস্তবতায় অসুস্থ মা আর হাসপাতাল। বিপদের চোখরাঙানি তাকে ঘিরে ধরলেও সে শুভবাদী; মানুষের হয়ে কাজ করতে উদগ্রীব ও সচেষ্ট। সে বেদনা ও জটিলতাকে জয় করে মানবপ্রেম দিয়ে। এর মধ্যে নিয়ে আসে আনন্দের আস্বাদ।

জীবন যেখানে দু:খতরঙ্গের খেলা, সেখানে আশাকেই ফারহানা একমাত্র ভেলা মনে করে না। সে ইতিবাদী প্রচেষ্টা ও শুভেচ্ছাকে ভেলা বানায়। তৈরী হয় ‘শুভ্র সাদায় আচ্ছাদিত’ বাগানের এমন দৃশ্যপট, যেখানে অসুস্থ মা সুস্থ হয়ে উঠেন এক ভোরে, যেখানে অসুস্থতার ভেতর অলৌকিক ঝরণা আর পুষ্পিত সুন্দরতায় হাটতে দেখেন আপন স্বামীকে। সেই দেখাকে উচ্চরবে তিনি ব্যক্ত করেন। যেন জীবনের নিরাশার ভেতর কথা বলছে ঐশী বিশ্বাস!

সাঈদ চৌধুরীর অতিন্দ্রীয় বিশ্বাসের যে স্বচ্ছলতা, তার চিত্রায়ন এ গল্পে স্পষ্ট। যেভাবে স্পষ্ট মানবিক দায়শীলতার অনুভব। যেভাবে জিনের অস্তিত্ব প্রমাণে তিনি যুক্তির অবতারণা করেছেন ‘বাসকিউন্স ভুত’ আর ‘ভুতের অট্টহাসি’ গল্পে। উভয় গল্পে তৈরী হয় এক গা ছমছমে পরিস্থিতি। ভূতের গল্প বলতে বলতে দৌড় দেয় ইংল্যান্ডের জন। আর বাংলার একটি গ্রামে ভূতের বাস্তবতায় উচ্চারিত হয় আয়াতুল কুরসির তেলাওয়াত।   

সাঈদ চৌধুরীর এই গল্পজার্নি আমাদের জীবন যাপনের ভাঙ্গা টুকরোগুলোকে জড়ো করে করে অগ্রসর হয়। প্রকৃত অর্থে এই টুকরাগুলো সাঈদ চৌধুরীর জীবনেরই ছিন্নভিন্ন মুখ, ছিন্নভিন্ন কিন্তু সমন্বিত। সেই সমন্বয় থেকে জন্ম নেয় তার গল্প, চরিত্র। ফলে সাঈদ চৌধুরীর আত্মপ্রকাশের প্রথম লগ্নে তার উপন্যাসের আহমদ চরিত্রকে ঠিক জায়গায় সনাক্ত করেছিলেন কবি-কথাকার আল মাহমুদ। লিখেছিলেন ছায়াপ্রিয়া  উপন্যাসের নায়ক ‘আহমদ’ চরিত্রটির আড়ালে আমি যেন সাঈদ চৌধুরীর মুখটিই দেখতে পেয়েছি। কাল্পনিক এ চরিত্রটি যেন আদর্শ হয়ে ধরা দিয়েছে, পাঠকের চেতনে। আর আহমদের ভাললাগার মানুষটির মাঝে নিজের প্রিয়তমার প্রতিচ্ছবি কেউ দেখতে পেলে অবাক হওয়ার কিছু নেই।‘

সাঈদ চৌধুরীর সেই উপন্যাসের ৪টি সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছিলো বলে আল মাহমুদ নিজের আশ্বস্তি জ্ঞাপন করেন। স্বার্থক একটি সৃষ্টির বৈশিষ্ট বোধ হয় এমনই হয়। তার উদ্দেশ্যে আল মাহমুদ বলেছিলেন, পেশাগত শত ব্যস্ততার ভেতরে সাহিত্যচর্চা অব্যাহত রাখতে। তখন তাকে যথাযথ মূল্যায়ণ করতে সুবিধা হবে বৈকি।

এই যে শত ব্যবস্থতার কথা বললেন আল মাহমুদ, তা সাঈদ চৌধুরীর জীবনের প্রধান এক দিক। ব্রিটেন প্রবাসী এই লেখক ও এক্টিভিস্ট পেশাগতভাবে ব্যবসায়ী, এয়ারলাইন ব্যবসায় যুক্ত ছিলেন, বিমান কোম্পানির ছিলেন একজন ডাইরেক্টর। ‘ব্রিটিশ-বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল এন্ড কলেজ’ এর প্রতিষ্ঠায় ছিলেন যুক্ত, সম্পাদনা করেছেন সাপ্তাহিক ইউরো বাংলা। করেছেন রিসোর্ট ব্যবসা। আবার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আল মাহমুদ ফাউন্ডেশনের, নেতৃত্বে আছেন সংলাপ সাহিত্য-সংস্কৃতি ফ্রন্ট সহ বহু সংগঠনের।

 ইতোমধ্যে লিখেছেন নানা গ্রন্থ। উপন্যাস ছায়াপ্রিয়া, প্রবন্ধ গ্রন্থ সুনিকেত, সাক্ষাৎকার কালজয়ী কবিতার স্রষ্টা আল মাহমুদ, কবিতাগ্রন্থ আত্মার অলিন্দে, আরব জাহান নিয়ে স্মৃতিময় লেখা ধুসর মরু বুকে, বিলেত নিয়ে লেখা লন্ডনে যাপিত জীবন, সাহিত্য আলোচনা সমকালীন সাহিত্য ভুবন ইত্যাদি।

সাঈদ চৌধুরীর কলাম, প্রতিবেদন, ফিচার ও সাহিত্য আলোচনাও দৃষ্টিতে পড়ে। এর মধ্যে রয়েছে এক ধরণের সাংবাদিকসূলভ বর্ণনা ও মনস্বীতা। তার এ চরিত্রের রচনায় রয়েছে এক ধরণের স্বাদু ব্যাপার। কয়েকটি রচনা শিরোনামের সাথে পরিচিত হওয়া যাক। (লিংক সংযুক্ত)

এভাবে লেখালেখি ও টেলিভিশন আলোচনায়ও তার চারুউচ্চারণ শোনা যায়। সাংগঠনিকতায় নিজেকে রেখেছেন সক্রিয়। এতো সব মাত্রার মধ্য দিয়ে সাঈদ চৌধুরী সচল থাকছেন। নিজের ও নিজের দেখা জীবনের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দিয়ে প্রতিবেদনদেহ সাজানোর কাজ করছেন। যেন হৃদয়গ্রাহী সুন্দরের হাসির পাশে তার রক্তাক্ত শরীর ও রোদনের ধ্বনি আমাদের দৃষ্টি ও কান না এড়ায়। এরই মধ্যে লড়াই করে অগ্রগতি নিশ্চিত করাই তো মানবপ্রগতির ইতিহাস।

একটা সময়ে পৃথিবীটা মানুষের কাছে আতঙ্কই ছিল। প্রাকৃতিক পরিবেশ, হিংস্র জন্তু-জানোয়ার আর দুর্গমতার কারণে। মানুষের কাছে একটা গোষ্ঠীর বিচরণ ভূমিই সমগ্র পৃথিবী বলে পরিগণিত হয়েছে। মানুষ একে একে পৃথিবীটাকে জয় করতে পেরেছে তার উদ্যম অদম্য স্পৃহা আর সীমাহীন দৃঢ় মনোবলের কারণে। মানুষ বদলাতে পেরেছে প্রকৃতির খেয়াল, আয়ত্তে আনতে পেরেছে বৈরী পরিবেশের, জন্তু-জানোয়ার অধীন হয়েছে মানুষের আর দুর্গম আর দুর্গম নেই, মানুষের পদচারণায় মুখর হয়েছে অজানা-অচেনা পৃথিবী। এখন প্রকৃতি কেবল প্রকৃতি নয়, মানবিক প্রকৃতি।

এই যে জয়, সেখানেও আছে প্রখর শুন্যতা। কারণ প্রকৃতি জয়ে মানুষ অগ্রগতি অর্জন করলেও মানুষ কি জয় করতে পেরেছে নিজেকে? মানুষকে? নিজের মধ্যকার পিশাচকে জয় করতে পারেনি বলেই তাদের লোভের থাবা ও হিংস্রতা শুধু প্রকৃতিকে বিপন্ন করছে না, মানুষের ভবিষ্যতকেও হুমকিগ্রস্থ করছে। ফলে মানুষের ভেতরের অমানুষের সাথে যে লড়াই, সেটা অতীতে যেমন গুরুতর বিষয় ছিলো, আজকে আরো বেশি। এ লড়াই জারি থেকেছে সেই কাল থেকে এই কালে এবং আগামী সব দিনে-রাতে। নানা তত্ত্ব, নানা চেষ্টা, নানা সংগ্রাম কেবল বেঁচে থাকবার পরিসরকে বড় করার লড়াই জারি রাখে। সেই লড়াইয়ে একজন কবি, একজন গাল্পিক, একজন শব্দশিল্পী মনের ও হৃদয়ের আলোকমালাকে ব্রক্ষাস্ত্র বানিয়ে লড়েন। চিরায়ত সুন্দরের অন্বেষা তাদের করে তৃপ্তিহীন। সেই লড়াই ও অতৃপ্ত যাত্রা তাদেরকে বহুমুখি সৃষ্টিশীলতায় সক্রিয় রাখে।

সাঈদ চৌধুরীও আপন সৃজনক্ষেত্রে নানা মাত্রিক। কবিতা হচ্ছে তার আত্মপ্রকাশের অন্যতম এক প্রকরণ। কবিতায় সাঈদ চৌধুরী সরল, সাবলীল। একদম ঠোঁটের ভাষায় রচিত তার কবিতা। প্রকরণের প্রতি মনোযোগের চেয়ে বিষয় ও বক্তব্যের প্রতি নিষ্ঠা এক ধরণের কবিতায় প্রকাশ পায়। সেগুলো মূলত বক্তব্যপ্রধান কাব্য। এমন কাব্যে সাঈদ প্রগলভ। 

সাঈদ চৌধুরীর গল্পে  মজলিসি মেজাজ রয়েছে, কবিতায়ও প্রাধান্য পেয়েছে কথকতা। এরই মধ্যে ভেসে উঠে  একটি ভাবনাবিহবল, স্বাপ্নিক চৈতন্যের মুখ। প্রকৃতি ও জীবনভাবনায় যার অঙ্গীকার। স্মৃতিকাতরতা ও নষ্টালজিয়া সেখানে উচ্চকিত :

নিসর্গের সবুজ শ্যামলিমায়/ মাইজগাঁও থেকে সারকারখানা/ সমান্তরালে ছুটে চলে গাড়ি ও ট্রেন/ ফেঞ্চুগঞ্জ কলেজ মোড়ে আইসক্রিম/ লেহন করে তৃষনার্ত যুবতি/ দ্যুতিময় হাতে কৌণ আইসক্রিম/ স্পন্দিত নদীর মতো ঝরায় বসন্ত/ গলতে থাকে রৌদ্র জ্যোৎস্নায়। 

সাঈদ চৌধুরী বিশ্বাসে সমর্পিত, ঈমানে উদ্দীপ্ত তার উচ্চারণ। তার কবিতায় আমরা শুনি   জীবনমুখিতার মধ্যেও ভাববাদী উচ্চারণ এবং বস্তসর্বস্ব দুনিয়ার করুণ চিত্র :

১.  নিরবে সন্ধ্যা ছড়িয়ে পড়ে/ দিগন্তের ঐ ধূসর আলোয়/ ঝলমলে গোধুলী বেলায়।/ সান্ধ্যরাতের কফির কাপে/ হারিয়ে যাওয়া মুখগুলি সব/ ভেসে ওঠে আলো-ছায়ায়।/ অবাক করা এক গুঞ্জনধ্বনি/ চুলগুলো সব পাতলা হচ্ছে/ কে যেন আজ জানতে চায়।

২. অনুভূতিশূন্য আবেশ ছিল মনুষ্য হৃদয়ে/ মুক্তকেশে ঝড়ের মেঘের কোলে/ এখন বিপর্যয়ের বাতাস বইছে/ দুর্ভাবনায় ভুগছে মহাবিশ্ব/ প্রযুক্তির অর্থহীন দৃশ্যে/ খোলা চোখে ঘুমাচ্ছে/ ডুবে যাওয়া মুখ।

৩. দিন চলেছে আশায় আশায়/ রাত জাগে নির্ঘুম দুর্ভাবনায়/ এই প্রীতি অবেলার অভিলাষ/ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ সময় করছ বিনাশ।/ অতিক্রান্ত জীবন ক্লান্ত অধীর/ তুমি কি তবে অন্ধ এবং বধির?/ বৈশাখী মেঘেরা ঘিরেছে আকাশ/ হচ্ছে কেবল হৃদপিন্ডের সর্বনাশ। 

সাঈদ চৌধুরীর একটি কবিতার নাম অপার্থিব, অলীক-অসার। এতে তিনি  লিখেছেন, নীলাভ আকাশ জুড়ে জালালী কেইতর উড়ে/ রোদেলা বিকেলে ঝিলমিল সোনালি আভায়/ ভালোবাসা পেয়েছি আমি বিত্ত নয় চিত্তে/ দিনের  সূর্যালোকে আর রাতের পূর্ণিমায়।  

এই পঙক্তিমালায় সাঈদ চৌধুরী সম্ভবত নিজেকে সবচেয়ে সুন্দরভাবে প্রকাশ করে দিয়েছেন। তার জীবনবোধের  আকাশটা প্রসারিত এবং নীল। সেখানে বিশ্বাস ও ঐতিহ্য তৈরী করে সোনালি আভা। যার মধ্যে ডানা মেলেছে জালালি কইতর!  

লেখক: কবি, গবেষক প্রাবন্ধিক

আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার পেলেন আহমদ রফিক ও মাসরুর আরেফিন



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক এবং কথাসাহিত্যিক মাসরুর আরেফিন

ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক এবং কথাসাহিত্যিক মাসরুর আরেফিন

  • Font increase
  • Font Decrease

আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার পেলেন দুই প্রজন্মের দুই কথাসাহিত্যিক।

আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার-২০১৯ পেয়েছেন ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক এবং কথাসাহিত্যিক মাসরুর আরেফিন। ‘ভাষা আন্দোলন: টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া’ প্রবন্ধের জন্য আহমদ রফিককে এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ‘আগস্ট আবছায়া’ উপন্যাসের জন্য মাসরুর আরেফিনের নামের পাশে যোগ হয়েছে পুরস্কারটি।

করোনা মহামারির কারণে এবার অনলাইনের মাধ্যমে নির্বাচিত দুই প্রজন্মের দুই কথাসাহিত্যিককে সম্মাননা জানানো হয়। গত ১৫ জানুয়ারি এই আয়োজনে প্রধান অতিথি ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার। এছাড়া ছিলেন আইএফআইসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী শাহ এ সারওয়ার।

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে সমসাময়িক লেখকদের স্বীকৃতি দিতে আইএফআইসি ব্যাংক ২০১১ সালে চালু করে ‘আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার’। প্রতিবছর পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত করা হয় সেরা দুটি বই। নির্বাচিত প্রত্যেক লেখককে পাঁচ লাখ টাকা, ক্রেস্ট ও সম্মাননাপত্র পেয়ে থাকেন।

;

ওমিক্রণে থমকে গেছে বইমেলার আয়োজন



সজিব তুষার, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

এবারও থমকে গেছে লেখক পাঠকের প্রাণের আসর অমর একুশে বইমেলা প্রাঙ্গণ। তুমুল উৎসাহ আর ব্যাপক উদ্দীপনা নিয়ে কাজ শুরু হলেও কোভিড- ১৯ এর ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট আতঙ্ক থামিয়ে দিয়েছে কাজ। একটা বড় অংশের কাঠামো তৈরি হয়ে গেলেও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাঙ্গণে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরে আছে গর্ত আর স্তূপ স্তূপ বাঁশ।

বরাবরের মত এ বছরেও ১ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়ার কথা অমর একুশে বইমেলা-২০২২। সে অনুযায়ী, কাজ শুরু করে দিয়েছিলো আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি। প্রায় শেষ হয়ে এসেছিলো প্রকাশনী গুলোর রেজিস্ট্রেশন ও লটারি পূর্ববর্তী কার্যক্রম। কাজ চলার মাঝেই বাঁধ সাধে বৈশ্বিক মহামারী কোভিড-১৯ নতুন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রন।

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

গত ১৬ জানুয়ারি সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ গণমাধ্যমকে জানান, 'করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতির কারণে আপাতত দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিত করা হয়েছে বইমেলা। মেলার পূর্ণ প্রস্তুতি রয়েছে বাংলা একাডেমির। সংক্রমণ পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকেই শুরু করা যেতো বইমেলা'। 

সরকারের এই ঘোষণার পর থমকে গেছে পুরো উদ্যমে শুরু হওয়া মেলার স্টল তৈরির কাজ। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গিয়ে দেখা যায়, স্টল তৈরির জন্য মাঠে কাঠামোর বেশ খানিকটা তৈরি হয়ে আছে। জায়গায় জায়গায় পুঁতে রাখা রয়েছে বাঁশ। কিন্তু কাজ করতে দেখা যায়নি কোনও শ্রমিককে।

এবারের বই মেলায় প্রথম বই প্রকাশ হবে এমন এক তরুণ লেখক বায়েজিদ হোসেন বলেন, 'ফেব্রুয়ারিতে বইমেলা আমাদের রক্তে গেঁথে গেছে। বৈশ্বিক মহামারী করোনার তোপে পণ্ড হয় গতবারের মেলাও। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো রাস্তায় বসে যাবে। এমন চলতে থাকলে খুব দ্রুতই অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হবেন তারা। এখন পর্যন্ত যেটুকু টিকে আছে সেটা নষ্ট করে ফেললে; শিল্প সংস্কৃতির আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না'।

যথোপযুক্ত স্বাস্থ্যবিধি মেনে বইমেলা সঠিক সময়ে শুরু করার পক্ষে কথা বলেন তিনি।

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গ্রন্থিক'র প্রকাশক রাজ্জাক রুবেল বলেন, 'গতবারের মেলার অভিজ্ঞতার পর এবছর আর রিস্ক নেব বলে মনে হচ্ছে না। সম্ভব হলে জমা দেওয়া টাকাটা ফেরত আনার ব্যবস্থা করবো'।

স্টলের রেজিস্ট্রেশন ও অন্যান্য বাবদ খরচের কথা উল্লেখ করে বলেন, 'দুটা স্টলের জন্য জমা দিতে হয়েছে আগের থেকেও বেশি। ডেকোরেশন খরচ। স্টলের লোকের খরচ। তাদের এমন সিদ্ধান্তে আমি কোনভাবেই লস আটকাতে পারবো না'।

এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমিতে গেলে কেউ কিছু বলতে পারেন নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মচারী জানান, "মহাপরিচালক- প্রকাশক ও সংশ্লিষ্টদের সাথে মিটিং করে সিদ্ধান্ত জানানো পর্যন্ত কেউ কিছু বলতে পারবো না"।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে থেকে তোলা বইমেলার প্রস্তুতিকালীন কাজের একাংশের ছবি। ছবি- বার্তা২৪.কম

 

এর আগে বইমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ও বাংলা একাডেমির পরিচালক জালাল আহমেদ গণমাধ্যমকে জানান, স্বাস্থ্যবিধি মেনে পহেলা ফেব্রুয়ারি থেকেই নেওয়া হচ্ছে বইমেলা শুরুর প্রস্তুতি। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গত বছরও মহামারী করোনাভাইরাসের কারণে দেড় মাস পিছিয়ে ১৮ মার্চ থেকে শুরু হয় অমর একুশে বইমেলা। আবার নির্ধারিত সময়ের দুদিন আগে ১২ এপ্রিলই টানে ইতি। সম্প্রতি করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় বিধিনিষেধ আরোপ করেছে সরকার। তবে দু'সপ্তাহ পিছিয়ে দিলে আদতে বই মেলা হবে কি না এ নিয়ে সন্দিহান অনেকেই। বইমেলা মানেই হাজার মানুষের ভিড়। লেখক পাঠকের সমারোহ। তবে একের পর এক মেলায় ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকলে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গুলো মেলা করবে কি না তা নিয়েও শঙ্কায় আছেন সচেতন মহল।

স্বাস্থ্যবিধি মেনেই মেলা হোক চান বড় একটা অংশের নেটিজানরা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে বেশ আলোচনাও তুলছেন তারা।


উল্লেখ্য, মুক্তধারা প্রকাশনীর মালিক চিত্তরঞ্জন সাহা বাংলা একাডেমির গেইটে ১৯৭২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষা দিবসের অনুষ্ঠানে চট বিছিয়ে শুরু করেন বই বিক্রি। ১৯৭৭ সালে তার সঙ্গে যোগ দেন আরও অনেকে। ১৯৭৮ সালে এ বইমেলার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয় বাংলা একাডেমিকে। তখন মহাপরিচালক ছিলেন আশরাফ সিদ্দিকী। পরের বছরই বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি যুক্ত হয় মেলার সঙ্গে।

মনজুরে মওলা বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্বে থাকার সময় ১৯৮৩ সালে 'অমর একুশে গ্রন্থমেলা' নামে এ মেলা আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হলেও তা আর করা যায়নি। পরের বছর বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গণে আসর বসে 'অমর একুশে বইমেলা'র। ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি জুড়ে কাগজের বইয়ের মুহুর্মুহু গন্ধ মাখা বইমেলাই যেন দর্শনার্থীদের মনে করিয়ে দেয় ভাষা সংগ্রামের কথা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঢাকার জ্যাম ঠেলেও ফেব্রুয়ারিতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাণের গন্তব্য হয়ে দাঁড়ায় ভাষা ও বইপ্রেমী মানুষের কাছে। সবাই চায় বইমেলা ফিরে পাক তার আগের জৌলুশ। বইয়ের সাথে ভবিষ্যত প্রজন্মের এই মিল বন্ধনের পুণ্যভূমি বেঁচে থাকুক সব অশুভ ছায়া থেকে।

;

অন্বেষণ মানে তো খোঁজ, এই খোঁজ হল আত্ম-অন্বেষণ...



সুবর্ণা মোর্শেদা, চিত্রশিল্পী
সুবর্ণা মোর্শেদা

সুবর্ণা মোর্শেদা

  • Font increase
  • Font Decrease

নিজেকে খোঁজার যে তাগিদ, আমার মধ্যে সেটা সবসময়ই কাজ করে। এই তাগিদ থেকেই আমার কাজের শুরু বলা যেতে পারে। সবসময় মনে হয়, নিজেকে খোঁজার চেয়ে কঠিন কিছু নাই। গত দুই বছরে সেই খোঁজার তাগিদ আরো তীব্র হয়ে উঠেছে। এই সময়ে অন্যদের সঙ্গে যখন কথা বলেছি, তার মাঝেও নিজেকেই খোঁজার চেষ্টা চলতো। লকডাউনের বেশ আগে থেকেই নিজেকে অনেক বেশি আইসোলেশনে নিয়ে যাই আমি—একটা নিরঙ্কুশ একাকীত্বের মধ্যে চলে আত্ম-অনুসন্ধানের কাজ। সো, লকডাউন আমার জন্য খুব নতুন কিছু ছিলো না। শুধু বাবা-মায়ের সঙ্গে নতুন করে থাকাটা ছিলো একেবারে নতুন।


২০১৯-এর একটা সময় আমি খুব অন্ধকারে ডুবে যাই। স্বভাবগত দিক থেকে রঙিন মানুষ হয়েও একটা গভীর ব্যক্তিগত কারণে আমার জীবন হয়ে পড়ে সম্পূর্ণ সাদা-কালো। আর এ সময়টাতেই নিভৃতে অনেকগুলো কাজ করে ফেলি। কখনো লিথোগ্রাফ, কখনো পেন্সিল স্কেচ আর কাগজে সেলাই করে করা এ-কাজগুলোই আমাকে সেই গভীর অন্ধকারেও বেঁচে থাকার প্রেরণা যুগিয়েছে। কাগজে সেলাই করে শিল্পকর্ম নির্মাণের একটা আলাদা আনন্দ আছে। সেটা হলো স্পর্শের আনন্দ।


এই স্পর্শকে কেমন করে দেখাবো! সেলাইয়ের উঁচু-নিচু অংশগুলোকে আমি বলি স্পর্শের প্রতীক। এর মধ্য দিয়ে স্পর্শের অনুভূতিকে অন্যের মনে সঞ্চার করা যায়। বড় হওয়ার পর, জীবনে এই প্রথম আমি মায়ের সাথে বাবার সাথে এতো দীর্ঘ সময় আমি কাটানোর অবকাশ পেয়েছি। আমার মায়ের গাছ লাগানোর শখ অনেক আগে থেকেই। সেই শখ লকডাউনে আরো তীব্র হলো।

তাঁর লাগানো গাছগুলো যতো বড় হচ্ছিলো, আর তাঁর বয়স যেন ততোই কমছিলো। গাছে ফল ধরা, ফুল ধরা দেখে তাঁর কী যে এক আনন্দ! সব মিলে যেন এক অপার্থিব অনুভূতি! তো, আমি তাঁকে একজন সফল চাষী হিসেবে ঘোষণা করলাম। দীর্ঘদিন ধরে আমি গন্ধ, স্পর্শ নিয়ে কাজ করি। এবার মায়ের গন্ধের সঙ্গে যোগ হলো মায়ের বাগানের গন্ধ-স্পর্শ।


গাছগুলোর পাতা যখন ঝরে পড়ে, সে-পাতার রং, শেইপকে আমার কাজের সঙ্গে সংযুক্ত করা আর স্পর্শগুলোকে ধরার জন্যই আমার কাগজে সেলাই করার কাজ। আমার ঘুমের সমস্যা আছে। রাতে ঘুম হয় না বা হতো না সেই অন্ধকার সময়গুলোতে। ঘুম না হওয়ার কারণে যে সকালে খারাপ লাগতো তা-ও না। সকালের গন্ধ আমার খুব প্রিয়।


এরমধ্যেই হলো মায়ের করোনা। দীর্ঘ ১ মাস ধরে মায়ের সিরিয়াস কন্ডিশন । আমি বুঝতে পারতাম, গাছগুলোও মাকে খুব মিস করছে। এদিকে মা তো হসপিটালে অক্সিজেন নিতে ব্যস্ত! ২৪ ঘন্টাই মায়ের সঙ্গে থাকি। তাঁর অক্সিজেন স্যাচুরেশন কমে যাওয়া-- কখনও ভালো, কখনও মন্দ। অবশেষে মায়ের জয়ী হয়ে ঘরে ফেরা। তাঁর সঙ্গে আবার তাঁর গাছেদের সেই নিবিড় সম্পর্ক--গভীর বন্ধুত্ব!

পুরো সময়টাই যেন কবিতার মত, প্রেমের কবিতা! আমার সাদা-কালো ক্যানভাসে ছড়িয়ে দেওয়া রঙের মত! অন্ধকারে অপরূপ আলোর মত। আমার ছবিগুলো যেন জীবনের মত! আমার জীবন যেন আমার ছবির মতো!

সকলকে আমন্ত্রণ!


চিত্রকর্ম প্রদর্শনী: ‘অন্বেষণ’
শিল্পী: সুবর্ণা মোর্শেদা (তৃতীয় একক প্রদর্শনী)
স্থান: ইএমকে সেন্টার
প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন: অধ্যাপক জামাল আহমেদ, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, তাওহিদা শিরোপা।
মাধ্যম: লিথোগ্রাফ, সায়ানোটাইপ, পেন্সিল স্কেচ, জলরংসহ বিভিন্ন মাধ্যম
সংখ্যা: মোট ৪২টি শিল্পকর্ম
চলবে: ১৫-৩০ জানুয়ারি
শো কিউরেটর: রেজাউর রহমান

;

কল্পনা ও ইতিহাসের ট্রাজিক নায়িকা আনারকলি



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

আনারকলির নাম উচ্চারিত হলে উত্তর-পশ্চিম ভারতের আবহে এক করুণ-মায়াবী প্রেমকাহিনী সবার মনে নাড়া দেয়। ইতিহাস ও কল্পকথায় আবর্তিত এই রহস্যময়ী নতর্কীর পাশাপাশি শাহজাদা সেলিম তথা সম্রাট জাহাঙ্গীর, সম্রাট আকবর, সম্রাজ্ঞী যোধা বাঈ চোখের সামনে উপস্থিত হন। ভেসে আসে পরামক্রশালী মুঘল আমলের অভিজাত রাজদরবার ও হেরেম। ব্রিটিশ ঔপনিবেশ-পূর্ব উপমহাদেশের ঐতিহ্য, সমৃদ্ধি, সাংস্কৃতিক দ্যুতি, বহুত্ববাদী পরিচিতির রাজকীয় অতীত এসে শিহরিত করে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের দেশগুলোর নাগরিকদের। 

১৫২৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ১৮৫৭ সালে অস্তমিত ৩৩১ বছরের বিশ্ববিশ্রুত মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাসে বহু সম্রাট, শাহজাদা, শাহজাদীর নাম বীরত্বে ও বেদনায় লিপিবদ্ধ রয়েছে। কিন্তু আনারকলির নাম বিশ্বস্ত ঐতিহাসিক বিবরণের কোথাও লেখা নেই, যদিও মুঘল হেরেমের এই রহস্যময়ী নারীর নাম আজ পর্যন্ত শিল্প-সাহিত্য-চলচ্চিত্র ও লোকশ্রুতিতে প্রবাহিত হচ্ছে। সম্রাজ্ঞী, শাহজাদী কিংবা কোনও পদাধিকারী না হয়েও মুঘল সংস্কৃতির পরতে পরতে মিশে থাকা কে এই নারী, আনারকলি, যিনি শত শত বছর ধরে মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হচ্ছেন, এমন জিজ্ঞাসা অনেকেরই। ইতিহাসে না থাকলেও শিল্প, সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে চিত্রিত হচ্ছেন তিনি অকল্পনীয় জনপ্রিয়তায়। ইতিহাস ও মিথের মিশেলে তাকে নিয়ে আখ্যান ও কল্পকথার কমতি নেই। তার নামে প্রতিষ্ঠিতি হয়েছে মাজার, সমাধি স্মৃতিসৌধ, প্রাচীন বাজার, মহিলাদের পোষাকের নান্দনিক ডিজাইন। ইতিহাসের রহস্যঘেরা এই নারীকে নিয়ে নির্মিত হয়েছে ইতিহাস সৃষ্টিকারী চলচ্চিত্র ‘মুঘল-ই-আজম’। রচিত হয়েছে অসংখ্য গ্রন্থ ও গবেষণা।

যদিও বাংলা ভাষায় আনারকলিকে নিয়ে আদৌ কোনও গ্রন্থ রচিত হয়নি, তথাপি উর্দু সাহিত্যে তাকে নিয়ে রয়েছে একাধিক নাটক ও উপন্যাস। ইংরেজিতে রয়েছে বহু গ্রন্থ। বিশেষত উর্দু ভাষার বলয় বলতে উত্তর ও পশ্চিম ভারতের যে বিশাল এলাকা পূর্বের বিহার থেকে পশ্চিমে পাঞ্জাব পর্যন্ত প্রসারিত, সেখানে আনারকলি একটি অতি পরিচিত ও চর্চিত নাম। সাহিত্যে ও লোকশ্রুতিতে তিনি এখনও জীবন্ত। অবিভক্ত পাঞ্জাবের রাজধানী লাহোরে রয়েছে আনারকলি মাকবারা। মাকবারা হলো কবরগাহ, সমাধিসৌধ। মুঘল স্মৃতিধন্য শহর দিল্লি, লাহোরে আছে আনারকলি বাজার। সাহিত্য ও লোককথার মতোই আনারকলিকে নিয়ে নির্মিত নানা লিখিত ও অলিখিত উপাখ্যান। 

অথচ মুঘল রাজদরবার স্বীকৃত ইতিহাস বিষয়ক গ্রন্থগুলোর কোথাও উল্লেখিত হন নি আনারকলি। প্রায়-প্রত্যেক মুঘল রাজপুরুষ লিখিত আকারে অনেক স্মৃতি ও ঐতিহাসিক বিবরণ লিপিবদ্ধ রাখলেও তার নাম আসে নি কোনও মুঘলের আত্মস্মৃতি বা ইতিহাস গ্রন্থে। তাহলে কেবলমাত্র একটি কাল্পনিক চরিত্র হিসেবে তার নাম অর্ধ-সহস্র বছর ধরে লোকমুখে প্রচারিত হলো কেন এবং কেমন করে? সত্যিই আনারকলি বলে কেউ না থাকতেন কেমন করে সম্ভব হলো পাঁচ শতাধিক বছর ধরে নামটি টিকে থাকা? এসব খুবই বিস্ময়কর বিষয় এবং আশ্চর্যজনক ঐতিহাসিক প্রশ্ন।

ভারতবর্ষে মুঘল ইতিহাসের এক রহস্যময় নারী চরিত্র রূপে আনারকলিকে নিয়ে আগে বহু চর্চা হলেও সবচেয়ে সফল ও ব্যাপকভাবে তিনি চিত্রিত হয়েছেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের কেন্দ্রস্থল বলিউডের ইতিহাস সৃষ্টিকারী সেরা জনপ্রিয় ও ব্যবসা সফল ছবি ‘মুঘল-ই-আজম’-এ। ছবির কাহিনী মুঘল-ই-আজম তথা শাহানশাহ জালালউদ্দিন মোহাম্মদ আকবরের দরবারে আবর্তিত। আকবরপুত্র শাহজাদা সেলিম, যিনি পরবর্তীতে হবেন সম্রাট জাহাঙ্গীর, মুঘল দরবারের এক নবাগত নর্তকী আনারকলির প্রেমে বিভোর। দীর্ঘ ছবিটি সেলিম-আনারকলির প্রণয়ের রোমান্টিকতায় ভরপুর। কিন্তু সম্রাট আকবর সেই ভালোবাসা মেনে নিতে নারাজ। প্রচণ্ড ক্রোধে আকবর আনারকলিকে শাহজাদার জীবন থেকে সরিয়ে দিয়েই ক্ষান্ত হন নি, সম্রাটপুত্রকে ভালোবাসার অপরাধে তুচ্ছ নর্তকী আনারকলিকে জীবন্ত কবরস্থ করেন। 

প্রশ্ন হলো, সত্যিই যদি আনারকলি নামে কোনও চরিত্র না-ই থাকবে, তাহলে এতো কাহিনীর উৎপত্তি হলো কেমন করে? সাহিত্যে ও চলচ্চিত্রে আনারকলিকে কেন্দ্র করে যা বলা হয়েছে বা দেখানো হয়েছে, তার সত্যতা কতটুকু? সত্যিই কি আনারকলিকে জীবন্ত কবর দেওয়া হয়েছিল? নাকি আনারকলি বলে ইতিহাসে কোনও চরিত্রই ছিল না? নাকি সব কিছুই লোকমুখে ছড়িয়ে পড়া কোনও মিথ, উপকথা বা গল্প? এসব প্রশ্নের উত্তর শত শত বছরেও মেলে নি।

আনারকলি যদি ‘কাল্পনিক’ হবেন, তাহলে, মুঘল আমলে ভারতে আগত ইংরেজ পরিব্রাজকের বর্ণনায়, লখনৌর লেখকের উপন্যাসে, লাহোরের নাট্যকারের নাটকে, বলিউডের একাধিক সিনেমায় আনারকলি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হবেন কেন? কেন শত শত বছর কোটি কোটি মানুষ আনারকলির নাম ও করুণ ঘটনায় অশ্রুসিক্ত হচ্ছেন? কেন আনারকলির নামে ভারতের প্রাচীন শহরগুলোতে থাকবে ঐতিহাসিক বাজার? লাহোরে পাওয়া যাবে তার কবরগাহ, যেখানে শেষ বয়সে শাহজাদা সেলিম তথা সম্রাট জাহাঙ্গীর হাজির হয়ে নির্মাণ করবেন সমাধিসৌধ আর রচনা করবেন করুণ প্রেমের কবিতা?

এসব প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানের জন্যে ‘কিছুটা ঐতিহাসিক, কিছুটা কাল্পনিক চরিত্র আনারকলি’ ও তাকে ঘিরে প্রবহমান প্রাসঙ্গিক ঘটনাবলীর ঐতিহাসিক পর্যালোচনা ভিত্তিক এই রচনা। আমার রচিত ‘দারাশিকোহ: মুঘল ইতিহাসের ট্র্যাজিক হিরো’ (প্রকাশক: স্টুডেন্ট ওয়েজ) গ্রন্থটি পাঠকপ্রিয়তা লাভ করায় মুঘল মূল-ইতিহাসের বাইরের এই রহস্যময়ী চরিত্র ও আখ্যানকে বাংলাভাষী পাঠকের সামনে উপস্থাপনে উৎসাহী হয়েছি। উর্দু ও ইংরেজিতে আনারকলির ঘটনাবলী ও প্রাসঙ্গিক ইতিহাস নিয়ে বহু লেখালেখি হয়েছে। যেগুলো থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছি। আনারকলির প্রসঙ্গে তাকে নিয়ে নির্মিত অবিস্মরণীয় চলচ্চিত্র ‘মুঘল-ই-আজম’ সম্পর্কেও আলোকপাত করেছি। চেষ্টা করেছি ইতিহাস ও মিথের মধ্যে লুকিয়ে থাকা মুঘল হেরেমের রহস্যময়ী নতর্কী ও বিয়োগান্ত প্রেমের নায়িকা আনারকলিকে অনুসন্ধানের।

;