স্মৃতিমেঘে কিশোরগঞ্জের শাহ আজিজুল হক



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
অ্যাডভোকেট শাহ আজিজুল হক

অ্যাডভোকেট শাহ আজিজুল হক

  • Font increase
  • Font Decrease

পটভূমি

ঘটনাক্রমে ২০২২ সালের ১৬ থেকে ২০ মে আমাকে ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালে জরুরি কাজে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অবস্থান করতে হয়। সে সময় অসুস্থ অ্যাডভোকেট শাহ আজিজুল হককে সাবেক পিজি হাসপাতাল ও বর্তমান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। কিছুদিন আগেই তাঁকে দেখে এসে মুক্তিযোদ্ধা-রাজনীতিবিদ অ্যাডভোকেট ভূপেন্দ্র ভৌমিক দোলন তাঁর চিকিৎসা সংক্রান্ত খোঁজ-খবর জানান। আমরা আশায় ছিলাম যে, তিনি সুস্থ হয়ে সবার মাঝে ফিরে আসবেন। ইউনাইটেড হাসপাতালে তিনি এসেছেন জেনে আমি দ্বিতলে ছুটে যাই। কিন্তু তিনি তখন আইসিও’র ঘেরাটোপে আবদ্ধ এবং সাক্ষাৎ দেওয়ার অবস্থায় ছিলেন না। কর্তব্যরত চিকিৎসকদের সঙ্গে আলাপ করেও আশার বাণী শুনতে পাই নি। গভীর বেদনা নিয়ে আমি ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে ফিরে আসি।

১০ মে তাঁর জন্মদিন ছিল। অল্পদিনের মধ্যেই তাঁর মৃত্যুদিনও উপস্থিত হয়। ২৬ মে (২০২২) দুপুর দেড়টার দিকে কিশোরগঞ্জ নিউজের প্রধান সম্পাদক আশরাফুল ইসলাম ফোনে তাঁর মৃত্যু সংবাদ জানান। আমি বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ নিয়ে নিশ্চিত হই যে, ঘণ্টাখানেক আগে তিনি পরলোকে যাত্রা করেছেন। সঙ্গে সঙ্গে স্বজন হারানোর ব্যথায় আক্রান্ত হই। কমপক্ষে চল্লিশ বছরের সম্পর্কসূত্রে খন্ড খন্ড স্মৃতিমেঘ আমাকে আচ্ছন্ন করে। মেহনতি মানুষের মুক্তির স্বপ্ন দেখা অনন্য মানুষটি শ্রমিক আন্দোলনের মহান মে মাসেই নিজের জন্ম ও মৃত্যুদিনের চিহ্ন অঙ্কন করে চিরদিনের মতো চলে গেলেন।

শৈশবে আশি দশকের শুরুতে একমাথা চুলের বিপ্লবী শাহ আজিজুল হককে দেখেছি কিশোরগঞ্জ শহরের গৌরাঙ্গ বাজারে আমাদের বাসার পাশে কমিউনিস্ট পার্টি, ছাত্র ইউনিয়ন অফিসে। একটি ইয়ামাহা মোটর সাইকেলে তিনি তখন পুরো কিশোরগঞ্জ চষে গণআন্দোলন সংগঠিত করতেন। আমরা চা খেতে খেতে সেসব গল্প শুনেছি। তাঁর কাব্য গ্রন্থ প্রকাশের সঙ্গে জড়িত থেকেছি। আরও পরে তিনি খড়মপট্টিতে ঢেরা তৈরি করেন। সেখানেও আড্ডায় মেতেছি। তারপর স্থায়ীভাবে আবাসন তৈরি করলে সেখানে বিকাল, সন্ধ্যা, রাত অবধি আড্ডা, আলাপে অতিবাহিত করেছি। ততদিনে আমি কর্মসূত্রে কিশোরগঞ্জের বাইরে অবস্থানকালে যখনই জন্মশহরে এসেছি, আবশ্যিকভাবে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছে। কখনও আলাপে আলাপে রাতও কাটিয়েছি তাঁর বাসায়। বিকালে হাঁটতে গিয়েছি পাট গবেষণরার খোলা প্রাঙ্গণে। কখনও সারাদিনের জন্য তাঁর সঙ্গে চলে গিয়েছি তাঁদের গ্রামের বাড়িতে, তাঁর কোনও আত্মীয়ের বাড়িতে কিংবা কোনও সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে।

আর্থ, সামাজিক, রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক বহুবিধ বিষয়ে তাঁর সঙ্গে আলাপে যে আনন্দ ও অনুভূতি অর্জিত হয়েছে, তা মফস্বল শহরে বিরল। সৃষ্টিশীল কাজে ও মননশীলতায় তাঁর অনুপ্রেরণা ছিল সবসময়। কিশোরগঞ্জের শিল্প, সাহিত্য, ইতিহাস বিষয়ক ‘মাজহারুন-নূর ফাউন্ডেশন’ আয়োজিত সম্মাননা বক্তৃতা এবং অন্যান্য সকল অনুষ্ঠান ও আয়োজনে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন। কিশোরগঞ্জের মেধাঋদ্ধ রাজনীতি, গতিশীল সামাজিক তৎপরতা, বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক উদ্যোগের সঙ্গে তিনি ছিলেন প্রাণপুরুষের মতো। সমকালীন কিশোরগঞ্জের প্রতিনিধিত্বশীল উজ্জ্বল মুখচ্ছবি তিনি। একটি শহরকে নান্দনিক আঙিকে যেসব ব্যক্তিত্ব প্রতিনিধিত্ব করেন, তিনি তাঁদের অন্যতম। তাঁর শূন্যতা সহজে পূর্ণ হবে না। কিশোরগঞ্জের আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ইতিহাসে তিনি উল্লেখযোগ্য চরিত্র রূপে বর্তমান ও অনাগতকালে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

১.
২০১৫ সালে কিশোরগঞ্জের সমাজ, সংস্কৃতি, সাহিত্য বিষয়ক সমীক্ষাধর্মী মাজহারুন-নূর ফাউন্ডেশন সম্মাননা বক্তৃতা’র প্রবর্তন ও সূচনার ধারাবাহিকতায় ‘কিশোরগঞ্জের আইন পেশার নান্দনিক বিন্যাস: নাসিরউদ্দিন ফারুকী, ভূপেন্দ্র ভৌমিক দোলন, শাহ আজিজুল হক’ শীর্ষক ৬ষ্ঠ মাজহারুন-নূর ফাউন্ডেশন সম্মাননা বক্তৃতা ২০২০ প্রদান করা হয়। অতীতের মতোই কিশোরগঞ্জের সমাজ-সংস্কৃতি-নাগরিক কর্মকান্ডের নানা ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের ও অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ ‘মাজহারুন-নূর ফাউন্ডেশন’ সর্বসম্মতভাবে উদ্যমী, নিবেদিতপ্রাণ, বুদ্ধিদীপ্ত আইনজ্ঞদের সংবর্ধিত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

কিশোরগঞ্জের সমাজ-সংস্কৃতি-সাহিত্য-শিক্ষা বিষয়ক সমীক্ষাধর্মী ‘মাজহারুন-নূর ফাউন্ডেশন সম্মাননা বক্তৃতা’ ২০১৫ সালে শুরু হয়ে বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাসের সুতীব্র প্রকোপের মধ্যেও অব্যাহত ধারায় চলমান থাকা নিঃসন্দেহে উৎসাহজনক ঘটনা। তবে করোনাকালে আমরা ১ম ‘মাজহারুন-নূর ফাউন্ডেশন সম্মাননা ২০১৫’ প্রাপ্ত প্রফেসর প্রাণেশকুমার চৌধুরী এবং ৬ষ্ঠ ‘মাজহারুন-নূর ফাউন্ডেশন সম্মাননা ২০২০’ প্রাপ্ত অ্যাডভোকেট শাহ আজিজুল হককে হারিয়েছি, তাঁরা ছিলেন সমকালীন কিশোরগঞ্জের বুদ্ধিবৃত্তিক তৎপরতার উজ্জ্বল মুখচ্ছবি।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ১ম মাজহারুন-নূর ফাউন্ডেশন সম্মাননা ২০১৫ প্রাপ্ত ‘আলোর পথের যাত্রী শিক্ষাবিদ-সাহিত্যিক প্রাণেশকুমার চৌধুরী গত ২৯ এপ্রিল ২০২১ তারিখে পরলোকগমন করেন। আমরা তার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি এবং তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। করোনাকালে তাঁর মৃত্যুতে আনুষ্ঠানিক ও সম্মিলিতভাবে শোক প্রকাশের সুযোগ সীমিত ছিল। ফলে ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে শোকবাণী প্রদান এবং আমার নিজের একটি নাতিদীর্ঘ শ্রদ্ধামূলক নিবন্ধের মাধ্যমে আমরা তার জীবন ও কীর্তিকে স্মরণ করেছি, যা প্রকাশিত হয়। ৬ষ্ঠ ‘মাজহারুন-নূর ফাউন্ডেশন সম্মাননা ২০২০’ প্রাপ্ত ‘কিশোরগঞ্জের আইন পেশার নান্দনিক বিন্যাস’-এর বিশিষ্টজন অ্যাডভোকেট শাহ আজিজুল হককে আমরা হারিয়েছি ২৬ মে ২০২২ সালে। তাঁর মৃত্যুতে তাৎক্ষণিকভাবে ফাউন্ডেশন শোক ও শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে এবং তাঁর জীবন র্কীতিকে বৃহত্তর পরিসরে আলোচনার্থে পুস্তিকাকারে প্রকাশ ও প্রচার ব্যবস্থারও পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।

৬ষ্ঠ মাজহারুন-নূর ফাউন্ডেশন সম্মাননা ২০২০ উপলক্ষ্যে আয়োজিত ‘কিশোরগঞ্জের আইন পেশার নান্দনিক বিন্যাস’ শীর্ষক বক্তৃতা প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায় যে, কিশোরগঞ্জের আইন পেশার ঐতিহ্য শতাধিক বছরের প্রাচীন এবং তা ঐতিহাসিক গৌরবে ভূষিত। দক্ষিণ এশিয়া উপমহাদেশের আইন পেশায় একে ব্রোহি, রামজেট মালানি, পালকিওয়ালা, স্নেহাংশু আচার্য্য, ইশতিয়াক আহমেদ এবং রফিক-উল হকের মতো কীর্তিমানদের দেখা পাওয়া গেছে। কিশোরগঞ্জের আইন পেশাতেও অনেকেই ছিলেন বা আছেন, মফস্বলে অবস্থানের কারণে যাদের মেধা, মনন, দক্ষতার উপযুক্ত মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি প্রাপ্ত হয় নি। অথচ তাঁরা পেশার উজ্জ্বলতার পাশাপাশি সমাজের বৃহত্তর অঙ্গনে শিক্ষা, সংস্কৃতি, স্বাস্থ্যসেবা, সাহিত্য, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা ও রাজনীতিতে বহুমাত্রিক অবদান রেখে স্থানীয় সমাজ প্রগতিকে বেগবান করছেন। আমার লিখিত সম্মাননা বক্তৃতায় কিশোরগঞ্জের আইন পেশার নান্দনিক বিন্যাস ও অর্জনের ইতিহাসটুক তুলে আনার চেষ্টা করা হয় তিনজন সমকালীন-অনন্য ব্যক্তিত্ব নাসিরউদ্দিন ফারুকী, ভূপেন্দ্র ভৌমিক দোলন, শাহ আজিজুল হককে সামনে রেখে।

২.
সাম্প্রতিক ইতিহাসের নিরিখে বলা যায়, বিগত ষাট, সত্তর, আশি দশকের কিশোরগঞ্জ যখন মহকুমা ছিল, তখন সামাজিক-সাংস্কৃতিক অঙ্গন মুখরিত করার মতো পেশাজীবী-বুদ্ধিজীবীর সংখ্যা ছিল অত্যল্প। মূলত এবং একমাত্র স্থানীয় গুরুদয়াল কলেজের শিক্ষকবৃন্দ ছিলেন যাবতীয় কর্মকাণ্ডের মূল। কারণ, তখন মহকুমায় ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন দুই-তিন জন মাত্র। যাদের মধ্যে ছিলেন এসডিও (মহকুমা প্রশাসক বা সাবডিভিশনার অফিসার), এসডিপিও (মহকুমা পুলিশ প্রশাসক), সিও (সার্কেল অফিসার) এবং এক-দুই জন ম্যাজিস্ট্রেট। ফলে প্রশাসনিক দিক থেকে আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক কাজের দায়িত্ব পালনের মতো প্রচুর সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন না তখনকার কিশোরগঞ্জে, যা এখন রয়েছে।

অন্যান্য পেশাজীবী, যেমন চিকিৎসকের সংখ্যাও ছিল কম। প্রথম এমবিবিএস ডিগ্রি নিয়ে ভাষাসৈনিক ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ডা. এ. এ. মাজহারুল হক পঞ্চাশের দশকে কিশোরগঞ্জে প্রাইভেট প্র্যাকটিস শুরু করেন এবং তিনি ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণের প্রেরণায় বাঙালির রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক অধিকার আদায়ের সংগ্রামে যুক্ত হয়ে মহকুমা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠায় অংশ নেন এবং দলের কোষাধ্যক্ষের দায়িত্ব ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন। তখন মহকুমা ও আশেপাশের অঞ্চলের অন্যতম প্রধান উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গুরুদয়াল কলেজ ও এর শিক্ষকম-লীকেই সকল সামাজিক-সাংস্কৃকি কাজের সামনের কাতারে দেখা গেছে। অতএব, কিশোরগঞ্জের বাস্তবতা ছিল এই যে, মহকুমার সামগ্রিক তৎপরতায় সেসময় বেশ কয়েকজন আইনজীবী অংশ নেন এবং সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষা, খেলাধুলার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সাম্প্রতিক অতীত ও নিজস্ব অভিজ্ঞতার নিরিখে বলা যায় যে, নিজের পেশার বাইরে সমাজের অন্যান্য ক্ষেত্রে উজ্জ্বল ভূমিকা পালনকারী অগ্রণী আইনজীবীদের মধ্যে ছিলেন হেমেন্দ্রচন্দ্র রায়, আবদুস সাত্তার (এমএনএ ও আওয়ামী লীগের সহাপতি), আবদুর রশীদ (পৌরসভার চেয়ারম্যান), মুস্তাফিজুর রহমান খান চুন্নু মিয়া, (এমএনএন ও আওয়ামী লীগ নেতা), আবদুল আলী মেনু মিয়া, মোহাম্মদ সাইদুর রহমান, নূরুজ্জামান চাঁন মিয়া (পৌরসভার চেয়ারম্যান ও সাংসদ), মোহাম্মদ আবদুল হামিদ (মহামান্য রাষ্ট্রপতি) সমরেশ চন্দ্র রায়, লতিফুর রহমান খান মরু প্রমুখ।

বলা বাহুল্য, শতবর্ষের অধিক প্রাচীনত্বের অধিকারী কিশোরগঞ্জ আইনজীবী সমিতি দেশের রাষ্ট্রপতিসহ আইন পেশা ও সামাজিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ বহুজনকে উপহার দিয়েছে। ছাত্রজীবনে সাংবাদিকতাকালে আশি দশকে আইনজীবী সমিতির শতবর্ষ উৎসবের অনুষ্ঠানমালায় অংশ গ্রহণের স্মৃতি থেকে সেসব কথা জানার সুযোগ আমার হয়েছে। উৎসবকালে সমিতির সম্পাদক ছিলেন লতিফুর রহমান খান মরু ভাই, যিনি অগ্রণী ছাত্রনেতা ও সামাজিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন। সমিতির একটি মূল্যবান স্মরণিকায়ও বহু তথ্য রয়েছে।

৩.
কিশোরগঞ্জের স্থানীয় সুধীজন ও বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন আইনজীবীগণ। যার বাস্তব প্রমাণ শৈশবে আমরা লক্ষ্য করেছি। শহর তখন এতোটা বড় হয় নি এবং শহরের বিশিষ্ট নাগরিক বলতে কয়েকজন আইনজীবীর নাম আমাদের কানে আসতো। তাঁদের অনেকে সে সময়েই প্রয়াত হলেও তাঁদের নাম লোকমুখে প্রচারিত হতো এবং শহরের বিভিন্ন স্থানের নিদের্শনা দিতে তাঁদের বাড়িকে ল্যা-মার্ক ধরা হতো। যেমন, এমাদ মিয়া মোক্তার, শাবান আলী মোক্তার, বোরহান মোক্তার, মেনু মিয়া মোক্তার ছিলেন অন্যতম। পরবর্তীতে মোক্তারশিপ আর ছিল না এবং সকলেই অ্যাডভোকেট নামে পরিচিত হন। যাদের নাম শৈশবে শুনেছি, তাঁদের অনেকেই লোকান্তরিত হলেও মৃত্যুর ২০/৩০ বছর পরেও চর্চিত হতেন। আমার নিজের শৈশবেও আইনজীবীদের সামাজিক মর্যাদা ও প্রতাপ স্বচক্ষে চাক্ষুষ করেছি। আমার পিতা ডা. এএ মাজহারুল হক আওয়ামী লীগের নেতা ও সর্বজনমান্য চিকিৎসক হিসেবে এদের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত ছিলেন। স্বাধীনতার পূর্বকালে ও পরবর্তীতে পিতার গৌরাঙ্গ বাজারের চেম্বার আওয়ামী লীগের অলিখিত কার্যালয় রূপে পরিগণিত ছিল। সেখানে প্রতিদিন সন্ধ্যায় অ্যাডভোকেট আবদুস সাত্তার, মোস্তাফিজুর রহমান চুন্নু মিয়া, বোরহান উদ্দিন আহমেদ, শহর আওয়ামী লীগের নেতা আবদুল ওয়াদুদ খোন্দকার সমবেত হয়ে গভীর রাত পর্যন্ত আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করতেন। কিশোরগঞ্জ এলে বর্ষীয়ান জাতীয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম আমার পিতার চেম্বারে আসতেন এবং ফোনে ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ করতেন। চিকিৎসক হিসাবে তখন আমার পিতার টিএনটি ফোন ছিল। আর কোনও নাগরিক বা আওয়ামী লীগ নেতার ফোন সংযোগ পাকিস্তান আমলে ছিল না। শহরে মোট ফোনই ছিল মাত্র কয়েকটি। ফলে আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় অফিসে এই ফোন নম্বরটি পরিচিত ছিল। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাবার্তা এই ফোনে আমার পিতার কাছে আসে ও তিনি সেটা কিশোরগঞ্জে প্রচারের ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেন।

৪.
বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ইতিহাসের একটি অন্যতম সামাজিক উপাদান হিসাবে এইসব ব্যক্তিবর্গের ভূমিকা ও অবদান বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ এবং কিশোরগঞ্জের স্থানীয় ইতিহাসের একটি তাৎপর্যপূর্ণ কালপর্বের উজ্জ্বল অংশ। দুঃখজনক বিষয় হলো, স্থানীয় ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রে এইসব সামাজিক ঘটনা ও ব্যক্তিত্বকে নথিভুক্ত করার যোগ্যতা কেউ দেখাতে পারেন নি। অধিকাংশই পূর্বে প্রকাশিত প্রাচীন আমলের সেকেন্ডারি তথ্যকে পুনরায় উপস্থাপনের নকলনবিশি করেছেন। সামাজিক গতিশীলতার প্রপঞ্চগুলোকে লিপিবদ্ধ করতে না পারায় কিশোরগঞ্জের সামাজিক বিকাশ ও আধুনিক বিনির্মাণের ধারা সম্পর্কিত প্রত্যক্ষ-ফলিত তথ্যাবলীর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক লোকচক্ষুর অন্তরালে রয়ে গেছে।

কয়েকটি দৃষ্টান্ত দিলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে। যেমন, অ্যাডভোকেট আবদুস সাত্তার ছিলেন পাকিস্তান ও বাংলাদেশ আমলে আওয়ামী লীগের দীর্ঘকালীন সভাপতি, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ও শিক্ষানুরাগী। গুরুদয়াল কলেজ ছাড়া যখন পুরো অঞ্চলে কোনও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল না, তখন কিশোরগঞ্জ মহিলা কলেজের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা-উদ্যোক্তা এই আইনজীবী-রাজনীতিবিদ কলেজ পরিচালনা পরিষদের সভাকালেই প্রাণ ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যু বেদনাদায়ক হলেও কিশোরগঞ্জের ইতিহাসে জনহিতমূলক কাজে আত্মনিবেদনের উজ্জ্বল ও বিশিষ্ট দৃষ্টান্ত স্বরূপ।

হেমেন্দ্রচন্দ্র রায় ছয় দশকের বেশি সময়কাল কিশোরগঞ্জে আইন পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। একাদিক্রমে তিনি সমিতির বহুবারের সভাপতি ছাড়াও বহু নবীন আইনজীবীর সিনিয়র রূপে ভূমিকা পালন করেন। তারাপাশা-নিউটাউন নিবাসী আবদুর রশীদ স্বাধীন-পূর্ব ও পরবর্তীকালে কিশোরগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। আইনজীবী সমিতির অন্যতম নেতা ছিলেন তিনি। তদুপরি আইন পেশায় আগমনের পূর্বে তিনি শিক্ষকতার মাধ্যমে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।

বোরহান উদ্দিন ছিলেন কিশোরগঞ্জের নগরায়নের অন্যতম ব্যক্তিত্ব। ষাট ও সত্তর দশকে অনেকগুলো পাকা বাড়ি নির্মাণ করে তিনি আধুনিক আবাসিক সুবিধা বিস্তারে ব্রতী হন। তখনকার কিশোরগঞ্জ শহরে সর্বজনাব বোরহান মোক্তার, মেনু হাজি, হাজি মলু মিয়া প্রমুখের একাধিক মানসম্পন্ন বাসা-বাড়ি ছিল ভাড়া দেওয়া জন্য। নূরুজ্জামান চাঁন মিয়া পৌরসভার চেয়ারম্যান ও সংসদ সদস্য হলেও স্থানীয় ক্রীড়াঙ্গনের বিকাশে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। নিঃসন্তান সমরেশ রায় পরহিত ও দানশীলতার অন্যন্য নজির রেখেছেন, যা কিশোরগঞ্জ ডায়াবেটিক সমিতিতে প্রদত্ত অনুদান ও ইটনায় প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়ের মধ্যে প্রতিভাত। হয়ত এই তালিকায় আরো অনেকের নাম আসতে পারে, হয়ত অনেকের অনেক কৃতিত্ব সেভাবে প্রকাশও পায় নি।

৫.
বস্তুতপক্ষে নিজের পেশাগত সাফল্যের বাইরে সমাজের প্রতিনিধিত্বশীল অবস্থানে থেকে নানামুখী উন্নয়নে ভূমিকা পালন করার যোগ্যতা একজন মানুষের বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্বের প্রকাশ ও কর্ম-কৃতিত্বের স্মারক। আইনজীবী সমাজের বিশ্লেষণে সমকালের নিরিখে তিনজন আইনজীবীকে সম্মাননা জ্ঞাপন করার কারণ এই যে, তাঁরা তাঁদের জীবনব্যাপী কাজের মাধ্যমে তাঁদের স্ব স্ব পেশাক্ষেত্রকে আলোকিত করার পাশাপাশি সমাজ প্রগতি, সাংস্কৃতিক গতিশীলতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নয়নের সারথি হয়েছেন। কিশোরগঞ্জের আইন পেশার নান্দনিক বিন্যাস পরিলক্ষিত হয়েছে তাঁদের মধ্যে, যা ব্যক্তিগত পরিধি ছাড়িয়ে সামাজিক কাঠামোতে বিস্তৃত হয়ে ইতিহাসের অংশে পরিণত হয়েছে এবং এদের মধ্যে শতবর্ষ প্রাচীন আইনজীবী সমাজের ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার বহনের কৃতিত্ব দেখা গেছে।

ঐতিহাসিক পর্যালোচনার নিরিখে বলা যায়, কিশোরগঞ্জের আইন পেশার বহুমাত্রিক, বর্ণময় কাঠামোটি আকস্মিক কোনো ঘটনা নয়। বরং সহস্র বর্ষের প্রাচীন জনপদ কিশোরগঞ্জের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক ঐতিহ্য এবং শতাব্দী প্রাচীন আইনজীবী সমাজের উত্তরাধিকারের সমৃদ্ধ ধারাবাহিকতার ফলশ্রুতি, যার ভিত্তিতে বিনির্মিত হয়েছে সমকালের নান্দনিক পাটাতন। এই ঐতিহাসিক গৌরবের কথাগুলো বিবেচনায় রেখেই আমরা সাম্প্রতিক সময়ের আইন পেশা ও এ পেশার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিগণের জীবন ও কর্মের পর্যালোচনা করতে পারি। তদুপরি, সাম্প্রতিক কিশোরগঞ্জের আইন পেশার নান্দনিক বিন্যাস সৃজিত হয়েছে যে তিনজন কীর্তিমানের মাধ্যমে, আমাদের সামাজিক ইতিহাসের গতিশীলতার প্রয়োজনেই তা শনাক্ত করা অপরিহার্য্য। একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে তাঁদের প্রসঙ্গে আলোচনা ও বিশ্লেষণকালে আমাদের মনে রাখতে হবে যে, সামাজিক ইতিহাস ও স্মৃতি প্রায়শই ঝাপসা ও অস্পষ্ট অবয়বে উপস্থাপিত হয়। কোনও কোনও ব্যক্তি, বিশেষ কিছু মানুষ ও ঘটনার কথা স্মৃতিচারণে উল্লেখ করতে পারলেও সুগ্রন্থিত ইতিহাস বা লিপিবদ্ধ তথ্য আকারে সেসব পাওয়ার আশা করা যায় না। এতে প্রবহমান ইতিহাসে বিভিন্ন ব্যক্তি ও ঘটনার তাৎপর্য ক্রমে ক্রমে চলে যায় বিস্মৃতির অন্তরালে, যা দুর্ভাগ্যজনক এবং ইতিহাসের বহুমাত্রিকতাকে ক্ষুন্নকারী। এহেন ধারা চলতে থাকলে আমাদের জীবনের চারপাশে পুঞ্জিভূত মানুষ, তাঁদের কৃতিত্ব এবং তাদেরকে কেন্দ্র করে সঞ্চারিত বহুমাত্রিক ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোও হারিয়ে যাবে।

লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, স্থানীয় ইতিহাস চর্চাকারীরা সামাজিক প্রপঞ্চগুলো সংগ্রহ করার বদলে প্রাচীন বা প্রকাশিত তথ্য-উপাত্ত নাড়াচাড়া করার নকলনবিশ চরিত্র ও কেরানি মানসিকতা থেকে বের হতে না পারায় পরিস্থিতির উন্নতি হয় নি। এমনকি, অসৎ-মতলববাজদের হাতে ইতিহাসের কোনো কোনো ইস্যু বিকৃতি প্রাপ্ত হয়। কারণ, ইতিহাস সঠিক ও বস্তুনিষ্ঠভাবে চিহ্নিত ও লিখিত না হলে সমাজ প্রগতির সত্যনিষ্ঠ অবয়বটি আমাদের সামনে অস্পষ্ট হতে বাধ্য। তখন নানা উপকথা ও আরোপিত বিষয় ইতিহাসের নামে জঞ্জাল তৈরি করে, যা বাস্তবতা ও সততার সম্পূর্ণ বিপরীতি। একটি জনপদ যে বহু মানুষের কীর্তি ও কর্মের আলোকমালায় দ্যুতিময় হয়, সেই বাস্তবতাটিও তখন অস্পষ্ট হয়ে সামাজিক কৃতিত্বের গৌরবসমূহ চাপা পড়ে যায়। এতে ঐতিহ্য বিনির্মাণের ধারায় ছেদ ঘটে ও ইতিহাস দিকভ্রান্ত হয়। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম অতীতের দিকে তাকিয়ে দিশা পায় না। ফলে আজকের ইতিবৃত্ত শুধু যে ইতিহাসের অংশ, তা-ই নয়, বরং ইতিহাসের পরম্পরার সূত্রে অনাগত ভবিষ্যতকালের পথের দিশাও বটে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণেও এ বিষয়টি আমি আলোচনায় আনা জরুরি মনে করেছি এবং ২০১৫ সাল থেকে কিশোরগঞ্জের সমাজ, সংস্কৃতি ও ইতিহাস বিষয়ক সম্মাননা বক্তৃতার ধারাবাহিক চর্চার একটি বিষয় জরুরি বলে প্রতীয়মান হয়েছে যে, সমকালীন কিশোরগঞ্জ শহরের অগ্রণী প্রজন্মের অনেকেই জাগতিক জীবন শেষ করে চির বিদায়ের পথে চলে যাচ্ছেন। অথচ এদের জীবদ্দশায় তাঁদের সমকালীন ইতিহাস লিপিবদ্ধ ও মূল্যায়ন করা এবং তাঁদের কাছ থেকে অভিজ্ঞতাবাদী তথ্য-উপাত্ত জ্ঞাত হওয়া স্থানীয় ইতিহাসচর্চার অমূল্য উপকরণের শামিল। তাঁদের অভিজ্ঞতা ও স্মৃতি উত্তর-প্রজন্মের জন্য লিপিবদ্ধ বা বক্তব্য আকারে রেখে গেলে সাধারণভাবে আইন পেশার পরম্পরায়, বিশেষভাবে কিশোরগঞ্জের নাগরিক সমাজ ও সামাজিক ইতিহাসচর্চায় পরিপূর্ণ কাঠামো প্রভুতভাবে সমৃদ্ধ ও উপকৃত হবে। এসব বাস্তবতাকে সামনে রেখে অনাগত ভবিষ্যতের নতুন প্রজন্মের সামনে কিশোরগঞ্জের ইতিহাসের ধারাবাহিকতা সংরক্ষিত রাখার কথা বিবেচনা করে ৬ষ্ঠ মাজহারুন-নূর সম্মাননা ২০২২ জ্ঞাপন করা হয় সর্বজনাব নাসিরউদ্দিন ফারুকী, ভূপেন্দ্র ভৌমিক দোলন, শাহ আজিজুল হককে।

৬.
মাজহারুন-নূর সম্মাননাপ্রাপ্ত তিন সিনিয়র আইনজীবীর মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই ব্যক্তিসত্ত্বায় কিছু কিছু পার্থক্য থাকলেও ঐতিহ্যিক পরম্পরায় গুণগত ও কৃতিত্বপূর্ণ জায়গাগুলো বেশি দৃষ্টিগ্রাহ্য। তিনজনই মোটের উপর তিনটি পরস্পর-সংযুক্ত প্রজন্মের প্রতিনিধি। একজনের বিকাশ ষাট দশকের শেষে। আরেক জনের সত্তর দশকে এবং অন্যজন আশির দশকে। তিনজনই বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, স্বাধীনতার সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ, উদারনৈতিক ধর্মনিরপেক্ষতা, অসাম্প্রদায়িকতা ও সমাজ প্রগতিপন্থী। আবার আশ্চর্যজনকভাবে, তিনজনের প্রত্যেকেই স্বনির্মিত ব্যক্তিত্ব, ইংরেজিতে যাকে ‘সেলফ মেড’ বলা হয়। জীবনে তাঁদের রাজনৈতিক, সামাজিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, পেশাগত ইত্যাদি যাবতীয় অর্জন বা প্রাপ্তি, পরিবার বা বংশের বরাতে কিংবা পৃষ্ঠপোষকের দানে প্রাপ্ত নয়, সম্পূর্ণভাবে নিজস্ব চর্চা, অধ্যাবসায় ও পরিশ্রমের মাধ্যমে লব্ধ। মধ্যযুগীয় সামন্ততান্ত্রিক কাঠামোতে পরিবার, বংশ ও পরম্পরার অচলায়তন ভেঙে রেনেসাঁসের মানুষ যেভাবে বিকশিত হয়েছিলেন আলোকায়িত ইউরোপে কিংবা ঊনিশ শতকের বঙ্গদেশে, আলোচ্য তিনজনের আত্মপ্রতিষ্ঠা তেমনি শ্রমসাধ্য ও মেধাবী অর্জনের পথে আত্মজাগরণের বার্তাবহ।

আরও উল্লেখযোগ্য বিষয় এই যে, বাংলার জাগরণ যেমনভাবে আঞ্চলিকতা (কলকাতাকেন্দ্রীক) বা ধর্মীয় ভাবধারায় প্রভাবিত ছিল, কিশোরগঞ্জের ক্ষেত্রে তেমনটি দেখা যায় নি। ‘রাজা স্বদেশে পূজিত হন, বিদ্বান পূজিত হন সর্বত্র’. চাণক্যের নামে প্রচলিত এই লোককথার তাৎপর্য আর কেউ না বুঝলেও বাঙালিরা অন্তত মর্মে মর্মে বোঝেন। বাংলার বাইরে, সমগ্র উপমহাদেশে, বাঙালিরা ঔপনিবেশিক আমল থেকেই ‘বাবু’ ও ‘বিদ্বান’ বলে পরিচিত ছিলেন। তবে বিনয় ঘোষের ভাষায়, ‘এক্ষেত্রে প্রথম ও প্রধান ট্র্যাজিডি হলো, বাংলার এই নতুন বিদ্বৎসমাজ প্রায়-সম্পূর্ণ ‘মুসলমানবর্জিত’ রূপ ধারণ করলো এবং সেইজন্য একে সাধারণভাবে ‘বাঙালি বিদ্বৎসমাজ’ না বলে, বিশেষ অর্থে ‘বাঙালি হিন্দু বিদ্বৎসমাজ’ বলাই যুক্তিসঙ্গত।’ কিন্তু ১৯৪৭ সালের সাম্প্রদায়িক বিভাজনে দেশভাগের ক্ষত মুছে স্বাধীনতাকামী পূর্ব বাংলা এবং পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশস্থ কিশোরগঞ্জের পটভূমিতে এই তিনজনের উত্থান সম্পূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ, আঞ্চলিকতামুক্ত ও পেশাগত নৈপূণ্যের মাধ্যমে স্বোপার্জিত আবহে সাধিত, যা একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক অগ্রগতির চিহ্নবাহী এবং কিশোরগঞ্জের অপরূপ সামাজিক গতিশীলতার নিদর্শন স্বরূপ প্রতিভাত হয়েছে, যাদের মধ্যে অ্যাডভোকেট শাহ আজিজুল হক জাগতিক জীবনের সীমানা পেরিয়ে আমাদের কাছ থেকে চলে গেছেন এবং রেখে গেছেন কর্ম ও কীর্তির অম্লান স্মৃতি।

৭.
কিশোরগঞ্জের শহরতলীর একটি ঐতিহ্যবাহী কৃষিভিত্তিক পারিবারিক কাঠামোর মধ্যে থেকে তীব্র গতিতে বেরিয়ে এসে শাহ আজিজুল হক তাবৎ পৃথিবীকে একটি আনন্দ ও সংগ্রামময় পাঠশালার মতো পঠন ও পাঠনের ক্ষেত্রে পরিণত করেন। জীবনকে বাস্তবের রসায়নে জারিত করে তিনি অর্জন করেন ফলিত অভিজ্ঞান। পথ চলেছেন তিনি আবেগ ও যুক্তির সন্ধিক্ষণ পেরিয়ে। জীবনের রূঢ়-কঠিন রণাঙ্গণ আর প্রকৃতির লীলায়িত ক্ষেত্র তাঁকে দিয়েছে চারিত্রিক দৃঢ়তা ও মানবিকতার দীক্ষা। ‘অতএব কারণে’ তার জীবনের অভিমুখ হয়েছে বহুমাত্রিক ও অসীমান্তিক। তিনি নিবিড়ভাবে মাটি. মানুষ ও আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক ঘটনাক্রমের ধারাবাহিকতার সঙ্গে অংশগ্রহণকারী রূপে মিশেছেন। জড়িয়েছেন লোকজ সংস্কৃতি, চিরায়ত সাহিত্য, সমাজ বীক্ষণ ও শ্রেণিভিত্তিক চৈতন্য জাগরণী রাজনীতিতে। ‘শিল্পের জন্য শিল্প নয়, মানুষের জন্য শিল্প’ ভিত্তিক আন্তর্জাতিক মর্মকথায় তিনি অবস্থান করেছেন শ্বাশত বাংলার অন্তরাত্মায়। গজদন্ত মিনারকে তুচ্ছ করে এবং গতানুগতিক-প্রাতিষ্ঠানিক সিলেবাসকে উপেক্ষা করে তিনি আলিঙ্গন করেছেন বিশ্বসাহিত্য ও স্বদেশের সুমৃত্তিকাকে এবং এরই ভিত্তিতে রাজনীতি, কাব্য ও সাংস্কৃতিক চর্চা করেছেন, সাংবাদিকতায় নিয়োজিত হয়েছেন। এবং পরিশেষে রাজনীতি ও আইন পেশায় নিজেকে স্থিত করলেও অন্যান্য কর্মকা- থেকে তিনি হাত গুটিয়ে নেন নি। আধুনিক বিশেষায়িত যুগে একটি পেশায় সর্বোচ্চ দক্ষতা অর্জনই যখন কঠিনতম, তখন তাঁকে দেখা যায় অনেকগুলো পেশায় সচল ও সফল। সাম্প্রতিক সময়ে এমন বহুমুখী কৃতিত্বশীল মানুষ বিরল। অন্তত কিশোরগঞ্জের ইতিহাসে দ্বিতীয় আরেকজন নেই, যিনি একাধারে রাজনীতি, আইনপেশা, সাংবাদিকতা, কাব্যচর্চা, সাহিত্য সাধনা, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ইত্যাদি যাবতীয় নন্দনকলায় সমান সরব ও সফল। প্রাচীন, ধ্রপদী, গ্রিক বিদ্যাচর্চার সংলাপ-নির্ভর জ্ঞানতাত্ত্বিক পদ্ধতির ট্র্যাডিশনাল পথের সঙ্গে আধুনিক জীবনবোধের মিলিত পথে তিনি ছিলেন আজীবনের যাত্রী।

অ্যাডভোকেট শাহ আজিজুল হক ছয় বার কিশোরগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি হওয়া অনন্য ব্যক্তিত্ব। তাঁর কৃতিত্ব শতবর্ষাধিক প্রাচীন কিশোরগঞ্জ আইনজীবী সমিতির ক্ষেত্রেই বিরল রেকর্ড নয়, বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বিশেষ উল্লেখযোগ্য একটি দৃষ্টান্তমূলক ঘটনা। বিশেষত মফঃস্বলের মতো ক্ষুদ্র গ-িতে রেষারেষি ও পারস্পরিক দ্বন্দ্ব-সংঘাতের মধ্যে এবং যেখানে সুযোগের চেয়ে প্রার্থী অধিক, সেখানে সকলের মধ্যে বছরের পর বছর আস্থা, সমর্থন ও সম্মতিতে বার বার বিপুল ভোটে জয়লাভ করা অসামান্য বিষয়। কিন্তু আইনজীবী সমাজের রাজনীতিতে প্রবাদপ্রতীক সাফল্য তাঁর বহুমাত্রিক সফলতার মাত্র একটি দিক। তিনি একাধারে রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, সুবক্তা ও সুলেখক। একজন প্রযুক্তি-নির্ভর অগ্রসর-আধুনিক মননের অধিকারী মানুষ তিনি। শ্রমজীবী মানুষের রাজনীতি দিয়ে শুরু করে তিনি জীবনের সকল পর্যায়ে অচিন্তনীয় সাংগঠনিক নেতৃত্বের পরিচয় দিয়েছেন। শুরুতে ক্ষেতমজুর ও কমিউনিস্ট আন্দোলনের স্বার্থে তাঁকে চারণের মতো গ্রাম-গঞ্জে-জনপদে ঘুরে বেড়াতে দেখেছি। বৈশ্বিক রাজনৈতিক পালাবদলের প্রেক্ষিতে তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে জেলার অন্যতম শীর্ষ নেতৃত্বে পরিণত হয়েছেন। যখন যেখানে থেকেছেন, সেখানেই সর্বোচ্চ অবদান রেখে শীর্ষতম স্থানে নিজেকে উত্তীর্ণ করার অসাধারণ যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছেন তিনি। মূলত একজন রাজনীতিবিদ ও আইনজীবী হলেও তাঁর জীবন ও কর্মের পরতে পরতে জড়িয়ে আছে সাহিত্য সাধনা ও সাংস্কৃতিক অনন্যতার নানামুখী প্রচেষ্টা। মনোদার্শনিক উচ্চতায় তিনি জীবন ও কর্মকে একটি সুস্নিগ্ধ আবহে পরিচালিত করেছেন সর্বদা। প্রকাশ করেছেন কাব্যগ্রন্থ, যা কিশোরগঞ্জের ইতিহাসে কম রাজনীতিবিদ বা আইনজীবীর পক্ষে সম্ভব হয়েছে।

নব্বই দশকের শেষ দিকে আমি যখন গবেষণার ছুটিতে ঢাকায় অবস্থানকালে আশি দশক থেকে আমার অতীত সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতার কারণে কিংবদন্তী সম্পাদক তোয়াব খানের আমন্ত্রণে দৈনিক জনকণ্ঠ-এ বিভাগীয় সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছি, তখন তিনি জনকণ্ঠে কিশোরগঞ্জের প্রতিনিধি হয়ে কাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি অনেকগুলো টিভি ও মিডিয়ার সঙ্গেও জড়িত হন। সাংবাদিকতায় তাঁর সাহসী ও আপোসহীন মনোভাব এবং বেশ কিছু আলোচিত রিপোর্টিং দেখে প্রায়শই আমি আশি দশকের শুরুর দিকে কিশোরগঞ্জে আমার সাংবাদিকতার পুরনো দিনগুলোর স্মৃতিতে ফিরে গিয়েছি।

গণমানুষের প্রতি নিবেদিত একটি বুদ্ধিবৃত্তিক তৃষ্ণা ও দার্শনিক প্রেরণা তাঁকে পেশার বাইরেও আর্থ, সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে টেনে নিয়েছে সব সময়। সর্বত্রই তিনি সত্য, সুন্দর ও মানুষের জয়গানে মুখরিত হয়েছেন। একজন কুসংস্কারমুক্ত, উদারনৈতিক, ধর্মনিরপেক্ষক, গণতান্ত্রিক মতাদর্শের দীক্ষায় তিনি চেয়েছেন মানুষের সাংস্কৃতিক মানের এবং রাজনৈতিক তৎপরতার বিষয়গুলোকে পরিশুদ্ধ ও ঋদ্ধ করতে। নিজের সুললিত বচনের সুপ্রযুক্ত বাক্যাবলী দিয়ে কিশোরগঞ্জের মানুষকে সন্মোহিত করার যে দুর্লভ যোগ্যতা তিনি প্রদর্শন করেছেন, তা কিশোরগঞ্জের সমকালীন ইতিহাসে অভূতপূর্ব। এমন মোহনীয় ও অদৃষ্টপূর্ব যোগ্যতা কারো কারো মধ্যে বহু বহু বছর পর পরিদৃষ্ট হয়। নিজের সামগ্রিক কৃতিত্ব ও যোগ্যতাকে তিনি মোটেও ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে রূপান্তরিত করেন নি। পরবর্তী প্রজন্ম ও অনুসারীদের মধ্যে প্রবহমান করতে নিরত ও সচেষ্ট রয়েছেন। তিনি পরিণত হয়েছে বৃহত্তর আওয়ামী লীগ পরিবারের সর্বস্তরের নেতা ও কর্মীদের সর্বক্ষণের অপ্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। সুখে-দুখে-বিপদে-আপদে সকলের পাশে ছুটে যাওয়ার একটি বিশ্বস্ত নাম হয়ে বিরাজ করেছেন তিনি কিশোরগঞ্জের মানুষের কাছে। জীবনের কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে নারীনেত্রী, শিল্প উদ্যোক্তা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব স্ত্রী এবং দুই কন্যাকে নিয়ে অ্যাডভোকেট শাহ আজিজুল হক কিশোরগঞ্জে শিল্পিত ভুবনের বাসিন্দা থেকে এখন আরেক অদেখা জগতের অধিবাসী। তাঁর অনুপস্থিতি ও অবর্তমানেও চলনে, বচনে ও যাপনে তাঁর বিশিষ্টতা সদা-দৃশ্যমান। কর্ম ও কীর্তির পরিস্ফূট বিন্যাসে তিনি জীবনের বাঁকে বাঁকে যে অভিজ্ঞতা ও অর্জন সঞ্চয় করেছেন ও মানুষের মধ্যে বিলিয়ে দিয়েছেন, তা এক জীবনের মহার্ঘ্য সম্পদ, যা তাঁকে বিত্ত, বৈভবের পাশাপাশি সুগভীর বোধের সমুদ্র-সমান বিশালতায় অভিষিক্ত করেছে।

অ্যাডভোকেট শাহ আজিজুল হকের সাফল্যের পেছনে শ্রম, অধ্যবসায়, নিষ্ঠা ও ত্যাগের সূচক যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে বুদ্ধি, মেধা, দক্ষতা ও কুশলার ছাপ। সঙ্কুল জীবনপথের নানা সঙ্কট ও সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে সাফল্যের মোহনার সন্ধান পাওয়া এ কারণেই তাঁদের পক্ষে সম্ভব হয়েছিল। তদুপরি এরা সকলেই ওমনিলিজেন্ট। কারণ, তাঁর যাবতীয় অর্জন জ্ঞাননির্ভরতাকে আশ্রয় করেই সম্পন্ন হয়। যে জন্য, কিশোরগঞ্জের বিবেচনায় অনেক সম্ভাবনাময় ও অপেক্ষাকৃত অধিকতর সুবিধাজনক অবস্থানে থাকা ব্যক্তিকে অতিক্রম করে পেশাগত যোগ্যতায়, বুদ্ধিবৃত্তিক স্বকীয়তায় এবং সামাজিক গুরুত্বের দিক থেকে তিনি অগ্রগামী হতে পেরেছিলেন। তাঁর যাবতীয় অর্জনই পরিপূর্ণভাবেই ‘একক’, ‘স্বোপার্জিত’। বলার অপেক্ষা রাখে না, যে ধরণের সামাজিক কাঠামো ও ক্ষমতার বিন্যাসকে তিনি পেরিয়ে এসেছিলেন, তা ক্রমশ পরিবর্তমান। বিশ্ব পরিস্থিতির পালাবদলের মতোই দেশজ অঙ্গনে জ্ঞান, শিক্ষা, মেধার প্রভাব ক্রম-হ্রাসমান। অর্থ, বিত্ত, শক্তি ও যোগাযোগ নির্ধারণ করছে চলমান সামাজিক স্তরবিন্যাসগত ক্ষমতার কাঠামোর বাস্তবতাকে। ফলে তাঁর মতো উজ্জ্বল ও অগ্রণী চরিত্র ধীরে ধীরে ‘ধ্রুপদ শৈলী’ বা ‘ক্লাসিক্যাল স্টাইল’-এর পুরনো প্রজন্মের স্থান দখল করছে। অথচ তিনি ও তাঁদের প্রজন্মের সাধনক্ষেত্র ছিল বহু-বিস্তৃত। কর্তৃত্ব জাহির করার মানসিকতা আদৌ তাঁদের ছিল না। অর্পিত কাজকেই জীবনব্রতে পরিণত করে তাঁরা যাপিত-জীবনকে উপভোগ ও সমৃদ্ধ করেছেন। কিশোরগঞ্জের সুমার্জিত নাগরিক সমাজের প্রতীক স্বরূপ তাঁরা নিঃসন্দেহে শেষ প্রতিনিধি বা ‘লাস্ট মুঘল’-এর মতো আভিজাত্য ও সুকুমার বৃত্তিতে আলোকময়।

তবে, যতই পরিবর্তনের পালাবদল হানা দিক, অতীত ও ঐতিহ্যের সংরক্ষণের স্বার্থে অ্যাডভোকেট শাহ আজিজের মতো নমস্য ব্যক্তিবর্গের সংগ্রাম, সাধনা, অর্জন ও জীবনাদর্শ নানাভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে বিরাজমান থাকবে। কর্মফলের চেয়ে কর্মে আগ্রহ বেশি, তাঁর মতো এমন মানুষ আজ খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। অথচ তিনি কি পাবেন তার চিন্তা না করেই কাজের মাধ্যমে অভীষ্ট লক্ষ্যের শীর্ষে পৌঁছেছিলেন। কাজের গভীরে প্রবেশের মাধ্যমে নিজের অবস্থান ও মর্যাদাকে স্বাভাবিকভাবে হাতের মুঠোয় পেয়েছিলেন তিনি। তিনি নিঃসন্দেহে অগ্রণী, অনুকরণযোগ্য এবং নিবেদিতপ্রাণ। বহুবিস্তৃত কর্মের জগতের বাসিন্দা হয়েও তিনি আত্মমগ্ন সাধকের জীবন যাপন করেছিলেন নিজের আলোকিত জগতে। এবং সমাজে, প্রতিষ্ঠানে, বহু ব্যক্তির জীবনে তীব্র-আনন্দধ্বনিতে নান্দনিক প্রতিধ্বনি তুলেছিলেন। মৃত্যুর পরও তাঁর অপরিহার্য্য উপস্থিতি কিশোরগঞ্জের মানুষ ও সুমৃত্তিকায় মেধাদীপ্ত, মননঋদ্ধ, সৃজনশোভিত একজন অনন্য ব্যক্তিত্বের সুতীব্র শূন্যতায় ও অপরিসীম বেদনায় সঞ্চারিত হচ্ছে। কাল-কালান্তরে এবং প্রজন্ম ও পরম্পরায় তিনি প্রেরণাদায়ী আবহে সতত প্রবহমান থাকবেন কিশোরগঞ্জের ইতিহাসধারার বহুমাত্রিক স্রোতধারায়।

ড. মাহফুজ পারভেজ, প্রফেসর, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; নির্বাহী পরিচালক, মাজহারুন-নূর ফাউন্ডেশন; অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম।

হাসান হাফিজের একগুচ্ছ কবিতা



হাসান হাফিজ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ম্যানিলা ও নস্টালজিয়া

ও ম্যানিলা
তুমি আছো স্মৃতিপটে,
ওগো প্রিয় ম্যানিলাসুন্দরী
তৃষিতের ওষ্ঠ তুমি ভিজিয়েছো
স্যান মিগ্যুয়েল নামে বীয়ারে মাদকে
‘পিনোটুবুু’ অগ্নিগিরি
খুব কিন্তু দূরে নয়
দ্বীপ দেশ ফিলিপিন্স
ঔপনিবেশক স্মৃতি কী দুঃসহ
একটানা চারশো বছর
দীর্ঘ দীর্ঘকাল পরে
মুক্তিস্বাদ পেয়েছো যে তুমি
সেই কটু অম্লস্বাদ
স্মৃতি হয়ে বুকে বেঁধে
‘মুক্তি’ দ্যায় উপশম
সুতন্বী উচ্ছল হও মনোরমা
দ্বীপকন্যা সুছন্দা ম্যানিলা।

অসহ দংশন

না-বৃষ্টি না-রোদ
এমন ধূসর দিনে
কেন ছুঁতে চেয়েছে সে
তোমার পেলব হাত
শৈল্পিক আঙুল
চুম্বনের অধিকার
ওরা কিন্তু দ্যায় নি যুবাকে
সন্ধ্যার আঁধারবেলা
সেই স্মৃতি অনশ্বর
জ্বলজ্বলে নক্ষত্রস্পর্ধায়
অমলিন চিরক্ষণ জলরঙ ছবি হয়ে
জেগে থাকে ঠোকরায়
না-পাওয়ার অসীম তৃষ্ণায়...

একগুঁয়ে মাঝি

মন পোড়ে?
বৃষ্টি ওড়ে?
মনের তো ডানা নাই,
কীভাবে বৈদেশ যাবে
বন্ধুয়া-হদিস পাবে
প্রশ্ন এইটাই।

বৃষ্টি পড়ছে
আছড়ে পড়ছে
মৃত্তিকার আলিঙ্গনে
এবং সম্ভোগে
সার্থকতা জলের প্রেমের।
দেখেছ প্রেমের মড়া?
কোনোদিন ডুবেছে সে জলে?

মন পোড়ে?
আহা বাহা পুড়ুক জ্বলুক
পোড়াই নিয়তি
বাহক দুর্গতি
ছিল যে কপালে লেখা
কীভাবে খ-াবে?
মনের বৈরাগী মাঝি
ফিরে আসতে নয় রাজি
চড়েছে সে একগুঁয়ে
ভাঙাচোরা ডিঙি নৌকায়।

নিরালায় সন্ধ্যাকালে

যাও পাখি যাও
পরানবন্ধুরে গিয়া
স্মরণ করাও
দুঃখিনীরে একলা রাইখা
কী মজা সে পায়?
এবার নাগালে পেলে
রশি দিয়া বাইন্দা রাখব
সতত পঞ্চল বন্ধে
এইবার দেইখা নিব কীভাবে পলায়!
শরমের খেতা পুড়ি
ওরে পাইলে এই ঘুরি
উইড়া চলি পাতায় পাতায়
যাও পাখি বলো তারে
এবার সে আসতে পারে
দুই বন্ধু বসব গিয়া
পুরানা দীঘির পাড়ে
নিরালা সন্ধ্যায় কালে
প্রাচীন ঘাটলায়
ও বন্দু সারলী হাঁস
খুঁচিয়ে কী মজা পাস?
সবকিছু ছাইড়া ছুইড়া
নিজ গৃহে সোজা চইলা আয়!


গত্যন্তর নাই

বিশ্বাস ভেঙেছো তবু
তোমাকে বিশ্বাস করি
পুনরায় প্রতারিত হতে চাই
ক্ষতি আর কতটুকু হবে?
সর্বনাশ পোড়া ছাই
লানতের অন্ত নাই
তোমাদ্বারা সকলই সম্ভব
যদি অসম্ভব হয়
আমি তবে বেপথু নাচার
পথ খোলা নাই যে বাঁচার
আমার কী গতি হবে তবে?


আশাভঙ্গ

এতোটা পথ
পাড়ি দিলাম একা
ভেবেছিলাম
হয়তো পাবো দেখা।
জানতাম না অদর্শনই
এই কপালের লেখা।
ভেবেছিলাম সরল তুমি
এখন দেখি জটিল বক্ররেখা!


নৈকট্য তো ছিল না কপালে

ক.
খুঁজতে খুঁজতে একদিন
হয়তো পেয়ে যাবো
ভয় কিন্তু জাগরুক
পেলে পর নিশ্চিত হারাবো!

খ.
কাঁটা ও সংশয়
সমস্ত জীবনব্যাপী
ভিলেনের মতো জেগে রয়।

গ.
জারিজুরি সবই হলো ফাঁস।
জানতে না আমার হৃদয়মধ্যে
বাস করে অপরূপ আন্ধা সর্বনাশ?
আমি কিন্তু জানতাম
সে কারণে কাছে ঘেঁষতে
চাইতাম না মোটের উপর
নৈকট্য নিয়তি নয় জানা ছিল
কিন্তু করতে পারি নাই
তোমাকে ত্যাগের মতো ছিন্ন উপবাস।

 

;

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু



হাসিবুর রহমান
পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

  • Font increase
  • Font Decrease

 

কোন জাতির উত্থান-পতন, আবেগ, ভবিষ্যৎ নির্মাণে মিশে থাকে ইতিহাসের  সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম উপাদান । কেউ ইচ্ছে করলেই তাকে যেমন বদলে দিতে পারে না, ঠিক তেমনি আদর্শগত দিক থেকে কোন জাতিকে বিপথে চালিতে করতে পারে ভুল ইতিহাস। ভারত উপমহাদেশের ইতিহাসে অষ্টাদশ শতকের বাংলা নানা কারণেই তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে, বাংলার আর্থিক সমৃদ্ধির সুনাম সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল সেই সময়। শান্তি সমৃদ্ধির চূড়ান্ত এক পর্যায়ে ১৭৫৭ পলাশির অন্ধকার নেমে আসে এবং ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন ঘটনো হয়।

দ্বিসার্ধশত বছরের পলাশি যুদ্ধের বহুমাত্রিক আলোচনা হয়েছে ঠিকই কিন্তু নবাব সিরাজউদ্দৌলার রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা ও ব্যক্তিগত চরিত্র নিয়ে জনসমাজে বিভ্রান্তিকর, কাল্পনিক গল্পও ছড়ানো হয়েছে । দেশী-বিদেশী ঐতিহাসিকরা তাঁকে লম্পট, দুশ্চরিত্র, কটুভাষী, হৃদয়হীন রূঢ়  চতুষ্পদ পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট স্বভাবজাত বলে মিথ্যা ও কলঙ্কের অপবাদে মুড়ে দিয়েছেন। সমকালীন যুগের ফারসি ভাষার মুসলমান,  ইংরেজ লেখক কেউই তাঁর প্রতি সুবিচার করে কলম ধরেননি।

তবে, অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, নিখিল নাথ রায় আধুনিক কালে সুশীল চৌধুরীর মতো ব্যতিক্রমী ঐতিহাসিকরা  সিরাজউদ্দৌলার মত দেশপ্রেমিক নবাবকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে যেভাবে মূল্যায়ন করে বিপথগামী ইতিহাস চর্চার ধারাকে থমকে দিয়েছেন- এটাও ইতিহাসবেত্তাদের সততা, স্বচ্ছতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্বরূপ। 

বর্তমানে অধিকাংশ ঐতিহাসিক পলাশির যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে বিস্তর লেখালেখিতে আগ্রহী। কিন্তু তাঁরা দেখেন না, দেখতে চান না যে পলাশি হলো একটি  পরিণতি । ষড়যন্ত্র আর সামরিক আগ্রাসনের একটি সুদূরপ্রসারী ফলাফল। তাঁরা পলাশি পরবর্তী সময়ে ইংরেজ কর্তৃক ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার বৈধতা দিতে সিরাজের বিরুদ্ধে সীমাহীন মিথ্যা যুক্তির জাল বুনেছিল, আসলে এছাড়া ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে স্বীকৃতি দেওয়ার অন্য কোন বৈধ উপায় তাঁদের হাতে অবশিষ্ট ছিল না।

মাত্র চৌদ্দ মাসের শাসনকালে অবাধ্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঔদ্ধত্যকে  দমন করতে সিরাজের দৃঢ়তা, সাহসিকতা, কঠোরতা দেখিয়েছিলেন তা নিঃসন্দেহে প্রশংসাযোগ্য। বাংলার মাটিতে বিনা অনুমতিতে ইংরেজদের দুর্গ নির্মাণ, কিংবা কর্মচারীদের  অবাধ "ব্যক্তিগত বাণিজ্য" বন্ধ করা তাঁর কাছে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। একজন স্বাধীন নবাবের চোখে সার্বভৌমিকতার প্রশ্ন এখানে জড়িয়ে ছিল। কিন্তু সিরাজের দুর্ভাগ্য তাঁর দরবারের পদস্থ বিশ্বাসী অমাত্য গোষ্ঠী, অনেকেই ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের আশায় কোম্পানির ষড়যন্ত্রের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। জগৎ শেঠদের মতো দেশীয় বণিকরাও এই ষড়যন্ত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

ঘরে বাইরে শত্রু পরিবেশিত সিরাজ দৃঢ়তার সঙ্গে এই অশুভ শক্তির মোকাবেলায় সফল হননি বটে , কিন্তু তাঁর স্বদেশভূমি রক্ষার লড়াইকে হীন চোখে দেখা অনৈতিহাসিক। পলাশি নামক বিয়োগান্ত ঘটনার পর  তাঁকে  চরম অপমান আর অমর্যতার সম্মুখীন হতে হয়। যে নিষ্ঠুরতা তাঁর সঙ্গে পলাশির পর দেখানো হয়েছিল ইতিহাসে তা বিরল। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক সিরাজুল ইসলাম লিখেছেন, প্রকৃতপক্ষে সমকালীন শাসকশ্রেণীর মানদণ্ডে সিরাজউদ্দৌলার চারিত্রিক দৃঢ়তা, অত্যন্ত সাহসিকতা ও অসাধারণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধ বিস্ময়কর বটে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় সাম্প্রতিক কালেও ইংরেজদের ভারতবর্ষ দখলের বৈধতা দান করতে গিয়ে একশ্রেণীর ইতিহাসবিদ সিরাজকে নিয়ে নতুন নতুন কাহিনী, উপাখ্যান ম্যানুফ্যাকচার করে ইতিহাস হিসাবে প্রচার করে চলেছেন। তাঁরা বলেন-- সিরাজের মৃত্যু কোন শহীদের মৃত্যু নয় । কারণ তিনি মধ্যযুগীয় রাষ্ট্রব্যবস্থাকে রক্ষা করতে লড়াই করেছিলেন মাত্র, যেখানে জনসমাজের সঙ্গে তাঁর কোন সম্বন্ধ ছিল না। অথবা একথা বলা হয় যে বাংলার নবাব হিসেবে কেন্দ্রীয় মুঘল শাসকদের দ্বারা কোন লিখিত বৈধ অনুমোদন তাঁর ছিল না ইত্যাদি।

সিরাজের মৃত্যু কোন শহিদের মৃত্যু কিনা সে বিষয়ে বিতর্ক থাকা অকল্পনীয়। তাঁর দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলা ইতিহাস-বিরুদ্ধ। এছাড়া শাসনের বৈধতার দিক থেকে বাংলার নবাবরা নিয়মিত দিল্লি সম্রাটদের রাজস্ব প্রদান করতেন, সিরাজ ও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। দেশের অভিন্ন মুদ্রা ব্যবস্থা বাংলাতেও চালু ছিল। কাজেই  অভিযোগকারীরা কি ধরনের 'দেশপ্রেম' ও 'জাতীয়তাবোধ' সিরাজের কাছে প্রত্যাশা করছেন তার কোন ইতিহাস সম্মত ব্যাখ্যা হয় না। দেশকে রক্ষা করার দায়িত্ব তিনি অস্বীকার করেননি এখানেই তাঁর রাজনৈতিক গুরুত্ব ও ঐতিহাসিক অবদান।

সিরাজউদ্দৌলার নিরন্তর লড়াই এর সঙ্গে যুক্ত ছিল আপামর বাংলার মানুষের জীবন ভবিষ্যৎ। পলাশিতে যদি নবাবকে না হারতে হত তাহলে বাংলার ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হত নিশ্চয়। দীর্ঘ দু'শো বছরের ঔপনিবেশিক শাসন, শোষণের জর্জরিত দেশবাসীর মনে হীনমন্যতাপদের জন্ম নিত না। স্বাধীনতার শত্রুদের সেদিন যথার্থভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। দেশপ্রেমিক নবাবের মৃত্যুকে কেবল ক্ষমতার হাত বদল বলেই ভেবেছিল একশ্রেণীর মানুষ। ক্ষমতাসীন নবাবের লাশকে সেদিন জনগণের ঘৃণা ও অপমানের বস্তু করে তুলেছিল। নবাবের অনুগ্রহে যাদের একসময় জীবন জীবিকা নির্ভর করত তারাই দেশপ্রেমিক সিরাজকে নির্মমভাবে হত্যা করল, মৃতদেহটি পশুর মত ডাস্টবিনে ছুঁড়ে দিয়েছিল। সমকালীন যুগের এই ঘৃণ্য প্রতিশোধ যেকোনো জাতির কাছেই বড় লজ্জার।

 

অথচ যে নবাব চরম বিপদের মুহূর্তে দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি, কারোর প্রতি  শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি, তাঁর সেই মহানুভবতা ও উদারতাকে কেউ মূল্যায়ন করতে চায় না। ম্যালেশন যথার্থই মন্তব্য করে করেছেন  যে, পলাশির আগে-পরে একমাত্র সিরাজের বিশ্বাসঘাতকতা ও ষড়যন্ত্রের সঙ্গে কোন সম্পর্ক ছিল না।

একথা সত্যি যে, বাংলার নবাবদের মধ্যে সিরাজই বোধহয় দেশকে একটু বেশি ভালোবেসে ফেলেছিলেন। তিনি মুর্শিদকুলি খান, সুজাউদ্দিন, সরফরাজ বা আলিবর্দী খানের মতো গা ভাসিয়ে চলতে পারতেন তাহলে তাঁকে অন্তত অকালে প্রাণ দিতে হতো না। হতভাগ্য রাজ্যহারা নবাব জীবনের অন্তিম সময়ের প্রাণ ভিক্ষার জন্য প্রত্যেকের পদতলে লুটিয়ে পড়েছিলেন কিন্তু সেদিন তাঁর করুণ আর্তি শুনতে পাইনি কেউ। ফলে বাংলার ইতিহাসে চিরকাল কালো অধ্যায় হিসেবে ১৭৫৭ সালের ৩রা জুলাই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। তাঁকে জীবন ভিক্ষার পরিবর্তে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। নিষ্ঠুর, ঘৃণিত সেই হত্যাযজ্ঞ আজও মানুষের হৃদয়ে কম্পিত হয়। দেশ রক্ষার লড়াইয়ে পরাজিত হয়েও মানুষের মনে তিনি চিরদিন স্বাধীনতার স্পৃহায় অমর হয়েই থাকবেন, এটাই অকালপ্রয়াত নবাবের জন্য  শ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি।

(প্রাবন্ধিক আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক।)

 সহায়ক তথ্যসূত্র :

১) যদুনাথ সরকার ,  বেঙ্গল নবাবস, এশিয়াটিক সোসাইটি, কলকাতা ,১৯৫২

 ২) ডঃ সুশীল চৌধুরী, পলাশির অজানা কাহিনী, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।

৩) ড: মোহম্মদ মোহর আলি,  হিস্টরি অব দ্য মুসলিমস অফ বেঙ্গল, ২খন্ড ,রিয়াধ ১৯৮৮।

৪) অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, সিরাজদ্দৌলা, কল্লোল, কলকাতা।

৫) ড : সিরাজুল ইসলাম , বাংলাদেশের ইতিহাস , খন্ড ১ম ( ১৭৫৭-১৯৭১) সম্পাদনা , এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ ২০১৭ ।

৬) আ:কা: মো: যাকারিয়া, সিরাজউদ্দৌলা , প্রথমা , ঢাকা ।

;

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

  • Font increase
  • Font Decrease

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ও শিশুসাহিত্যিক ফখরুল হাসান। ২৩ জুন বিকেলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সংগীত ও নৃত্যকলা মিলনায়তনে তার হাতে সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ৬ লেখককে সম্মাননা, ‘শেখ হাসিনার জয় বিশ্বের বিস্ময়’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, আবৃত্তি, ছড়া পাঠ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

এ সময় সৈয়দ মাসুম, আর মজিব, এনাম আনন্দ, ফাহমিদা ইয়াসমিন, লুৎফর রহমান চৌধুরীকেও সম্মাননা দেওয়া হয়।

বঙ্গবন্ধু জন্মশতবর্ষ আন্তর্জাতিক পর্ষদ, বঙ্গবন্ধু লেখক পরিষদের আয়োজনে বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. শাহজাহান মৃধা বেনুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ও জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা।

প্রধান অতিথি ছিলেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন কবি অসীম সাহা, মারুফুল ইসলাম, তারিক সুজাত ও অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন।

কবিতা আবৃত্তি করেন জালাল উদ্দিন নলুয়া, ড. তপন বাগচী, শফিকুর রাহী, রিফাত নিগার শাপলা, আনতানুর হক, হানিফ খান, ইউসুফ রেজা, রোকশানা সাথী, জমশেদ ওয়াজেদ, মাসুদ আলম বাবুল, মাদবর রফিক, লুৎফর চৌধুরী, হাসনাইন সাজ্জাদী, গিয়াসউদ্দিন চাষা, হেনা খান, কৌমুদী নার্গিস, বোরহান মাসুদ, সৈয়দ একতেদার আলী, আলী নিয়ামত, মিহির কান্তি ভৌমিক, লুৎফা জালাল, তানিয়া মাহমুদ, শ্রাবণ রেজা, ইমরান পরশ, সৈয়দ তপু, মেরীনা সাঈদ, শাফিন প্রমুখ

;

সংশপ্তক শেখ হাসিনা



আবদুল হামিদ মাহবুব
আবদুল হামিদ মাহবুব

আবদুল হামিদ মাহবুব

  • Font increase
  • Font Decrease

 

সংশপ্তক শেখ হাসিনা

কাণ্ড অনেক করে

পদ্মা বুকে ‘পদ্মা সেতু’

ঠিক দিয়েছেন গড়ে।

 

কাণ্ড ওসব নয় সাধারণ,

ভুলতে কি আর পারি?

জয় বাংলা জোরসে হেঁকে

ঠিক তো দিলেন পাড়ি।

 

অপেক্ষাতে সবাই আছি

মনটা উচাটন

ওই দিনটা জানান দিয়ে

আসলো শুভক্ষণ!

 

বাংলাদেশের এমন জয়ে

বিশ্ব জানুক, কি সুখ?

সব বাঙালি বুকের পাতায়

সুখের গাথা লিখুক।

;