জয়নব আরা বেগমের কবিতায় মনস্বিতা



মমতাজ উদ্দিন আহমদ
জয়নব আরা বেগমের কবিতায় মনস্বিতা

জয়নব আরা বেগমের কবিতায় মনস্বিতা

  • Font increase
  • Font Decrease

 

জয়নব আরা বেগম (২৭ ডিসেম্বর ১৯৭৮) বাংলা কবিতার রথে উঠে আসা একটি নাম। পেশায় শিক্ষক হলেও লিখনিতে সিদ্ধহস্ত অর্জন করছেন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে। তাঁর কবিতায় ধরা পড়েছে প্রনষ্ট সময়ের অভিঘাতের বিষন্নতা। আবার কখনোবা প্রকাশ ঘটে নস্টালজিয়া, কখনো অন্তর্বিহীন মৌন-নিস্তব্ধতা, মানবীয় ভালোবাসার অন্তর্লীনতা এবং নির্মোহ সম্পর্কের গভীর আকাঙ্ক্ষার পূর্ণ প্রকাশ।

জয়নব আরা বেগমের কবিতায় রয়েছে স্বকীয় বৈশিষ্ট্য। কবিতাগুলো অনুরাগী পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। অনতিদীর্ঘ, অনলস, তেজস্বী ও মনস্বী অনুশীলনের চাপ লক্ষ্যণীয় তাঁর কবিতায়। প্রচলিত আধুনিক কবিতার ধারায় রচিত হয়েছে তাঁর কাব্যের শরীর। এতে রয়েছে গভীর রসবোধ, সমাজচিন্তন, নারী-পুরুষের চিরকালীন প্রেম-বিরহ ও উদার-নৈতিকতার সুসমন্বয়। কবিতাগুলোতে রয়েছে বিদগ্ধ আত্মমগ্নতা। আবার কখনো বা ইহজাগতিক ভাবনার সাথে পরলৌকিকতার সংমিশ্রণ।

সাহিত্যের নানান শাখার তুলনায় বোদ্ধা মহলে কবিতার আলোচনাই সর্বাধিক। কবিতা অনন্ত শক্তির উৎসধারাও বটে। তাই কবিতার সংজ্ঞা পুরোপুরি দেয়া কঠিন। কবিতার কল্পনার সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা কী কবিও দিতে পারেন কিনা তা পাঠকমাত্রই সন্দিহান থাকেন। জয়নব আরা বেগমের আধুমিক কবিতাগুলো পড়লে মনে লাগে সুর-ছন্দের তীব্র আকস্মিক শব্দতীর, পৌঁছে যায় অন্তরেরও ভেতর!

‘কবিতা অনন্ত শক্তির উৎসধারা’। সে ভাবনা থেকে বলা যায়, জয়নব আরা বেগমের প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘সমর্পিত শব্দাবলী’ ও ‘আঁধার ক্ষেতে বুনেছি ভোরের বীজ’ এর কবিতাগুলোয় রয়েছে নিজস্ব একটি গতিধারা। আছে ভাবের প্রাচুর্য। তাঁর প্রতিটি কবিতায় যে তৃষ্ণাবোধ রয়েছে তা দৃশ্যমান বাস্তবতা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। কবিতায় রয়েছে দৃশ্যমান বাস্তবতা থেকে ভিন্ন দৃশ্য তৈরীর সক্ষমতা।

কবি অসাধারণ সব শব্দের বুননে তৈরী করেন নিজের ক্ষুরধার লিখনীতে কবিতামালা। সাধারণ কল্পনার উর্ধ্বে উঠে কবিতায় তিনি নিজস্ব কল্পনায় শিল্পবুনেন। কবি মূহূর্তের অভিজ্ঞতা থেকে চলে যান সুদূরে। মাঝে মাঝে কল্পলোকের সিংহধারে পৌঁছে বেদনার বেদীমুলে অনর্থক শাপবর্ষণ করেন প্রিয়জনের উদ্দেশ্যে। সেখানে থাকে না বাস্তবতার কোন সীমারেখাও! সেখানে শুধুই কল্পলোকের ঘরবসতি!

বসন্তের নিদাঘ-শোভা আমাদের শরীর-মনকে জাগিয়ে তোলে। সে অনুভূতি যৌবনের। কবিতায়ও বসন্তের দৃশ্য ও বাতাসের ঝড়োগতি ও আত্মজাগরণ নিয়ে আসতে পারেন কবিরা। যেমন- আমাদের জাতীয় কবির ‘বিদ্রোহী’ কবিতা একটি আত্মজাগরণের কবিতা। সুদৃঢ় আত্মবিশ্বাসের জয়গান ‘বিদ্রোহী’ কবিতার চরণে চরণে সুস্পষ্টরূপে দেদীপ্যমান। এ কবিতায় ১২১ বার ‘আমি’ শব্দ ব্যবহার করে কবি প্রতীয়মান করেছেন মানুষ অসম শক্তির অধিকারী!

কবি মূলতঃ অনন্ত কল্পনা শক্তি দিয়ে শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে ছন্দ-মাত্রায় কবিতা বুনেন। এটি অত্যন্ত দূরহ কাজ বটে। জয়নব আরা বেগম তাঁর কবিতায় সাম্য, সত্য-সততা, প্রেম-অনুরাগ, ক্ষোভ, চাওয়া-পাওয়া, আশাহত জীবনের ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধতা এবং সমাজের মিল-অমিল বিষয়গুলোকে ফুটিয়ে তুলেছেন নিজ মনের আয়নার ফ্র্রেমে।

কবিতায় মনের ভাবপ্রকাশের অবদান বিশ্ববিশ্রুত। কবির কবিতা শরীর-মনের চারদিকে অনুভূতি জাগিয়ে দিতে সক্ষম। সে অনুভূতি যৌবনের, সে অনুভূতি পাওয়া-না পাওয়ার বেদনাকাব্য। পল্লী মানুষের জীবন নির্ভর আধুনিক কবিতায় সিদ্ধহস্ত কবি জয়নব আরা বেগম।

ছোট্ট পরিসরে কবিতার সংজ্ঞা দেওয়া কঠিন। কবিতার শক্তির উৎসধারার নাগাল খুব কম মানুষই পান। কবিতার রূপ-আকৃতি-প্রকৃতি একেক জনের কাছে একেকভাবে ধরা দেয়। তাই প্রত্যেক কবির আলাদা আলাদা ভাবের জগতের সাথে আমরা পরিচিত। মৌলিক কবির ভাবের জগৎ সর্বদাই আলাদা। যেমন গত শতকে রবীন্দ্র বলয়ে প্রদক্ষিণ করেও নজরুল তাঁর স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেই হয়েছেন কালজয়ী।

কবিতা কি! কী তার পরিচয়? তার সহজ বর্ণনা পাই কবি আল মাহমুদের ‘কবিতা এখন’ কবিতাটি পাঠে। কবিতাটির শেষাংশটি এমন-

‘কবিতা চরের পাখি, কুড়ানো হাঁসের ডিম, গন্ধভরা ঘাস

ম্লান মুখ বউটির দড়ি ছেঁড়া হারানো বাছুর

গোপন চিঠির প্যাডে নীল খামে সাজানো অক্ষর

কবিতা তো মক্তবের মেয়ে চুলখোলা আয়েশা আক্তার।’

কবিতা এক-একজনের কাছে ধরা দিয়েছে ভিন্ন ভিন্ন অনুভূতি দিয়ে। কবিতার সহজ বর্ণনায় যেভাবে ‘মক্তবের চুলখোলা আয়েশা আক্তার’ এর বর্ণনা উঠে আসে তেমনি আমরা দেখতে পাই জটিল-কঠিন বর্ণনার পক্তিমালাও। যাঁর মাথামু-ু সাধারণ পাঠকের বোধগম্যতাই বাইরে। এদিক দিয়ে কবি জয়নবের কবিতাগুলোর শব্দগাঁথুনি বেশ সাবলিল ও ঝরঝরে।

কবি জয়নব আরা বেগমের কাব্যগ্রন্থ ‘সমর্পিত শব্দাবলী’র কবিতা ‘শব্দের তাঁতী’তে কবিতার রূপ ধরা পড়েছে এভাবে-

‘সোনার সুতোয় রূপোর গিট মেরে

বুনন করি রেশমী কবিতা।

অজানার অতৃপ্তি ঘুচাতে

নিজেকে পিপাসার্ত করে তৃষ্ণা নিবারণের জন্য

গণ্ডুষ ভরে পান করি

সাহিত্য-সংস্কৃতির রস।

তারপর নিজের মত কলম ঘুরাই

কখনো স্বপ্নে হারাই।’

তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘আঁধার ক্ষেতে বুনেছি ভোরের বীজ’ এর ২৫-২৬ পৃষ্ঠার একটি কবিতার নাম ‘কবিতা’। এ কবিতাটির শেষাংশে ‘কবিতা’র পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে এভাবে-

‘বোমার আগুনে ধ্বংস ও বিরান হয়ে যাওয়া

দগ্ধ প্রান্তরে

নতুন আশ্বাসের বাণী শোনায়।

জীবনের সঞ্চিনী বাড়ায়-

বিমর্ষ তালিকার নাম মুছে দিয়ে।

সে অন্য কেউ নয়- ‘কবিতা’।’ (চম্বুক অংশ: কবিতা, আঁধার ক্ষেতে বুনেছি ভোরের বীজ)।

তাঁর কবিতায় মাঝে মাঝে ধরা পড়ে শিল্পিত ভাবনার স্বাধীন প্রকাশ। কবির বিরহী ভাবনা, কবিতার ঝাঁঝালো ভাষা আর পঙতি যেন এক একটি বুলেট। এতে ধরা পড়ে তাঁর অন্তরের প্রবল শক্তি। যে শক্তি জ্ঞানগম্মিদের ধারণারও উর্ধ্বে। কবি তাঁর ‘অশ্রুপ্লাবন’ কবিতায় লিখেন-

‘বিশ্বাসের একাগ্রতায় আমার বুকে

তোমার প্রেমকে ধারণ করে

প্রাণের মধ্যে খুঁজেছি প্রাণের বাঁধন।’ 

তখন পাঠকমাত্রেই হৃদয়ের অলিন্দে খুঁজে পান কবির প্রেমারাধানার সাধনা আর ভাবনার সীমারেখা। একইসাথে খুঁজে পান কবির ব্যথিত হৃদয়ের প্রকাশের ব্যাপ্তির গভীরতা। আবার যখন দেখি-

‘পাষাণে পরান বেঁধে,

ম্লান বেশে সজল নয়নে

নিজের বোবা দৃষ্টির শূন্য চাহনি

আজ আমাকে করছে ক্ষত-বিক্ষত’।

                                (‘অশ্রপ্লাবন’ : সমর্পিত শব্দাবলী)

এখানে পাঠকমাত্রই কবির হৃদয়ে বেদনার অনুরণন দেখে ব্যথিত হন। যখন কবি বলেন, ‘বেদনার শতদল হয়ে ফুটে আছি যন্ত্রণা দিঘীর মাঝখানে‘ তখন পাঠকের হৃদয়ে কবির যন্ত্রণা দিঘীতে শাপলা ফুটানোর আকুলতা সৃষ্টি করে। কবি পাঠকের মনকে আকাঙ্খিত করে তোলেন কষ্টের দিঘীতে শাপলা ফোটানোর। কবি যখন লেখেন-

‘অকারণে শুধু আজ মনে বাজে বেদনার তান,

বুকে বাজে হাহাকার করতালি-

অশ্রুপ্লাবনে হাবুডুবু খাই বেদনার উপকূলে’।

                                (‘অশ্রুপ্লাবন’ : সমর্পিত শব্দাবলী)

কবি এখানে নিজেই স্বীকার করেছেন ‘অকারণে আজ মনে বাজে বেদনার তান’। এখানে কবির কল্পনা ধরা পড়ে। কবির দুঃখের কারণে যোগ হয়েছে অকারণ ভাবনা-কল্পনা। কবির এ বিরহের মধ্যে বাস্তব অনুষঙ্গ নেই। আছে শুধু প্রিয়জনের প্রতি অকারণ দ্বেষ আর অনুচিত শাপবর্ষণ। কবির বিরহ এখানে শুধুই কল্পনাপ্রসুত। যাতে বাস্তবতার সংশ্লেষ নেই।

কবি জয়নব আরা বেগমের কাব্যগ্রন্থ ‘সমর্পিত শব্দাবলী’ এবং ‘আঁধার ক্ষেতে বুনেছি ভোরের বীজ’ এর ১০৩ টি কবিতার মধ্যে অনেকগুলো কবিতাই বেশ উঁচুমর্গের বলে মনে হয়। সাহিত্য সমালোচকের পাশাপাশি বিশ্বসাহিত্যের বিভিন্ন বিখ্যাত কবিও কবিতাকে দেখেছেন বিভিন্ন রূপে। সেদিক দিয়ে তাঁর কবিতার মূল অনুষঙ্গ কি তা সময়ই বলে দেবে একদিন।

কবিতাই কবির মননের পরিচয় বহন করে। দু’টি কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলোয় পরিবেশ-প্রকৃতি, প্রেম, সমাজ-সভ্যতা, সুখ-দুঃখ, প্রতিবাদ, ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধতা-মৌনতা, রাগ-অনুরাগ, বিশ্বাস-অবিশ্বাসের নানান প্রসঙ্গ ফুটে উঠেছে শব্দ-তরঙ্গে।

নারী প্রেমিকা; নারী কবিতার শক্তির উৎস। কবিতার অন্যতম উপজীব্যও বটে নারী। যেমনিভাবে নারী কবিতায় কাজী নজরুল ইসলাম লিখেন-

‘নারীর বিরহে, নারীর মিলনে, নর পেল কবি-প্রাণ,

যত কথা তার হইল কবিতা, শব্দ হইল গান।

নর দিল ক্ষুধা, নারী দিল সুধা, সুধায় ক্ষুধায় মিলে’

জন্ম লভিছে মহামানবের মহাশিশু তিলে তিলে!’

কিন্তু নারীই যখন হয়ে উঠেন কবি তখনও প্রাধান্য পায় এমন কাউকে ঘিরে। যা তার মানসসঙ্গী! কবি জয়নব আরা বেগম লিখলেন,

‘হৃদয়ের সোনালী কুঞ্চন ভেঙ্গে

নক্ষত্র হয়ে এসেছিলে তুমি

কোন এক বুধবার সন্ধ্যায়।

স্নায়ুর ভেতর টগবগ করেছিলো রক্তরস।

স্বাদে-গন্ধে সিক্ত হয়েছিলাম,

নিমফুলের স্নিগ্ধ গন্ধের মতো

একটা গন্ধ আমাকে মাতিয়ে রেখেছিলো;

ধুকপুক হৃদয়ে অনুভব করেছিলাম

এক রহস্যময় ভালোলাগা।

(প্রথম স্পর্শ : সমর্পিত শব্দাবলী)

তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘আঁধার ক্ষেতে বুনেছি ভোরর বীজ’ এর কবিতা ‘অস্তিত্বের রেণু’তে কবি লিখলেন-

‘যদি কখনো তোমার প্রত্যাখানের কৃষ্ণবলয়

আমাকে এসে গ্রাস করে,

তবে সেই দিন যেন পৃথিবীর

অন্তিম দিন হয় আমার।

আমার যাত্রা-পথের দিন-রাত্রির

উত্থান-পতনে তুমি রোমাঞ্চ পুলক।

তোমার ভালোবাসার রহস্য সৃজনের পঞ্চভূত

আমার বুকের তপস্যা।’

এ কবিতাগ্রন্থ দু’টির কবিতাগুলোয় প্রেম-পরিবেশ-প্রকৃতি ধরা পড়েছে বেশ আধুনিক কবিতার পঙ্তিমালায়। পাঠককে দোলা দেয় কবিতাগুলো। পাশাপাশি তাঁর কবিতায় শিল্প-প্রকরণ, আদর্শ-চেতনা, চিন্তা প্রভৃতির গভীরতা অনেকখানি গভীর। কবিতায় তার অন্তর্নিহিত শক্তি ও বলিষ্ঠতা এবং ইচ্ছাশক্তির প্রচ-তা কবিতার শব্দের ভারী ওজন প্রভৃতি গুণ আমরা ভবিষ্যতেও লক্ষ্য করবো বলে আশা করি। এছাড়া ভাষার-বৈচিত্র্য এবং নিজস্বতায় আলাদা সুর সৃষ্টি হোক তাঁর কবিতায় এ প্রত্যাশা।

মানুষ ঐতিহ্য অনুসন্ধানে এবং দেশপ্রেমে আগ্রহী। ঐতিহ্যসন্ধান মানেই তার অস্তিত্ব অনুসন্ধান করা। দেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গ। সমাজের চারপাশকে ঘিরে গড়ে ওঠে সংস্কৃতি। এ সংস্কৃতির সঙ্গে মানুষের জীবনাচরণ। কবি তাঁর চারপাশ থেকে কবিতার উপকরণ সংগ্রহ করেন। প্রকাশ করেন নিজস্ব ভঙ্গিতে। ‘স্বদেশ’ কবিতায় কবি জয়নব আরা বেগম লিখলেন-

‘বটের ডালে কালো কোকিল

ডাকছে কুহুতানে,

তারই সুরে মন ভরে যায়

স্বপ্ন জাগে প্রাণে-

এমনি সুখের স্বপ্ন পারে

ভাসছি সুখের তারে।’

দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে অন্তবির্হিন মৌননিস্তব্ধ সৌন্দর্যের দিগন্ত বিস্তৃত গ্রন্থিল পাহাড়ি জনপদ বান্দরবান। এই অপরূপ বান্দরবান জেলাকে নিয়ে কবি জয়নব আরা বেগম লিখেছেন ১০০ লাইনের ৫০০ শব্দের দীর্ঘ একটি কবিতা। কবিতাটি শুরু এবং শেষের পঙ্তিগুলো এই-

‘পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে সবুজের মেলা,

তারি সাথে মেঘ খেলে লুকোচুরি খেলা।

ঝর্ণা-পাহাড়-নদী আর সবুজ বন,

অপরূপ রূপ দেখে হারায় এ মন।

---

পাহাড়ি-বাঙ্গালী সম্প্রীতি অটুট এখানে

ছুটে আসে সব সুখ তাই এই পানে।

জন্মেছি এইখানে কী চাই আর,

আমার জেলা ‘বান্দরবান’ আমার অহংকার।’

(বান্দরবান : আঁধার ক্ষেতে বুনেছি ভোরের বীজ)।

কবি জয়নব আরা বেগম লোকজ-উপাদানে শৈল্পিক করে সাজিয়েছেন তার কবিতার অবয়ব। মা, বাবা, গন্তব্য, প্রথম স্পর্শ, সুঁই সুতো, বেদনার শব্দ, নালিশ, মিনতি, হৃদমাঝার, বাজখাই অধিকার, বিশ্বাসের ঝুলি, অনন্ত তৃপ্তি, স্বর্গীয় পুলক, স্বপ্নস্নান, অনন্ত সুখ, জৈব বিষ, আমি মুক্তি চাই, সোনালী সূর্য, ধিক্কার ধ্বনী, শব্দের তাঁতী, হিরক রাজা, মন পদ্মের ঢেউ, তোমাকে ভালোবাসি বলে, ভীনগ্রহবাসী, সলজ্জ আস্তানা, বান্দরবান, চন্দ্রালোকের সিঁড়ি, আগামীর প্রত্যাশা , অথৈ যমুনা, যন্ত্রণার ঐশ্বর্য্য, স্বদেশ, সর্বগ্রাসী, নারী, বিশ্বাস, দৈবধন, ভালোবাসা ও ঘৃণা, নিন্দাবাদের বৃন্দাবন, হে অমানিশা, অস্তিত্বের রেণু, সুপ্রিয়’ ইত্যাদি কবিতায় ব্যবহৃত হয়েছে স্মৃতিকথার উপাদান। কয়েকটি নস্টালজিক কবিতা পড়লে পাঠক ফিরে যাবেন অতীতে।

কবি জয়নব আরা বেগমের কবিতায় ইসলামী মিথ এবং পুরাণের ব্যবহার তেমন লক্ষ্যণীয় নয়। বাঙ্গালী মুসলিম কবিদের মাঝে যাঁরা তাঁদের কবিতায় ইসলামী মিথের ব্যবহার করেছেন তারা বাঙ্গালী মুসলিম মনে স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন। তদ্রুপভাবে কবিতায় পুরানের ব্যবহারও বাঙ্গালী মানসকে সমানভাবে আকর্ষণ করে। আধুনিক বাংলা সাহিত্যে কবি আল মাহমুদ তাঁর কবিতায় এ দু’টি মিথ এর দারুণ সমন্বয় করেছেন। ফলে তার অনেক কবিতাই মানুষের বোধ-বিশ্বাস, অস্তি-মজ্জার কথা বলে বিধায় কবিতাগুলো নিত্য প্রাসঙ্গিক।

পাশাপাশি কবিতায় ইংরেজি, আরবি, উর্দু-ফারসি, প্রাচীন সংস্কৃত ও সাধু ভাষার শব্দের জুঁতসই ব্যবহার করলে কবিতাগুলো আরো সুখপাঠ্য হয়ে উঠবে বলে মনে করি। তাঁর কবিতায় উঠে আসুক প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দুঃখ-বেদনা, হাসি-কান্না, অনুভব-অনুভূতির শৈল্পিক বুনন। লোকজ শব্দ, ঐহিত্য চেতনা, ধর্মাশ্রয়ী কবিতা সৃষ্টির মাধ্যমে তাঁর কাব্যের দুয়ার আরো খোলে অপূর্ব সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হোক! ‘সমর্পিত শব্দাবলী’ কবির প্রথম দিকের কবিতার সমারোহের গ্রন্থিত রূপ।

কবি জয়নব আরা বেগম পেশায় একজন শিক্ষক। ১৯ বছরের শিক্ষকতা জীবনে তাঁর রয়েছে অনেক অর্জন। প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের একসেস টু ইনফরমেশন পরিচালিত ‘শিক্ষক বাতায়নে’ একজন সক্রিয় ও সেরা শিক্ষক। ২০১৪ সালে শিক্ষামন্ত্রী থেকে সেরা শিক্ষক এ্যাওয়ার্ড লাভ করেন। তাঁর তৈরি মাল্টিমিডিয়া মডেল কন্টেন্টগুলো দেশের মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরূমে পাঠোপযোগী। মাল্টিমিডিয়া কন্টেন্ট প্রতিযোগিতা ২০১৭-এ এটুআই কর্তৃক তিনি দেশসেরা শিক্ষক নির্বাচিত হন। বান্দরবান জেলায় একাধিকবার তিনি শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হওয়ায় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক তাঁকে স্টাডি ট্যুরে মালয়েশিয়া সফরে পাঠানো হয়।

গ্লোবাল লার্নিং এর উপর উচ্চতর অভিজ্ঞতার জন্য ২০১৫ সালে তিনি লন্ডন সফর করেন। তাঁর এ সফরের ব্যয়ভার বহন করে সরকার ও ব্রিটিশ কাউন্সিল। লন্ডনের স্কটস প্রাইমারি স্কুলে তিনি অতিথি শিক্ষক ছিলেন। ইউকে ভিজিটকালে লন্ডনের হেভারিং এর মেয়র ব্রায়ান ইগলিং তাঁর কাজে সন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে রানীর পোষাক পরিয়ে সম্মাননা এবং এ্যাওয়ার্ড প্রদান করেন। এছাড়াও কবি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে পেয়েছেন একাধিক সম্মাননা।

একটি সভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জয়নব আরা বেগমের জন্ম ও বেড়ে উঠা। পৈত্রিক বাড়ি কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার পূর্ব কাকারা গ্রামে। বাবা জয়নাল আবেদীন একজন ব্যবসায়ী। মাতা হোছনে আরা বেগম গৃহিনী। চাকুরিসূত্রে তিনি বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান পার্বত্য জেলার স্থায়ী বাসিন্দা।

লেখক: মমতাজ উদ্দিন আহমদ, সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান

ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'



তাহমিদ হাসান
ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'

ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'

  • Font increase
  • Font Decrease

বইয়ের নাম: মানচিত্রের গল্প

লেখক: ড. মাহফুজ পারভেজ

প্রকাশক: শিশু কানন

প্রকাশকাল: ২০১৮

গল্প পড়তে সবারই ভালো লাগে। যারা ইতিহাস, রাজনীতি, ভূগোলের কঠিন বিষয় ও বড় বড় বই পড়তে ভয় পান, তারাও গল্প আকারে সেসব সোৎসাহে পাঠ করেন। ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প' তেমনই এক গ্রন্থ, যা ভূগোল, মানচিত্র, অভিযান সংক্রান্ত সহস্র বর্ষের ইতিহাস, আবিষ্কার ও অর্জনকে গল্পের আবহে, স্বাদু ভাষায় উপস্থাপন করেছে। এ গ্রন্থ ছাড়াও তিনি মুঘল ইতিহাস, দারাশিকোহ, আনারকলি প্রভৃতি ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব ও বিষয়কে প্রাঞ্জল ভাষায় তুলে ধরেছেন একাধিক গ্রন্থের মাধ্যমে।

ড. মাহফুজ পারভেজ মূলত একজন কবি, কথাশিল্পী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। তিনি ১৯৬৬ সালের ৮ মার্চ কিশোরগঞ্জ শহরের কেন্দ্রস্থল গৌরাঙ্গ বাজারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগে পড়াশুনা করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউজিসি ফেলোশিপে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করে। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগে প্রফেসর পদে নিয়োজিত আছেন।

তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ গুলো মধ্যে আমার সামনে নেই মহুয়ার বন, নীল উড়াল, রক্তাক্ত নৈসর্গিক নেপালে, বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, বিদ্রোহী পার্বত্য চট্টগ্রাম ও শান্তিচুক্তি, রক্তাক্ত নৈসর্গিক নেপালে ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ রয়েছে।

https://www.rokomari.com/book/author/2253/mahfuz-parvez

লেখকের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ গুলোর মধ্যে ২০১৮ সালে প্রকাশিত 'মানচিত্রের গল্প' বইটি রয়েছে। লেখক বইটিকে ১৯ টি অধ্যায়ে ভাগ করছে। বইটির মধ্যে মানচিত্র আবিষ্কার কিভাবে শুরু হয়েছে এবং আবিষ্কারে পিছনে যাদের অবদান ছিল সেই সব বিস্তারিত তুলে ধরেছেন।

মানচিত্র বা ম্যাপ শব্দটি আদিতে ল্যাটিন 'মাপ্পামুন্ডি' শব্দটি থেকে এসেছে। 'মাপ্পা' অর্থ টেবিল-ক্লথ আর 'মুনডাস' মানে পৃথিবী। অতি প্রাচীন সভ্যতায় চীনারা প্রথম মানচিত্র অঙ্কনে যাত্রা শুরু করে, কিন্তু সেই সব মানচিত্রের আজ অস্তিত্ব নেই। বইটির মধ্যে এইসব ক্ষুদ্র তথ্য থেকে শুরু টলেমির মানচিত্র, চাঁদের মানচিত্র সহ আরো অজানা তথ্য গুলো লেখক বইটির মধ্যে তুলে ধরেছে।

লেখক বইয়ের ১৯ টি অধ্যায়ের মধ্যে টলেমির মানচিত্র, ভাস্কো ডা গামা আর কলম্বাসের লড়াই, রেনেলের ' বেঙ্গল অ্যাটলাস', 'আই হ্যাভ ডিসকভার দ্য হাইয়েস্ট মাউন্টেন অব দ্য ওয়ার্ল্ড ', মানচিত্র থেকে গ্লোব ইত্যাদি সব উল্লেখযোগ্য শিরোনামে বইটি সজ্জিত করছেন।

পরিশেষে ১৯ টি অধ্যায়ের মধ্যে শেষ দুই অধ্যায়ে 'পরিশিষ্ট-১, পরিশিষ্ট-২' শিরোনামে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য মানচিত্র এবং মানচিত্র প্রণয়নে কয়েকজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের কথা বইটিতে তুলে ধরেন।

কয়েকটি ঐতিহাসিক মানচিত্রের মধ্যে---

ব্যাবিলনে প্রাপ্ত ভূ মানচিত্র- যেটিতে ইউফ্রেটিস নদীর তীরে ব্যাবিলনকে আর্বতন করে দেখানো হয়েছে।

অ্যানাক্সিমান্ডারের মানচিত্র- পৃথিবীর প্রথম দিকের আদি মানচিত্রগুলোর মধ্যে এইটি অন্যতম, যা অঙ্কন করেছিল অ্যানাক্সিমান্ডার। এই মানচিত্রে ইজিয়ান সাগর এবং সেই সাগরকে ঘিরে মহাসাগরের এইসব দেখানো হয়েছে।

আল ইদ্রিসি'র মাপ্পা মুনদি- বিপুল মুসলিম মনীষীর মধ্যে বিখ্যাত ছিলেন আল ইদ্রিসি। আফ্রিকা, ভারত মহাসাগর ও দূরপ্রাচ্য বা ফারইস্ট অঞ্চলকে তিনি তাঁর মানচিত্রে ফুটিয়ে তুলে।

ফ্রা মায়োরো'র মানচিত্র- ভেনিসীয় সন্ন্যাসী ফ্রা মায়েরোর প্রণীত মানচিত্রটি একটি কাঠের ফ্রেমের ভেতরে পার্চমেন্টে আঁকা বৃত্তাকার প্লানিস্ফিয়ার।

হুয়ান দে লা কোসা'র মানচিত্র- তিনি ছিলেন স্পেনের বিজেতা৷ তিনি বহু ম্যাপ ও মানচিত্র তৈরি করেছিলেন তার মধ্যে প্রায় অধিকাংশ হারিয়ে গেছে বা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। ১৫০০ সালে প্রণীত তাঁর ম্যাপ বা মাপ্পা মুনদি এখনও রয়েছে, এই মানচিত্রে আমেরিকা মহাদেশকে চিহ্নিত করা সর্বপ্রথম ইউরোপীয় মানচিত্র।

মানচিত্র প্রণয়নে কয়েকজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব--

হাজি মহিউদ্দিন পিরি-- তাঁর পুরো নাম হাজি মহিউদ্দিন পিরি ইবনে হাজি মুহাম্মদ। তিনি ছিলেন উসমানী-তুর্কি সাম্রাজ্যের নামকরা অ্যাডমিরাল বা নৌ-সেনাপতি এবং বিশিষ্ট মানচিত্রকর।

আল ফারগনি- তাঁর পুরো নাম আবু আল আব্বাস আহমেদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে কাসির আল ফারগনি। অবশ্য ইউরোপের মানুষের কাছে তিনি বিজ্ঞানী আলফ্রাগানুস নামে পরিচিত ছিলেন। টলেমির একটি গ্রন্থ 'আলমাগেস্ট'- এর ভিত্তি করে সহজ সরল ভাষায় লেখা তাঁর বিখ্যাত বই 'এলিমেন্ট অব অ্যাস্ট্রোনমি অন দ্য সেলেস্টয়াল মোশান'।

বার্তোলোমে দে লাস কাসাস-- তিনি সরাসরি মানচিত্র চর্চায় অংশগ্রহণ করেন নি বটে, তবে তাঁর দ্বারা মানচিত্র চর্চা উপকৃত হয়েছে। তিনি ক্যারিবীয় অঞ্চলে ব্যাপক ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সবিস্তারে লিখে গিয়েছিলেন।

লেখক এই বইটিতে খুব সুন্দর উপস্থাপনার মাধ্যমে জটিল তথ্য গুলোকে সহজে তুলে ধরেছে৷ ২৭ শে মার্চ আমার জন্মদিনে আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ড. মাহফুজ পারভেজ স্যার এই বইটি উপহার দেন৷ এই বইটি পড়ে ইতিহাস, রাজনীতি, ভূগোলে আগ্রহী পাঠক নিজের জ্ঞানকে প্রসারিত করতে পারবেন এবং নতুন কিছু জানতে পারবেন, একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

তাহমিদ হাসান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস স্নাতক সম্মান শ্রেণির শিক্ষার্থী

;

চা-নগরীতে এক কাপ চা



কবির য়াহমদ
চা-নগরীতে এক কাপ চা

চা-নগরীতে এক কাপ চা

  • Font increase
  • Font Decrease

[চা-শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির ন্যায্য দাবির প্রতি সংহতি]

এখানে-ওখানে জন্ম নিয়েছে ডাইনোসর-টিকটিকি
এখানে-ওখানে জন্ম নিয়েছে বেনামী বৃক্ষরাজি
সবকিছু থমকে যায়, সবকিছু থমকে থাকে জ্যোতির্ময় ছায়ায়।

ঈশ্বর; জন্মে শাপ আছে, কত খেলা-ছেলেখেলা
এ পাড়া, ও পাড়া বাঙময় সুঘ্রাণ, সঞ্জীবনী মায়া
দুই হাতে স্বর্গ-নরক, সুমিষ্ট কল্লোল; বিভাজন।

ভূগোলের পাঠে সমূহ ভুল, আকাশে নরক স্রোতহীন
উড়ুক্কু ভূ-স্বর্গ বাতাসে ভাসে এখানে-ওখানে
তবু স্বর্গ তার কালে নেমেছে ধরায়, ত্রিকোণ পাতায়
সবুজাভ মিহি মিহি ষোল আনা যৌনকলা!

ঈশ্বর তুমি পান করে যাও এক কাপ সুপেয় চা
মানবগোষ্ঠী বারে বারে জন্মাবে এই বৃহত্তর চা-নগরীতে।


তোমার চায়ের কাপে একটা মাছি পড়ুক
তার নিত্যকার অর্জনে হয়ে উঠুক বিষগন্ধি-মৌ
প্রসন্ন বিকেলে একপশলা বৃষ্টি আসুক
ভিজিয়ে দিয়ে যাক সত্যাসত্য ওড়না।

একদিন মেঘকে বলেছিলাম একান্তে
চুপসে দিতে আপাতদৃশ্য সমূহ প্রসাধন
অন্তর্বাসের অন্তর্হিত চেহারা ভাসুক
কোন এক মাছরাঙার ঠোঁটে।

আমাদের ধূম্রশালায় ইদানীং টান পড়েছে
তাই আশ্রয় নিয়েছে সব গার্লস কলেজে
ওখানে নিত্য বালিকার সহবাস-
দৃষ্টিবিভ্রমে কেউ কেউ যায় চোখের আড়ালে।

একটা মাছি ঘুরঘুর করতে থাকুক এক পেয়ালা চায়ে
একটা প্রসাধন দোকানী হন্যে হয়ে ছুটে আসুক মাছির পেছনে
আজ একটা মেঘখণ্ড আকাশে ব্যতিব্যস্ত হোক একপশলা বৃষ্টি হতে

আমাদের চা মহকুমায় আজ বৃষ্টি হোক ওড়নার ওজন বাড়িয়ে দিতে।


মুখোমুখি বসে গেলে এক কাপ চা হোক
অন্তত এক জোড়া ঠোঁটে চুমু খাক নিদেনপক্ষে একটা সিগারেট
আরেক জোড়া ঠোঁটে হাহাকার জাগুক অনন্ত শীতরাত্রির মত।

তোমার ঠোঁটগুলো ক্ষুদ্র অভিলাষী প্রগাঢ় আকাঙ্ক্ষার তরঙ্গ-বঞ্চিত নদী
মোহনা খুঁজে খুঁজে হয়রান হয়, এক ফোঁটা জল, হায়
শেষ কবে ঢেলেছিল জল কেউ- অসহ্য ব্যথার কাল গৃহহীন জনে।

অবনত ইথার মিশে গেছে কাল সন্ন্যাস জীবনে
তবু মুখোমুখি কাল, তবু এক কাপ চা
একটা চুমু হোক চায়ের কাপে, একটা মাত্র হোক আজ অন্যখানে
যারা নেমেছিল পথে তাদের পথ থেমে আসুক পথে
সব পথ আজ মিশে যাবে চাপের কাপে, ঠোঁটের সাগরে।

ওহে ঈশ্বর, তোমার গোপন দরোজা খুলে দাও
প্রার্থনার ভাষা নমিত হোক আজ চায়ের কাপে, ক্রিয়াশীল রাতে।

;

কলকাতায় অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
কলকাতায় অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু

কলকাতায় অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশে বই বিক্রির জগতে বাতিঘর একটি বিপ্লব আনতে সক্ষম হয়েছে। বই বিক্রির পাশাপাশি বইপড়া, চা-কফির আড্ডাসহ নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা এনেছে প্রতিষ্ঠানটি। তারই আদলে এবার কলকাতার কলেজ স্ট্রিটে অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু হয়েছে।

গত ১১ আগস্ট প্রদীপ জ্বালিয়ে বুক ক্যাফেটি উদ্বোধন করেন প্রকাশক সুধাংশু শেখর দে, লেখক কমল চক্রবর্তী, অমর মিত্র, কলকাতা লিটল ম্যাগাজিন গবেষণা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা সন্দীপ দত্ত, বাংলাদেশের প্রকাশক দীপঙ্কর দাস, মনিরুজ্জামান মিন্টু।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন কবি রুদ্র গোস্বামী, প্রকাশক রূপা মজুমদার, বাঁধাইকর্মী অসীম দাস, প্রেসকর্মী দীপঙ্কর, পাঠক তন্ময় মুখার্জি ও সৌম্যজিৎ, নূর ইসলাম, বাসব দাশগুপ্ত, লেখক সমীরণ দাস, সুকান্তি দাস, শুদ্ধসত্ত্ব ঘোষসহ প্রায় ২শ পাঠক।

আয়োজকরা জানান, বুক স্টোর ও ক্যাফে এখন একটি জনপ্রিয় ধারা। সেই ধারায় শুধু নতুন একটি সংযোজন নয়, অভিযান বুক ক্যাফে অনন্য হয়ে উঠল বাংলা প্রকাশনা ও মুদ্রণের ২৪৪ বছরের ইতিহাসকে ফুটিয়ে তোলার মধ্য দিয়ে। প্রায় একশ বছরের পুরোনো ছাপার মেশিন রাখা হয়েছে এখানে। দেওয়ালে দেওয়ালে মুদ্রণ ও প্রকাশনায় অবদান রাখা ব্যক্তি ও সংস্থার ছবি স্থান পেয়েছে। চায়ের কাপে রয়েছে বাংলার প্রথম মুদ্রণের বর্ণমালা।


বাংলাদেশের অভিযান প্রকাশনীর কর্ণধার কবি মনিরুজ্জামান মিন্টু বলেন, ‘বাংলাদেশের বইয়ের বিশাল সমারোহ ও অভিযান বুক ক্যাফের এই পথচলা বাংলা বইয়ের বাজারকে সমৃদ্ধ করবে। শুধু বইয়ের দোকান নয়, বুক ক্যাফে! ফলে শিল্পের অপরাপর মাধ্যমগুলোও কোনো না কোনোভাবে এটাকে যুক্ত করবে।’

দেড় দশক ধরে বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থার উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন কবি ও কথাসাহিত্যিক ড. রাহেল রাজিব। তিনি বলেন, ‘বই বিষয়ক যে কোনো আয়োজন একটি সমাজকে সামনে এগিয়ে নেয়। অভিযান বুক ক্যাফের অবস্থান কলকাতা কলেজ স্ট্রিট হলেও সেখানে বাংলাদেশের বইয়ের সমাহার এবং শিল্পবিষয়ক অপরাপর বিষয়গুলোর সম্পৃক্তি প্রতিষ্ঠানটিকে এগিয়ে নেবে।’

 

;

স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক



তৌফিক হাসান, কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তা২৪.কম
স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক

স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক

  • Font increase
  • Font Decrease

আমেরিকা ভ্রমণে বাঙালির অন্যতম গন্তব্যের একটি হচ্ছে স্ট্যাচু অব লিবার্টি। স্ট্যাচু অব লিবার্টির সামনে দাঁড়িয়ে একটা ছবি না উঠলে যেন আমেরিকাপূর্ণই হবে না! আমেরিকার সিম্বলিক আইকন হচ্ছে এই স্ট্যাচু অব লিবার্টি। ভাস্কর্যটি আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক। তাই বাংলাদেশ থেকে রওনা হবার আগেই গন্তব্য হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছিল নিউইয়র্কের স্ট্যাচু অব লিবার্টি।

পরিকল্পনা ছিল আমার স্ত্রীর এবং তার ছোট বোনের পরিবারের সকলে মিলে একসাথে স্ট্যাচু অফ লিবার্টি দেখতে যাব। কিন্তু ভায়রা ভাইয়ের বিশেষ কাজ পরে যাওয়ায় সিদ্ধান্ত হলো তার এক বন্ধু নীলফামারীর জিএম ভাই আমাদের ড্রাইভ করে নিয়ে যাবে নিউইয়র্কে। যাত্রার দিন ঘড়ির কাটা মেপে জিএম ভাই হাজির, রেডি হয়েই ছিলাম তাই ঝটপট বেরিয়ে পরলাম। পেনসিলভেনিয়ার লেভিট্টাউনে তখন সকাল ৮টা বাজে, বাসা থেকে বের হবার সাথে সাথেই সূর্য মামার ঝাঁজ বুঝতে পারলাম। সূর্য এমন তেতেছে দিনটা যে খুব একটা সুখকর হচ্ছে না তা বেশ বুঝতে পারলাম। বিগত কয়েক বছরের তুলনায় এবারের গ্রীষ্মে বেশি গরম অনুভূত হচ্ছে আমেরিকাতে। স্থানীয়দের মতে এরকম গরম বিগত কয়েক বছরে তারা দেখতে পায়নি। শুধু আমেরিকাতে নয়, এই বছর ইউরোপেও বেশ গরম অনুভূত হচ্ছে আর আমাদের দেশের কথা না হয় নাই বললাম।

লিবার্টি আইল্যান্ড

গাড়ির চাকা সচল আবার কিছুক্ষণ পরেই আমরা আই-৯৫ হাইওয়েতে গিয়ে পড়লাম, এই এক রাস্তা ধরেই প্রায় দুই থেকে আড়াই ঘণ্টায় আমরা পৌঁছে যাবো নিউইয়র্কের ম্যানহাটানে। ৫৫ মাইল বেগে ছুটে চলছে আমাদের গাড়ি আর ঠান্ডা হাওয়ায় বসে আমরা গান শুনছি। হঠাৎ ড্যাশবোর্ডে চোখ পড়তেই খানিকটা আঁতকে ওঠার মতো অবস্থা হলো। কারণ সেখানে উইন্ড স্ক্রিনের তাপমাত্রা দেখাচ্ছে ১০০ ডিগ্রী ফারেনহাইট। কপালে ভোগ আছে তা পরিষ্কার হয়ে গেল। চলতে চলতে প্রায় ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই আমরা নিউইয়র্কের ম্যানহাটান এলাকার ব্যাটারি পার্কে পৌঁছে গেলাম, এখান থেকেই যেতে হবে লিবার্টি আইল্যান্ডে। এবার পার্কিং এর জায়গা খোঁজার পালা। নিউইয়র্কে গাড়ি পার্কিং করা বেশ ঝামেলার তার মধ্যে আমরা গিয়েছে ফোর্ডের ট্রানজিট নামের বেশ বড়সড় একটি ভ্যান। যত প্রাইভেট পার্কিংয়েই যাচ্ছি সবাই না করে দিচ্ছে যে এত বড় ভ্যানের জন্য কোন জায়গা খালি নেই। কোথায় গেলে পেতে পারি সেই হদিসও কেউ দিতে পারছে না দেখে মেজাজ কিঞ্চিৎ খারাপ হতে শুরু করলো। অবশেষে প্রায় ঘণ্টাখানেক পরে আমরা এক পার্কিং খুঁজে পেলাম। গাড়ি পার্ক করেই ছুটলাম ফেরি টার্মিনালের দিকে। জনপ্রতি ২৩ ডলার করে অনলাইনে টিকিট করাই ছিল।  ওই টিকিটে ভাস্কর্যটির উপরে উঠা এবং এলিস আইল্যান্ড ভ্রমণ অন্তর্ভুক্ত।

 

লিবার্টি আইল্যান্ডে যাবার ফেরি

গ্রীষ্মকালে স্ট্যাচু অব লিবার্টিতে প্রচুর পর্যটক যায়। আপনি যদি অনলাইনে টিকিট না করে যান তাহলে ব্যাটারি পার্ক ফেরি টার্মিনালে যে টিকিট কাউন্টার আছে সেখানেও করতে পারবেন কিন্তু ঘণ্টাখানেক লাইনে দাঁড়াতে হতে পারে। আমাদের যেহেতু অনলাইন টিকিট কাটা ছিল তাই আমরা সরাসরি ফেরি টার্মিনাল চলে যাই। মোটামুটি এয়ারপোর্ট গ্রেড সিকিউরিটি সম্পন্ন করে জ্যাকেট, জুতা, ব্যাগ, বেল্ট এবং ওয়ালেট সবকিছু স্ক্যান করিয়ে ফেরিতে উঠার অনুমতি মেলে। ফেরিতে উঠিই তড়িঘড়ি করে ছাদে চলে যাই ভালো ভিউ পাবার জন্য। তবে রোদের তীব্রতায় সেখানে বেশ কষ্ট হচ্ছিল, বিশেষ করে বাচ্চাদের। ফেরি ছাড়ার পর খানিকটা আরাম বোধ হলো বাতাস শুরু হয় বলে। ফেরি ছাড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা পৌঁছে যাই লিবার্টি আইল্যান্ডে বা স্ট্যাচু অব লিবার্টির বাড়িতে। এই ভাস্কর্যটি আমেরিকার আইকনিক সিম্বল হলেও এটা কিন্তু আমেরিকানরা তৈরি করেনি। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ জয়ে আমেরিকানদের বিশেষভাবে সাহায্য করেছিল ফ্রান্স। আমেরিকার স্বাধীনতা অর্জনের ১০০ বছর পূর্তিতে দুই দেশের বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে, ১৮৮৬ সালে ফ্রান্সের জনগণের পক্ষ থেকে ভাস্কর্যটি আমেরিকাকে উপহার দেয়া হয়। ফ্রান্সে পুরোপুরি তৈরি করার পর বিশাল এই ভাস্কর্যটি খুলে ২০০টি বাক্সে ভরে জাহাজে করে আমেরিকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

লিবার্টি আইল্যান্ড জেটি

১৯২৪ সাল পর্যন্ত ভাস্কর্যটির নাম ছিল লিবার্টি এনলাইটেনিং দ্য ওয়াল্ড, পরবর্তীতে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় স্ট্যাচু অব লিবার্টি। ১৫১ ফুট ১ ইঞ্চি উচ্চতার ভাস্কর্যটির ডান হাতে রয়েছে প্রজ্জলিত মশাল এবং বাম হাতে রয়েছে আইনের বই। স্ট্যাচু অব লিবাটির মাথার মুকুটে রয়েছে সাতটি কাটা, যা সাত মহাদেশ এবং সাত সমুদ্র কে নিদের্শ করে। মাটি থেকে মূল বেদি সহ এর উচ্চতা ৩০৫ ফুট ১ ইঞ্চি। ভাস্কর্যটির নাকের র্দৈঘ্য ৬ ফুট ৬ ইঞ্চি এবং এর এক কান থেকে আরেক কানের দূরত্ব ১০ ফুট। মূর্তিটির ওজন প্রায় আড়াই লক্ষ কেজি। ভাস্কর্যটির পায়ের কাছে পরে থাকা শেকল আমেরিকার মুক্তির প্রতীক। স্ট্যাচু অব লিবার্টির ভেতরে দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে একেবারে মাথায় ওঠা যায়। ভাস্কর্যটির মুকুটে রয়েছে ২৫ টি জানালা, যা অনেকটাই ওয়াচ টাওয়ার হিসেবে কাজ করে।

মজার ব্যাপার হলো যে স্ট্যাচু অফ লিবার্টির ছবি দেখলেই সবাই আমেরিকা ঠাওর করতে পারে সেটা কিন্তু আসলে আমেরিকার কথা ভেবে তৈরি করা হয়নি।ফরাসি ভাস্কর ফ্রেডেরিক অগাস্ট বার্থোল্ডি এটির রূপকার। রোমান দেবী লিবার্টাসের আদলেবার্থোল্ডি এই বিশ্বখ্যাত ভাস্কর্য টিডিজাইন করেছিলেন তবে মুখমন্ডলটি ডিজাইনে তার মায়ের মুখের প্রভাব আছে বলে জানা যায়। ভাস্কর্যটির ভিতরের কাঠামো ডিজাইন করতে তিনি বিখ্যাত গুস্তাভ আইফেলের সাহায্য নিয়েছিলেন। গুস্তাভ আইফেল কিন্তু ফ্রান্সের আইকন আইফেল টাওয়ারের রূপকার।

স্ট্যাচু অব লিবার্টি

প্রাথমিকভাবে বার্থোল্ডি ঠিক করেছিলেন তার এই স্বপ্নের শিল্পকর্মকে তিনি সুয়েজ খালের তীরে স্থাপন করবেন এবং সেই মোতাবেক সুয়েজ কর্তৃপক্ষ ও মিশর সকারের সাথে আলোচনার পর ঠিক হলো সুয়েজ খালের তীরেই স্থাপন করা হবে এই ভাস্কর্যটিকে, নামও ঠিক করা হলো 'ইজিপ্ট ব্রিঙিং লাইট টু এশিয়া'। পরবর্তীতে নানা জটিলতায় ভাস্কর্যটি মিশরে স্থাপন না করা গেলে বার্থোল্ডি আমেরিকায় আসেন তার শিল্পকর্মটির একটা হিল্লে করতে।

শুরুর দিকে আমেরিকাবাসীরাও খুব একটা আগ্রহ দেখাননি এই ভাস্কর্য নিয়ে। তবে অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের পর শেষ পর্যন্ত ভাস্কর্যটি স্থাপন করা হয় যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান শহর ও একদার রাজধানী নিউইয়র্কের হাডসন নদীর মুখে লিবার্টি আইল্যান্ডে। আমরা সেই আইল্যান্ডে পৌঁছে ফেরি থেকে নেমেই সারিবদ্ধ ভাবে এগোতে থাকলাম ভাস্কর্য পানে। কাছে গিয়ে ভাল করে দেখতে লাগলাম বিশ্বখ্যাত সেই ভাস্কর্য। ভাস্কর্যটি তামায় তৈরি হলেও বর্তমানে এর গায়ের রঙ বর্তমানে সবুজ আকার ধারণ করেছে। সময়ের আবর্তে  আটলান্টিক মহাসাগরের নোনা জলের ওপর দিয়ে ভেসে আসা বাতাসের সাথে বিক্রিয়ার ফলে তামার বহিরাবরণের এই সবুজ সাজ। ভাস্কর্য চত্বর ভাল করে ঘুরে, মুর্তিটিকে ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে কিছু ছবি তুলে হাঁটা দিলাম এটির মাথার যাবার জন্য। আবারও সিকিউরিটি চেক করাতে হলো। বয়স্ক এবং অপারগ মানুষের জন্য লিফটের ব্যবস্থা আছে সেখানে তবে আমরা সিঁড়ি বেয়েই উঠতে লাগলাম। প্রায় ১০ তলা সমান উঁচু প্যাডেস্টালে পৌঁছার পর আমাদের থামতে হলো কারণ কোভিডের কারণে একদম মাথা পর্যন্ত উঠা বন্ধ আছে যদিও মাথার মুকুট পর্যন্ত উঠার জন্য টিকিট কাটা ছিল আমাদের।

প্যাডেস্টালের ওপর থেকেই মূল ভাস্কর্যের শুরু। সেখান থেকে ভাস্কর্যটির ভিতর দিয়ে উঠতে যাওয়াটা খানিকটা কঠিনই বলা চলে কারণ এর থেকে উপরের দিকে উঠতে হলে বেশচাপা প্যাঁচানো প্যাঁচানো খাড়াসিঁড়ি বাইতে হবে। উপর যাওয়া বারণ বিধায় নিচ থেকে তাকিয়ে উপরের দিকে দেখলাম। গ্লাস লাগানো থাকাতে মোটামুটি অনেকটা অংশ দেখা যায়। প্যাডেস্টালে কর্মরত সিকিউরিটি অফিসার খানিকাটা ব্রিফিং দিলেন এবং বললেন যে এই ভাস্কর্যের ভিতরের কাঠামোর সঙ্গে আইফেল টাওয়ারের খানিকটা মিল আছে। দেখিয়ে দিলেন কোন কর্নার থেকে দেখলে আইফেল টাওয়ারের মতো মনে হবে। প্যারিসের আইফেল টাওয়ার কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে আমার। তাই সিকিউরিটি অফিসারের দেখিয়ে দেয়া অংশ দিয়ে তাকিয়ে ভিতরের কাঠামোর সাথে আইফেল টাওয়ারের বেশ সাদৃশ্য পেলাম।

মূল ভাস্কর্যের ভিতরের কাঠামো

প্যাডেস্টালে বা ভাস্কর্যের পাদদেশে খানিকক্ষণ সময় কাটিয়ে ছবি-টবি তুলে নামার পথ ধরলাম।সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে আমার স্ত্রীর তেষ্টা পেয়ে গেল। নিচে নামার পর পানি খাবে না লেমনেড খাবে জিজ্ঞেস করাতে সে বলল লেমনেড খাবে। অগত্যা লেমনেড তথা খাস বাংলায় লেবুর শরবত অর্ডার করলাম। প্লাস্টিক গ্লাসে অর্ধেক বরফের উপর আধখানা ফ্রেস লেবু, দুই চামচ চিনি আর পানি এই হলো লেমনেড। আমাদের মোট ১১ জনের জন্য বিল আসলো ১৮৬ ডলার। এমনিতেই ভীষণ গরম তার উপর লেবু পানির বিল দেখে গায়ের জ্বালা আরও বেড়ে গেল। নিজেকে আর ধরে রাখতে না পেরে স্ত্রীকে বলেই ফেললাম বাংলাদেশ তোমাকে কখনো লেবুর শরবত খেতে দেখিনি আর এখানে এসে তুমি ১৮৬ ডলার নামিয়ে দিলে। বউ মুখে কিছু না বলে আমার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে থাকলো যেন আমার থেকে বড় কিপ্টে সে জীবনেও দেখেনি। শ্যালিকা আমার পাশে ছিল বলেই সেই যাত্রা রক্ষা পেলাম।

লিবার্টি আইল্যান্ড ঘোরা শেষ, মিউজিয়াম না দেখেই ফেরির পথ ধরলাম কারণ আমাদের পরের গন্তব্য এলিস আইল্যান্ড। ফেরিরে উঠার সময় কাঠের পাটাতনের বাহিরের দিকে স্টিল স্ট্রাকচারের গর্তে প্রচুর কয়েন দেখতে পেলাম। ইউরোপিয়ান-আমেরিকানরা এরকম হাজারো কয়েন প্রতিবছর নানা ধরনের মনোবাসনা নিয়ে পানিতে ছুঁড়ে মারে। এখনেও হয়তো তেমনি কিছু হয়েছে, কিছু অংশ গিয়ে সাগরে পরেছে বাকিটা পল্টুনের স্টিল স্ট্রাকচারের গ্যাপে আটকে গিয়েছে।

ফেরিতে উঠেই আবারো ছাদে চলে গেলাম, সমান্য পরেই চলে আসলাম এলিস আইল্যান্ডে। এলিস আইল্যান্ড একসময় একসময় ছিল অভিবাসীদের  ইমিগ্রেশন সেন্টার। এখানে ইমিগ্রেশন শেষ করে তারা আমেরিকার বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়তো। ১৮৯২ সাল থেকে ১৯৫৪ সালে বন্ধ হয়ে যাবার আগ পর্যন্ত ৬০ বছরে প্রায় ১২ মিলিয়ন অভিবাসীর ইমিগ্রেশন হয়েছিল এই আইল্যান্ডে। অনুমান করা যায় যে বর্তমান মার্কিন নাগরিকদের প্রায় ৪০ শতাংশের পূর্বপুরুষদের মধ্যে কেউ না কেউ এই দ্বীপের মাধ্যমে আমেরিকাতে অভিবাসিত হয়েছিল।

এলিস আইল্যান্ড ইমিগ্রেশন রেজিস্ট্রেশন হল

ইমিগ্রেশন সেন্টারটিকে বর্তমানে স্মৃতিশালা হিসেবে বেশ সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা হয়েছে। ইমিগ্রেশন হল, লাগেজ রুম সহ পুরো ইমারতটি ভাল করে ঘুরে দেখলাম। প্রচুর পিক্টোরিয়াল ডিসপ্লে আছে যেগুলো পড়তে গেলে অনেক সময়ের দরকার। বিল্ডিঙে দুই ফ্লোরে দুটো থিয়েটারও আছে পুরো ইতিহাসের উপর মুভি দেখানোর জন্য। আমাদের সময় কম থাকাতে মুভি না দেখেই ফিরতে শুরু করলাম কারণ ততক্ষণে দিনের আলো কমতে শুরু করেছে।

;