ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'



তাহমিদ হাসান
ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'

ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'

  • Font increase
  • Font Decrease

বইয়ের নাম: মানচিত্রের গল্প

লেখক: ড. মাহফুজ পারভেজ

প্রকাশক: শিশু কানন

প্রকাশকাল: ২০১৮

গল্প পড়তে সবারই ভালো লাগে। যারা ইতিহাস, রাজনীতি, ভূগোলের কঠিন বিষয় ও বড় বড় বই পড়তে ভয় পান, তারাও গল্প আকারে সেসব সোৎসাহে পাঠ করেন। ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প' তেমনই এক গ্রন্থ, যা ভূগোল, মানচিত্র, অভিযান সংক্রান্ত সহস্র বর্ষের ইতিহাস, আবিষ্কার ও অর্জনকে গল্পের আবহে, স্বাদু ভাষায় উপস্থাপন করেছে। এ গ্রন্থ ছাড়াও তিনি মুঘল ইতিহাস, দারাশিকোহ, আনারকলি প্রভৃতি ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব ও বিষয়কে প্রাঞ্জল ভাষায় তুলে ধরেছেন একাধিক গ্রন্থের মাধ্যমে।

ড. মাহফুজ পারভেজ মূলত একজন কবি, কথাশিল্পী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। তিনি ১৯৬৬ সালের ৮ মার্চ কিশোরগঞ্জ শহরের কেন্দ্রস্থল গৌরাঙ্গ বাজারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগে পড়াশুনা করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউজিসি ফেলোশিপে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করে। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগে প্রফেসর পদে নিয়োজিত আছেন।

তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ গুলো মধ্যে আমার সামনে নেই মহুয়ার বন, নীল উড়াল, রক্তাক্ত নৈসর্গিক নেপালে, বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, বিদ্রোহী পার্বত্য চট্টগ্রাম ও শান্তিচুক্তি, রক্তাক্ত নৈসর্গিক নেপালে ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ রয়েছে।

https://www.rokomari.com/book/author/2253/mahfuz-parvez

লেখকের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ গুলোর মধ্যে ২০১৮ সালে প্রকাশিত 'মানচিত্রের গল্প' বইটি রয়েছে। লেখক বইটিকে ১৯ টি অধ্যায়ে ভাগ করছে। বইটির মধ্যে মানচিত্র আবিষ্কার কিভাবে শুরু হয়েছে এবং আবিষ্কারে পিছনে যাদের অবদান ছিল সেই সব বিস্তারিত তুলে ধরেছেন।

মানচিত্র বা ম্যাপ শব্দটি আদিতে ল্যাটিন 'মাপ্পামুন্ডি' শব্দটি থেকে এসেছে। 'মাপ্পা' অর্থ টেবিল-ক্লথ আর 'মুনডাস' মানে পৃথিবী। অতি প্রাচীন সভ্যতায় চীনারা প্রথম মানচিত্র অঙ্কনে যাত্রা শুরু করে, কিন্তু সেই সব মানচিত্রের আজ অস্তিত্ব নেই। বইটির মধ্যে এইসব ক্ষুদ্র তথ্য থেকে শুরু টলেমির মানচিত্র, চাঁদের মানচিত্র সহ আরো অজানা তথ্য গুলো লেখক বইটির মধ্যে তুলে ধরেছে।

লেখক বইয়ের ১৯ টি অধ্যায়ের মধ্যে টলেমির মানচিত্র, ভাস্কো ডা গামা আর কলম্বাসের লড়াই, রেনেলের ' বেঙ্গল অ্যাটলাস', 'আই হ্যাভ ডিসকভার দ্য হাইয়েস্ট মাউন্টেন অব দ্য ওয়ার্ল্ড ', মানচিত্র থেকে গ্লোব ইত্যাদি সব উল্লেখযোগ্য শিরোনামে বইটি সজ্জিত করছেন।

পরিশেষে ১৯ টি অধ্যায়ের মধ্যে শেষ দুই অধ্যায়ে 'পরিশিষ্ট-১, পরিশিষ্ট-২' শিরোনামে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য মানচিত্র এবং মানচিত্র প্রণয়নে কয়েকজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের কথা বইটিতে তুলে ধরেন।

কয়েকটি ঐতিহাসিক মানচিত্রের মধ্যে---

ব্যাবিলনে প্রাপ্ত ভূ মানচিত্র- যেটিতে ইউফ্রেটিস নদীর তীরে ব্যাবিলনকে আর্বতন করে দেখানো হয়েছে।

অ্যানাক্সিমান্ডারের মানচিত্র- পৃথিবীর প্রথম দিকের আদি মানচিত্রগুলোর মধ্যে এইটি অন্যতম, যা অঙ্কন করেছিল অ্যানাক্সিমান্ডার। এই মানচিত্রে ইজিয়ান সাগর এবং সেই সাগরকে ঘিরে মহাসাগরের এইসব দেখানো হয়েছে।

আল ইদ্রিসি'র মাপ্পা মুনদি- বিপুল মুসলিম মনীষীর মধ্যে বিখ্যাত ছিলেন আল ইদ্রিসি। আফ্রিকা, ভারত মহাসাগর ও দূরপ্রাচ্য বা ফারইস্ট অঞ্চলকে তিনি তাঁর মানচিত্রে ফুটিয়ে তুলে।

ফ্রা মায়োরো'র মানচিত্র- ভেনিসীয় সন্ন্যাসী ফ্রা মায়েরোর প্রণীত মানচিত্রটি একটি কাঠের ফ্রেমের ভেতরে পার্চমেন্টে আঁকা বৃত্তাকার প্লানিস্ফিয়ার।

হুয়ান দে লা কোসা'র মানচিত্র- তিনি ছিলেন স্পেনের বিজেতা৷ তিনি বহু ম্যাপ ও মানচিত্র তৈরি করেছিলেন তার মধ্যে প্রায় অধিকাংশ হারিয়ে গেছে বা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। ১৫০০ সালে প্রণীত তাঁর ম্যাপ বা মাপ্পা মুনদি এখনও রয়েছে, এই মানচিত্রে আমেরিকা মহাদেশকে চিহ্নিত করা সর্বপ্রথম ইউরোপীয় মানচিত্র।

মানচিত্র প্রণয়নে কয়েকজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব--

হাজি মহিউদ্দিন পিরি-- তাঁর পুরো নাম হাজি মহিউদ্দিন পিরি ইবনে হাজি মুহাম্মদ। তিনি ছিলেন উসমানী-তুর্কি সাম্রাজ্যের নামকরা অ্যাডমিরাল বা নৌ-সেনাপতি এবং বিশিষ্ট মানচিত্রকর।

আল ফারগনি- তাঁর পুরো নাম আবু আল আব্বাস আহমেদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে কাসির আল ফারগনি। অবশ্য ইউরোপের মানুষের কাছে তিনি বিজ্ঞানী আলফ্রাগানুস নামে পরিচিত ছিলেন। টলেমির একটি গ্রন্থ 'আলমাগেস্ট'- এর ভিত্তি করে সহজ সরল ভাষায় লেখা তাঁর বিখ্যাত বই 'এলিমেন্ট অব অ্যাস্ট্রোনমি অন দ্য সেলেস্টয়াল মোশান'।

বার্তোলোমে দে লাস কাসাস-- তিনি সরাসরি মানচিত্র চর্চায় অংশগ্রহণ করেন নি বটে, তবে তাঁর দ্বারা মানচিত্র চর্চা উপকৃত হয়েছে। তিনি ক্যারিবীয় অঞ্চলে ব্যাপক ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সবিস্তারে লিখে গিয়েছিলেন।

লেখক এই বইটিতে খুব সুন্দর উপস্থাপনার মাধ্যমে জটিল তথ্য গুলোকে সহজে তুলে ধরেছে৷ ২৭ শে মার্চ আমার জন্মদিনে আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ড. মাহফুজ পারভেজ স্যার এই বইটি উপহার দেন৷ এই বইটি পড়ে ইতিহাস, রাজনীতি, ভূগোলে আগ্রহী পাঠক নিজের জ্ঞানকে প্রসারিত করতে পারবেন এবং নতুন কিছু জানতে পারবেন, একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

তাহমিদ হাসান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস স্নাতক সম্মান শ্রেণির শিক্ষার্থী

ধারাবাহিক উপন্যাস 'রংধনু'-৯



মাহফুজ পারভেজ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

[নবম কিস্তি]

মাঝে মাঝে ম্যারির সাধ জানে নতুন জীবনের। আহ! জীবনটা যদি আবার নতুন করে শুরু করা যেতো! ঘুম ভেঙে দেখা মিলতো একদম আনকোরা নতুন একটি সকাল, যে সকাল ভেসে যাচ্ছে অপার্থিব অলীক আলোয়।

ম্যারি জীবনের রূঢ় অভিজ্ঞতায় জানেন, এত আলো ভাল নয়। তবু তিনি নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করেন, “এত কেন দেখো তুমি চোখ?”

তিনি আলোকিত সকাল থেকে চোখ ফেরাতে চান, পারেন না। তার মর্মমূল থেকে উঠে আসছে অদ্ভুত আত্মগ্লানি। কেউ জেনো তার সত্তার কানে কানে বলছে,

“তোমার নতুন করে আজ তবে ফের মৃত্যু হোক! চারপাশে ছেঁড়া-ফাটা উপড়ানো মানুষের বাঁচা আর তার পাশে একা একা অন্ধকার ধৈর্য্যের মতো নিজেকে পোড়াও তুমি ম্যারি, তুমি এক অনাবৃষ্টির বানভাসি, তোমাকে মেরেছে কে? তুমি জানো না, গোপনে যে তুমিই নিহত।”

প্রতিদিন জন্ম আর প্রতিদিন মৃত্যুর চক্রব্যূহে নিজেকে বড্ড অসহায় লাগে ম্যারির। জীবনের উপরিভাগে এইসব মনস্তাত্ত্বিক সঙ্কট মোটেই টের পাওয়া যায় না বাইরে থেকে। কখনো কখনো কেবল চোখের কাঁচে ছায়াপাত ঘটায় অন্তর্গত বিষণ্নতার মেঘ।

অথচ আর দশটা স্বাভাবিক ও সচ্ছল ঘরের মতো একটি পরিবারেই জন্মেছিলেন তিনি। অভাব কী তা কোনওদিন বোঝেননি। লেখাপড়ায় আগাগোড়া ওপর দিকে ছিলেন। জীবনে, যাপনে, শিক্ষায় যে-স্তরে তিনি পৌঁছেছেন, তা বহুজনের কাঙ্ক্ষিত। ঠিক বয়সে বিয়ে হয়েছিল, যদিও নিজের ইচ্ছায়, তথাপি ক্যাভিনও ছিল শিক্ষায় আর সংস্কৃতিতে অসাধারণ।

বছর না-ঘুরতে ম্যারির কোলে এসেছিল টমাস। তাকে যত্নে মানুষ করেছেন ব্যক্তিগত উত্থা্ন-পতনের বিপন্নতাকে পরাজিত করেই। আর বিচ্ছিন্নতা? আমেরিকায় তা এন্তার ঘটছে। সব কিছুর পরেও ম্যারির একার লড়াইয়ে টমাসের শিক্ষা ও জীবনের গতি সূর্যমুখীর মতো যথেষ্ট আলো-ঝলমলে।

কিন্তু জীবনের শেষটা যেমন ভাবা গিয়েছিল তেমনটা হল না ম্যারির। ক্যাভিন জীবনের আলো ম্লান করে দিয়ে আকস্মিক ভাবে চলে গেল। বাড়িতে কেবল মা আর ছেলে। তারপর এক সময় এলেন আরেকজন, ম্যারি মা আর টমাসের নানী। পারিবারিক বলয়ে কিছুটা সঙ্গ পাওয়া গেলো তৃতীয় একজনের। তবু সমস্যার শেষ হয় না। ম্যারির চারপাশের সবাই তাকে ঘিরে নিঃসঙ্গতার মেঘ খুঁজে পায়।

শুধু মা নন, সকলেই বলতে থাকল, দেখেশুনে কোনো ছেলের সঙ্গে একটা বিয়ে করে নাও। বাড়িতে কোনো পুরুষ কর্তা না থাকলে কি শ্রী থাকে! ম্যারির মা মিসেস অ্যানি গিলবার্ট, খোঁজখবরও চালাচ্ছিলেন নিজের মতো করে, উচ্চশিক্ষিত, সম্ভ্রান্ত বংশের সুচাকুরে দু’-তিনটি ছেলের সন্ধানও পেয়েছিলেন।

আচমকা একদিন তার ছিঁড়ল। ম্যারি আটকে গেলেন বাগানের পাইন গাছের সঙ্গে নিঃসঙ্গতার বন্ধনে। পারিবারিক-ব্যক্তিগত বিষয় চর্চা করলেই ম্যারি অতীতমুখী হয়ে পড়েন। স্মৃতির হ্যাঙওভার থেকে বের হতে পারেন না। অথচ স্বাভাবিক, জাগতিক জীবনে তিনি প্রচণ্ড ভবিষ্যতচারী। ক্যারিয়ার ও পেশার ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র থমকে থাকেন নি তিনি। পিছিয়ে পড়ার তো প্রশ্নই আসে না।

শান্ত, স্বিগ্ধ অথচ লড়াকু মানসিকতার জন্য ম্যারি ক্যাম্পাসের অন্যতম আলোচিত চরিত্র। অনেকের পছন্দের মানুষও তিনি। কোনো হতাশা নেই, হাহাকার নেই, বেদনার আত্মপ্রকাশ নেই তার মধ্যে। জীবনকে স্বাভাবিক গতি ও ছন্দে এগিয়ে নিতে বদ্ধপরিকর একজন ‘ঘটনাবহুল অভিজ্ঞতায় জারিত’ মানুষকে কে না ভালোবাসবে! কিন্তু ম্যারি জানেন, গোপনে তার মধ্যে বইছে সুপ্ত রক্তপ্রবাহের নদী। পৃথিবীর আর কেউ যে একান্ত নদীর খোঁজ জানে না।

আচমকাই একজন খানিকটা টের পেয়েছিল ম্যারির হৃদয়ের গোপনতম জগৎ সম্পর্কে। তার নাম ম্যাথু। রোমান যুবকটি ইতালি থেকে নানা স্থানের অভিজ্ঞতা নিয়ে ভাসতে ভাসতে এসেছিল আমেরিকায় ম্যারিদের ক্যাম্পাসে। প্রাচীন রোমান ভাস্কর্যের আদলে মায়াবী মুখ আর পেশীবহুল পৌরুষের মাখামাখিতে ম্যাথু একটানে ম্যারির বুকে তীরের মতো বিদ্ধ হয়েছিল। অদ্ভুত ছিল তার জীবন আর অতি বিচিত্র জীবনযাপন প্রণালী। পাত্র বা প্রেমিক হিসেবে পশ্চিমের অগ্রসর সমাজের তথাকথিত বিবেচনায় ম্যাথু ছিল পরীক্ষায় ফেল করা ছাত্রের মতো অপাঙতেয়। তার তিন কুলে প্রায় কেউ নেই। প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়াও বেশিদূর নয়। ছবি এঁকে তার রোজগার, একটা ছোটখাটো বিজ্ঞাপনী সংস্থায় তার আঁকার চাকরি। কিছু কিছু পয়সা জমিয়ে সে পৃথিবীর নানা প্রান্তে ভ্রমণ করে। ম্যারিদের ক্যাম্পাসে সে পড়াশোনা করতে নয়, এসেছিল মানুষ ও প্রকৃতি দেখতে।

ম্যাথুর মধ্যে ক্যাভিনের প্রচ্ছায়া দেখেছিলেন ম্যারি। তার মনে হয়েছিল, ক্যাভিন আর ম্যাথু একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। এক সময় তার মনে হয়েছিল, ক্যাভিনের অবর্তমানে একমাত্র ম্যাথুই তার একান্ত জীবনে জায়গা পেতে পারে।

ম্যাথুর সঙ্গে ম্যারির নিবিড়তা বাড়ছে টের পেয়ে মাঝখানে দেয়াল হয়ে দাঁড়ান মিসেস অ্যানি। মা হয়ে মেয়ের জীবনের সঙ্গে অনুল্লেখযোগ্য ও নিষ্প্রভ কোনও কিছু জুড়বে, এটা কোনওদিন ভাবনাতেও আনেন নি তিনি। যারা অসফল, তিনি চিরকাল তাদের করুণার নজরে দেখেছেন। এবার মেয়ের জীবনে এমন কাউকে কেমন করে আসন দেবেন, সেটা বুঝতে পারলেন না। পরিস্থিতি হাতছাড়া হচ্ছে দেখে নিজের আচরণগুলোর ওপরেও তিনি নিয়ন্ত্রণ হারান। একটা প্রবল ক্রোধ তাঁকে আচ্ছন্ন করল। প্রায় উচ্ছন্নে যাওয়া একটি ছেলেকে এ বাড়ির জামাতা হিসেবে মেনে নেওয়া দুষ্কর, সেটা জানার পরেও মিসেস অ্যানি মেয়ের মতের বিরুদ্ধে একটি কথাও বললেন না। তবে তিনি ম্যাথুকে চোখের সামনে দেখতেও চাইলেন না।

"বিয়েটা হতেই পারে", বললেন তিনি, "কিন্তু তাঁর পক্ষে তা নিয়ে আনন্দ করা অসম্ভব, স্বীকৃতি জানানো অসম্ভব।" বিশেষত ক্যাভিনের সঙ্গে মেয়ের বিচ্ছিন্নতার স্মৃতি তাকে ক্ষিপ্ত ও আতঙ্কিত করে। ক্যাভিন-সদৃশ্য ম্যাথুকে সামনে রেখে ম্যারির জীবনে আরেকটি ঝুঁকি নেওয়ার কথা তিনি কল্পনাও করতে পারেন না। তিনি মেয়ের বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার উদ্যোগ নিলেন।

সেই থেকে চারপাশটা ধূসর হয়ে যায় ম্যারির। ম্যাথু টের পায় টানাপোড়েনের বিষয়গুলো। ম্যারির নিজেরই তৈরি করা একাকিত্বের বৃত্তের মধ্যে ঢুকতে ঢুকতেও ঢুকলো না ম্যাথু। দুজনের মধ্যে পারিবারিক-সামাজিকভাবে তৈরি হওয়া অদৃশ্য বেড়াটা ভাঙা হলো না আর। ম্যাথু আবার হারিয়ে গেল নিজের জগতে। দুজনের মধ্যে একটা ছোট্ট ফাঁক রইল শুধু। বয়স কম হলে লাফিয়ে লাফিয়ে সিঁড়ি ভাঙার মতো ফাঁকটা ভরে দেওয়া যেতো। কিংবা পেরিয়ে যাওয়াও সম্ভব হতো। সম্পর্কের নিবিড় নৈকট্যে এসেও ‘সম্ভব’কে এক ফুৎকারে ‘অসম্ভব’ করে দিয়ে ম্যারি আর ম্যাথু সরে গেলেন নিজেদের আলাদা বিবরে।

[পরবর্তী কিস্তি আগামী শুক্রবার]

আরও পড়ুন:ধারাবাহিক উপন্যাস 'রংধনু'-৮

;

ধারাবাহিক উপন্যাস 'রংধনু'-৮



মাহফুজ পারভেজ
ধারাবাহিক উপন্যাস 'রংধনু'-৮

ধারাবাহিক উপন্যাস 'রংধনু'-৮

  • Font increase
  • Font Decrease

[অষ্টম কিস্তি]

“এই ছবিতে তুমি যে ঘাসের ওপর থেকে রংধনু শুরু করলে, কী করে তা বাস্তবের কাছাকাছি হবে?”

ম্যারির প্রশ্ন শুনে পল্লবী মাথা ঝুঁকিয়ে তার হাতের পেনসিলটা কাগজে এলোমেলো ঘষতে থাকে। কোনো উত্তর দেয় না। ক্যাম্পাসে পড়তে আসা দক্ষিণ এশীয় তরুণীটির দিকে অপলক চেয়ে থাকেন ম্যারি। পল্লবী মাথা ঝুঁকিয়ে রেখেই একসময় বিড়বিড় করে, “আমি তো কখনো সত্যিকারের রংধনু দেখিনি!”

ম্যারি চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে প্রায় অর্ধস্ফুটে বলেন, “বুঝেছি। তবে আর কী।”

কথাটা বলে ম্যারি নিজের মনে ভাবলেন, মেয়েটিকে এভাবে বলা ঠিক হয় নি। পল্লবী আহত হতে পারে কিংবা তার মধ্যে না-পারার হতাশা আসতে পারে। এটা ঠিক কাজ নয়। শিক্ষার্থীর গুণ জাগ্রত করা তার দায়িত্ব। কোনো কিছু করার এবং পারার পথ দেখানো কর্তব্য। না-পারার বিষয়গুলো মনে করিয়ে তাকে আটকে দেওয়া মোটেও ঠিক হয় নি।

নিজের ভুল বুঝতে পেরে পল্লবীর পাশে বসে হাসতে হাসতে ম্যারি বলেন, “সব সময় বাস্তবকে হুবহু আঁকার দরকার নেই। দেখা জিনিস হুবহু আঁকতে নেই। স্বপ্ন, কল্পনা আর ইচ্ছে মিশিয়ে আঁকতে হয়। তবেই সেটা তোমার একান্ত নিজের সৃষ্টি হবে।”

পল্লবীর ঠোঁটের কোণ বেঁকে উঠতে উঠতেও ফের স্বাভাবিক হয়ে যায়। তার খুশির সঙ্গে শোনা যায় হাতের চুড়ির রিনিঠিনি শব্দ। ম্যারি সন্তর্পণে স্বস্তির নিঃশ্বাস নেন।

অন্য ছেলেমেয়েগুলোর ড্রয়িং খাতা চেক করে ম্যারি খানিকটা আশাহত হন। কিন্তু তিনি সেটা নিজের মনেই লুকিয়ে রাখেন। এদের দোষ দেওয়ার কিছু নেই। সত্যি সত্যি রংধনু তারা দেখে নি। বইয়ে দেখা কিংবা ইউটিউবের রংধনু দেখে দেখে যতটুকু আঁকতে পেরেছে, সেটাই বেশি।

একটি বিষয় দেখে ম্যারি খুবই বিস্মিত হন। রংধনু পৃথিবীর সর্বত্র একই রকম হবে, এটাই বিজ্ঞানের সূত্র। কিন্তু ছেলেমেয়েদের রংধনুতে তেমন ছাপ নেই। আফ্রিকা থেকে আসা সারাহ রংধনু এঁকেছে কালচে আকাশের প্রেক্ষাপটে। চীনের ছেলে লি লালচে আকাশের পটভূমিতে যে রংধনু চিত্রিত করেছে, তাতে সাতটি রঙ স্পষ্টভাবে খোলে নি। ম্যারি টের পান, সবার মনে আলাদা আলাদা আকাশ, যা তারা কল্পনা করেছে নিজের দেশ ও পরিবেশের প্রভাবে। তাই পল্লবীকে আলাদাভাবে দোষ দেওয়া ঠিক নয়। তার রংধনু তারই নিজস্ব পরিবেশ ও অনুভূতির ফসল, যা তিনি এই প্রথম একেকজন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে একেক রকমের দেখলেন। রংধনু অভিন্ন হলেও মানুষের মন আর কল্পনা যে সেটাকে আলাদা অবয়ব দিয়েছে, সেটা দিব্যি প্রকাশ পায় ম্যারির কাছে।

ড্রয়িং খাতাগুলো নিয়ে কোনো নেতিবাচক মন্তব্য করা থেকে বিরত রইলেন ম্যারি। সবাইকে একটিই কমেন্ট করলেন তিনি, “গুড ওয়ার্ক, ট্রাই এগেইন।”

ম্যারি কিন্তু ঠিকই টের পান, ছেলেমেয়েগুলোর কাজে অবচেতনভাবে একটি বার্তাই ভেসে ওঠে, তা আসলে তাদেরই সঙ্কুল পরিস্থিতির প্রতিফলন। যে কারণে তাদের ছবির আকাশগুলো বদলে গিয়েছে। কোনও একটি হয়েছে কালচে, কিছু লালচে কিংবা পিঙ্গল। চোখের সামনের আর্থসামাজিক বাস্তবতাই তাদের অনুভতি ছুঁয়ে ভিসুয়াল রিপ্রেজ়েন্টেশনের গভীরে বিশেষ ভাবে নিহিত রয়েছে। উত্তাল পরিবেশ ও পরিস্থিতিতে যার জন্ম, তার ছবির আত্মদর্শী চৈতন্যের মধ্যে সেই বীজমন্ত্র লুক্কায়িত থাকবেই।

চিত্রকর্ম বোঝার ও বিশ্লেষণের আলাদা চোখ আছে ম্যারির। কারণ, একসময় ম্যারি নিজেই ছিলেন ক্যাম্পাসের চলমান শিল্প আন্দোলনের অন্যতম হোতা। শিল্পকে মানুষের দরবারে পৌঁছে দেওয়ার সেই অবিরত প্রচেষ্টার ফসল তুলেছিলেন তিনি আর তার সঙ্গে এক জেদি যুবক, ক্যাভিন। তাদের চাঞ্চল্যে ক্যাম্পাসের গথিক স্থাপত্যের গম্বুজওয়ালা ভবনগুলো ছুটির দিনের বৈকালিক আড্ডায় গমগম করত। এক শিল্পশোভিত ক্যাম্পাসের উদ্ভাস হতো কবি-সাহিত্যিক-চিত্রকর-ভাস্কর-গায়ক-সমালোচক-সম্পাদকদের ভিড়ে। সঙ্গে থাকতো আর্ট, পত্রপত্রিকা ও বই বিষয়ক আড্ডা। চলতো আবৃত্তি, কবিতাপাঠ, গান ও গল্পপাঠের মশগুল আসর।

প্রায়ই মহান শিল্পীদের ছবির প্রদর্শনী, নতুন উদীয়মান শিল্পীদের কাজ সংগ্রহ, মার্কিন দেশের লিথো প্রেসগুলোর সন্ধান, পুরনো ছাপচিত্রের খোঁজে অহর্নিশ অন্বেষণ ইত্যাদি ছিল তার যাপনের অবিচ্ছেদ অংশ। শিল্প ইতিহাসের সন্ধিক্ষণ তখন থেকেই তাঁর অবচেতনে তৈরি করে ফেলেছিল চিত্রকর্মের এক মহার্ঘ মিউজ়িয়াম।

একবার অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টসের সহায়তায় তিনটি কক্ষ নিয়ে ম্যারির কাজগুলোর একটি প্রদর্শনীর পরিকল্পনা ও আয়োজন করেছিল তাঁরই সাথী ও বন্ধুসম ক্যাভিন। প্রায় দেড়শোটি নানা মাধ্যমের কাজ ও বিবিধ পরীক্ষা-নিরীক্ষার সে এক মহাযজ্ঞ! এই উপলক্ষে তাঁর শিল্প নিয়েই একটি ডকু-ফিল্ম রিলিজ় করে বন্ধুরা। সমালোচকরা বলেছিলেন, অভিনবত্বে একটি আলাদা মাত্রার সংযোজন ঘটেছে ম্যারির কাজে। যেন রূপবন্ধ নতুন ভাবে পুনর্বিন্যাসের ফলে সিম্ফনি ও স্টাইল, বক্তব্য ও বর্ণনা, কম্পোজ়িশন ও ক্যাজ়ুয়ালিটি, মেসেজ ও মেটাফর একে অপরের পরিপূরক হয়ে প্রকাশিত হয়েছে ম্যারির আঁকা ছবিগুলোর পরতে পরতে।

হবে না কেন? ড্রয়িং, ছাপচিত্রের রঙিন পুনর্নির্মাণ, জলরং, ইঙ্ক, তেলরং, গ্রাফিক্স, মিশ্র মাধ্যম, রঙিন পেন্সিল, উডকাট, লিনোকাট, সেরিগ্রাফ, নিউজ পেপার ম্যাটে মিশ্র মাধ্যম, অ্যাক্রিলিক, এচিং, ব্রোঞ্জ ভাস্কর্য— কী করেননি ম্যারি? শিল্পের যাবতীয় নিরীক্ষায় সৌন্দর্যের সবগুলো পথ পেরিয়ে এসেছেন তিনি। তারপর এক সময় নিঃসঙ্গ ও একেলা হয়ে পড়েছেন নিজেরই অজান্তে।

রংধনু নিয়ে অ্যাসাইনমেন্টে ব্যস্ত ছেলেমেয়েদের ছবিগুলোর সঙ্গে মেতে ম্যারির চাপা-শিল্পীসত্তা গুপ্ত লাভাস্রোতের মতো বের হয়ে এলো। সবাই চলে যাওয়ার পর তিনি আলাদাভাবে পল্লবীকে নিয়ে বসলেন। মেয়েটির সঙ্গে তিনি একটি অদ্ভুত নিবিড়তা অনুভব করেন। সবার চেয়ে বেশি সখ্যতাও তিনি বোধ করেন পূর্বদেশের এই মেয়েটির সঙ্গে। ঘরবাড়ি ছেড়ে মার্কিন দেশের ক্যাম্পাসে পড়তে আসা বেশকিছু ছেলেমেয়ের মধ্যে পল্লবী নামের এই তরুণীর জন্য কেন ম্যারি অনেক বেশি নৈকট্য অনুভব করেন, তা তিনি নিজেও ঠিকঠিক জানেন না। এই মেয়েটি পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে নানা বিষয়ে তার সঙ্গে এসে কথা বলে। তার প্রশ্নের ধরণ, জিজ্ঞাসার তীব্রতা ও কথা বলার আন্তরিক সুর ম্যারিকে মুগ্ধ করে। প্রাচ্য দেশের সংস্কৃতিতে বড় হওয়া মেয়েটির মধ্যে অপার কৌতূহল। গান শুনতে আর বই পড়তেও ভীষণ ভালোবাসে সে। ম্যারি প্রায়ই তাকে একমনে লাইব্রেরিতে পড়তে দেখে। বিচিত্র সব বই ইস্যু করে পড়ার জন্য বেছে নেয় পল্লবী। জানাশোনা কিছুটা গভীর হলে পল্লবী কিছু গান প্রেজেন্ট করে ম্যারিকে। গানের কথাগুলো বাংলায় কিন্তু সুর হৃদয়-ছোঁয়া। বিশেষ করে একটি গান ম্যারিকে আচ্ছন্ন করে প্রবলভাবে। গানটির প্রথম লাইন “তোমারও পরাণ যাহা চায়।”

ম্যারি একবার জিজ্ঞেস করেছিল পল্লবীকে, “এতোজন থাকতে তুমি আমাকে তোমার দেশের তোমার ভাষার গান উপহার দিলে কেন?”

“তোমাকে খুব দুখী ও বিষণ্ন মনে হয় আমার। গানগুলো শুনলে তোমার ভালো লাগবে।” কালবিলম্ব না করেই জানিয়েছিল পল্লবী।

ম্যারি ভীষণ অবাক হন। তারুণ্য ও যৌবনের সন্ধিক্ষণের সঙ্কুল পরিস্থিতিতে রয়েছে এই মেয়ে। অথচ কেমন করে তার মনের গভীরে ডুব দিয়েছে মেয়েটি। অলক্ষ্যে আপন হয়ে যাওয়া এমন একটি মেয়েকে মন থেকে ভালো না বেসে পারেন না ম্যারি।

এসব কথা ভাবতে ভাবতে ম্যারি বাস্তবে ফিরে আসেন। পল্লবীর আঁকার সরঞ্জাম গুছিয়ে দিতে দিতে বলেন, “তোমার যেমন ইচ্ছে হয়, তেমনভাবেই আঁকো তোমার রংধনু। আমি সেই ছবির নাম দেবো ‘পল্লবীর রংধনু’।"

উচ্ছ্বল ঝরণার মতো আনন্দে উজ্জ্বল হয় পল্লবীর সমস্ত মুখমণ্ডল। পল্লবী হাসতে হাসতে উঠে পড়ে। আঁকার খাতা আর রঙের বাক্স দু’হাতে নিয়ে সে রওনা দেয় নিজের হোস্টেলের দিকে। যেতে যেতে বলে,

“মিস, আমি তোমাকে একটা চমৎকার রংধনু উপহার দেবো, যা আমি শুধু তোমার কথা ভেবে আঁকবো। আমি নিশ্চিত, তুমি খুবই পছন্দ করবে আমার রংধনু।”

পল্লবীর চলে যাওয়া দেখতে দেখতে ম্যারি একটা ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। পথের শেষে অদৃশ পল্লবীর ছায়াও আর নেই। সেখানে মনে হয় আবছায়ায় দেখা যাচ্ছে ক্যাভিনকে, যে লোকটি জীবনে প্রথম তাকে রংধনুর রঙের অরণ্যে পাগল করেছিল। ম্যারি তার একান্ত ভাবনায় ছেদ টেনে আকাশের দূর দিগন্তে তাকান। তারপর নিজেকে কিছুটা ঘুরিয়ে পশ্চিম আকাশে দৃষ্টি দেন তিনি। ক্যানভাসের মতো রংবহুল আকাশে তখন প্রদোষের আবিরমাখা উল্লাস। এখনই দিবাবসানে হাত ধরে শুরু হবে অন্ধকার রাতের।

ম্যারি অস্তগামী রশ্মির দিকে তাকিয়ে একাকী কি যেন চিন্তা করেন। তার ঘটনাবহুল জীবনের কোনো খণ্ডাংশের ছায়াপাত কি দেখতে পান তিনি আকাশের উদার শরীরে? তার স্থির ও অবিচল দৃষ্টি আটকে যায় অস্তাচলের দূর দিগন্তে। এক সময় তিনি অস্পষ্ট শব্দের মায়াজালে কোনক্রমে উচ্চারণ করেন, “তাঁর জীবনে অস্তবেলার রঙ-টা অন্যরকমও হতে পারত।”

পরবর্তী কিস্তি আগামী শুক্রবার।

আরও পড়ুন: ধারাবাহিক উপন্যাস 'রংধনু'-৭

;

দেশভাগ, স্মৃতি, সত্তা, ভবিষ্যৎ



সুমন ভট্টাচার্য
ইনসেটে লেখক  সুমন ভট্টাচার্য

ইনসেটে লেখক সুমন ভট্টাচার্য

  • Font increase
  • Font Decrease

[৭৫ বছর আগে বাংলাদেশের যশোর ছিল তাঁর অস্তিত্বের শিকড়। সাহিত্যিক নিমাই ভট্টাচার্যের বংশধারার তৃতীয় প্রজন্ম তিনি। কলকাতার সাহিত্য আন্দোলন ও সাংবাদিকতায় ব্যাপৃত তাঁর জীবন। শিকড়ের সন্ধানে ফিরে দেখেছেন স্মৃতি ও সত্তার পদচিহ্ন। বয়ান করেছেন অনুভূতি ও ভবিষ্যতের চিত্রকল্প।]

আমাদের পূর্বপুরুষদের বাড়ি ছিল যশোরের নড়াইলে। এখন বোধহয় বাংলাদেশে নড়াইল একটা আলাদা জেলা হয়ে গিয়েছে। পরে জেনেছি যশোরের সঙ্গে আরো অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব বা রাজনীতিকদেরও একটা শিকড়ের সম্পর্ক ছিল। যেমন ভারতবর্ষের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায় কিংবা পশ্চিমবঙ্গ কংগ্রেসের প্রাক্তন সভাপতি, সাবেক সাংসদ সোমেন মিত্র।

ঘটনাচক্রে আমার পিতৃপুরুষদের ভিটে ছিল যেখানে, সেই যশোরের সঙ্গে আমার মাতুলালয়েরও নাড়ির টান ছিল। অর্থাৎ আমার মায়ের দিক থেকে দাদু, যিনি সাহিত্যিক হিসেবে সুবিখ্যাত, সেই নিমাই ভট্টাচার্যের শিকড় ছিল যশোরে। কিছুদিন আগে আমার বাংলাদেশ প্রবাসী এক বন্ধু, সাংবাদিক এবং চলচ্চিত্র পরিচালক হাসিবুর রেজা কল্লোল একটা ছবি তুলে পাঠিয়েছিলেন, যে যশোরে কোন একটি রাস্তার নামকরণ নিমাই ভট্টাচার্যের নামে করা হয়েছে। সেটা অবশ্যই আমার কাছে বা হয়তো বৃহত্তর অর্থে আমার পরিবারের কাছে যথেষ্ট আনন্দের এবং গর্বের ঘটনা ছিল।

আজ থেকে প্রায় ২৫ বছর আগে যেবার আমি প্রথম বাংলাদেশ যাই, সেইবার যশোর গিয়েছিলাম এবং সেই সুযোগে যশোর শহরের এক ব্যবসায়ী আমাকে আমার পিতৃপুরুষের ভিটে দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলেন। অবশ্যই সেটা একটা আলাদা আবেগের, উত্তেজনার এবং শিহরণ জাগানো ঘটনা ছিল। গত শতকের ৯ এর দশকের সেই সময়েও নড়াইলের ওই গ্রামে এমন কিছু বৃদ্ধ মানুষ ছিলেন, যাঁদের আমাদের পিতৃপুরুষদের স্মৃতি মনে ছিল।

আমি কলকাতায় ফিরে এসে আমার বাবা-মা এবং ঠাকুমাকে যশোরের গল্প বলেছিলাম। ঠাকুমা অবশ্য যশোর গিয়েছিলেন বিয়ের পর। গত শতকের ৩ এর দশকে সেই সময় নাকি কলকাতা থেকে নৌকো করে যশোর পর্যন্ত যাওয়া যেত। সেটা ভারতের স্বাধীনতার অন্তত এক দশকেরও বেশি সময়ের আগের ঘটনা, তাই ঠাকুমার কাছে যশোরের স্মৃতি মাথায় গেঁথেছিল।

আমি প্রায় পঞ্চাশ বছরের ব্যবধানে সেই যশোরে, সেই নড়াইলে ফিরে গিয়েছিলাম এটা অবশ্যই ঠাকুমা, লীলা ভট্টাচার্যকে স্মৃতিমেদুর করেছিল। বাবা এবং মা খুব উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলেন বাংলাদেশে যাওয়ার জন্য, নড়াইল দেখার জন্য। কিন্তু এটা আমার দুর্ভাগ্য, ব্যক্তিগতভাবে অপরাধ যে, সময় এবং সুযোগ করে আমার তাঁদের পিতৃপুরুষের ভিটে দেখাতে নিয়ে যাওয়ার ফুসরত হয়ে ওঠেনি।

বাবার জন্য যন্ত্রণাটা একটু অন্যরকম ছিল। কারণ ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের সময় বাবা যশোর পর্যন্ত গিয়েছিলেন বলে আমায় অনেকবার বলেছেন। আবার কংগ্রেসের রাজনীতির সঙ্গে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকা, সাংবাদিকতার সঙ্গে সম্পর্ক তাঁকে একাত্তরের ওই সময়টায় কোন কাজে সীমান্ত পেরিয়ে যশোর পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছিল। কিন্তু সময়টাই এমন ছিল যে বাবা খুঁজে খুঁজে নড়াইল পর্যন্ত যেতে পারেননি। যশোর পৌঁছেও নড়াইল না দেখার যন্ত্রণা বাবাকে সারা জীবন বহণ করতে হয়েছে। এবং হয়তো সেই যন্ত্রণা নিয়েই তিনি চলেও গিয়েছেন।

আসলে আমার দাদুরা চার ভাইই গত শতকের ২এর দশকে চাকরি নিয়ে একে একে কলকাতায় চলে এসেছিলেন। এবং কোনও আশ্চর্য সমাপতনে দাদুরা চার ভাই গত শতকের ৩এর দশকেই সরকারি চাকরি এবং কলকাতা শহরে নিজেদের মতো বাড়ি করে ফেলেছিলেন। তাই হয়তো যশোরের সঙ্গে দাদুদের নাড়ির টান থাকলেও যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল এবং খুব সত্যি কথা বলতে গেলে কি, আমার ছোটবেলায় দাদু ঠাকুমা কারও কাছেই আমি এই নিয়ে সাংঘাতিক হাহুতাশ করতে দেখিনি।

আজকের ভারতবর্ষের রাজনীতিতে যে বিষয়টিকে কেন্দ্র করে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির উত্থান এবং যে আহত ক্ষতকে উসকে দিয়ে ভারতবর্ষের একটি প্রধান রাজনৈতিক দল নিজেদের জনসমর্থন বাড়াতে চায়, সেই আবেগ কোনদিন আমাদের বাড়িতে ছিল না। স্যামুয়েল হান্টিংটনের 'ক্ল্যাশ অফ দা সিভিলাইজেশন'-এর যাবতীয় তত্বের বিপরীতে দাঁড়িয়ে আমার পরিবার আমার শিক্ষা দিয়েছিল, যে তাঁদের মাইগ্রেশনের কারণ ছিল উন্নততর অর্থনীতির এবং নাগরিক জীবনের সন্ধান করা| ধর্মীয় বিদ্বেষ বা সেই সংক্রান্ত লুকানো ক্ষত নিয়ে কোনওদিন আমি বড় হইনি। দাদু কিংবা দাদুর ভাইরা যশোরের ফেলে আসা জমি পুকুরের কথা হয়তো স্মৃতিচারণে বলতেন, কিন্তু উত্তর কলকাতার বাড়ি, বেলেঘাটার ঠিকানা এবং সরকারি চাকরি নিয়ে তাঁরা কলকাতাতে ভালো ছিলেন। এবং এই মাইগ্রেশনটা সম্পূর্ণ হয়ে গেছিল দেশভাগের অনেক আগে।

এটাও হয়তো সমাপতন যে, পরবর্তীকালে যে মুসলিম পরিবারটির সঙ্গে আমার বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপিত হলো, তাঁদেরও একটা বাংলাদেশের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। ভুল বললাম, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সাতক্ষীরাতে আমার শ্বশুরবাড়ির একটা জমি জায়গা বা শিকড় ছিল। কিন্তু আমার স্ত্রীর দাদামশাই, সৈয়দ সিরাজ আলি যেহেতু জিন্নাহর চাইতে মৌলানা আবুল কালাম আজাদকে বেশি নেতা বলে মানতেন, তাই ভারতবর্ষে অর্থাৎ বর্ধমানে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

এইসব কারণেই হয়তো আমার বড় হয়ে ওঠা থেকে আজ এই হাফ সেঞ্চুরির জীবনে পৌঁছে যাওয়া পর্যন্ত হিন্দু-মুসলিম বিদ্বেষের ন্যারেটিভ কিংবা বাংলাদেশের ফেলে আসা জমি নিয়ে হতাশা গ্রাস করেনি। বাবা তাঁর সোশ্যাল ডেমোক্রেট রাজনীতি দিয়ে জানতেন যে, তাঁর বাবা যশোর থেকে কলকাতায় এসে মাইগ্রেশনের যে সূচনা করেছিলেন, আমি কলকাতা থেকে দিল্লি পৌঁছে হয়তো তার আর একটা ধাপকে সম্পূর্ণ করেছিলাম!

কে জানে আমার পরবর্তী প্রজন্মের কেউ লন্ডন কিংবা নিউইয়র্কে পৌঁছে যশোর কিংবা সাতক্ষীরা থেকে আসা আরেকজন কোনও অনাবাসীর সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতাবে না!

;

একজন নিসর্গী মুশফিক হোসাইন



মোহাম্মদ আলম চৌধুরী
একজন নিসর্গী মুশফিক হোসাইন

একজন নিসর্গী মুশফিক হোসাইন

  • Font increase
  • Font Decrease

মুশফিক হোসাইন জানুয়ারি ৬, ১৯৫৫ সালে চট্টগ্রাম শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগ থেকে ১৯৭৬ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন এবং এরপর ব্যাংকিং পেশায় যুক্ত হয়ে কৃতিত্বের সাথে অবসর গ্রহণ করেন।

শৈশব থেকেই তাঁর মধ্যে প্রাণ-প্রকৃতির প্রতি অনুরাগ ছিল। নিসর্গ প্রেম সম্পর্কে তিনি বলেন,  ‘কৈশোরে একদিন কুয়াশামাখা ভোরে চোখ মেলে দেখি কর্ণফুলীর কোলে সূর্যমামা চোখ রাঙিয়ে হাসছে। দৌড়ে যাই নদীর কূলে। জোয়ারের নোনা জলে দুলছে হারগোজা। লতা-পাতা আর কাঁটার ফাঁকে নীলাভ ফুলেরা। রঙিন পক্ষীকুলের বিচিত্র সুর ও স্বর আমাকে তাদের প্রেমে মগ্ন করে। মৌমাছির রহস্যময় জীবন উদ্ঘাটনে আমি ব্যস্ত হয়ে পড়ি আর বৃক্ষকুল হয়ে ওঠে আমার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ’।

শৈশবের সোনাঝরা দিনগুলোতে প্রকৃতির সেবায় নিজেকে নিয়োগ করেছেন। এখনও অষ্টাদশ বয়সী তরুণের মতো খুঁজে বেড়ান প্রাণ-প্রকৃতির রহস্য। বৃক্ষশিশুর চারা রোপণে নিরলস খেটে যাচ্ছেন। শহরের আনাচে-কানাচে উৎসবহীন পরিবেশে নীরবে রোপন করেছেন অগুণিত বৃক্ষচারা। চট্টগ্রাম কলেজের প্রধান গেইটে সাক্ষী হয়ে মাথা উচু করে দাঁড়িয়ে আছে তাঁর রোপণ করা রুদ্রপলাশ বৃক্ষ। 

পাখিকুলের আবাস ধ্বংসে তাঁর মনে রক্তক্ষরণ হয়। তাই পাখিদের জন্য মাটির কলসিতে বাসা তৈরি করে বৃক্ষ শাখায় বেধে দেন। রাতে ঘুমুতে যাওয়ার আগেই ব্যালকনিতে পানি রাখেন বেড়াতে আসা পাখিদের জন্য।

উপকুল ও সাগর-মোহনার পাখিদের প্রতি বিশেষ দরদ থাকলেও যে কোনো পাখির সুর তাঁকে আকুল করে তোলে। তাই পাখি দেখা ও পাখি চেনার আয়োজন করে নতুন প্রজন্মকে তিনি উদ্বুদ্ধ করেন। চট্টগ্রাম শহরে পাখি উদ্ধারকারীর অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন এ বয়সেও।

মুশফিক হোসাইনের শরীরে বহমান লোহিতকণিকায় প্রকৃতি-প্রেম রয়েছে। তাঁর মাতা-পিতারও ছিলো প্রাণ-প্রকৃতির প্রতি এমন নিখাদ দরদ। তাঁর সাথে প্রগাঢ় আলোচনায় জেনেছি শৈশবে প্রকৃতি-প্রেমে মগ্ন হওয়ার বিশদ কাহিনী।

তাঁরই নিরলস ভূমিকায় ও সম্পাদনায় চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত হয় প্রকৃতি ও প্রকৃতিসংরক্ষণ বিষয়ক প্রকাশনা ‘প্রকৃতি’। অভিজ্ঞতাধর্মী ও গবেষণামূলক এ প্রকাশনা ইতোমধ্যে পরিবেশ সংরক্ষণ আন্দোলনে ব্যাপক ভূমিকা রেখে চলেছে। আমি এ প্রকাশনার সহযোগী সম্পাদক-হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে দেখেছি, বৃক্ষদেহে পেরেকের আঘাত দেখে আবেগ-প্রবণ হয়ে তাঁর অশ্রু-বিসর্জনের দৃশ্য। এ সম্পর্কে তিনি আমাকে বলেছেন, ‘মনুষ্যদেহে যেমন আঘাত ও কষ্ট অনুভূত হয়, বৃক্ষদেহেও ঠিক তেমনি আঘাত ও কষ্ট অনুভূত হয়। উভয়েরই অনুভূতি শক্তি প্রবল। পার্থক্য শুধু একগোষ্ঠীর বাকশক্তি আছে আর অপর গোষ্ঠীর তা নেই’।

বৈকালিক পদচারণায় পরিচিত-অপরিচিত কারো সাথে আলোচনার সুযোগ হলে তিনি অনবরত বলে যান নিমপাতা, জলপাই, বহেরা, আমলকি আর সজনে-ডাটার কথা। চট্টগ্রাম শহরের জামাল খান মোড়, প্রেসক্লাব কিংবা আড্ডারত মুহুর্তে আমি বহুবার এ-দৃশ্যের সাক্ষী হয়েছি। নতুন প্রজন্মের কথা ভেবে এখন তিনি প্রকৃতিপাঠ মঞ্চের উদ্যোগে বিভিন্ন শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে গিয়ে প্রকৃতি ও প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধিতে প্রকৃতি দল নিয়ে সরব রয়েছেন।

‘বেড়াতে গিয়েছি মৃতদের বাড়িতে’ নামে তাঁর কাব্যগ্রন্থে মানব-মানবীর প্রেম যেমন রয়েছে ঠিক তেমনি প্রকৃতি প্রেমও রয়েছে। প্রকৃতির প্রেম ছাড়া কোনো প্রেমই আদতে প্রেম হয় না। মানবপ্রেমের লুকানো ইতিহাস প্রকৃতিতেই রয়েছে।     

প্রকৃতি-প্রেমে ব্যাকুল হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বসন্তে জরা-ক্ষরা আর অশুভকে দূর করার জন্য বাড়ির চৌকাঠে মালা গেঁথে ঝুলিয়ে রাখা হয় ‘বিউফুল’ আর সাথে থাকে তার বোন নিমপাতাগুচ্ছ। যা আমাকে মুগ্ধ করে আর ভালোবেসেছি জলজ পাখি, ফুল, প্রজাপতি ও জলডোরা সাপ। মায়ার বাধনে বেঁধেছি গাছ, পাখির বাসা, ডিম ও ছানা। এই ভালোবাসার নামই প্রকৃতি’।

বীজ, চারাসংগ্রহ ও বিতরণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শ্মশান, কবরগাহসহ পতিত ভূমিতে গাছ লাগানো ও পরিচর্যায় ৬০ বছর ধরে তিনি নিয়োজিত। এ সম্পর্কে তাঁর ঘনিষ্টজন, সহপাঠী ও চা শিল্প-নির্বাহী আমিনুর রশীদ কাদেরী বলেন, ‘মুশফিক হোসাইনের সমগ্র অন্তরাত্মা জুড়ে প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা। বীজের অঙ্কুরোদগম দেখে যেমন থমকে দাঁড়ায় তেমনি পাখির বাচ্চার  উড়াউড়ি দেখেও মুগ্ধ হয় আবার কখনো কখানো বয়স্ক বৃক্ষের দিকে পলকহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে’।

মুশফিক হোসাইন ‘চিটাগাং বী সোসাইটি’র প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে ‘প্রকৃতি’র সম্পাদক, ‘প্রকৃতি পাঠমঞ্চ’- এর এডমিন এবং প্রবীণদের নিয়ে ‘প্রবীন নাগরিক ফোরাম চট্টগ্রাম’ ও মাস্টার্স ৭৬-এর আহ্বায়ক। জনসচেতনতায় পত্রিকা ও সাময়িকীতে প্রকৃতি ও পরিবেশ নিয়ে কলাম ও সচিত্র প্রতিবেদন লেখালেখি করেন। মনন - সৃজন ও বিশ্লেষণের বাংলা মাসিক ‘দখিনা’র ব্যবস্থাপনা সম্পাদকের দায়িত্বরত আর সাময়িকী ও স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ ও সম্পাদনায় যুক্ত।

প্রকৃতি সংরক্ষণে উল্লেখযোগ্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ নিসর্গী মুশফিক হোসাইন ‘সিটি ব্যাংক -তরুপল্লব দ্বিজেন শর্মা নিসর্গ পুরস্কার ২০২২’ এ বৃক্ষসখা পুরস্কার অর্জন করায় তাঁকে উষ্ণ অভিনন্দন।

লেখক: প্রফেসর, রাজনীতিবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

;