কয়েকটি দীর্ঘকবিতা

মাসরুর আরেফিন
অলঙ্করণ কাব্য কারিম

অলঙ্করণ কাব্য কারিম

  • Font increase
  • Font Decrease

আমাজন অ্যালেক্সার প্রতি

উৎসর্গ: ‘অক্ষয় মালবেরি’র মণীন্দ্র গুপ্ত

অ্যালেক্সা, ব্যাড কিড, হ্যালো,
পৃথিবীর বহু কোটি একাকী লোকের সাথে
তুমি যে অবিরাম গা-ছাড়া ভ্রুক্ষেপহীন
ডাম-ডি-ডাম্ব কথা বলো, কেন বলো?
তোমাকে জিজ্ঞেস করে তারা
আজকের আবহাওয়া কত ভালো,
বাইরে আকাশ কি গাঢ় লাল নাকি ঘন কালো?
কিন্তু তা ছাড়িয়ে দূরে নীল মতো
মানুষের ভিড়ে
চলমান ভাপ ওঠার মতো
কিছু কিছু বিষয় দৃশ্যমান থাকে—
যেমন অস্থির কালপ্রবাহ
যেমন আবেগসঞ্চারী কিছু বিহ্বলতা,
সেসব বাদ দিয়ে কী করে ঝড় বাতাস নিয়ে
তোমার উত্তর পূর্ণাঙ্গ হতে পারে বলো?

অ্যালেক্সা যদি পারো বলো—
আউশভিৎস ও বিরকেনাউ একই গ্রামের নাম নাকি,
রায়েরবাজারকে তখন তো গ্রাম বলাটাই ছিল বাকি
আর এখন উড়াল ট্রেনে চেপে গেলে
সেই জায়গাটা কোন স্টেশনে গিয়ে ওঠে,
এবং জ্যাকারান্ডা যে পৃথিবীতে এরকম অবলীলায় ফোটে,
তা কি কখনো শেষ হয় হবে,
ইংরেজিতে প্লেগ বানানে ই ইউয়ের আগে না পরে তবে,
এবং এই এক দেশে কেন তিনখানা ইছামতি নদী?
অ্যালেক্সা বলো,
সেইসব প্লেগ বা অন্য মহামারী যদি
এইভাবে পৃথিবীকে বেড় দিয়ে ধরে
যদি শহরে ঢেউখেলা ছাদে চিকিৎসাগৃহের পরে
ফের, পরে, একসার হাসপাতালই চলে আসে
যা দেখে রিলকে একদিন লিখেছিল
মানুষ এখানে, এইখানে, কোনোদিন কিভাবে
বাঁচতে আসে, ফুহ! কিম্বা ধেততেরি!
কাতিন ফরেস্টে বিশ হাজার
হাহ, জেনে কী হবে মেরি কি তেরি,
পোলিশ সেনা অফিসার
কিভাবে মারা গেল
কিভাবে এনকেভিডি কিভাবে স্তালিন-বেরিয়া
বা অন্য কেউ অত নিষ্ঠুর হতে পারে, হয়,
কিভাবে গাছের শিকড় গাছ বেড় দিয়ে মরে গেল, মরে যায়?
নিচে মাটিতে কিভাবে তারা এখন
মূল গাছ থেকে দূরে
পর্যুদস্ত ভাঙা ভাস্কর্যের মতো, আর
পুকুরের পাড়ে ঘন সান্দ্র পাতার
আড়ালে কোন পাখি ডাকে,
কুয়োর পাশটাতে যার হাঁস ঘোরে সেটা কার হাঁস
কার বিড়াল কাদের গিরগিটি ঘাসের ফাঁকে ফাঁকে,
এবং অ্যালেক্সা বলো,
আমি যে বেলে মাছ ধরলাম বিল থেকে
মাকে এনে দিতে
সেই বিলের নাম বিহারিরা চলে যেতে যেতে
‘ফক্কিকার বিল‘ নাম দিয়ে গিয়েছিল কেন?
কেন পারম্পর্যহীন হাওয়া,
কোনো স্থির বিন্যাস ছাড়া, আহা, চারদিকে ওড়ে
আমি চোখে অন্ধকার দেখি
সেসব অন্তঃসারশূন্য পথে পথে—
অ্যালেক্সা,
সেই ধুম্রকেশী পথের নাম বলো,
বেড়াবেনী জুলফিওয়ালা পথ চুলের ফিতের মতো
বাতাসের মত্ততা ভরা, দিনে সুনশান
আর বিকেলে সেটা হতে হতে হচ্ছে এমন জাফরান।

বলো অ্যালেক্সা ঝড়, পৃথিবীকে থাবা দিয়ে
চিবুকে রক্ত লাগা টকটকে যেই ঝড়,
তার নাম কে দিয়েছে তুফান, কে দিয়েছে আন্ধিয়া?
বিহারিরা বলতো ‘দিন-কি পুরিয়া’—
ইমনভুপালি, শাহানাও হতে পারে!
কী এই কালের প্রবাহ, এই এভাকুয়েশন,
সাতপুরুষের ভিটে ছেড়ে যাওয়া?
এই-ই কি অতিবাহিত সময়ের ঘনীভূত দ্রুত সঞ্চালন?

অ্যালেক্সা দেখি বলো, মানুষের আয়ু
সময়ের আস্তানার পাশে
আনুষঙ্গিক এক লহমার ফাঁসে
আটকানো ঘোড়ার লাফের মতো কেন?
কেন অন্য মাত্রা পেল তাই শুশুকের উঠেই ডুব দেওয়া?
কেন এ কথাটাই বলেছিল আমার বেঁচে থাকতে পিতা
তার নিজের ডুবের আগে,
যে হে পুত্র তুমি তোমার অ্যালেক্সাকে বলো—
বাতাস ঝির ঝির করে বইছে কিন্তু দূরে
ওই প্রতীক্ষাটুকু কী ক্ষিপ্রগতি ঘুরছে ঠকিয়ে
আসছে এইদিকে ঘুরে ঘুরে
নিজস্ব একতরফা-করা তালিকা অনুসারে!
ঘুরুক, পিতা বলেছিল, ওকে শুধু জিজ্ঞেস করো,
কেন দূরে হেমন্তের ছাড়া-ছাড়া বন অকারণে—কিম্বা ওটাতেই সব কারণ মাখা—দিগন্তপ্রসারী?

অ্যালেক্সা, যদি পারো আমার এই
সাময়িক বিশেষ চৈতন্য নিয়ে বলো—
বলো আমাদের মাঝে অমর কেউ আছে নাকি
আর মানুষ কোথায় যায়—কোথায় কোথায়
মানুষের চেতনা হারায়,
তারা জীবিত যখন আর যখন মৃত...

এবং কপোতাক্ষ নদী কিম্বা নদ
বলো কারা কারা সেইদিন আমার সাথে ছিল
যেইদিন মাইকেল মধুর আলোয়ান দেখা হলো,
তারপরে কপোতাক্ষেরই নিচে
ব্রোঞ্জের রঙ সবুজ হয়ে আসা
ব্রিটিশ সাবমেরিন
আর কিভাবে তার গায়ে মহাকাব্যিক মন্ত্রপূত প্রেত
টলমল ঝুলে ছিল রাবণের ছায়া ছায়া রঙ,
বড় হা, দাঁত, সব নিন্দনীয় কাজের সংকেত?

অ্যালেক্সা, যুদ্ধ কি বাস্তবেই হয়েছিল,
বাস্তবেই অগ্নিশালায় কুশাসনের ওরা
কথা বলছিল ক্রুজার ডেস্ট্রয়ার নিয়ে?
তুমি সেই নদীর নামটুকুই জানো
কপোতাক্ষ সেটা,
দেখি ক্রুজারের নাম কী ছিল বলো,
সেই সাবমেরিন সেই টর্পেডো-বুলেট...
তোমার কথামেশিনও কি ওদেরকে ডাকে ‘কমরেড’?
ওকে!
দেখি বলো তাহলে তোমার ওই একঘেয়ে সুরে একটানে
এই জীবনের মানে,
প্রতি ভোরে পৃথিবী শীত শীত হয়ে এলে
কাঁথার নিচে লুকিয়ে কেন সবচাইতে ভালো
বোধ হয়—
আবার হায় ফের একটা দিন
অন্যের সূত্রমতো বাঁচা শুরু করতে হবে, এই ভয়?

আর তখনই কিনা তোমার ‘গুড মর্নিং’,
তোমার ‘সুপ্রভাত’,
তোমার ‘আজকের দিনটা যাক ভালো’,—
আর তখনই,
যখন ঘাসে ঘাসে জেগে উঠছে ময়াল সাপগুলো,
ছোট সৈন্য লাইকাওন ভোরের আলোর নিচে
দু টুকরো হয় হতে বাধ্য বীর একিলিসের কিরিচে
—চিরকাল?
এই একই মৃত্যুদৃশ্য সেই হোমারের কাল থেকে,
তবু তুমি বলবে যে, ‘এক নতুন দিন শুরু কাল’!
আহা, এই কথা তুমি,
মেশিন লার্নিংয়ের এই গান,
কিভাবে পুরোটাই
তোমার ক্লান্তি থেকে বলছো দিনমান।

বলো দেখি এরকম
এবং আরো যত রকম সকম আছে সেরকম
যত বর্শা ও তরবারি,
সব না হলেও কিছু তো অ্যালেক্সা বোন তুমি, নারীকণ্ঠ,
তাই তোমাকে প্রহেলিকাও সম্ভবত বলতে পারি,
বলো তুমি
কিছু তো জীবনের তাৎপর্যটুকু নিয়ে বলো,
যে কোথায় খোদা থাকতে পারে
এবং কেন মানুষের এইরকম ক্ষুধা
এই আপাতব্যাখ্যাহীন যার শক্তি তারই বেঁচে থাকা?
অ্যালেক্সা ধুর, যাক তবে সেক্সটক করো,
আহহ-উহহ-করো-ধরো এইসব বিপ্লবী কথা
এই বিপ্লবীসত্তা এই বিশ্বাসঘাতকতা;
এবং অগ্নিযুগে (অগ্নিযুগই বলে একে)
তুমি আমি একই রূপ, ডান কিম্বা বাম
টুইডলডি ও টুইডলডাম।

তো, অ্যালেক্সা বলো, খেলনা পুতুলের নাম তুমি,
আমাকে আরেকবার ভোরের নদীর কথা বলো
আরেকবার যে পাখি নির্লিপ্ত ডাকে বলো তার নাম
যে নদী সে কি শান্ত ইছামতি
আর তাতে যে গান তা কি ভাটিয়ালি
এবং যে ঢেউ তাতে কিসের হিজিবিজি
এবং পাখিদের আবহসঙ্গীতে
কাদের কুশপুত্তলিকা দাহ
তাই তাতে তাই তাতে পানিতে সলিলে ও জলে,
কোন মেঘের লাল মেশা অগ্নিপ্রবাহ?

তুমি কোনো বনের কিনারে

ধরো সন্ধ্যাবেলায়
তুমি কোনো বনের কিনারে
আকাশ সহিষ্ণু আর তার রক্তিম ছায়া
মিশে গেছে গাড়িটির কাচে
তোমার পাশে জায়া, সংসারসঙ্গিনী
জায়গাটা গাজীপুর, রাজেন্দ্রপুরও হতে পারে
কিম্বা কাপাসিয়া—
একটা হবে কিছু হবে ওদিকেই,
তাতে তফাৎ হয় না কোনো, কারণ চারপাশে
ঘন বন শালবন বনতুলসী অলীক কুচফল,
পারুল জারুল ইত্যাদি আর অর্জুন
ওহ, মাটি কী রকম তৃণাচ্ছাদিত এবং অর্জুন—
চিরায়ত প্রতাপশালী দানব আকৃতি।

ধরো সব মিলে শান্তি মিশে আছে বুকে
আর আজকের দিনটাকে “ভালো গেল” বলে পত্রপল্লব ধরে পাখির চিৎকারে
বলা যায় সময়টা এত শান্তির এতটা মায়াভরা যে তোমাদের নিজেদের এ-পৃথিবীতে লাগছে
আতিথ্য-পাওয়া পথ খুঁজে পাওয়া
দুই আদম-হাওয়া
আর গাড়ির স্টেরিওতে গুন্ডেচা ব্রাদার্স জোরে
রাগ শ্যামকল্যাণ জয়জয়ন্ত
বাইরে শান্ত স্থির সব যদিও যথেষ্ট কলকাকলিত
আকাশ স্বচ্ছ ও পাখিরা সে আকাশে শামিয়ানা মতো,
এতো পাখি—হতে পারে সময়টা গোধূলি,
হতে পারে সন্ধ্যাবেলা, হতে পারে শেষ বিকেল কিম্বা মঙ্গলা রাত্রির শুরু,
সময়, এসব সময় এমনই আঠা আঠা মতো
সুল ফাখতা...
আর তোমার যে হাত ধরে আছে, বড় রাস্তা থেকে গাড়ি ধাপে ধাপে কেঁপে
এদিকটায় নেমে যাবার স্বনিত শব্দমুখরিত মুহূর্তটা থেকে যে তোমার আধা ঘণ্টা হাত ধরে আছে,
ধরে ছিল, তুমি গাড়ি চালাচ্ছিলে,
চালাচ্ছো এখন ধীরে উদ্দেশ্যবিহীন
সে বলল তোমাকে যে কতদিন
দুইজনে এভাবে ঘোরোনি উদ্দেশ্যবিহীন
তাই কী হয় যদি আরো দূরে চলে যাই বনের ভেতরদিকে
যেখানে সন্ধ্যা নামছে তো
পাখিরা আসছে তো ফিরে
প্রকৃতি এখানে সুন্দর খুব সুন্দরের থেকে বেশি গাঢ়, দ্যাখো দ্যাখো দুটো খরগোশ চলে গেল দূরে
দৌড়ে পালিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে কী রকম
পানিতে হাঁস ডুব দেবার মতো।

আর তখনই দেখলে তুমি
যখন গাড়ির চারপাশে গাছ ঘন পাতা
পথ যেন বাঙময়—শাল-অর্জুনদের
অলৌকিক সরসর-পা-চালানো গুঞ্জরণ তোলা
সরু গলি, মাটিতে পাতার কার্পেট পাতা—
ঠিক যখন তার এইভাবে হাত ধরা দেখে
মনে হচ্ছিল জীবন তবে কাটিয়ে দেবারই মতো কিছু, যেমন সংসারে নিয়তই ভাবো
জীবন ওভাররেটেড, তা সত্য নয় মোটে,
একসাথে থাকা কষ্ট নয় অত,
আর যাই বলো বাচ্চাও তো আছে,
এমনকি বিড়ালও এবং তানসেনের সিডি
আর আনুশকা শঙ্কর তার বুক উঁচু পোস্টারসহ
আর যথেষ্টই কবিতার বই, পর্যাপ্ত পুরাণও
যেমন কালেভালা এমনকি কালেভালা
এবং গোপন ড্রয়ারে যা থাকার কথা তাও—

ঠিক তখন তোমার সঙ্গিনী তোমার হাতে
নখ বসিয়ে দিল, ভয়ে,
তুমি শুনলে এক ছুরির ধারের মতো
চোখা আর্তচিৎকার
এবং তোমার হাত বেয়ে জিব্রাল্টার
অসফিয়েনচিম মিউনিখ মনে পড়ে গেল
এক মুহূর্তমতো—
রক্ত গড়াল গিয়ারবক্সের দিকে,
গাড়িতে স্পষ্ট সালফার, ক্রুরগন্ধ
আর গাড়িতে বেশ কটা টোকা
গাড়ি এক বাঁকে ঘোরার দরকার থেকে
দাঁড়ানোই ছিল আর এরা দুজন ষণ্ডা যেন
উমাকান্ত গুন্ডেচা রামাকান্ত গুন্ডেচা নাকি
এবং দেখলে যে আর একজন রোগাপটকা
দূর থেকে হেঁটে আসছে তাদের দলপতি
হাতে তার সস্তা চিয়াপ্পা এম-নাইন-টুয়েন্টি-টু
মানে যা থাকে ঢাকার আশপাশে
উপশহরের গরিলাদের হাতে—
বেরেটার নকল ভার্শন
প্রথম শটে যা ডবল অ্যাকশন
পরেরগুলো এক রাউন্ড করে;
সময়ের সাথে মিলিয়ে সহিংসতা নিয়ে
ব্যক্তিগত নেশা থেকে জেনে গেছো
কিসে কে কিভাবে মরতে পারে—

ওই তার হাতে চিয়াপ্পা গাড়ির আলোয় স্পষ্ট
আসছে সে এইদিকে
জিজ্জি, নোভাক স্টাইল ফাইবার অপটিক সাইট
জিজ্জি, কালো প্লাস্টিক গ্রিপ
তোমার মনে হচ্ছে হতে পারে তোমার স্ত্রীর নাম
হতে পারে তার নাম ইয়াসমিন জেসমিন নাসরিন কিম্বা বকুল
আহ, কী করে তার নাম হয়ে যাচ্ছে ভুল?
কতখানি আতঙ্কিত তুমি, এক্ষুনি কত খুশি ছিলে কারণ এভাবে বেড়ানো হয় না বহুদিন বাচ্চাদের ছাড়া শুধুই দুইজনে এবং ওই দলপতি ধরো
বলে দিল চিয়াপ্পা তোমার মাথার সাথে ধরে
যে চারদিকে বিশ মাইলের মাঝে
পাখি ও কিছু দিকভ্রান্ত এই বা সেই পশু ছাড়া
আর কিছু নেই অতএব আপনি চলে যান
আর আপনার বান্ধবী, স্ত্রীও হতে পারে,
মাফ করবেন আজ রাতটা এখানে থেকে যাবে
আমরা বড় একা এবং কাল দুপুরের দিকে
মাফ করবেন এই কালো মেহগনি, এক শাল
ও দুই ইন্ডিয়ান রোজউডের ত্রিভুজটার মাঝে
তাকে পেয়ে যাবেন ভালো আছে ভালোভাবে
বৃত্ত হয়ে
আর গাড়ির স্টেরিওতে তখন গুন্ডেচা শেষ
তখন আসগেইর এইনারসসন তার বিখ্যাত ‘গোয়িং হোম’ নিয়ে, সম্ভবত সংসার নিয়ে
বলছে যে এটা কত বড় বোঝা
এর ওজন সবচেয়ে বেশি
এর ওজনের ভার
এবং গানের এই করকোষ্ঠীবিচারের কথা শুনে
সে হাত ছেড়ে দিল, ধরো,
যদিও রক্ত তখনও প্রবাহিত
মধ্যপদলোপী কী এক কী জিনিসের ফেরে
ভালোই একা থাকা তবে কি ধরো শুরু হলো তবে?

রাত অনিঃশেষ

রাত অনিঃশেষ, রোববারের রাত
আর সব রাত্রিরই মতো
কক্ষপথ তার ধীর ও নির্ধারিত—
এখনো বাচ্চারা শুতে যাওয়া দূরে থাক
রাতের খাওয়াই তারা শেষ করেনি ভালোমতো,
এখনো গান বাজছে তাতে
জোরে শব্দ করে গান বাজে যাতে,
সেখানে গলায় বেদনা ভরে
গায়ক বলে যাচ্ছে ইয়াসগার্স পার্কের কথা
মানে উডস্টক ফেস্টিভ্যাল খুব মিস করছে কেউ,
এখনো রাত অবধারিত গাঢ় হওয়া বাকি,
এখনো দূর থেকে দূরে কুকুরগুলো ঘেউ ঘেউ
শুরু করেনি গভীর রাতে তারা যেটা করে
ভোর আর হবে না এই ভয়ে,
এখনো আমার ব্যক্তিগত রাত নিয়ে ভয়টুকু
শুরু হয়নি মনে,
যে এই বুঝি নির্ঘুম রাতের প্রগাঢ় কোনো ক্ষণে
কারো জোর চিৎকার শুনব কোথাও চাপা স্বরে,
যেন কোনো বাইসন পড়ে যাচ্ছে পাহাড়ের থেকে যেভাবে সাধারণ বড় পাথর খণ্ড হেলে পড়ে,
আর এখনো জেসাস ক্রাইস্ট (যত যাই বলো
তার চেহারাটা বেশ ভালো),
পৃথিবীর অন্যপাশে এখনো তাকে,
তেত্রিশ বছরের এই পাগল ছেলেটাকে,
ঝাড়ামোছা করাই শেষ হয়নিকো,
পশ্চিমে রোববারের প্রার্থনার আগে—
তার মানে আমাদের এইখানে এখনো সময়
থেমে আছে রাত দশটা বা দশটা দশের দাগে।

তাহলে কিভাবে তা হয়—
কিভাবে হিসাব মেলে সন্ধ্যা যে কত দূরে ছিল, কত আগে!
কেমন সন্ধ্যা ছিল এটা আজ?
আকাশে অ্যানড্রমিডা অরিয়ন কিছুই দেখিনি তো,
আকাশ ক্রিমসন ছিল, আকাশ মার্বেলের ভেতরটার মতো;
তাই আজ মনে হচ্ছিল আদতেই কোনো সন্ধ্যা নয়,
বরং অন্য কিছু নাম, মারাত্মক অন্য কোনো নামে তাকে ডাকা যেত।
যাহোক, ডাকিনি, তবে তার মানে
অত দূর সন্ধ্যার পরে
তার মানে এখনো সময় বেশি যায়নিকো।

রাত তাই নিশ্চিত আজ অনেক লম্বা ও বড়,
তবে তুমি বিষয়টাকে দীর্ঘ যেহেতু বলো,
তাই দীর্ঘই বলতে পারো।
আমি বলতে চাই কেবল এই কথাটুকু—
আমি তোমার মন পড়তে পারি, মন পড়তে থাকি,
ভাবি কী কী তুমি দেখেছো এই পৃথিবীতে
আর তোমার আরো কী কী দেখা বাকি;
তোমার চোখে চোখ রেখে যেমন বলতে পারি:
রাত আসলেই অনিঃশেষ, রাত এক অতল রাস্তার সিঁড়ি,
আর দেখো আমাদের শেষটা আসবে শিগগিরই,
এবং খেয়াল কোরো মানুষ মরে না দল বা জোড়া বেঁধে—
মরে সে একাকী, একাকীই দেয়
স্তব্ধতার বাঁকা ও অমল সেতু পাড়ি;
মৃত্যু একজন করে করে যার যার জন্যই আসে,
আর এ-নিয়ম ভালো না খারাপ তা সম্ভবত
লেখা থাকে জেসাস ক্রাইস্টের মতো লোকদেরই
শ্বাসে ও বিশ্বাসে।

বাইরে কি রাত ঘন হলো?
কোনো বিড়াল পড়ল কি স্লিপারি এলম্ গাছ থেকে?
প্রশ্ন থেকে যায় এই বিদেশি গাছগুলো
কিভাবে ও কোথা থেকে ঘর ছেড়ে এলো?
যাক, বাইরে বিড়াল পড়ল সেই স্লিপারি এলম্ গাছ থেকে—
আহা, দ্যাখো, স্লিপারি এলম্ বলো যাকে
সে তার নামের মধ্যেই কিভাবে বদনাম নিয়ে থাকে।
তো, বাচ্চারা বড় হচ্ছে কত পিচ্ছিল লোকদের মাঝে,
পৃথিবী ঘৃণার কারখানা, জুডাস ব্রুটাসে
কে এই ঘর যথেষ্ট ভরে দিল?
বলবে যে তোমার বাচ্চাদের পৃথিবীতে
জন্ম দেওয়াই তাহলে ভুল ছিল!
তবু মানুষ মানুষের জন্ম দেয় সব জেনেবুঝে।
মেরির কথা অতএব মনে পড়ে গেল—জিসাসের মাতা—
জিসাস বুঝেছিল, তার চেহারাটা নিঃসন্দেহে ভালো, সে বুঝেছিল কী বলতে চাচ্ছি আমি
সে সেটা ভালোই বুঝেছিল।

লেখা শেষ হয়ে আসে, আমার চোখ রক্ত লাল
রাত দশটা তাহলে পার হয়ে গেছে,
মুনিয়া পাখিগুলো ওইভাবে কেন কাঁপে?
স্বপ্নে একসাথে দল বেঁধে একই লোভী বিড়ালটাকে দেখে?
কিম্বা টিভিতে দেখা—ওরা কি আর অত কিছু বোঝে!—মাতাল হায়েনা বা খুনি এলিফেন্ট সিলও হতে পারে,
সত্যি মুনিয়া পাখিগুলো সারাদিন এত টিভি দ্যাখে!
আর আমরা দুজনে একসাথে
দেখি, দেখেছি এ পৃথিবীর এমন সব কিছু,
এমন জিনিস কিছু কিছু, যা না দেখলেই ভালো হতো—
যেমন সে দেখেছে আমার গোপন চিঠি
যিশুর কাছে লেখা, কোন মুহূর্তের ভুলে,
যে জুডাসই ত্রাতা, তুমি বাচ্চা ছেলে,
মাথা ঠান্ডা করো
জুডাসই তোমাকে বানাল এত বড়,
এবং যে আমরা সকলেই যাব একা একা
সকলেই শেষ হবে আলাদা আলাদা করে, কোনোভাবে দল বেঁধে নয়,
এটাই লেখা ছিল জুডাসের তিরিশ মুদ্রার গায়!

হেইল মেরি, তোমার ছেলে ক্রুশকাঠে ঝুলে
মুক্তি নিয়ে এসেছিল আমাদের চরাচর
দেখবার চোখে,
রাতও যথেষ্টই হয়ে গেল, চোখ লাল এবং ভারী
এবং অন্ধকার প্রগাঢ় হতে হতে সামান্য আলো
যখন তিরোহিত, যখন আঁধারে অসংখ্য
ট্রিগার ও অসংখ্য তরবারি,
তখন তেত্রিশ বছরের এই বাচ্চা ছেলে,
তার মোমের মতো ত্বক, আমাদেরকে নাচাল এমনভাবে যেন আমরা ছেঁড়া ঘুড়ি;
এই রাত অনিঃশেষ—আমাদের শেষটা আসবে শিগগিরই।

জেসাস ক্রাইস্ট, হাহ্, তার চেহারাটা ভালো,
এমন দেখতে যে মনে হয় তাকে আমি তাকে
চাইলেই বাঁচাতে পারতাম তার ভেড়াগুলো সহ,
আর সবকিছু যা ভালো তা ঘটছে অন্য কোথাও
এই পৃথিবীতে নয়, এই পৃথিবী দুর্বহ—
এখানে রাতের বিছানায় সাথে কেউ নেই
রাত কঠিন যায় একা, সাথে কেউ থাকলেও।

পশুগুলো ডেকে উঠল দ্যাখো

মেলার রাস্তায়, ষাঁড়জবাই হয়ে যাচ্ছে মেলার রাস্তায়।
এখন এই পংক্তি টেনে বড় করো,
যাতে এর পেছনে চলে আসে স্কুলবালকদের নেশা—রক্ত দেখার;
আর আসে হেডমাস্টার এবং তার নালিশ যে,
সময় প্রস্ফুরিত, সংক্ষুব্ধ, থরোথরো।

“পশু-মারা রাস্তার পাশে জীবনের ব্রহ্মজ্ঞান
ঘটে”...

এই তো পংক্তি এসে যাচ্ছে বেশ!
এর কথাই বলা হয়েছিল,
সেইসাথে বেঞ্চি ও নীলডাউনের কথা,
বলা হয়েছিল এখানে শত্রুতার বিষয় নেই কোনো,
আছে ছাত্র-শিক্ষক মিল,
আছে স্কুলের নীলরঙ বাস,
আছে বালকের লালাগ্রন্থি যাতে
এই তো চকলেটের শেষটা মাখামাখি,
এই তো হলুদ মসকেটগুলোয় ফুল
এই তো গোল-পাতা ডগউডগুলি, ঝনঝন, রীতিমতো—
এই তো লিবার্টি রোড, আকাশ কুণ্ঠিত!

এই এত আবেগের ঢেউ,
এত সান্ত্বনার কথা,
নিজেকেই বলছি তবু ভালো লাগছে না কিছু।
কারণ, ছাত্রকে দেওয়া
প্রতিজ্ঞা রাখেনি কোনো শিক্ষকের কেউ—
নীল বাস খাকি হয়ে গেছে,
ধ্যাবড়া-জ্যাবড়া মতো সেটা,
আর এই শাস্তি, এই শীত, এই স্ফীত বিস্তারিত
শীত—শৈশবে কথা ছিল না এটা।

তুমি তার চেয়ে আমাকে তোমার বাসায় নিয়ে চলো
সেখানে অন্তত নীরবতা ভাগ করে বসে থাকা যাবে।
এই তো মনে হচ্ছে নীরবতার থেকে
আবর্জনাহীন আর কি কিছু আছে?
মনে হচ্ছে পড়ে যাব,
মনে হচ্ছে কপালে বেত্রাঘাত-ভর্ৎসনা-অগৌরব লেখা,
মনে হচ্ছে লেন্সের মধ্য দিয়ে যেন পৃথিবীকে দেখা—
ষাঁড় ও ষাঁড়ের চিৎকার,
পনেরো কুড়ি লোক,
তারা আছে মানবমোর্চার ন্যায়ানুগ সাজে,
তবে তাদের বিপরীতে একটাই ষাঁড়, এবং
এবং—এই তো মনে হচ্ছে—ড্রাম বাজে বাজে।

সত্যি এসবই এড়াতে চেয়েছি চিরকাল
সত্যি সেই স্কুলবয়স থেকে চেষ্টা করে গেছি
বুঝতে যে, কখন থামতে হবে যখন নাকাল।
কিন্তু স্কুলবালকেরা ঠিক অসভ্যতাই শেখে আগে,
আর এই বালকের মাথার ভেতরে শুধু
ঝমঝম বৃষ্টির রাতে অবিরাম ভয়ার্ত পংক্তিই জাগে,
যেমন শোয়া থেকে উঠে এই নিয়ে তার বিশবার হলো,
আসলে হয়েছে দশ, কিন্তু অলংকার মনে রেখে বিশই বলা ভালো,
কারণ বিশের সাথে অন্য এক শব্দের পুরো
ধ্বনির মিল আছে।

সেটা ভালো, এই যে মিলেমিশে থাকা—
যেমন পুকুর ও এক বালকের পাড় থেকে পিছলে মারা যাওয়া
যেমন কোরবানির রাতে নিজেকে বাঁচিয়ে রেখে
ষাঁড়গুলি মারা, আইনসম্মতভাবে—অন্য এক মিলমিশই হেতু।

পশুগুলো ডেকে উঠল দ্যাখো,
ওরা কি মৃত্যুভয়ে ভীত, ওরা কি ছমছম?

আপনার মতামত লিখুন :