পয়ার পয়ার নাম মুখে বলো ভাই

মুজিব ইরম
অলঙ্করণ কাব্য কারিম

অলঙ্করণ কাব্য কারিম

  • Font increase
  • Font Decrease

পয়ার বন্দনা

পয়লা বন্দনা করি জগত মানুষ। পয়ারপুস্তকখানি শোনো দিয়া হুঁশ॥ সিলটি মানুষ আমি রাখিও স্মরণ। জালালী কৈতরওড়ে কাজল বরণ॥ উত্তরে বন্দনা করি হিমানী পর্বত। জন্তিয়া পাহাড়ে রাখি অচিন শপথ॥ খাসিয়া পাহাড়ে শেষে গান ধরি তার। দক্ষিণে বন্দনা করি কুহকী পাহাড়॥ টিলাটালা পথঘাট স্মরণে নিলাম। পুবেতে বন্দনা করি কামরূপ নাম॥ কামরূপী জাদু দিয়ে এই পদ বাঁধি। জাদুটুনা বান মেরে নয়া পথ সাধি॥ পশ্চিমে বন্দনা করি দেশি নিজ পথ। পয়ারের লোক আমি পদের শপথ॥ চৌদিকে বন্দনা করি মধ্যে নিছি ঠাঁই। পয়ারে বাঁধিব পদ বলি শ্রোতা ভাই॥ সুললিত ভাবামৃতে যার লোভ হয়। জাতি ধর্ম ত্যাগি তারা পয়ার ভজয়॥ পয়ার পয়ার নাম মুখে বলো ভাই। পয়ার বিহনে সুখ ত্রিভুবনে নাই॥ নাম করো নাম ভজো নাম সর্বময়। ভণিতা রচিলে পরে নাম সত্য হয়॥

ত্রিপদী চৌপদী আর লাচারি পয়ার। বিচার করিয়া দেখি সকলি অসার॥ মুজিব ইরম বলে আমি দীন হীন। বন্ধে নি আনিবা ঘরে পয়ারের দিন॥

পয়ারকথা

শোনো শোনো ভাইবন্ধু শোনো দিয়া মন। পয়ারে বাঁধিব সুর করিব বর্ণন॥ বন্দনা করিতে চাই কী বন্দিব আর। এই দেহে খেলা করে পুঁথি ও পয়ার॥ কেন যে বাঁধিতে গৎ মনেতে উঠিল। পদগুলো গান হোক মনে আশা ছিল॥ কারে বলি দুঃখতাপ কেন লিখি তান। মুদ্রণের ফেরে পড়ে গেল কুলমান॥ পাঠের তরেতে আমি লিখি না তো হায়। গানের তরেতে লিখি যদি সুর পায়॥ গাইতে না পারি দুখ মরমে পশিল। সুর বিনে জিতে মরা কপালে জুটিল॥ জানি না জানি না আমি সহজিয়া রীত। কেউ যেন গায় এসে এই লেখা গীত॥ কেউ যেন বলে এসে ধরে জনে জনে। এই লেখা লেখা নয় মুদ্রণে পঠনে॥ পুরাতন দোঁহা এই পয়ারে বিরাজে। বাঁধিয়াছি সেই দোঁহা মরমিয়া সাজে॥ আমি তো হৈয়াছি মরা বাউলিয়া রীতে। আমি তো দিয়াছি ধরা গীতে ও পীরিতে॥ মিনতি রাখিও শেষে মিনতি রাখিও। এই দেহ গীতে সুরে চন্দনে মাখিও॥

এই পালা শেষ হৈল শান্ত হৈল মন। পয়ারে পয়ারকথা করিয়া বর্ণন॥ ইরমে বলিছে ফের ভাইবন্ধুজন। আদরে রাখিও পাশে করিব ভজন॥

ছহি ইরমনামা

ইরম ইরম বলে ডেকো না গো আর। চুগলকোরেরা বলে মান গেছে তার॥ বলিতে বলিতে তারা কসম দিয়াছে। উজানে খুঁজিতে গিয়া ভাটিতে গিয়াছে॥ তুমি জানো ইরমের আসল হদিস। কী করে জানিবে তারা হারিয়েছে দিশ॥ উজানে ভাটিতে গিয়া পাতালে খুঁজিবে। ইরম কোথায় থাকে তারা কি বুঝিবে॥ সেই কবে নিশাপুরে করিয়াছে বাস। তারা দেখে ইরমের নকল নিবাস॥ বলিও বলিও তুমি ধরে আড়িপড়ি। ইরম লুকিয়ে আছে তুমি রূপ ধরি॥ বলো তুমি বৃথা খোঁজা বৃথা আস্ফালন। আসলে যা দেখে তারা না-দেখা মতন॥

খুঁজুক খুঁজুক তারা নিয়ত খুঁজুক। এই কথা আড়িপড়ি সকলে বুঝুক॥ হাসাহাসি গালাগালি খোঁজাখুঁজি সার। ইরমে আউলি দিছে জগত মাজার॥

বাতুনি পয়ার

কী করিয়া সভা মাঝে পড়িব কালাম। ভাইবন্ধু কবিগণে বলিব ছালাম॥ আমি অতি মূর্খ মতি জানা শোনা নাই। আকুল হৈয়াছি যদি বন্ধুয়ারে পাই॥ মুজিয়া নয়ন ওগো করিব চয়ন। ফুটিবে ফুটিবে জানি মনের নয়ন॥ প্রেম সত্য তুমি সত্য সর্ব শাস্ত্রে পাই। তুমি ছাড়া সর্বহাটে আমি নি বিকাই॥ ভাবিয়া রজনী কাটে ভুলি নামধাম। তুমি নি পড়ি বা এই পয়ার কালাম॥ যদি তুমি পড়ো ওগো হাসিয়া বাসিয়া। পেয়েছি পেয়েছি কব নাচিয়া নাচিয়া॥ ভাজিব ভজিব আমি তোমার পঠন। দেখিব দেখিব আমি তোমার গঠন॥ বন্দনা করিব আমি রূপের বাহার। যে দেখিবে এই রূপ সর্ব সিদ্ধি তার॥

এই কথা জমা ছিল কেউ এসে পাবে। জেনেছি পয়ারে আর জেনেছি কিতাবে॥ ভজিলে হাসির রঙ শিখিব বাতুনি। সৃজিলে কথার ঢঙ শিখিব গাঁথুনি॥ মুজিব ইরম বলে দেখা যদি পাই। ও মুখের রাঙ্গা হাসি কপালে লাগাই॥

সমাপ্তির আগে

পয়ারপুস্তক প্রায় হৈয়াছে পূরণ। অধম ইরমে কয় রাখিও স্মরণ॥ পড়িবে কিতাবখানি যারা খুশি মনে। হবে তারা শব্দাক্রান্ত বলি জনে জনে। দুই হাজার ঊনিশ জুলাই মাসেতে। পয়ার পুস্তক শেষ হৈল কোনো মতে॥ কী লিখেছি জানা নাই ক্ষমা দিও ভাই। ভয়ে-ডরে লিখে রাখি মূল্য জানা নাই॥ পরগনা ইটা যার বাড়ি নালিহুরী। এতিম বালক বেশে বিদেশেতে ঘুরি॥ বাড়িছাড়া ঘরছাড়া আমি দীন হীন। মৌলভী বাজার জিলা শ্রীহট্ট প্রাচীন॥ হিউয়েন সাং মতে নামের আঁচল। আল বেরুনীর সাক্ষ্য হইল প্রচল॥ ‘সিলাহেত’ ‘শীলাহাট’ ও ‘শি-লি-চা-ত-ল’। শ্রী সতীর হড্ড হৈতে নাম হৈলা চল॥ গুহক রাজার কন্যা শীলা দেবী নামে। শ্রীহট্ট হৈয়াছে নাম শুনি ইহ ধামে॥ ‘সিল হট্ যাহ্’ পীর করিলা হুকুম। এতই নামের রূপ ডেকে আনে ঘুম॥ সেই ঘুমে জেগে উঠি রচি কিছু পদ। প্রাচীনে মজিয়া থাকি কাটাই বিপদ॥ জালালী কৈতর আমি শ্রীহট্ট মাজারে। ঘুরিয়া কাটাই দিন দূরের বাজারে॥ শরিয়ত উল্লা দাদা আমি তার নাতি। পয়ারপুস্তক রচে ধরি মারিফতি॥

মুজিব ইরম বলে নাই ডর নাই। পাঠক মুর্শিদ মেনে প্রণাম জানাই॥ পাঠক পাঠিকাগণে আদাব ছালাম। পয়ার পুস্তক হৈল আপাত তামাম॥

আপনার মতামত লিখুন :