ধূম্রনীল মাধব-মুহূর্ত ঘিরেছিল পৃথিবীর চারপাশ

সোহেল হাসান গালিব
অলঙ্করণ কাব্য কারিম

অলঙ্করণ কাব্য কারিম

  • Font increase
  • Font Decrease

দাহ্যবস্তু

তোমার সমীপে আমি—যেন এক নিবেদনপত্র—
বিদেশি ভাষায় লেখা। জীর্ণ ফাইলের অন্তঃপুরে
আছি মৌন, টেবিলের প্রান্তে। দিলে স্বাক্ষর অন্যত্র।
লাগল না একটিও টোকা দেহকাঠের সন্তুরে।

তবু যদি রাত্রির দেরাজ থেকে ভেঙে পড়ে তালা—
রজনীকান্তের গান শুনবে কি বধির জানালা?

থাক সে গানের কথা। মুছে যাক দৃশ্যও না হয়।
একবার শুধু ছুঁয়ে দ্যাখো, আমি স্বয়ং কবিতা।
দ্বৈতে ছিল দ্বিধা, বলো একাকিত্বে কিসের অদ্বয়!
দাহ্যবস্তু পড়ে আছে। দহনের ভার—নেবে কি তা?

ব্রহ্মাণ্ড মস্তক চাঁদ

আমার, প্রতিটি স্বপ্নে, কেন জানি দায়িত্ব বর্তায়—বাসে ট্রেনে
লিফলেট বিলাবার; মজুরি তো আছে, সমস্যা কী—বলে হার্বাল-কর্তায়।
অর্শ গেজ ভগন্দর নিরাময়বার্তা তুলে দিয়ে নালায়েক মানুষের হাতে
কখনো রতিসুখের গতিপথ হয়তোবা নিজেকেই বাতলাতে
বাতলাতে, ইসলামি চটিবই লিখি চলি স্বপ্নে।
ছাপাখানা মালিকেরে ডেকে বলি : নে তুই, সব নে।

দুপুরবেলার ঘুম বিকেলের ঢাল বেয়ে গড়িয়ে যেতেই
পৃথিবীকে ঘি-সবুজ বেল বলে কেন মনে হয়?
গোলের ধারণা থেকে আরো কত মেটাফর ছুটে এসে
মেটাফিজিকাল নদীটির কাছে খুঁজেছে আশ্রয়।
ব্রহ্মাণ্ড মস্তক চাঁদ একসঙ্গে সবই কি লাফাতে চায় ঢেউয়ের ওপর!
আমার অজস্র ঘুম ভেঙেচুরে জুড়ে যেতে থাকে কার ঘুমের ভেতর?

ভাগ্যরেখা

বাঘবন্দি খেলায় হয়েছি বাক্যবন্দি, সব চিন্তা
তথৈবচ। মেঘডম্বরু দিনেই হারালো বর্ষাতি।
নিয়েছো তুমিও জব্দ ক’রে কোন কালোজাদুবাক্সে
আমার লেখনী যত। ছিল নৈঃশব্দ্যের স্বরলিপি
রচনার দায়। দুটি হাতের তালুতে চেয়ে দেখি
ধনুকের রেখা; সুরশল্য নেই। কী করে বোঝাব
বিরাট দুঃস্বপ্ন এ জীবন—সমস্ত বলার পরও
রয়ে যাবে শিশুদের ভাবনার মতন অব্যক্ত।

নীলকুঠি

সকল বাতেনি, কূটাভাস জানা যায় শুধু স্বপ্নে;
একেকটি দুঃস্বপ্নের মধ্যে ঢুকে পড়া বন্ধুজন
ধাওয়া খেয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে যখন পালায় ছুটে, ঠিক
যখন তোমার পিছুডাক পিছনেই ঢলে পড়ে।

অথচ এখানে আজও হরিয়াল পাখিদের শান্ত
আনাগোনা; হল্দে গাছে টোনাটুনিদের গল্পগান;
কুমিরের দেশে শৃগালের মানুষিক চতুরালি—
‘রূপকথা’ নামে ছেঁড়া বইখানা পুরাতন শেল্ফে।

ঘাসের সবুজ চুমু খেয়ে তড়পানো বাতাসের
কাছেই থাকুক তবে সেই গ্রন্থ-বিচারের ভার।
আর আমি, ময়দানে পাশ ফিরে শুয়ে, খুঁজে ফিরি
তোমারই নিদ্রার নীল-কুঠুরিতে প্রবেশের পথ।

ঘুম

যে বালিশে ঘুমাই, সে বালিশের বুকটাকে চিরে
তুলো উড়ে যায়—কেন তুলো ওড়ে শুধু রাতভর

কালো মশারির গায়ে লেগে থাকা তারাগুলো ঘিরে?

ভেবেছি অনেক দিন, এই ঘুম-হারামের পর
আশল কথাটি বলে দেব আয়ুক্ষীণ জোনাকিরে

বলে দেব, বলবার কিছু নাই, তাই ভাষান্তর...

তরঙ্গিণী

একবার ঘুড়ি তবু আকাশে উড়াল মেঘ থেকে
ছিন্ন হলে, একবার হাতে এলে দস্যু বালকের—
দর্পিত ডানায় খোঁজে সেও লগ্নভ্রষ্ট জীবনের

আশ্চর্য পুনরুত্থান। সুউচ্চ টাওয়ার কিংবা কোনো
মনুমেন্টে লটকে থাকা সেই ঘুড়ি বহুদিন আমি
দেখেছি, দেখেছি জলে তার প্রতিবিম্ব ভেসে যায়।

ওই জল আমি চিনি—পাখিরাও বলে তাকে নদী,
ডাকে তরঙ্গিণী। তারই বুকে ফের উড়িয়েছি ঘুড়ি—
উড়ুক সে দিনমান। নীলিমার দিকে চেয়ে অন্ধ

ঈর্ষাতুর সুপারির ফুল আজ ঝরুক তরঙ্গে...

আফিমের দেশে

জলার্ত পাত্রের মধ্যে এক ফোঁটা রঙের মতন
কেবল একটি কথা ছুঁতে পারে সহস্র রজনী—
স্বপ্নের মুকুট-পরা আফিমের দেশে বসে তা কি
ভেবেছিল বাগদাদি শাহ, সুলতান গজনীর?

একবার গান ধরে, জাগিয়ে সে বিষণ্ন রবাবে—
তারপর থেমে গেলে, সরে গেলে দৃষ্টির জবাবে।

যে বনের পথে হেঁটে তোমার পোশাকে লেগে গেল
চোর-কাঁটা, সে পথ কে জানে কার ছিল না ঈপ্সিত।
জনান্তিকে পড়ে থাক ভ্রান্তি—দুটির নিস্বর ঝিল্লির;
তবুও বলো না : আমি রাত্রির পেখম খুলি নি তো।

হাওয়ার উচ্ছ্বাস নয়, ধূম্রনীল মাধব-মুহূর্ত
ঘিরেছিল পৃথিবীর চারপাশ—একটি সন্ধ্যায়—
প্রতিটি পাতার শীর্ষে ঝরে পড়ে যতটা সূর্যাস্ত
ততটা পালক থাকবে কি জমা ঘাসের কব্জায়?

আপনার মতামত লিখুন :