ফুটে আছে কয়েকটি মৃদু মুহূর্ত

ফারুক আহমেদ
অলঙ্করণ কাব্য কারিম

অলঙ্করণ কাব্য কারিম

  • Font increase
  • Font Decrease

ঘাড় নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক কবিতা

তোমার শরীর আমার ঘাড় নিয়ন্ত্রণ করে।
বারবার মনে হয় তুমি আমার ঘাড়কে ইচ্ছামাফিক
একবার ডানে, একবার বামে ঘুরাচ্ছো।

তোমার শরীর নকশীকাঁথার মতো এক বর্ণিল
আবহমানতা এঁকে, তাতে সবুজ, হলুদ, লালচে
বা এরকম নানা রঙ চারদিকে ছড়িয়ে দিচ্ছ।
কোথাও মনে হয় একটি সাদা জুঁইফুলের মতো
একটি পুঁটিমাছ লাফ দিয়ে উঠল। কোথাও
মনে হয় লাল সূর্য বা রুপালি চাঁদের মতো
ভিন্ন রঙের দুটা দুল তোমার দু’কানে দোল খাচ্ছে।

আচ্ছা, নদীর দুটা ব্যাপার আছে না, ঢেউ আর স্রোত
কিভাবে এগুলোর সৌন্দর্য শনাক্ত করা যায়। ঢেউ মানে কী...,
স্রোত মানে লাফিয়ে ওঠা কালো চুলের মনোহর বাগান।
অরণ্য মানে তোমার রহস্যময় এবং সঙ্কুল হৃদয়, নাকি?

সকালে তোমাকে দেখে মনে হয় আমি শুভ্রশরতে আছি,
তারপরই ঘুরে আসে বসন্তের বিপুল রঙ। তারপর কী?
বিকাল শেষে যখন সন্ধ্যা নেমে আসে তখন ফাঁকা মাঠে
নেমে আসা কুয়াশার মতো শুষ্ক শীত টের পাওয়া যায়
আর রাতে কখনো বৈশাখীঝড় বা বর্ষার ঝরঝর।
তাহলে হেমন্ত? ঐশ্বর্যের এ ঋতু যেকোনো সময়ের।
অর্থাৎ তোমাকে ঘিরে ঋতুগুলো গোল্লাছুট খেলে
আর আমার ঘাড় নিয়ে তুমি খেলো হা-ডু-ডু।

সাদা পালকউড়ানো পাখি পানি ঘেঁষে যেমন উঠে যায়
তেমন তোমার শ্বেত ওড়না আমার মুখের ওপর দিয়ে
অস্পর্শে অথচ স্পর্শের সম্ভাবনা ছড়িয়ে উড়ে যায়।
আমি বেদনাবিধূর হৃদয় নিয়ে ভাবি কতদিন
প্রকৃত তোমাকে পাই না, কতদিন প্রকৃত তোমাকে
মুগ্ধতা ও আকাঙ্ক্ষা একসঙ্গে মালা বানিয়ে গলায়
জড়িয়ে দিই না।

তোমার বিছানার নাম সবুজ, তুমি সবুজ জড়িয়ে থাকো।
আমি সেই সবুজের কথা শুনে অবুঝের মতো
তোমার দিকে ছুটে যাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠি।
তুমি ঘাড় নিয়ন্ত্রণ করো মানে, তোমার ঐশ্বর্য
আমার ঘাড় নিয়ন্ত্রণ করে। একবার ডানে, একবার বামে।

আমি এভাবে বিশ্বাস করতে শুরু করি
আমার পিতার ঘাড় তোমার শরীর নিয়ন্ত্রণ করত,
আমার পিতামহের ঘাড় তোমার শরীর নিয়ন্ত্রণ করত,
আমার পিতামহের বাবার ঘাড়ও তোমার শরীর নিয়ন্ত্রণ করত।
ফলে আমি সানন্দে সবাইকে বলি, হে বাংলাদেশ
তোমার শরীর আমার ঘাড় নিয়ন্ত্রণ করে।
একবার ডানে, একবার বামে।

পরিমিতি

আমি আমার কবিতার ভেতর একটি শব্দ আবিষ্কার করলাম
যা গোবি মরুভূমিকে ধরে আছে। পরমুহূর্তে আমি
আরেকটি শব্দকে আবিষ্কার করলাম—যা পুরো
আটলান্টিক মহাসাগরের গভীরতা নিয়ে বসে আছে।
আরেকটি শব্দ, যা এভারেস্ট থেকে একটু বেশি উঁচু
বলেই মনে হলো।
তার মানে আমার কবিতার প্রতিটি শব্দের রয়েছে
এইরকম ধারণক্ষমতা, গভীরতা বা উচ্চতা।

তার মানে, বিশাল মরুভূমির মাঝেও রয়েছে মরূদ্যান
তার মানে, অনেক উচ্চতার পাশেও রয়েছে গভীর খাদ
তার মানে, অবিশ্বাস্য গভীরতার ভেতরও রয়েছে কোনো দ্বীপপুঞ্জ।
বোধহয় নয়। নিশ্চিতভাবেই নয়।

আমার কবিতার প্রতিটি শব্দ ধরে রাখতে সক্ষম
মাইলের পর মাইল দীর্ঘ হাসির ঐশ্বর্য।
আমার কবিতার প্রতিটি শব্দ ধরে রাখতে সক্ষম—
গত দুইহাজার বছরের আবহমান বাংলার তাবৎ রূপ।
কিন্তু কোনোমতেই সেটুকু জায়গা ফাঁকা নেই—
যেখানে তোমার মুখ ঢুকে পড়তে পারে,
নিদেনপক্ষে অন্তত তোমার একটি চাহনি
সেটুকু জায়গা তুমি কোনোমতেই খুঁজে পাবে না।

ফুটে আছে

ফুটে আছে কয়েকটি মৃদু মুহূর্ত
ফুটে আছে কয়েকটি ভাবনার জানালা
ফুটে আছে ঝিরিঝিরি চাহনির প্রবাহ
ফুটে আছে সঙ্গতালাভের তাড়নায় বেড়ে ওঠা আকাঙ্ক্ষা
ফুটে আছে দেখা না হওয়ার প্রহসন
ফুটে আছে অব্যক্ত-ব্যর্থতার কালকেতু

ছড়িয়ে পড়েছে গ্রামের পর গ্রাম তোমার অনুপস্থিতির দীর্ঘশ্বাস
ছড়িয়ে পড়েছে অন্ধকার নামা মানে তোমার মুখ দেখতে না পারা
ছড়িয়ে পড়েছে দুজনের পায়ের মাঝখানে সমুদ্রের বিশালতা
ছড়িয়ে পড়েছে গম্ভীরতা নামক একটি ভয়ঙ্কর স্থলমাইন
ছড়িয়ে পড়েছে ব্যস্ততা নামক একটি ক্লিশে মোহ
ছড়িয়ে পড়েছে বিদ্যুতের মতো বেশি অনুপস্থিতির ঘটনা।

ফলে বাতাসে একটি কলাপাতার দোল খাওয়ার অর্থ হলো
তা আমাকে ডাকছে না যেতে বলছে—তা বোঝা যাচ্ছে না।

আপনার মতামত লিখুন :