নৈনিতালের মেঘ অথবা মানুষের প্রেমিকারা

অনন্ত আরফাত
অলঙ্করণ কাব্য কারিম

অলঙ্করণ কাব্য কারিম

  • Font increase
  • Font Decrease

নৈনিতালের মেঘ অথবা মানুষের প্রেমিকারা

আমাদের প্রেমিকারা যে যার বয়সের সমান
দূরত্ব পার হয়ে গেলে সকরুণ সুরে দুটো
ডাহুক ডেকে উঠে, আমাদের ক্লান্তি বোধ হয়…

একরাশ নীলাভ বেদনা নিয়ে এই ষোলশহর
স্টেশনে উড়ে আসে কিছু চৈতালি মেঘ,
সম্ভ্রমহীন আধা-কালো মেঘগুলো ধুব-ধাব
করে দৌড়াদৌড়ি করে, এ-গাছ; ও-গাছের
ডাল ভেঙে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেয়, চায়ের
কাপে এসে বসে, মানুষের মনে হয়, আজকের
চা-টায় বেশ একটা ঠান্ডা ঠান্ডা ভাব…

মানুষের মনের প্রগাঢ় বেদনাগুলো খিড়কি
খুলে উঁকিবুকি দেয়, চাচামিয়ার দোকান
থেকে যার যার নিজের সিগারেটটা ঠিক
ঠিক চলে আসে, বেনসন লাইট; গোল্ডলিফ
সুইচ; ডার্বি। সিগারেট থেকে বেদনাগুলো
ওড়ে ওড়ে গিয়ে মেঘেদের গায়ে মিশে…

নৈনিতাল থেকে ওড়ে আসা আলাভোলা
মেঘটার হঠাৎ দক্ষ রাজকন্যার কথা মনে
পড়ে, সতীর আত্মহুতির কথা মনে পড়ে,
একান্ন খণ্ড দেহের এক খণ্ড কি উড়ে এসে
এইখানে, ষোলশহর স্টেশনে পড়েছিল?
আলাভোলা শিব বহুজন্ম আগের কথা
মনে করতে পারে না। স্টেশনের এ-মাথা
ও-মাথা ধুব-ধাব পায়চারি করতে থাকে…

মানুষের প্রেমিকাগুলো মাঝেমধ্যে হাঁপাতে
হাঁপাতে চন্দ্রনাথ পাহাড়ে উঠে যায়…

মৃতবক্ষা নদীদের শরীর

চিরায়ত চৈত্রের রোদ ফুরায়ে গেছে
মৃতবক্ষা নদীদের শরীর থেকে…

এই রকম অসংখ্য নরম নরম রোদ
ধানশালিকের ঠোঁটে দু-চুমুক প্রগাঢ়
মৃত্যু জমা দিয়ে মীম ভিলার ছাদের
কিনারায় এসে বসে। এদিক ওদিক
তাকায়, আমার জানালা দিয়ে কিছু
ঢুকে পড়ে, মোবাইলটা উত্তপ্ত হয়…

মানুষের জন্য কোনো প্রতিহিংসা
নদীদের বুকে জমা হয় কিনা আমি
জানি না, কারো জানা আছে কি না—
সেইসব প্রশ্ন নিয়া আমি উজানের
দেশে যাই। নৌকা নিয়া ঘুরাঘুরি করি।

পাশের নৌকায় নিয়ে যেতে দেখি
মানুষের ঘরের চালা, একটা মৃত
শিশু হাত-পা ছড়ায়া শুইয়া থাকে
ঠাকুরের চরের কিনারায়। ভয়াবহ
নিষ্পেষণে পাড় ভাঙতে দেখি…
চোখের পলকে মানুষ মারার চরের
কিছু অংশ আর খুঁজে পাই না!

চরের কিনারায় এইসব বুভুক্ষু রোদ
দেইখা আমার বেলকনির কথা মনে
পড়ে, আমার পায়ের পাতা পুড়ে
যায়, পাড় ভাঙে, মানুষের জন্যে
আমার দীর্ঘশ্বাস পড়ে, নদীদের জন্যে
আমার দীর্ঘশ্বাস পড়ে, মানুষের
জন্যে নদীদের দুঃখ হয় কিনা, সেই—
সব প্রশ্ন নিয়া আমি উজানের দেশে
যাই, চৈত্রের রোদগুলো ফুরায়ে যেতে
দেখি, মানুষের জীবন দেখি, মৃতবক্ষা
নদীদের চর থেকে ধানশালিকদের
শহরের দিকে ওড়ে যাওয়া দেখি…

আমার বেলকনির কথা মনে পড়ে…

হেরন পাখিদের প্রতি

অনেকগুলা শরৎকাল ক্ষয় হয়ে গেছে
আমি টের পাই, আমি টের পাই—বুকের
ভিতর থেকে কিছু নরম কাঁশফুল উড়ে
চলে যাচ্ছে বেলকনির সীমানা ছাড়ায়ে…

কাঁশফুলের দীর্ঘশ্বাসগুলা মেয়ে মানুষের
স্তনের মতন এত কোমল অন্ধকার ছেড়ে
কার কাছে যায়, কোথায় যে যায়—এই
সব ভাবনা ভেবে ভেবে, আরো কিছু
নির্জীব শরৎকাল আমাদের অতিক্রম
করতে থাকে। শীত নেমে আসতে থাকে…

শীত শীত অনুভূতি নিয়া আমরা অফিসে
যাই, অফিসকর্ম করি, জাহাঙ্গীরনগরের
দিকে কি আরো বেশি মৃদু-মন্দ বাতাস
বইতে থাকে? আরো হালকা দোলাচাল?

কোনো লেকে কি একটা বা দুইটা পাখি
আগে আগে ওড়ে এসে জায়গা দখলের
ফন্দি করছে? অথবা মাদানী এভিনিউ
ধরে ভাটারার দিকে যেতে থাকলে, এই-
ভাবে যেতে যেতে সাতারকুল, এক নম্বর
ব্রিজ, তারপর দু’ নম্বর, তারপর আরো
দূরে গিয়ে বালু খাল পার হয়ে নাম না
জানা কোনো এক গ্রামের দিকে যাত্রা
করতে করতে কি আমাদের নিজেদের
কথা মনে পড়ে? ধূসর শরৎকালগুলা?

আদৌ এইসব কুয়াশাচ্ছন্ন বিকালবেলা
পৃথিবীর মানুষের কাছে ছিল কিনা—
এই রকম অসংখ্য উদ্ভট সন্দেহ নিয়া
পৃথিবীটা নিজেই নিজের মুখোমুখী হয়,
ঝগড়াঝাঁটি করে—দিনশেষে তবুও হিসাব
মিলাতে পারে না, একঝাঁক নিশাচর
হেরন হিমালয়ের পাশ ঘেঁষে ওড়ে আসতে
থাকে আমাদের দিকে। আমাদের তখন
শীতকালের কথা মনে পড়ে, বিরান
শীতের রাত আর নির্ঘুম হেরনগুলা
পৃথিবীর পথ ধরে হেঁটে হেঁটে আমাদের
শীতকালীন ফসলের ক্ষেতের উপরে
আসে, শুধু নরম নরম কাঁশফুলগুলা
আর থাকে না কোথাও, কোথায় যেন
যেতে থাকে, ধবল অন্ধকারের সাথে…

এমন একটা আহাম্মক আষাঢ়ী পূর্ণিমা রাইত

এমন একটা আহাম্মক আষাঢ়ী পূর্ণিমা রাইতে
তব্দা মাইরা বইসা থাকার কি কোনো মানে
আছে, জিতু? এমন আশ্চর্য সুন্দর বিষাদমাখা
রাইত—চান্দের ভিতরে ঢুইকা যাচ্ছে চান্দের
শরীর, মেঘের শরীরে ঢুইকা যাচ্ছে আরো কিছু
ছাইরঙ্গা মেঘ। শুধু মানুষেরা পরস্পর দূরে
সইরা যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। শুধু মানুষের কোনো
পূর্ণিমা নাই। মানুষেরা পরস্পর নিজেদের
সমান বিপরীত দূরত্ব পার হইয়া হাঁটছে, একা…

আমি আমার নিজস্ব পথের দূরত্ব পার হইয়া
একা একা আমার অভিমানের নিকটে আইসা
বসি, নিজের সাথে নিজের কথা হয়। তুমি
তোমার বেদনার ব্যসার্ধ ছুঁইয়া তোমার বৃত্তের
পরিধি পূর্ণ করো। আধুনিক মানুষের মতো
আমাদের ভেতরে কোনো রকম ঝগড়াঝাঁটি
হয় না। আমরা পরস্পর চুপচাপ বইসা থাকি…

আমাদের ভেতরে একটা ঠান্ডা বরফের পাহাড়
জমতে থাকে। পাহাড়েরা সুস্পষ্ট হয়, বাড়তে
থাকে। অভিমানগুলা ডালপালা ছড়ায়া বসে,
মৌনবৃক্ষের ছায়ায় ছায়ায় আমরা হাঁটতে থাকি।
বরফের পাহাড়গুলা বড় হতে থাকে, আমাদের
অভিমানগুলা আরো বেশি গাঢ়তর হয়…

এমন আহাম্মক কোনো পূর্ণিমা রাইত আমাদের
ছাদের কিনারায় আইসা দাঁড়ালে আমাদের মাথা
ঝিমঝিম করে, আমরা ঝিম মাইরা বইসা থাকি।
চান্দের দূরত্বে পৌছায়া যাওয়া অভিমানগুলা
গলতে থাকে, এমন এক আজগুবি পূর্ণিমা রাইত…

আমি আমার সমস্ত অভিমান ছিড়া-খুঁইড়া তোমার
কাছে যাই, তুমি তোমার সমস্ত বেদনা ছুঁইড়া ফেইলা
অভিমানের কাছে আসো। আমরা দুজন পরস্পরের
বেদনার কাছে গিয়া চুপচাপ বইসা থাকি। এমন একটা
আজাইরা আজগুবি রাইত—আমি তোমার বেদনার
ব্যসার্ধ ছুঁইয়া তোমার বৃত্তের পরিধি বরাবর ছুইটা
যাইতে থাকি। এমন আহাম্মক একটা রাইত…

আপনার মতামত লিখুন :