প্রেম ও সংহার কথা এবং অন্যান্য

শাবিহ মাহমুদ
অলঙ্করণ: কাব্য কারিম

অলঙ্করণ: কাব্য কারিম

  • Font increase
  • Font Decrease

প্রেম ও সংহার কথা

মদারু রাত ঢেলে দেয় অসহিষ্ণু শরাব, এ লজ্জা বড়ো দীর্ঘতর আপাত আগুন। ফোঁটা ফোঁটা ব্যথা, পেগ পেগ অস্বপ্ন, আর, নৈঃসঙ্গ্য নিয়ে চিৎ-শুয়ে মুগ্ধ মানবী এক—জেগে আছি অঘুমের কোলে। সে কি পাঠ করেছে কোনোদিন—ঋতুর প্রযত্নে পাঠানো সমূহ চিরকুট? ফলে বসন্তে বেড়ে ওঠে প্রসন্ন লাঞ্ছনার কী এক বিভক্ত দায়! নাচমুদ্রার অন্ধকার রোদ, টুকরো বোতল ভেঙে পড়ছি ঘুঙুরের পায়ের কাছে, এবং ‘ইত্নি ছোট্টি সালছে এহি ব্যাটা হামারা পেয়ার’; ঝিম ঝিম টাল গলায় কাতরতা ঢালে সামিয়া কসাই; পার্শ্বজন জেনে নেয় তৃণভোজী বকরির ছালের মূল্য ও মান। মদারু রাত কী ভেবে ঢেলে দিল জহরের দাগ! আমি তো নিইনি হাতে—বহুছিদ্র ওই কান্নার বাঁশি, আমি তো মেলিনি কোনোদিন—এই খণ্ডিত স্বকালের পক্ষে ভরা অঞ্জলি। তবে কেন রাত হয় ঘুঙুর, ভাঁউরা হই আমরা তাহার?
রাত ঢালে শ্রী সাধন চন্দ্র, পান করি পিপাসার্ত ভোর। পিপাসা মেটে না কেন, ইশ্!

২.
একটা নাচদৃশ্যের বেহিসাবি খমক ও ঘুঙুরের জল, আমাকে নিয়ে যায় বিশ্বস্ত শৈশবে; শিশুজন্ম এ শব্দটির মানে কী? একটা কসাইখানার বহুছিদ্র গন্ধময় রোদ, আর বৃষ্টির ঝাপটা ঝিম মেরে বসে আছে বিমূর্ত মুখে। একটা কসাইখানার রক্ত-মেদ-ভুঁড়ির সৌষ্ঠবের পাশে, প্রাণ নিয়ে বসে থাকে অনাথ, আর রঙিলা ব্রোথেল!

এই ঝাঁ ঝাঁ দুপুরে কার গলা বেয়ে নেমে যায় সুতীব্র গরল-মাল, কী দুঃখ তাহার? উদ্দীপক ভঙ্গিতে বসা ছুকরিটির শেষ কাডালের নাম ‘সরলা মাসি’। সে মূলত ব্যর্থতা ঝেড়ে নিচ্ছে বিষণ্ণ দুপুরের, ওর মনে অহেতুক শঙ্কা, ওর মনে যথেচ্ছ ক্লান্তি, কালকের।

সভ্যতা ও ভব্যতা দেখে এইসব তেরছা চোখে; সে এতই নিরুপায় তার করার থাকে না কিছুই।

৩.
একটা গভীর সুন্দর হলুদ আগুন ক্রমশ আমার চোখের মণি গলিয়ে ফেলছে, এবং এক অনিবার্য জলমগ্ন ঝাপসা দৃষ্টি বরফ গলছে চারপাশে—‘বিজেত্রীর ঘরে আমি যাইনি সেদিন, লোকে তবু আমাকেই বেরুতে দেখেছে, অথচ সেই সন্ধ্যায়’; হ্যাঁ, একটা অন্ধকার সন্ধ্যা এমন ফরসা সকাল হয়ে যাবে একটু আগেও কি ভেবেছিল আমাদের মন? আমরা বিপরীত প্রাণের দরজায় হুমড়ি খেলাম, কথা ও ঠোঁটে ফিসফিস অধরে শুনি মগ্নতার গান।
এ শ্রবণ আমাদের প্রার্থিত অপরাধ, এ শরণ রতিমগ্ন প্রার্থনার কাল্পনিক ফল, দেখো—দু-টুকরো হয়ে অপেক্ষা করছে দুজনার মানবিক হাতে। এবং এইভাবে কাছে না-এসেও পাশে থাকা যায়। এ কথা শুনে, সে হাসল খুব জোরে শব্দ করে।

খেদ

পলানো রাতের সাথে ভেগে গেছে গতদিন ভোর, বিশ্বস্ত ক্লান্তি। চলাচলে পড়ে থাকি যেটুকু মরা ছবি, সুগন্ধি ঘাম, অদরকারি কথার চিকচিক বালু—স্থান বদলে নির্মিতব্য নতুনে, ধরা দাও আগন্তুক মন এই বিভ্রান্ত বিশ্বাসীকে।
সেদ্ধ আলকাতরার ঘ্রাণচিত্রে প্রহর বেজে চলে দৃশ্যপ্রধান, শব্দময় ও রং বদলানো নীল কেরোসিন; ব্যথার্ত পোড়োবাড়ি—যাকে বলি অশ্লীল বিষণ্ণতা, আর গ্লানির জীবন নিয়ে মাছি-নোংরা লঘু-সংখ্যার দীর্ঘস্বর কান্না, আমার স্বজন ইত্যাকার অপূর্ব অপূর্ণতা।
এবং ক্রমাগত টপটপ সন্ধ্যার জলের পাজামা ও প্রেমিকাকে বলি, হে আমার ইহলৌকিক মা, তুমি কখনো আমার জননী ছিলে না।

বেহিসাবির প্রহর গণন

টেম্পুর মারাত্মক গোঙানির ভিতর, সবুজ পাতার হলুদ ছায়া ঝরে গেলে, মফস্বল প্রণীত এ পথ হয় প্রকৃত পোতাশ্রয়। ছড়িয়ে ও ছিটিয়ে আছে অনেক, অনেক কিছু—পুকুরের জলের উপর একটা টুপ্ ধ্বনি ভেঙে পড়বার প্রথম মুহূর্তে, অচেনা পাখির শিস, এবং তার প্রতিধ্বনির পেছনে লেগে থাকলে পর, কয়েকটি রোদভেজা দুপুরের প্রিয় প্রহর-গণনায় ধাবিত হয় এই বেহিসাবি মন।
সরু পিচের ভাঙা পথ ও লাল সুরকির ভাঙন পাশাপাশি চিরকাল। এই চূর্ণিত প্রত্নের পরাজয়—জীবন এভাবেই ধসে যায় দুপুরের তাপে। তবু, কল্পনার এক কুহক গুঞ্জনে, বিকেলের উজ্জ্বল আলো রমণীদের চুল বাঁধতে প্ররোচিত করে, আর, একপ্রস্থ দীর্ঘ হয় মিথ্যা ও সাময়িক সংসার। জানি না কোথায় যাব, কেন যাব! কেবল জানি, আমাকে যেতেই হবে নিজের নির্মিত নিয়তির ধার ধরে, অন্য এক গ্রহের ভেতর।

২.
দুলাল গাইনের ক্যানভাসের অস্পষ্ট চিকন রেখার মতন স্বচ্ছ সাঁকোটি, দাঁড়িয়ে আছে চোখের মাঝখানে। আর বঙ্গের রাজধানী মফস্বলের এই প্রকৃতিরাজ্য ধরে হাঁটছে, একজন কিশোর, দুইটি বালিকা ও বালক। কলসির জলের অক্ষর ধরে আছি কাঁখে, ভুল বানানের ক-টি পঠিতব্য পুস্তক! যেটুকু পাঠ্য তা পাই পথে পথে যেতে; কিছুটা রং, যা দেখে বৃক্ষ ও বাকল আয়নার জলাশয় হয়ে উদ্ভাস ছড়ায়। আরো কিছুটা জলরং ও আংশিক রঙিনতা নিয়ে, খালপাড়ে হাঁটা হাঁটা লাল গরুর সবুজ সন্ধান! ওর নড়াচড়া কেন জলের ছায়া কাঁপা কাঁপা ভাঙে?
এ গ্রামে আজ তিন দিন। প্রথম সন্ধ্যায়, অনাহূত এ আগন্তুককে আতিথ্য দিয়েছিল একটি সাদা ডিম, গৃহস্থমুরগি। তেমনি নানান অবোধ্য দৃশ্যের মতন, গাছের পাতার চ্যুত হওয়া মিহিন ধ্বনিলগ্নতা মূলত আমার চোখের খসে পড়া রোদ।

নির্বাসিত জলপথ ধরে

একটা অহেতুক শিশুজন্মের বুদ্বুদ ফোটার মতোই গল্পটার শুরু। অচেনা কোথাও জাল ফেলবার মিহিন ধ্বনি গোঁজার মুহূর্তে, গোসলের শব্দাঙ্কে কেঁপে ওঠে পকেটভর্তি জলের প্ররোচনা, যার টেরাকোটায় লিপিবদ্ধ বালি-শুকনো মন; এইবার এ ধুলোগুলি ঘর বাঁধবার পাঁয়তারা ভাজে, যেহেতু সে ঘনিষ্ঠলগ্ন তো হিরের কুচি। আর কড়কড়ে পাঁপরভাজা দুপুরটাকে, একটা সুগন্ধি নীল কেরোসিনের দুষ্টু ড্রামে ডুবিয়ে দেবার পর, অধরা অস্পষ্ট কোনো নামের মতো ভেসে ওঠে কারো ছবিমুখ, এবং রুবী ভৌমিকের বাদামি চোখ বেয়ে ক্রমাগত টপটপ ঝরে পড়ছে আমার মায়ের কান্না। দুই দুর্বোধ্য হন্তারক জলের মাঝরেখায়, হারিয়ে যাওয়া এক অবোধ্য পুরুষজন্মের পাপ, গ্লানি ও সমাগত মৃত্যুর কোনো তেজস্বী স্বাদের দিকে পলানো পায়ের শব্দ ছাড়া, আমার মনের আর কোনো গন্তব্যই নেই।

২.
গাছের পাতায় লেখা জীবনের মতো কোনো স্বচ্ছ অনুতাপ! আমি তো আমার পায়ের কাছেই পড়ে আছি; এমন বিষাদদৃশ্যে মগ্ন হলে মন, নিজের নামের বানান প্রত্যাহারের কালিতে পাল্টে পড়ে জাগতিক ঘষামাজা, সত্য-স্বপ্ন ও ছদ্মবেশভূষা, আর সময়ের কোমরে বাঁধা নরম সুতা ও শেকল।
তবু কেবল এক অবশ্যঋণী সাময়িক ছায়ায়, মানুষ মাথা কুটে মরবার আনন্দই খোঁজে। তবু আগত দিবসের সম্ভাব্য পাতায়, এক ঝিলিক রোদ কুড়াবার দুর্নাম। যদিবা প্রতিটা সকাল মুখ ধোয় বেসিনের পচা পানি। মানুষ জলের পোকা—ভাসে, আর ভাসায় চারপাশ, এবং অন্ধকার আসবার আগে টানা বারান্দার দড়িতে ঝুলিয়ে দেয় বিকেলের নরম রোদ। জীবন তো সময়ের এক অস্বচ্ছল ছায়া।

সেলাইয়ের অমূল্য বিদ্যাবলি

গলিটার পাশে আরেকটা গলি থির
মাথায় বসে আছেন আমার শিক্ষক, পরম
গল্প পাড়বার আশায় অম্লান জুতো
ক্ষত করে, মেলে ধরি মুখে
শিখে নিতে সেলাইয়ের অমূল্য বিদ্যাবলি।
ভাঙা টুকরা ইটের কঠিনতা বুকে নিয়ে
মনে মাখি পরাভূত শোক—
গলিত চোখে চোখ ফেলে, কোন দ্রবণে ভেজো বিটুমিন?
বালি ও ঢালাইয়ের অংকে কার শরীরের ছায়া নির্মিতি পায়?
আঙুলের নির্ধারিত ফাঁকে গলে পড়ছে সিগেটের ধোঁয়া—
এ-কথা বলে কাউকে ফিরিয়ে দেয়ার এক রকম আনন্দ তো আছেই,
বলল হ্যান্ডশেক।
প্যাঁচ ও পাকানো ধূম্র বিটুমিনে ভরে যাচ্ছি রোদ
নির্মিতব্য রাতের রাস্তা গুঁড়ো হওয়া ভোর
এ-ও কি নতুন নির্মাণ কোনো!
নেতিবাদী শোক পেয়ে বসে পেছনের দিন, মনস্ক দিবসের দূর-প্রেম।
ক্ষয়ে যাচ্ছি ঝড়,
জ্বলে হই ছাই,
জলে জলে ভাসা ভাসা আগামী কুড়াই—
আনন্দ-আক্রান্ত কষ্টের এ-কোন বিরোধিতায়, সম্মুখে, সমরাস্ত্রহীন
তোমাকে পোড়াবার অপার মহিমালগ্ন, কিছু তো আছেই ওইখানে

মসৃণ পথের দিকে খুঁজে নিই আমূল বন্ধুরতা

স্বজন

বান্ধব
কে?
নিজেই অচেনা।
ফলে
ক্ষয়ে ও লয়ে, নিজেকে নামাই (অথবা ওঠাই)
তোমাদের যোগ্যতার শর্তাবলি ভুলে (অথবা মেনে)
এ-জন্যই পথ মানে—দাঁড়িয়ে থাকা...
পথের আরেক অর্থ—বহু বহু দূর...

আমার পাঠ্যসূচিতে ছিল বহুমুখী শিক্ষা
শাঁখারীপট্টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কোলাহল
আলী ট্রান্সপোর্টের পেশিবহুল ওঠা-নামা
প্রাচীন পোস্টাফিস,
ফলের আড়ৎ,
বাঘের মুখওলা ছোট্ট টিউকল—
রোজ ভোরে
তার পায়ে সার-সার শিশু,
নারী ও পুরুষের যৌনগন্ধি জল
পিছল খায়
পাশে, বটধরা দালানের গায়ে পিঠ ঠেকিয়ে একটানা
ফুঁপিয়ে কাঁদছে একটা ছোট্ট জন্মদিন।
এইসব মগ্ন বধিরতা, পেয়ে বসে ঊনত্রিশের ধাবমান ট্রেন
তোমাকে কেন?
অন্ধকার গলির মুখে আমার মাস্টার মশাই
চরম মমতায় সেলাচ্ছেন জুতো
আমি তার বখে যাওয়া এক খবিশ শিক্ষানবীশ
চোখ যায় গল্লির মেয়েদের অদ্ভুত সাজ
লাল ঠোঁটে ধরা প্যাঁচ ও পাকানো ধূম্রময় রক্তিম সিগেট
আড়াল-ছিন্ন জীবনে সেলাইয়ের কাটা-ফাঁড়া দগদগে ঘা!
তদ্দরুন, ব্ল্যাকহোল লজ্জা পায়
(আসলে কি পায়?)
মুষড়ে পড়ে ফ্যাক্স, আর মেইল মেশিন
(আসলে কি পড়ে?)
হয় না শেখা সমাজতত্ত্ব কতিপয়!
শুকিয়ে যাচ্ছি—নির্মিত রাস্তার রোদ,
সরে যাচ্ছি দ্রুত—বিটুমিন শীতলগ্ন তাপ,
পলাচ্ছি—গলি, আর প্যাঁচ ও পাকানো রক্তিম সিগেট থেকে
—নষ্ট মানসে!
আমার আল্লার কসম।