ফেরা



মাজহারুল ইসলাম
অলঙ্করণ: কাজী যুবাইর মাহমুদ

অলঙ্করণ: কাজী যুবাইর মাহমুদ

  • Font increase
  • Font Decrease

গভীর রাতে রতনের বাবাকে ঘুম থেকে তুলে নিয়ে গেল পাকিস্তানি সেনারা। বাবাকে জড়িয়ে ধরে রতন খুব কাঁদছিল। বাবা ওকে আদর করে বললেন, তুমি ঘুমিয়ে পড়ো, আমি তো কালই চলে আসব।

রতনের বয়স দশ। রতনের ভাই রুতুল তার থেকে পাঁচ বছরের বড়। সে দেয়ালের সঙ্গে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখেও অশ্রু টলমল করছে। বাবা তাকেও আদর করলেন। পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে ওদের মা চোখের পানি মুছছেন। রুতুল লক্ষ করল বাবা চেষ্টা করছেন স্বাভাবিক থাকতে। কিন্তু তার চেহারায় স্পষ্ট ভয় ও আতংকের ছাপ। যাওয়ার আগে বললেন, তোমরা কান্নাকাটি করছো কেন? আমি তো কালই ফিরে আসব।

মা এবার নিজেকে সংবরণ করতে পারলেন না। জোরে শব্দ করে কেঁদে উঠলেন। তাঁর কান্না শুনে মেজর বলল, বাহেন রোনা মাত। চিন্তা করিও না। হাম কাল শামকো ভেজ দেঙ্গে। চলিয়ে হোসেইন সাব।

জলপাই রঙের জিপটা হোসেন আলীকে নিয়ে চলে গেল। বাইরে তখন ঘোর অন্ধকার। অমাবস্যার রাত। সন্ধ্যা থেকেই আকাশটা কেমন ভার হয়ে ছিল। গুমোট আবহাওয়া। এখন হঠাৎ করেই শুরু হয়েছে মেঘের গর্জন ও ঘনঘন বিদ্যুৎচমক। যে কোনো মুহূর্তে বৃষ্টি নামবে। আর্মির গাড়িটা চলে গেলে রতনের বড়ভাই ও দুই বোন ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো। পাকসেনারা যুবক ছেলেদের দেখলে মুক্তিবাহিনীর সদস্য মনে করে ধরে নিয়ে হত্যা করছে। যুবতী মেয়েদের চোখে পড়লে ওদের মাথা ঠিক থাকে না। তাই রতনের বাবা তাদের পাক আর্মিদের সামনে আসতে নিষেধ করেছিলেন। রতন ও রুতুল বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাবাকে তুলে নেওয়া জিপটার চলে যাওয়া দেখছিল।

দুই বোন রেহানা ও শাহানা মাকে জড়িয়ে ধরে কান্নাকাটি শুরু করেছে। রতনের বড়ভাই আসিফ বিরক্ত হয়ে বলল, তোরা সবাই যদি কান্নাকাটি করিস তাহলে আম্মাকে সান্ত্বনা দেবে কে? কান্নাকাটি বন্ধ করে এখন ঘুমাতে যা।

রেহানা ও শাহানা চোখ মুছতে মুছতে ঘরের ভেতর চলে গেল। আসিফ মাকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে একপর্যায়ে নিজেই শিশুর মতো কাঁদতে শুরু করল। তার কান্নার শব্দে রুতুলসহ অন্য ভাইবোনরা এসে বড়ভাইকে জড়িয়ে ধরল। সবাই একসঙ্গে কাঁদছে। মনে হলো যেন কান্নার মিছিল শুরু হয়েছে। অথচ যার সবচেয়ে বেশি কাঁদবার কথা, রতনের মা রহিমা খাতুন, তিনি পাথরের মূর্তির মতো বারান্দার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছেন।

শুরু হলো মুষলধারে বৃষ্টি। কান্না ও বৃষ্টির শব্দ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল। রতনের মা সবাইকে কান্না থামিয়ে তাদের বাবার জন্য দোয়া করতে বলে নিজে ঘরে গিয়ে জায়নামাজে দাঁড়ালেন।

সারদা পুলিশ একাডেমিতে হোসেন আলী প্রধান হিসাবরক্ষক। ট্রেজারির একটা চাবি তাঁর কাছে, আরেকটা চাবি থাকে একাডেমির অধ্যক্ষের কাছে। অধ্যক্ষ পদ্মা পাড়ি দিয়ে ভারত চলে গেছেন। পুলিশ একাডেমি এখন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দখলে। ট্রেজারির তালা ভেঙে নগদ অর্থ লুটপাট হয়েছে। সে বিষয়ে তদন্ত করার জন্য গভীর রাতে হোসেন আলীকে ধরে নিয়ে গেছে পাক সেনারা।

পুলিশ একাডেমিতে পাক আর্মিরা আক্রমণ করে ১৩ এপ্রিল। তার আগের রাতে পরিবার নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে এখানে সেখানে ঘোরাঘুরি করে অবশেষে পাবনা জেলার কাছাকাছি মুলাডুলিতে নিজ বড়ভাইয়ের বাড়িতে আশ্রয় নেন হোসেন আলী। এরমধ্যে সরকারি কর্মচারীদের কাজে যোগদানের ঘোষণা এলে তিনি রাজশাহী পুলিশ লাইনে এসে যোগদান করেন। হোসেন আলী ভীতু প্রকৃতির মানুষ। পরিবার-পরিজন ছেড়ে তার পক্ষে মুক্তিযুদ্ধে যাওয়া সম্ভব ছিল না। কিন্তু তিনি মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের মানুষ। লুকিয়ে প্রায়ই মুক্তিযোদ্ধাদের নানাভাবে সহযোগিতা করে থাকেন।

রাজশাহীতে কাজে যোগদানের পর তাঁর দীর্ঘদিনের সহকর্মী আব্দুর রহমানের অনুরোধে তাঁর আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়ে ওঠেন। বাড়িটা খালি পড়ে আছে। বাড়ির লোকজন সবাই গোদাগাড়ি বর্ডার দিয়ে ভারতে চলে গেছে। মুলাডুলি থেকে প্রতিদিন রাজশাহী আসা-যাওয়াটা কষ্টসাধ্য বিষয়। অল্প কিছু বাস চলাচল করে। সেগুলোতে প্রায়ই বসার জায়গা পাওয়া যায় না। রাস্তায় দুই-তিন জায়গায় চেকপোস্ট। ডান্ডি কার্ড বের করে বসে থাকতে হয়। সবকিছু মিলে রহমান সাহেবের অনুরোধ মেনে নিয়ে এখানে আসেন হোসেন আলী। অবশ্য বড়ভাই তাঁকে চাকরিতে যোগ দিতে নিষেধ করেছিলেন। বলেছিলেন, দেখিস, দেশ একদিন স্বাধীন হবে। মানুষ জেগে উঠেছে। পাকিস্তানিরা এ যুদ্ধে হারবে নিশ্চয়ই। হয়তো সময় লাগবে আমাদের স্বাধীন হতে। তুই চাকরিতে আর ফিরে যাস না। ওদের কোনো বিশ্বাস নেই—কখন কী করে ফেলে। হোসেন আলী কোনো কথা বলেন না। চুপ করে থাকেন। তিনি জানেন বড়ভাইয়ের কথায় দ্বিমত করার কিছু নেই। তবু শেষ পর্যন্ত হোসেন আলী চাকরিতে যোগ দেন।

নামাজ শেষ করে জায়নামাজে বসে রহিমা খাতুন কথাগুলো ভাবছিলেন। ভাসুরের কথা শুনে কাজে যোগ না দিলে আজ হোসেন আলীকে এ অবস্থায় পড়তে হতো না।


পরদিন সকাল থেকে রুতুল ও তার ভাইবোনরা বারান্দায় বসে আছে জলপাই রঙের গাড়িটার অপেক্ষায়। সন্ধ্যা পার হয়ে রাত হয়ে গেল। গাড়ি এলো না। রুতুল জানে না তার বাবাকে আর্মিরা কেন ধরে নিয়ে গেছে। মাকে জিজ্ঞেস করে একবার বকা খেয়েছে। মা বলেছেন, ছোটদের সবকিছু জানতে নেই। একথা শোনার পর রুতুল মন খারাপ করে মার দিকে তাকিয়ে থাকে। রহিমা খাতুন মুহূর্তের মধ্যে ছেলেকে বুকের মধ্যে টেনে নিয়ে বললেন, অফিসের কাজের জন্য নিয়ে গেছে বাবা। আজকালের মধ্যেই চলে আসবে। তুমি বাবার জন্য দোয়া করো, বাবা যেন তাড়াতাড়ি চলে আসেন।

রুতুল নির্বাক হয়ে মার দিকে তাকিয়ে আছে। মা ওকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরলেন। নিঃশব্দে কাঁদছেন রহিমা খাতুন। মায়ের চোখ থেকে কয়েক ফোঁটা পানি ওর মাথায় এসে পড়ল।

রহিমা খাতুন আজ রোজা রেখেছেন। সন্ধ্যায় এক গ্লাস পানি আর একমুঠ মুড়ি দিয়ে রোজা ভাঙলেন তিনি। ছেলেমেয়েরা অনেক চেষ্টা করেও ভাত খাওয়াতে পারেনি। হোসেন আলী ফিরে এলে একসঙ্গে ভাত খাবেন তিনি। গভীর রাত পর্যন্ত সবাই হোসেন আলীর অপেক্ষায় বসে থাকলেন।

মেজর তার কথা রাখেনি। কথা রাখবে না সেটাই স্বাভাবিক। সারা দেশে তারা নিরীহ মানুষদের নৃশংসভাবে হত্যা করছে, বাড়িঘর পুড়িয়ে ফেলছে। ওরা মানুষ না, ওরা পশুর চেয়েও অধম।


দ্বিতীয় দিনও পার হয়ে গেল। হোসেন আলী ফিরে এলেন না। রহিমা খাতুন সারা রাত জেগে থাকেন ফিরে আসার অপেক্ষায়। তাঁর সঙ্গে দুই কন্যা রেহানা ও শাহানা জেগে থাকে। গতকাল থেকেই বাড়িতে চুলা বন্ধ। আশপাশের বাড়ি থেকে খাবার দিয়ে যায়। রহিমা খাতুন পানি ছাড়া কোনো কিছু মুখে দেন না। সারা দেশে যুদ্ধ চলছে। প্রতিদিনই নানা ধরনের খবর আসছে।

আসিফের মনটা আজ খুব খারাপ। নিজের বাবার কোনো খোঁজ নাই, এরমধ্যে খবর এলো তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু মুক্তিযোদ্ধা শিবলি নিহত হয়েছে। শিবলি ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ত। পাক সেনারা জীবিত অবস্থায় তার চোখ উপড়ে ফেলে। শরীরের চামড়া ছিলে লবণ ছিটিয়ে দেয়। তারপরেও শিবলির মুখ থেকে ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ কিংবা মুক্তিযোদ্ধাদের বিষয়ে কোনো রকম তথ্য বের করতে পারেনি। অবশেষে ৯ জুন পাক সেনারা তাকে বড়াল নদীর পাড়ে নিয়ে গিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে।


তৃতীয় দিন দুপুরে সারদা থেকে ইয়াসিন মিস্ত্রি এলো রহিমা খাতুনের সঙ্গে দেখা করতে। সে পুলিশ একাডেমিতে মিস্ত্রির কাজ করে। কাঠ, লোহা-লক্কর সব ধরনের কাজেই পারদর্শী। হোসেন আলীর সঠিক কোনো খবর সে দিতে পারল না। তবে লোকমুখে শুনেছে হোসেন আলীর মতো আরো কয়েকজনকে একাডেমির গেস্টহাউজের একটা কক্ষে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। রহিমা খাতুনকে ইয়াসিন মিস্ত্রি বলল, স্যারের মতো ভালো মানুষ আমি খুব কম দেখেছি। আপনি চিন্তা করবেন না আম্মা। স্যারের কিছু হলে আমি সব ফাঁস করে দেব। ইয়াসিন মিস্ত্রি রহিমা খাতুনকে আম্মা বলে ডাকে।

রহিমা খাতুন অবাক হয়ে বললেন, তুমি কী ফাঁস করবে?

আমি নিজে লকারের তালা ভেঙে দিয়েছি। আমার সামনে চারজন পাক সেনা লুটপাট করেছে সব। রাত দশটায় আমাকে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে বুকে বন্দুকের নল ঠেকিয়ে এই কাজ করিয়েছে।

কী বলছো?

জ্বি আম্মা, নিজের জীবন বাঁচানোর জন্য কাজটা করতে বাধ্য হয়েছিলাম। আমি রাজি না হলে ওই রাতেই আমাকে গুলি করে মেরে ফেলত।

রহিমা খাতুনের বুকটা কেঁপে উঠল। কী সাংঘাতিক! নিজেরা লুটপাট করে নিরীহ মানুষটাকে রাতের অন্ধকারে ধরে নিয়ে গেল। ঘরের খাবার ছাড়া মানুষটা একবেলাও ঠিকমতো খেতে পারে না। অথচ আজ তিন দিন পার হয়ে গেছে। না জানি কী অবস্থায় আছে। নিজের অজান্তেই তাঁর চোখ দিয়ে কয়েক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল।

শাড়ির আঁচলটা টেনে চোখ মুছতে মুছতে রহিমা খাতুন বললেন, তোমার এসব কথা কাউকে বলার দরকার নাই। ওরা জানলে তোমাকে মেরে ফেলবে।

স্যারের জন্য আমি জীবন দিতেও রাজি আছি আম্মা। স্যারের কিছু হলে আমি অবশ্যই সবকিছু ফাঁস করে দেব।

ইয়াসিন মিস্ত্রির চলে যাওয়ার সময় তাকে রহিমা খাতুন বললেন, তোমার স্যারের কোনো খবর পেলে আমাদের জানাবে।

আপনি চিন্তা করবেন না আম্মা। আমি নিজে এসে খবর দিয়ে যাব।

ওইদিন গভীর রাতে পাক আর্মিরা ইয়াসিন মিস্ত্রিকে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে পদ্মা নদীর পাড়ে গুলি করে হত্যা করে। পরে তার লাশ পেট্রোল দিয়ে আগুন ধরিয়ে পুড়িয়ে ফেলে। খবরটা শুনে রহিমা খাতুন খুব কান্নাকাটি করলেন।


চতুর্থ দিন পার হয়ে গেল। হোসেন আলীর কোনো খবর পাওয়া গেল না। নানা গুজব কানে আসতে লাগল। দুপুরে বাড়ির কাছের মুদি দোকানদার ইদ্রিস আলী রুতুলকে জানাল, গতকাল রাতে নাকি পুলিশ একাডেমিতে অনেক গুলির শব্দ পাওয়া গেছে। তার এক আত্মীয় একাডেমি সংলগ্ন কুঠিপাড়া গ্রামে থাকে। আজ রাজশাহী এসেছিল। সে নিজের কানে গুলির শব্দ শুনেছে। অনেক মানুষকে নৃশংসভাবে হত্যা করে পদ্মায় ভাসিয়ে দিয়েছে। খবরটা শুনে রুতুল আঁতকে উঠল। তার আব্বা তো পুলিশ একাডেমিতেই আছে। রুতুল দোকানে এসেছিল দুই/একটা দরকারি জিনিস কিনতে। কোনো কিছু না নিয়েই সে বাড়ির দিকে রওনা হলো।

সারা দেশের অবস্থা যে ভালো না সেটা বিবিসির খবর শুনলেই বোঝা যায়। সন্ধ্যায় মোড়ের চায়ের দোকানে অনেকেই রেডিওতে বিবিসির খবর শুনতে আসে। রহিম মিয়া সে সময় সবাইকে বিনা পয়সায় আদা চা খাওয়ায়। রুতুল মাঝে মাঝে সেখানে যায়। আজ তার যাওয়ার ইচ্ছা ছিল না। খবর শুনে ফেরার সময় রহিম চাচা বলল, তোমার আব্বার কোন খবর পাইছো?

না চাচা।

শোনো, আর্মিদের হাতে ধরা পড়লে কেউ কি আর কখনো ফেরত আসে? তোমার বড়ভাইকে বলো খোঁজখবর নিয়া লাশ উদ্ধার করতে পারে কি না।

আপনি না জেনে এভাবে যা খুশি বলবেন না। তাছাড়া আব্বা ধরা পড়েনি। বাসা থেকে অফিসের কাজের জন্য নিয়ে গেছে।

সেটা তো আরো ভয়ংকর।

রহিম চাচার ওপর অসম্ভব রাগ হলো রুতুলের। সে ঠিক করল আর কখনো এখানে আসবে না।

এরমধ্যে সেখানে বসা আরেকজন বলল, শুনেছি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শত শত মানুষকে ধরে এনে নির্মমভাবে হত্যা করে মাটিচাপা দিচ্ছে...।

তার কথা শেষ হওয়ার আগেই রুতুল হনহন করে হেঁটে বাসার দিকে রওনা হলো। রাগে তার শরীর জ্বলে যাচ্ছে। মনে মনে বলছে, কোথায় এরা আমাকে সান্ত্বনা দিবে, দুইটা ভালো কথা বলবে। তা না, উল্টো নিষ্ঠুরের মতো না জেনে শুনে আব্বাকে নিয়ে কী সব কথা বলল! এদের মনে কি কোনো দয়ামায়া নাই?

অসম্ভব মন খারাপ করে বাড়ি ফিরল রুতুল। কারো সঙ্গে কথা না বলে সোজা ছাদে উঠে গেল। অমাবস্যা এখনো কাটেনি। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। সেইসঙ্গে আকাশ মেঘলা, বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। যে কোনো মুহূর্তে বৃষ্টি নামবে। ছাদের বাতি নিভানো। এক কোনায় রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে রুতুল। রহিম চাচার কথাগুলো রুতুলের মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। তিনি কি কোনো খবর পেয়েছেন আব্বার? তা নাহলে এভাবে কথাগুলো বললেন কেন? প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের মৃত্যুর খবর আসছে। তাহলে কি আমার আব্বাও...? একবার মনে হলো দৌড়ে চাচাকে জিজ্ঞেস করে আসে তিনি কি সত্যি কোনো খবর পেয়েছেন?

কিন্তু সাহস পেল না রুতুল। কারণ যদি রহিম চাচা বলেন, অনুমান করে না গো, আমি জেনেই বলছি। তোমার আব্বারে...। রুতুল একথা শুনতে চায় না। প্রয়োজনে সারা জীবন আব্বার জন্য অপেক্ষা করবে। সে বিশ্বাস করতে চায় না যে এরকম কিছু ঘটতে পারে। কী সব উলটাপালটা ভাবছে সে! একা থাকলে মাথার মধ্যে আজেবাজে চিন্তা আরো বেশি কাজ করে। তাই এক দৌড়ে ছাদ থেকে নেমে মার কাছে ছুটে গেল। রুতুলের ইচ্ছা ছিল মাকে কিছুক্ষণ জড়িয়ে ধরে থাকবে। সেটা হলো না, কারণ মা বড়ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলছেন।

পাশের বাড়ির একজন মুরব্বি রুতুলের বড়ভাই আসিফকে ডেকে পরামর্শ দিয়েছেন মসজিদে একটা দোয়ার ব্যবস্থা করতে। কথাটা শুনে রহিমা খাতুন বললেন, বিপদ-আপদে আল্লাহ-খোদার নাম নেওয়া ছাড়া তো কোনো গতি নাই। ফজরের নামাজের সময় তুমি ইমাম সাহেবের সঙ্গে কথা বলে কালই দোয়ার ব্যবস্থা করো।


পরদিন আসরের নামাজের পর হেতেম খা মসজিদে দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হলো। সকাল থেকে কোরআন খতম দেওয়া হয়েছে। মসজিদে মুসল্লির সংখ্যা কম। শহর থেকে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য অনেকেই গ্রামে চলে গেছেন। যারা আছেন ভয়ে ঘর থেকে বের হতে চায় না। রুতুলরা তিন ভাই, আত্মীয়স্বজন ও এলাকার মানুষ মিলে বিশজনের বেশি হবে না। আসরের নামাজ শেষে হুজুর দোয়া শুরু করলেন। এরপর শুরু হলো মোনাজাত। মোনাজাত শুরুর আগে হুজুর বললেন, হোসেন আলী সাহেবের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে আমরা এখন রাব্বুল আলামিনের কাছে হাত তুলে দোয়া করব...। আপনারা সবাই একবার সূরা ফাতেহা, তিনবার সূরা এখলাস ও একবার দরুদ শরিফ পড়েন। হুজুরের কথা শুনে রুতুল হতবাক। বড়ভাইকে সে বলল, হুজুর এসব কী বলছেন? আব্বাকে সত্যি সত্যি ওরা মেরে ফেলেছে? আর যদি মেরেই ফেলে সে খবর আমরা জানার আগে হুজুর জানলেন কিভাবে?

বড়ভাই ইশারা দিলেন মোনাজাতের মধ্যে কথা না বলার জন্য।

চোখ দিয়ে ঝরঝর করে পানি ঝরছে রুতুলের। গতকাল সন্ধ্যায় রহিম চাচাও একই ধরনের কথা বলছিলেন। তাহলে কি বড়ভাই কোনোকিছু গোপন করছেন তাদের কাছে? নাকি হুজুর অনুমান করে বলছে? কোনটা আসলে সত্যি? রুতুলের ইচ্ছা করছে উঠে গিয়ে হুজুরের মুখ চেপে ধরে। মুক্তিযোদ্ধাদের বলছেন, ‘আমাদের বিপদগামী মুসলিম ভাই...।’ রাগে রুতুলের শরীর কাঁপছে। হঠাৎ মসজিদের আশপাশের দোকানগুলোর ঝাঁপ নামানোর শব্দ কানে এলো। মানুষ দৌড়াদৌড়ি করছে। কেউ কেউ চিৎকার করছে ‘আর্মি আসছে’ ‘আর্মি আসছে’ বলে। পাক আর্মির গাড়ি দেখলেই মানুষ ভয়ে দোকানপাট বন্ধ করে পালায়।

রুতুল মোনাজাত ফেলে রাস্তার ওপর গিয়ে দেখে, সেদিন রাতের সেই জলপাই রঙের জিপটা তাদের বাড়ির দিকে যাচ্ছে। রাস্তায় একটা কাকপক্ষীও নেই। সবাই ভয়ে পালিয়েছে। রুতুল জিপের পেছনে পেছনে দৌড়াতে শুরু করল। জিপটা ওদের বাড়ির সামনে গিয়ে থামল। রুতুল যেন উড়ে এসে দাঁড়াল জিপের কাছে। রুতুলের আব্বা জিপ থেকে নামলেন। যে কাপড়ে ঘর থেকে বেরিয়েছিলেন তা-ই পরনে। পাঁচ দিনে এ কী হাল হয়েছে তাঁর! চোখ-মুখে কেমন একটা উদ্ভ্রান্তির ছাপ। কালি পড়েছে চোখের নিচে। মুখটা শুকিয়ে অর্ধেক হয়ে গেছে। রুতুলের মনে হলো দাঁড়াতে বা হাঁটতে আব্বার খুব কষ্ট হচ্ছে। প্রথমে রুতুলকে দেখেননি তিনি। যখনই ওকে দেখলেন, তাঁর চোখ দুটো অশ্রুসজল হয়ে উঠল। জড়িয়ে ধরলেন ওকে। এর মধ্যে রুতুলের অন্য ভাইবোনেরা এসে দাঁড়িয়েছে বাবাকে ঘিরে।

একটু দূরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে রহিমা খাতুন তখন আঁচলে অশ্রু আড়াল করতে চাইছেন।

পাদটীকা
পাঁচ দিন হোসেন আলীকে আটকে রাখার পর তদন্তে বেরিয়ে এসেছিল—কয়েকজন পাক সেনা মিলে লকার ভেঙে টাকা লুটপাট করেছে। লকার ভাঙার কাজটি করিয়েছে তারা ইয়াসিন মিস্ত্রিকে দিয়ে। সেকারণে ইয়াসিন মিস্ত্রিকে হত্যা করা হয়। এই সত্য প্রকাশ করা যাবে না দেখে পুলিশ একাডেমির চারজন সিপাইকে দোষী করে তদন্ত রিপোর্ট তৈরি করা হয়। রিপোর্টে লেখা হয়, এই সিপাইরা লকার ভেঙে টাকা লুট করে পদ্মা নদী পাড়ি দিয়ে ভারতে চলে গেছে।

ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'



তাহমিদ হাসান
ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'

ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'

  • Font increase
  • Font Decrease

বইয়ের নাম: মানচিত্রের গল্প

লেখক: ড. মাহফুজ পারভেজ

প্রকাশক: শিশু কানন

প্রকাশকাল: ২০১৮

গল্প পড়তে সবারই ভালো লাগে। যারা ইতিহাস, রাজনীতি, ভূগোলের কঠিন বিষয় ও বড় বড় বই পড়তে ভয় পান, তারাও গল্প আকারে সেসব সোৎসাহে পাঠ করেন। ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প' তেমনই এক গ্রন্থ, যা ভূগোল, মানচিত্র, অভিযান সংক্রান্ত সহস্র বর্ষের ইতিহাস, আবিষ্কার ও অর্জনকে গল্পের আবহে, স্বাদু ভাষায় উপস্থাপন করেছে। এ গ্রন্থ ছাড়াও তিনি মুঘল ইতিহাস, দারাশিকোহ, আনারকলি প্রভৃতি ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব ও বিষয়কে প্রাঞ্জল ভাষায় তুলে ধরেছেন একাধিক গ্রন্থের মাধ্যমে।

ড. মাহফুজ পারভেজ মূলত একজন কবি, কথাশিল্পী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। তিনি ১৯৬৬ সালের ৮ মার্চ কিশোরগঞ্জ শহরের কেন্দ্রস্থল গৌরাঙ্গ বাজারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগে পড়াশুনা করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউজিসি ফেলোশিপে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করে। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগে প্রফেসর পদে নিয়োজিত আছেন।

তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ গুলো মধ্যে আমার সামনে নেই মহুয়ার বন, নীল উড়াল, রক্তাক্ত নৈসর্গিক নেপালে, বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, বিদ্রোহী পার্বত্য চট্টগ্রাম ও শান্তিচুক্তি, রক্তাক্ত নৈসর্গিক নেপালে ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ রয়েছে।

https://www.rokomari.com/book/author/2253/mahfuz-parvez

লেখকের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ গুলোর মধ্যে ২০১৮ সালে প্রকাশিত 'মানচিত্রের গল্প' বইটি রয়েছে। লেখক বইটিকে ১৯ টি অধ্যায়ে ভাগ করছে। বইটির মধ্যে মানচিত্র আবিষ্কার কিভাবে শুরু হয়েছে এবং আবিষ্কারে পিছনে যাদের অবদান ছিল সেই সব বিস্তারিত তুলে ধরেছেন।

মানচিত্র বা ম্যাপ শব্দটি আদিতে ল্যাটিন 'মাপ্পামুন্ডি' শব্দটি থেকে এসেছে। 'মাপ্পা' অর্থ টেবিল-ক্লথ আর 'মুনডাস' মানে পৃথিবী। অতি প্রাচীন সভ্যতায় চীনারা প্রথম মানচিত্র অঙ্কনে যাত্রা শুরু করে, কিন্তু সেই সব মানচিত্রের আজ অস্তিত্ব নেই। বইটির মধ্যে এইসব ক্ষুদ্র তথ্য থেকে শুরু টলেমির মানচিত্র, চাঁদের মানচিত্র সহ আরো অজানা তথ্য গুলো লেখক বইটির মধ্যে তুলে ধরেছে।

লেখক বইয়ের ১৯ টি অধ্যায়ের মধ্যে টলেমির মানচিত্র, ভাস্কো ডা গামা আর কলম্বাসের লড়াই, রেনেলের ' বেঙ্গল অ্যাটলাস', 'আই হ্যাভ ডিসকভার দ্য হাইয়েস্ট মাউন্টেন অব দ্য ওয়ার্ল্ড ', মানচিত্র থেকে গ্লোব ইত্যাদি সব উল্লেখযোগ্য শিরোনামে বইটি সজ্জিত করছেন।

পরিশেষে ১৯ টি অধ্যায়ের মধ্যে শেষ দুই অধ্যায়ে 'পরিশিষ্ট-১, পরিশিষ্ট-২' শিরোনামে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য মানচিত্র এবং মানচিত্র প্রণয়নে কয়েকজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের কথা বইটিতে তুলে ধরেন।

কয়েকটি ঐতিহাসিক মানচিত্রের মধ্যে---

ব্যাবিলনে প্রাপ্ত ভূ মানচিত্র- যেটিতে ইউফ্রেটিস নদীর তীরে ব্যাবিলনকে আর্বতন করে দেখানো হয়েছে।

অ্যানাক্সিমান্ডারের মানচিত্র- পৃথিবীর প্রথম দিকের আদি মানচিত্রগুলোর মধ্যে এইটি অন্যতম, যা অঙ্কন করেছিল অ্যানাক্সিমান্ডার। এই মানচিত্রে ইজিয়ান সাগর এবং সেই সাগরকে ঘিরে মহাসাগরের এইসব দেখানো হয়েছে।

আল ইদ্রিসি'র মাপ্পা মুনদি- বিপুল মুসলিম মনীষীর মধ্যে বিখ্যাত ছিলেন আল ইদ্রিসি। আফ্রিকা, ভারত মহাসাগর ও দূরপ্রাচ্য বা ফারইস্ট অঞ্চলকে তিনি তাঁর মানচিত্রে ফুটিয়ে তুলে।

ফ্রা মায়োরো'র মানচিত্র- ভেনিসীয় সন্ন্যাসী ফ্রা মায়েরোর প্রণীত মানচিত্রটি একটি কাঠের ফ্রেমের ভেতরে পার্চমেন্টে আঁকা বৃত্তাকার প্লানিস্ফিয়ার।

হুয়ান দে লা কোসা'র মানচিত্র- তিনি ছিলেন স্পেনের বিজেতা৷ তিনি বহু ম্যাপ ও মানচিত্র তৈরি করেছিলেন তার মধ্যে প্রায় অধিকাংশ হারিয়ে গেছে বা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। ১৫০০ সালে প্রণীত তাঁর ম্যাপ বা মাপ্পা মুনদি এখনও রয়েছে, এই মানচিত্রে আমেরিকা মহাদেশকে চিহ্নিত করা সর্বপ্রথম ইউরোপীয় মানচিত্র।

মানচিত্র প্রণয়নে কয়েকজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব--

হাজি মহিউদ্দিন পিরি-- তাঁর পুরো নাম হাজি মহিউদ্দিন পিরি ইবনে হাজি মুহাম্মদ। তিনি ছিলেন উসমানী-তুর্কি সাম্রাজ্যের নামকরা অ্যাডমিরাল বা নৌ-সেনাপতি এবং বিশিষ্ট মানচিত্রকর।

আল ফারগনি- তাঁর পুরো নাম আবু আল আব্বাস আহমেদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে কাসির আল ফারগনি। অবশ্য ইউরোপের মানুষের কাছে তিনি বিজ্ঞানী আলফ্রাগানুস নামে পরিচিত ছিলেন। টলেমির একটি গ্রন্থ 'আলমাগেস্ট'- এর ভিত্তি করে সহজ সরল ভাষায় লেখা তাঁর বিখ্যাত বই 'এলিমেন্ট অব অ্যাস্ট্রোনমি অন দ্য সেলেস্টয়াল মোশান'।

বার্তোলোমে দে লাস কাসাস-- তিনি সরাসরি মানচিত্র চর্চায় অংশগ্রহণ করেন নি বটে, তবে তাঁর দ্বারা মানচিত্র চর্চা উপকৃত হয়েছে। তিনি ক্যারিবীয় অঞ্চলে ব্যাপক ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সবিস্তারে লিখে গিয়েছিলেন।

লেখক এই বইটিতে খুব সুন্দর উপস্থাপনার মাধ্যমে জটিল তথ্য গুলোকে সহজে তুলে ধরেছে৷ ২৭ শে মার্চ আমার জন্মদিনে আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ড. মাহফুজ পারভেজ স্যার এই বইটি উপহার দেন৷ এই বইটি পড়ে ইতিহাস, রাজনীতি, ভূগোলে আগ্রহী পাঠক নিজের জ্ঞানকে প্রসারিত করতে পারবেন এবং নতুন কিছু জানতে পারবেন, একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

তাহমিদ হাসান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস স্নাতক সম্মান শ্রেণির শিক্ষার্থী

;

চা-নগরীতে এক কাপ চা



কবির য়াহমদ
চা-নগরীতে এক কাপ চা

চা-নগরীতে এক কাপ চা

  • Font increase
  • Font Decrease

[চা-শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির ন্যায্য দাবির প্রতি সংহতি]

এখানে-ওখানে জন্ম নিয়েছে ডাইনোসর-টিকটিকি
এখানে-ওখানে জন্ম নিয়েছে বেনামী বৃক্ষরাজি
সবকিছু থমকে যায়, সবকিছু থমকে থাকে জ্যোতির্ময় ছায়ায়।

ঈশ্বর; জন্মে শাপ আছে, কত খেলা-ছেলেখেলা
এ পাড়া, ও পাড়া বাঙময় সুঘ্রাণ, সঞ্জীবনী মায়া
দুই হাতে স্বর্গ-নরক, সুমিষ্ট কল্লোল; বিভাজন।

ভূগোলের পাঠে সমূহ ভুল, আকাশে নরক স্রোতহীন
উড়ুক্কু ভূ-স্বর্গ বাতাসে ভাসে এখানে-ওখানে
তবু স্বর্গ তার কালে নেমেছে ধরায়, ত্রিকোণ পাতায়
সবুজাভ মিহি মিহি ষোল আনা যৌনকলা!

ঈশ্বর তুমি পান করে যাও এক কাপ সুপেয় চা
মানবগোষ্ঠী বারে বারে জন্মাবে এই বৃহত্তর চা-নগরীতে।


তোমার চায়ের কাপে একটা মাছি পড়ুক
তার নিত্যকার অর্জনে হয়ে উঠুক বিষগন্ধি-মৌ
প্রসন্ন বিকেলে একপশলা বৃষ্টি আসুক
ভিজিয়ে দিয়ে যাক সত্যাসত্য ওড়না।

একদিন মেঘকে বলেছিলাম একান্তে
চুপসে দিতে আপাতদৃশ্য সমূহ প্রসাধন
অন্তর্বাসের অন্তর্হিত চেহারা ভাসুক
কোন এক মাছরাঙার ঠোঁটে।

আমাদের ধূম্রশালায় ইদানীং টান পড়েছে
তাই আশ্রয় নিয়েছে সব গার্লস কলেজে
ওখানে নিত্য বালিকার সহবাস-
দৃষ্টিবিভ্রমে কেউ কেউ যায় চোখের আড়ালে।

একটা মাছি ঘুরঘুর করতে থাকুক এক পেয়ালা চায়ে
একটা প্রসাধন দোকানী হন্যে হয়ে ছুটে আসুক মাছির পেছনে
আজ একটা মেঘখণ্ড আকাশে ব্যতিব্যস্ত হোক একপশলা বৃষ্টি হতে

আমাদের চা মহকুমায় আজ বৃষ্টি হোক ওড়নার ওজন বাড়িয়ে দিতে।


মুখোমুখি বসে গেলে এক কাপ চা হোক
অন্তত এক জোড়া ঠোঁটে চুমু খাক নিদেনপক্ষে একটা সিগারেট
আরেক জোড়া ঠোঁটে হাহাকার জাগুক অনন্ত শীতরাত্রির মত।

তোমার ঠোঁটগুলো ক্ষুদ্র অভিলাষী প্রগাঢ় আকাঙ্ক্ষার তরঙ্গ-বঞ্চিত নদী
মোহনা খুঁজে খুঁজে হয়রান হয়, এক ফোঁটা জল, হায়
শেষ কবে ঢেলেছিল জল কেউ- অসহ্য ব্যথার কাল গৃহহীন জনে।

অবনত ইথার মিশে গেছে কাল সন্ন্যাস জীবনে
তবু মুখোমুখি কাল, তবু এক কাপ চা
একটা চুমু হোক চায়ের কাপে, একটা মাত্র হোক আজ অন্যখানে
যারা নেমেছিল পথে তাদের পথ থেমে আসুক পথে
সব পথ আজ মিশে যাবে চাপের কাপে, ঠোঁটের সাগরে।

ওহে ঈশ্বর, তোমার গোপন দরোজা খুলে দাও
প্রার্থনার ভাষা নমিত হোক আজ চায়ের কাপে, ক্রিয়াশীল রাতে।

;

কলকাতায় অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
কলকাতায় অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু

কলকাতায় অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশে বই বিক্রির জগতে বাতিঘর একটি বিপ্লব আনতে সক্ষম হয়েছে। বই বিক্রির পাশাপাশি বইপড়া, চা-কফির আড্ডাসহ নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা এনেছে প্রতিষ্ঠানটি। তারই আদলে এবার কলকাতার কলেজ স্ট্রিটে অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু হয়েছে।

গত ১১ আগস্ট প্রদীপ জ্বালিয়ে বুক ক্যাফেটি উদ্বোধন করেন প্রকাশক সুধাংশু শেখর দে, লেখক কমল চক্রবর্তী, অমর মিত্র, কলকাতা লিটল ম্যাগাজিন গবেষণা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা সন্দীপ দত্ত, বাংলাদেশের প্রকাশক দীপঙ্কর দাস, মনিরুজ্জামান মিন্টু।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন কবি রুদ্র গোস্বামী, প্রকাশক রূপা মজুমদার, বাঁধাইকর্মী অসীম দাস, প্রেসকর্মী দীপঙ্কর, পাঠক তন্ময় মুখার্জি ও সৌম্যজিৎ, নূর ইসলাম, বাসব দাশগুপ্ত, লেখক সমীরণ দাস, সুকান্তি দাস, শুদ্ধসত্ত্ব ঘোষসহ প্রায় ২শ পাঠক।

আয়োজকরা জানান, বুক স্টোর ও ক্যাফে এখন একটি জনপ্রিয় ধারা। সেই ধারায় শুধু নতুন একটি সংযোজন নয়, অভিযান বুক ক্যাফে অনন্য হয়ে উঠল বাংলা প্রকাশনা ও মুদ্রণের ২৪৪ বছরের ইতিহাসকে ফুটিয়ে তোলার মধ্য দিয়ে। প্রায় একশ বছরের পুরোনো ছাপার মেশিন রাখা হয়েছে এখানে। দেওয়ালে দেওয়ালে মুদ্রণ ও প্রকাশনায় অবদান রাখা ব্যক্তি ও সংস্থার ছবি স্থান পেয়েছে। চায়ের কাপে রয়েছে বাংলার প্রথম মুদ্রণের বর্ণমালা।


বাংলাদেশের অভিযান প্রকাশনীর কর্ণধার কবি মনিরুজ্জামান মিন্টু বলেন, ‘বাংলাদেশের বইয়ের বিশাল সমারোহ ও অভিযান বুক ক্যাফের এই পথচলা বাংলা বইয়ের বাজারকে সমৃদ্ধ করবে। শুধু বইয়ের দোকান নয়, বুক ক্যাফে! ফলে শিল্পের অপরাপর মাধ্যমগুলোও কোনো না কোনোভাবে এটাকে যুক্ত করবে।’

দেড় দশক ধরে বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থার উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন কবি ও কথাসাহিত্যিক ড. রাহেল রাজিব। তিনি বলেন, ‘বই বিষয়ক যে কোনো আয়োজন একটি সমাজকে সামনে এগিয়ে নেয়। অভিযান বুক ক্যাফের অবস্থান কলকাতা কলেজ স্ট্রিট হলেও সেখানে বাংলাদেশের বইয়ের সমাহার এবং শিল্পবিষয়ক অপরাপর বিষয়গুলোর সম্পৃক্তি প্রতিষ্ঠানটিকে এগিয়ে নেবে।’

 

;

স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক



তৌফিক হাসান, কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তা২৪.কম
স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক

স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক

  • Font increase
  • Font Decrease

আমেরিকা ভ্রমণে বাঙালির অন্যতম গন্তব্যের একটি হচ্ছে স্ট্যাচু অব লিবার্টি। স্ট্যাচু অব লিবার্টির সামনে দাঁড়িয়ে একটা ছবি না উঠলে যেন আমেরিকাপূর্ণই হবে না! আমেরিকার সিম্বলিক আইকন হচ্ছে এই স্ট্যাচু অব লিবার্টি। ভাস্কর্যটি আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক। তাই বাংলাদেশ থেকে রওনা হবার আগেই গন্তব্য হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছিল নিউইয়র্কের স্ট্যাচু অব লিবার্টি।

পরিকল্পনা ছিল আমার স্ত্রীর এবং তার ছোট বোনের পরিবারের সকলে মিলে একসাথে স্ট্যাচু অফ লিবার্টি দেখতে যাব। কিন্তু ভায়রা ভাইয়ের বিশেষ কাজ পরে যাওয়ায় সিদ্ধান্ত হলো তার এক বন্ধু নীলফামারীর জিএম ভাই আমাদের ড্রাইভ করে নিয়ে যাবে নিউইয়র্কে। যাত্রার দিন ঘড়ির কাটা মেপে জিএম ভাই হাজির, রেডি হয়েই ছিলাম তাই ঝটপট বেরিয়ে পরলাম। পেনসিলভেনিয়ার লেভিট্টাউনে তখন সকাল ৮টা বাজে, বাসা থেকে বের হবার সাথে সাথেই সূর্য মামার ঝাঁজ বুঝতে পারলাম। সূর্য এমন তেতেছে দিনটা যে খুব একটা সুখকর হচ্ছে না তা বেশ বুঝতে পারলাম। বিগত কয়েক বছরের তুলনায় এবারের গ্রীষ্মে বেশি গরম অনুভূত হচ্ছে আমেরিকাতে। স্থানীয়দের মতে এরকম গরম বিগত কয়েক বছরে তারা দেখতে পায়নি। শুধু আমেরিকাতে নয়, এই বছর ইউরোপেও বেশ গরম অনুভূত হচ্ছে আর আমাদের দেশের কথা না হয় নাই বললাম।

লিবার্টি আইল্যান্ড

গাড়ির চাকা সচল আবার কিছুক্ষণ পরেই আমরা আই-৯৫ হাইওয়েতে গিয়ে পড়লাম, এই এক রাস্তা ধরেই প্রায় দুই থেকে আড়াই ঘণ্টায় আমরা পৌঁছে যাবো নিউইয়র্কের ম্যানহাটানে। ৫৫ মাইল বেগে ছুটে চলছে আমাদের গাড়ি আর ঠান্ডা হাওয়ায় বসে আমরা গান শুনছি। হঠাৎ ড্যাশবোর্ডে চোখ পড়তেই খানিকটা আঁতকে ওঠার মতো অবস্থা হলো। কারণ সেখানে উইন্ড স্ক্রিনের তাপমাত্রা দেখাচ্ছে ১০০ ডিগ্রী ফারেনহাইট। কপালে ভোগ আছে তা পরিষ্কার হয়ে গেল। চলতে চলতে প্রায় ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই আমরা নিউইয়র্কের ম্যানহাটান এলাকার ব্যাটারি পার্কে পৌঁছে গেলাম, এখান থেকেই যেতে হবে লিবার্টি আইল্যান্ডে। এবার পার্কিং এর জায়গা খোঁজার পালা। নিউইয়র্কে গাড়ি পার্কিং করা বেশ ঝামেলার তার মধ্যে আমরা গিয়েছে ফোর্ডের ট্রানজিট নামের বেশ বড়সড় একটি ভ্যান। যত প্রাইভেট পার্কিংয়েই যাচ্ছি সবাই না করে দিচ্ছে যে এত বড় ভ্যানের জন্য কোন জায়গা খালি নেই। কোথায় গেলে পেতে পারি সেই হদিসও কেউ দিতে পারছে না দেখে মেজাজ কিঞ্চিৎ খারাপ হতে শুরু করলো। অবশেষে প্রায় ঘণ্টাখানেক পরে আমরা এক পার্কিং খুঁজে পেলাম। গাড়ি পার্ক করেই ছুটলাম ফেরি টার্মিনালের দিকে। জনপ্রতি ২৩ ডলার করে অনলাইনে টিকিট করাই ছিল।  ওই টিকিটে ভাস্কর্যটির উপরে উঠা এবং এলিস আইল্যান্ড ভ্রমণ অন্তর্ভুক্ত।

 

লিবার্টি আইল্যান্ডে যাবার ফেরি

গ্রীষ্মকালে স্ট্যাচু অব লিবার্টিতে প্রচুর পর্যটক যায়। আপনি যদি অনলাইনে টিকিট না করে যান তাহলে ব্যাটারি পার্ক ফেরি টার্মিনালে যে টিকিট কাউন্টার আছে সেখানেও করতে পারবেন কিন্তু ঘণ্টাখানেক লাইনে দাঁড়াতে হতে পারে। আমাদের যেহেতু অনলাইন টিকিট কাটা ছিল তাই আমরা সরাসরি ফেরি টার্মিনাল চলে যাই। মোটামুটি এয়ারপোর্ট গ্রেড সিকিউরিটি সম্পন্ন করে জ্যাকেট, জুতা, ব্যাগ, বেল্ট এবং ওয়ালেট সবকিছু স্ক্যান করিয়ে ফেরিতে উঠার অনুমতি মেলে। ফেরিতে উঠিই তড়িঘড়ি করে ছাদে চলে যাই ভালো ভিউ পাবার জন্য। তবে রোদের তীব্রতায় সেখানে বেশ কষ্ট হচ্ছিল, বিশেষ করে বাচ্চাদের। ফেরি ছাড়ার পর খানিকটা আরাম বোধ হলো বাতাস শুরু হয় বলে। ফেরি ছাড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা পৌঁছে যাই লিবার্টি আইল্যান্ডে বা স্ট্যাচু অব লিবার্টির বাড়িতে। এই ভাস্কর্যটি আমেরিকার আইকনিক সিম্বল হলেও এটা কিন্তু আমেরিকানরা তৈরি করেনি। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ জয়ে আমেরিকানদের বিশেষভাবে সাহায্য করেছিল ফ্রান্স। আমেরিকার স্বাধীনতা অর্জনের ১০০ বছর পূর্তিতে দুই দেশের বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে, ১৮৮৬ সালে ফ্রান্সের জনগণের পক্ষ থেকে ভাস্কর্যটি আমেরিকাকে উপহার দেয়া হয়। ফ্রান্সে পুরোপুরি তৈরি করার পর বিশাল এই ভাস্কর্যটি খুলে ২০০টি বাক্সে ভরে জাহাজে করে আমেরিকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

লিবার্টি আইল্যান্ড জেটি

১৯২৪ সাল পর্যন্ত ভাস্কর্যটির নাম ছিল লিবার্টি এনলাইটেনিং দ্য ওয়াল্ড, পরবর্তীতে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় স্ট্যাচু অব লিবার্টি। ১৫১ ফুট ১ ইঞ্চি উচ্চতার ভাস্কর্যটির ডান হাতে রয়েছে প্রজ্জলিত মশাল এবং বাম হাতে রয়েছে আইনের বই। স্ট্যাচু অব লিবাটির মাথার মুকুটে রয়েছে সাতটি কাটা, যা সাত মহাদেশ এবং সাত সমুদ্র কে নিদের্শ করে। মাটি থেকে মূল বেদি সহ এর উচ্চতা ৩০৫ ফুট ১ ইঞ্চি। ভাস্কর্যটির নাকের র্দৈঘ্য ৬ ফুট ৬ ইঞ্চি এবং এর এক কান থেকে আরেক কানের দূরত্ব ১০ ফুট। মূর্তিটির ওজন প্রায় আড়াই লক্ষ কেজি। ভাস্কর্যটির পায়ের কাছে পরে থাকা শেকল আমেরিকার মুক্তির প্রতীক। স্ট্যাচু অব লিবার্টির ভেতরে দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে একেবারে মাথায় ওঠা যায়। ভাস্কর্যটির মুকুটে রয়েছে ২৫ টি জানালা, যা অনেকটাই ওয়াচ টাওয়ার হিসেবে কাজ করে।

মজার ব্যাপার হলো যে স্ট্যাচু অফ লিবার্টির ছবি দেখলেই সবাই আমেরিকা ঠাওর করতে পারে সেটা কিন্তু আসলে আমেরিকার কথা ভেবে তৈরি করা হয়নি।ফরাসি ভাস্কর ফ্রেডেরিক অগাস্ট বার্থোল্ডি এটির রূপকার। রোমান দেবী লিবার্টাসের আদলেবার্থোল্ডি এই বিশ্বখ্যাত ভাস্কর্য টিডিজাইন করেছিলেন তবে মুখমন্ডলটি ডিজাইনে তার মায়ের মুখের প্রভাব আছে বলে জানা যায়। ভাস্কর্যটির ভিতরের কাঠামো ডিজাইন করতে তিনি বিখ্যাত গুস্তাভ আইফেলের সাহায্য নিয়েছিলেন। গুস্তাভ আইফেল কিন্তু ফ্রান্সের আইকন আইফেল টাওয়ারের রূপকার।

স্ট্যাচু অব লিবার্টি

প্রাথমিকভাবে বার্থোল্ডি ঠিক করেছিলেন তার এই স্বপ্নের শিল্পকর্মকে তিনি সুয়েজ খালের তীরে স্থাপন করবেন এবং সেই মোতাবেক সুয়েজ কর্তৃপক্ষ ও মিশর সকারের সাথে আলোচনার পর ঠিক হলো সুয়েজ খালের তীরেই স্থাপন করা হবে এই ভাস্কর্যটিকে, নামও ঠিক করা হলো 'ইজিপ্ট ব্রিঙিং লাইট টু এশিয়া'। পরবর্তীতে নানা জটিলতায় ভাস্কর্যটি মিশরে স্থাপন না করা গেলে বার্থোল্ডি আমেরিকায় আসেন তার শিল্পকর্মটির একটা হিল্লে করতে।

শুরুর দিকে আমেরিকাবাসীরাও খুব একটা আগ্রহ দেখাননি এই ভাস্কর্য নিয়ে। তবে অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের পর শেষ পর্যন্ত ভাস্কর্যটি স্থাপন করা হয় যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান শহর ও একদার রাজধানী নিউইয়র্কের হাডসন নদীর মুখে লিবার্টি আইল্যান্ডে। আমরা সেই আইল্যান্ডে পৌঁছে ফেরি থেকে নেমেই সারিবদ্ধ ভাবে এগোতে থাকলাম ভাস্কর্য পানে। কাছে গিয়ে ভাল করে দেখতে লাগলাম বিশ্বখ্যাত সেই ভাস্কর্য। ভাস্কর্যটি তামায় তৈরি হলেও বর্তমানে এর গায়ের রঙ বর্তমানে সবুজ আকার ধারণ করেছে। সময়ের আবর্তে  আটলান্টিক মহাসাগরের নোনা জলের ওপর দিয়ে ভেসে আসা বাতাসের সাথে বিক্রিয়ার ফলে তামার বহিরাবরণের এই সবুজ সাজ। ভাস্কর্য চত্বর ভাল করে ঘুরে, মুর্তিটিকে ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে কিছু ছবি তুলে হাঁটা দিলাম এটির মাথার যাবার জন্য। আবারও সিকিউরিটি চেক করাতে হলো। বয়স্ক এবং অপারগ মানুষের জন্য লিফটের ব্যবস্থা আছে সেখানে তবে আমরা সিঁড়ি বেয়েই উঠতে লাগলাম। প্রায় ১০ তলা সমান উঁচু প্যাডেস্টালে পৌঁছার পর আমাদের থামতে হলো কারণ কোভিডের কারণে একদম মাথা পর্যন্ত উঠা বন্ধ আছে যদিও মাথার মুকুট পর্যন্ত উঠার জন্য টিকিট কাটা ছিল আমাদের।

প্যাডেস্টালের ওপর থেকেই মূল ভাস্কর্যের শুরু। সেখান থেকে ভাস্কর্যটির ভিতর দিয়ে উঠতে যাওয়াটা খানিকটা কঠিনই বলা চলে কারণ এর থেকে উপরের দিকে উঠতে হলে বেশচাপা প্যাঁচানো প্যাঁচানো খাড়াসিঁড়ি বাইতে হবে। উপর যাওয়া বারণ বিধায় নিচ থেকে তাকিয়ে উপরের দিকে দেখলাম। গ্লাস লাগানো থাকাতে মোটামুটি অনেকটা অংশ দেখা যায়। প্যাডেস্টালে কর্মরত সিকিউরিটি অফিসার খানিকাটা ব্রিফিং দিলেন এবং বললেন যে এই ভাস্কর্যের ভিতরের কাঠামোর সঙ্গে আইফেল টাওয়ারের খানিকটা মিল আছে। দেখিয়ে দিলেন কোন কর্নার থেকে দেখলে আইফেল টাওয়ারের মতো মনে হবে। প্যারিসের আইফেল টাওয়ার কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে আমার। তাই সিকিউরিটি অফিসারের দেখিয়ে দেয়া অংশ দিয়ে তাকিয়ে ভিতরের কাঠামোর সাথে আইফেল টাওয়ারের বেশ সাদৃশ্য পেলাম।

মূল ভাস্কর্যের ভিতরের কাঠামো

প্যাডেস্টালে বা ভাস্কর্যের পাদদেশে খানিকক্ষণ সময় কাটিয়ে ছবি-টবি তুলে নামার পথ ধরলাম।সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে আমার স্ত্রীর তেষ্টা পেয়ে গেল। নিচে নামার পর পানি খাবে না লেমনেড খাবে জিজ্ঞেস করাতে সে বলল লেমনেড খাবে। অগত্যা লেমনেড তথা খাস বাংলায় লেবুর শরবত অর্ডার করলাম। প্লাস্টিক গ্লাসে অর্ধেক বরফের উপর আধখানা ফ্রেস লেবু, দুই চামচ চিনি আর পানি এই হলো লেমনেড। আমাদের মোট ১১ জনের জন্য বিল আসলো ১৮৬ ডলার। এমনিতেই ভীষণ গরম তার উপর লেবু পানির বিল দেখে গায়ের জ্বালা আরও বেড়ে গেল। নিজেকে আর ধরে রাখতে না পেরে স্ত্রীকে বলেই ফেললাম বাংলাদেশ তোমাকে কখনো লেবুর শরবত খেতে দেখিনি আর এখানে এসে তুমি ১৮৬ ডলার নামিয়ে দিলে। বউ মুখে কিছু না বলে আমার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে থাকলো যেন আমার থেকে বড় কিপ্টে সে জীবনেও দেখেনি। শ্যালিকা আমার পাশে ছিল বলেই সেই যাত্রা রক্ষা পেলাম।

লিবার্টি আইল্যান্ড ঘোরা শেষ, মিউজিয়াম না দেখেই ফেরির পথ ধরলাম কারণ আমাদের পরের গন্তব্য এলিস আইল্যান্ড। ফেরিরে উঠার সময় কাঠের পাটাতনের বাহিরের দিকে স্টিল স্ট্রাকচারের গর্তে প্রচুর কয়েন দেখতে পেলাম। ইউরোপিয়ান-আমেরিকানরা এরকম হাজারো কয়েন প্রতিবছর নানা ধরনের মনোবাসনা নিয়ে পানিতে ছুঁড়ে মারে। এখনেও হয়তো তেমনি কিছু হয়েছে, কিছু অংশ গিয়ে সাগরে পরেছে বাকিটা পল্টুনের স্টিল স্ট্রাকচারের গ্যাপে আটকে গিয়েছে।

ফেরিতে উঠেই আবারো ছাদে চলে গেলাম, সমান্য পরেই চলে আসলাম এলিস আইল্যান্ডে। এলিস আইল্যান্ড একসময় একসময় ছিল অভিবাসীদের  ইমিগ্রেশন সেন্টার। এখানে ইমিগ্রেশন শেষ করে তারা আমেরিকার বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়তো। ১৮৯২ সাল থেকে ১৯৫৪ সালে বন্ধ হয়ে যাবার আগ পর্যন্ত ৬০ বছরে প্রায় ১২ মিলিয়ন অভিবাসীর ইমিগ্রেশন হয়েছিল এই আইল্যান্ডে। অনুমান করা যায় যে বর্তমান মার্কিন নাগরিকদের প্রায় ৪০ শতাংশের পূর্বপুরুষদের মধ্যে কেউ না কেউ এই দ্বীপের মাধ্যমে আমেরিকাতে অভিবাসিত হয়েছিল।

এলিস আইল্যান্ড ইমিগ্রেশন রেজিস্ট্রেশন হল

ইমিগ্রেশন সেন্টারটিকে বর্তমানে স্মৃতিশালা হিসেবে বেশ সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা হয়েছে। ইমিগ্রেশন হল, লাগেজ রুম সহ পুরো ইমারতটি ভাল করে ঘুরে দেখলাম। প্রচুর পিক্টোরিয়াল ডিসপ্লে আছে যেগুলো পড়তে গেলে অনেক সময়ের দরকার। বিল্ডিঙে দুই ফ্লোরে দুটো থিয়েটারও আছে পুরো ইতিহাসের উপর মুভি দেখানোর জন্য। আমাদের সময় কম থাকাতে মুভি না দেখেই ফিরতে শুরু করলাম কারণ ততক্ষণে দিনের আলো কমতে শুরু করেছে।

;