তোমার কয়েকটি ছায়া লোকাল ট্রেনে চেপে বসেছে

মন্দিরা এষ
অলঙ্করণ: কাজী যুবাইর মাহমুদ

অলঙ্করণ: কাজী যুবাইর মাহমুদ

  • Font increase
  • Font Decrease

অব্যক্ত

কেউ একজন লিখছে; তার লেখার মাঝে নিজেকে হাতড়ে বেড়াই। সে তার কবিতায় আমাকে হাতড়ে বেড়ায়।
আমাদের কখনো কথা হয়নি বৃষ্টি নিয়ে; এমনকি বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে সমস্ত বৃষ্টিকাল নিশ্চুপ থেকেছি আমরা। আর অনেক দূরবর্তী কম্পমান লালবিন্দুর উষ্ণ স্পর্শে থেকেছি নিজস্ব শৈত্যের আড়ালে। বিন্দুরা সর্বদা দূরগামী সামুদ্রিক যাত্রী, এই মেনে আমি আরো প্রাচীন পাথরের বন্দর হই গোধূলির জাফরান ফুরিয়ে যেতে যেতে।
কেউ একটি সমুদ্র নরম কলাপাতায় মুড়ে নিয়ে আসে, তার উচ্ছ্বসিত চোখের ভাঁজে আমার বন্দরজীবনের অব্যক্ত গল্প ঘুমিয়ে যায় রোজ।

 

শ্যাডোস বিহাইন্ড মি

আমার নামে কিছু বোধহীন ছায়া ঘুরেফেরে
এই ধরো, নীলকুমারের তীর ঘেঁষে
আর জলের ভেতর—ছায়াদের ঘনতর ছায়ারা থাকে
ভাবতে পারো তারা পরস্পর কথা বলছে;
কিংবা নেহায়েত নড়ছে-চড়ছে শ্বাসের ব্যবধানে
সেদিন বাড়ি থেকে নেমে হাঁটছি;
হঠাৎ শুনি ছায়াদের কেউ বলে উঠল—
‘তোমার কয়েকটি ছায়া শ্বেতকাঞ্চনতলা থেকে
লোকাল ট্রেনে চেপে বসেছে
টিকিট কাটেনি
কমলাপুর থেকে জরিমানা দিয়ে ওদের ছাড়িয়ে নিয়ে এসো’
তাদের আমি চিনি না—বলে উর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে থাকি
পরস্পর ফিসফাস পেছনে ফেলে
আত্মীয়-বন্ধু কিংবা পরিচিতদের চিঠি আসে না বহুকাল হয়
ডাকবাক্সে জমতে থাকে এইসব বোধহীন ছায়াদের চিঠি…

 

দান্তের চিঠি

দান্তের ছাইরঙা চিঠি খুলেছে সকাল
এখানে নরক গুলজার!
প্রতিটি ইনফেরনো থেকে
ধূমায়িত অন্ধকারে—বিপন্ন ঘুম নিয়ে আসি
ঘাটে বাঁধা নৌকায় তুলে দিই আশ্বাস।
এপারে কুয়াশা জমে গেছে; নরম
জমেছে হত্যাপ্রবণ একাকীত্ব
অসহ্য মানবিক দিনে এখনো সূর্য ওঠেনি যখন
দান্তের গিটারিস্ট বন্ধু সুর তুলে হারিয়ে গিয়েছে
কেউ জানেনি কখনো—
দান্তের চোখে জল ছিল কিনা!

 

সঙ্গী

স্থির শুয়ে আছি
ওপরে স্টেইনলেস ব্লেড তীব্র গতিতে ছুটছে।
মাঝে পৃথিবীর সব থেকে দুখি ও সুন্দর প্রাণীটি—
তার চকচকে খয়েরি পাখনা মেলে উড়ছে আয়েশে।
বর্তমানে আমার একমাত্র সঙ্গী ।
সে আমাকে দেখছে না,
আমার মমতায় আর্দ্র চোখ দেখছে না,
তীব্র ব্লেড তাকে তীব্র আকর্ষণ করছে...
তার ছিন্ন ডানার কুচি—আমার বিছানায়
ছিন্ন মস্তক—আমার শিয়রে

ওপরে স্টেইনলেস ব্লেড তীব্র গতিতে ছুটছে
নিচে স্থির শুয়ে আছি আমি
মাঝে—
শূ
ন্য
তা...

 

ডেড সি

একটা প্রচণ্ড চিৎকারে ভেঙে গেল কাচের সমুদ্র
ছলকে পড়ছে এত রিমঝিম—
যেন কোনো বিকেল ডুকরে যাচ্ছে,
যেন কোনো তুমুল রাত ভাসিয়ে দিচ্ছে তোমার শহর...
একটা প্রতিধ্বনি গুমরে গেল আনাচে-কানাচে
আর ছায়ারা ভাবছে নৈঃশব্দ্য!
যেন কোনো ট্রেনহীন পতিত জংশন,
যেন কোনো ঠান্ডা চোখ থেকে স্বপ্ন মরে গেল...
সমস্ত গাণিতিক বিন্যাস পেরিয়ে—
তোমার নগ্ন শরীর ডুবছে-ভাসছে
কাচের সমুদ্রে...
তুমি শ্বাস নাও, হাত-পা ছড়িয়ে ভেসে থাকো
এটা একটা ‘ডেড-সি’ ।

আপনার মতামত লিখুন :