মায়ের চিঠি, অনাগতকে

শিমুল সালাহ্উদ্দিন
অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

  • Font increase
  • Font Decrease

সোনারে আমার,
তুইতো আমার বুকের ভেতর কাঁপন হয়েই ছিলি। কখন এলি ভেতরে আমার? তোকে খুব ধরতে ইচ্ছে করে রে। তোর কী কী দেখতে আমার মতো হবে রে? চোখ চুল? নাক মুখ কি তোর পাষাণ বাবা লোকটার মতো?

কোথাও তুই নেই, তবু দ্যাখ, সমস্ত অস্তিত্ব জুড়ে আছিস। আমাকে ভেঙে ফেলতে থাকা ব্যথায় আছিস, আছিস গা গুঁলিয়ে ওঠায়, বমি-বমি লাগায় আছিস। নিজেকে পাগল মনে হয় জানিস রে বাবু, বমি করে আয়নায় তাকিয়ে হেসে ফেলি।

আমার খেতে কক্ষনো ভালো লাগত না, তোর জন্য এখন জোর করে করে খাই। সেদিন কী হয়েছে জানিস, তোর বাবা তার প্রিয় মাছের মাথা আমাকে বেছে বেছে খাওয়ালো অনেকক্ষণ ধরে। তোর দাদি সেটা দেখে মুচকি হেসে মুখে কাপড় চেপে চলে গেলেন নিজের ঘরে।

তুই আসবি, এই খবরে বাড়িতে আমার দাম যে কী বাড়া বেড়েছে রে। কলঘরে আমাকে গরম পানি এনে দেয় তোর বাবা। রান্নার সব কাজ ভাগাভাগি করে নিয়েছে তোর দাদি আর ফুপু। তোর বাবা বলে, আমার নাকি এখন শুধু আরাম করতে হবে! আর পড়তে হবে স্নিগ্ধ সুন্দর সব বই, শুনতে হবে ধ্রুপদী সব গান।

আর তোর দাদু কী করে জানিস! প্রতিদিনই বাজারে গিয়ে কিছু না কিছু নিয়ে আসবে। গাছপাকা একটা কৎবেল এনেছে সেদিন, সারা দুপুর বসে বসে খুঁচিয়ে খেয়েছি কাঠি দিয়ে। কাঠিতে আর উঠছে না দেখে, পত্রিকা পড়া ছেড়ে এসে আছাড় দিয়ে ভেঙে দিলেন, কী যে আদর বেড়েছে আমার রে বাবু! সব তোর জন্য।

কিন্তু তোকে দেখব তো আমি। মাঝে মাঝে মনে হয় পৃথিবীর সবার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিই। তুই আমার জীবন নিয়ে আসবি বলে মনে হয় আমি আর বাঁচব না। কিন্তু তোকে বুকে চেপে না ধরে মরে যাওয়াটা খুব খারাপ হবে রে সোনা। এজন্যই একটুও ইচ্ছে করে না, তবুও প্রতি সপ্তাহে ডাক্তার আপার কাছে যাই।

এবড়ো থেবড়ো রাস্তায়, রিকশায় যেতে যেতে তোর বাবা যে কিভাবে আগলে জড়িয়ে থাকে আমায়, আমার খুব লজ্জা করে। কাউকে বলতে পারি না বলেই না তোকে বলছি।

উফফ, তুই কি ফুটবলার হবি রে বড় হয়ে? এত প্র্যাকটিস কেন করিস রে পেটে? নাকি মায়ের মতো ঠোঁটকাটা হবি তুই, সত্যি বলতে ভয় পাবি না।

তোর নাম নিয়ে তোর বাবার সাথে খুব ঝগড়া হচ্ছে। আমি বলি, আপনি কবি, নাম আপনি রাখেন, কিন্তু তিনি বলেন, তুমি মা। মা এমনকি কবির চেয়েও বড়। সব সন্তানের নাম মায়েরই রাখা উচিত। মুখে বলিনি, কিন্তু জানিস রে বাবু, এটা কিন্তু আমারও সত্যি বলে মনে হয়। কিন্তু আমার মাথায় যে বাবু, সোনা, আদরমনি এসব ছাড়া ভালো নাম আসেই না!

এদিকে, তোর দাদু, দাদি, ফুঁপু, চাচা, মামা সবাই একটা করে নাম ঠিক করে বসে আছে। তোর নানা আর নানু এসেছিল সেদিন জানিস, তোর নানু মানে আমার মা, আমিও তার পেটে ছিলাম। কত অজানা গল্প যে করল, আমিও নাকি অনেক কষ্ট দিয়েছি, সেই গল্প শুনে তুই যে আমাকে কত লাথি দিচ্ছিস, সব সহ্য করে নিচ্ছি।

এই শোন সোনা, তোর নানা নানু আমাকে নিয়ে যেতে চেয়েছিল, প্রথম সন্তান নাকি মায়ের কাছে হওয়াই ভালো, কিন্তু তোর দাদু আর দাদা আমাকে যেতেই দিল না, আমার মা বাবাকে বলল, আপনারা থেকে যান এ বাড়িতে। শোন, আমার কী যে ভালো লেগেছে রে। তোর নানা নানু আবার শুক্রবার আসবে।

আমি এখন অদ্ভুত অদ্ভুত স্বপ্ন দেখি, দেখি উঠানে তুই আমার আঙুল ধরে হাঁটছিস। ছোট্ট একটা তুই, তোকে আমি নিজের হাতে বানানো লাল শার্ট পরিয়েছি,আর তোর বাবার এনে দেয়া লাল জুতা। একবার নামলে কোলে উঠতেই চাস না তুই, জোর করে কোলে নিতে হয়। অথচ একটু হেঁটেই পড়ে যাস বারবার। এই স্বপ্নটা তোকে বলতে পারলাম, বেশিরভাগ ঘুম ভেঙে মনেই থাকে না।

মাঝরাতে হঠাৎ হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায়, আর ঘুম আসে না। আমি উঠলেই না ডাকলেও তোর বাবা উঠে যায়, চা বানায়, একটুও বিরক্ত হয় না। আমাকে কী আজব সব ভাষার কবিতা শোনাতে থাকে।

তুইও কি আমাকে এমন ভালোবাসবি? প্লিজ তোর বাবার মতো বোকা হোস না। তার মতো ভালোমানুষ হলেও একটু চালাক চতুর হোস। তোর বাবার মতো ছিঁচকাদুনে হোস না, কথায় কথায় কাঁদে লোকটা। আর কিছুই লুকাতে পারে না। মিথ্যা বললেই ধরা পড়ে যায়।

তুই হবি শার্লক হোমসের মতো, প্রফেসর শঙ্কুর মতো, ফেলুদার মতো। নাকি তুই হুমায়ূন আহমেদের শুভ্রর মতো হবি রে, তোর বাবা কিছুটা শুভ্রর মতো ম্যান্দামার্কা, ওরকম হোস না। নাকি সুলতানা রাজিয়ার মতো হবি তুই, নির্ভীক, বিশ্বজয়ী? ওয়াসফিয়ার মতো এভারেস্ট জয় করে ফেলবি? নাকি তোর বাবার মতোই আলসে একটা ছাপোষা কবি হয়ে আরামের জীবন কাটিয়ে দিবি? কিংবা তোর মায়ের মতো আদুরে একটা বউ! তুই কি লতার মতো গান গাইবি? নাকি সেঞ্চুরির পর সেঞ্চুরি করবি শচীনের মতো? ববিতার মতো নায়িকা হবি? নাকি সত্যজিতের মতো চলচ্চিত্রকার?

তুই কি আমার সাথে অভিমান করবি, রাগ করবি? নাকি আমি রাগ করলে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলবি? তুই কি আমাকে বায়েজীদ বোস্তামির মতো ভালোবাসবি রে সোনা? নাকি ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের মতো পৃথিবীর সবাইকে বাসবি ভালো? নাকি কবি হবি তুই জীবনানন্দের মতো?

আচ্ছা যা, তুই হবি ঠিক তুই যা চাস, তাই তাই। কারোর মতোন না, তোর চাওয়ার মতোন। আচ্ছা এই চিঠি পড়ে কি তুই মিটি মিটি হাসবি রে সোনা? ভাববি, আমার মা-টা একটা আস্ত পাগল ছিলে! মরে বেঁচেছে!

তখন যদি সত্যি আমি না থাকি, দূর আকাশের তারা হয়ে যাই, এজন্য এই চিঠি লিখে রাখলাম তোকে, বাবু। ভয় পাবি না কক্ষনো তুই, তোর মা আছে, ধ্রুবতারার মতোই, তোর সাথে সাথে সবখানে। জীবন খুব সুন্দর, উপভোগ্য, সাহস রাখবি বুকে।

ইতি
তোর মা

আপনার মতামত লিখুন :